মঙ্গলবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০২৫

শ্রীমদ্ভগবদগীতায় অর্জুন-পর্ব ১৮ (অংশ ২)

 শ্রীমদ্ভগবদগীতায় অর্জুন-পর্ব ১৮ (অংশ-দুই)
               অষ্টাদশ অধ্যায়
               মোক্ষসন্ন্যাসযোগ
অষ্টাদশ অধ্যায়ের ৬২ তম শ্লোক, যা পর্ব-১৮ (অংশ-এক)-এ আলোচিত হয়েছে, তার শেষ বক্তব্যটি ছিল কঠোর আদেশ। শ্রীকৃষ্ণ স্পষ্ট বলছেন, 'অনন্যভাবে', আমাকে স্মরণ কর এবং আমাতেই শরণ (আশ্রয়) নাও ; কেননা পরমাত্মার কৃপাতেই পরম শান্তি এবং প্রার্থিত পরম ধাম বা স্বর্গ লাভ হবে। (স্মরণীয়, বৈষ্ণব পদাবলীর সেই অপূর্ব কথাগুলি --
    "কত চতুরানন    মরি মরি যাওত
        ন তুয় আদি অবসানা।
      তোহে জনমি পুনঃ    তোহে সমাগত
           সাগর লহরি সমানা।।"
                                    ---- বিদ্যাপতি।
স্মরণ করতেই হবে এজন্যই যে এখন যেন শ্রীমদ্ভগবৎ পুরাণের 'ভক্তিবাদের' সচ্চিদানন্দঘন শ্রীকৃষ্ণের মূর্তি ভক্তের হৃদয় মন্দিরে প্রতিভাসিত)। অর্থাৎ তোমার, হে অর্জুন, ইচ্ছার কোন যথার্থতা নেই। আমি যা বলেছি, তাই কর। এবং এতক্ষণ ধরে যে উপদেশুলি তিনি দিলেন সে সবের উপসংহারে তিনি বললেন,

"ইতি তে জ্ঞানমাখ্যাতং গুহ্যাদ্ গুহ্যতরং ময়া।
বিমৃশ্য এতৎ অশেষেন যথেচ্ছসি তথা কুরু।।"

হে বীরশ্রেষ্ঠ পার্থ, গোপনীয় হতেও অতি গোপনীয় জ্ঞান আমি তোমার কাছে, সুদীর্ঘ ভাষণে ব্যক্ত করলাম। এই রহস্যময়, গূঢ়তাপূর্ণ জ্ঞানকে সম্পূর্ণরূপে বিচার করে (বিমৃশ্য), এবার তোমার যা ইচ্ছা তাই কর -- "যথা ইচ্ছসি তথা কুরু।" (এখানে আর অর্জুনের 'ইচ্ছা' কোথায় ? এখন তিনি শ্রীকৃষ্ণে 'সমাগত')।
____________________________________
                      ব্যাখ্যা
মনে রাখতে হবে স্বয়ং ভগবানের দ্বারা উক্ত এই নিগূঢ়, রহস্যাবৃত, গুপ্ত জ্ঞান অভিব্যক্ত হয়েছে হিংসাদীর্ণ, ক্রোধতপ্ত, আত্মজনের বধ্যভূমি সমর প্রাঙ্গণে -- 'কুরুক্ষেত্রে'। (যা কুরুরাজ ধৃতরাষ্ট্র প্রথম এবং একমাত্র শ্লোকে 'ধর্মক্ষেত্র' বলেছেন। এই 'ধর্মক্ষেত্র' শব্দের বহুকাল ধরে, বহু বিদ্বান-পণ্ডিতের দ্বারা, বহুবিধ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তবে এমনও হতে পারে যে এখানে ধর্ম শব্দের অর্থ স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। অর্থাৎ 'যুদ্ধ' যদি ক্ষত্রিয়ের 'স্বভাবজম্ ধর্ম' হয় তবে যুদ্ধের ক্ষেত্রটিও ধর্মক্ষেত্র। রাজা ধৃতরাষ্ট্র অবশ্যই কামনা করেছিলেন যে তাঁর পুত্ররাই পরিণামে বিজয়ী হয়ে পাণ্ডববর্জিত কুরুরাজ্য প্রতিষ্ঠা করবেন এবং তিনি পাণ্ডবনিধন যুদ্ধকে 'ধর্মযুদ্ধ' নামেই প্রজাদের মধ্যে প্রচার করতে সক্ষম হবেন। ঐতিহাসিক কাল থেকে রাজতন্ত্রের বহমান ইতিবৃত্তে এমন প্রমাণ অসংখ্য আছে)।
_____________________________________
যাই হোক্, আমরা দেখেছি অষ্টাদশ অধ্যায়ের প্রথম (শ্লোকে) উচ্চারণে শ্রীকৃষ্ণের প্রতি শ্রদ্ধাভাববিমোহিত অর্জুনের জিজ্ঞাসা ছিল 'সন্ন্যাস ও ত্যাগের' তত্ত্ব- সম্মন্ধীয়। তার পর থেকে বাষট্টিটি শ্লোকে অবিরাম তত্ত্বালোচনায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে মানুষের সামাজিক বর্ণানুমোদিত কর্ম ও গুণভিত্তিক ধর্মের (সত্ত্ব রজঃ তমঃ) অনুপুঙ্খিক বিবরণ ও ব্যাখ্যা দিয়ে গিয়েছেন। অর্জুন ছিলেন নির্বাক শ্রোতা। স্তব্ধবাক, নিরুত্তর অর্জুনের মনের মধ্যে অবশ্যই কিছু অনুক্ত প্রশ্ন ছিল। কেননা তাঁর প্রথম জিজ্ঞাসার মধ্যে ছিল মানবীয় প্রবনতাগুলি সমস্ত পরিত্যাগ করে, সন্ন্যাস গ্রহণের পর এই সর্বস্ব ধংসাত্মক যুদ্ধের কি বা প্রয়োজন ? মনে হয় স্বয়ং পরমাত্মার বিগ্রহ সখা কৃষ্ণের সম্মুখে তিনি এতই বিস্ময়বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন যে তিনি রইলেন নিস্তব্ধ, নিশ্চল, নিরুৎসাহিত। তাঁর এই নিষ্প্রাণ অবস্থা লক্ষ্য করেই শ্রীকৃষ্ণ উপসংহারে বললেন, 'এখন তোমার যা ইচ্ছা হয় তাই কর।' কিন্তু পরক্ষণেই পরম সখার নীরবতায় ব্যথিত হয়ে (শিষ্যের মৌনতার বেদনায় সমব্যাথী হয়ে আচার্য যেমন পুনরুচ্চারণের ক্লেশ স্বীকার করেন) তিনি অর্জুনের প্রতি কৃপাপরবশ হয়ে পড়েন এবং বলেন, গোপন হতেও যা গোপনীয় আমার এযাবৎকালের বচন তুমি আবার শোন, উপলব্ধি করবার চেষ্টা কর। কেননা তুমি যে আমার প্রিয়তম সুহৃদ, তোমার হিতসাধনের জন্যই তো আমি হিতকারক কথাগুলি বলব, -- "বক্ষ্যামি তে হিতম।।"
দেখ সখা, তোমার মৌনভাবে আমি সংশয়িত। তাই তোমাকে বলছি যদি পরমাত্মার সাধনার অতি সূক্ষ্ম, জটিল, গূঢ়, দুর্বোধ্য, দুরাচরণীয় ও অচিন্ত্যনীয় জ্ঞানমার্গ অবলম্বন করতে না পার তবে আমাকেই অবলম্বন কর। আমার শরণ নাও, আমাতেই তোমার সত্তাকে অর্পণ কর, আমার ভক্ত হয়ে যাও, 

"মন্মনা ভব মদ্ভক্তো মদযাজী মাং নমস্কুরু।
মামৈবৈষ্যসি সত্যং তে প্রতিজানে প্রিয়োহসি মে।।"

অবিচল মনে আমাকেই চিন্তা কর, তোমার সকল ভক্তি আমাতেই অর্ঘ্য দাও। আমার যে বিশ্বরূপ তোমাকে দেখিয়েছি, বা তোমার প্রার্থনায় যে (বিষ্ণু) নারায়ণরূপে তোমার কাছে অবতীর্ণ হয়েছি সেই আমাকেই তুমি ভজনা কর, জগৎ সংসারের শক্তি, বিভূতি, ঐশ্বর্য ও সমস্ত স্বাত্ত্বীক গুণের বিগ্রহরূপে আমাকে জেনে নিত্য প্রনত হলেই আমাকে সত্য সত্যই প্রাপ্ত হবে। এতক্ষণ যত ধর্মমত, যত ধর্মপথের কথা বলেছি, বা তুমি অপরাপর আচার্যদের কাছে শুনেছ সে সকল যদি অনুসরণ করতে নাও পারে তবে কেবল এবং কেবলমাত্র আমাকে শরণ (আশ্রয়) করে ধর্মপথ, কর্মপথ ও জীবনপথে অগ্রসর হও। এরপর সেই বহু আলোচিত মহাবাণী,
"সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ।
অহম্ ত্বা সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ।।"
আমাতে (পরমাত্মায়) আশ্রয় নিলে আমি তোমাকে সকল পাপ থেকে (স্বজন-হনন মহাপাপ থেকে) মুক্ত করব, মোক্ষ প্রদান করব ; আত্মজন, বন্ধু পরিজনদের মৃত্যুর জন্য শোক করো না -- "মা শুচঃ।"

বস্তুত অষ্টাদশ অধ্যায়ের এই ছেষট্টিতম বাণীটি শ্রীমদ্ভগবদগীতার উপসংহারের 'উপসংহার', যে বাণী শ্রীকৃষ্ণকে সমগ্র বিশ্বের ঈশ্বরভক্তদের হৃদয়ে ভগবানরূপে চিরপ্রতিষ্ঠিত করেছে, এবং বৈষ্ণবধর্মের আরাধ্য, একমাত্র আরাধ্য দেবতার আসনে প্রতিস্থাপন করে কৃষ্ণভক্তকুল তাঁর করে পূজা করে চলেছেন। বেদান্তধর্মের যে নিরাকার, নির্বিকার, অচ্যুত, অপরিজ্ঞেয়, সচ্চিদানন্দঘন পরমাত্মা -- সেই রূপ বৈষ্ণবীয় সাধনায় শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্ম-ধারী নারায়ণ এবং পীতাম্বরবাস বনমালী, ময়ূরপুচ্ছচূড় বংশীধারী, রসময় রাসবিহারী শ্যামরায়। সে এক 'অখিলরসামৃতমূর্তি' সাকার ঈশ্বরসাধনার অপরূপ ধর্মদর্শন। (এ প্রসঙ্গে দীর্ঘ দীর্ঘ আলোচনার অবকাশ আছে, যদি "মতি রহু তুয়া পরসঙ্গ"।)

যাই হোক্, এবার পরবর্তী বাণীনিচয়ে তিনি শ্রীমদ্ভগবদগীতারূপ মহাগ্রন্থের পাঠ, প্রচার ও ফলপ্রাপ্তি সম্মন্ধে বলছেন, দেখ অর্জুন, এই যে গীতারূপ পরম রহস্য তোমার হিতসাধনের নিমিত্তে, তোমার নিকটে বর্ণিত হোল তা সেই সকল মানুষদের কাছে বলা উচিত নয় যারা তপরহিত, ভক্তিহীন, ভগবৎকথায় অনাগ্রহী এবং 'আমার' নিন্দুক -- "ন চ মাম যঃ অভ্যসূয়তি।" কিন্তু যে পুরুষ (প্রাচীন বৈদিক ও সংস্কৃত শব্দ 'পুরুষ' অর্থে মানব মানবী দুইই বোঝায়। বেদান্ত মীমাংসায় পুরুষের 'স্বভাব' হলেন 'প্রকৃতি' অর্থাৎ নারী।) যাঁরা আমার প্রেমে আসক্ত, যাঁরা আমার ভক্ত অবশ্যই তাঁদের কাছে 'আমার' আলোচনা করবে। তাঁরা নিঃসংশয়ে আমাকে আপন করে পাবে -- "মামেবৈষ্যত্যসংশয়ঃ।" এই গীতার বাণী শ্রবণেচ্ছু যাঁরা তাঁরা আমার প্রিয় ; তাঁরা যেহেতু দিবারাত্র আমাতেই মগ্ন থাকেন, তাই তাঁদের চাইতে আমার আর প্রিয়তর কেও নেই। হে প্রিয়তম অর্জুন, এই কথা যেন প্রচারিত হয় -- 'যে পুরুষ আমাদের এই গীতার কথন, তোমার আমার আলাপন (কৃষ্ণার্জুন সংবাদ) শোনেন তিনি মৎকথিত জ্ঞানযজ্ঞেরই ফল লাভ করবেন ; আমি তাঁর দ্বারা পূজিত -- "জ্ঞানযজ্ঞেন তেনাহমিষ্টঃ স্যামিতি মে মতিঃ।।"  এই গীতাশ্রবণে যিনি অনুরক্ত, শুধু শ্রদ্ধাযুক্ত হয়ে শ্রবণমাত্র করেন, তিনিও সর্বপাপ মুক্ত হয়ে শ্রেষ্ঠলোক (দেবলোক) প্রাপ্ত হন।
এবার অর্জুন, তুমি বল, আরম্ভ থেকে শেষ, আমার সকল বাণী গুলি তুমি একাগ্র চিত্তে শ্রবণ করেছ ? তাতে তোমার অজ্ঞান-সম্ভূত মোহ কি বিনষ্ট হয়েছে? 
____________________________________
                      ব্যাখ্যা
কী অপূর্ব আন্তরিক, সহানুভূতিময়, সুহৃদসুলভ প্রশ্ন ! সত্যিই তো, এই দ্বন্দ্বসঙ্কুল যুদ্ধক্ষেত্রে, কর্তব্য-অকর্তব্য দ্বিধায় দীর্ণ, আসন্ন মহাসর্বনাশের আশঙ্কায় আশঙ্কিত, একজন মানুষই তো অর্জুন। সখা কৃষ্ণ বিশ্বরূপ ধারণ করে, যে মুহূর্ত থেকে তাঁর কাছে 'জগদীশ্বর' রূপে অবতীর্ণ হয়েছেন, সেই সময় থেকেই অর্জুন বিস্ময়বিহ্বল। সেই মানসিক অবস্থায় ভগবানের শ্রীমুখনিঃসৃত গভীর, গুহ্য, কঠোর সাধনোচিত ধর্মদর্শন ও জীবনাচরণের বাণী আত্মস্থ করা যে দুরূহ তা অর্জুনের অব্যক্ত বিহ্বলতা দেখে শ্রীকৃষ্ণ অনুভব করেছিলেন বলেই জিজ্ঞাসা করলেন, "কচ্চিদজ্ঞানসম্মোহঃ প্রনষ্টস্তে ধনঞ্জয়।।"            অজ্ঞানরূপ মোহ দূর হয়েছে কি তোমার, হে ধনঞ্জয় ?
                        
কিন্তু প্রশ্ন, সত্যই কি  অর্জুন মোহমুক্ত হতে পেরেছিলেন ? না কি শ্রীকৃষ্ণের সেই বিশ্বগ্রাসী, বিশ্বব্যাপী বিশ্বরূপ দেখার পর থেকে অর্জুনের আর কিছুই করনীয় ছিল না। (যদিও এই বিষয়ে ক্ষণপূর্বেই আমরা আলোচনা করেছি, তবুও কৃষ্ণার্জুন সংবাদের কিছু অংশ মহাভারতের 'ভীষ্মপর্ব' থেকে এখানে উদ্ধার করবার চেষ্টা করবো, যেখানে অর্জুন ছিলেন নিরুপায়, সাক্ষাৎ মহাকালের রথারূঢ় ক্রীড়নক মাত্র।
মহাভারতের ভীষ্মপর্বে 'গীতার' গ্রন্থনা। ভীষণ যুদ্ধে, অবশ্যম্ভাবী নরসংহারের নিমিত্তে কৃষ্ণ অর্জুনকে যে কথাগুলি বললেন সেগুলি ঘোর বিনাশাত্মক। অর্জুন যখন বললেন, "বল, কে তুমি উগ্ররূপ ? তোমাকে নমস্কার ? হে দেবেশ, প্রসন্ন হও, তুমি আদি স্বরূপ, তোমাকে জানতে ইচ্ছা করি ; তোমার প্রবৃত্তি বুঝতে পারছি না।
তখন ভগবান বললেন, আমি 'লোকক্ষয়কারী কাল' ! এখানে যে যোদ্ধারা সমবেত হয়েছে, তুমি না মারলেও তারা মরবে। আমি পূর্বেই তাদের মেরেছি ; সব্যসাচী, তুমি নিমিত্তমাত্র হও। ওঠ, যশোলাভ কর, শত্রু জয় করে সমৃদ্ধ রাজ্য ভোগ কর।
অর্জুন বললেন, হে সর্ব, তোমাকে সহস্রবার সর্বদিকে নমস্কার করি। তোমার মহিমা না জেনে প্রমাদবশে বা প্রণয়বশে তোমাকে কৃষ্ণ, যাদব ও সখা ব'লে সম্বোধন করেছি, বিহার ভোজন ও শয়নকালে উপহাস করেছি, সে সমস্ত ক্ষমা কর। তোমার অদৃষ্টপূর্ব রূপ দেখে আমি রোমাঞ্চিত হয়েছি, 'ভয়ে' আমার মন প্রব্যাথিত হয়েছে। তুমি প্রসন্ন হও, পূর্বরূপ ধারণ কর। কৃষ্ণ তাঁর স্বাভাবিক রূপ গ্রহণ করলেন এবং আরো বহু উপদেশ দিয়ে পরিশেষে বললেন, হে অর্জুন, তুমি যদি অহংকার বশে মনে কর যুদ্ধ করব না, তবে সে সংকল্প মিথ্যা হবে, তোমার প্রকৃতিই তোমাকে যুদ্ধে প্রবৃত্ত করাবে।"  (রাজশেখর বসু -- 'ব্যাসকৃত মহাভারতের সারানুবাদ')।
তারপর যা বলেছিলেন তা আমরা পূর্বেই আলোচনা করেছি এবং অর্জুনকে 'আপন সর্বগ্রাসী মহিমায় অভিভূত' ক'রে শেষে এক প্রকার আদেশই করলেন,  ("সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ...."),  তারপর অর্জুনের আর কিছুই করবার ছিল না ; কেননা তখন, "সাগরতুল্য দুই বাহিনী যুদ্ধের উন্মাদনায় উন্মত্ত, সমুদ্যত ও চঞ্চল হয়ে উঠেছে।" (ঐ)।
অর্জুন জানলেন, যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। শ্রীকৃষ্ণকে বললেন, "হে অচ্যুত, আমার মোহ বিনষ্ট হয়েছে, তোমার প্রসাদে আমি 'ধর্মজ্ঞান' লাভ করেছি, আমার সন্দেহ দূর হয়েছে, তোমার আদেশ পালন করব।"
এখানে প্রশ্ন অর্জুন কোন্ 'ধর্মজ্ঞান' লাভ করলেন ? উত্তর এককথায় দুর্বোধ্য ও দুর্জ্ঞেয়। এই ধর্মজ্ঞান কি সেই 'জ্ঞান'  যা তিনি গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের 'সাংখ্যযোগ' থেকে আরম্ভ করে অষ্টাদশ অধ্যায়ের 'মোক্ষসন্ন্যাসযোগ' পর্যন্ত শ্রবণ করে এসেছেন ? না কি, ১৮/৫৯ বাণীর ওই যে রহস্যময় বক্তব্য, "...প্রকৃতিস্তাং নিযোক্ষতি" -- তোমার প্রকৃতিই "তোমাকে যুদ্ধে প্রবৃত্ত করাবে।"  এখানে 'তোমার প্রকৃতি' অর্থে অর্জুনের 'স্ব-ভাব' -- 'ক্ষত্রিয়ের সহজাত প্রবৃত্তি বা ধর্ম', যা বর্ণাশ্রম বিধানে শাসকবর্ণের ধর্ম। অর্থাৎ কিনা 'রাজধর্ম' !
____________________________________
যাই হোক, ১৮/৭৩ তম শ্লোকটি 'অর্জুন উবাচ', যেখানে অর্জুন শ্রীকৃষ্ণে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ ক'রে, শ্রীকৃষ্ণের আজ্ঞামত যুদ্ধ --- মহাভারতের মহানরমেধ যজ্ঞানুষ্ঠানের সঙ্কল্প করলেন। 'কৃষ্ণার্জুনের আলাপন' এখানেই সমাপ্ত। এবার এই দীর্ঘ আলাপচারিতা সম্পর্কে সঞ্জয় রাজা ধৃতরাষ্ট্রকে অবহিত করেছেন এই বলে যে,
"ইত্যহং বাসুদেবস্য পার্থস্য চ মহাত্মনঃ।
সংবাদমিমম্ অশ্রৌষম্ অদ্ভুতম্ রোমহর্ষণম্।।"

হে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র, এইভাবে আমি বসুদেবনন্দন বাসুদেব ও মহাত্মা কুন্তীনন্দন অর্জুনের অপূর্বশ্রুত রোমহর্ষক কথোপকথন শুনেছি। শ্রীব্যাসদেবের কৃপায় দিব্যদৃষ্টি লাভ করেছিলাম বলেই পরম রহস্যযুক্ত, অতি গোপনীয় 'যোগ' সাক্ষাৎ যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কণ্ঠেই শ্রবণ করতে পেরেছি। আমি ধন্য। শ্রীকেশব ও অর্জুনের সেই মঙ্গলময়, অদ্ভুত সংবাদ বার বার স্মরণ করে আমার অন্তর আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠছে। আহা, ভগবানের সেই বিশ্বরূপ! যতবার স্মরণে জেগে উঠছে ততবার "হৃষ্যামি চ পুনঃ পুনঃ।।"  হে কুরুকুলপতি, অধিক কি আর বলি,
"যত্র যোগেশ্বর কৃষ্ণ যত্র পার্থ ধনুর্ধরঃ।
তত্র শ্রীর্বিজয়ো ভূতিঃ ধ্রুবা নীতিঃ মতির্মমঃ।।"
যেখানে যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং রয়েছেন, যেখানে গাণ্ডীধন্বা অর্জুন আছেন, যেখানে বিভূতি ও অবিচলিত নীতি আছে সেখান তাঁদের (পাণ্ডবদের) শ্রীবিজয় অবশ্যম্ভাবী --- এই আমার মত।

অষ্টাদশ অধ্যায় সম্বলিত শ্রীমদ্ভগবদগীতা নামক মহাগ্রন্থের এখানেই সমাপ্তি। তবে সমগ্র গ্রন্থটি অষ্টাদশ পর্ব মহাভারতের 'ভীষ্মপর্বের' সূচনায় আরম্ভ এবং সেখানেই শেষ। তারপরও ঘটনাবহুল, দ্বন্দ্বসঙ্কুল মহাভারতীয় কাহিনী চলমান। 'গীতা-উপনিষদ'কে বলা হয়েছে, 'সমস্ত উপনিষদগুলি গাভীস্বরূপ, দোহন করছেন গোপালনন্দন কৃষ্ণ, পার্থ সেই গাভীর বৎস (যিনি প্রথম সেই দুগ্ধরূপ গীতার অমৃত পান করেছেন) ; আর সেই দোহন-করা দুগ্ধ বা গীতারূপ অমৃত পান করেন সুধীগণ-- "পার্থঃ বৎসঃ সুধীর্ভোক্তা দুগ্ধম্ গীতামৃতম্ মহৎ।।" 
_____________________________________
মহাগ্রন্থ গীতা বিষয়ে বিশেষ কয়েকটি কথা

১) যুগ যুগ ধরে শুধু ভারতবর্ষেই নয় সমগ্র পৃথিবীর সুধীসমাজে শ্রীমদ্ভগবদগীতার সমাদর ও শ্রদ্ধা অচিন্ত্যনীয়। এখনও তার বিন্দুমাত্র গৌরব, গরিমা ও মহিমার ক্ষয় প্রাপ্তি ঘটেনি বরং প্রবলতরভাবে গীতাদর্শের প্রচার হয়ে চলেছে। কিন্তু গীতার ব্যাখ্যার সামান্যতম ত্রুটি গীতার মহান আদর্শকে নস্যাৎ করে দিতে পারে। এ প্রসঙ্গে গীতাশাস্ত্রী, সুমহান বেদ ও পুরাণবিদ পুন্যশ্লোক জগদীশ চন্দ্র ঘোষ মহাশয় বলছেন,
"গীতা স্বধর্মনিষ্ট বিন্দুমাত্রেরই নিত্যপাঠ্য। তাই অনেকে ক্ষুদ্র সংস্করণ হইতেও প্রত্যহ কিছু কিছু পাঠ করিয়া থাকেন। কিন্তু নিয়মপাঠ আর শাস্ত্রদৃষ্টিতে গীতা অধ্যয়ন বা উহাতে প্রবেশলাভের চেষ্টা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। ....... প্রাচীন উপনিষদগুলি (যেমন ঈশ্, কেন, কঠ, বৃহদারণ্যক, ছান্দ্যোগ্য, মুণ্ডক, মাণ্ডুক্য, ঐতরেয়, তৈত্তিরীয়, প্রশ্ন --- এই দশটি উপনিষদের ভাষ্য রচনা করেছিলেন ভগবান শঙ্করাচার্য), জৈমিনিসূত্র, যোগানুশাসন, শাণ্ডিল্যসূত্র, নারদসূত্র ইত্যাদি নানা শাস্ত্রের সহিত অল্পবিস্তর পরিচয় না থাকিলে গীতার প্রাচীন টিকাভাষ্য সম্যক বুঝা যায় না। গীতার বিভিন্ন স্থলে এমন অনেক কথা আছে যাহা পরস্পর বিরুদ্ধ বলিয়া প্রতিয়মান হয়।"
২) আমার মনে হয়েছে গীতার বাণী শ্রবণেচ্ছু যাঁরা তাঁরা আস্তিক্যবাদে অবশ্যই বিশ্বাসী হবেন। আমদের দেশের প্রাচীন ধর্মমতের যে 'ষড়দর্শন' -- সাংখ্য, পূর্ব মীমাংসা ও উত্তর মীমাংসা, যোগ, ন্যায়, শ্বেতাশ্বতর, বৈশেষিক এবং বেদান্ত -- এগুলি সবই আস্তিক্যবাদে বিশ্বাস করে (যদিও কপিলের প্রাচীন সাংখ্য যথেষ্টই দ্বান্দ্বিক)। এই ছয়টি দর্শন বেদকে প্রামাণ্যগ্রন্থ হিসাবে স্বীকার করে, তারপর তাদের নিজস্ব প্রতিপাদ্যগুলিকে বিচার করে। অপরদিকে চার্বাক, বৌদ্ধ ও জৈন দর্শনগুলিকে নাস্তিক্যবাদী বলা হয় এই কারণেই যে তাঁরা (যদিও সুউচ্চ তত্ত্বমার্গের ঘোষক) বেদ ও ঈশ্বরে (ব্রহ্মে) বিশ্বাস করেন না।
৩) শ্রীমদ্ভগবদগীতাও উপনিষদরূপেই আরাধ্য এবং পূর্ণরূপে সর্বোপনিষদের অমৃতরসসিঞ্চিত ব্রহ্মবাদী দর্শনের প্রবক্তা। এই মহান গ্রন্থই ভারতবর্ষে তথা জগৎ সংসারে পরম কল্যাণময়ী ভক্তিবাদের মন্দাকিনীধারা আনয়ন করেছেন। গীতার উৎস মহাকবি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস রচিত মানসসরোবর-সদৃশ বারিধীর মহাধার মহাভারত মহাকাব্যের 'ভীষ্মপর্বে'।
("চন্দ্রচূড় জটাজালে আছিলা যেমতি
জাহ্নবী ভারতরস ঋষি দ্বৈপায়ন
ঢালি সংস্কৃত হ্রদে রাখিলা তেমতি।" 
                             --মাইকেল মধুসূদন।)
ঐতিহাসিকদের মতে খ্রীষ্টপূর্ব পঞ্চম থেকে দ্বিতীয় শতাব্দীর মধ্যে রচিত হয়েছে মহাভারতের অন্তর্গত গীতা। কিমাশ্চর্যম্ ! তিনটি সহস্রাব্দ ধরে এই অবিনশ্বর গ্রন্থটি আজও মানুষের দ্বন্দ্বক্ষুব্ধ, শোকদুঃখবিদীর্ণ জীবনে শান্তি ও সান্ত্বনার অমৃতবাণী সিঞ্চন করে চলেছেন অবিরাম ! এ এক পরম বিস্ময় !
৪) এই গীতোপনিষদ মানবের চৈতন্য উন্মোচনে, জ্ঞানালোক বিকিরণে যে কী অপার দৈবপ্রসাদ বিতরণ করেছে, করে চলেছে এবং আগামী দিনেও করে চলবে তার মূল্যায়ন মানুষ করতে পারবে তখনই যখন 'শ্রীমদ্ভগবদগীতার' স্বরূপ মানুষ অন্তরে উপলব্ধি করতে পারবে, যখন মানুষ স্বর্গকামী, আচারসর্বস্ব, এহিক, ক্ষণিক ফলদায়ী, আত্মম্ভরিতাপূর্ণ সম্প্রদায়গত ধর্মব্যবসায়ীদের পাশাখেলার মায়াবদ্ধতা থেকে মুক্ত হবে।
গীতার বাণীগুলিকে 'মহাভারত' মহাকাব্যের সঙ্গে একাঙ্গে জড়িয়ে নিলে ভ্রমিত হবার সম্ভাবনা প্রবল। যখন (ভীষ্মপর্বে, যুদ্ধারম্ভের মুহূর্ত পূর্বে) শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বিশ্বজগৎ, বিশ্বজাগতিক চৈতন্যসত্ত্বা এবং মানবজীবনের মুক্তির সাধনার বিষয়ে বলছেন তখন অর্জুনের তৎকালের অবশ্যকর্তব্য থেকে পশ্চাদপসরণের কোন উপায় আর ছিল না। এমনই হয় ; মানব সভ্যতার ইতিহাসে যত আত্মহননের, নরমেধযজ্ঞের সর্বনাশা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে, সমস্তগুলির পূর্ব অবস্থার 'পাপের' পরিপ্রেক্ষিতটিই বিচারের বিষয়। সেই 'পূর্ব অবস্থার' কৃতকর্মের ফল 'পররবর্তীর' বিষাদময় অনিবার্য পরিণাম। 'কর্মানি অধিকারস্তে' শব্দের তাৎপর্য এই নয় যে পার্থিব ভোগাকাঙ্ক্ষার নিবৃত্তি। সেই ক্ষণিক, বিনাশশীল প্রাপ্তির কামনা হতে নিষ্কৃতি লাভের সাধনার নামই 'নিষ্কাম কর্মব্রত' -- যা গীতার প্রতিপাদ্য বিষয়গুলির অন্যতম।
৫) শ্রীগীতার অন্যতম এবং অনন্য উদ্ঘোষণা 'কালের'  মহিমা। সৃষ্টি, স্থিতি ও বিনাশের নিয়ন্ত্রক মহাকাল। তিনি নির্মম নিষ্ঠুর অনুদাসীন (কাউকে, কোন কিছুকেই ছেড়ে দেন না)। এই প্রসঙ্গে মহাভারতের স্ত্রীপর্ব ('জলপ্রাদানিকপর্বাধ্যায়') থেকে কিছু অংশ --- "শত পুত্রের মৃত্যুতে ধৃতরাষ্ট্র অত্যন্ত শোকাকুল। সঞ্জয় তাঁকে বললেন, মহারাজ, শোক করছেন কেন, শোকের কোন প্রতিকার নেই। ..... ধৃতরাষ্ট্র বলছেন, ‌আমার সমস্ত পুত্র আমাত্য ও সুহৃদ নিহত হয়েছেন, এখন আমি জরাজীর্ণ পক্ষীর ন্যায় হয়েছি, আমার চক্ষু নেই, রাজ্য নেই, বন্ধু নেই ; আমার জীবনের আর প্রয়োজন কি ?
ধৃতরাষ্ট্রকে আশ্বাস দেবার জন্য বিদুর বললেন, মহারাজ, শুয়ে আছেন কেন, উঠুন, সর্ব প্রাণীর গতিই এই। মানুষ শোক করে মৃতজনকে ফিরে পায় না, শোক করে নিজেও মরতে পারে না। এখানে মহাকবির সেই চিরায়ত সত্যের শ্লোকগুলি উদ্ধার করি, 

"সর্বে ক্ষয়ন্তা নিচয়াঃ পতনান্তাঃ সমুচ্ছয়াঃ।
সংযোগা বিপ্রয়োগান্তা মরণান্তঞ্চ জীবিতম্।।
আদর্শনাদাপতিতাঃ পুনশ্চাদর্শনং গতা।
ন তে তব ন ত্বেষাং তং তত্র কা পরিদেবনা।।
শোকস্থানসহস্রাণি ভয়স্থানশতানি চ।
দিবসে দিবসে মূঢ়মাবিশন্তি ন পন্ডিতম্।।
না কালস্য প্রিয়ঃ কশ্চিন্ন দ্বেশ্যঃ কুরুসত্তম।
না মধ্যস্থঃ ক্বচিৎ কালঃ সর্বং কালঃ প্রকর্ষতি।। 

সকল সঞ্চয় পরিশেষে ক্ষয় পায়, উন্নতির অন্তে পতন হয়, মিলনের অন্তে বিচ্ছেদ হয়, জীবনের অন্তে মরণ হয়। মানুষ অদৃশ্য স্থান থেকে আসে, আবার অদৃশ্য স্থানেই চলে যায় ; তাঁরা আপনার নন, আপনিও তাঁদের নন ; তবে কিসের খেদ ? সহস্র সহস্র শোকের কারণ এবং শত শত ভয়ের কারণ প্রতিদিন মূঢ় লোককে অভিভূত করে, কিন্তু পন্ডিতকে করে না। হে কুরুশ্রেষ্ঠ, কালের কেউ প্রিয় বা অপ্রিয় হয় না, কাল‌ কারও প্রতি উদাসীনও নয় (কালের কবল থেকে কেউ মুক্তি পায় না) ; কাল সকলকেই আকর্ষণ করে নিয়ে যায়।"
এরপরই আরও একটি শাশ্বত বাণী,
"হা ! লোকে লোভের বশে, ক্রোধ ও ভয়ে উন্মত্ত হয়ে নিজেকে বুঝতে পারে না। সৎকুলে জন্মালে নীচকুলজাতের এবং ধনী হলে দরিদ্রের নিন্দা করে, অন্যকে মূর্খ বলে, নিজেকে সংযত করতে চায় না। প্রাজ্ঞ ও মূর্খ, ধনবান ও নির্ধন, কুলীন ও অকুলীন, মানী ও অমানী সকলেই যখন পরিশেষে শ্মশানে গিয়ে শয়ন করে তখন দুষ্টবুদ্ধি লোকে কেন পরস্পরকে প্রতারিত করে ?" 
        'মহাভারত সারানুবাদ'-- রাজশেখর বসু।

৬) শ্রীমদ্ভগবদগীতার যে ধর্মধারণার উপস্থাপনা তার তো কোন সম্প্রদায়ের ধর্মতত্ত্ব নয় কেননা সেই সুদূর অতীতে আর্যাবর্তের ষোড়শ মহাজনদে ও তার বাইরেও যে জনসংখ্যা ছিল তা বর্তমান সময়কালের অখন্ড ভারতীয় ভূখণ্ডের (জম্বুদ্বীপ) জনসংখ্যার তুলনায় নিতান্ত এবং নিতান্তই যে কম ছিল তার বিস্তর সাক্ষ্য বেদ বেদান্ত পুরাণাদি থেকে উপস্থাপিত করা যায়। ন-আর্যদের গ্রাম ও বনবাসী জীবনের, ব্রাহ্মণদের আরণ্যক জীবনের সমাজবন্ধনে তেমন দ্বন্দ্ব ছিল না, যেমন ছিল মহাভারতে বর্ণিত বিভিন্ন আর্য (সামান্য কিছু অনার্য) রাজার, বিভিন্ন প্রকারের (কোথাও শুধুমাত্র রাজ্য জয়, কোথাও গোধন হরণ, কোথাও নারীহরণ, কোথাও কৌমবিবাদ) আগ্রাসন। এই অনিবার্য ও অপ্রতিরোধ্য আগ্রাসন-সঞ্জাত ঘোর বিনাশাত্মক দ্বন্দ্ববিক্ষোভের মধ্যখানে থেকে গীতার দর্শন ব্যক্ত হয়েছে। তাই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পটভূমির বাইরে এসে গীতার 'ধর্ম' (ধর্ম অর্থে এখানে ব্যষ্ঠি ও সমষ্টির কল্যাণময়, চৈতন্যময় জীবনাচরণের দর্শন) বিচার্য।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধভূমি ও কুরুপক্ষ ও পাণ্ডবপক্ষের যুযুধানবৃন্দের মনোভূমির কালান্তক বিনাশ যখন সাঙ্গ, তখন, আমাদের মহাকবি লিখছেন,
"সমরবন্যা যবে অবসান,
সোনার ভারত বিপুল শ্মশান,
রাজগৃহ যত ভূতল শয়ান
               পড়ে আছে ঠাঁই ঠাঁই --
ভীষণা শান্তি রক্তনয়নে
বসিয়া শোণিত পঙ্কশয়নে
চাহি ধরাপানে আনতবয়নে
মুখেতে বচন নাই।"
                           ----- রবীন্দ্রনাথ।

৭) 'বিশ্বরূপ দর্শনে' অর্জুন দিব্যদৃষ্টিতে দেখেছেন,
লেলিহ্যসে গ্রসমানঃ সমন্তাৎ লোকান্
"সমগ্রান্ বদনৈঃ জ্বলভিঃ।
তেজোভিরাপূর্য জগৎ সমগ্রং
ভাসস্তবোগ্রাঃ প্রতপন্তি বিষ্ণো।। ১১/৩০"

অর্জুন বলেছিলেন, সমগ্র বিশ্বসংসারকে, সমস্ত দিক থেকে প্রজ্বলিত মুখগহ্বর দ্বারা লেহন করে, গ্রাস করছেন প্রলয়ঙ্কর বিষ্ণু ! আপনার (মহাচিতাগ্নির মত) অসহনীয় তেজরাশী সমস্ত জগতকে পরিপূর্ণ করে সন্তপ্ত করছে। (জ্যোতির্বিজ্ঞানের কৃষ্ণগহ্বরের রূপ স্মরণ করিয়ে দেয়)।

এই নরকের আশা-ভাষাহীন অন্ধ গহ্বরে নিয়তি-নির্দিষ্ট প্রবেশের পূর্বমুহূর্তের মন্ত্রবাণী যে দিব্যগ্রন্থে সংকলিত তাই শ্রীমদ্ভগবদগীতা।
তবুও ঋষিগণ আমাদের বাঁচার মন্ত্র দিয়ে গিয়েছেন। জন্ম মৃত্যু, সৃজন-বিনাশের মধ্যে দিয়েই বিশ্বপ্রাণ ভোগবতী জাহ্নবী --অবিনাশী, অবিনশ্বর, চিরপ্রবহমান। পূর্ণ হতে 'তিনি' আসেন, আবার পূর্ণতেই প্রত্যাবর্তন করেন। 

"ওঁ পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাৎ পূর্ণমুদচ্যতে।
পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিশ্যতে।।
ওঁ শান্তিঃ ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ।" 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 

১৬/১২/২০২৫
_____________________________________


















কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...