ধর্মসংকটের বলি মানবতা -- পর্ব ৩
রোমান ক্যাথলিকরা একই সাথে ধর্মীয় সাম্রাজ্যবাদের সম্প্রসারণের জন্য যেমন পূর্বদেশ অভিযানে (Crushed war) নেমেছিল, ঠিক তেমনি আবার ঘর সামলাতেও এক নির্দয় পরিমার্জন কাজে আত্মনিয়োগ করেছিল --- যেটির নাম ইনকুইজিশন (Inquisition)। অর্থাৎ গৃহশত্রুর অনুসন্ধান। রোম সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে প্রজাদের মধ্যে অ-খ্রীষ্টানরা ও অ-ক্যাথলিক খুঁজে বের করে তাদের ইনকুইজিশন নামের ট্রাইবুনালে (Inquisition Tribunal) বিচারের ব্যবস্থা করা। ত্রয়োদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে, ক্রুশেডের তীব্রতা যখন ধীরে ধীরে কিছুটা মন্দীভূত হয়ে এল, তখন রাজশক্তির সাহায্যপুষ্ট রোমান ক্যাথলিকরা 'বিধর্মী' এবং অবিশ্বাসীদের যথাযোগ্য শাস্তিবিধানে মরীয়া হয়ে উঠল।
ব্যবস্থাটা এমনই ছিল যে, যে পুলিশ সেই বিচারক আবার সেইই ঘাতক। ইনকুইজিশনের তুলনাহীন বর্বরতার কাহিনী ইউরোপের ঐতিহাসিকেরাও আড়াল করতে পারেননি। "এমন একটি ষড়যন্ত্রপ্রবণ, রক্তলোলুপ, আপাদমস্তক অধার্মিক ট্রাইবুনাল কল্পনা করাও কঠিন।"
মানুষের শোণিতসিক্ত যন্ত্রণা যেন নেশার মতো বিচারক-ঘাতকেরা উপভোগ করত। আজীবন কারাবাসের ব্যবস্থা, সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের মত শাস্তি বিধান করেও সন্তুষ্ট হতে না পেরে বিভীসিকাময় দৈহিক যন্ত্রণা দিয়ে তারা আসামীকে (accused) মেরে, তারপর স্বস্তি। ট্রাইবুনালের প্রথম পর্যায়ের এই অমানবিক ব্যবস্থা চলেছিল প্রায় দু'শ বছর ধরে, ত্রয়োদশ শতক থেকে পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত।
দ্বিতীয় পর্যায়ে যখন ইটালি, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, নরওয়ে প্রভৃতি দেশে নূতনতর ভাবনা চিন্তার বিকাশ হোল --- তখন এই নবজাগরণ (Renaissance)-এর তীব্র বিরোধিতায় নেমে পড়ল এই ইনকুইজিশন ট্রাইবুনাল।
কোপারনিকাসের বৈজ্ঞানিক মতবাদে বিশ্বাসীরা যীশুকে ভার্জিন-শিশু না মানা প্রভৃতি বিজ্ঞানসম্মত যুক্তি থেকে সরে না আসার জন্য ব্রুনোকে (Giordano Bruno) প্রথমে নির্বাসন, পরে কারাগারে নিক্ষেপ এবং শেষে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার নির্দেশ দেওয়া হল। তা কার্যকরও করা হোল। গ্যালিলিওর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটত যদি তিনি অনন্যোপায় হয়ে মিথ্যা না বলতেন।
গোড়ামী ও ধর্মান্ধতার এখানেই শেষ নয়, তৃতীয় পর্যায়ে তারা আলোকপ্রাপ্তির উচ্চতম অবস্থারও (Enlightenment) বিরোধিতা করেছিল। মুক্তচিন্তা, উদার মানসিকতা, বিজ্ঞান, শিল্পকলার নব নব উদ্ভাবন ও অভিব্যক্তির চরম বিরোধিতা করাই যেন তাদের ধর্মাচরণের 'ধর্ম' (characteristic) হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
(পঞ্চদশ, ষোড়শ, সপ্তদশ এমনকি অষ্টাদশ শতকেও এই বাঙলায় ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুদের সতীদাহ, অন্তর্জলী যাত্রা যেমন ধর্মধারণার অঙ্গ হয়ে উঠেছিল। এটিও বিশদে আলোচনা করার ইচ্ছা রইল।)
যাই হোক্, ঘাত-প্রতিঘাত ও সম্প্রসারণের দুই সহস্রাব্দের ইতিহাস বর্ণনা করবার দায় যাঁরা নিয়েছেন সেই চিরস্মরণীয় নামগুলির মধ্যে আছেন Eusebius of Caesarea, Walter Frederick Adeney, Randall Balmar, John M. G. Barclay প্রভৃতি প্রখ্যাত ঐতিহাসিকগণ। এনাদের মধ্যে ইউসেবিয়াসকে বলা হয় ফাদার অব চার্চ হিসটোরিওগ্রাফি। আমরা শুধু এই সমস্ত ধর্মধারণার অন্ধ ভক্তদের ধর্মের নামে অধর্মাচরণের, ভিন্নধর্মী মানুষদের প্রতি অমানবিক, নিষ্ঠুর আচরণের প্রতি আমাদের আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করছি।
তার অর্থ এই নয় যে আমাদের আলোচিত ইহুদী, পারসী, খ্রীষ্টান ও ইসলাম ধর্মের মঙ্গলময় অবদান সম্মন্ধে আমরা অনবহিত। কিন্তু যখন দেখি ক্ষয়িষ্ণু পশ্চিম রোম সাম্রাজ্যের ক্ষমতালিপ্সু সামন্ত প্রভূরা, অর্থলিপ্সু বণিকেরা ক্রুশেডের আড়ালে পূর্ব ভূমিখণ্ডের ঐশ্বর্য দখলের জন্য লক্ষ লক্ষ নিরীহ ধর্মবিশ্বাসী মানুষদেরকে, অবোধ শিশুদেরকে পবিত্রভূমি জেরুজালেম পুনরুদ্ধারের ছলনায় নিশ্চিত মৃত্যুর হাঁড়িকাঠে বলি দিয়েছিল, যখন মহান পোপ থেকে ছোট চার্চের ফাদার পর্যন্ত পূর্বী অর্থডক্স (Eastern Temple Orthodox)-দের প্রভাব নষ্ট করবার অহংকারী নির্দয় উচ্চমন্যতায় একপ্রকারের ভ্রাতৃহননে লিপ্ত হয়েছিল তখন ঈশ্বরপুত্র যীশুর পবিত্র বিধানগুলির সার্বজনীন মঙ্গলবোধের অবমূল্যায়ন হয়নি কি ? এইটিই ভাববার বিষয়।
১৪৫৩ খ্রীষ্টাব্দে কনস্টান্টিনোপলের পতন, অটোম্যান সাম্রাজ্যের ভয়ঙ্কর উত্থান (যা আরম্ভ হয়েছিল চতুর্দশ শতকে এবং ছড়িয়ে পড়েছিল দক্ষিণপূর্ব ইউরোপ, পশ্চিম এশিয়া, উত্তর আফ্রিকা, ও সেন্ট্রাল ইউরোপের দক্ষিণপূর্ব অঞ্চলে) ক্রুশেড যুদ্ধের তীব্রতাকে অনেকখানি প্রসমিত করে। চতুর্দশ শতক থেকে বিশ শতকের প্রথম দুই দশক পর্যন্ত এই তুর্কীদের অপ্রতিহত নিয়ন্ত্রণ বজাই ছিল সেন্ট্রাল ইউরোপের বিস্তৃত ভূমিখণ্ডের উপর।
পশ্চিম এশিয়ায় তুর্কীদের একছত্ৰ শাসন প্রতিষ্ঠিত হবার ফলে খ্রীষ্টানদের আগ্রাসন (ক্রুশেড) যেমন মন্দীভূত হয়েছিল, ঠিক তেমনি গোঁড়া ক্যাথলিকদের স্বগোষ্ঠী, স্বজাতি ও স্বদেশবাসীর উপর (নির্মম ইনকুইজিশনের নামে) রক্তলোলুপ নিপীড়ন অনেকখানি অপ্রত্যাশিত বাধাপ্ৰাপ্ত হয়েছিল ১৭৮৯ খ্রীষ্টাব্দের ফরাসী বিপ্লবে শোষিত ও অভিজাত সম্প্রদায়ের দ্বারা নির্যাতিত জনগণের জাগরণ লক্ষ্য করে।
খ্রীষ্টিয় চতুর্থ শতকে পশ্চিম রোম সাম্রাজ্যের পৃষ্টপোষকতা পাবার পর খ্রীষ্টান ধর্মের অন্ধ বিশ্বাসীদের হাতে ইহুদীদের উপর নির্যাতন চলেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। আর সেই নরমেধ যজ্ঞের পূর্ণাহুতি হোল হিটলারের হাতে। ইহুদী বিদ্বেষ নাৎসীদের এতটাই নরঘাতক করে তুলেছিল যে তারা ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে প্রায় ৮০ লক্ষের উপর পুরুষ মহিলা ও শিশুদর হত্যা করেছিল। জার্মানীরা নিজেদেরকে 'নর্ডিক' , বিশুদ্ধ আর্য জাতির উত্তরসুরী বলে দাবি করত। ইহুদীসহ অন্যান্য জাতি গোষ্ঠীর লোকেদের অবাঞ্ছিত ঘোষনা করে তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যে যে নারকীয় নির্যাতন ও হননক্রিয়া চালিয়েছিল তার খতিয়ান এখনো সম্পূর্ণ পাওয়া যায়নি। পোলান্ডের আউশউইৎস অঞ্চলে চল্লিশটির অধিক Concentration ক্যাম্পে ষাট লক্ষের উপর ইহুদীদেরকে হত্যা (Holocaust) করা হয়েছিল। তা ছাড়াও এই গণসংহারের বলি হয়েছিল সোভিয়েত কম্যুনিস্ট, যাযাবর সম্প্রদায়, রোমানিয়, শ্লাভিয় ভাষাগোষ্ঠীর মানুষ, প্রতিবন্ধি, বৃহন্নলা এবং অসুস্থ নারীও শিশু। পশুদের পালের (herd of cattle) মত বন্দীশিবির থেকে প্রথমে তাদের তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হোত ; বৃদ্ধ, শিশু, নারী ও প্রতিবন্ধি যারা রাস্তায় পড়ে যেত তাদের ওখানেই গুলি করে বা বুকে বেয়নেট ঢুকিয়ে মেরে ফেলা হোত, আর বাকীদের নিয়ে গিয়ে গ্যাস চেম্বারে বা গণচুল্লিতে পোরা হোত--- extermination or final solution !
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এই জীবন্ত নরকের (Inferno in Earth) বিন্দুবৎ বর্ণনা দেবার চেষ্টা করা হোল শুধুমাত্র এ-টুকু বলবার জন্যে যে ধর্মান্ধতা-সঞ্জাত হিংসার বীভৎসা কোন্ স্তরে পৌঁছাতে পারে ! ধর্মের 'অধর্মাচার' মানব সভ্যতাকে, মনুষত্ববোধকে হতাশার কোন্ অতলান্ত অন্ধকারে বিসর্জন দিতে পারে মানুষ, দ্বিতীয় মহাসমরের ইতিবৃত্ত তার চিরশোচনীয় দৃষ্টান্ত হয়ে আছে এবং থাকবেও অনন্তকাল।
খ্রীষ্টানধর্মীদর গৃহযুদ্ধও শোণিতসিঞ্চিত। ক্যাথলিক আর প্রোটেস্ট্যান্টদের মধ্যে আত্মহননের দ্বন্দ্ব শতাব্দীর পর শতাব্দী চলেছে অবিরাম। এ-দ্বন্দ্ব এখনো অব্যাহত আয়ারল্যান্ডে, কখন মিটবে বা আদোও মিটবে কিনা তাও অনিশ্চিত, কেননা সেখানেও ধর্ম ক্রূর রাজনৈতিক স্বার্থপরতার কবলে।
যে ধর্ম বা জীবনাচরণের 'বিধান' একজন প্রকৃত অর্থেই দেবশিশুর আত্মদানের (বলা ভালো, রক্তপিপাসু হিংস্রতার যূপকাষ্ঠে বলিপ্রদত্ত হওয়ার) মধ্য দিয়ে ধরাধামে অভিব্যক্ত হয়েছিল, সর্বমানবের অন্তরে 'ভালোবাসার' আবেদন রেখেছিল, তাই হয়ে উঠল কিনা ধর্মব্যাবসায়িকদের শাসনের, শোষনের, নির্যাতনের, মারণের হাতিয়ার !
কিন্তু যীশুর মৃত্যুর পর যাঁরা তাঁর বাণী প্রচারের দায় নিয়েছিলেন সেই সকল মহান সাধুগণ, যেমন সাধু (Saint) মথি, মার্ক, লূক, যোহান তাঁরা তো তরোয়াল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন নি। আবার এমনো এমন সব বিশপ, ফাদার, নানদের আমরা পাই যাঁরা মানব সেবায় নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে। গিয়েছেন এবং এখনো করে চলেছেন। দক্ষিণপূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা মহাদেশের সর্বত্র ( বিশেষ করে মধ্যে ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিস্তৃত ভূমিখণ্ডে, উত্তর আফ্রিকায় প্রাধাণ্য ছিল ইসলামের) খ্রীষ্টান সম্প্রদায় সেই সমস্ত অঞ্চলের, অন্ধকারাচ্ছন্ন মানবতার সেবায় যে তন্নিষ্ঠ ছিল সে সত্যকথাও ইতিহাস অস্বীকার করে না।
(ক্রমশঃ)
(পর্ব--৪পর্ব--৪, ভারতে খ্রীষ্ট ধর্ম)
_____________________________________
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন