বুধবার, ৮ জানুয়ারি, ২০২৫

ধর্মসংকটের বলি মানবতা--- পর্ব ---১


ধর্মসংকটের বলি মানবতা। 



১৯৯২ সালের ডিসেম্বর মাসের ৬ তারিখে অযোধ্যার বাবরি মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়া হোল। বিশ্বহিন্দু পরিষদ ও তার কিছু শাখা সংগঠন 'করসেবক' নামের দল নিয়ে গিয়ে রাম জন্মভূমি উদ্ধারকল্পে ষোড়শ শতকে নির্মিত ওই মসজিদ উন্মত্ত উল্লাসে ধংস করেছিল। সংবাদ মাধ্যমে শোর উঠল 'হিন্দু' জাগরণের প্রথম লক্ষণ দেখা দিয়েছে।

সেই সমকালের একজন বিদগ্ধ ইতিহাসবিদ লিখছেন,
"তাহলে কি এতদিন 'হিন্দু'রা ঘুমিয়েছিল ? কেন সহসা তার নিদ্রাভঙ্গ হোল ? করল কে ? নিদ্রাভঙ্গের পর কুম্ভকর্ণের মত আচরণের কোন প্রমাণ ? তার গ্রাস থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা, পরমত সহিষ্ণুতা, মানবিক ঔদার্য, সামাজিক শালিনতা --- কোনকিছুই রক্ষা পাচ্ছেনা। বাবরি মসজিদ দিয়ে শুরু। তার প্রতিক্রিয়ায়  প্রতিবেশী দেশে  কত মন্দির ভাঙা হোল। বোম্বাই ও কোলকাতায় ঘটল ভয়াবহ বিস্ফোরণ, দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ, লুঠপাট। ....বি জে পি মতাবলম্বী হিন্দুরা বলছে---- প্রধান মন্ত্রীর প্রতিশ্রুতিমত   অযোধ্যার ভাঙা মসজিদের জায়গায় কোন মসজিদ বানানো চলবে না। বিশ্বহিন্দু পরিষদ আওয়াজ তুলছে ভারতের কোথাও কোন মসজিদ বানানো চলবে না।
(যখন এই প্রতিবেদন লেখা হচ্ছে তখন অবশ্য অযোধ্যায়  রামমন্দির নির্মাণ প্রায় সারা এবং তার সামান্য ব্যবধানে একটি --- বাবরি মসজিদ স্মৃতি কল্পে,  নূতন মসজিদও নির্মিত হওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা।)
প্রায় সার্ধ শতাব্দী ধরে হিন্দুধর্মের আত্মীকরণের ঐতিহ্য, বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য, বিরোধের মাঝে মিলন মহান --- ইত্যাদি বাণীর আফিমে বুঁদ হয়ে ছিলাম আমরা। আজ হয়েছি বিশ্বের অবজ্ঞার পাত্র, প্রায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির সমগোত্রীয়।"
এখানে লেখক সেই ঐতিহাসিক ঘটনার পরিণামের কথাও বলেছেন কিন্তু বলেননি যে ঐ মসজিদের ধংসাবশেষ যাদের মাথায় পড়ল, স্বদেশে ও প্রতিবেশী দেশগুলিতে যারা বিক্ষত, নিহত ও বিড়ম্বিত হোল তাদের দায় কিন্তু নিলেন না ওই বাবরি মসজিদ ধ্বংসের মহান সৈনিক ও তাদের সেনাপতিগণ। ভারতের স্বাধীনতা লাভের সময়কালটিও সমগ্র ভারতবর্ষের সামগ্রিক ভারতীয় জাতিসত্তার শুভলগ্ন ছিল না। "দেশ স্বাধীন হল,  দেশভাগ হল----রেখে গেল কি গ্লানিময় পঙ্কশয্যা ----- দেশ হারাবার, প্রিয়জন বিচ্ছেদের, গণহত্যা, নারীধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, রাহাজানির কি দুর্মর দুঃস্বপ্ন।"
সেই সময়েও দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রবক্তা যাঁরা ছিলেন এবং ভারতকে  দ্বিখণ্ডিত করবার আশু প্রয়াসে যাঁরা দুই ধর্ম গোষ্ঠীর হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছিলেন তাঁরাও লক্ষ লক্ষ নিরীহ, অসহায় মানুষের নির্মম মৃত্যুর, ভিটা-মাটি-ঘটি হারানো নরনারীর আর্তনাদের দায় নেননি। বাঙলা ও পাঞ্জাব প্রদেশের দেহ খণ্ডন করে মুসলমানদের সংখ্যাধিক্যের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটেছে। তাও দুটি আলাদা আলাদা ভূখন্ডে। ভারতের পূর্ব প্রান্তে পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিমে পশ্চিম পাকিস্তান। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তান থেকেই পূর্ব পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত হোত।  ভাষার ভিন্নতা হেতু এবং 'বাঙালী' জাতিসত্তার স্বতন্ত্রতার অন্তর্লীণ অভিপ্সার ফলে পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রিক দ্বন্দ্ব জন্মলগ্ন থেকেই ছিল। ১৯৫২ খ্রীষ্টাব্দে ভাষা আন্দোলনে যার ধূমায়িত রূপ স্পষ্ট হয়েছিল এবং ১৯৭২ খ্রীষ্টাব্দের মুক্তিযুদ্ধে 'বাঙলাদেশ' নামে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্মের মধ্যে দিয়ে সেই রাষ্ট্রিক দ্বন্দ্বের পরিসমাপ্তি। (বর্তমানে সেই বাঙলাদেশ এক ভয়ঙ্কর সাম্প্রদায়িক শাসনতান্ত্রিক উপপ্লবের মধ্যে দিয়ে চলেছে।)
অখণ্ড পাকিস্তান রাষ্ট্রের আভ্যন্তরিণ দ্বন্দ্বের পরিণামে যে বিভাজন সেখানে ভারত রাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ; এবং তা অনিবার্য হয়ে উঠেছিল এই কারণেই যে পশ্চিম পাকিস্তানের সশস্ত্র অভিযান ও নিপীড়নের ফলে বিপুল সংখ্যক পূর্ববঙ্গীয়  উদ্বাস্তুর ঢেও আছড়ে পড়েছিল ভারতরাষ্ট্রে, বিশেষ করে পশ্চিম বাঙলা, আসাম এবং ত্রিপুরায়।
অতি সংক্ষিপ্ত আকারে স্বাধীনত্তোর ভারতবর্ষের বিখণ্ডিত হবার এই কাহিনীর সমাপ্তিতেই যদি অখণ্ড এই ভারতখণ্ডের 'সাম্প্রদায়িকতা' রোগের প্রশমন ঘটত তবে প্রতিবেশী ও পরস্পর সংলগ্ন এই তিনটি দেশের বৈষয়িক  এবং সাংস্কৃতিক উন্নতির কোন বাধা রইত না। কিন্তু 'বিধি বাম না ধর্ম বাম' তাই বিচার্য বিষয়। বিশ্ব-মানবজাতির একত্র মিলনের ঘোর অন্তরায় যে ধর্ম সে কথা স্বতঃসিদ্ধ। 
প্রথমে ইউরোপের ধর্মীয় দ্বন্দ্বের কথাই ধরা যাক। সেখানে যীশু খ্রীষ্টের জন্মের আগে তেমন কোন প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের ইতিহাস গড়ে ওঠেনি। ইহুদী ধর্মের প্রবর্তক মুশা, (খ্রীঃ পূঃ ১২০০) এবং প্রাচীন পারসিক ধর্মপ্রচারক জরাথুষ্ট্র (খ্রীঃ পূঃ ৬২৮--খ্রীঃ পূঃ ৫৫১)-- য়ের ইতিহাস স্বতন্ত্র। তবুও, যেহেতু আমরা খ্রীষ্টান ধর্ম নিয়ে আলোচনা করতে চাই তাই ইহুদীদের ধর্ম নিয়েও আলোচনা করতে হবে। 'হিব্রু' বলতে আমরা জেনেছি প্রাচীন ইহুদী জাতি ও প্রাচীন ইহুদীদের ভাষা। আর ইহুদী ধর্ম হোল একটি আব্রাহামিক (ইহুদীদের ধর্ম প্রবর্তক, আদিপুরুষ অব্রাহাম, আনুঃ ১৮০০ খ্রীঃ পূঃ) ধর্মধারণা।
এই ধর্মমত একেশ্বরবাদী (Monotheistic). ঈশ্বর এক এবং তিনি জিহোবা (Jehobva). মুশি বা মোশা হচ্ছেন এই ধর্মধারণার একজন অন্যতম বাণীবাহক(Messenger).
ইহুদীরা যীশুকে অপর একজন বাণীবাহক বলে স্বীকার করেন না। কিন্তু খ্রীষ্টান সম্প্রদায় ইহুদীদের সমস্ত পুরাতন ধর্মগ্রন্থগুলি (The Old Testament) নিজেদের ধর্মগ্রন্থ বলেই মানেন। ইউরোপের ধর্মতাত্বিকদের ধারণায় ইহুদী ধর্মের ধারাবাহিকতায় গড়ে উঠেছে খ্রীষ্টধর্ম ইসলাম ধর্ম, দ্রুজ ও বাহাই ধর্ম।
ইহুদী ধর্মধারণার মতই জরথ্রুস্ট (খ্রীঃ পূঃ ১২০০, মতান্তরে ১৮০০) প্রবর্তিত জরাথ্রুষ্টবাদও (Zarathustraism), যা পারসিক ধর্ম নামেই পরিচিত, একটি অতি প্রাচীন ধর্মধারণা। এই ধর্মীয় দর্শন এককালে  পারস্যের জাতীয় ধর্ম ছিল এবং বর্তমানের ইরান ছাড়াও তৃতীয় শতাব্দীর সময়কালে মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল। এটিও একেশ্বরবাদী ধর্ম। উপাস্য দেবতা বা ঈশ্বর আহুর মাজদা এবং ধর্মগ্রন্থ আবেস্তা বা জেন্দাবেস্তা।
যাই হোক্ মধ্যপ্রাচ্য থেকে সমগ্র ইউরোপ ভূখন্ড জুড়ে উপরি উক্ত ধর্মগুলির প্রভাব ছিল ঠিকই কিন্তু বিস্তৃতস্তরে  অনুসৃত ও অনুশীলিত হোত ইহুদী ধর্ম আর খ্রীষ্টান ধর্ম।
ইসলাম এসেছে অনেক পরে।‌ (৫৭০খ্রীষ্টাব্দে ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হজরত মহম্মদের জন্ম)। তার উদ্ভব মধ্যপ্রাচ্যে।
                           ক্রমশঃ
পর্ব--২
ইহুদী ও খ্রীষ্টানী দ্বন্দ্ব
_______________________________________________





কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...