রবিবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০২৫

শ্রীমদ্ভগবদগীতায় অর্জুন-পর্ব ১৮ (অংশ -১)

   শ্রীমদ্ভগবদগীতায় অর্জুন- পর্ব ১৮ (অংশ-এক)
                     অষ্টাদশ পর্ব--(অংশ-এক)
             অথাষ্টাদশোধ্যায়ঃ ; মোক্ষসন্ন্যাসযোগ।

অষ্টাদশ অধ্যায়ের আরম্ভেই সুধীর শ্রোতা তৃতীয় পাণ্ডবের প্রশ্ন, 

"সন্ন্যাসস্য মহাবাহো তত্ত্বমিচ্ছামি বেদিতুম্।
ত্যাগস্য চ হৃষিকেশ পৃথক্ কেশিনিষূদন।।"
হে হৃষিকেশ, হে মহাবাহো (অমিতবল অন্তর্যামী হে প্রভু) বাসুদেব, আমি সন্ন্যাসের ও ত্যাগের তত্ত্ব জানতে চাই।

(এখানে একটি পরমাশ্চর্য বিষয়ের অবতারণা করলেন কুরু রাজবংশের শৌর্য-ঐশ্বর্যময় বিরাট পুরুষ তৃতীয় পাণ্ডব মহারথী অর্জুন। এতগুলি বিশেষণে ভূষিত করা হোল তাঁকে এই কারণেই যে 'ত্যাগ ও সন্ন্যাসের' কথা বলেছেন যিনি তিনি জন্মসূত্রে সন্ন্যাসী (ব্রাহ্মণ) নন, বরং দেবরাজ ইন্দ্রের উপ্ত-ঔরস, ভোজ রাজকন্যা কুন্তীর গর্ভজাত সন্তান। আবার এই মুহূর্তে তিনি কুরুরাজ্য বিজিগীষু গাণ্ডীবধন্বা সব্যসাচী)
প্রত্যোত্তরে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, কামনা মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রবনতা, মানুষ কামনাবিহীন হতে পারে না। মানুষ জায়া-পুত্র-পরিবার, ধন-মানাদি প্রাপ্তি ও সংরক্ষণের নিমিত্তে ; আধিদৈবিক, আধিভৌতিক ও আধ্যাত্মিক দুঃখ থেকে আত্মরক্ষা ও পরিবারকে রক্ষার কামনায় যজ্ঞ, দান, তপস্যা, উপাসনা প্রভৃতি যে সকল কর্মসঙ্কল্প করে -- বেদজ্ঞ ঋষিগণ তাকেই 'কাম্য' বলেন। এই কাম্যকর্মের ত্যাগকেই বলে 'সন্ন্যাস'। আবার কাম্যকর্মের সমস্ত ফল 'আমার নয়, সমস্ত মানুষরূপী ঈশ্বরের' -- এই ভাবনাই হোল 'ত্যাগ'। 'মনীষিণঃ' -- বিদ্বানগণের ভাবনা একরকম নয় এইরূপ 'ত্যাগ ও সন্নাসের' বিষয়ে। কিছু মণীষী এই যুক্তি উপস্থাপনা করেন যে সকল কর্মই দোষযুক্ত।  এবং তাই কর্ম ত্যাগ করবারই যোগ্য, এই কারণেই যে সকল কর্মের পরিণামই এক অনিবার্য শূন্যতায় হারিয়ে যায়। (বৌদ্ধ দর্শনের শূন্যবাদ, যার গভীর আলোচনা আমরা পাই মহাদার্শনিক নাগার্জুনের ভাষ্যে)।

"হালভাঙ্গা পালছেঁড়া ব্যথা চলেছে নিরুদ্দেশে।"
                                  ----- রবীন্দ্রনাথ

আবার কিছু মণীষী (বিদ্বানগণ অন্যরকম মত প্রকাশ করেন। তাঁরা বলেন যজ্ঞ, দান, তপঃরূপ কর্ম ত্যাগ করবার প্রয়োজন নেই কেননা এই কর্মগুলি জগতের হিত সাধন করে। কিন্তু হে অর্জুন, যজ্ঞ দান তপ--এ সকল কর্ম করতে হবে ফলের কামনা না করে, নিরাসক্তভাবে। দেখ, নিত্যকার যে কর্ম যা জীবন ও বর্ণভিত্তিক ক্রিয়াকলাপ সেগুলি পরিত্যাগ করা, বা মোহাসক্ত হয়ে আলস্যের জীবন যাপন করা তামসিকতা লক্ষণ। অপরদিকে শারীরিক কষ্ট বা দুঃখলাভের আশঙ্কায় কর্মে প্রবৃত্ত না হওয়াও অকর্তব্য। কারণ সেখানে পুরুষের যে রাজসিক ভাব (ক্ষত্রিয়বর্ণ- বিশেষের উদ্দেশ্য বলা হয়েছে) তার বিনষ্টি সম্ভাবিত হয়। সর্বোপরি সাত্ত্বিক কর্মই শ্রেয়স্কর। নিষ্কাম ও নিরাসক্ত হয়ে, শাস্ত্রবিধি পালন করে, বর্ণানুযায়ী, স্ব স্ব ধর্মানুসারী কর্মপালনই সাত্ত্বিক গুণসম্পন্ন এবং সর্বোত্তম - এই আমার নিশ্চিত মত, "মে পার্থ নিশ্চিতং মতমুত্তমম।।" 
'রাজসিক কর্ম' ক্লেশকর ও দুঃখদায়ী হলেও করণীয় ও কর্তব্য, কেননা সেখানে 'ত্যাগের যে ফল' অর্থাৎ নিষ্কাম কর্মের মধ্যে দিয়ে মোক্ষলাভ --তাও প্রাপ্ত হওয়া হয় না। হে অর্জুন, শাস্ত্রবিধি দ্বারা নির্ধারিত নিয়ত কর্ম করতে হবে আসক্তিবিহীন মানসিকতায়, এবং তার সমস্ত ফল ত্যাগ করতে হবে নিস্পৃহভাবে। (যেমন দানের ক্ষেত্রে যদি দাতার সম্পদক্ষয়ের শোক বা দানের জন্য তার আত্মশ্লাঘা না থাকে তবেই তার সাত্ত্বিক দান-কর্ম স্বাত্ত্বিক ত্যাগরূপে গন্য হবে।) জ্ঞানবান ত্যাগী তিনিই যিনি (অন্যের) অকল্যাণকর কর্মে বিদ্বেষ করেন না, কল্যাণকারী কর্মে আসক্ত হন না ; যিনি "সত্ত্বসমাবিষ্টঃ মেধাবী ছিন্নসংশঃ।"
দেখ অর্জুন, মানুষ দেহের ভৃত্য,'দেহভৃতা'। সকল কর্ম ত্যাগ করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে সকাম পুরুষের কর্মফলপ্রাপ্তি এবং নিষ্কাম পুরুষের কর্মফলত্যাগ (যাঁকে প্রকৃত ত্যাগী বলা হয়)--- এই দুইয়ের যে ভালো ও মন্দ, এবং ভালোমন্দ-মিশ্রিত যে তিন প্রকার ফল তার বিচার মৃত্যুর পরে হয়। কিন্তু যিনি পূর্ণরূপে সকল কর্তব্য, অকর্তব্য, সে সবের ফলের আসক্তি, কর্তৃতাভিমান পরিত্যাগ করেছেন (সন্নাসী) তাঁদের কর্মের ফল ভোগ করতে হয় না -- কৃতকর্মের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বার বার জন্মগ্রহণ করতেও হয় না।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আবারো শ্লোক (১৮/১৩) থেকে সাংখ্য মতে প্রত্যাবর্তন করেছেন। তিনি বলছেন, 'হে অর্জুন, সকল কর্মের সিদ্ধির জন্য সাংখ্য সিদ্ধান্তে যা বলা হয়েছে তার অনুধাবন কর। কর্মসাধনের পাঁচটি হেতু। কর্মের 'কর্তা' (যার দ্বারা কর্মটি হয়) আছে, 'আধার' (যাকে আশ্রয় করে কর্ম সম্পাদন হয়) আছে, পৃথক্ পৃথক্ 'করণ' (যে যে ইন্দ্রিয় ও যেমন যেমন সাধনার দ্বারা কর্ম অনুষ্ঠিত হয়) আছে, পৃথক পৃথক চেষ্টা (প্রয়াস বা উদ্যোগ) আছে এবং পঞ্চম হেতু 'দৈব'  আছে।' কায়মনোবাক্যে শাস্ত্রমতে বা অশাস্ত্রমতে মানুষ যা কিছু কর্মই করে তার এই পাঁচটি কারণ হেতু -- "পঞ্চৈতে তস্য হেতবঃ।"
মনে রাখতে হবে 'আত্মা' কর্তা নয়। তিনি নিত্যশুদ্ধ, নির্বিকার। তাঁকে কর্তা ভাবে শাস্ত্রজ্ঞানবিরহিত অশুদ্ধবুদ্ধি মানুষ-- 'স পশ্যতি দুর্মতিঃ।' আর যে পুরুষের 'আমি কর্তা' এই অহংকার নেই, যে পুরুষের বুদ্ধি সংসার বিষয়ে নির্লিপ্ত সে পুরুষ 'হনন করেও হন্তা হন না, পাপেও বদ্ধ হন না।
________________________________________

                ব্যাখ্যা
কিমাশ্চর্যম্ ! নির্লিপ্ত, অথচ ক্রিয়াশীল এমন পুরুষ কর্মনিবন্ধনের রজ্জুতে বাঁধা পড়েন না। এমনকি হত্যা করেও হন্তারক নন ! জ্ঞানসাধনা, তপশ্চারণা, নিষ্কাম এবং পরহিতব্রতোপাসনার মত দৈবী জীবনাচরণের মহতী উপদেশ শুনবার পর, অষ্টাদশ অধ্যায়ের প্রথম শ্লোকে অর্জুন যখন শ্রীকৃষ্ণের কাছে 'ত্যাগ ও সন্ন্যাস তত্ত্ব' জানতে চাইলেন তখন থেকেই কি শ্রীকৃষ্ণের মনে এই সংশয় উদিত হয়েছিল যে 'নরসংহারের' মত নৃশংসতায় অর্জুন আর উৎসাহিত হয়ে উঠতে পারবেন না ? অর্জুনের মুখে 'ত্যাগ ও সন্ন্যাস' শব্দ দুটি তাঁকে বিচলিত করেছিল ? তাঁকে ভাবিত করেছিল এই ভাবনায় যে আসন্ন মহাযুদ্ধের মহাবিনষ্টির পাপকলুষিত পরিণাম সম্মন্ধে সচেতন হয়ে উদাসীন হয়ে উঠছেন ধনঞ্জয় ? তাই কি আবার-করে ওই দ্বিতীয় অধ্যায়ের সাংখ্যযোগের কথাগুলির প্রায় পুনরুচ্চারণ ! 
"যে এনং বেক্তি হন্তারং যশ্চৈনং মন্যতে হতম।
উভৌ তো ন বিজানীতো নায়ং সঞ্চিত না হন্যতে।।" ২/১৯।।
অহংকারশূন্য, নিষ্কাম, সাংসারিক কাজে অনাসক্ত পুরুষ কর্ম করেন কিন্তু কর্মের দায় তাঁর উপর বর্তায় না। কারণ তিনি জানেন তাঁর আত্মা, যিনি তাঁর অন্তরেই বিরাজ করছেন তিনি কর্তা নন ; তিনি সাক্ষী মাত্র।
আমরা আবারও সেই উপনিষদের প্রজ্ঞায় প্রত্যাবর্তন করলাম। এই আত্মাকে উপলব্ধি করা যায় কি ভাবে? কেন উপনিষদ বলছেন,
"তস্যৈ তপো দমঃ কর্মেতি প্রতিষ্ঠা।।" এই জ্ঞান লাভ করা যায় তপস্যায়, আত্মসংযমে এবং নিবেদিত কর্মসাধনায়।
___________________________________ 

অষ্টাদশ অধ্যায়ের অষ্টাদশ বাণীতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আরও গভীর দার্শনিকতায় প্রবেশ করেছেন। বলেছেন,
"জ্ঞানং জ্ঞেয়ং পরিজ্ঞাতা ত্রিবিধা কর্মচোদনা।
করণং কর্ম কর্তেতি ত্রিবিধঃ কর্যসংগ্রহঃ।।" 

আমরা কর্ম করি কেন ? কি সেই সকল প্রবনতা যেগুলি আমাদেরকে কর্মে প্রণোদিত করে ? শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, দেখ সখা, জ্ঞান, জ্ঞেয় এবং জ্ঞাতা এই তিন অব্যক্ত ও ব্যক্ত প্রণোদনা কর্মের প্রেরণা প্রদান করে। যে অব্যক্ত চেতনার দ্বারা আমরা বিষয় বা পদার্থকে জানি তাই 'জ্ঞান'। জ্ঞানের বিষয়ীভূত বস্তু বা ভাব 'জ্ঞেয়'। যিনি চেতনার দ্বারা সে সকল জানেন তিনি 'জ্ঞাতা'। 'যে চেতনার' দ্বারা প্রাণিত হয়ে কর্মের প্রেরণা পাওয়া যায় তাই 'করণ', যিনি (পুরুষ) তা করেন তিনি 'কর্তা' এবং যা কৃত হয় তাই 'ক্রিয়া'। 'সাংখ্য' শাস্ত্রীয় মতে সমস্ত এই প্রকৃয়ার মূলে 'জ্ঞান'। 'জ্ঞানও' আবার 'সাত্ত্বিক', 'রাজসিক' এবং 'তামসিক' গুণযুক্ত হয়। যে জ্ঞান সর্বভূতে এক, অবিনাশী, অবিভক্ত পরমাত্মাকে দেখে সে জ্ঞান 'সাত্ত্বিক'। যে জ্ঞান সকল ভূতে ভিন্ন ভিন্ন ভাব এবং ভূতজগতকে পৃথক্ পৃথক্ রূপে জানে সে জ্ঞান রাজসিক। এবং দুর্বল যে জ্ঞান আপন ইন্দ্রিয়-সর্বস্ব, যুক্তি ও তত্ত্বহীন দেহকেই কার্যরূপ শরীর মনে ক'রে তাতেই আসক্ত হয় সেই জ্ঞান 'তামসিক'। হে অর্জুন, আরো শোন, কর্মের ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনি সত্ত্ব রজঃ তমঃ বিভাগ আছে। কর্তৃত্বাভিমানহীন, ফলাকাঙ্ক্ষাশূন্য, অনুরাগ ও দ্বেষহীন কর্ম সাত্ত্বিক, পরিশ্রমযুক্ত, অহংকারযুক্ত, ফলপ্রয়াসী কর্ম 'রাজস্বম উদাহৃতম্'। আর পরিণামশূ্ন্য, ক্ষয়কারী, অবিচার-অজ্ঞান দ্বারা কৃত এবং সামর্থ্যের বাইরে যে কর্মপ্রচেষ্টা তাই তামসিক।
কর্তার চরিত্র বর্ণনা প্রসঙ্গেও ঐরূপ বিভাজন করা হয়। যিনি নিরাসক্ত, নিরংহঙ্কার, ধৈর্যবান, ক্ষয়-ক্ষতি ও আনন্দ-শোকে নিস্পৃহ হয়ে কর্ম করেন তিনিই সাত্ত্বিক কর্তা। যিনি আসক্তিযুক্ত, ফলাকাঙ্ক্ষী, লোভী ও অশুদ্ধাচারী, শোকে-আনন্দে বিচলিত তিনি 'রাজসিক কর্তা।' আর তিনিই 'তামসিক কর্তা' যিনি অপ্রকৃতিস্থ, শিক্ষা-রহিত, অপরের জীবন-জীবিকা নষ্টকারী এবং "বিষাদী দীর্ঘসূত্রী চ কর্তা তামস উচ্যতে।" 
শ্রীভগবান বলেই চলেছেন, শোন অর্জুন, গুণত্রয়ের প্রবনতা অনুসারে 'বুদ্ধি' এবং 'ধৃতি'ও তিন তিন প্রকারের। "বুদ্ধের্ভেদং ধৃতেশ্চৈব গুণস্ত্রিবিধং শৃণু।" দেখ, জীবনের 'মার্গ' বা পথ, 'কর্তব্য-অকর্তব্য'-ভেদ ধারণা করা চাই।  যে পুরুষ প্রবৃত্তিমার্গ নিবৃত্তিমার্গ, কর্তব্য- অকর্তব্য, ভয় ও অভয়, বন্ধন ও মুক্তি -- এই সকল বিপরীতমুখী ধারণা তত্ত্বতঃ জানেন তিনি সাত্ত্বিকী বুদ্ধি সম্পন্ন। সমভাবে ঐ বৈপরীত্যগুলি সম্মন্ধে ধারণার অভাব বা অজ্ঞানতাই হোল 'রাজসী' -- "বুদ্ধি সা পার্থ রাজসী"। আর, বলা বাহুল্য, হে মহারথী, ঐ যে সাত্ত্বিক বুদ্ধির লক্ষণগুলি বলেছি সেগুলির অভাব, সেগুলির বিপরীত যা কিছু বুদ্ধি তা সবই 'তামসিক'।
এবার 'ধৃতির' উপরেও ওই তিনটি গুণের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। হে অর্জুন, 'ধৃতি' তাই যা মানুষের সত্ত্বাকে ধারণ করে। মানুষের মন প্রাণ ইন্দ্রিয়সমূহের ক্রিয়াগ্রামকে ধ্যানের দ্বারা সংযত রাখে, পরমাত্মা ভিন্ন অন্য বিষয় থেকে সংহত করে রাখে (ব্যাভিচার থেকে মুক্ত রাখে) "সা ধৃতিঃ সাত্ত্বিকী"। অন্যদিকে ধর্মকামার্থ, ফলাকাঙ্ক্ষী ধৃতি 'রাজসিক' এবং দুর্মেধা যাঁরা, তাঁরা নিদ্রা ভয় দুশ্চিন্তা দুঃখ ও মত্ততা পরিত্যাগ করতে সক্ষম হননা। তাঁদের ধৃতি 'তামসী'।
সুখও ত্রিবিধ। সাধকগণ দান যজ্ঞ ও সেবা কর্মের মধ্যে দিয়ে, দুঃখবিহীন 'সাত্ত্বিক সুখ' ভোগ করেন, যে সুখ প্রথম দিকের সংযম ও সাধনার ক্লেশের দ্বারা সিদ্ধ হয় ও পরিশেষে ভগবানের প্রসাদসুধা লাভ করে। 'রাজসিক' সুখ ক্ষণিকের এবং সে সুখের প্রাপ্তি ঘটে ইন্দ্রিয়ের ভোগের মাধ্যমে। পরিণামে যা বিষবৎ হয়ে ওঠে। 'তামস' সুখ আপন অন্তরস্থিত আত্মাকেই মোহগ্রস্ত করে রাখে। "নিদ্রালস্যপ্রমাদোত্থং তামসং উদাহৃতম্।"
কিন্তু হে সখা, এ কথা সত্য যে স্বর্গে মর্ত্যে এমন কোন প্রাণ নেই যে এই তিনটি গুণের প্রভাব থেকে মুক্ত।
ন তদস্তি পৃথিব্যাং বা দিবি দেবেষু বা পুনঃ।
সত্ত্বং প্রকৃতিজৈঃ মুক্তম্ যদেভিঃ স্যাৎ ত্রিভির্গুণৈঃ।।
_____________________________________

 
                   ব্যাখ্যা

কেননা এই জগৎপ্রকৃতির 'মায়া' দ্বারা আচ্ছন্ন। মায়া ত্রিগুণময়ী, এই জগৎ সংসার ত্রিগুণময়ী (সত্ত্ব রজঃ তমঃ) মায়ারই বিকার। অর্থাৎ যা আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সে সব 'বিকার' -- বিবর্তন-পরিবর্তনশীল। এই বিকারগ্রস্থ বিশ্বধারধণার পারে আছেন মহাচৈতন্যস্বরূপ পরমাত্মা বা 'ব্রহ্ম'। যুগাবতার শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবও বলতেন, 'ব্রহ্ম সত্য জগৎ মিথ্যা -- এইটে ধারণা কর'।               
এই 'মায়া' শব্দটিই অতি মায়াবী। আদি বেদের মধ্যে মায়া 'শব্দটি' আছে। কিন্তু পরবর্তীতে বেদান্ত বা উপনিষদে মায়া বিষয়ে তেমন আলোকপাত করা হয়নি। আরো পরে শঙ্করাচার্য এই মায়ার উপর বিপুল চিন্তা আরোপ করেছেন। সে ব্যাখ্যা অতলান্তিক। এবার বাংলার শঙ্করাচার্য পরমহংদেবের পরম শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দও মায়া ও মায়াবাদের অতি দীর্ঘ কিন্তু প্রাঞ্জল ভাষায় বর্ণনা করেছেন। তাঁর লেখা থেকেই কিছু অংশ উদ্ধার করছি।
"বেদান্ত বলিতেছে, মঙ্গল ও অমঙ্গল উভয়ের মূল্য সমান। ইহারা এইরূপে পরস্পর-সম্মন্ধ হইয়া রহিয়াছে। সংসার এইরূপ জানিয়া সহিষ্ণুতার সহিত কর্ম কর। কি জন্য কর্ম করিব ? (সাংঘাতিক প্রশ্ন)। যদি সংসারের অবস্থা এইরূপ তবে আমরা কি করিব ? অজ্ঞেয়বাদী হই না কেন? ('অজ্ঞেয়বাদ' বলে যে ঈশ্বরের অস্তিত্ব 'আছে বা নেই' তার প্রমাণ করা যায় না ; অতএব জানারও প্রয়োজন নেই। Spencer-এর  Agnosticism একটি গভীর দর্শনতাত্ত্বিক বিষয়।) আধুনিক অজ্ঞেয়বাদী জানেন, এ রহস্যের মীমাংসা নাই ; বেদান্তের ভাষায় বলিতে গেলে --- এই মায়াপাশ হইতে অব্যাহতি নাই। অতএব কর্ম কর এবং সন্তুষ্ট থাকিয়া জীবন ভোগ কর। এখানেও একটি অতি অসঙ্গত মহাভ্রম রহিয়াছে। তুমি যে জীবন দ্বারা পরিবৃত রহিয়াছ, সেই জীবন সম্মন্ধে তোমার জ্ঞান কিরূপ ? জীবন বলিতে তুমি কেবল পঞ্চেন্দ্রিয়ে আবদ্ধ জীবনই বুঝ ? ইন্দ্রিয়জ্ঞানে আমরা পশু হইতে সামান্য ভিন্ন। আমি বিশ্বাস করি, এখানে উপস্থিত এমন কেহ নাই, যাঁহার জীবন কেবল ইন্দ্রিয়েই আবদ্ধ। আমাদের বর্তমান জীবন বলিতে ইন্দ্রিয় অপেক্ষা আরো কিছু বেশী বুঝায়। আমাদের সুখ দুঃখের অনুভব, উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং চিন্তাশক্তিও তো আমাদের জীবনের প্রধান অঙ্গ ; আর সেই উচ্চ আদর্শ ও পূর্ণতার দিকে অগ্রসর হইবার কঠোর চেষ্টাও কি আমাদের জীবনের উপাদান নহে ? অজ্ঞেয়বাদীদের মতে জীবন যেভাবে আছে, সেইভাবেই উহা ভোগ করা কর্তব্য ( আমাদের লোকায়ত চিন্তা ও চার্বাক দর্শনেরও ওই একই মত)। কিন্তু জীবন বলিলে আদর্শ -অন্বেষণের --- পূর্ণতা অভিমুখে অগ্রসর হইবার প্রবল চেষ্টাও বুঝায়। আমাদের এই আদর্শ লাভ করিতেই হইবে। অতএব আমরা অজ্ঞেয়বাদী হইতেই পারি না। অজ্ঞেয়বাদী জীবনের আদর্শভাগ বর্জন করিয়া বাকিটুকু সর্বস্ব বলিয়া গ্রহণ করেন। আদর্শ লাভ করা অসম্ভব জানিয়া তিনি ইহার অন্বেষণই পরিত্যাগ করেন। এই প্রকৃতিকে (পরিদৃশ্যমান ও প্রলুব্ধকর ভোগসর্বস্বতাকে) -- এই জগৎপ্রপঞ্চকেই তো বলে মায়া। বেদান্তমতে ইহাই প্রকৃতি।"
                       'জ্ঞানযোগ' -- স্বামী বিবেকানন্দ।

 
যাই হোক্, এই 'মায়া'-র ধারণা অত্যন্ত জটিল, যাকে কেন্দ্র করে পক্ষে ও বিপক্ষে অসংখ্য মনীষী ও দার্শনিক দের মতামত ব্যক্ত হয়ে আছে শত সহস্র গ্রন্থে। তবে 'ব্রহ্ম সত্য ; জগৎ মিথ্যা' -- আচার্য শঙ্করের এই কথাটি যখন উচ্চারিত হয়, তখন এই যে 'পরিদৃশ্যমান ও প্রলুব্ধকর ভোগসর্বস্ব' জগৎ বা প্রকৃতি তা যে মিথ্যা ও মায়াবৃত এইটি ধারণা করা কেবলমাত্র দুরূহ নয়, অসম্ভব। যদি করি তবে কি কোন্ 'আশ্রয়ে' জীবন অতিবাহিত হবে? জীবনের আদপেই কোন 'অস্তিত্ব' থাকবে কি না, এবং এই জগতের জাগতিক মায়া কাটালে জীবনের 'অবস্থান' কোথায় হবে ? শ্রীমদ্ভগবদগীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ে সেই সকল গূঢ় প্রশ্নের উত্তর আছে।
_____________________________________
এরপর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বর্ণাশ্রম ধর্মের আলোচনায় প্রবৃত্ত হলেন। বললেন, হে পরন্তপ অর্জুন, এই যে মানুষের মধ্যে চারটি বর্ণ বা জাতির সৃষ্টি হয়েছে তা কিন্তু অসম্মানের উদ্দেশ্যে নয়। এই বিভাগ তাদের স্বভাব থেকে উৎপন্ন গুণের নিরিখেই হয়েছে।

"শমো দমস্তপঃ শৌচং ক্ষান্তিঃ আর্জবমে চ।
জ্ঞানম্ বিজ্ঞানম্ আস্তিক্যম্ ব্রহ্মকর্ম স্বভাবজম্।।"

অন্তঃকরণের সংযম, ইন্দ্রিয়দমন, চিত্তের শুদ্ধি, তপস্যা, ক্ষমা, মনের ও শরীরের সরল প্রকাশ, আস্তিক বুদ্ধি (পরমাত্মা ভগবানে বিশ্বাস), জ্ঞান-বিজ্ঞান সাধন এবং ব্রাহ্মণের সাধারণ ক্রিয়াকর্মে (পঠন পাঠন দান ধ্যান নিধিধ্যাসন ইত্যাদি) যাঁরা প্রবৃত্ত ও ব্যাপৃত থাকেন তাঁরা ব্রাহ্মণ।  শৌর্য, তেজ, ধৈর্য যাঁদের চরিত্রগুণ, যুদ্ধে যাঁরা পরাম্মুখ নন, দানে যাঁরা মুক্তহস্ত এবং প্রভুত্বের ভাবে যাঁরা বলিষ্ঠ তাঁরা 'ক্ষত্রিয়'। 'বৈশ্যদের' কর্ম কৃষিকাজ, গোপালন, ব্যবসা, বাণিজ্যরূপ সদ্ব্যবহার। এবং 'শূদ্র' যাঁরা তাঁদের কাজ অপর তিন বর্ণের প্রতি পরিসেবা প্রদান করা। "পরিচর্যাত্মকম্ কর্ম শূদ্রস্যাপি স্বভাবজম্।"
_________________________________________

আর্য ব্রাহ্মণ্যবাদী বা ব্রাহ্মণ-প্রধান ধর্মধারণার বশবর্তী এই বর্ণাশ্রমবাদের উক্ত বাক্যটির আলোচনা ও ব্যাখ্যা, পক্ষে ও বিপক্ষে, ভারতবর্ষের এক বিপুল গণসমাজকে আহত করেছে এবং তাদের মনে গভীর হীনমন্যতাবোধ যুগপৎ অন্তরগ্লানির সঞ্চার করেছে যা আজিও দুর্মোচনীয়। পরিণামে ভারতীয় সমাজে অনৈক্য, বহিরাক্রমণ ও ধর্মান্তরিতকরণ অনিবার্য ও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছিল, এবং যা আজও অব্যাহত আছে।
(এ প্রসঙ্গে বিশদে আলোচনা করার ইচ্ছা রইল)। (১)
____________________________________ 

বর্ণভিত্তিক সমাজ বিভক্তির বিষয়ে আরো যা যা বলেছেন শ্রীকৃষ্ণ সেগুলিকেও সেই কালে কর্মাধিকার নির্দিষ্ট করবার ক্ষেত্রে অস্বীকার করা যায়নি বা হয়নি। তিনি বলছেন, 

"স্বে স্বে কর্মণ্যভিরতঃ সংসিদ্ধিং লভতে নরঃ।
স্বকর্মনিরতঃ সিদ্ধিং যথা বিন্দতি তৎ শৃণু।।" ১৮/৪৬।।

যেমন স্বাভাবিক প্রবৃত্তি অনুসারে মানুষ সংসিদ্ধি (ভগবৎপ্রাপ্তি) লাভ করে, তেমনি নিজ নিজ কর্মের সাধনা করেও মানুষ পরম সিদ্ধিকেই প্রাপ্ত হয়। যে পরমাত্মা থেকে সমস্ত ভূতসংসারের উৎপত্তি হয়েছে এবং যাঁর দ্বারা এই জগৎ সংসার ব্যাপ্ত হয়ে আছে নিজ নিজ কাজের মধ্য দিয়েই মানুষ তাঁর পূজা করে ও পরম আনন্দ লাভ করে। অন্যের কাজ, যদি উত্তম গুণেরও হয় তবুও নিজের কাজ (গুণরহিত হলেও) শ্রেষ্ঠ। স্বধর্মের কাজ করলে মানুষ পাপক্লিন্ন হয় না-- "ন আপ্নোতি বিল্বিষম্।" হে কোন্তেয়, স্বধর্ম যেমন সহজধর্ম, ঠিক তেমনি স্বকর্ম সহজ ও স্বভাবজ কর্ম। সে কাজ ত্যাগ করবে না। তা দোষযুক্ত হতেও পারে ; কেননা কোন কর্মই দোষমুক্ত হতে পারে না। যেমন ধোঁওয়ার দ্বারা অগ্নি আবৃত থাকে, ঠিক তেমনি সকল কাজ কোন না কোন দোষের দ্বারা আবৃত। (প্রথম অধ্যায়ে বিষাদ যোগে অর্জুন যেভাবে 'আত্মীয়নিধনের' মত কর্মে নিদারুণ নৃশংসতার কথা বলেছিলেন, এই অষ্টাদশ অধ্যায়ে এসে শ্রীকৃষ্ণ কি আরেকবার অর্জুনের 'ক্ষাত্রধর্মের' কর্তব্যের উল্লেখ করে বলছেন, "সহজং ধর্ম কৌন্তেয় সদোষমপি না ত্যজেৎ।" এই স্বজন হত্যা নৃশংস হলেও তার তোমার স্বধর্ম। 

১৮/৪৯ শ্লোকে আবার ভগবান শ্রীকৃষ্ণ 'সাংখ্য যোগ'-এ প্রত্যাবর্তন করেছেন। বলছেন, কর্মযোগের বিপরীত নৈষ্কর্ম্য। যেহেতু শুদ্ধচৈতন্য পরমাত্মা ক্রিয়ারহিত, তাই তাঁকে প্রাপ্ত হতে যে যোগাভ্যাস প্রয়োজন তাই হোল সাংখ্যযোগ, (আদি সাংখ্যের যা বিপরীত) আসক্তিশূন্য,স্পৃহারহিত, আত্মজয়ী সন্নাসী সেই 'নৈষ্কর্ম্য' সিদ্ধি লাভ করে। (এখানে 'সন্ন্যাসেন' শব্দটি 'সাংখ্য'মতের কি না তাতে সংশয় আছে)। আবার পরবর্তী বাণীত জ্ঞানযোগের কথা বলছেন। বলছেন অন্তঃকরণের শুদ্ধির দ্বারা যেমন ব্রহ্মলাভ হয় তেমনি হে কৌন্তেয়, পরম নিষ্ঠাসহযোগে আরাধিত  'জ্ঞানযোগেও' ব্রহ্মোপলব্ধি হয়। কিন্তু সে আরাধনা অতি কঠিন।
"বুদ্ধ্যা বিশুদ্ধয়া যুক্তো ধৃত্যাত্মানং নিয়ম্য চ।
শব্দাদীন্ বিষয়ান্ ত্যক্ত্বা রাগদ্বেষৌ বুদস্য।।
বিবিক্তসেবী লঘ্বাশী যৎবাককায়মানসঃ।
ধ্যানযোগপরো নিত্যং বৈরাগ্যং সমুপাশ্রিতঃ।।"
বিশুদ্ধবুদ্ধি যে মানুষ, নির্জনে থেকেও যিনি দেশের দশের সেবা করেন, যিনি স্বল্পাহারী, কায়মনোবাক্যে যিনি অতি সংযমশীল, বৈরাগ্য সাধনায় সিদ্ধ, যোগধ্যানে মগ্ন, স্বাত্ত্বিক ধারণায় ঋদ্ধ, যাঁর অন্তঃকরণ বশীভূত, যিনি শব্দসংযত এবং অনুরাগ ও বিদ্বেষবিহীন ; যিনি বল, দর্প, কাম, ক্রোধ হতে মুক্ত, সঞ্চয়-সংগ্রহ যিনি পরিত্যাগ করেছেন, মমতার মোহে যিনি বদ্ধ নন তিনিই সেই 'সৎ-ন্যাসী' পুরুষ এবং ব্রহ্মে একীভূত হয়ে যাবার সাধনায় সিদ্ধ হন। এমত জীবন-সাধনায় সিদ্ধ হয়ে ব্রহ্ম বা পরমাত্মায় একীভাবে স্থিত হয়ে, কামনাহীন, শোক-দুঃখ হীন, সমস্ত প্রাণে ও পদার্থে সমভাব অবলম্বন করেন যিনি তিনিই 'পরম নৈষ্কর্ম্য'রূপ সিদ্ধি লাভ ক'রে, সাধনমার্গে "মদ্ভক্তিং লভতে পরাম্।" 
পরমাত্মায় বা পরমব্রহ্মরূপ 'আমাকে' প্রাপ্ত হবার এই সাধনায় প্রথমত 'তত্ত্বতঃ' জানতে হবে। স্বরূপতঃ আমি (ব্রহ্ম) যা এবং আমার যা প্রভাব ( ব্রহ্মাণ্ডব্যপ্ত চৈতন্যের লীলা) -- তত্ত্বতঃ (অর্থাৎ জ্ঞানযোগের দ্বারা কেননা 'প্রজ্ঞানন্দ ব্রহ্ম') যিনি উপলব্ধি করেছেন তিনি আমাতে, 'সচ্চিদানন্দঘন পরমাত্মায়' লীন হয়ে যান -- "বিশদে তদনন্তরম্।"  তখন সেই সাধক আমার ভক্ত, আমাতেই তাঁর বিলয় ও মুক্তি। তাই হে অর্জুন, ভক্ত যিনি ভক্তি তাঁর অনন্যা, ভক্তি তাঁর অব্যভিচারিণী। তিনি কর্ম করুন আর নাই করুন, তাঁর যোগ আমার সঙ্গে। জগতের সকল কর্মের (আমারি মত) কর্তা তিনি ; কিন্তু নির্লিপ্ত, নির্বিকার, নিরাসক্ত। অতএব, হে সখা,
চেতসা সর্বকর্মাণি ময়ি সন্ন্যস্য মৎপরঃ।
বুদ্ধিযোগমুপাশ্রিত্য মচ্চিত্তঃ সততং ভব।। ১৮/৫৭
এই হোল ভগবানের সারকথা --- মহাবাণী। শ্রীকৃষ্ণ এখানে সেই পরম পুরুষ যাঁর উপরে আর কিছু নাই।
"পুরুষাৎ না পরং কিঞ্চিৎ সা কাষ্ঠা সা পরা গতিঃ।। এই পুরুষের থেকে আর ঊর্ধতর কিছু নাই ; ওই পুরুষেই '(পরমব্রহ্মরূপ মহাচৈতন্য") আমার সকল কিছুর বিলয়। (-- কঠ উপনিষদ)। সুতরাং তুমি, হে রথীশ্রেষ্ঠ, ভক্তিযোগে "মতিচ্চ সততং ভব"-- নিরন্তর মদ্গতচিত্ত হয়ে যে কাজে, যে স্বধর্মে তুমি নিযুক্ত, নিষ্কামনায়, নিষ্প্রশ্নে তাই কর। (ভগবানের) আমার দ্বারাই সমস্ত দুর্গতি থেকে উদ্ধার, আমার আদেশ প্রতিপালনে বিমুখ হলেই অধোগতি অনিবার্য। 'অহংকারাৎ না শ্রোষ্যসি 'বিনঙ্ক্ষ্যাসি'।
শ্রীকৃষ্ণের আদেশে এমন কঠোরতা কি এই কারণেই যে অর্জুন এখনো কিংকর্তব্যবিমূঢ় ? তাই কি শ্রীকৃষ্ণ পরবর্তী আজ আজ্ঞায় বলছেন, শোন অর্জুন, তুমি যে 'অহংকারকে' অবলম্বন করে মনে করছ 'আমি এই যুদ্ধভূমি ত্যাগ করব' -- যা মিথ্যা প্রতিপন্ন হবে ; কারণ তোমার স্বভাব তোমাকে বাধ্য করবে বিপক্ষনাশে প্রবৃত্ত হতে। 

"যদহংকারমাশ্রিত্য না য্যোৎস্য ইতি মন্যসে।
মিথ্যৈষ ব্যবসায়স্তে প্রকৃতিস্তাং নিযোক্ষ্যতি।।"

(এখানে 'অহংকার' শব্দের অর্থ 'আমি যুদ্ধ নামক কর্মের কর্তা' -- এই ভাব। আর 'প্রকৃতি' শব্দের অর্থ স্বভাব বা ক্ষত্রিয়ের সহজাত প্রবনতা)। পরে আবারো বলছেন, হে কোন্তেয়, মোহযুক্ত হয়ে যে কর্মে তুমি অনিচ্ছা প্রকাশ করছো, নিজস্ব স্বভাবজাত কর্মপ্রেরণায় প্রাণিত হয়ে, কর্মের দ্বারাই বদ্ধ হয়ে তোমাকে সে কাজ করতেই হবে। 

"ধর্মরাজ দিল যবে ধংসের আদেশ
আপন হত্যার ভার আপনিই নিল মানুষেরা।" 
                              ----- রবীন্দ্রনাথ।

নিরুপায় অর্জুন ! এবার আরো কঠোর, আরো আত্মশ্লাঘানাশকারী নির্মম 'বাণী,' যেন বাক্যবাণ,
ওহে অর্জুন, তুমি কে ? তোমার শরীর এক যন্ত্রমাত্র। এই শরীররূপ যন্ত্রে অন্তর্যামীরূপ পরমেশ্বর আরূঢ় আছেন। সমস্ত ভূতবর্গকে (প্রাণীকে) তাদের ক্রমানুসারে পরিচালিত করাবার জন্যে প্রাণীগণের হৃদয়ে যিনি বাস করেন তিনিই সারথী --- রথীর কাজ সারথী নিয়ন্ত্রণ করেন। সেই 'সত্য' ধারণ করে  অহমভাব ত্যাগ করে, পরমেশ্বরের আশ্রয় অবলম্বন কর -- "তমেব শরণং গচ্ছ সর্বভাবেন ভারত" ; তার ফলেই, তাঁর প্রসাদে পরম শান্তির আশ্রয় লাভ করবে--পরম্ শান্তিং স্থানং প্রাপ্সসি শাশ্বতম্।।" 

এই  অষ্টাদশ অধ্যায়টি দু'টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। অষ্টাদশ পর্ব- (অংশ-এক), অষ্টাদশ পর্ব-(অংশ-দুই)। পরবর্তী অংশ শ্রীমদ্ভগবদগীতায় অর্জুন-পর্ব ১৮ (অংশ-দুই)।
___________________________________















কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...