ধর্মসংকটের বলি মানবতা --পর্ব ৫
এবার আসি ইসলাম ধর্মে। ইসলাম ধর্ম আলোচনার আরম্ভে একজন বিদগ্ধ পণ্ডিত ও প্রাবন্ধিক, যার সঙ্গে আমি সহমত পোষণ করি সেই শ্রদ্ধেয় সত্যেন্দ্রনাথ রায় মহাশয়ের কথাগুলি উদ্ধার করি,
"ইসলাম একই সঙ্গে একটি ধর্ম, একটি রাজনৈতিক শক্তিকেন্দ্র এবং সেকালের পক্ষে (ষষ্ঠ শতক থেকে সম্পূর্ণ মধ্যযুগ) সুশৃঙ্খল সমাজগঠনের একটি ব্যবস্থা। ইসলামের সমাজ-পরিকল্পনায় দুটি বৈশিষ্ঠ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এক হোল দৃঢ়বদ্ধ সামাজিক সংহতি আর দুই সামাজিক সুবিচার ও সাম্য। এক সময় অন্য ধর্ম থেকে মানুষ যে দলে দলে ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়েছে তার মধ্যে এই সাম্যের আকর্ষণ অনেকখানি ক্রিয়া করেছিল।"
ইব্রাহিমীয় ধর্মীয় ধারায় ইসলামের অভ্যুদয় --- এমন একটি ইতিহাস সমর্থিত বিশ্বাস আছে। মহান আদম থেকে সুলেমান, এরা সকলেই ঈশ্বরের কছ থেকে বাণী লাভ করেন ও মানুষের মঙ্গলের জন্য সে বাণী প্রচার করেন। মহানবী হজরত মহম্মদ তেমনি ঈশ্বরের বাণী- বাহক। সেই বাণী বিধৃত আছে কোরান ধর্মগ্রন্থে।
"La ilaha il Allah ; Muhammed Rasool Allah"
(There is none worthy of worship except God. Muhammed is the Messenger of God). ---.......................................................................
This is not a new Message. It is the pristine message of all Prophets. The Qur'an affirms this again and again and emphasizes the continuity of the Divine Word. The names of many of the Messengers ------- Adam, Abraham, Moses, Jesus, Muhammed (peace be upon them) ---are explicitly stated in the Qur'an. The names of countless others are alluded to but are not spelled out. In this manner, The Qur'an upholds the Unity of all universal religions."
The Qur'an
--------------Dr.Nazeer Ahmed.
নবী হজরত মহম্মদের জন্ম ৫৭০, মতান্তরে ৫৭১ খ্রীষ্টাব্দে। বাল্যকালেই তিনি পিতামাতাকে হারান এবং চাচা আবু তালিবের স্নেহ ও যত্নে বড় হয়ে ওঠেন। প্রথম জীবনে 'চরবাহা' বা মেষপালকের ভূমিকায়, পরে তিনি ব্যবসায়ী হিসাবে কর্মজীবন অতিবাহিত করেন। কিন্তু জ্ঞানোন্মেষ হওয়ার সময়কাল থেকেই তিনি ছিলেন আত্মানুসন্ধানী ও সত্যানুসন্ধানী। তিনি নূর পর্বতের হেরো গুহায় নিয়মিত গভীর ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। ৩৫ বছর বয়সে তাঁর তপস্যা কঠোরতর হয় এবং যখন তার ৪০ বছর বয়েস তখন কুরআনের প্রথম আয়াত তার উপর অরতীর্ণ হয়। এই ভাবে ঈশ্বরের বা আল্লাহর বাণী লাভ করতে থাকেন। আয়াতগুলি ভক্তদেরকে দিকনির্দেশ করেন, বোধ বুদ্ধি দান করেন এবং স্বর্গীয় সংবাদ পৌঁছে দেন। তিনি বিশ্বাস করলেন এবং আপনজনদের জানালেন, আয়াতগুলি জিব্রাইল ফেরেস্তা দ্বারা প্রেরিত আল্লাহর (ঈশ্বরের) বাণী। তিনি নিজেকে আল্লাহর রাসুল ও নবী বলে ঘোষণা করেন এবং প্রচার করেন যে তিনি পূর্ববর্তী নবীদের পরম্পরায়, ঈশ্বরের বাণী প্রচার করবার আদেশ প্রাপ্ত হয়েছেন।
ধর্ম প্রচারের প্রথম দিকে মক্কায় কিছু গোষ্ঠী ও আত্মীয়দের কাছে বাধাপ্ৰাপ্ত হয়েছিলেন। তিনি মদিনায় আসেন। 'মদিনার সনদপত্র' নামক সংবিধানের মাধ্যমে ধর্মাদর্শ ঘোষণা করেন, সেখানকার ভিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠীগুলিকে সঙ্ঘবদ্ধ করেন। এবার মক্কার ঐ প্রকার গোষ্ঠী-সম্প্রদায় ও পৌত্তলিকদের সঙ্গে প্রায় আট বছর ধরে যুদ্ধ চলে। এই সময়কালে তার অনুসারির সংখ্যা অকল্পনীয়ভাবে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হতে থাকে। তিনি ৬৩০ খ্রীষ্টাব্দে দশ হাজার সাহাবির এক বিশাল মুশলিম বাহিনীর নেতৃত্বে মক্কা অবরোধ করেন। মক্কা বিজয় ঘটেছিল রক্তপাতহীন অভিযানের মাধ্যমেই। মক্কায় প্রবেশ করেই সমস্ত মূর্তিই ধংস করার আদেশ দেন।
এইভাবে বহু সফল অভিযানের নেতৃত্ব দিয়ে আরবের প্রায় সম্পূর্ণ অংশ দখল করেন এবং একই সাথে তাঁর ধর্মপ্রচারও অব্যাহত থাকে। ইসলাম বর্ষপঞ্জীর মতে ১০ম হিজরীতে, ৬৩২ খ্রীষ্টাব্দে জীবনে একমাত্র এবং শেষ হজ্জ পালন করার সময় আরাফাতের ময়দানে, জাবাল-এ-টিলার উপর দাঁড়িয়ে সমবেত লক্ষাধিক তাঁর অনুগমনকারী মুসলমানদের উদ্দেশে তিনি ভাষণ দেন। এই ভাষণ মহান মুসলমানগণ বিশ্ব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণ বলে বিবেচনা করেন, যে ভাষণে তিনি ইসলামের প্রকৃত মূল্যবোধ অনুযায়ী মুসলমানদের কী করণীয় সে সম্পর্কে চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা দান করেন।
আমরা মহান নবী হজরত মহম্মদের প্রচারিত ধর্মধারণার ব্যাপ্তি, গভীরতা ও দর্শন নিয়ে আলোচনার স্পর্ধা সংবরণ করতে চাই এই কারণেই যে ইসলাম ধর্মের সাধক যাঁরা তাঁরাই এই ধর্মদর্শনের ও তার আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যার অধিকারী। তবে এই বিষয়ে অতি সামান্য অধ্যয়নের ফলে এটুকু উপলব্ধি করেছি যে ইসলামধর্মেরও মূল আদর্শ ভ্রাতৃত্ব, সাম্য এবং মানবতা। মহান নবী তার শেষ বিদায়ী ভাষণে (খুৎবা) বলছেন, "মনে রেখো এক মুসলিম আরেক মুসলিমের ভাই।" তাঁর এই ঐতিহাসিক উপদেশগুলি "মানবাধিকারের শ্রেষ্ঠ সনদ।"
ইউরোপের খ্রীষ্টানধর্ম যেমন যীশুখ্রীষ্টের প্রয়াণের প্রায় তিন শতাব্দী পরে রোম সাম্রাজ্যের শাসকদের, এবং ক্রমান্বয়ে অপরাপর রাষ্ট্রের শাসকদের, অভিজাতবর্গের পৃষ্টপোষকতা লাভ করেছিল মধ্যপ্রাচ্যের হজরত মহম্মদ প্রচারিত ধর্মধারণা কিন্তু জন্মলগ্ন থেকেই যোদ্ধার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এখানে সূচনাপর্ব থেকেই ইসলামে ধর্ম ও রাষ্ট্র অভিন্ন। ৬৬২ খ্রীষ্টাব্দে মহান নবী হজরত মহম্মদের মহা প্রয়াণের সঙ্গে সঙ্গেই ইসলামের ধর্মশক্তি ও রাষ্ট্রশক্তির সম্পৃক্ততা-জনিত দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক রূপের সঙ্গে ধর্মাচার ও ধর্মীয় আদর্শের মিলনের ফলে শাসকবর্গের মধ্যে ক্ষমতার অধিকার লাভের নিষ্ঠুরতা অনিবার্য হয়ে উঠল। অন্তর্কলহ, পররাজ্য আক্রমণের দ্বারা ধর্মাদর্শের প্রচার, পরধর্ম অসহিষ্ণুতা -- ধর্মের প্রাতিষ্ঠানিকতার যত কিছু লক্ষণ সবই যুক্ত হোল ঐসলামিক সাম্রাজ্য বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে। হজরত মহম্মদ পরবর্তী সময়ে কে খলিফা হবেন তাই নিয়ে ঘোরতর অন্তর্দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছিল। আবুবকর পক্ষের সাথে আলি পক্ষের মতবিরোধের পরিণতি ৬৮০ সালে কারাবালা প্রান্তরের যুদ্ধ। এখানে উমাইয়া সৈনদলের সঙ্গে যুদ্ধে আলির কনিষ্ঠ পুত্র হুসেনের পরাজয় ঘটে এবং আলি নিহত হন। সেই সময়েই সিয়া ও সুন্নী এই দুই শাখায় ইসলামের মূল স্রোত দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যায়, শিয়া সুন্নী সম্প্রদায়ের এই বিচ্ছেদ চরম বৈরীতায় পর্যবসিত হয়। অন্তর্দ্বন্দ্বের এখানেই শেষ নয়, দ্বিতীয় খলিফা ওমর নিহত হন তাঁর ক্রীতদাসের হাতে, তৃতীয় খলিফা ওসমান ও চতুর্থ খলিফা আলি দুজনই নিহত হয়েছিলেন গুপ্তঘাতকের দ্বারাই। প্রাথমিক পর্যায়ে ইসলামের অভ্যন্তরে এমন শাসনক্ষমতা ও ধর্মগুরুর অধিকারের রক্তাক্ত সংগ্রাম যেমন ছিল তেমনি ছিল ইসলাম সাম্রাজ্যবাদের বিস্তার। কালের বিবর্তনের সাথে সাথে ইউরোপখণ্ডের সম্প্রসারণবাদী খ্রীষ্টানধর্মের মতই ইসলাম ধর্মও বিশ্ববিজয় অভিযানে উদগ্রীব হয়ে উঠল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলেছিল (চলেছেও) এই আগ্রাসন। প্রভুত্বের দুর্মদ আকাঙ্ক্ষা-প্রসূত অন্তর্দ্বন্দ্বের ফলে গুপ্ত হত্যা, ভ্রাতৃহনন, আত্মজনহনন যেমন ছিল তেমনি ছিল ইসলাম সাম্রাজ্যবাদের ক্রমসম্প্রসারণশীল প্রবনতা। খলিফা আবু বকর সর্বপ্রথম আরব-বিজয় সম্পূর্ণ করেছিলেন। তারপর দ্বিতীয় খলিফা ওমরের নেতৃত্বে আরম্ভ হোল প্রকৃতপক্ষেই এক দেশ হতে অন্যদেশে সমরাভিযান। অল্পকালের মধ্যেই প্যালেস্টাইন, ইরাক, সিরিয়াসহ সমগ্র মিশর। সাম্রাজ্যবিস্তারী ইসলাম মহান নবী মহম্মদের তিরোধানের পরবর্তী এক'শ বছরের মধ্যে ইউরোপখণ্ডের স্পেন থেকে এশিয়া মহাদেশের সিন্ধুনদের তীরবর্তী অঞ্চল ছাপিয়ে চীন পর্যন্ত এবং ওদিকে উত্তর আফ্রিকার সুবিশাল ভূখন্ডে ইসলামের আধিপত্য বিস্তৃত হোল।
ইসলাম ধর্মে সিয়া ও সুন্নী বিভাজনের কথা আমরা আগেই বলেছি। কোনও ধর্মের মূলিভূত যে রূপ তার বিবর্তন ঘটা স্বাভাবিক যখন সেই ধর্মের আচরণগত বৈসাদৃশ্য আসে। সেই বৈসাদৃশ্য উদ্ভুত হয় কালে কালে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মগুরুদের নিজস্ব ব্যাখ্যার দ্বারা। ইহুদী ধর্মে তেমন ঘটেছে ; তেমন ঘটেছে খ্রীষ্টান ধর্মে। ইসলাম ধর্মেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ইসলাম যখন ভৌগলিকভাবে বিভিন্ন ভূখন্ডে এবং বিভিন্ন জনজাতির লোকায়ত ধর্মধারণার ও ধর্মসংস্কারের সংস্পর্শে এসে পৌঁছাল তখন কৌমচেতনা ও কৌমপ্রবনতার প্রভাবে ইসলামের ভিন্ন ভিন্ন শাখারও উদ্গম অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠল। তাদের মধ্যে কয়েকটি --- যেমন খারিজি সম্প্রদায়, মুরজিয়া সম্প্রদায়, ইসমাইলী শিয়া সম্প্রদায়, মুতাজিলা গোষ্ঠী।কলকাতা পীর, ফকির, দরবেশ ইত্যাদী।
নবী হজরত মহম্মদ প্রচারিত ও প্রতিষ্ঠিত ইসলাম এক দৃঢ়সংবদ্ধ রাষ্ট্রশক্তি, না কি ধর্ম-শক্তি এই জটীল প্রশ্নের উত্তর ইতিহাসের জটাজালে জড়িয়ে রয়েছে। আমরাও তার মীমাংসায় যাবো না। তার বিচার করুক শাশ্বত মহাকাল, কিন্তু এই রাষ্ট্রশক্তির পৃষ্টপোষকতায় প্রচারিত ও প্রসারিত ইসলামের বিজয়াভিযানে মানবসভ্যতার কতখানি বিকশন সম্ভব হয়েছে, কতখানি মঙ্গলালোক বিকীর্ণ হয়েছে পৃথিবীর বুকে তাই যেন বিচার্য বিষয় হয় অনাগত ভবিষ্যতে।
একথাও ঠিক যে ক্ষমতালিপ্সু রাজশক্তি বা আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রশক্তি ধর্মধারণার আদি ও মূল আদর্শ ও উদ্দেশ্য বিস্মৃত হয়, দয়া মায়া করুণা, শুশ্রূষা ও সহিষ্ণুতা প্রভৃতি কোমল মানবিক বৃত্তিগুলি ঢেকে যায় হিংস্রতা, জিঘাংসা, নির্মমতার অন্ধ অমানবিকতায়।
খ্রীষ্টানধর্মের এবং ইসলামধর্মের এবম্প্রকার বিশ্ববিজয়ী সাম্রাজ্যের শাসনতন্ত্রের অধীনে-থাকা দেশগুলির বিভিন্ন প্রকার উন্নতি-অবনতির আলোচনা করবার পরেও ধর্মতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদ সত্যেন্দ্রনাথ রায় মন্তব্য করছেন,
"জানিনা কোন্ অধিকারে এক রাজ্য অপর রাজ্য জয় করে, দিগ্বিজয়ী কোন্ অধিকারে পাইকেরি নরহত্যার পথে ধাবিত হয় ; জানি না এক ধর্ম কেন অপর সমস্ত ধর্মের বিরুদ্ধে আগ্রাসী অভিযান চালায়, তাতে জগতের কার কি হিত হয় ! শুধু জানি, এই সব আগ্রাসী অভিযান মানুষের যত ঘর ভেঙেছে, যত জনপদ শ্মশান করেছে, যত রক্ত ঝরিয়েছে কোন কিছুতেই তার দাম ওসুল হয় না। রক্তপাতের প্রসঙ্গে আবার ক্রুশেডের কথাও আসতে পারে, কেননা কয়েক শতাব্দীব্যাপী এই যুদ্ধ তো একা খ্রীষ্টীয় পক্ষেই করেনি, অপর দিকে মুসলমানপক্ষও ক্রুশেড যুদ্ধে কখনই অনাগ্রহী ছিল না। খ্রীষ্টীয় পক্ষ যেমন লুব্ধ দস্যুর দৃষ্টিতে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে বার বার দৃষ্টিপাত করেছিল, মুসলমান পক্ষীয়রাও ঠিক সেইরকমই আগ্রাসী মনোভাব নিয়েই ইউরোপে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করেছিল। উভয় পক্ষের ধর্মীয় প্রাধান্য লাভের অভিপ্সাও তুল্যমূল্য।"
ধর্মের প্রভুত্ব মানবচেতনার কোন্ অনাগত প্রত্যুষে মানবপ্রেমের স্বর্গরাজ্য স্থাপনা করবে তারই প্রতীক্ষায় আজ "হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বীর" ঘোরতামসময়ী অমানিশা-জাগরণ।
তমসো মা জ্যোতির্গময়।।
(ক্রমশঃ)
এরপর পর্ব ৬।
ভারতীয় ধর্ম (বর্তমানে যা 'হিন্দু' ধর্ম নামে আলোচিত)।
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২৯/০১/২০২৫
কলকাতা
______________________________________________
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন