সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২৫

দুঃখ -পর্ব-২

দুঃখ -- পর্ব-২


'দুঃখ' শব্দটির মধ্যে আমরা সমস্ত রকমের কষ্টের অনুভূতির কথা বলতে চাই, যেমন শোক, বিষাদ, ব্যথা, মনের বা শরীরের যন্ত্রনা, অনুতাপ-সন্তাপ-- সমস্ত কিছু যা আমরা জীবন যাত্রায়, জীবনাচরণে পরিত্যাগ করতে চাই, পরিহার করতে চাই, উপেক্ষা করতে চাই, প্রশমিত এবং উপশমিত করতে চাই। একটি সারমেয়- মাতার দু'দুটি সুন্দর শিশুর অপঘাত মৃত্যুর দুঃখের আঘাতটা তার কাছে কতদিন ছিল, তার মন, স্মৃতি, বোধ কেমন -- এসবের কতটুকুই বা আমাদের জানা ? তবে এই প্রাণীটি মানুষের ইতিহাসের আদিকালের সহচর ; তাই এদের প্রতি আমাদের সহবস্থান ও ভালোবাসার বন্ধন অচ্ছেদ্য এবং সেই ভালোবাসার সম্মন্ধেই ওই মা'কুকুরের দুঃখ নিজের দুঃখ হয়েই আমাদের অন্তরে গভীরভাবে বেজেছে। মনে হয়েছে যে অপঘাত ও স্বজাতি কলহে ওই মানবেতর প্রাণে যেমন সর্বনাশ নেমে এলো তেমনটি কি মানুষের সমাজে নেই ? আছে আছে এবং সহস্রগুণে তীব্রতর, পাশবিকতায় লাঞ্ছিত, মর্মান্তিকভাবেই আছে। সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারায়, ক্রমোন্নয়নের পথে জল-স্থল-আকাশজুড়ে অনন্ত অসংখ্য দুর্ঘটনায় অকালমরণ, সভ্যতার আদিকাল থেকে সংখ্যাতীত কুরুক্ষেত্রের বীভৎস নরসংহারে নরনারী শিশুদের মৃত্যু মানুষের জীবনধর্ম আর পশুদের জীবনধর্মকে এক বন্ধনীতে আবদ্ধ করে দিয়েছে। এ কী সত্য নয় ? মানব সভ্যতার ঊষাকাল থেকে বিশ্বময় ছড়িয়ে-থাকা এইরূপ পাশবিক নরমেধ যজ্ঞগুলির হিসাব ইতিবৃত্তে যতটুকু বর্ণিত আছে তা মহাসমুদ্রে ডুবন্ত হিমশৈলের চূড়া মাত্র। আমাদের দেশে রামায়ণ, মহাভারত মহাকাব্য দুটিতে রাজবংশ ধংশের কাহিনীর মধ্যে রক্ষকুলের এবং কুরু-পাণ্ডব কুলের স্বামী সন্তানহারা রমনীদের হাহাকারের সঙ্গে যখন একই ছন্দে মিশে যায় আমাদের পাড়ার অবোধ সারমেয়-মায়ের আর্তস্বর তখন মনে হয়না সভ্যতা একপা'ও অগ্রসর হয়েছে। আমরা নিজেদের সৃষ্টিগুলি নিয়ে না নিজে বাঁচতে শিখেছি, না প্রকৃতির দান নিরীহ প্রাণজগতকে বাঁচাতে পেরেছি।
কিছুটা দীর্ঘ হলেও এখানে আমরা মহাভারত মহাকাব্যের 'স্ত্রী' পর্ব, রাজশেখর বসু মহাশয়ের 'মহাভারত সারানুবাদ' থেকে কিয়দংশ উদ্ধার করছি,

          ।।স্ত্রীবিলাপপর্বাধ্যায়।।

             'গান্ধারীর কুরুক্ষেত্র দর্শন'

"ব্যাসের আজ্ঞানুসারে ধৃতরাষ্ট্র ও যুধিষ্ঠিরাদি কৃষ্ণকে অগ্রবর্তী ক'রে কৌরব নারীদের নিয়ে কুরুক্ষেত্রে উপস্থিত হলেন। রুদ্রের ক্রীড়াস্থানের ন্যায় সেই যুদ্ধভূমি দেখে নারীরা উচ্চকণ্ঠে কাঁদতে কাঁদতে যান থেকে নামলেন।
গান্ধারী দূর থেকেই দিব্যচক্ষু দ্বারা সেই ভীষণ রণভূমি দর্শন করলেন। তিনি কৃষ্ণকে বললেন, দেখ, একাদশ অক্ষৌহিণীর অধিপতি দুর্যোধন গদা আলিঙ্গন করে রক্তাক্ত দেহে শুয়ে আছেন। আমার পুত্রের মৃত্যু অপেক্ষাও কষ্টকর এই, যে-নারীরা নিহত পতিগণের পরিচর্যা করছেন। লক্ষ্মণজননী দুর্যোধনপত্নী মস্তকে করাঘাত করে পতির বক্ষে পতিত হয়েছেন। আমার পতিপুত্রহীনা পুত্রবধূরা আলুলায়িত কেশে রণভূমিতে ধাবিত হচ্ছেন। মস্তকহীন দেহ এবং দেহহীন মস্তক দেখে অনেকেই মূর্ছিত হয়ে পড়ে গেছেন। ওই দেখ, আমার পুত্র বিকর্ণের তরুণী পত্নী মাংসলোভী গৃর্ধ্রদের তাড়াবার চেষ্টা করছেন, কিন্তু পারছেন না। কৃষ্ণ, তুমি নারীদের দারুণ ক্রন্দনের নিনাদ শোন। শ্বাপদগণ আমার পুত্র দুর্মুখের মুখমণ্ডলের অর্ধভাগ ভক্ষণ করেছে। কেশব, লোকে যাকে অর্জুন অপেক্ষা এবং তোমার চাইতেও দেড়গুণ অধিক শৌর্যশালী বলত সেই অভিমন্যু নিহত হয়েছেন, বিরাটদুহিতা বালিকা উত্তরা শোকে আকুল হয়ে পতির গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। উত্তরা বিলাপ করে বলছেন, বীর, তুমি আমাদের মিলনের ছ'মাসের মধ্যেই নিহত হলে ! ওই দেখ, মৎস্যরাজের কুলস্ত্রীগণ অভাগিনী উত্তরাকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। হায় ! কর্ণের পত্নী জ্ঞানশূন্য হয়ে ভূতলে প'ড়ে গিয়েছেন, শ্বাপদগণ কর্ণের দেহের অল্পই অবশিষ্ট রেখেছে। গৃর্ধ্র ও শৃগালগণ সিন্ধুসৌবীররাজ জয়দ্রথের দেহ ভক্ষণ করছে, আমার কন্যা দু্ঃশলা আত্মহত্যার চেষ্টা করছে ও শোকাশ্রুসিক্ত কণ্ঠে পাণ্ডবদের গালি দিয়ে চলছে। হা, হা, ওই দেখ, দুঃশলা তার পতির মস্তক না পেয়ে চারিদিকে ছুটে বেড়াচ্ছে। ওখানে ঊর্ধরেতা সত্যপ্রতিজ্ঞ ভীষ্ম শরশয্যায় শুয়ে আছেন। দ্রোণপত্নী কৃপী শোকে বিহ্বল হয়ে পতির সেবা করছেন, জটাধারী ব্রাহ্মণগণ দ্রোণের চিতা নির্মাণ করছেন। কৃষ্ণ, ওই দেখ, শকুনিকে শকুনদল বেষ্টন করে আছে, এই দুর্বুদ্ধিও অস্ত্রাঘাতে নিধনের ফলে স্বর্গে যাবেন !"
তারপর দেবী গান্ধারীর সেই জীবনের অস্তিত্ব- আলোড়নকারী বাক্য, 

"মধুসূদন, তুমি কেন এই যুদ্ধ হতে দিলে ?" 

গান্ধারী আরো বলেছিলেন যে, হে কৃষ্ণ, বিপুল শক্তির, বিরাট সৈন্যবাহিনীর, প্রবল সামর্থ্যের অধিকারী হয়েও, আমার ও কুন্তীর সন্তানদের, সমস্ত কুরুকুলের বীরদের তুমি যুদ্ধ থেকে বিরত করতে পার নি, তুমি সমস্ত জেনেশুনে এই সমূহ-বিনাশ উপেক্ষা করেছ, এর ফল তোমাকেও ভোগ করতে হবে। কুরু পাণ্ডবদের বংশ এবং জ্ঞাতিদের আত্মহননের ব্যবস্থা করে তুমি যে পাপ করলে, আজ থেকে ঠিক ছত্রিশ বছর পর তুমিও জ্ঞাতিহীন, বন্ধু-আমাত্যহীন, সন্তানহীন ও বনচারী হয়ে অত্যন্ত নিকৃষ্ট, এবং অবমাননার মৃত্যু বরণ করবে। আজ, নিজের চোখেই তো দেখছি, মহান ভরতবংশের অবলা নারীকুল শোকাহত হয়ে ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে, যুদুবংশ ধংশের পর তোমাদের রমণীকুলও কি সেই ভাবে অনাথিনী হবে না, শোকাতুর হয়ে, ভূমিশয্যায় বিলাপ করবে না ?
বাসুদেব কৃষ্ণ তখন ঈষৎ হাস্য করে বলেছিলেন, আপনি যা অভিশাপ দিলেন দেবী, তা অবশ্যম্ভাবী। বৃষ্ণিবংশের সংহারের হেতুও আমি হব। যে যাদবগণ মানুষ ও দেবদানবের অবধ্য তাঁরাও পরস্পরের হাতেই নিহত হবে। এবং হয়েওছিল তাই।

কুরু বংশের শিশু কিশোর তরুণ প্রৌঢ়দের অকাল  মৃত্যুর পর আমরা দ্বারকায় গিয়েছি এবার এবং মহাভারতের 'স্ত্রীপর্ব', 'শান্তি পর্ব', 'অনুশাসন পর্ব', 'আশ্বমমেধিক পর্বে'র পর 'মৌষল পর্বে' উপস্থিত হয়েছি। সেখানে এসে দেখি দেবী গান্ধারীর অভিশাপ বর্ণে বর্ণে সত্য হয়ে উঠেছে। ভারতকথার কথক বৈশম্পায়ন জনমেজয়কে বললেন, যুধিষ্ঠিরের রাজ্য লাভের পর 'ষটত্রিংশ', ঠিক ছত্রিশতম বৎসরেই বৃষ্ণিবংশের প্রবল পরাক্রমশালী পুরুষেরা নিজেরাই পাপপরায়ণ হয়ে আত্মহননে লিপ্ত হয়েছিলেন। 'বৃষ্ণি'রা যাদবগোষ্ঠীর একটি শাখা। অপরাপর শাখাগুলি ছিল 'অন্ধক', 'ভোজ', 'কুক্কুর' ইত্যাদি। 'মৌষল' পর্বে দ্বারকায় ভয়ানক সব অতিপ্রাকৃত, কুলক্ষণযুক্ত, অমঙ্গলজনক ঘটনা, দুর্ঘটনার বিবরণ আছে।
"দ্বারকায় আরও নানাপ্রকার উৎপাত দেখা গেল। কৃষ্ণবর্ণা নারী নিদ্রিতা পুরাঙ্গনাদের মঙ্গলসূত্র এবং ভয়ঙ্কর রাক্ষসগণ যাদবদের অলঙ্কার, ছত্র, ধ্বজ ও কবচ হরণ করতে লাগল। কৃষ্ণের চক্র সকলের সমক্ষে আকাশে অন্তর্হিত হ'ল, দারুকের সমক্ষে অশ্বগণ কৃষ্ণের দিব্য রথ নিয়ে সাগরের উপর দিয়ে চ'লে গেল। অপ্সরারা বলরামের তালধ্বজ এবং কৃষ্ণের গড়ুরধ্বজ হরণ করে উচ্চরবে বললে, যাদবগণ, প্রভাসতীর্থে চলে যাও।"

এরপর অসহায়, নিরুপায়, নিরস্ত্র কৃষ্ণের সম্মুখেই কি ভাবে যদুকুলের বিনাশ হোল তার বীভৎস বিবরণ মৌষলপর্বের শ্লোকে শ্লোকে বিন্যস্ত আছে। শেষে কৃষ্ণকে যেতে হোল তাঁর অতিবৃদ্ধ পিতা বসুদেবের কাছেই। বলতে হোল, "হস্তিনাপুর থেকে অর্জুন না আসা পর্যন্ত আপনি নারীদের রক্ষা করুন।" এই বলে তিনি মৃত্যুপুরী পরিত্যাগী, শোকদগ্ধ, বনবাসী অগ্রজ বলরামের কাছে গেলেন। "যাদব শূন্য দ্বারকাপুরীতে থাকতে পারব না আমি, বনবাসী হয়ে বলরামের সঙ্গে তপস্যা করব"। কিন্তু সেখানে তিনি স্বচক্ষে দেখলেন কী  অবিশ্বাস্য আধিদৈবিকভাবে বলরামের প্রাণ নির্গত হোল। শোক-বিষাদ-বিকল কৃষ্ণ তখন সেই বনভূমিতেই 'মহাযোগে' শয়ন করলেন। সেই সময় সেখানে 'জরা' নামের এক ব্যাধের আগমন ঘটে। সেই ব্যাধ দূর থেকে মৃগভ্রমে তীক্ষ্ণ তীর নিক্ষেপ করে কৃষ্ণের পদতল বিদ্ধ করলে।
মহাভারতের মহানায়ক শ্রীকৃষ্ণেরও নিধন হোল। সর্বস্বান্ত কৃষ্ণপিতা 'বসুদেবও' পরলোকে যাত্রা করলেন। ইতিমধ্যে অর্জুন দ্বারকায় এসে গিয়েছেন। তিনিই সকল মৃতজনের সৎকার ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করলেন। বাসুদেবের সঙ্গে তার পত্নীগণও -- দেবকী, ভদ্রা, মদিরা, রোহিনী সহমরণে গেলেন। এবার অর্জুন বলরাম ও কৃষ্ণের দেহের অন্বেষণে বেরিয়ে, শবদেহদুটি আনয়ন করে সেগুলিরও অন্তিমকার্যের ব্যবস্থা করলেন। এইবার আমরা আবারও রাজশেখর বসু মহাশয়ের 'মহাভারতের সারানুবাদ' ও কালীপ্রসন্ন সিংহের 'মহাভারত' থেকে মর্মদাহী কিছু অংশ উদ্ধার করছি,
সপ্তম দিনে তিনি (অর্জুন) কৃষ্ণের ষোল হাজার পত্নী,পৌত্র 'বজ্র' এবং অসংখ্য নারী, বালক ও বৃদ্ধদের নিয়ে (হস্তিনাপুরের উদ্দেশ্য) যাত্রা করলেন। রথী, গজারোহী, অশ্বারোহী অনুচরগণ এবং ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়াদি প্রজা তাঁর সঙ্গে গেলেন। অর্জুন দ্বারকার যে যে স্থান পরিত্যাগ করছিলেন সেই সেই স্থান সমূদ্র এসে গ্রাস করতে লাগলো।
কিছুদিন পরে তাঁরা গবাদিপশু ও ধান্যপ্রাচুর্য পরিপূর্ণ 'পঞ্চনদ প্রদেশে' প্রবেশ করলেন। সেখানে বাস করত অতি হিংস্র 'আভির' দস্যুদের এক বিপুল জনগোষ্ঠী। তারা যাদব রমণীদের দে'খে, লালসায় উন্মত্ত হয়ে গেল। লাঠি, সড়কি নিয়ে আক্রমণ করল। কুরুক্ষেত্রজয়ী ধনঞ্জয়ের মুখে আত্মদর্পের হাস্যরেখা। তিনি বললেন, যদি যমালয়ে যেতে না চাও তবে দূর হয়ে যাও এখান থেকে, না হলে আমার ভীষণ বাণে সকলের মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। দস্যুদের উপর সে উদ্ধত হুংকারের কোন প্রভাবই পড়ল না দেখে অর্জুন তাঁর গান্ডীব হস্তে ধারণ করলেন, অতি আয়াসে (কষ্টকরভাবে) জ্যা রোপণ করলেন ; কিন্তু হায় ! কোন দিব্যাস্ত্র তাঁর স্মরণে এল না। যাদবদের যে সকল সহগামী যোদ্ধারা তাঁর সঙ্গে ছিলেন তাঁদের সমবেত পরাক্রমকে বিধ্বস্ত করে দিয়ে দস্যুরা নারীদের হরণ করে নিয়ে গেল। 'কোন কোন নারী আবার স্বেচ্ছায় তাদের সঙ্গেই গেল !'  (বিষয়টি লক্ষণীয়)।
________________________________________

                          ব্যাখ্যা

এতক্ষণ যে কথকথা আমরা গান করে গেলাম, (বাঙলার কথকঠাকুর সম্প্রদায় এই ভাবেই গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে পুরাণ পাঁচালী গেয়ে শোনাতেন), যে অনাথিনী রমনীদের হাহাকারের চিত্র অঙ্কন করবার চেষ্টা করলাম তার একটিই উদ্দেশ্য যা হোল, মারণান্তিক 'যুদ্ধজয়' মরীচিকার বিভীষিকা মাত্র। জয় কোন পক্ষেরই হয় না। পরাজয় হয় সভ্যতার, সংস্কৃতির, মানবতার আর সর্বোপরি নারীত্বের। অবলা নারীদের লাঞ্ছনার অন্ত থাকে না। যুদ্ধের পূর্বমুহূর্তে রাজকুল-শৌর্যের, অহংকারসর্বস্ব পরাক্রমের রণনিনাদ উদ্ঘোষিত হয়, যুদ্ধশেষে তাই পরিবর্তিত হয়ে যায় নারীশিশুদের বিষাদময় ক্রন্দনধ্বনিতে। স্বাভাবিকভাবেই আসে বর্ণশঙ্করতা। বর্ণান্ধ আর্যরা যে 'পবিত্রশোণিতে'র আত্মম্ভরিতার গর্বে অশ্বমেধ যজ্ঞ করেন, তা গিয়ে শেষ হয় নরমেধের 'জাতিবর্ণহীন' চিতাগ্নিতে।

এখানে স্মরণীয়, শ্রীমদ্ভগবদগীতার প্রথম অধ্যায়ে অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে যেমন বলেছিলেন, 

"কুলক্ষয়ে প্রণশ্যন্তি কুলধর্মাঃ সনতনাঃ।
ধর্মে নষ্টে কুলং কৃতস্নম্ অধর্মঃ অভিভবত্যুত।।
অধর্মাভিভবাৎ কৃষ্ণ প্রদুষ্যন্তি কুলস্ত্রিয়ঃ।
স্ত্রীষু দুষ্টাসু বার্ষ্ণেয় জায়তে বর্ণশঙ্করঃ।।" ১/৪০-৪১। 

দেখ কৃষ্ণ, কুলের বিনাশ হলে সনাতন কুলধর্ম নাশ হয়। ধর্ম নষ্ট হলে সমগ্র কুলকে তখন অধর্ম গ্রাস করে। পাপের প্রভাবে কুলস্ত্রীগণ (প্রকৃতির নিয়মেই) দূষিত হন এবং হে বৃষ্ণিবংশজাত কৃষ্ণ, তুমি জান, স্ত্রীগণ দূষিত হলে "বর্ণশঙ্করঃ জায়তে।" শঙ্কর জাতির জন্ম হয়।
(ভারতের বর্তমান সনাতনবাদীরা ভেবে দেখতে পারেন।)
_____________________________________

হৃতবীর্য, শত্রুবিনাশী অর্জুনের এমন পরিণতি কী কল্পনীয় ছিল ? শূন্যতূণীর, শ্লথবাহু অর্জুনের আয়ত্ব হতেই সেই ম্লেচ্ছ দস্যুরা 'বৃষ্টিক', 'অন্ধক' বংশীয় সুন্দরীদের হরণ করে নিয়ে গেল। কতিপয় বালক, প্রৌঢ় ও প্রৌঢ়া রমনীদের নিয়ে অর্জুন ইন্দ্রপ্রস্থে যেতে পেরেছিলেন। অক্রূরের পত্নীরা প্রব্রজ্যা নিয়েছিলেন, কৃষ্ণের পত্নীগণ রুক্মিণী, গান্ধারী (কৃষ্ণের এক স্ত্রী) শৈব্যা, হৈমবতী ও জাম্ববতী অগ্নিকুন্ডে প্রবেশ করলেন, সত্যভামা সহ অপরাপর কৃষ্ণসহচরীবৃন্দ হিমালয় অতিক্রম করে 'কলাপ' গ্রামে গিয়ে কৃষ্ণের ধ্যানে কাল যাপন করতে লাগলেন।


                রামায়ণের কথা

'রামায়ণ' মহাকাব্যের চিরদুখিনী সীতাদেবীর অগ্নিপরীক্ষা ও অন্তিমপর্বে ভূতলপ্রবেশের (আত্মহননের) করুণার্দ্র কাহিনীর বর্ণনা রয়েছে মৎপ্রণীত 'বিন্দুতে সিন্ধুদর্শন' গ্রন্থে। ওদিকে তখন রক্ষোরাজ রাবণের পুত্র-পৌত্র-আমাত্য সহ সমস্ত রাক্ষসবীরদের অকাল মৃত্যুর পর তাঁদের অন্তঃপুরের অনাথিনী মাতা বধূ বনিতারা কী অবস্থায় ছিলেন ?

"রাবণ যদি বিভীষণের উপদেশ শুনতেন তবে লঙ্কা দুঃখময় শ্মশান হোত না। কুম্ভকর্ণ, অতিকায় ও ইন্দ্রজিতের মৃত্যুতেও কি রাবণের চৈতন্য হোল না ? আমার পুত্র, আমার ভ্রাতা, আমার স্বামী যুদ্ধে হত হয়েছে --- গৃহে গৃহে রাক্ষসীদের এই বিলাপই শোনা যাচ্ছে। লঙ্কা বীরশূন্য, আমাদের আর আশা নাই।"

এমনই "দুঃখময় শ্মশান"-এর ছবি আমরা আবারও এবং আরও অসংখ্যবার দেখতে পাব মনবেতিহাসের পাতায় পাতায়। এবং সর্বত্রই নারীদের মর্মবেদনার বিলাপ অশ্রুতই থেকে যায়। এই প্রবন্ধটির বিষয় সেটিই।  (এবার পর্ব-৩)
                          (ক্রমশঃ)
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২৯/১২/২০২৫
কলকাতা।
_____________________________________







শুক্রবার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০২৫

দুঃখ-- পর্ব-১

                          দুঃখ--পর্ব-১ 

জানি এবং মানি, সকলেই জানেন এবং মানেন যে 'দুঃখ' বা বলা ভালো, দুঃখের যে অনুভূতি তা বিশ্বজনীন এবং অনাদ্যন্ত। মানবেতর প্রাণে দুঃখের আঘাত কতখানি বাজে, কতক্ষণ থাকে সেটি তেমন করে জানা যায় না, যেমন অনুভূত হয় আমার নিজের বেলায় এবং কিছুটা হলেও আপনার মানুষদের বেলা। তবে ঐ মানবেতর প্রাণ যদি আমাদের ভালোবাসার কেউ হয় তবে তার দুঃখের দৃশ্যও আমাদের আপনজন-বিরহবেদনার মতই অসহনীয় হয়ে ওঠে। 

গতকালের একটি ঘটনা বলিঃ
আমার পাড়ায় কুকুরদের ছোট-খাটো একটি দল আছে, যেমন এই কলকাতা মহানগরীর সমস্ত পাড়াতেই থাকে। রোজই তাদের দেখি ঘরের বাইরে যাওয়া-আসায়। কয়েকদিন আগে দেখেছিলাম তাদের মধ্যে এক মা-কুকুরের দুটি ছানা হয়েছে। প্রথম প্রথম দেখছিলাম ছানাদুটি বাদুড়ের মত উপরমুখো হয়ে তাদের মায়ের স্তন্যপান করছে বা বিশ্রামরত মায়ের পেটের সাথে মিশে ঘুমিয়ে রয়েছে। পরে, বেশ কয়েকদিন পরে দেখি তাদের ছোটাছুটি, ধূলাখেলা, পথে-পড়ে-থাকা আবর্জনার টুকরো নিয়ে দুই সারমেয়-শিশুর খুনসুটি। পথচারীদের দৃষ্টিও তাদের উপর পড়েছে। এ-বাড়ি, ও-বাড়ী থেকে বেরিয়ে এসে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা, মেয়রাই বেশি, খাবারও পরিবেশন করছে --- পাউরুটির টুকরো, আস্ত বিস্কুট ইত্যাদি। আরো দিন কাটল, দিনে দিনে চোখলাগুরকম ডাগর হোল -- বেশ নাদুস নুদুস। আমাদের পায়ে পায়ে কিছুটা লাফাতে লাফাতে আসে, আবার তাদের মায়ের কাছে ফিরে যায়। মাকে সর্বাঙ্গ দিয়ে মায়ের সর্বাঙ্গে আদর মাখায়। আধচোখ-বোজা মায়ের সে তৃপ্তি যেন মূর্তি লাভ করে তেমনি যেমনটি দেখি মানবী মায়ের বাৎসল্যের প্রকাশে। 

হঠাৎ শীতটাও বাড়ল, ঘন কুয়াশাও নামল, শরীরটাও বিগড়াল। কিন্তু বুড়ো বুড়ির সংসার। তিনটি দিনের বেশী ঘরে বসে থাকলে উনোন বন্ধ, 'মাইকিং' শুরু। অগত্যা সামান্য কুয়াশা কাটতেই সকাল সকাল 'উলম্ব বস্তির' চারতলা থেকে নেমে গলিপথে দশ'পা যেতেই পাগুলো অসাড় হয়ে গেল ! মা কুকুর একটি ছানার আধটুকরো মুখে করে নিয়ে কোথায় যায় ! কাঁপা কাঁপা পায়ে কিছুটা এগিয়ে যেতেই দেখি ওই ছানাটির আরেকটি টুকরোর সাথে মুখের টুকরোটা সে রাখছে ! আমি দাঁড়িয়ে। সে একবার করে আমর দিকে চাইছে, আবার মুখ নামিয়ে রক্তে ভেজা, কাটা অংশ দুখানা এক সাথে রাখছে। 

এর মধ্যে আরো দু'একজন এলেন, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলেন। কেউ কুয়াশার, কেউ অজ্ঞাত গাড়িচালকের, কেউবা পথ কুকুরদের বাড়বাড়ন্তের জন্য মিউনিসিপ্যালিট উপর দায় চাপিয়ে আপন আপন মন্তব্য দিয়ে গন্তব্যের দিকে চলে গেলেন। আমিই বা কি করতে পারি ! আমিও বাজারে গেলাম। ফেরার সময় ভেবেছিলাম, ও'পথে আর যাব না। একটু ঘুরপথেই যাব। কিন্তু পারলাম না। 'দৃশ্যটা' যেন আমাকে টেনে ওই পথেই নিয়ে এল। ওই গলিপথের বাঁকটাতে, ওই অকুস্থানের দিকে আর চোখ দেব না ভেবে ভেবে এসেও চোখ চলেই গেল। দেখি ছিন্ন ছানাটি নেই ; 'সেনেটারির' লোকেরা নিয়ে গিয়েছে নিশ্চয়ই। কিন্তু জায়গাটিতে, শুকিয়ে-যাওয়া-রক্তে ভিজা ভিজা কালচে পিচ রাস্তায় লোম চামড়ার সামান্য কিছু অবশিষ্টের উপর মুখটি গুঁজে, কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে রয়েছে মা'কুকুরটি, আর তার সামনে একটা ভাঙা টিনের বাটিতে রাখা আছে অনেকগুলি রুটির টুকরো। অন্য ছানাটি, (আগেরটির তুলনায় সুন্দরতর, অন্ততঃ সাদা রঙের জৌলুসে) রুটির একটি একটি খণ্ড মুখে তুলে নিয়ে মায়ের কাছে রেখে আসছে। মা'টি কিন্তু নিঃসাড়। কিছুক্ষণ চেয়ে রইলাম ; তারপর ঘরমুখো হতেই হোল।
এ সংবাদটি গৃহিণীকে দিলাম না। জানি, সেটি তিনি এমনভাবে নেবেন যে তাঁকে সামাল দিতে দিতেই সেদিনটা নয়, বেশ কয়েকটি দিন কেটে যাবে। তারপর আবার সন্ধ্যাবেলায় পাশের অ্যাপার্টমেন্টের এক ফ্ল্যাটে গৃহপ্রবেশের নেমন্তন্ন আছে। আজকের জন্য 'মনখারাপের' বিষয়টি না হয় আমার একলারই থাক্। শীতের দিন, দুপুরবেলাটা নেহাতই ছোট। সন্ধ্যা হোল। নেমন্তন্ন বাড়িতে গেলাম। 'সিনিয়র সিটিজেন' ; "আপনারা বসে পড়ুন", এবং ঠান্ডার দোহাই দিয়ে আগেভাগেই ফিরে এলাম। টিভি খুলে বসলাম, আগ্রহে নয়, চাপা কষ্টটা ভুলে থাকার তাগিদে। কিন্তু তাতেও মনের উপর আঘাতের পর আঘাত। প্রতিবেশী দেশ জ্বলছে, গুলি ছুটছে, অর্ধমৃত করে কাউকে সল্লোসে পোড়ানো হচ্ছে, প্রতিষ্ঠান-পরিকাঠামো পুনরায় মাটিতে মিশে যাচ্ছে। স্বদেশের ভিতরেও খুন-ধর্ষণ, নারীনিগ্রহ, অজানা যুবকের লাশ পড়ে আছে ধানক্ষেতে, মন্দির-মসজিদ এখন বিদ্বষের তীর্থস্থান এবং রাজনীতির বিষাক্ত রণহুংকার, ধর্ম নিয়ে ধুন্ধুমার ! করি কি ? না, থাক্। টিভি বন্ধ করেই শান্তি। 

কিন্তু কোথায় শান্তি ! ওই পাশের অ্যাপার্টম্যান্ট থেকে এবার ভেসে আসছে উৎসবের আসল কোলাহল। তরুণদের পার্টি -- হাসি-গান-নাচ-হুল্লোড়। ওদিকে গেটের বাইরে, সেটাও আবার আমারই ঘরের দিকটায়, ডাষ্টবিনে মাংস-বিরিয়ানির গন্ধে এসে জুটেছে এপাড়া, ওপাড়া, সেপাড়া, বেপাড়ার অনাহুত শ্বাপদদের ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠী। তুমুল সংক্ষোভ, বিক্ষোভ, সংঘাত ! কুকুর কেলেঙ্কারি নয়, কুকুরদের কুরুক্ষেত্র !
ঘুমাতে পারিনি এমন নয়। ঘুমের ওষুধ খাই। ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। যথারীতি ঘুম থেকেও উঠেছি সকালে। সহধর্মিণী আগেই উঠেছিলেন। যথানিয়মে চা-য়ের টেবিলে মুখোমুখি বসেছিলাম। কিন্তু ওই, 'তাঁর মেয়ে, ছেলেবউদের ঠিক কি করা উচিত, নকুলদানা আনতে কেন রোজ ভুলে যাই', কাজের মেয়েটা দুনিয়ার সেরা ফাঁকিবাজ -- এসবের মধ্যেই তাঁর মানস-বিচরণ। বাইরের যা ঘটমান তাতে তাঁর কি করবার আছে ? খাঁটি কথা। ওই নকুলদানা আনার ভার নিয়ে আমি বের হলাম বটে, তবে ওই হতভাগিনীকে দেখবার একটি আকর্ষণ‌ও ছিল ; কেননা অন্যমনস্ক হয়েও কয়েকটি বিস্কুট নিলাম পকেটে। গলিটাতে দশ পা'ও যেতে হোল না। এবার যা ঘটনা তার ভাষা কোথায় ! চার-পাঁচজন লোক, তিনটি ছোট ছোট মেয়ে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে। আমিও গিয়ে দাঁড়ালাম। মাথা গলিয়ে দেখি ওই মা'কুকুরটাই ! তার দ্বিতীয় ছানাটিকে হাঁ-মুখে ধরে তুলবার চেষ্টা করছে। ছানাটির সারা শরীর রক্তে চবচবে। তার ঘাড়ে, পিঠে, গলায় দগদগে ক্ষত। মরে গিয়েছে অনেক আগেই। মা'টা জানে না ; তারও মরতে বোধ হয় আর বেশি বাকি নেই ! তার পিঠের সঙ্গে পেট এক হয়ে গিয়েছে, ঘাড়টা, কান দুটো ঝুলে পড়েছে। পাগুলো যেন চারখানা কাঠি।
পাড়ার দর্শকরা সহমত একটিই কারণে, যে গতরাতে ভিন পাড়া থেকে যে সকল বাঘা বাঘা 'লিডার ডগ'রা পাশের অ্যাপার্টমেন্টের ডাষ্টবিনের দখল নেবার জন্য এসেছিল তারাই এই শিশুটির উপরেই তাদের শ্বাদন্তের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করেছে। আমি মা' কুকুরটির মুখের কাছে বিস্কুটগুলো দিলাম ; কিন্তু সে শুঁকেও দেখল না। শুধু ঝোলা মুণ্ডুটা অল্প একটু উঠিয়ে, আকাশের দিকে ঘোলা ঘোলা চোখ তুলে কী যে একরকম আর্ত ডাক ডেকে উঠল ! আমি আর সহ্য করতে পারলাম না।

 
(গল্প নয়, সত্য ঘটনা। এটি একটি প্রবন্ধের ভূমিকাস্বরূপ। ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে)।
                       (ক্রমশঃ)
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২৪/১২/২০২৫
কলকাতা।
_________________________________________
                    














মঙ্গলবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০২৫

শ্রীমদ্ভগবদগীতায় অর্জুন-পর্ব ১৮ (অংশ ২)

 শ্রীমদ্ভগবদগীতায় অর্জুন-পর্ব ১৮ (অংশ-দুই)
               অষ্টাদশ অধ্যায়
               মোক্ষসন্ন্যাসযোগ
অষ্টাদশ অধ্যায়ের ৬২ তম শ্লোক, যা পর্ব-১৮ (অংশ-এক)-এ আলোচিত হয়েছে, তার শেষ বক্তব্যটি ছিল কঠোর আদেশ। শ্রীকৃষ্ণ স্পষ্ট বলছেন, 'অনন্যভাবে', আমাকে স্মরণ কর এবং আমাতেই শরণ (আশ্রয়) নাও ; কেননা পরমাত্মার কৃপাতেই পরম শান্তি এবং প্রার্থিত পরম ধাম বা স্বর্গ লাভ হবে। (স্মরণীয়, বৈষ্ণব পদাবলীর সেই অপূর্ব কথাগুলি --
    "কত চতুরানন    মরি মরি যাওত
        ন তুয় আদি অবসানা।
      তোহে জনমি পুনঃ    তোহে সমাগত
           সাগর লহরি সমানা।।"
                                    ---- বিদ্যাপতি।
স্মরণ করতেই হবে এজন্যই যে এখন যেন শ্রীমদ্ভগবৎ পুরাণের 'ভক্তিবাদের' সচ্চিদানন্দঘন শ্রীকৃষ্ণের মূর্তি ভক্তের হৃদয় মন্দিরে প্রতিভাসিত)। অর্থাৎ তোমার, হে অর্জুন, ইচ্ছার কোন যথার্থতা নেই। আমি যা বলেছি, তাই কর। এবং এতক্ষণ ধরে যে উপদেশুলি তিনি দিলেন সে সবের উপসংহারে তিনি বললেন,

"ইতি তে জ্ঞানমাখ্যাতং গুহ্যাদ্ গুহ্যতরং ময়া।
বিমৃশ্য এতৎ অশেষেন যথেচ্ছসি তথা কুরু।।"

হে বীরশ্রেষ্ঠ পার্থ, গোপনীয় হতেও অতি গোপনীয় জ্ঞান আমি তোমার কাছে, সুদীর্ঘ ভাষণে ব্যক্ত করলাম। এই রহস্যময়, গূঢ়তাপূর্ণ জ্ঞানকে সম্পূর্ণরূপে বিচার করে (বিমৃশ্য), এবার তোমার যা ইচ্ছা তাই কর -- "যথা ইচ্ছসি তথা কুরু।" (এখানে আর অর্জুনের 'ইচ্ছা' কোথায় ? এখন তিনি শ্রীকৃষ্ণে 'সমাগত')।
____________________________________
                      ব্যাখ্যা
মনে রাখতে হবে স্বয়ং ভগবানের দ্বারা উক্ত এই নিগূঢ়, রহস্যাবৃত, গুপ্ত জ্ঞান অভিব্যক্ত হয়েছে হিংসাদীর্ণ, ক্রোধতপ্ত, আত্মজনের বধ্যভূমি সমর প্রাঙ্গণে -- 'কুরুক্ষেত্রে'। (যা কুরুরাজ ধৃতরাষ্ট্র প্রথম এবং একমাত্র শ্লোকে 'ধর্মক্ষেত্র' বলেছেন। এই 'ধর্মক্ষেত্র' শব্দের বহুকাল ধরে, বহু বিদ্বান-পণ্ডিতের দ্বারা, বহুবিধ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তবে এমনও হতে পারে যে এখানে ধর্ম শব্দের অর্থ স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। অর্থাৎ 'যুদ্ধ' যদি ক্ষত্রিয়ের 'স্বভাবজম্ ধর্ম' হয় তবে যুদ্ধের ক্ষেত্রটিও ধর্মক্ষেত্র। রাজা ধৃতরাষ্ট্র অবশ্যই কামনা করেছিলেন যে তাঁর পুত্ররাই পরিণামে বিজয়ী হয়ে পাণ্ডববর্জিত কুরুরাজ্য প্রতিষ্ঠা করবেন এবং তিনি পাণ্ডবনিধন যুদ্ধকে 'ধর্মযুদ্ধ' নামেই প্রজাদের মধ্যে প্রচার করতে সক্ষম হবেন। ঐতিহাসিক কাল থেকে রাজতন্ত্রের বহমান ইতিবৃত্তে এমন প্রমাণ অসংখ্য আছে)।
_____________________________________
যাই হোক্, আমরা দেখেছি অষ্টাদশ অধ্যায়ের প্রথম (শ্লোকে) উচ্চারণে শ্রীকৃষ্ণের প্রতি শ্রদ্ধাভাববিমোহিত অর্জুনের জিজ্ঞাসা ছিল 'সন্ন্যাস ও ত্যাগের' তত্ত্ব- সম্মন্ধীয়। তার পর থেকে বাষট্টিটি শ্লোকে অবিরাম তত্ত্বালোচনায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে মানুষের সামাজিক বর্ণানুমোদিত কর্ম ও গুণভিত্তিক ধর্মের (সত্ত্ব রজঃ তমঃ) অনুপুঙ্খিক বিবরণ ও ব্যাখ্যা দিয়ে গিয়েছেন। অর্জুন ছিলেন নির্বাক শ্রোতা। স্তব্ধবাক, নিরুত্তর অর্জুনের মনের মধ্যে অবশ্যই কিছু অনুক্ত প্রশ্ন ছিল। কেননা তাঁর প্রথম জিজ্ঞাসার মধ্যে ছিল মানবীয় প্রবনতাগুলি সমস্ত পরিত্যাগ করে, সন্ন্যাস গ্রহণের পর এই সর্বস্ব ধংসাত্মক যুদ্ধের কি বা প্রয়োজন ? মনে হয় স্বয়ং পরমাত্মার বিগ্রহ সখা কৃষ্ণের সম্মুখে তিনি এতই বিস্ময়বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন যে তিনি রইলেন নিস্তব্ধ, নিশ্চল, নিরুৎসাহিত। তাঁর এই নিষ্প্রাণ অবস্থা লক্ষ্য করেই শ্রীকৃষ্ণ উপসংহারে বললেন, 'এখন তোমার যা ইচ্ছা হয় তাই কর।' কিন্তু পরক্ষণেই পরম সখার নীরবতায় ব্যথিত হয়ে (শিষ্যের মৌনতার বেদনায় সমব্যাথী হয়ে আচার্য যেমন পুনরুচ্চারণের ক্লেশ স্বীকার করেন) তিনি অর্জুনের প্রতি কৃপাপরবশ হয়ে পড়েন এবং বলেন, গোপন হতেও যা গোপনীয় আমার এযাবৎকালের বচন তুমি আবার শোন, উপলব্ধি করবার চেষ্টা কর। কেননা তুমি যে আমার প্রিয়তম সুহৃদ, তোমার হিতসাধনের জন্যই তো আমি হিতকারক কথাগুলি বলব, -- "বক্ষ্যামি তে হিতম।।"
দেখ সখা, তোমার মৌনভাবে আমি সংশয়িত। তাই তোমাকে বলছি যদি পরমাত্মার সাধনার অতি সূক্ষ্ম, জটিল, গূঢ়, দুর্বোধ্য, দুরাচরণীয় ও অচিন্ত্যনীয় জ্ঞানমার্গ অবলম্বন করতে না পার তবে আমাকেই অবলম্বন কর। আমার শরণ নাও, আমাতেই তোমার সত্তাকে অর্পণ কর, আমার ভক্ত হয়ে যাও, 

"মন্মনা ভব মদ্ভক্তো মদযাজী মাং নমস্কুরু।
মামৈবৈষ্যসি সত্যং তে প্রতিজানে প্রিয়োহসি মে।।"

অবিচল মনে আমাকেই চিন্তা কর, তোমার সকল ভক্তি আমাতেই অর্ঘ্য দাও। আমার যে বিশ্বরূপ তোমাকে দেখিয়েছি, বা তোমার প্রার্থনায় যে (বিষ্ণু) নারায়ণরূপে তোমার কাছে অবতীর্ণ হয়েছি সেই আমাকেই তুমি ভজনা কর, জগৎ সংসারের শক্তি, বিভূতি, ঐশ্বর্য ও সমস্ত স্বাত্ত্বীক গুণের বিগ্রহরূপে আমাকে জেনে নিত্য প্রনত হলেই আমাকে সত্য সত্যই প্রাপ্ত হবে। এতক্ষণ যত ধর্মমত, যত ধর্মপথের কথা বলেছি, বা তুমি অপরাপর আচার্যদের কাছে শুনেছ সে সকল যদি অনুসরণ করতে নাও পারে তবে কেবল এবং কেবলমাত্র আমাকে শরণ (আশ্রয়) করে ধর্মপথ, কর্মপথ ও জীবনপথে অগ্রসর হও। এরপর সেই বহু আলোচিত মহাবাণী,
"সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ।
অহম্ ত্বা সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ।।"
আমাতে (পরমাত্মায়) আশ্রয় নিলে আমি তোমাকে সকল পাপ থেকে (স্বজন-হনন মহাপাপ থেকে) মুক্ত করব, মোক্ষ প্রদান করব ; আত্মজন, বন্ধু পরিজনদের মৃত্যুর জন্য শোক করো না -- "মা শুচঃ।"

বস্তুত অষ্টাদশ অধ্যায়ের এই ছেষট্টিতম বাণীটি শ্রীমদ্ভগবদগীতার উপসংহারের 'উপসংহার', যে বাণী শ্রীকৃষ্ণকে সমগ্র বিশ্বের ঈশ্বরভক্তদের হৃদয়ে ভগবানরূপে চিরপ্রতিষ্ঠিত করেছে, এবং বৈষ্ণবধর্মের আরাধ্য, একমাত্র আরাধ্য দেবতার আসনে প্রতিস্থাপন করে কৃষ্ণভক্তকুল তাঁর করে পূজা করে চলেছেন। বেদান্তধর্মের যে নিরাকার, নির্বিকার, অচ্যুত, অপরিজ্ঞেয়, সচ্চিদানন্দঘন পরমাত্মা -- সেই রূপ বৈষ্ণবীয় সাধনায় শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্ম-ধারী নারায়ণ এবং পীতাম্বরবাস বনমালী, ময়ূরপুচ্ছচূড় বংশীধারী, রসময় রাসবিহারী শ্যামরায়। সে এক 'অখিলরসামৃতমূর্তি' সাকার ঈশ্বরসাধনার অপরূপ ধর্মদর্শন। (এ প্রসঙ্গে দীর্ঘ দীর্ঘ আলোচনার অবকাশ আছে, যদি "মতি রহু তুয়া পরসঙ্গ"।)

যাই হোক্, এবার পরবর্তী বাণীনিচয়ে তিনি শ্রীমদ্ভগবদগীতারূপ মহাগ্রন্থের পাঠ, প্রচার ও ফলপ্রাপ্তি সম্মন্ধে বলছেন, দেখ অর্জুন, এই যে গীতারূপ পরম রহস্য তোমার হিতসাধনের নিমিত্তে, তোমার নিকটে বর্ণিত হোল তা সেই সকল মানুষদের কাছে বলা উচিত নয় যারা তপরহিত, ভক্তিহীন, ভগবৎকথায় অনাগ্রহী এবং 'আমার' নিন্দুক -- "ন চ মাম যঃ অভ্যসূয়তি।" কিন্তু যে পুরুষ (প্রাচীন বৈদিক ও সংস্কৃত শব্দ 'পুরুষ' অর্থে মানব মানবী দুইই বোঝায়। বেদান্ত মীমাংসায় পুরুষের 'স্বভাব' হলেন 'প্রকৃতি' অর্থাৎ নারী।) যাঁরা আমার প্রেমে আসক্ত, যাঁরা আমার ভক্ত অবশ্যই তাঁদের কাছে 'আমার' আলোচনা করবে। তাঁরা নিঃসংশয়ে আমাকে আপন করে পাবে -- "মামেবৈষ্যত্যসংশয়ঃ।" এই গীতার বাণী শ্রবণেচ্ছু যাঁরা তাঁরা আমার প্রিয় ; তাঁরা যেহেতু দিবারাত্র আমাতেই মগ্ন থাকেন, তাই তাঁদের চাইতে আমার আর প্রিয়তর কেও নেই। হে প্রিয়তম অর্জুন, এই কথা যেন প্রচারিত হয় -- 'যে পুরুষ আমাদের এই গীতার কথন, তোমার আমার আলাপন (কৃষ্ণার্জুন সংবাদ) শোনেন তিনি মৎকথিত জ্ঞানযজ্ঞেরই ফল লাভ করবেন ; আমি তাঁর দ্বারা পূজিত -- "জ্ঞানযজ্ঞেন তেনাহমিষ্টঃ স্যামিতি মে মতিঃ।।"  এই গীতাশ্রবণে যিনি অনুরক্ত, শুধু শ্রদ্ধাযুক্ত হয়ে শ্রবণমাত্র করেন, তিনিও সর্বপাপ মুক্ত হয়ে শ্রেষ্ঠলোক (দেবলোক) প্রাপ্ত হন।
এবার অর্জুন, তুমি বল, আরম্ভ থেকে শেষ, আমার সকল বাণী গুলি তুমি একাগ্র চিত্তে শ্রবণ করেছ ? তাতে তোমার অজ্ঞান-সম্ভূত মোহ কি বিনষ্ট হয়েছে? 
____________________________________
                      ব্যাখ্যা
কী অপূর্ব আন্তরিক, সহানুভূতিময়, সুহৃদসুলভ প্রশ্ন ! সত্যিই তো, এই দ্বন্দ্বসঙ্কুল যুদ্ধক্ষেত্রে, কর্তব্য-অকর্তব্য দ্বিধায় দীর্ণ, আসন্ন মহাসর্বনাশের আশঙ্কায় আশঙ্কিত, একজন মানুষই তো অর্জুন। সখা কৃষ্ণ বিশ্বরূপ ধারণ করে, যে মুহূর্ত থেকে তাঁর কাছে 'জগদীশ্বর' রূপে অবতীর্ণ হয়েছেন, সেই সময় থেকেই অর্জুন বিস্ময়বিহ্বল। সেই মানসিক অবস্থায় ভগবানের শ্রীমুখনিঃসৃত গভীর, গুহ্য, কঠোর সাধনোচিত ধর্মদর্শন ও জীবনাচরণের বাণী আত্মস্থ করা যে দুরূহ তা অর্জুনের অব্যক্ত বিহ্বলতা দেখে শ্রীকৃষ্ণ অনুভব করেছিলেন বলেই জিজ্ঞাসা করলেন, "কচ্চিদজ্ঞানসম্মোহঃ প্রনষ্টস্তে ধনঞ্জয়।।"            অজ্ঞানরূপ মোহ দূর হয়েছে কি তোমার, হে ধনঞ্জয় ?
                        
কিন্তু প্রশ্ন, সত্যই কি  অর্জুন মোহমুক্ত হতে পেরেছিলেন ? না কি শ্রীকৃষ্ণের সেই বিশ্বগ্রাসী, বিশ্বব্যাপী বিশ্বরূপ দেখার পর থেকে অর্জুনের আর কিছুই করনীয় ছিল না। (যদিও এই বিষয়ে ক্ষণপূর্বেই আমরা আলোচনা করেছি, তবুও কৃষ্ণার্জুন সংবাদের কিছু অংশ মহাভারতের 'ভীষ্মপর্ব' থেকে এখানে উদ্ধার করবার চেষ্টা করবো, যেখানে অর্জুন ছিলেন নিরুপায়, সাক্ষাৎ মহাকালের রথারূঢ় ক্রীড়নক মাত্র।
মহাভারতের ভীষ্মপর্বে 'গীতার' গ্রন্থনা। ভীষণ যুদ্ধে, অবশ্যম্ভাবী নরসংহারের নিমিত্তে কৃষ্ণ অর্জুনকে যে কথাগুলি বললেন সেগুলি ঘোর বিনাশাত্মক। অর্জুন যখন বললেন, "বল, কে তুমি উগ্ররূপ ? তোমাকে নমস্কার ? হে দেবেশ, প্রসন্ন হও, তুমি আদি স্বরূপ, তোমাকে জানতে ইচ্ছা করি ; তোমার প্রবৃত্তি বুঝতে পারছি না।
তখন ভগবান বললেন, আমি 'লোকক্ষয়কারী কাল' ! এখানে যে যোদ্ধারা সমবেত হয়েছে, তুমি না মারলেও তারা মরবে। আমি পূর্বেই তাদের মেরেছি ; সব্যসাচী, তুমি নিমিত্তমাত্র হও। ওঠ, যশোলাভ কর, শত্রু জয় করে সমৃদ্ধ রাজ্য ভোগ কর।
অর্জুন বললেন, হে সর্ব, তোমাকে সহস্রবার সর্বদিকে নমস্কার করি। তোমার মহিমা না জেনে প্রমাদবশে বা প্রণয়বশে তোমাকে কৃষ্ণ, যাদব ও সখা ব'লে সম্বোধন করেছি, বিহার ভোজন ও শয়নকালে উপহাস করেছি, সে সমস্ত ক্ষমা কর। তোমার অদৃষ্টপূর্ব রূপ দেখে আমি রোমাঞ্চিত হয়েছি, 'ভয়ে' আমার মন প্রব্যাথিত হয়েছে। তুমি প্রসন্ন হও, পূর্বরূপ ধারণ কর। কৃষ্ণ তাঁর স্বাভাবিক রূপ গ্রহণ করলেন এবং আরো বহু উপদেশ দিয়ে পরিশেষে বললেন, হে অর্জুন, তুমি যদি অহংকার বশে মনে কর যুদ্ধ করব না, তবে সে সংকল্প মিথ্যা হবে, তোমার প্রকৃতিই তোমাকে যুদ্ধে প্রবৃত্ত করাবে।"  (রাজশেখর বসু -- 'ব্যাসকৃত মহাভারতের সারানুবাদ')।
তারপর যা বলেছিলেন তা আমরা পূর্বেই আলোচনা করেছি এবং অর্জুনকে 'আপন সর্বগ্রাসী মহিমায় অভিভূত' ক'রে শেষে এক প্রকার আদেশই করলেন,  ("সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ...."),  তারপর অর্জুনের আর কিছুই করবার ছিল না ; কেননা তখন, "সাগরতুল্য দুই বাহিনী যুদ্ধের উন্মাদনায় উন্মত্ত, সমুদ্যত ও চঞ্চল হয়ে উঠেছে।" (ঐ)।
অর্জুন জানলেন, যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। শ্রীকৃষ্ণকে বললেন, "হে অচ্যুত, আমার মোহ বিনষ্ট হয়েছে, তোমার প্রসাদে আমি 'ধর্মজ্ঞান' লাভ করেছি, আমার সন্দেহ দূর হয়েছে, তোমার আদেশ পালন করব।"
এখানে প্রশ্ন অর্জুন কোন্ 'ধর্মজ্ঞান' লাভ করলেন ? উত্তর এককথায় দুর্বোধ্য ও দুর্জ্ঞেয়। এই ধর্মজ্ঞান কি সেই 'জ্ঞান'  যা তিনি গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের 'সাংখ্যযোগ' থেকে আরম্ভ করে অষ্টাদশ অধ্যায়ের 'মোক্ষসন্ন্যাসযোগ' পর্যন্ত শ্রবণ করে এসেছেন ? না কি, ১৮/৫৯ বাণীর ওই যে রহস্যময় বক্তব্য, "...প্রকৃতিস্তাং নিযোক্ষতি" -- তোমার প্রকৃতিই "তোমাকে যুদ্ধে প্রবৃত্ত করাবে।"  এখানে 'তোমার প্রকৃতি' অর্থে অর্জুনের 'স্ব-ভাব' -- 'ক্ষত্রিয়ের সহজাত প্রবৃত্তি বা ধর্ম', যা বর্ণাশ্রম বিধানে শাসকবর্ণের ধর্ম। অর্থাৎ কিনা 'রাজধর্ম' !
____________________________________
যাই হোক, ১৮/৭৩ তম শ্লোকটি 'অর্জুন উবাচ', যেখানে অর্জুন শ্রীকৃষ্ণে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ ক'রে, শ্রীকৃষ্ণের আজ্ঞামত যুদ্ধ --- মহাভারতের মহানরমেধ যজ্ঞানুষ্ঠানের সঙ্কল্প করলেন। 'কৃষ্ণার্জুনের আলাপন' এখানেই সমাপ্ত। এবার এই দীর্ঘ আলাপচারিতা সম্পর্কে সঞ্জয় রাজা ধৃতরাষ্ট্রকে অবহিত করেছেন এই বলে যে,
"ইত্যহং বাসুদেবস্য পার্থস্য চ মহাত্মনঃ।
সংবাদমিমম্ অশ্রৌষম্ অদ্ভুতম্ রোমহর্ষণম্।।"

হে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র, এইভাবে আমি বসুদেবনন্দন বাসুদেব ও মহাত্মা কুন্তীনন্দন অর্জুনের অপূর্বশ্রুত রোমহর্ষক কথোপকথন শুনেছি। শ্রীব্যাসদেবের কৃপায় দিব্যদৃষ্টি লাভ করেছিলাম বলেই পরম রহস্যযুক্ত, অতি গোপনীয় 'যোগ' সাক্ষাৎ যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কণ্ঠেই শ্রবণ করতে পেরেছি। আমি ধন্য। শ্রীকেশব ও অর্জুনের সেই মঙ্গলময়, অদ্ভুত সংবাদ বার বার স্মরণ করে আমার অন্তর আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠছে। আহা, ভগবানের সেই বিশ্বরূপ! যতবার স্মরণে জেগে উঠছে ততবার "হৃষ্যামি চ পুনঃ পুনঃ।।"  হে কুরুকুলপতি, অধিক কি আর বলি,
"যত্র যোগেশ্বর কৃষ্ণ যত্র পার্থ ধনুর্ধরঃ।
তত্র শ্রীর্বিজয়ো ভূতিঃ ধ্রুবা নীতিঃ মতির্মমঃ।।"
যেখানে যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং রয়েছেন, যেখানে গাণ্ডীধন্বা অর্জুন আছেন, যেখানে বিভূতি ও অবিচলিত নীতি আছে সেখান তাঁদের (পাণ্ডবদের) শ্রীবিজয় অবশ্যম্ভাবী --- এই আমার মত।

অষ্টাদশ অধ্যায় সম্বলিত শ্রীমদ্ভগবদগীতা নামক মহাগ্রন্থের এখানেই সমাপ্তি। তবে সমগ্র গ্রন্থটি অষ্টাদশ পর্ব মহাভারতের 'ভীষ্মপর্বের' সূচনায় আরম্ভ এবং সেখানেই শেষ। তারপরও ঘটনাবহুল, দ্বন্দ্বসঙ্কুল মহাভারতীয় কাহিনী চলমান। 'গীতা-উপনিষদ'কে বলা হয়েছে, 'সমস্ত উপনিষদগুলি গাভীস্বরূপ, দোহন করছেন গোপালনন্দন কৃষ্ণ, পার্থ সেই গাভীর বৎস (যিনি প্রথম সেই দুগ্ধরূপ গীতার অমৃত পান করেছেন) ; আর সেই দোহন-করা দুগ্ধ বা গীতারূপ অমৃত পান করেন সুধীগণ-- "পার্থঃ বৎসঃ সুধীর্ভোক্তা দুগ্ধম্ গীতামৃতম্ মহৎ।।" 
_____________________________________
মহাগ্রন্থ গীতা বিষয়ে বিশেষ কয়েকটি কথা

১) যুগ যুগ ধরে শুধু ভারতবর্ষেই নয় সমগ্র পৃথিবীর সুধীসমাজে শ্রীমদ্ভগবদগীতার সমাদর ও শ্রদ্ধা অচিন্ত্যনীয়। এখনও তার বিন্দুমাত্র গৌরব, গরিমা ও মহিমার ক্ষয় প্রাপ্তি ঘটেনি বরং প্রবলতরভাবে গীতাদর্শের প্রচার হয়ে চলেছে। কিন্তু গীতার ব্যাখ্যার সামান্যতম ত্রুটি গীতার মহান আদর্শকে নস্যাৎ করে দিতে পারে। এ প্রসঙ্গে গীতাশাস্ত্রী, সুমহান বেদ ও পুরাণবিদ পুন্যশ্লোক জগদীশ চন্দ্র ঘোষ মহাশয় বলছেন,
"গীতা স্বধর্মনিষ্ট বিন্দুমাত্রেরই নিত্যপাঠ্য। তাই অনেকে ক্ষুদ্র সংস্করণ হইতেও প্রত্যহ কিছু কিছু পাঠ করিয়া থাকেন। কিন্তু নিয়মপাঠ আর শাস্ত্রদৃষ্টিতে গীতা অধ্যয়ন বা উহাতে প্রবেশলাভের চেষ্টা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। ....... প্রাচীন উপনিষদগুলি (যেমন ঈশ্, কেন, কঠ, বৃহদারণ্যক, ছান্দ্যোগ্য, মুণ্ডক, মাণ্ডুক্য, ঐতরেয়, তৈত্তিরীয়, প্রশ্ন --- এই দশটি উপনিষদের ভাষ্য রচনা করেছিলেন ভগবান শঙ্করাচার্য), জৈমিনিসূত্র, যোগানুশাসন, শাণ্ডিল্যসূত্র, নারদসূত্র ইত্যাদি নানা শাস্ত্রের সহিত অল্পবিস্তর পরিচয় না থাকিলে গীতার প্রাচীন টিকাভাষ্য সম্যক বুঝা যায় না। গীতার বিভিন্ন স্থলে এমন অনেক কথা আছে যাহা পরস্পর বিরুদ্ধ বলিয়া প্রতিয়মান হয়।"
২) আমার মনে হয়েছে গীতার বাণী শ্রবণেচ্ছু যাঁরা তাঁরা আস্তিক্যবাদে অবশ্যই বিশ্বাসী হবেন। আমদের দেশের প্রাচীন ধর্মমতের যে 'ষড়দর্শন' -- সাংখ্য, পূর্ব মীমাংসা ও উত্তর মীমাংসা, যোগ, ন্যায়, শ্বেতাশ্বতর, বৈশেষিক এবং বেদান্ত -- এগুলি সবই আস্তিক্যবাদে বিশ্বাস করে (যদিও কপিলের প্রাচীন সাংখ্য যথেষ্টই দ্বান্দ্বিক)। এই ছয়টি দর্শন বেদকে প্রামাণ্যগ্রন্থ হিসাবে স্বীকার করে, তারপর তাদের নিজস্ব প্রতিপাদ্যগুলিকে বিচার করে। অপরদিকে চার্বাক, বৌদ্ধ ও জৈন দর্শনগুলিকে নাস্তিক্যবাদী বলা হয় এই কারণেই যে তাঁরা (যদিও সুউচ্চ তত্ত্বমার্গের ঘোষক) বেদ ও ঈশ্বরে (ব্রহ্মে) বিশ্বাস করেন না।
৩) শ্রীমদ্ভগবদগীতাও উপনিষদরূপেই আরাধ্য এবং পূর্ণরূপে সর্বোপনিষদের অমৃতরসসিঞ্চিত ব্রহ্মবাদী দর্শনের প্রবক্তা। এই মহান গ্রন্থই ভারতবর্ষে তথা জগৎ সংসারে পরম কল্যাণময়ী ভক্তিবাদের মন্দাকিনীধারা আনয়ন করেছেন। গীতার উৎস মহাকবি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস রচিত মানসসরোবর-সদৃশ বারিধীর মহাধার মহাভারত মহাকাব্যের 'ভীষ্মপর্বে'।
("চন্দ্রচূড় জটাজালে আছিলা যেমতি
জাহ্নবী ভারতরস ঋষি দ্বৈপায়ন
ঢালি সংস্কৃত হ্রদে রাখিলা তেমতি।" 
                             --মাইকেল মধুসূদন।)
ঐতিহাসিকদের মতে খ্রীষ্টপূর্ব পঞ্চম থেকে দ্বিতীয় শতাব্দীর মধ্যে রচিত হয়েছে মহাভারতের অন্তর্গত গীতা। কিমাশ্চর্যম্ ! তিনটি সহস্রাব্দ ধরে এই অবিনশ্বর গ্রন্থটি আজও মানুষের দ্বন্দ্বক্ষুব্ধ, শোকদুঃখবিদীর্ণ জীবনে শান্তি ও সান্ত্বনার অমৃতবাণী সিঞ্চন করে চলেছেন অবিরাম ! এ এক পরম বিস্ময় !
৪) এই গীতোপনিষদ মানবের চৈতন্য উন্মোচনে, জ্ঞানালোক বিকিরণে যে কী অপার দৈবপ্রসাদ বিতরণ করেছে, করে চলেছে এবং আগামী দিনেও করে চলবে তার মূল্যায়ন মানুষ করতে পারবে তখনই যখন 'শ্রীমদ্ভগবদগীতার' স্বরূপ মানুষ অন্তরে উপলব্ধি করতে পারবে, যখন মানুষ স্বর্গকামী, আচারসর্বস্ব, এহিক, ক্ষণিক ফলদায়ী, আত্মম্ভরিতাপূর্ণ সম্প্রদায়গত ধর্মব্যবসায়ীদের পাশাখেলার মায়াবদ্ধতা থেকে মুক্ত হবে।
গীতার বাণীগুলিকে 'মহাভারত' মহাকাব্যের সঙ্গে একাঙ্গে জড়িয়ে নিলে ভ্রমিত হবার সম্ভাবনা প্রবল। যখন (ভীষ্মপর্বে, যুদ্ধারম্ভের মুহূর্ত পূর্বে) শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বিশ্বজগৎ, বিশ্বজাগতিক চৈতন্যসত্ত্বা এবং মানবজীবনের মুক্তির সাধনার বিষয়ে বলছেন তখন অর্জুনের তৎকালের অবশ্যকর্তব্য থেকে পশ্চাদপসরণের কোন উপায় আর ছিল না। এমনই হয় ; মানব সভ্যতার ইতিহাসে যত আত্মহননের, নরমেধযজ্ঞের সর্বনাশা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে, সমস্তগুলির পূর্ব অবস্থার 'পাপের' পরিপ্রেক্ষিতটিই বিচারের বিষয়। সেই 'পূর্ব অবস্থার' কৃতকর্মের ফল 'পররবর্তীর' বিষাদময় অনিবার্য পরিণাম। 'কর্মানি অধিকারস্তে' শব্দের তাৎপর্য এই নয় যে পার্থিব ভোগাকাঙ্ক্ষার নিবৃত্তি। সেই ক্ষণিক, বিনাশশীল প্রাপ্তির কামনা হতে নিষ্কৃতি লাভের সাধনার নামই 'নিষ্কাম কর্মব্রত' -- যা গীতার প্রতিপাদ্য বিষয়গুলির অন্যতম।
৫) শ্রীগীতার অন্যতম এবং অনন্য উদ্ঘোষণা 'কালের'  মহিমা। সৃষ্টি, স্থিতি ও বিনাশের নিয়ন্ত্রক মহাকাল। তিনি নির্মম নিষ্ঠুর অনুদাসীন (কাউকে, কোন কিছুকেই ছেড়ে দেন না)। এই প্রসঙ্গে মহাভারতের স্ত্রীপর্ব ('জলপ্রাদানিকপর্বাধ্যায়') থেকে কিছু অংশ --- "শত পুত্রের মৃত্যুতে ধৃতরাষ্ট্র অত্যন্ত শোকাকুল। সঞ্জয় তাঁকে বললেন, মহারাজ, শোক করছেন কেন, শোকের কোন প্রতিকার নেই। ..... ধৃতরাষ্ট্র বলছেন, ‌আমার সমস্ত পুত্র আমাত্য ও সুহৃদ নিহত হয়েছেন, এখন আমি জরাজীর্ণ পক্ষীর ন্যায় হয়েছি, আমার চক্ষু নেই, রাজ্য নেই, বন্ধু নেই ; আমার জীবনের আর প্রয়োজন কি ?
ধৃতরাষ্ট্রকে আশ্বাস দেবার জন্য বিদুর বললেন, মহারাজ, শুয়ে আছেন কেন, উঠুন, সর্ব প্রাণীর গতিই এই। মানুষ শোক করে মৃতজনকে ফিরে পায় না, শোক করে নিজেও মরতে পারে না। এখানে মহাকবির সেই চিরায়ত সত্যের শ্লোকগুলি উদ্ধার করি, 

"সর্বে ক্ষয়ন্তা নিচয়াঃ পতনান্তাঃ সমুচ্ছয়াঃ।
সংযোগা বিপ্রয়োগান্তা মরণান্তঞ্চ জীবিতম্।।
আদর্শনাদাপতিতাঃ পুনশ্চাদর্শনং গতা।
ন তে তব ন ত্বেষাং তং তত্র কা পরিদেবনা।।
শোকস্থানসহস্রাণি ভয়স্থানশতানি চ।
দিবসে দিবসে মূঢ়মাবিশন্তি ন পন্ডিতম্।।
না কালস্য প্রিয়ঃ কশ্চিন্ন দ্বেশ্যঃ কুরুসত্তম।
না মধ্যস্থঃ ক্বচিৎ কালঃ সর্বং কালঃ প্রকর্ষতি।। 

সকল সঞ্চয় পরিশেষে ক্ষয় পায়, উন্নতির অন্তে পতন হয়, মিলনের অন্তে বিচ্ছেদ হয়, জীবনের অন্তে মরণ হয়। মানুষ অদৃশ্য স্থান থেকে আসে, আবার অদৃশ্য স্থানেই চলে যায় ; তাঁরা আপনার নন, আপনিও তাঁদের নন ; তবে কিসের খেদ ? সহস্র সহস্র শোকের কারণ এবং শত শত ভয়ের কারণ প্রতিদিন মূঢ় লোককে অভিভূত করে, কিন্তু পন্ডিতকে করে না। হে কুরুশ্রেষ্ঠ, কালের কেউ প্রিয় বা অপ্রিয় হয় না, কাল‌ কারও প্রতি উদাসীনও নয় (কালের কবল থেকে কেউ মুক্তি পায় না) ; কাল সকলকেই আকর্ষণ করে নিয়ে যায়।"
এরপরই আরও একটি শাশ্বত বাণী,
"হা ! লোকে লোভের বশে, ক্রোধ ও ভয়ে উন্মত্ত হয়ে নিজেকে বুঝতে পারে না। সৎকুলে জন্মালে নীচকুলজাতের এবং ধনী হলে দরিদ্রের নিন্দা করে, অন্যকে মূর্খ বলে, নিজেকে সংযত করতে চায় না। প্রাজ্ঞ ও মূর্খ, ধনবান ও নির্ধন, কুলীন ও অকুলীন, মানী ও অমানী সকলেই যখন পরিশেষে শ্মশানে গিয়ে শয়ন করে তখন দুষ্টবুদ্ধি লোকে কেন পরস্পরকে প্রতারিত করে ?" 
        'মহাভারত সারানুবাদ'-- রাজশেখর বসু।

৬) শ্রীমদ্ভগবদগীতার যে ধর্মধারণার উপস্থাপনা তার তো কোন সম্প্রদায়ের ধর্মতত্ত্ব নয় কেননা সেই সুদূর অতীতে আর্যাবর্তের ষোড়শ মহাজনদে ও তার বাইরেও যে জনসংখ্যা ছিল তা বর্তমান সময়কালের অখন্ড ভারতীয় ভূখণ্ডের (জম্বুদ্বীপ) জনসংখ্যার তুলনায় নিতান্ত এবং নিতান্তই যে কম ছিল তার বিস্তর সাক্ষ্য বেদ বেদান্ত পুরাণাদি থেকে উপস্থাপিত করা যায়। ন-আর্যদের গ্রাম ও বনবাসী জীবনের, ব্রাহ্মণদের আরণ্যক জীবনের সমাজবন্ধনে তেমন দ্বন্দ্ব ছিল না, যেমন ছিল মহাভারতে বর্ণিত বিভিন্ন আর্য (সামান্য কিছু অনার্য) রাজার, বিভিন্ন প্রকারের (কোথাও শুধুমাত্র রাজ্য জয়, কোথাও গোধন হরণ, কোথাও নারীহরণ, কোথাও কৌমবিবাদ) আগ্রাসন। এই অনিবার্য ও অপ্রতিরোধ্য আগ্রাসন-সঞ্জাত ঘোর বিনাশাত্মক দ্বন্দ্ববিক্ষোভের মধ্যখানে থেকে গীতার দর্শন ব্যক্ত হয়েছে। তাই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পটভূমির বাইরে এসে গীতার 'ধর্ম' (ধর্ম অর্থে এখানে ব্যষ্ঠি ও সমষ্টির কল্যাণময়, চৈতন্যময় জীবনাচরণের দর্শন) বিচার্য।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধভূমি ও কুরুপক্ষ ও পাণ্ডবপক্ষের যুযুধানবৃন্দের মনোভূমির কালান্তক বিনাশ যখন সাঙ্গ, তখন, আমাদের মহাকবি লিখছেন,
"সমরবন্যা যবে অবসান,
সোনার ভারত বিপুল শ্মশান,
রাজগৃহ যত ভূতল শয়ান
               পড়ে আছে ঠাঁই ঠাঁই --
ভীষণা শান্তি রক্তনয়নে
বসিয়া শোণিত পঙ্কশয়নে
চাহি ধরাপানে আনতবয়নে
মুখেতে বচন নাই।"
                           ----- রবীন্দ্রনাথ।

৭) 'বিশ্বরূপ দর্শনে' অর্জুন দিব্যদৃষ্টিতে দেখেছেন,
লেলিহ্যসে গ্রসমানঃ সমন্তাৎ লোকান্
"সমগ্রান্ বদনৈঃ জ্বলভিঃ।
তেজোভিরাপূর্য জগৎ সমগ্রং
ভাসস্তবোগ্রাঃ প্রতপন্তি বিষ্ণো।। ১১/৩০"

অর্জুন বলেছিলেন, সমগ্র বিশ্বসংসারকে, সমস্ত দিক থেকে প্রজ্বলিত মুখগহ্বর দ্বারা লেহন করে, গ্রাস করছেন প্রলয়ঙ্কর বিষ্ণু ! আপনার (মহাচিতাগ্নির মত) অসহনীয় তেজরাশী সমস্ত জগতকে পরিপূর্ণ করে সন্তপ্ত করছে। (জ্যোতির্বিজ্ঞানের কৃষ্ণগহ্বরের রূপ স্মরণ করিয়ে দেয়)।

এই নরকের আশা-ভাষাহীন অন্ধ গহ্বরে নিয়তি-নির্দিষ্ট প্রবেশের পূর্বমুহূর্তের মন্ত্রবাণী যে দিব্যগ্রন্থে সংকলিত তাই শ্রীমদ্ভগবদগীতা।
তবুও ঋষিগণ আমাদের বাঁচার মন্ত্র দিয়ে গিয়েছেন। জন্ম মৃত্যু, সৃজন-বিনাশের মধ্যে দিয়েই বিশ্বপ্রাণ ভোগবতী জাহ্নবী --অবিনাশী, অবিনশ্বর, চিরপ্রবহমান। পূর্ণ হতে 'তিনি' আসেন, আবার পূর্ণতেই প্রত্যাবর্তন করেন। 

"ওঁ পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাৎ পূর্ণমুদচ্যতে।
পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিশ্যতে।।
ওঁ শান্তিঃ ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ।" 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 

১৬/১২/২০২৫
_____________________________________


















রবিবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০২৫

শ্রীমদ্ভগবদগীতায় অর্জুন-পর্ব ১৮ (অংশ -১)

   শ্রীমদ্ভগবদগীতায় অর্জুন- পর্ব ১৮ (অংশ-এক)
                     অষ্টাদশ পর্ব--(অংশ-এক)
             অথাষ্টাদশোধ্যায়ঃ ; মোক্ষসন্ন্যাসযোগ।

অষ্টাদশ অধ্যায়ের আরম্ভেই সুধীর শ্রোতা তৃতীয় পাণ্ডবের প্রশ্ন, 

"সন্ন্যাসস্য মহাবাহো তত্ত্বমিচ্ছামি বেদিতুম্।
ত্যাগস্য চ হৃষিকেশ পৃথক্ কেশিনিষূদন।।"
হে হৃষিকেশ, হে মহাবাহো (অমিতবল অন্তর্যামী হে প্রভু) বাসুদেব, আমি সন্ন্যাসের ও ত্যাগের তত্ত্ব জানতে চাই।

(এখানে একটি পরমাশ্চর্য বিষয়ের অবতারণা করলেন কুরু রাজবংশের শৌর্য-ঐশ্বর্যময় বিরাট পুরুষ তৃতীয় পাণ্ডব মহারথী অর্জুন। এতগুলি বিশেষণে ভূষিত করা হোল তাঁকে এই কারণেই যে 'ত্যাগ ও সন্ন্যাসের' কথা বলেছেন যিনি তিনি জন্মসূত্রে সন্ন্যাসী (ব্রাহ্মণ) নন, বরং দেবরাজ ইন্দ্রের উপ্ত-ঔরস, ভোজ রাজকন্যা কুন্তীর গর্ভজাত সন্তান। আবার এই মুহূর্তে তিনি কুরুরাজ্য বিজিগীষু গাণ্ডীবধন্বা সব্যসাচী)
প্রত্যোত্তরে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, কামনা মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রবনতা, মানুষ কামনাবিহীন হতে পারে না। মানুষ জায়া-পুত্র-পরিবার, ধন-মানাদি প্রাপ্তি ও সংরক্ষণের নিমিত্তে ; আধিদৈবিক, আধিভৌতিক ও আধ্যাত্মিক দুঃখ থেকে আত্মরক্ষা ও পরিবারকে রক্ষার কামনায় যজ্ঞ, দান, তপস্যা, উপাসনা প্রভৃতি যে সকল কর্মসঙ্কল্প করে -- বেদজ্ঞ ঋষিগণ তাকেই 'কাম্য' বলেন। এই কাম্যকর্মের ত্যাগকেই বলে 'সন্ন্যাস'। আবার কাম্যকর্মের সমস্ত ফল 'আমার নয়, সমস্ত মানুষরূপী ঈশ্বরের' -- এই ভাবনাই হোল 'ত্যাগ'। 'মনীষিণঃ' -- বিদ্বানগণের ভাবনা একরকম নয় এইরূপ 'ত্যাগ ও সন্নাসের' বিষয়ে। কিছু মণীষী এই যুক্তি উপস্থাপনা করেন যে সকল কর্মই দোষযুক্ত।  এবং তাই কর্ম ত্যাগ করবারই যোগ্য, এই কারণেই যে সকল কর্মের পরিণামই এক অনিবার্য শূন্যতায় হারিয়ে যায়। (বৌদ্ধ দর্শনের শূন্যবাদ, যার গভীর আলোচনা আমরা পাই মহাদার্শনিক নাগার্জুনের ভাষ্যে)।

"হালভাঙ্গা পালছেঁড়া ব্যথা চলেছে নিরুদ্দেশে।"
                                  ----- রবীন্দ্রনাথ

আবার কিছু মণীষী (বিদ্বানগণ অন্যরকম মত প্রকাশ করেন। তাঁরা বলেন যজ্ঞ, দান, তপঃরূপ কর্ম ত্যাগ করবার প্রয়োজন নেই কেননা এই কর্মগুলি জগতের হিত সাধন করে। কিন্তু হে অর্জুন, যজ্ঞ দান তপ--এ সকল কর্ম করতে হবে ফলের কামনা না করে, নিরাসক্তভাবে। দেখ, নিত্যকার যে কর্ম যা জীবন ও বর্ণভিত্তিক ক্রিয়াকলাপ সেগুলি পরিত্যাগ করা, বা মোহাসক্ত হয়ে আলস্যের জীবন যাপন করা তামসিকতা লক্ষণ। অপরদিকে শারীরিক কষ্ট বা দুঃখলাভের আশঙ্কায় কর্মে প্রবৃত্ত না হওয়াও অকর্তব্য। কারণ সেখানে পুরুষের যে রাজসিক ভাব (ক্ষত্রিয়বর্ণ- বিশেষের উদ্দেশ্য বলা হয়েছে) তার বিনষ্টি সম্ভাবিত হয়। সর্বোপরি সাত্ত্বিক কর্মই শ্রেয়স্কর। নিষ্কাম ও নিরাসক্ত হয়ে, শাস্ত্রবিধি পালন করে, বর্ণানুযায়ী, স্ব স্ব ধর্মানুসারী কর্মপালনই সাত্ত্বিক গুণসম্পন্ন এবং সর্বোত্তম - এই আমার নিশ্চিত মত, "মে পার্থ নিশ্চিতং মতমুত্তমম।।" 
'রাজসিক কর্ম' ক্লেশকর ও দুঃখদায়ী হলেও করণীয় ও কর্তব্য, কেননা সেখানে 'ত্যাগের যে ফল' অর্থাৎ নিষ্কাম কর্মের মধ্যে দিয়ে মোক্ষলাভ --তাও প্রাপ্ত হওয়া হয় না। হে অর্জুন, শাস্ত্রবিধি দ্বারা নির্ধারিত নিয়ত কর্ম করতে হবে আসক্তিবিহীন মানসিকতায়, এবং তার সমস্ত ফল ত্যাগ করতে হবে নিস্পৃহভাবে। (যেমন দানের ক্ষেত্রে যদি দাতার সম্পদক্ষয়ের শোক বা দানের জন্য তার আত্মশ্লাঘা না থাকে তবেই তার সাত্ত্বিক দান-কর্ম স্বাত্ত্বিক ত্যাগরূপে গন্য হবে।) জ্ঞানবান ত্যাগী তিনিই যিনি (অন্যের) অকল্যাণকর কর্মে বিদ্বেষ করেন না, কল্যাণকারী কর্মে আসক্ত হন না ; যিনি "সত্ত্বসমাবিষ্টঃ মেধাবী ছিন্নসংশঃ।"
দেখ অর্জুন, মানুষ দেহের ভৃত্য,'দেহভৃতা'। সকল কর্ম ত্যাগ করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে সকাম পুরুষের কর্মফলপ্রাপ্তি এবং নিষ্কাম পুরুষের কর্মফলত্যাগ (যাঁকে প্রকৃত ত্যাগী বলা হয়)--- এই দুইয়ের যে ভালো ও মন্দ, এবং ভালোমন্দ-মিশ্রিত যে তিন প্রকার ফল তার বিচার মৃত্যুর পরে হয়। কিন্তু যিনি পূর্ণরূপে সকল কর্তব্য, অকর্তব্য, সে সবের ফলের আসক্তি, কর্তৃতাভিমান পরিত্যাগ করেছেন (সন্নাসী) তাঁদের কর্মের ফল ভোগ করতে হয় না -- কৃতকর্মের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বার বার জন্মগ্রহণ করতেও হয় না।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আবারো শ্লোক (১৮/১৩) থেকে সাংখ্য মতে প্রত্যাবর্তন করেছেন। তিনি বলছেন, 'হে অর্জুন, সকল কর্মের সিদ্ধির জন্য সাংখ্য সিদ্ধান্তে যা বলা হয়েছে তার অনুধাবন কর। কর্মসাধনের পাঁচটি হেতু। কর্মের 'কর্তা' (যার দ্বারা কর্মটি হয়) আছে, 'আধার' (যাকে আশ্রয় করে কর্ম সম্পাদন হয়) আছে, পৃথক্ পৃথক্ 'করণ' (যে যে ইন্দ্রিয় ও যেমন যেমন সাধনার দ্বারা কর্ম অনুষ্ঠিত হয়) আছে, পৃথক পৃথক চেষ্টা (প্রয়াস বা উদ্যোগ) আছে এবং পঞ্চম হেতু 'দৈব'  আছে।' কায়মনোবাক্যে শাস্ত্রমতে বা অশাস্ত্রমতে মানুষ যা কিছু কর্মই করে তার এই পাঁচটি কারণ হেতু -- "পঞ্চৈতে তস্য হেতবঃ।"
মনে রাখতে হবে 'আত্মা' কর্তা নয়। তিনি নিত্যশুদ্ধ, নির্বিকার। তাঁকে কর্তা ভাবে শাস্ত্রজ্ঞানবিরহিত অশুদ্ধবুদ্ধি মানুষ-- 'স পশ্যতি দুর্মতিঃ।' আর যে পুরুষের 'আমি কর্তা' এই অহংকার নেই, যে পুরুষের বুদ্ধি সংসার বিষয়ে নির্লিপ্ত সে পুরুষ 'হনন করেও হন্তা হন না, পাপেও বদ্ধ হন না।
________________________________________

                ব্যাখ্যা
কিমাশ্চর্যম্ ! নির্লিপ্ত, অথচ ক্রিয়াশীল এমন পুরুষ কর্মনিবন্ধনের রজ্জুতে বাঁধা পড়েন না। এমনকি হত্যা করেও হন্তারক নন ! জ্ঞানসাধনা, তপশ্চারণা, নিষ্কাম এবং পরহিতব্রতোপাসনার মত দৈবী জীবনাচরণের মহতী উপদেশ শুনবার পর, অষ্টাদশ অধ্যায়ের প্রথম শ্লোকে অর্জুন যখন শ্রীকৃষ্ণের কাছে 'ত্যাগ ও সন্ন্যাস তত্ত্ব' জানতে চাইলেন তখন থেকেই কি শ্রীকৃষ্ণের মনে এই সংশয় উদিত হয়েছিল যে 'নরসংহারের' মত নৃশংসতায় অর্জুন আর উৎসাহিত হয়ে উঠতে পারবেন না ? অর্জুনের মুখে 'ত্যাগ ও সন্ন্যাস' শব্দ দুটি তাঁকে বিচলিত করেছিল ? তাঁকে ভাবিত করেছিল এই ভাবনায় যে আসন্ন মহাযুদ্ধের মহাবিনষ্টির পাপকলুষিত পরিণাম সম্মন্ধে সচেতন হয়ে উদাসীন হয়ে উঠছেন ধনঞ্জয় ? তাই কি আবার-করে ওই দ্বিতীয় অধ্যায়ের সাংখ্যযোগের কথাগুলির প্রায় পুনরুচ্চারণ ! 
"যে এনং বেক্তি হন্তারং যশ্চৈনং মন্যতে হতম।
উভৌ তো ন বিজানীতো নায়ং সঞ্চিত না হন্যতে।।" ২/১৯।।
অহংকারশূন্য, নিষ্কাম, সাংসারিক কাজে অনাসক্ত পুরুষ কর্ম করেন কিন্তু কর্মের দায় তাঁর উপর বর্তায় না। কারণ তিনি জানেন তাঁর আত্মা, যিনি তাঁর অন্তরেই বিরাজ করছেন তিনি কর্তা নন ; তিনি সাক্ষী মাত্র।
আমরা আবারও সেই উপনিষদের প্রজ্ঞায় প্রত্যাবর্তন করলাম। এই আত্মাকে উপলব্ধি করা যায় কি ভাবে? কেন উপনিষদ বলছেন,
"তস্যৈ তপো দমঃ কর্মেতি প্রতিষ্ঠা।।" এই জ্ঞান লাভ করা যায় তপস্যায়, আত্মসংযমে এবং নিবেদিত কর্মসাধনায়।
___________________________________ 

অষ্টাদশ অধ্যায়ের অষ্টাদশ বাণীতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আরও গভীর দার্শনিকতায় প্রবেশ করেছেন। বলেছেন,
"জ্ঞানং জ্ঞেয়ং পরিজ্ঞাতা ত্রিবিধা কর্মচোদনা।
করণং কর্ম কর্তেতি ত্রিবিধঃ কর্যসংগ্রহঃ।।" 

আমরা কর্ম করি কেন ? কি সেই সকল প্রবনতা যেগুলি আমাদেরকে কর্মে প্রণোদিত করে ? শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, দেখ সখা, জ্ঞান, জ্ঞেয় এবং জ্ঞাতা এই তিন অব্যক্ত ও ব্যক্ত প্রণোদনা কর্মের প্রেরণা প্রদান করে। যে অব্যক্ত চেতনার দ্বারা আমরা বিষয় বা পদার্থকে জানি তাই 'জ্ঞান'। জ্ঞানের বিষয়ীভূত বস্তু বা ভাব 'জ্ঞেয়'। যিনি চেতনার দ্বারা সে সকল জানেন তিনি 'জ্ঞাতা'। 'যে চেতনার' দ্বারা প্রাণিত হয়ে কর্মের প্রেরণা পাওয়া যায় তাই 'করণ', যিনি (পুরুষ) তা করেন তিনি 'কর্তা' এবং যা কৃত হয় তাই 'ক্রিয়া'। 'সাংখ্য' শাস্ত্রীয় মতে সমস্ত এই প্রকৃয়ার মূলে 'জ্ঞান'। 'জ্ঞানও' আবার 'সাত্ত্বিক', 'রাজসিক' এবং 'তামসিক' গুণযুক্ত হয়। যে জ্ঞান সর্বভূতে এক, অবিনাশী, অবিভক্ত পরমাত্মাকে দেখে সে জ্ঞান 'সাত্ত্বিক'। যে জ্ঞান সকল ভূতে ভিন্ন ভিন্ন ভাব এবং ভূতজগতকে পৃথক্ পৃথক্ রূপে জানে সে জ্ঞান রাজসিক। এবং দুর্বল যে জ্ঞান আপন ইন্দ্রিয়-সর্বস্ব, যুক্তি ও তত্ত্বহীন দেহকেই কার্যরূপ শরীর মনে ক'রে তাতেই আসক্ত হয় সেই জ্ঞান 'তামসিক'। হে অর্জুন, আরো শোন, কর্মের ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনি সত্ত্ব রজঃ তমঃ বিভাগ আছে। কর্তৃত্বাভিমানহীন, ফলাকাঙ্ক্ষাশূন্য, অনুরাগ ও দ্বেষহীন কর্ম সাত্ত্বিক, পরিশ্রমযুক্ত, অহংকারযুক্ত, ফলপ্রয়াসী কর্ম 'রাজস্বম উদাহৃতম্'। আর পরিণামশূ্ন্য, ক্ষয়কারী, অবিচার-অজ্ঞান দ্বারা কৃত এবং সামর্থ্যের বাইরে যে কর্মপ্রচেষ্টা তাই তামসিক।
কর্তার চরিত্র বর্ণনা প্রসঙ্গেও ঐরূপ বিভাজন করা হয়। যিনি নিরাসক্ত, নিরংহঙ্কার, ধৈর্যবান, ক্ষয়-ক্ষতি ও আনন্দ-শোকে নিস্পৃহ হয়ে কর্ম করেন তিনিই সাত্ত্বিক কর্তা। যিনি আসক্তিযুক্ত, ফলাকাঙ্ক্ষী, লোভী ও অশুদ্ধাচারী, শোকে-আনন্দে বিচলিত তিনি 'রাজসিক কর্তা।' আর তিনিই 'তামসিক কর্তা' যিনি অপ্রকৃতিস্থ, শিক্ষা-রহিত, অপরের জীবন-জীবিকা নষ্টকারী এবং "বিষাদী দীর্ঘসূত্রী চ কর্তা তামস উচ্যতে।" 
শ্রীভগবান বলেই চলেছেন, শোন অর্জুন, গুণত্রয়ের প্রবনতা অনুসারে 'বুদ্ধি' এবং 'ধৃতি'ও তিন তিন প্রকারের। "বুদ্ধের্ভেদং ধৃতেশ্চৈব গুণস্ত্রিবিধং শৃণু।" দেখ, জীবনের 'মার্গ' বা পথ, 'কর্তব্য-অকর্তব্য'-ভেদ ধারণা করা চাই।  যে পুরুষ প্রবৃত্তিমার্গ নিবৃত্তিমার্গ, কর্তব্য- অকর্তব্য, ভয় ও অভয়, বন্ধন ও মুক্তি -- এই সকল বিপরীতমুখী ধারণা তত্ত্বতঃ জানেন তিনি সাত্ত্বিকী বুদ্ধি সম্পন্ন। সমভাবে ঐ বৈপরীত্যগুলি সম্মন্ধে ধারণার অভাব বা অজ্ঞানতাই হোল 'রাজসী' -- "বুদ্ধি সা পার্থ রাজসী"। আর, বলা বাহুল্য, হে মহারথী, ঐ যে সাত্ত্বিক বুদ্ধির লক্ষণগুলি বলেছি সেগুলির অভাব, সেগুলির বিপরীত যা কিছু বুদ্ধি তা সবই 'তামসিক'।
এবার 'ধৃতির' উপরেও ওই তিনটি গুণের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। হে অর্জুন, 'ধৃতি' তাই যা মানুষের সত্ত্বাকে ধারণ করে। মানুষের মন প্রাণ ইন্দ্রিয়সমূহের ক্রিয়াগ্রামকে ধ্যানের দ্বারা সংযত রাখে, পরমাত্মা ভিন্ন অন্য বিষয় থেকে সংহত করে রাখে (ব্যাভিচার থেকে মুক্ত রাখে) "সা ধৃতিঃ সাত্ত্বিকী"। অন্যদিকে ধর্মকামার্থ, ফলাকাঙ্ক্ষী ধৃতি 'রাজসিক' এবং দুর্মেধা যাঁরা, তাঁরা নিদ্রা ভয় দুশ্চিন্তা দুঃখ ও মত্ততা পরিত্যাগ করতে সক্ষম হননা। তাঁদের ধৃতি 'তামসী'।
সুখও ত্রিবিধ। সাধকগণ দান যজ্ঞ ও সেবা কর্মের মধ্যে দিয়ে, দুঃখবিহীন 'সাত্ত্বিক সুখ' ভোগ করেন, যে সুখ প্রথম দিকের সংযম ও সাধনার ক্লেশের দ্বারা সিদ্ধ হয় ও পরিশেষে ভগবানের প্রসাদসুধা লাভ করে। 'রাজসিক' সুখ ক্ষণিকের এবং সে সুখের প্রাপ্তি ঘটে ইন্দ্রিয়ের ভোগের মাধ্যমে। পরিণামে যা বিষবৎ হয়ে ওঠে। 'তামস' সুখ আপন অন্তরস্থিত আত্মাকেই মোহগ্রস্ত করে রাখে। "নিদ্রালস্যপ্রমাদোত্থং তামসং উদাহৃতম্।"
কিন্তু হে সখা, এ কথা সত্য যে স্বর্গে মর্ত্যে এমন কোন প্রাণ নেই যে এই তিনটি গুণের প্রভাব থেকে মুক্ত।
ন তদস্তি পৃথিব্যাং বা দিবি দেবেষু বা পুনঃ।
সত্ত্বং প্রকৃতিজৈঃ মুক্তম্ যদেভিঃ স্যাৎ ত্রিভির্গুণৈঃ।।
_____________________________________

 
                   ব্যাখ্যা

কেননা এই জগৎপ্রকৃতির 'মায়া' দ্বারা আচ্ছন্ন। মায়া ত্রিগুণময়ী, এই জগৎ সংসার ত্রিগুণময়ী (সত্ত্ব রজঃ তমঃ) মায়ারই বিকার। অর্থাৎ যা আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সে সব 'বিকার' -- বিবর্তন-পরিবর্তনশীল। এই বিকারগ্রস্থ বিশ্বধারধণার পারে আছেন মহাচৈতন্যস্বরূপ পরমাত্মা বা 'ব্রহ্ম'। যুগাবতার শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবও বলতেন, 'ব্রহ্ম সত্য জগৎ মিথ্যা -- এইটে ধারণা কর'।               
এই 'মায়া' শব্দটিই অতি মায়াবী। আদি বেদের মধ্যে মায়া 'শব্দটি' আছে। কিন্তু পরবর্তীতে বেদান্ত বা উপনিষদে মায়া বিষয়ে তেমন আলোকপাত করা হয়নি। আরো পরে শঙ্করাচার্য এই মায়ার উপর বিপুল চিন্তা আরোপ করেছেন। সে ব্যাখ্যা অতলান্তিক। এবার বাংলার শঙ্করাচার্য পরমহংদেবের পরম শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দও মায়া ও মায়াবাদের অতি দীর্ঘ কিন্তু প্রাঞ্জল ভাষায় বর্ণনা করেছেন। তাঁর লেখা থেকেই কিছু অংশ উদ্ধার করছি।
"বেদান্ত বলিতেছে, মঙ্গল ও অমঙ্গল উভয়ের মূল্য সমান। ইহারা এইরূপে পরস্পর-সম্মন্ধ হইয়া রহিয়াছে। সংসার এইরূপ জানিয়া সহিষ্ণুতার সহিত কর্ম কর। কি জন্য কর্ম করিব ? (সাংঘাতিক প্রশ্ন)। যদি সংসারের অবস্থা এইরূপ তবে আমরা কি করিব ? অজ্ঞেয়বাদী হই না কেন? ('অজ্ঞেয়বাদ' বলে যে ঈশ্বরের অস্তিত্ব 'আছে বা নেই' তার প্রমাণ করা যায় না ; অতএব জানারও প্রয়োজন নেই। Spencer-এর  Agnosticism একটি গভীর দর্শনতাত্ত্বিক বিষয়।) আধুনিক অজ্ঞেয়বাদী জানেন, এ রহস্যের মীমাংসা নাই ; বেদান্তের ভাষায় বলিতে গেলে --- এই মায়াপাশ হইতে অব্যাহতি নাই। অতএব কর্ম কর এবং সন্তুষ্ট থাকিয়া জীবন ভোগ কর। এখানেও একটি অতি অসঙ্গত মহাভ্রম রহিয়াছে। তুমি যে জীবন দ্বারা পরিবৃত রহিয়াছ, সেই জীবন সম্মন্ধে তোমার জ্ঞান কিরূপ ? জীবন বলিতে তুমি কেবল পঞ্চেন্দ্রিয়ে আবদ্ধ জীবনই বুঝ ? ইন্দ্রিয়জ্ঞানে আমরা পশু হইতে সামান্য ভিন্ন। আমি বিশ্বাস করি, এখানে উপস্থিত এমন কেহ নাই, যাঁহার জীবন কেবল ইন্দ্রিয়েই আবদ্ধ। আমাদের বর্তমান জীবন বলিতে ইন্দ্রিয় অপেক্ষা আরো কিছু বেশী বুঝায়। আমাদের সুখ দুঃখের অনুভব, উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং চিন্তাশক্তিও তো আমাদের জীবনের প্রধান অঙ্গ ; আর সেই উচ্চ আদর্শ ও পূর্ণতার দিকে অগ্রসর হইবার কঠোর চেষ্টাও কি আমাদের জীবনের উপাদান নহে ? অজ্ঞেয়বাদীদের মতে জীবন যেভাবে আছে, সেইভাবেই উহা ভোগ করা কর্তব্য ( আমাদের লোকায়ত চিন্তা ও চার্বাক দর্শনেরও ওই একই মত)। কিন্তু জীবন বলিলে আদর্শ -অন্বেষণের --- পূর্ণতা অভিমুখে অগ্রসর হইবার প্রবল চেষ্টাও বুঝায়। আমাদের এই আদর্শ লাভ করিতেই হইবে। অতএব আমরা অজ্ঞেয়বাদী হইতেই পারি না। অজ্ঞেয়বাদী জীবনের আদর্শভাগ বর্জন করিয়া বাকিটুকু সর্বস্ব বলিয়া গ্রহণ করেন। আদর্শ লাভ করা অসম্ভব জানিয়া তিনি ইহার অন্বেষণই পরিত্যাগ করেন। এই প্রকৃতিকে (পরিদৃশ্যমান ও প্রলুব্ধকর ভোগসর্বস্বতাকে) -- এই জগৎপ্রপঞ্চকেই তো বলে মায়া। বেদান্তমতে ইহাই প্রকৃতি।"
                       'জ্ঞানযোগ' -- স্বামী বিবেকানন্দ।

 
যাই হোক্, এই 'মায়া'-র ধারণা অত্যন্ত জটিল, যাকে কেন্দ্র করে পক্ষে ও বিপক্ষে অসংখ্য মনীষী ও দার্শনিক দের মতামত ব্যক্ত হয়ে আছে শত সহস্র গ্রন্থে। তবে 'ব্রহ্ম সত্য ; জগৎ মিথ্যা' -- আচার্য শঙ্করের এই কথাটি যখন উচ্চারিত হয়, তখন এই যে 'পরিদৃশ্যমান ও প্রলুব্ধকর ভোগসর্বস্ব' জগৎ বা প্রকৃতি তা যে মিথ্যা ও মায়াবৃত এইটি ধারণা করা কেবলমাত্র দুরূহ নয়, অসম্ভব। যদি করি তবে কি কোন্ 'আশ্রয়ে' জীবন অতিবাহিত হবে? জীবনের আদপেই কোন 'অস্তিত্ব' থাকবে কি না, এবং এই জগতের জাগতিক মায়া কাটালে জীবনের 'অবস্থান' কোথায় হবে ? শ্রীমদ্ভগবদগীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ে সেই সকল গূঢ় প্রশ্নের উত্তর আছে।
_____________________________________
এরপর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বর্ণাশ্রম ধর্মের আলোচনায় প্রবৃত্ত হলেন। বললেন, হে পরন্তপ অর্জুন, এই যে মানুষের মধ্যে চারটি বর্ণ বা জাতির সৃষ্টি হয়েছে তা কিন্তু অসম্মানের উদ্দেশ্যে নয়। এই বিভাগ তাদের স্বভাব থেকে উৎপন্ন গুণের নিরিখেই হয়েছে।

"শমো দমস্তপঃ শৌচং ক্ষান্তিঃ আর্জবমে চ।
জ্ঞানম্ বিজ্ঞানম্ আস্তিক্যম্ ব্রহ্মকর্ম স্বভাবজম্।।"

অন্তঃকরণের সংযম, ইন্দ্রিয়দমন, চিত্তের শুদ্ধি, তপস্যা, ক্ষমা, মনের ও শরীরের সরল প্রকাশ, আস্তিক বুদ্ধি (পরমাত্মা ভগবানে বিশ্বাস), জ্ঞান-বিজ্ঞান সাধন এবং ব্রাহ্মণের সাধারণ ক্রিয়াকর্মে (পঠন পাঠন দান ধ্যান নিধিধ্যাসন ইত্যাদি) যাঁরা প্রবৃত্ত ও ব্যাপৃত থাকেন তাঁরা ব্রাহ্মণ।  শৌর্য, তেজ, ধৈর্য যাঁদের চরিত্রগুণ, যুদ্ধে যাঁরা পরাম্মুখ নন, দানে যাঁরা মুক্তহস্ত এবং প্রভুত্বের ভাবে যাঁরা বলিষ্ঠ তাঁরা 'ক্ষত্রিয়'। 'বৈশ্যদের' কর্ম কৃষিকাজ, গোপালন, ব্যবসা, বাণিজ্যরূপ সদ্ব্যবহার। এবং 'শূদ্র' যাঁরা তাঁদের কাজ অপর তিন বর্ণের প্রতি পরিসেবা প্রদান করা। "পরিচর্যাত্মকম্ কর্ম শূদ্রস্যাপি স্বভাবজম্।"
_________________________________________

আর্য ব্রাহ্মণ্যবাদী বা ব্রাহ্মণ-প্রধান ধর্মধারণার বশবর্তী এই বর্ণাশ্রমবাদের উক্ত বাক্যটির আলোচনা ও ব্যাখ্যা, পক্ষে ও বিপক্ষে, ভারতবর্ষের এক বিপুল গণসমাজকে আহত করেছে এবং তাদের মনে গভীর হীনমন্যতাবোধ যুগপৎ অন্তরগ্লানির সঞ্চার করেছে যা আজিও দুর্মোচনীয়। পরিণামে ভারতীয় সমাজে অনৈক্য, বহিরাক্রমণ ও ধর্মান্তরিতকরণ অনিবার্য ও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছিল, এবং যা আজও অব্যাহত আছে।
(এ প্রসঙ্গে বিশদে আলোচনা করার ইচ্ছা রইল)। (১)
____________________________________ 

বর্ণভিত্তিক সমাজ বিভক্তির বিষয়ে আরো যা যা বলেছেন শ্রীকৃষ্ণ সেগুলিকেও সেই কালে কর্মাধিকার নির্দিষ্ট করবার ক্ষেত্রে অস্বীকার করা যায়নি বা হয়নি। তিনি বলছেন, 

"স্বে স্বে কর্মণ্যভিরতঃ সংসিদ্ধিং লভতে নরঃ।
স্বকর্মনিরতঃ সিদ্ধিং যথা বিন্দতি তৎ শৃণু।।" ১৮/৪৬।।

যেমন স্বাভাবিক প্রবৃত্তি অনুসারে মানুষ সংসিদ্ধি (ভগবৎপ্রাপ্তি) লাভ করে, তেমনি নিজ নিজ কর্মের সাধনা করেও মানুষ পরম সিদ্ধিকেই প্রাপ্ত হয়। যে পরমাত্মা থেকে সমস্ত ভূতসংসারের উৎপত্তি হয়েছে এবং যাঁর দ্বারা এই জগৎ সংসার ব্যাপ্ত হয়ে আছে নিজ নিজ কাজের মধ্য দিয়েই মানুষ তাঁর পূজা করে ও পরম আনন্দ লাভ করে। অন্যের কাজ, যদি উত্তম গুণেরও হয় তবুও নিজের কাজ (গুণরহিত হলেও) শ্রেষ্ঠ। স্বধর্মের কাজ করলে মানুষ পাপক্লিন্ন হয় না-- "ন আপ্নোতি বিল্বিষম্।" হে কোন্তেয়, স্বধর্ম যেমন সহজধর্ম, ঠিক তেমনি স্বকর্ম সহজ ও স্বভাবজ কর্ম। সে কাজ ত্যাগ করবে না। তা দোষযুক্ত হতেও পারে ; কেননা কোন কর্মই দোষমুক্ত হতে পারে না। যেমন ধোঁওয়ার দ্বারা অগ্নি আবৃত থাকে, ঠিক তেমনি সকল কাজ কোন না কোন দোষের দ্বারা আবৃত। (প্রথম অধ্যায়ে বিষাদ যোগে অর্জুন যেভাবে 'আত্মীয়নিধনের' মত কর্মে নিদারুণ নৃশংসতার কথা বলেছিলেন, এই অষ্টাদশ অধ্যায়ে এসে শ্রীকৃষ্ণ কি আরেকবার অর্জুনের 'ক্ষাত্রধর্মের' কর্তব্যের উল্লেখ করে বলছেন, "সহজং ধর্ম কৌন্তেয় সদোষমপি না ত্যজেৎ।" এই স্বজন হত্যা নৃশংস হলেও তার তোমার স্বধর্ম। 

১৮/৪৯ শ্লোকে আবার ভগবান শ্রীকৃষ্ণ 'সাংখ্য যোগ'-এ প্রত্যাবর্তন করেছেন। বলছেন, কর্মযোগের বিপরীত নৈষ্কর্ম্য। যেহেতু শুদ্ধচৈতন্য পরমাত্মা ক্রিয়ারহিত, তাই তাঁকে প্রাপ্ত হতে যে যোগাভ্যাস প্রয়োজন তাই হোল সাংখ্যযোগ, (আদি সাংখ্যের যা বিপরীত) আসক্তিশূন্য,স্পৃহারহিত, আত্মজয়ী সন্নাসী সেই 'নৈষ্কর্ম্য' সিদ্ধি লাভ করে। (এখানে 'সন্ন্যাসেন' শব্দটি 'সাংখ্য'মতের কি না তাতে সংশয় আছে)। আবার পরবর্তী বাণীত জ্ঞানযোগের কথা বলছেন। বলছেন অন্তঃকরণের শুদ্ধির দ্বারা যেমন ব্রহ্মলাভ হয় তেমনি হে কৌন্তেয়, পরম নিষ্ঠাসহযোগে আরাধিত  'জ্ঞানযোগেও' ব্রহ্মোপলব্ধি হয়। কিন্তু সে আরাধনা অতি কঠিন।
"বুদ্ধ্যা বিশুদ্ধয়া যুক্তো ধৃত্যাত্মানং নিয়ম্য চ।
শব্দাদীন্ বিষয়ান্ ত্যক্ত্বা রাগদ্বেষৌ বুদস্য।।
বিবিক্তসেবী লঘ্বাশী যৎবাককায়মানসঃ।
ধ্যানযোগপরো নিত্যং বৈরাগ্যং সমুপাশ্রিতঃ।।"
বিশুদ্ধবুদ্ধি যে মানুষ, নির্জনে থেকেও যিনি দেশের দশের সেবা করেন, যিনি স্বল্পাহারী, কায়মনোবাক্যে যিনি অতি সংযমশীল, বৈরাগ্য সাধনায় সিদ্ধ, যোগধ্যানে মগ্ন, স্বাত্ত্বিক ধারণায় ঋদ্ধ, যাঁর অন্তঃকরণ বশীভূত, যিনি শব্দসংযত এবং অনুরাগ ও বিদ্বেষবিহীন ; যিনি বল, দর্প, কাম, ক্রোধ হতে মুক্ত, সঞ্চয়-সংগ্রহ যিনি পরিত্যাগ করেছেন, মমতার মোহে যিনি বদ্ধ নন তিনিই সেই 'সৎ-ন্যাসী' পুরুষ এবং ব্রহ্মে একীভূত হয়ে যাবার সাধনায় সিদ্ধ হন। এমত জীবন-সাধনায় সিদ্ধ হয়ে ব্রহ্ম বা পরমাত্মায় একীভাবে স্থিত হয়ে, কামনাহীন, শোক-দুঃখ হীন, সমস্ত প্রাণে ও পদার্থে সমভাব অবলম্বন করেন যিনি তিনিই 'পরম নৈষ্কর্ম্য'রূপ সিদ্ধি লাভ ক'রে, সাধনমার্গে "মদ্ভক্তিং লভতে পরাম্।" 
পরমাত্মায় বা পরমব্রহ্মরূপ 'আমাকে' প্রাপ্ত হবার এই সাধনায় প্রথমত 'তত্ত্বতঃ' জানতে হবে। স্বরূপতঃ আমি (ব্রহ্ম) যা এবং আমার যা প্রভাব ( ব্রহ্মাণ্ডব্যপ্ত চৈতন্যের লীলা) -- তত্ত্বতঃ (অর্থাৎ জ্ঞানযোগের দ্বারা কেননা 'প্রজ্ঞানন্দ ব্রহ্ম') যিনি উপলব্ধি করেছেন তিনি আমাতে, 'সচ্চিদানন্দঘন পরমাত্মায়' লীন হয়ে যান -- "বিশদে তদনন্তরম্।"  তখন সেই সাধক আমার ভক্ত, আমাতেই তাঁর বিলয় ও মুক্তি। তাই হে অর্জুন, ভক্ত যিনি ভক্তি তাঁর অনন্যা, ভক্তি তাঁর অব্যভিচারিণী। তিনি কর্ম করুন আর নাই করুন, তাঁর যোগ আমার সঙ্গে। জগতের সকল কর্মের (আমারি মত) কর্তা তিনি ; কিন্তু নির্লিপ্ত, নির্বিকার, নিরাসক্ত। অতএব, হে সখা,
চেতসা সর্বকর্মাণি ময়ি সন্ন্যস্য মৎপরঃ।
বুদ্ধিযোগমুপাশ্রিত্য মচ্চিত্তঃ সততং ভব।। ১৮/৫৭
এই হোল ভগবানের সারকথা --- মহাবাণী। শ্রীকৃষ্ণ এখানে সেই পরম পুরুষ যাঁর উপরে আর কিছু নাই।
"পুরুষাৎ না পরং কিঞ্চিৎ সা কাষ্ঠা সা পরা গতিঃ।। এই পুরুষের থেকে আর ঊর্ধতর কিছু নাই ; ওই পুরুষেই '(পরমব্রহ্মরূপ মহাচৈতন্য") আমার সকল কিছুর বিলয়। (-- কঠ উপনিষদ)। সুতরাং তুমি, হে রথীশ্রেষ্ঠ, ভক্তিযোগে "মতিচ্চ সততং ভব"-- নিরন্তর মদ্গতচিত্ত হয়ে যে কাজে, যে স্বধর্মে তুমি নিযুক্ত, নিষ্কামনায়, নিষ্প্রশ্নে তাই কর। (ভগবানের) আমার দ্বারাই সমস্ত দুর্গতি থেকে উদ্ধার, আমার আদেশ প্রতিপালনে বিমুখ হলেই অধোগতি অনিবার্য। 'অহংকারাৎ না শ্রোষ্যসি 'বিনঙ্ক্ষ্যাসি'।
শ্রীকৃষ্ণের আদেশে এমন কঠোরতা কি এই কারণেই যে অর্জুন এখনো কিংকর্তব্যবিমূঢ় ? তাই কি শ্রীকৃষ্ণ পরবর্তী আজ আজ্ঞায় বলছেন, শোন অর্জুন, তুমি যে 'অহংকারকে' অবলম্বন করে মনে করছ 'আমি এই যুদ্ধভূমি ত্যাগ করব' -- যা মিথ্যা প্রতিপন্ন হবে ; কারণ তোমার স্বভাব তোমাকে বাধ্য করবে বিপক্ষনাশে প্রবৃত্ত হতে। 

"যদহংকারমাশ্রিত্য না য্যোৎস্য ইতি মন্যসে।
মিথ্যৈষ ব্যবসায়স্তে প্রকৃতিস্তাং নিযোক্ষ্যতি।।"

(এখানে 'অহংকার' শব্দের অর্থ 'আমি যুদ্ধ নামক কর্মের কর্তা' -- এই ভাব। আর 'প্রকৃতি' শব্দের অর্থ স্বভাব বা ক্ষত্রিয়ের সহজাত প্রবনতা)। পরে আবারো বলছেন, হে কোন্তেয়, মোহযুক্ত হয়ে যে কর্মে তুমি অনিচ্ছা প্রকাশ করছো, নিজস্ব স্বভাবজাত কর্মপ্রেরণায় প্রাণিত হয়ে, কর্মের দ্বারাই বদ্ধ হয়ে তোমাকে সে কাজ করতেই হবে। 

"ধর্মরাজ দিল যবে ধংসের আদেশ
আপন হত্যার ভার আপনিই নিল মানুষেরা।" 
                              ----- রবীন্দ্রনাথ।

নিরুপায় অর্জুন ! এবার আরো কঠোর, আরো আত্মশ্লাঘানাশকারী নির্মম 'বাণী,' যেন বাক্যবাণ,
ওহে অর্জুন, তুমি কে ? তোমার শরীর এক যন্ত্রমাত্র। এই শরীররূপ যন্ত্রে অন্তর্যামীরূপ পরমেশ্বর আরূঢ় আছেন। সমস্ত ভূতবর্গকে (প্রাণীকে) তাদের ক্রমানুসারে পরিচালিত করাবার জন্যে প্রাণীগণের হৃদয়ে যিনি বাস করেন তিনিই সারথী --- রথীর কাজ সারথী নিয়ন্ত্রণ করেন। সেই 'সত্য' ধারণ করে  অহমভাব ত্যাগ করে, পরমেশ্বরের আশ্রয় অবলম্বন কর -- "তমেব শরণং গচ্ছ সর্বভাবেন ভারত" ; তার ফলেই, তাঁর প্রসাদে পরম শান্তির আশ্রয় লাভ করবে--পরম্ শান্তিং স্থানং প্রাপ্সসি শাশ্বতম্।।" 

এই  অষ্টাদশ অধ্যায়টি দু'টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। অষ্টাদশ পর্ব- (অংশ-এক), অষ্টাদশ পর্ব-(অংশ-দুই)। পরবর্তী অংশ শ্রীমদ্ভগবদগীতায় অর্জুন-পর্ব ১৮ (অংশ-দুই)।
___________________________________















Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...