জত্যাভিমান ধর্মান্ধতা এবং গান্ধী ও যুদ্ধ--পর্ব ৪
"পাপের এ সঞ্চয়
সর্বনাশের পাগলের হাতে
আগে হয়ে যাক্ ক্ষয়।
বিষম দুঃখে ব্রণের পিণ্ড
বিদীর্ণ হয়ে, তার
কলুষপুঞ্জ করে দিক উদ্গার।"
---'প্রায়শ্চিত্ত' (নবজাতক) রবীন্দ্রনাথ
এমনই হয়তো ভেবেছিলেন নিয়তিলাঞ্ছিত, হতাশ গান্ধী। এনারা এমনই হয়ে থাকেন। রবীন্দ্রনাথের 'প্রায়শ্চিত্ত' কবিতার (নবজাতক) রূঢ় সত্যের বাণীতে এই প্রত্যয়ই ধ্বনিত হয়েছে যে আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের আদর্শের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছিল ইংরেজ পরবর্তী ভারতভূখণ্ডের 'কালনেমীর লঙ্কাভাগের' লালসার কলুষপুঞ্জ, যার উদ্বমন অবশ্যম্ভাবী ছিল। (কিন্তু যন্ত্রণার স্মৃতি এই যে সেই গরলবন্যায় ডুবে মরেছিল তারা যারা বুকে বুকে জড়িয়ে, হাতে হাত রেখে একই সমাজনীড়ে প্রাণের ধারা অব্যাহত রেখেছিল যুগ যুগ ধরে)। কংগ্রেসের মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, মুসলিম লিগের আলাদা রাষ্ট্রের নাছোড় চাহিদা, কট্টর হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের তীব্র কংগ্রেস বিরোধিতা তখন এমন এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল যা গান্ধীদের মত মানবিকতাবাদীদের কাছে কিংকর্তব্যবিমূঢ়তার কারণ ছিল। ওদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদের ভিত্তির ভিতরে আঘাত হেনেছে। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর 'আজাদহিন্দ' ফৌজ অক্ষশক্তির সাহায্য ও সহযোগিতার উপর প্রাথমিকভাবে ভর করে, পরবর্তীতে সম্পূর্ণ স্বদেশের সৈন্যবাহিনী গড়ে তুলেছে এবং দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দিক থেকে সশস্ত্র আক্রমণে স্বাধীনতার যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। এমনই এক আন্তর্জাতিক বিপর্যস্ত অবস্থায় গান্ধীর অহিংস আন্দোলনের, অসাম্প্রদায়িক আদর্শের ধার ও ভার যে লঘুতর হতে আরম্ভ করবে, তা একপ্রকার নিশ্চিতই ছিল। যাই হোক ১৯৪৫ থেকে '৪৬-'৪৭-এর ইতিহাসের আর পুনরাবৃত্তি করার প্রয়োজন নেই, কেননা এই শোণিতপঙ্কে নিমজ্জিত ভারতাত্মার আর্ত ক্রন্দন আজও স্তিমিত হলেও স্তব্ধ হয়ে যায় নি।
বাংলা ও পাঞ্জাবকে স্বাধীনতার যূপকাষ্ঠে বলি দিয়ে ভারত স্বাধীন হোল। গান্ধীজী স্বাধীন ভারতের শাসনক্ষমতা থেকে দূরে সরে গেলেন ; কিন্তু ভারতের সাম্প্রদায়িক ক্ষতচিহ্নগুলির নিরাময়ের দায় নিয়ে নূতন কিছু ভাবনার লালন করছিলেন যখন, 'হরিজন' জনতা যারা, 'সবার পিছে, সবার নীচে পড়ে থাকা' সর্বহারার দল যারা --- তাদের জন্যেও দেশের স্বাধীনতাকে বোধ্য ও অনুকূল করবার ব্রত পালন করে চলবার প্রয়াসে নিরত ছিলেন, ঠিক তখনই, ১৯৪৮ সালের ৩০শে জানুয়ারী দিল্লির বিড়লা হাউসের প্রাঙ্গণে ৭৮ বছর বয়সের অর্ধনগ্ন এই বৃদ্ধের বুক ঝাঁঝরা হয়ে গেল আততায়ীর গুলিতে। কট্টর হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা, রাজনৈতিক দল হিন্দু মহাসভার সদস্য নাথুরাম গডসের হাতে ছিল সেই ঘাতক 'অস্ত্র', যে অস্ত্রের বিরুদ্ধেই ছিল মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর আজীবন যুদ্ধঘোষণা।
গান্ধীজী আর কয়টা বছরই বা বাঁচতেন ? ১৮৪৮ সালে তাঁকে হত্যা করলো যে আততায়ী, হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল যারা তারা কি গান্ধীবিহীন একটি সোনার ভারত গড়ে তুলেছে ? এখনও, বিভিন্ন সরকারের পরিবর্তনের পরেও, দেশ-বিদেশ হতে আগত 'বিরাট বিরাট' সব ব্যক্তিদের কেন নিয়ে যেতে হয় গান্ধীঘাটে ? কেন গান্ধীমূর্তিতে মাল্যদান করে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান পালন করতে হয় ? কেন গান্ধীজীর রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক মানবতাবাদের দর্শনের কথা বলতে হয় রাষ্ট্রের নেতৃবৃন্দকে ? এ সকল প্রশ্নের উত্তর নেই। তবে বর্তমান ভারতে এমন একটি অমানবিক পরিবেশ সৃষ্টি করবার প্রয়াস চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে যাতে ধীরে ধীরে সেই মানবপ্রেমী পুরুষটির প্রভাবটিকে ক্ষীয়মান করে তোলা যায়। কিন্তু 'অমানবিকতার' পরাভব এখানেই। প্রেমের এক শাশ্বত প্রেরণা আছে। তাই গান্ধীদের হত করা যায়, কিন্তু লুপ্ত করা যায় না। যেমন যায়নি, সক্রেটিসকে, যীশুখ্রীষ্টকে, মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেবকে (পুরীর মন্দিরের পুরোহিতরা তাঁকেও হত্যা করেছিলেন বলে জনশ্রুতি আছে)। এমন উদাহরণ ইতিহাসের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে অসংখ্য। 'হিংসার' মধ্যে নিহিত আছে প্রভূত্বের উল্লাস।
গান্ধী দেশভাগ চাননি। "Gandhi opposed the partition of India, thinking philosophically and in an ideological view that the 'Partition of India' would be a tragic failure of unity and a betrayal of his lifelong efforts for Hindu-Muslim harmony. He even declared that it would only happen "over my dead body." He even went so far that he proposed that "all power be given to the Muslim League to 'keep the country United'. (এটাই ছিল তাঁর আবেগাছন্ন ভ্রান্তি -- Emotional blunder)" কেননা তিনি তখন ভেবেছিলেন ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ভাগ হলে এর পরিণাম ভয়াবহ আকার ধারণ করবে এবং এই উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক হিংসার অবসান হবে না কোন দিনও।
কিন্তু অন্য দিকে জহরলাল নেহরু, প্যাটেল প্রভৃতি নেতারা ভারতভাগ মেনে নিয়েই স্বাধীনতা চাইলেন। মহম্মদ আলি জিন্নাও এক সর্বনাশা ডাক দিলেন, "India, either be separated or destroyed !" And Gaandi was sidelined from the main stream of India's Freedom Struggle. He, then, felt deeply pained and frustrated. A deathly despair engulfed his soul and endeavour. He was in belief that the partition of India was a 'madness' and fundamental failure of India's spirit. যাই হোক্ (India got freedom), যখন স্বাধীনতা এল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার রক্তপিচ্ছিল পথে ধরে, যখন দিল্লিতে চলছে ক্ষমতা আর অধিকারের ভাগ-বাঁটোয়ারা তখনও গান্ধী সেই পথে -- আর্ত, দিশাহারা, বাস্তুহারা মানুষদের কাছে --- কলকাতায়, নোয়াখালীতে...।
এ সকল কাহিনী বহু চর্চিত, তবু এ কথা বলতেই হবে রাজনৈতিক আন্দোলন যখন ক্ষমতা লাভের অস্ত্র হয়ে ওঠে তখন তার সম্মুখে মানুষের মনুষ্যত্ববোধের কোমল গুণগুলির (tender values) অকাল মৃত্যু ঘটে। মানুষে মানুষে যে একটি অদৃশ্য যোগ থাকে-- ধর্ম-বর্ণ, সবল-দুর্বল নির্বিশেষে-- সেইটি ছিন্ন করে ফেলতে না পারলে ক্ষমতাভোগ করা যায়না। গান্ধী যে তা জানতেন না, তা ঠিক নয়। তিনি সেই ক্ষমতালাভের, ক্ষমতা ভোগের লালসা ত্যাগ করেছিলেন বলেই বলতে পেরেছিলেন, "ভারত ভাগের পরিণাম ভারতবর্ষের আত্মাকে বলিদান দেওয়া।" কিন্তু তাঁর আদর্শকে উপলব্ধি করা সমকালের দ্বিজাতিতত্ত্বে বিশ্বাসী, শাসনক্ষমতা লাভের জন্য উন্মত্ত দেশনায়কদের কাছে ছিল অবাস্তবতার স্বপ্ন ; আর গান্ধীদের মত মানবতার পূজারীদের কাছে ছিল (যুগ যুগ ধরে আছে) মানবসভ্যতাকে বাঁচিয়ে রাখার একমাত্র পথ।
"Gandhi, for us, is not only the heroic guide of his immense people claiming it's liberty ---- and about to take it. He is the surest, the purest light shining in the dark skies of our time. Amidst the tempests in which the sinking ship of our civilizatione risks vanishing with all its cargo, he is the star that shows us the way still open that leads to salvation ('পরিত্রাণ' অর্থে গ্রহণ করতে হবে)।
This way is within us. it is the supreme energy, the energy of heroic non-acceptance. It is the refusal hurled by the proud soul against injustice and violence. It is the revolution of spirit.
This revolution does not breed opposition between races, classes, nations, and religions ; it brings them together. It awakens in every man the deep fire of One Soul, which made humanity rise from the void into which in its madness it now aspires to return."*
১৯৩০ সালে গান্ধীর জন্মদিন উপলক্ষে গান্ধীকে পাঠানো রোমা রোলাঁর বাণী।
সময়কালটি লক্ষ্য করুন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝখানের সেই সর্বনাশা কাল (বিশ্ববিধ্বংসী কুরুক্ষেত্রেরউদ্যোগপর্ব) যখন ওই 'জাতি, শ্রেণী, রাষ্ট্র এবং ধর্ম' ( "races' classes' nations and religions") নামক উগ্র রক্তবীজের দল ছড়িয়ে পড়েছিল ইউরোপ, এশিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকার সর্বত্রই। তখন কিনা গান্ধী চাইছিলেন এমন এক বিপ্লব যা প্রতিটি মানুষের মধ্যে জাগিয়ে তুলবে এক ও অচ্ছেদ্য আত্মিকতার পবিত্র অগ্নিশিখা ("-- It awakens in every man the deep fire of the One Soul.."). যখন ওই 'জাতি, শ্রেণী, রাষ্ট্র এবং ধর্ম' ( "races' classes' nations and religions") নামক উগ্র রক্তবীজের দল ছড়িয়ে পড়েছিল ইউরোপ, এশিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকার সর্বত্র।
মানব সভ্যতার এমনই তমসাচ্ছন্ন অধ্যায়গুলিতে এমন স্বপ্ন নিয়েই তো মহামানবদের আবির্ভাব ঘটে এবং তাঁদের অকালে, ব্যর্থ সাধনার দায় বহন ক'রে বিষ পান করতে হয়, ক্রুশবিদ্ধ হতে হয়, অন্ধকার কারাগারে শেষ নিঃশ্বাস রেখে যেতে হয়, ঘাতকের বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে ধরিত্রীর বুকে রক্তচিহ্ন এঁকে যেতে হয়। তবু তাঁদের আসতেই হয়, বার বার ; কেননা তাঁরা পৃথিবীর প্রতি, পৃথিবীর প্রাণের প্রতি 'ভালোবাসায় অন্ধ' ! তাঁদের মানবতার অন্তর্দৃষ্টিতে ধরা পড়েনা মানুষের ঘোর কুটীল, লালসাকলুষ, হিংসা-প্রতিহিংসার কদর্য রূপ।
রবীন্দ্রনাথের আর গান্ধীর একাত্মতার কাহিনী দীর্ঘদিনের। গান্ধীর অন্তরের 'মানবপ্রেমের' আলো, (light of his love for humanity) দিব্যদৃষ্টিতে দেখেছিলেন তিনি। অভিবাদন করেছিলেন 'মহাত্মা' নামে। ভারত তথা বিশ্বের রাজনীতির কুরুক্ষেত্রে তিনি গান্ধীর মত সেনাপত্য করেন নি ঠিকই, কিন্তু যেন অনুভব করেছিলেন সমকালের 'মানবসভ্যতার নিদারুণ সংকট' এবং যা তাঁর অন্তর্বেদনার লাভাস্রোতের মত নির্গত হয়েছে 'প্রান্তিক' কাব্যের সপ্তদশ সংখ্যক কবিতায়ঃ
".... ........... দেখিলাম এ কালের
আত্মঘাতী মূঢ় উন্মত্ততা, দেখিনু সর্বাঙ্গে তার
বিকৃতির কদর্য বিদ্রুপ। একদিকে স্পর্ধিত ক্রূরতা,
মত্ততার নির্লজ্জ হুংকার, অন্যদিকে ভীরুতার
দ্বিধাগ্রস্ত চরণবিক্ষেপ, বক্ষে আলিঙ্গিয়া ধরি
কৃপণের সতর্ক সম্বল --- সন্ত্রস্ত প্রাণীর মতো
ক্ষণিক-গর্জন-অন্তে ক্ষীণস্বরে তখনি জানায়
নিরাপদ নীরব নম্রতা। রাষ্ট্রপতি যত আছে
প্রৌঢ় প্রতাপের, মন্ত্রসভাতলে আদেশ-নির্দেশ
রেখেছে নিষ্পিষ্ট করি রুদ্ধ ওষ্ঠ-অধরের চাপে
সংশয়ে সংকোচে। এদিকে দানব-পক্ষী ক্ষুব্ধ শূন্যে
উড়ে আসে ঝাঁকে ঝাঁকে বৈতরণীনদীপার হতে
যন্ত্রপক্ষ হুংকারিয়া নরমাংসক্ষুধিত শকুনি,
আকাশেরে করিল অশুচি। মহাকাল সিংহাসনে-
সমাসীন বিচারক, শক্তি দাও, শক্তি দাও মোরে,
কণ্ঠে মোর আনো বজ্র বাণী, শিশুঘাতী নারীঘাতী
কুৎসিত বীভৎসা-'পরে ধ্বিক্কার হানিতে পারি যেন।
নিত্যকাল রবে যা স্পন্দিত লজ্জাতুর ঐতিহ্যের
হৃদস্পন্দনে, রুদ্ধকণ্ঠ ভয়ার্ত এ শৃঙ্খলিত যুগ যবে
নিঃশব্দে প্রচ্ছন্ন হবে আপন চিতার ভস্মতলে।"
(লক্ষ্যণীয় -- কবিতাটির প্রকাশকাল -- পৌষ ১৩৪৪)
রবীন্দ্রনাথ-গান্ধীদের মানবতার আদর্শ বিহীন ভারত, ভারতীয় সমাজ ও ভারতীয়ত্বও কি সেই করুণ পরিণাম বরণ করেই "নিঃশব্দে প্রচ্ছন্ন হবে আপন চিতার ভস্মতলে'' , আরোবার এবং বারংবার ? 'আত্মহননের কুরুক্ষেত্রই' কি 'অমানবতার ধর্মক্ষেত্র' হয়ে উঠবে ?
* উদ্ধৃত অংশটি সুমহান গবেষক, অধ্যাপক ও সাহিত্যিক শ্রদ্ধেয় চিন্ময় গুহ মহাশয়ের "Bridging East & West -- Rabindranath Tagore and Romain Rolland Correspondence (1919-1940) থেকে গৃহীত।
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২৯/০১/২০২৬
কলকাতা।
__________________________________________