বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০২৬

জাত্যাভিমান, ধর্মান্ধতা এবং গান্ধী ও যুদ্ধ--পর্ব ৪

জত্যাভিমান ধর্মান্ধতা এবং গান্ধী ও যুদ্ধ--পর্ব ৪

"পাপের এ সঞ্চয়
সর্বনাশের পাগলের হাতে
আগে হয়ে যাক্ ক্ষয়।
বিষম দুঃখে ব্রণের পিণ্ড
বিদীর্ণ হয়ে, তার
কলুষপুঞ্জ করে দিক উদ্গার।" 

                ---'প্রায়শ্চিত্ত' (নবজাতক) রবীন্দ্রনাথ
এমনই হয়তো ভেবেছিলেন নিয়তিলাঞ্ছিত, হতাশ গান্ধী।  এনারা এমনই হয়ে থাকেন। রবীন্দ্রনাথের 'প্রায়শ্চিত্ত' কবিতার (নবজাতক) রূঢ় সত্যের বাণীতে এই প্রত্যয়ই ধ্বনিত হয়েছে যে আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের আদর্শের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছিল ইংরেজ পরবর্তী ভারতভূখণ্ডের 'কালনেমীর লঙ্কাভাগের' লালসার কলুষপুঞ্জ, যার উদ্বমন অবশ্যম্ভাবী ছিল। (কিন্তু যন্ত্রণার স্মৃতি এই যে সেই গরলবন্যায় ডুবে মরেছিল তারা যারা বুকে বুকে জড়িয়ে, হাতে হাত রেখে একই সমাজনীড়ে প্রাণের ধারা অব্যাহত রেখেছিল যুগ যুগ ধরে)। কংগ্রেসের মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, মুসলিম লিগের আলাদা রাষ্ট্রের নাছোড় চাহিদা, কট্টর হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের তীব্র কংগ্রেস বিরোধিতা তখন এমন এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল যা গান্ধীদের মত মানবিকতাবাদীদের কাছে কিংকর্তব্যবিমূঢ়তার কারণ ছিল। ওদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদের ভিত্তির ভিতরে আঘাত হেনেছে। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর 'আজাদহিন্দ' ফৌজ অক্ষশক্তির সাহায্য ও সহযোগিতার উপর প্রাথমিকভাবে ভর করে, পরবর্তীতে সম্পূর্ণ স্বদেশের সৈন্যবাহিনী গড়ে তুলেছে এবং দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দিক থেকে সশস্ত্র আক্রমণে স্বাধীনতার যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। এমনই এক আন্তর্জাতিক বিপর্যস্ত অবস্থায় গান্ধীর অহিংস আন্দোলনের, অসাম্প্রদায়িক আদর্শের ধার ও ভার যে লঘুতর হতে আরম্ভ করবে, তা একপ্রকার নিশ্চিতই ছিল। যাই হোক ১৯৪৫ থেকে '৪৬-'৪৭-এর ইতিহাসের আর পুনরাবৃত্তি করার প্রয়োজন নেই, কেননা এই শোণিতপঙ্কে নিমজ্জিত ভারতাত্মার আর্ত ক্রন্দন আজও স্তিমিত হলেও স্তব্ধ হয়ে যায় নি।
বাংলা ও পাঞ্জাবকে স্বাধীনতার যূপকাষ্ঠে বলি দিয়ে ভারত স্বাধীন হোল। গান্ধীজী স্বাধীন ভারতের শাসনক্ষমতা থেকে দূরে সরে গেলেন ; কিন্তু ভারতের সাম্প্রদায়িক ক্ষতচিহ্নগুলির নিরাময়ের দায় নিয়ে নূতন কিছু ভাবনার লালন করছিলেন যখন, 'হরিজন' জনতা যারা, 'সবার পিছে, সবার নীচে পড়ে থাকা' সর্বহারার দল যারা --- তাদের জন্যেও দেশের স্বাধীনতাকে বোধ্য ও অনুকূল করবার ব্রত পালন করে চলবার প্রয়াসে নিরত ছিলেন, ঠিক তখনই, ১৯৪৮ সালের ৩০শে জানুয়ারী দিল্লির বিড়লা হাউসের প্রাঙ্গণে ৭৮ বছর বয়সের অর্ধনগ্ন এই বৃদ্ধের বুক ঝাঁঝরা হয়ে গেল আততায়ীর গুলিতে। কট্টর হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা, রাজনৈতিক দল হিন্দু মহাসভার সদস্য নাথুরাম গডসের হাতে ছিল সেই ঘাতক 'অস্ত্র', যে অস্ত্রের বিরুদ্ধেই ছিল মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর আজীবন যুদ্ধঘোষণা।
গান্ধীজী আর কয়টা বছরই বা বাঁচতেন ? ১৮৪৮ সালে তাঁকে হত্যা করলো যে আততায়ী, হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল যারা তারা কি গান্ধীবিহীন একটি সোনার ভারত গড়ে তুলেছে ? এখনও, বিভিন্ন সরকারের পরিবর্তনের পরেও, দেশ-বিদেশ হতে আগত 'বিরাট বিরাট' সব ব্যক্তিদের কেন নিয়ে যেতে হয় গান্ধীঘাটে ? কেন গান্ধীমূর্তিতে মাল্যদান করে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান পালন করতে হয় ? কেন গান্ধীজীর রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক মানবতাবাদের দর্শনের কথা বলতে হয় রাষ্ট্রের নেতৃবৃন্দকে ? এ সকল প্রশ্নের উত্তর নেই। তবে বর্তমান ভারতে এমন একটি অমানবিক পরিবেশ সৃষ্টি করবার প্রয়াস চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে যাতে ধীরে ধীরে সেই মানবপ্রেমী পুরুষটির প্রভাবটিকে ক্ষীয়মান করে তোলা যায়। কিন্তু 'অমানবিকতার' পরাভব এখানেই। প্রেমের এক শাশ্বত প্রেরণা আছে। তাই গান্ধীদের হত করা যায়, কিন্তু লুপ্ত করা যায় না। যেমন যায়নি, সক্রেটিসকে, যীশুখ্রীষ্টকে, মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেবকে (পুরীর মন্দিরের পুরোহিতরা তাঁকেও হত্যা করেছিলেন বলে জনশ্রুতি আছে)। এমন উদাহরণ ইতিহাসের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে অসংখ্য। 'হিংসার' মধ্যে নিহিত আছে প্রভূত্বের উল্লাস।

 
গান্ধী দেশভাগ চাননি। "Gandhi opposed the partition of India, thinking philosophically and in an ideological view that the 'Partition of India' would be a tragic failure of unity and a betrayal of his lifelong efforts for Hindu-Muslim harmony. He even declared that it would only happen "over my dead body." He even went so far that he proposed that "all power be given to the Muslim League to 'keep the country United'. (এটাই ছিল তাঁর আবেগাছন্ন ভ্রান্তি -- Emotional blunder)" কেননা তিনি তখন ভেবেছিলেন ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ভাগ হলে এর পরিণাম ভয়াবহ আকার ধারণ করবে এবং এই উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক হিংসার অবসান হবে না কোন দিনও।
কিন্তু অন্য দিকে জহরলাল নেহরু, প্যাটেল প্রভৃতি নেতারা ভারতভাগ মেনে নিয়েই স্বাধীনতা চাইলেন। মহম্মদ আলি জিন্নাও এক সর্বনাশা ডাক দিলেন, "India, either be separated or destroyed !" And Gaandi was sidelined from the main stream of India's Freedom Struggle. He, then, felt deeply pained and frustrated. A deathly despair engulfed his soul and endeavour. He was in belief that the partition of India was a 'madness' and fundamental failure of India's spirit. যাই হোক্ (India got freedom), যখন স্বাধীনতা এল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার রক্তপিচ্ছিল পথে ধরে, যখন দিল্লিতে চলছে ক্ষমতা আর অধিকারের ভাগ-বাঁটোয়ারা তখনও গান্ধী সেই পথে -- আর্ত, দিশাহারা, বাস্তুহারা মানুষদের কাছে --- কলকাতায়, নোয়াখালীতে...।

 
এ সকল কাহিনী বহু চর্চিত, তবু এ কথা বলতেই হবে রাজনৈতিক আন্দোলন যখন ক্ষমতা লাভের অস্ত্র হয়ে ওঠে তখন তার সম্মুখে মানুষের মনুষ্যত্ববোধের কোমল গুণগুলির (tender values) অকাল মৃত্যু ঘটে। মানুষে মানুষে যে একটি অদৃশ্য যোগ থাকে-- ধর্ম-বর্ণ, সবল-দুর্বল নির্বিশেষে-- সেইটি ছিন্ন করে ফেলতে না পারলে ক্ষমতাভোগ করা যায়না। গান্ধী যে তা জানতেন না, তা ঠিক নয়। তিনি সেই ক্ষমতালাভের, ক্ষমতা ভোগের লালসা ত্যাগ করেছিলেন বলেই বলতে পেরেছিলেন, "ভারত ভাগের পরিণাম ভারতবর্ষের আত্মাকে বলিদান দেওয়া।" কিন্তু তাঁর আদর্শকে উপলব্ধি করা সমকালের দ্বিজাতিতত্ত্বে বিশ্বাসী, শাসনক্ষমতা লাভের জন্য উন্মত্ত দেশনায়কদের কাছে ছিল অবাস্তবতার স্বপ্ন ; আর গান্ধীদের মত মানবতার পূজারীদের কাছে ছিল (যুগ যুগ ধরে আছে) মানবসভ্যতাকে বাঁচিয়ে রাখার একমাত্র পথ। 

"Gandhi, for us, is not only the heroic guide of his immense people claiming it's liberty ---- and about to take it. He is the surest, the purest light shining in the dark skies of our time. Amidst the tempests in which the sinking ship of our civilizatione risks vanishing with all its cargo, he is the star that shows us the way still open that leads to salvation ('পরিত্রাণ' অর্থে গ্রহণ করতে হবে)।
This way is within us. it is the supreme energy, the energy of heroic non-acceptance. It is the refusal hurled by the proud soul against injustice and violence. It is the revolution of spirit.
This revolution does not breed opposition between races, classes, nations, and religions ; it brings them together. It awakens in every man the deep fire of One Soul, which made humanity rise from the void into which in its madness it now aspires to return."* 

১৯৩০ সালে গান্ধীর জন্মদিন উপলক্ষে গান্ধীকে পাঠানো রোমা রোলাঁর বাণী।  

সময়কালটি লক্ষ্য করুন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝখানের সেই সর্বনাশা কাল (বিশ্ববিধ্বংসী কুরুক্ষেত্রেরউদ্যোগপর্ব) যখন ওই 'জাতি, শ্রেণী, রাষ্ট্র এবং ধর্ম' ( "races' classes' nations and religions") নামক উগ্র রক্তবীজের দল ছড়িয়ে পড়েছিল ইউরোপ, এশিয়া ও ল্যাটিন  আমেরিকার সর্বত্রই। তখন কিনা গান্ধী চাইছিলেন এমন এক বিপ্লব যা প্রতিটি মানুষের মধ্যে জাগিয়ে তুলবে এক ও অচ্ছেদ্য আত্মিকতার পবিত্র অগ্নিশিখা ("-- It awakens in every man the deep fire of the One Soul.."). যখন ওই 'জাতি, শ্রেণী, রাষ্ট্র এবং ধর্ম' ( "races' classes' nations and religions") নামক উগ্র রক্তবীজের দল ছড়িয়ে পড়েছিল ইউরোপ, এশিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকার সর্বত্র।
মানব সভ্যতার এমনই তমসাচ্ছন্ন অধ্যায়গুলিতে এমন স্বপ্ন নিয়েই তো মহামানবদের আবির্ভাব ঘটে এবং তাঁদের অকালে, ব্যর্থ সাধনার দায় বহন ক'রে বিষ পান করতে হয়, ক্রুশবিদ্ধ হতে হয়, অন্ধকার কারাগারে শেষ নিঃশ্বাস রেখে যেতে হয়, ঘাতকের বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে ধরিত্রীর বুকে রক্তচিহ্ন এঁকে যেতে হয়। তবু তাঁদের আসতেই হয়, বার বার ; কেননা তাঁরা পৃথিবীর প্রতি, পৃথিবীর প্রাণের প্রতি 'ভালোবাসায় অন্ধ' ! তাঁদের মানবতার অন্তর্দৃষ্টিতে ধরা পড়েনা মানুষের ঘোর কুটীল, লালসাকলুষ, হিংসা-প্রতিহিংসার কদর্য রূপ। 

রবীন্দ্রনাথের আর গান্ধীর একাত্মতার কাহিনী দীর্ঘদিনের। গান্ধীর অন্তরের 'মানবপ্রেমের' আলো, (light of his love for humanity) দিব্যদৃষ্টিতে দেখেছিলেন তিনি। অভিবাদন করেছিলেন 'মহাত্মা' নামে। ভারত তথা বিশ্বের রাজনীতির কুরুক্ষেত্রে তিনি গান্ধীর মত সেনাপত্য করেন নি ঠিকই, কিন্তু যেন অনুভব করেছিলেন সমকালের 'মানবসভ্যতার নিদারুণ সংকট' এবং যা তাঁর অন্তর্বেদনার লাভাস্রোতের মত নির্গত হয়েছে 'প্রান্তিক' কাব্যের সপ্তদশ সংখ্যক কবিতায়ঃ

 
".... ........... দেখিলাম এ কালের
আত্মঘাতী মূঢ় উন্মত্ততা, দেখিনু সর্বাঙ্গে তার
বিকৃতির কদর্য বিদ্রুপ। একদিকে স্পর্ধিত ক্রূরতা,
মত্ততার নির্লজ্জ হুংকার, অন্যদিকে ভীরুতার
দ্বিধাগ্রস্ত চরণবিক্ষেপ, বক্ষে আলিঙ্গিয়া ধরি
কৃপণের সতর্ক সম্বল --- সন্ত্রস্ত প্রাণীর মতো
ক্ষণিক-গর্জন-অন্তে ক্ষীণস্বরে তখনি জানায়
নিরাপদ নীরব নম্রতা। রাষ্ট্রপতি যত আছে
প্রৌঢ় প্রতাপের, মন্ত্রসভাতলে আদেশ-নির্দেশ
রেখেছে নিষ্পিষ্ট করি রুদ্ধ ওষ্ঠ-অধরের চাপে
সংশয়ে সংকোচে। এদিকে দানব-পক্ষী ক্ষুব্ধ শূন্যে
উড়ে আসে ঝাঁকে ঝাঁকে বৈতরণীনদীপার হতে
যন্ত্রপক্ষ হুংকারিয়া নরমাংসক্ষুধিত শকুনি,
আকাশেরে করিল অশুচি। মহাকাল সিংহাসনে-
সমাসীন বিচারক, শক্তি দাও, শক্তি দাও মোরে,
কণ্ঠে মোর আনো বজ্র বাণী, শিশুঘাতী নারীঘাতী
কুৎসিত বীভৎসা-'পরে ধ্বিক্কার হানিতে পারি যেন।
নিত্যকাল রবে যা স্পন্দিত লজ্জাতুর ঐতিহ্যের
হৃদস্পন্দনে, রুদ্ধকণ্ঠ ভয়ার্ত এ শৃঙ্খলিত যুগ যবে
নিঃশব্দে প্রচ্ছন্ন হবে আপন চিতার ভস্মতলে।"
(লক্ষ্যণীয় -- কবিতাটির প্রকাশকাল -- পৌষ ১৩৪৪)

রবীন্দ্রনাথ-গান্ধীদের মানবতার আদর্শ বিহীন ভারত, ভারতীয় সমাজ ও ভারতীয়ত্বও কি সেই করুণ পরিণাম বরণ করেই "নিঃশব্দে প্রচ্ছন্ন হবে আপন চিতার ভস্মতলে'' , আরোবার এবং বারংবার ? 'আত্মহননের কুরুক্ষেত্রই' কি 'অমানবতার ধর্মক্ষেত্র' হয়ে উঠবে ? 

* উদ্ধৃত অংশটি সুমহান গবেষক, অধ্যাপক ও সাহিত্যিক শ্রদ্ধেয় চিন্ময় গুহ মহাশয়ের "Bridging East & West -- Rabindranath Tagore and Romain Rolland Correspondence (1919-1940) থেকে গৃহীত।

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২৯/০১/২০২৬
কলকাতা।

__________________________________________


















বুধবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২৬

জাত্যাভিমান ধর্মান্ধতা এবং গান্ধী ও যুদ্ধ--পর্ব ৩

জাত্যাভিমান ধর্মান্ধতা এবং গান্ধী ও যুদ্ধ--পর্ব ৩

একজন সৈনিক, যিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রাণ দিয়েছিলেন তার একটি কবিতা এখানে উদ্ধার করি--,
Anthem for doomed youth

What passing-bells for these who die as cattle ?
Only the monstrous anger of the guns.
Only the stuttering rifles' rapid rattle
Can patter out their hasty orisons.
No mockeries now for them ; no prayers nor bells ;
Nor any voice of mouring save the choirs,
The shrill, demented choirs of wailing shells ;
And bulges calling for them from sad shires.
What candles may be held to speed them all ?
Not in the hands of boys, but in their eyes
Shall shine the holy glimmers of good byes.
The pallor of girls' brows shall be their pall ;
Their flowers the tenderness of patient minds,
And each slow dusk a drawing-down of blinds.
                ---- Wilfred Owen (1893 - 1918)
_________________________________________


মৃত যৌবনের সঙ্গীত

"কেন যে শোনাও বিদায়-বেলার ঘন্টাধ্বনি
মরল যারা তাদের আমরা গবাদিপশুই মানি।..."

এই কবিতাটি ছাড়াও উইলফ্রেড ওয়েনের আরো যে কবিতাগুলি আছে যেমন 'Dulce et Decorum Est', 'Futility', 'Strange Meeting' প্রভৃতির যে ভাষা, যে স্ব-অনুভূত, স্বচক্ষে দৃষ্ট মানুষের প্রাণের নির্মম আত্মাহুতির দহন ফুটে ফুটে উঠেছে সেগুলি আর কোন প্রতিশব্দে বর্ণনা করা যায় না। নরক যেন পৃথিবীর বুকে জীবন্ত হয়ে হাহাকার করে ওঠে। (প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে আরও অনেক কবির লেখনীতে যুদ্ধের বীভৎসতার ছবি আছে)। শুধু কবিরাই নন সারা পৃথিবীর সুধীসমাজের চিত্তদেশ সেই নরমেধ যজ্ঞের অগ্নিশিখার দহন পুড়িয়ে নিষ্প্রাণ করে দিয়েছিল। তাঁদের কয়েকজনের, যেমন বার্ট্রান্ড রাসেল (Bertrand Russell), লুডভিগ ভিটগেনস্টাইন (Ludwig wittgenstein), এলেইন (Alain যাঁর মর্মবিদারী গ্রন্থ Slavery, Mud and Blood)-দের সঙ্গে এক সাথেই উচ্চারিত হয় মহাত্মা গান্ধীর নাম। এছাড়াও মহাত্মার গুণগ্রাহী ও তাঁর অহিংসার মত ও পথের সহযাত্রী ছিলেন রোমা রোলাঁ (Romain Rolland), হেরম্যান হেসে (Herman Hesse), লিও তলস্তয় (Leo Tolstoy, যাঁর সুবিখ্যাত গ্রন্থ War and Peace). এমনই আরও বহু মণীষীর নাম বলা যায় যাঁরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঐ নরসংহারের উন্মত্ততা দেখে নির্বাক, মুহ্যমান হয়ে পড়েছিলেন। এনাদের সকলের মধ্যমণি ছিলেন আমাদের বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ইউরোপের কবি শিল্পী সাহিত্যিক দার্শনিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে তিনি যুদ্ধের বিরুদ্ধে তাঁর তীক্ষ্ণ তীব্র যুক্তিকঠোর বিরোধিতা সচ্চোরে ঘোষণা করে গিয়েছেন। রোমা রোলাঁর সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ ও নিবিড় বন্ধুত্বের বিষয়ে একটি অসামান্য গ্রন্থ রচনা করেছেন সুলেখক সুপণ্ডিত চিন্ময় গুহ মহাশয়। তাঁর রচিত 'Correspondence between Rabindranath Tagore and Romain Rolland from 1919 to 1940' যাঁরা পড়েছেন তাঁরা জানেন যুদ্ধের বিরুদ্ধে এই দুই মহাচিন্তকের লেখনী কী অসম ও নির্ভীক সংগ্রাম চালিয়ে গিয়েছেন দুই দশকের অধিক কাল ধরে, এবং একই সঙ্গে ভারতে ইংরেজ শাসনের যে সাম্রাজ্যবাদী নৃশংসতার দৃষ্টান্ত সেগুলিকেও বার বার ধ্বিক্কার জানিয়েছেন। ১৯১৯ সালে জালিওনাওয়ালাবাগে গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে বৃটিশ সরকারের দেওয়া 'স্যার' উপাধি পরিত্যাগ করেন। এছাড়াও তাঁকে আচার্যরূপে, পরামর্শদাতারূপে সমকালের স্বাধীনতার সংগ্রামের নেতৃবৃন্দ বরণ করেছিলেন। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, জহরলাল নেহরু, বালগঙ্গাধর তিলক এবং গান্ধী স্বয়ং বিশ্বকবির সুগভীর রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রতান্ত্রিক দর্শনের পথ অনুসরণ করেছেন, যে দর্শনের মূল সুর ছিল আন্তর্জাতিক মানবতাবাদ।
দেখুন, মৎপ্রণীত 'বিন্দুতে সিন্ধুদর্শন - প্রথম খণ্ড' গ্রন্থে আমি স্যার এডুইন আর্নল্ড (Sir Edwin Arnold) রচিত বিখ্যাত 'The Light of Asia' গ্রন্থটি সম্মন্ধে বিশদভাবে আলোচনা করেছি। যে কাব্য তথাগত বুদ্ধের জীবনী, তাঁর জীবনদর্শন ও ধর্মদর্শনের একটি চিরন্তন, চির- অক্ষয় দেউলস্বরূপ। এই কাব্য যার ভিত্তিতে অহিংসা, যার চূড়াতেও অহিংসা, সমকালের শ্রেষ্ঠ মণীষীদের, নোবেল পুরস্কার বিজয়ীদের এমনভাবেই প্রভাবিত করেছিল যে তাঁরা প্রত্যেকেই এক একজন বুদ্ধদেবের মতই অহিংসার তপস্যাকেই জীবনের ব্রতরূপে গ্রহণ করেছিলেন। মহাত্মা গান্ধীও তাঁদেরই একজন। তাঁর জীবন সাধনা নিয়ে অনেক বিতর্ক ও বিরুদ্ধ মতামত আছে ; কিন্তু তাঁর আদর্শকে নস্যাৎ করবার ধৃষ্টতা সমকালের মহাপ্রতাপান্বিত রাজশক্তিরও ছিল না। তাই তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত, পরিচালিত যে স্বাধীনতার আন্দোলন তা তো স্বাভাবিকভাবেই বলপ্রয়োগহীন, অস্ত্রহীন, হিংস্রতাহীন হবে এবং সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হবেই।
সাম্প্রদায়িকতা শুধুমাত্র ধর্মবিশ্বাসকেন্দ্রিক নয়। তার বহু প্রকারের কুৎসিত কদর্য রূপ আছে। রাজনৈতিক, সামাজিক, বর্ণভিত্তিক (দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্য, apartheid, ছিল যার নির্লজ্জ উদাহরণ), স্বজাতির মধ্যেও ধনবৈষম্যের পার্থক্যগত সাম্প্রদায়িকতা। কিন্তু (ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা ছাড়া) এই যে উদাহৃত সাম্প্রদায়িকতার কথা বলা হোল সেগুলিকেও গোষ্ঠীগত ধর্মবিশ্বাসের অজুহাতেই ব্যবহার করা হয়। আব্রাহামীয় ধর্মমতগুলির পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ইতিহাস বিদিত। ইহুদি-খ্রিষ্টান, ক্যাথলিক- প্রটেস্টান্ট ধর্মদ্বন্দ্ব যেমন সারাটা মধ্যযুগ জুড়ে অসংখ্য রক্তক্ষয়ী সংঘাত ঘটিয়েছে। আর ইসলাম ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রায় দু'শ বছর ধরে চলা ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধের বিভীষিকাময় ইতিবৃত্ত ইউরোপ তথা বিশ্ব ইতিহাসের এক নৃশংসতম 'মহাভারত', যার কিছুটা আমরা পাই মহাকবি তাসোর (Torquato Tasso) 'জেরুজালেম লিবারেতা' 'Gerusalemme Liberate' কাব্যে (যদিও এটি শুধুমাত্র প্রথম ক্রুসেডের একটি কল্পনাপ্রসূত আখ্যায়িকা)। মনে হতে পারে বুদ্ধ নিরঞ্জনের অহিংসা মন্ত্রের উপাসক মহাত্মা গান্ধীর প্রসঙ্গ থেকে অনেকখানি সরে এসেছি ; কিন্তু এই আপাত অপ্রয়োজনীয় প্রাসঙ্গিকতার উল্লেখ এই কারণেই যে তা হলেই আমরা বুঝে নিতে পারব গান্ধী কেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অভিমুখ অহিংস পথের দিকে ঘুরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন।
মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী একজন ব্যক্তিবিশেষ নন, গান্ধী এক আদর্শ ; যে আদর্শ ব্যক্তিজীবনের জীবনাচরণে, সমাজমানসের পুনর্গঠনে, দেশ এবং সমগ্র বিশ্বের রাষ্ট্রতন্ত্রের আত্মোপলব্ধির মন্ত্র উচ্চারণ করে বলে "মা মা হিংসি"। তাঁর স্বাধীনতা আন্দোলনের সারশিক্ষা ছিল,

"অহিংসা, অভয়, অপরিগ্রহ, সত্যাগ্রহ, সর্বোদয়, সাধারণ জীবনযাপন, সমত্ব ও সমবিচার, ভ্রাতৃত্ব এবং আত্মবিবর্তন।" 'অহিংসা' দুর্বলের শস্ত্র নয়, বরং অহিংসা হিংসার প্রবলতম প্রতিপক্ষ। তিনি বলছেন, "Non violence is not just absence of harm, but a powerful force for change, rooted in love and compassion." আবার আত্মশুদ্ধি বা আত্মবিবর্তন (be the change) বিষয়ে তাঁর ব্যাখ্যা "Be the change you wish to see the world." নিজেকে নয়, নিজের ধর্ম সমাজ বা রাষ্ট্রকে নয়, সমগ্র বিশ্বকে তুমি কিভাবে দেখবে ! শত্রুরূপে না বন্ধুরূপে ? তার নির্ধারণ করতে হবে তোমাকেই। এই জাগতিক আত্মীয়তার বোধ স্বাভাবিক ভাবেই বিংশ শতাব্দীর পৃথিবীর কাছে কাল্পনিক মনে হয়েছিল, মনে হয়েছিল "an utopian imaginativeness towards the world powers that preach for glorification of warfare."
'অপরিগ্রহ' বোঝাতে তিনি বলছেন, "living minimally to reduce greed and inequality." তিনি যখন এ কথা বলছেন তখন বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদী লুন্ঠন এবং ভোগবাদ চরম অবস্থায় পোঁচেছে। ইউরোপখণ্ডের উগ্র রাষ্ট্রবাদী মত্ততা দেখেছেন, ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন দেখেছেন, দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যের ঘৃণ্যরূপ দেখেছেন এবং দেশে ফিরে এসে দেখেছেন হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে ধূমায়িত সংহাত। এর মধ্যে ১৯০৬ সালের ৩০শে ডিসেম্বর 'অল ইন্ডিয়া মুসলিম লিগ' (খাজা সলিমুল্লাহ মূল প্রতিষ্ঠাতা), এবং ২৭শে সেপ্টেম্বর ১৯২৫ সালে কট্টর হিন্দু সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (মূল প্রতিষ্ঠাতা কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার) প্রতিষ্ঠা এবং কর্মকাণ্ড আরম্ভ হয়ে গিয়েছে। কাজেই ক্ষমতালাভের লোভ (greed), আর 'বিভাজন ও বৈষম্য' তখন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের আদর্শের মধ্যে নগ্নভাবে প্রভাব বিস্তার করতে আরম্ভ করেছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ১৯০০ সালের গোড়ার দিক থেকেই ইংরেজ বিতাড়নের পন্থার আরও একটি অসম উপসর্গ, যা বৃটিশ সরকারের প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র ও সহিংস আক্রমণ। বহুধাবিভক্ত এত সব প্রতিকূলতার মধ্যে তাঁকে সংগ্রাম করতে হয়েছিল।
তাই 'অভয়' বা fearlessness -- এই আদর্শটি তিনি যেমন আত্মশক্তি জাগরণের প্রয়াসে গ্রহণ করেছিলেন, ঠিক তেমনি জনসাধারণের ভিতরেও আত্মবিশ্বাস জাগানোর চেষ্টা করেছিলেন। অভয় সম্মন্ধে তিনি বলেছেন, "courage to stand for truth, even alone, drawing strength from inner conviction."


তিনি বুঝেছিলেন শুধুমাত্র অস্ত্র দিয়ে শত্রু নিধনের মাধ্যমে সত্ত্ব, স্বদেশ, স্বাধিকার --কিছুই রক্ষা করা যায় না। কারণ অস্ত্রের তৃষ্ণা মেটাতে রক্তের প্রয়োজন এবং সেই রক্তের চাহিদা মেটাতে হয় অস্ত্রকে মুক্তি দিয়ে। 'The sword wishes to get out of its  scabbard, সে তখন দেখেনা 'কেবা আত্ম, কেবা পর'। আর মানুষের অন্তরেই বাস করে সেই লালসা-সমভূত আগ্রাসন যার দাস বৃত্তি করে অস্ত্র। তাই মানুষের অন্তরের, মানুষের মননশীলতার পরিবর্তন প্রয়োজন।
"The mind is its own place, and itself,
Can make a Heaven of Hell, a Hell of Heaven."
                            --- Paradise Lost: Milton. 

অপরদিকে Marlow-র Doctor Faustus-য়েও মূল মন্ত্রটি এইভাবেই উচ্চারিত হয়েছে। The concept of hell is mainly a spiritual one. এবং যাঁরা মহাত্মা গান্ধীর জীবনীর উপর গবেষণা করেছেন তাঁরা জানেন গান্ধী কেন স্বাধীনতা আন্দোলনের বা স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল মন্ত্র হিসেবে আত্মিক শুদ্ধির আদর্শকে পাথেয় করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে সর্বপ্রথম ও সর্ববৃহৎ আন্দোলন ১৯২২ সালের অসহযোগ আন্দোলন। এই আন্দোলনের দেশ ইংরেজের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। আন্দোলন যখন তুঙ্গে, চুড়ান্ত পর্যায়ে তখন একটি বিশাল বিক্ষুব্ধ জনতা উত্তর প্রদেশের গোরোক্ষপুর জেলার চৌরিচৌরায় একটি পুলিশ ষ্টেশনের উপর চড়াও হয় এবং ঐ থানায় আগুন ধরিয়ে দেয়। তাতে ২২জন পুলিশকর্মী জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মারা যান। গান্ধীজী এই নৃশংসতা সহ্য করতে না পেরে তাঁর আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন। তিনি জানতেন এই হিংস্রতার দ্বারা অর্জিত স্বাধীনতায় এমনই নৃশংসতা অব্যাহত থাকবে। (আজকেও কি সেই নারকীয় ঘটনার পুনরাবৃত্তি আমরা দেখি না ?) কিন্তু ১৯৪২ সালে 'quit India Movement'-- যে আন্দোলনে গান্ধীজীর ডাক ছিল 'করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গে' , 'Do or Die'-- তখন ভারতের বহুস্থানে হিংসাত্মক ঘটনা সংঘটিত হলেও গান্ধী পশ্চাদপসরণ করেন নি, বা করতে পারেন নি কেননা তখন আন্দোলনের রাশ চলে গিয়েছিল নেহরু -জিন্নাদের হাতে। হতাশ গান্ধী (বোধ হয়) স্মরণ করেছিলেন মহাভারতের (ভীষ্মপর্ব) ও গীতার বাণী,
অর্জুন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধভূমিত শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপ দর্শন করছেন আর জিজ্ঞাসা করছেন,

যথা প্রদীপ্তং জ্বলনং পতঙ্গা
বিশন্তি নাশায় সমৃদ্ধবেগাঃ।
তথৈব নাশায় বিশন্তি লোকাঃ
অস্তবাপি বক্ত্রাণি সমৃদ্ধবেগাঃ।।...

পতঙ্গরা যেমন আত্মনাশের জন্য সমৃদ্ধবেগে প্রদীপ্ত অনলে প্রবেশ করে সেইরূপ সর্বলোক (সমস্ত জানপ্রাণ) নিজেদেরকেই নাশ করার জন্য তোমার মুখসমূহে প্রবেশ করছে। তুমি জ্বলন্ত বদনে সব দিক থেকে সমগ্র লোক গ্রাস করতে করতে লেহন করে ; বিষ্ণু, তোমার উগ্র প্রভা সমগ্র জগৎ তেজে পূরিত করে সন্তপ্ত করছ। বল, কে তুমি উগ্ররূপ ? ......"
শ্রীকৃষ্ণ উত্তরে বলেছিলেন। 

"কালোহস্মি লোকক্ষয়কৃৎ প্রবৃদ্ধো
লোকান্ সমাহর্তুমিহ প্রবৃত্তঃ।
ঋতেহপি ত্বাং না ভবিষ্যন্তি সর্বে
যেহবস্থিতাঃ প্রত্যনীকেষু যোধাঃ।।..."

আমি লোকক্ষয়কারী অনাদী (প্রবৃদ্ধ) মহাকাল। এখন লোকসমূহকে ধংস করার জন্যই প্রবৃত্ত হয়েছি। যে সমস্ত যোদ্ধারা পক্ষ-প্রতিপক্ষ সৈন্যবাহিনীতে অবস্থিত আছে তারা, তুমি ছাড়া আর কেউ, থাকবেনা। হে অর্জুন, যাদের তুমি দেখছ তারা আমার দ্বারা পূর্বেই নিহত হয়েছে, তুমি নিমিত্তমাত্র। 'ময়ৈবৈতে নিহতা পূর্বমেব নিমিত্তমাত্রং ভব সব্যসাচিন্।।'

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কাল ছিল মানব সভ্যতার ঘোর তমসাচ্ছন্ন অধ্যায়। 'বর্বর' সভ্যতার ঊষাকাল থেকে ধর্মকেন্দ্রিক যত যুদ্ধ হয়ে এসেছে তাদের মধ্যে এমন পৈশাচিক মারণোৎসব পৃথিবী আর কখনো দেখেনি কেননা 'মিত্রশক্তি' ও 'অক্ষশক্তি' -- দুইয়েরই উদ্দেশ্য ছিল এক একটি জাতিকে, স্বাজাত্যাভিমানের নেশায় বিলুপ্ত করে দেওয়ার উন্মত্ত বুভুক্ষা -- রক্তপান করবার পিপাসা। ১৯৩৯-'৪০ সালেই যখন 'গান্ধীরা' এই মানবতার ঘাতকদের বিশ্বজোড়া আবির্ভাব দেখেছিলেন তখন মহাকালের ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া তাঁদের আর কিছু করবার ছিল না।

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২১/০১/২০২৬, কলকাতা।









শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০২৬

জাত্যাভিমান, ধর্মান্ধতা এবং গান্ধী ও যুদ্ধ--পর্ব ২

জাত্যাভিমান, ধর্মান্ধতা এবং গান্ধী ও যুদ্ধ--পর্ব ২


(প্রবন্ধের এই অংশটিতে ধৈর্য রাখতে হবে। পরের অংশে মূল বিষয়ের অবতারণা করা হবে।)

'যুদ্ধ' নামক মহাকালের কাপালিক যজ্ঞানুষ্ঠানের আরম্ভ এবং শেষ বলে কিছু নেই। মানুষের সভ্যতার, বলা ভালো আসুরী-পন্থী উন্নতির, এই মারণ ব্যাধির সম্পূর্ণ নিরাময়ের ওষুধও অদ্যাবধি অনাবিষ্কৃত। তবু বৈদ্য যাঁরা, ভিষক যাঁরা তাঁরা তো 'যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশ' -- এই প্রয়াসে চেষ্টা করেই যাবেন। 'গান্ধী' সম্প্রদায় সেই ভিষক গোষ্ঠীর মানবাত্মা। তাঁরা জানেন
"হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্ব,
ঘোর কুটীল পন্থ তাহার লোভ জটিলবন্ধ ..."
                                -----রবীন্দ্রনাথ
তবু মানুষের প্রতি ভালোবাসা, এই পৃথিবীটার প্রতি ভালোবাসা তাঁদেরকে প্রতিনিয়ত প্রাণিত করে এই মন্ত্রে যে জীবন ও জগৎ যতক্ষণ আছে ততক্ষণ আছে প্রাণের লীলা। যদি জীবন তার নির্দিষ্ট কালটুকু, এই আলোকোজ্জ্বল, আনন্দময় জগতে কাটিয়ে যেতে না পারে, যদি জীবন অকালে ঝরে যায়, যদি জগৎ বিকৃত, বিক্ষত, কুৎসিত হয়ে পড়ে তবে মানুষের সভ্যতা তো নিরর্থক। মাতৃস্তন্য পান করে শিশু বাঁচে, বড় হয় ; কিন্তু সেই মাতৃস্তন্য-অমৃতভাণ্ড যদি লালসার তরবারি ছিন্ন করে নিয়ে যায় তবে না বাঁচেন জননী, না বাঁচে শিশু, না কোন প্রয়োজনে লাগে ঘাতকের। জন্মদাত্রী জননীর সঙ্গে এই ধরিত্রীমাতার কোন পার্থক্য নেই। এখানেই লুকিয়ে আছে সত্যের রহস্য। প্রতিটি ব্যক্তি মানুষের প্রাণের উৎস যেমন মাতৃগর্ভ, জীবনে প্রাথমিকভাবে বেঁচে থাকা যেমন মাতৃদুগ্ধ এবং স্থিতি যেমন মাতৃক্রোড় ঠিক তেমনি সমগ্র প্রাণীজগতের কাছে এই পৃথিবীও মাতৃবৎ। প্রাণের অস্তিত্বের জন্য যেমন মা, বিশ্বপ্রাণের অস্তিত্বের জন্য তেমনই এই বসুন্ধরা। কবি বলেছেন না,
"আমারে তুলিয়া লহ অয়ি বসুন্ধরে,
কোলের সন্তানে তব কোলের ভিতরে,
বিপুল অঞ্চলতলে, ওগো মা মৃণ্ময়ী.."
                                      --- ঐ
এই বলা শুধুমাত্র কবির কাব্যোচ্ছ্বাস নয়। বিশ্বের মানব-অন্তরের আর্তি। মা যেমন অবিভাজ্য, এই ভূবনমণ্ডলও যদি তেমনি অবিভাজ্য, অবিভক্ত হোত তবে তবে যুদ্ধ নামক নরসংহারের প্রয়োজন থাকত না। কিন্তু সে হয়নি, হচ্ছে না এবং হবে না। আদিম শিকারজীবী  সাম্যবাদী সমাজের পরবর্তী কাল, খাদ্য উৎপাদনের সময়কাল হতেই আরম্ভ হয়েছে সবলতমের ক্ষমতার প্রতিযোগিতা। আহরণ, সঞ্চয় ; সঞ্চয়ের জন্য লুণ্ঠন, লুণ্ঠনের ভাগ বাঁটোয়ারা এবং লোভাতুরের হিংস্রতা। অতিসম্পদের উন্মত্ত আচরণ ও সম্পদহীনতার পর-অধিনতা। এ বিষয়ে আমাদের দেশের চাইতে বিদেশে গবেষণা করা হয়েছে অনেক বেশী, লেখা হয়েছে অনেক গ্রন্থ। জার্মান দার্শনিকগণ যেমন George W.F. Hegel, Ludwig Feuerbach, Bruno Bauer এবং সর্বোপরি Karl Marx ও Engles আদিম সাম্যবাদী ব্যবস্থা থেকে ঐতিহাসিক ক্রমপর্যায়ে সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং তার পর হতে কি ভাবে ঔপনিবেশিক আগ্রাসন ও সাম্রাজ্যবাদের সৃষ্টি হয়েছে তার বিশদে আলোচনা করে গিয়েছেন। Marks ও Engles-এর Historical Materialism (ঐতিহাসিক বস্তুবাদ), Dialectic Materialism (দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ)-লেখাগুলিতে ধনতন্ত্রের ধারণা, ধনতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা এবং ধনতন্ত্রবাদের অভ্যন্তরে, পাকা ফলের ভিতরে কীটের মত জন্ম-নেওয়া দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের তত্ব আমরা জেনেছি। এবং এই ধনতন্ত্রই যে মানুষের ক্রম-উন্মেসিত চেতনাকে, শিক্ষা সংস্কৃতির সাধনা এমনকি 'ধর্মধারণা'কেও নিয়ন্ত্রণ করে তারও মীমাংসা তাঁরা করেছেন অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে। কিন্তু ধনবৈষম্যের দ্বন্দ্ব থেকে সংহাত ও সংগ্রামের শেষে নারকীয় ও ধংসাত্মক পরিণামের সৃষ্টি হয়, এ কথা যেমন গবেষণাসিদ্ধ, তেমনি 'ধর্মও' কখনো কখনো ভিন্ন ভিন্ন নির্দয় তত্বের অবতারণা করে, ভিন্ন ভিন্ন জীবনাচরণের নির্দেশ দিয়ে বা 'স্মৃতিগ্রন্থ' রচনা করে মানবসমাজে বিভেদের বিষবৃক্ষ রোপণ করে-- এও ততোধিক সত্য।
এখানে মনে রাখতে হবে যে 'ধর্ম' (religion) আর ধর্মধারণা বা ধর্মদর্শন কিন্তু এক নয়। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মগুলির সৃষ্টি ও প্রতিষ্ঠা হয়েছে ন্যূনধিক দুই থেকে আড়াই হাজার বছর আগে (ভারতীয় ধর্মধারণার কথা পরে)। ইউরোপে এবং মধ্যপ্রাচ্যে আব্রাহামীয় ধর্ম, একেশ্বরবাদী ধর্মের প্রচার ও প্রসার ঘটেছিল। ইহুদি ধর্ম, খ্রিষ্ট ধর্ম, ইসলাম ধর্মগুলিকে আব্রাহামীয় মূল ধর্মের মধ্যেই পড়ে। তার সঙ্গে বাহাই ধর্ম, দ্রুজ ধর্ম রাসতাফারী প্রভৃতি ধর্মগুলিরও উৎস আদি পিতা নবী আব্রাহাম বা ইব্রাহিম। "The Abrahamic religions of The Semitic, a group of religious doctrines of Monotheistic belief that admire and offer sacrifices for Abraham by Judaism, Christianity, Islam and some other sects of same believers."
নবী ইব্রাহিম বা আব্রাহামের জন্মের সময়কাল সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মতবিরোধ আছে, তবে একটি সর্বসম্মত ধারনা এই যে এই আদি মানব, আদিপিতার অস্তিত্ব ছিল খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ থেকে ১৭০০ সালের মধ্যে। ইসলামিক ও প্রাচীন বাইবেলের সূত্রমতে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের মেসোপটেমিয়া অঞ্চলের উর নামক শহরে জন্মগ্রহণ করেন।
ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের ধর্মমতের উৎস ও প্রসার সম্মন্ধে এই অতি সামান্য (আব্রাহামীয় ধর্মমত, যার বিভিন্ন মূল শাখার ইতিহাস সমুদ্রের মতো গভীর, আকাশের মত ব্যপ্ত) ভূমিকা দেওয়া হোল এই কারণেই যে এই সমস্ত ধর্মমতগুলি একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী হলেও ইউরোপের মানবেতিহাস দেখেছে ইহুদি ও খ্রিস্টান, খ্রিস্টান ও ইসলামের মধ্যকার অসংখ্য রক্তক্ষয়ী সংঘাতের দৃশ্য ও দৃষ্টান্ত। এই ঘটনার প্রধান যে কারণসমূহ আছে তার মধ্যে মূল কারণ ছিল রাজার হাতে, ধর্মগুরুদের হাতে ধর্মের নিয়ন্ত্রণ। (এই প্রসঙ্গে মৎপ্রণীত 'বিন্দুতে সিন্ধুদর্শন --প্রথম খণ্ড'-এ 'ধর্মসংকটের বলি মানবতা' প্রবন্ধটিতে সবিস্তারে বর্ণনা করা হয়েছে)। বর্বরদের অবিরাম আক্রমণে পশ্চিম রোম সাম্রাজ্য সম্পূর্ণ ধংস হয়ে গেল ৪৭৬ খ্রিষ্টাব্দে। তারপরও দীর্ঘদিন পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল, যার রাজধানী ছিল কনস্টান্টিনোপোল (Constantinople). সম্রাট কনসস্টানটাইন (Constantine the Great (AD 272-337) ৩১২ খ্রিষ্টাব্দে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেন। ইতিহাস বলছে, He played a pivotal role in elevating the glorious status of Christian religion and Christian culture in Rome, simultaneously decriminalising Christian practice and ceasing Christian persecution. This was a turning point in Christianisation of the Roman Empire.
ইতিহাসের এই তথ্যগুলি দেওয়ার উদ্দেশ্যে হোল মহান ক্ষমতাশালী সম্রাটদের, রাজাদের, সামন্ত প্রভুদের হাতে ধর্মের দণ্ড যাওয়ার ফলে সাধারণের সাধনার 'উপায়' বা 'পথ' আর রইল আর না। স্বভাবতঃই ধর্ম হয়ে উঠলো শাসনের, ত্রাশনের, জোর করে অন্য ধর্মের জাতি গোষ্ঠীকে ধর্মান্তরিতকরণের, নির্দিষ্ট ধর্মভুক্ত জাতি গঠনের এবং অন্তিম ফলস্বরূপ জাতিরাষ্ট্র গঠনের হাতিয়ার ; আর সেই হাতিয়ারে ভর করে এসেছে রাষ্ট্রতন্ত্র এবং রাষ্ট্রের একাধিপত্য কায়েম করবার বাসনার ফলে জন্ম হয়েছে ঔপনিবেশিকতা ও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের। জাতিরাষ্ট্রের সর্বগ্রাসী আগ্রাসনে সংঘটিত হয়েছে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে যুদ্ধ এবং সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের পরিণতি হয়েছে মহাযুদ্ধ।
আবার একই দেশের গণ্ডির মধ্যে ধর্মান্ধতা এনেছে সাম্প্রদায়িক বিভাজন, বিভেদ এবং দাঙ্গা ও সংখ্যালঘুদের উৎসাদন ও উৎসার্জন। ইউরোপখণ্ডের ইতিহাস ছেড়ে একেবারে ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিবৃত্ত আলোচনায় আসি। এখানে ইংরেজ এসেছিল একটি বানিজ্যিক সংস্থারূপে, ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী। (১৬৫১ সালে হুগলিতে তাদের প্রথম বানিজ্যিক কুঠি স্থাপিত হয়। কিন্তু প্রকৃত আরম্ভ বলতে ১৬৫৮ সাল, যদিও ১৬০০ খৃষ্টাব্দে ইংল্যান্ডের রাণী প্রথম এলিজাবেথ এই বাণিজ্যিক সংস্থাকে ভারতে ব্যবসা করবার সনদ প্রদান করেন। এই কোম্পানির সঙ্গে জব চার্নকের নাম ও জড়িত থাকার কারণ ১৬৯০ খ্রিস্টাব্দে তিনি প্রথমে সুতানুটি ও পরে কলকাতা ও গোবিন্দপুর নামের আরো দুটি গ্রাম যুক্ত করে যে কুঠি স্থাপনা করেন তাই কলকাতা শহরের আদি পত্তনরূপে ইতিহাসে স্বীকৃতি লাভ করেছে। এই কথাগুলি কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক)। এই ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ভারতবর্ষে ইংরেজ সাম্রাজ্য বিস্তারের ও প্রতিষ্ঠার সূচনা। পরের ইতিহাস প্রায় দু'শ বছরের ইংরেজ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ভারতবর্ষ -- পূর্বে রেঙ্গুন (বর্তমানের মায়ানমার) থেকে পশ্চিমের গুজরাট, উত্তরের হিমালয়, উত্তরপশ্চিমদেশের আফগানিস্তান ছুঁয়ে দক্ষিণের রামেশ্বরম। দেশের বহু রাজার রাজত্ব ছিনিয়ে নিতে নদীস্রোতের মত রক্তের স্রোত বহাতেও তারা কসুর করেনি। সমগ্র ভারতবর্ষ দখল যখন শেষের পর্বে তখন, ঠিক একশ'বছর পর (১৮৫৭ সালে) ইংরেজ সাম্রাজ্য শক্তির বিরুদ্ধে একটি সর্বভারতীয় স্তরে প্রকৃত বিদ্রোহ সংঘটিত হয় এবং তার বিয়োগান্তক পরিণতিও হয় শেষ মোগল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদূর শাহের পতন ও তাঁকে হত্যার মধ্যে দিয়ে।
ইংরেজ শাসনের দুটি ফল ফলেছিল। প্রথমটি হোল বহু রাজতন্ত্রে বিভাজিত ভারতে একটি স্বাদেশিকতাবোধ অর্থাৎ ভারতীয়ত্ব এবং দ্বিতীয়ত উনবিংশ শতাব্দীর শেষ অধ্যায় থেকে ভারতীয়দের ঐক্যবদ্ধভাবে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার জাগরণ। কিন্তু সেই যে ১৮৮০-র দশকের সময়কাল থেকে ১৯৪৭-এ স্বাধীনতা লাভ করা পর্যন্ত ভারতবর্ষের যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা তা বিকৃত হয়েছে, বিচ্যুত হয়েছে হিন্দু ও মুসলমান সাম্প্রদায়িক বিভাজনের জন্যে। কিন্তু স্বাধীনতার সংগ্রাম থামেনি। অজস্র অজস্র রাজনৈতিক নেতা নেতৃত্ব দিয়েছেন। সহিংস ও অহিংস আন্দোলন যুগপৎ চলেছে। ওদিকে বিংশ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকেই ইউরোপেও পরিব্যাপ্ত পরিসরে জাতিরাষ্ট্রগুলির মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪ -১৯১৯) তার একটি ভয়ঙ্কর পরিণতি। এবং সেই সময় থেকেই, দেশের এবং বিদেশের এই অমানবিক যুদ্ধকে প্রতিহত করবার জন্য দুটি পথ অবলম্বন করা হয়েছে পৃথিবীর সর্বত্র জুড়ে। রাষ্ট্রনেতারা বিভিন্ন রাজনৈতিক রণকৌশল ও রণনীতি প্রয়োগ করবার চেষ্টা করেছেন। এমনকি রাজনীতি থেকে দূরে সরে থাকতে চাওয়া বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিদ্বান, শিল্পী, সাহিত্যিক, দার্শনিকেরাও তাঁদের মত সোচ্চারে ঘোষণা করেছেন। এই দ্বিতীয় দলের মানুষদের মত ছিল সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে, রূঢ় জাতিসত্তার বিরুদ্ধে, নিষ্ঠুর রাষ্ট্রবাদের বিপক্ষে এবং অহিংসার ও মানবতার সপক্ষে। এখানেই 'গান্ধী'-দের আলোচনা হতে পারে।
মানবতাবাদী, অহিংসাধর্মের প্রবর্তক ও প্রচারক, যুদ্ধের বিরুদ্ধে 'যুদ্ধ' করে যাঁরা জীবনদান করে গিয়েছেন,  চরম ব্যর্থতা ও বিফলতার গরল পান করে গিয়েছেন যাঁরা, তাঁদের কথা বলার জন্যই এতখানি পশ্চাৎপট স্থাপনা করা হোল।
এবার পর্ব ৩, আগামীতে।

               (ক্রমশঃ) 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১৬/০১/ ২০২৬
কলকাতা।




বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬

Affection

Affection
Every mortal thing, one day I know,
Will disappear and fade away, so
Allure me nothing but the feeling
Of Love, affection and soothing
Words of compassion that heal the hearts,
Bring to us the very touch of immortality.
Trisha has all those hued beams of a Star
And our fear of being in penury seems so far.
__________________________________
We pray for you a long and triumphant life ahead on your Birthday.
Bapi and Ma.
15/01/2026
Kolkata.

সোমবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬

জাত্যাভিমান, ধর্মান্ধতা এবং গান্ধী ও যুদ্ধ

জাত্যাভিমান, ধর্মান্ধতা এবং গান্ধী ও যুদ্ধ।

(৩০শে জানুয়ারী, গান্ধীহত্যা স্মরণে। এই লেখাটি আগামী ৩০শে জানুয়ারী, ২০২৬ পর্যন্ত চলবে। প্রবন্ধটি পরিবর্ধিত আকারে পুনর্লিখিত।)

"প্রেমে বাঁচি, প্রেমেই ধরি, প্রেমেই বাঁধি তোকে ;
মরে গেলে প্রেমের মালা রাখিস আমার বুকে।"* 

"আজ সঙ্ঘ পরিবার যে দাবি তুলছে তার অনেকগুলির উৎস গত শতাব্দীর ত্রিশের দশকের হিন্দু সত্তাসংকটে। হিন্দু মহাসভা বলতে থাকে ভারতীয় সংস্কৃতি ও হিন্দু সংস্কৃতি সমার্থক। ভারতীয় জাতীয়তাকে হিন্দু জাতীয়তা হতে হবে। সাভারকার বললেন হিন্দুস্থানকে শুধু পিতৃভুমি মানলে চলবে না, পুন্যভূমি বলেও মানতে হবে। এর অর্থ যে মুসলিমরা হবে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক, তা অনুল্লেখ্য কিন্তু স্পষ্ট।"
                                     ----অমলেশ ত্রিপাঠী।

১৯৩৯ সালে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের গুরু গোলওয়াকার এক পুস্তিকায় লেখেন ----
"The non-Hindu peoples in Hindustan must either adopt the Hindu Culture and language, must learn to respect and hold in reverence Hindu religion, must entertain no ideas but those of glorification of the Hindu race and culture. ... In one ward, they must cease to be foreigners, or may stay in the country, wholly subordinated to the Hidu Nation, claiming nothing, deserving no privileges ----- far less any preferential treatment ----- not even citizen's rights."
        (---We or Our Nationhood Defined) 

বিগত শতাব্দীর সেই ত্রিশের দশকের বিশ্বধংসী বিবাদ। স্লাভ ও ইহুদী জাতিকে অবদমিত করে বিশুদ্ধ আর্যত্বের শ্রেষ্ঠত্ব-ঘোষণা। হিটলার বিষাক্ত শাণিত বক্তব্যে প্রচার করতে লাগলেন সেমেটিক জাতির ষড়যন্ত্রে  আর্য জার্মানী বিপন্ন। ভারতেও সেই একই উচ্চারণ, একই ঘোষণা ! আর এস এস-এর মুখপত্রে সেই একই আসন্ন জাতিদাঙ্গার নরমেধ যজ্ঞে ঘৃতাহুতি ! হিন্দু জাতি, হিন্দু সংস্কৃতির, হিন্দু ধর্ম বিপন্ন ! অপরদিকে, প্রথম দশক থেকেই সৈয়দ আহমদের প্রচার। তার আলীগড় দলের দাবী,--- পৃথক নির্বাচন, বিশেষ গুরুত্ব (weightage). নূতন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল কুড়ি ও ত্রিশের দশকে। আরও তীব্র, তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল সাম্প্রদায়িক বিভাজন। এখানে উল্লেখ করা দরকার সেই ১৯০৫/'০৬ সাল থেকেই ইংরেজদের divide and rule. কার্জন, মিন্টো, রিজলেদের চক্রান্ত।  ফল হাতে হাতে। ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মুসলিম লিগ, পরের বছর হিন্দু মহাসভা। (প্রাতিষ্ঠানিক নামকরণ ১৯২১)। এর পরেকার ইতিহাস বিসর্পিল, জটীল এবং অমানবিক।

এইভাবে ভারত স্বাধীন হওয়ার বহু পূর্ব-সময়কাল থেকেই ভারতবাসীর ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের দায় যাঁরা নিয়েছিলেন তাঁদের অবিমিশ্রকারিতা ও অদূরদর্শিতার  ফলে সাম্প্রদায়িকতা ধীরে ধীরে এমন এক নারকীয় পরিবেশ সৃষ্টি করল যার শেষ, বীভৎস পরিণতি এল ১৯৪৬-সালে। ওই বছর ১৬ই আগষ্ট, ১৯৪৬ মহম্মদ আলি জিন্না 'প্রত্যক্ষ সংগ্রামের' ডাক দিলেন। তিনি  ঘোষণা করলেন 'বিভক্ত ভারত অথবা ধ্বংসপ্রাপ্ত ভারত'। শুরু  হয়ে গেল সাম্প্রদায়িক সহবস্থানের শ্মশানযাত্রা। জ্বলে উঠলো দাঙ্গার চিতাবহ্নি। হু হু করে ছড়িয়ে পড়ল সেই নারকীয় লেলিহান শিখা। প্রথমে কলকাতার দাঙ্গা, (the great calcutta killing)। তারপর তা ছড়িয়ে গেল বিহার, বাঙলার পূর্বপ্রদেশ, যুক্তপ্রদেশ (অধুনা উত্তর প্রদেশ), পাঞ্জাব, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে। কলকাতায় মৃত্যু হয়েছিল ৪০০০ মানুষের উপর, গৃহহীন লক্ষাধিক। এবং তারপরই সমুহ সর্বনাশ --- বাঙলার ইতিহাসের বিভীষিকা নোয়াখালীর গণসংহার---- লুণ্ঠন,  নারীধর্ষণ, শিশু-কিশোর-তরুণ-বৃদ্ধদের নির্বিচারে হত্যা ---
"Great Naoakhali massacre: In October and November 1946 the historical massacre, rapes and abduction -- one of the cruelest forms of Riots happened in human civilization, with bladed weapons, arson, looting and forced conversion. Around 50,000 people were marooned on the holy day of Kojagori Lakshmi Purnima."
যা ভারতের বুকে দুর্মোচনীয় ভেদরেখা এঁকে দিয়ে দিয়ে গেল চিরকালের জন্য। দাঙ্গা বন্ধ করার তাগিদ নিয়ে, দাঙ্গাবিধ্বস্ত মানুষের আর্তনাদ শোনার আন্তরিকতা নিয়ে, দেশের কোন হিন্দু বা মুসলমান নেতৃত্ব যান নি সেদিন। গিয়েছিলেন আশাহত, বিধ্বস্ত বৃদ্ধ গান্ধী আর দেশের মাতৃসমা নারীনেত্রী সুচেতা কৃপালিনী। কিন্তু তাঁদের দৌত্যও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিল কেননা গান্ধীজীর অনুপস্থিতিতেই কংগ্রেস তখন মেনে নিয়েছিল দেশভাগ। মারণলিপ্সার নরমেধ যজ্ঞে পূর্ণাহুতি !  বাঙলা আর পাঞ্জাবের উদ্বাস্তুদের জীবন হয়ে উঠল জীবন্ত নরক।
বাঙলার এই মর্মান্তিক ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির অবকাশ এখানে নেই। এই ঐতিহাসিক হিংসার প্রতিহিংসা, আবারও হিংসা এবং এই নারকীয় মানবাত্মার আত্মহনন আবার কখনো কোথাও যেন না ঘটে যুদ্ধ তো তার জন্যই হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু হয়েছে কতটুকু ? উপরন্তু সেই নিভে যাওয়া চিতায় কলস কলস গরলভর্তি জ্বালানি ছড়িয়ে দেওয়া চলেছে পৈশাচিক উন্মত্ততায়, যার উচ্চকণ্ঠের রণহুংকারে ক্ষীণ হয়ে এসেছে মানব-প্রেমের বীণার ধ্বনি। (একটি স্বতন্ত্র প্রবন্ধে সেটি লেখার ইচ্ছা রইল)।
" দেশ স্বাধীন হল, দেশভাগ হল --- রেখে গেল কি গ্লানিময় পঙ্কসয্যা ---- দেশ হারাবার, প্রিয়জন বিচ্ছেদের, গণহত্যা, নারীধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুণ্ঠনের কী দুর্মর দুঃস্বপ্ন ! এই দুঃস্বপ্নের‌ দুর্মোচনীয় অভিশাপ ভারতের  ধর্মীয় রাজনীতিকে পরিপুষ্ট করছিল, (আজও করে চলেছে)। 
গান্ধীর দিকে আঙুল তুলে সেদিন আর এস এস বলেছিল‌, 'হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের কথা বলে দেশের প্রতি  সবচেয়ে বিশ্বাঘাতকতা করেছেন তিনি।''
তাই কি 'হিন্দুদের ঈশ্বরের দূত' হয়ে এসেছিলেন তিনি,   যিনি তাঁকে তাঁর উন্মুক্ত বুকে গুলি করলেন প্রার্থনা মন্দিরে ? যুগ যুগ আচরিত সনাতন ধর্মের ফরমান নিয়ে ? অহিংসার পূজারীর শোণিতার্ঘ্য দানের পরেও কি দেশমাতৃকার আরও বলি চাই ? আরও রক্তাঞ্জলি ?!
সে দিনের পর থেকে বর্তমান সময়কাল পর্যন্ত দেশের বিধাতৃ যাঁরা, ঈশ্বরের দূত যাঁরা‌, তাঁরা গান্ধীজীর জন্মদিনে, মৃত্যুদিনে তাঁর‌ সমাধিস্থলে‌‌ পুষ্পস্তবক রাখেন, মালা দেন, নীরবতা পালন করেন।  তা অনুতাপের, না স্বস্তির ? বোঝা যায়না। 
বোঝা না গেলেও এটুকু উপলব্ধি করা যায়‌ যে 'হিন্দু' আর 'মুসলমান' এই শব্দ দুটিকে দুটি সম্প্রদায়ের 'প্রতিনিধি' করে রঙ্গমঞ্চে এক ভয়ঙ্কর ও উত্তেজনাকর যাত্রাপালা আরম্ভ হয়েছে আবারও। এই যাত্রাপালার কুশী-লবদের দুটি পক্ষ। এক পক্ষ 'সনাতনী' বা 'হিন্দু' নামে, অপরপক্ষ 'ইসলাম বা মুসলিম বা মুসলমান' বলে‌ নিজেদের অস্তিত্ব ঘোষণা করেন।
গভীরভাবে যদি এই কুশী-লবদের বাস্তবজীবনের আলোচনা করি তবে দেখব তাদের উভয়েরই জন্মভূমি, কর্মভূমি একই ; সাধন ভূমি, অর্থাৎ জীবনাচরণের ঠাঁইও এক। জন্ম এই মাটিতে এবং ছাত্রাবস্থা, গার্হস্থ্য, প্রৌঢ়ত্ব বার্ধক্য পেরিয়ে একই মাটিতে--- চিতায় বা কবরে শেষ আশ্রয়। তাহলে 'হিন্দু' ও 'মুসলিম'- দের মধ্যে এই বিদ্বেষ, বিভাজন ও হিংস্রতার কারণ কি ? কারণ ধর্মকে অস্ত্ররূপে, পন্যরূপে, শোষণের জাদুদণ্ডরূপে ব্যবহার করবার প্রবনতা। 

(এ বিষয়ে বিশদে আলোচনা আছে  মৎরচিত 'ধর্মসংকটের বলি মানবতা' প্রবন্ধে, গ্রন্থ-- 'বিন্দুতে সিন্ধু দর্শন'।)

আধিপত্য বিস্তারের প্রয়াসে ধর্ম কিভাবে রাজা, সম্রাট, রাজনীতির নায়কদের তথা শাসকের হাতের অস্ত্র হয়ে উঠেছিল (এবং উঠেছে) তার অমানবিকতার, নির্মমতার ইতিবৃত্ত রোমান ক্যাথলিকদের 'ইনকুইজিশন'- এ, ক্রুশেড যুদ্ধের সময়কালে এবং খ্রীষ্টান রাজশক্তির ক্রমসম্প্রসারণের উদগ্র অভিযানে সভ্যতার কলঙ্কিত কালিমায় লিপিবদ্ধ আছে।  বিশেষ করে এশিয়ার ও‌ ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলিকে শাসনে, ত্রাশনে রাখার জন্যে, শোষণের‌ শাসনতন্ত্র কায়েম করবার উদ্দেশ্যে ধর্মকে অস্ত্র হিসাবে যেভাবে তারা ব্যবহার করেছে তাতে সে সকল দেশের কত যে অবোধ প্রাণ, মৌলিক সংস্কৃতি, ভাষা ও আদিম সমাজব্যবস্থা ধংস হয়ে‌ গিয়েছে তার ইয়ত্তা নাই।
আর আমাদের দেশে এই দুটি জাতির ধর্মবিশ্বাসের মধ্যে সহনশীল সহবস্থানের চেষ্টা চলেছে প্রায় এক হাজার বছর ধরে। দুটি ধর্মধারণার কঠোরতা ভেঙে, মিলনাত্মক ধর্মবোধের সৃষ্টিও হয়েছে, (যেমন পীর, সত্যপীর, ফকিরী, মুরশেদী, আউল বাউল প্রভৃতি---) কিন্তু ধর্মগুরুদের, ধর্মের মোরসীপাট্টা যাদের হাতে, তারা তাদের নিহিত বা কায়েমি স্বার্থের চিরকালিন প্রভুত্ব হারাবার আতঙ্কে ধর্মের বিচারহীন মৌলবাদি কাঠামোটিকে রক্ষা করবার অজুহাতে, প্রচ্ছন্ন বা অপ্রচ্ছন্নভাবে ঐ মানবিক‌ মিলনপ্রয়াসী লোকায়ত ধর্মভাবগুলির বিরুদ্ধে নিষ্ঠুর আঘাত হেনেছে, যুগে যুগে। এই আঘাত দুই দিক থেকে। প্রথম রাজা বা শাসনতন্ত্রের সাহায্য নিয়ে ; আর দ্বিতীয় সামাজিকভাবে ঘৃণা ছড়িয়ে এবং হিংস্র অত্যাচারের মাধ্যমে।
দূর বা অনতিদূর ইতিহাস স্মরণে না এনেও একেবারে বর্তমান ভারতবর্ষের প্রক্ষাপটে বিচার করলে স্পষ্ট হয়ে উঠবে এই ভয়ঙ্কর সত্য। ভারতবর্ষের অভ্যন্তরিণ সমাজ পরিবেশে হিন্দুত্বের উগ্র উন্মাদনাপ্রসূত অ-হিন্দুদের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন এবং বহিরাগত ঐশ্লামিক কট্টরপন্থীদের দ্বারা নিরস্ত্র, নিরীহ, পর্যটকদের অচিন্তনীয় বিভীসিকাময় গণহত্যা। 

এই যে বিদ্বেষ ও ঘৃণা, হিংসা ও হত্যা --- উক্ত ধর্মগুলির শাস্ত্রও নাকি সমর্থন করে। শুধু সমর্থনই করে না, পুরস্কারের প্রতিশ্রুতিও দেয়। যারা নিজ নিজ 'ধর্ম'কে ঐরূপ নির্দয়তার সঙ্গে পালন করবে তাদের জন্য মহান স্রষ্টা বা দেবতা ও দেবতারা চিরবসন্তবিরাজিত, জরা-মৃত্যু-ব্যাধিহীন, ভোগবিলাসের উপকরণসমন্বিত অক্ষয় স্বর্গলাভের ব্যবস্থা করেই রেখেছেন।
এমত বিশ্বাস যদি ধর্মবিশ্বাসীদের মনের মধ্যে একবার দৃঢ়ভাবে প্রোথিত হয়ে যায় তবে তাদেরকে প্রতিহত করা, প্রতিরোধ করা দুরূহ ; স্বয়ং ঈশ্বর (যদি নিখিল বিশ্বের অনাবিস্কৃত কোন জ্যোতিরর্মণ্ডলে থেকেও থাকেন) ধরাধামে সকায়ে অবতীর্ণ হলেও তাঁর পক্ষেও সম্ভব হবে না। তিনিও নির্ঘাত ব্যর্থ হবেন ; যেমন ব্যর্থ হয়েছেন মানব চৈতন্যের মূর্ত মূর্তি গৌতম বুদ্ধ, জৈনমুনি, মুশা-ঈশা-মহম্মদ, শ্রীচৈতন্য, শ্রীরামকৃষ্ণ তেমনই ব্যর্থ অহিংসার পূজারী মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী।
তেমনই আবার আমাদের, জাতি-ধর্ম-বর্ণ-হারা যারা, তাদেরও ক্ষীণ, রুগ্ন, সন্ত্রস্ত মানবিক প্রার্থনা অশ্রুতই থেকে যাবে  আততায়ীর বুলেট-বোমা-বারুদের কর্ণবিদারী মারণনাদের তান্ডবে।
নিয়তি কেন বাধ্যতে।

অস্ত্রহীন সংগ্রামের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম চিরদিনই জয় পেয়েছে, অস্ত্রহীনকে হত্যা করে জয় পেয়েছে, অস্ত্রহীনের অস্তিত্ব সম্পূর্ণ বিনষ্ট করে জয় পেয়েছে। কিন্তু যে নিরস্ত্র, যে নিষ্প্রাণ হয়ে গেল, তার জন্য মানুষের করুণা এবং অস্ত্রধারী ঘাতকের প্রতি ঘৃণা জেগে ওঠে। এটিই মানবতার ধর্ম বা মানুষের স্বাভাবিক প্রবনতা। হাজার হাজার বছরের ইতিহাস বলে যে মানবসভ্যতার কলঙ্কিত ঘটনাগুলির মধ্যে সর্বপ্রধান যে ঘটনা তার হোল যুদ্ধ। যুদ্ধ কেন হয় তার অসংখ্য কারণ আছে। এই ভারত নামক উপমহাদেশের অভ্যন্তরে রাজায় রাজায় যুদ্ধ, যুগ যুগ ধরে গ্রীক-পারসিক,'শক্ হুনদল পাঠান মোগল'- দের বহিরাক্রমণ, ফরাসি-ইংরেজদের ঔপনিবেশিক দখলদারী -- কেন হয়েছিল সে সবের শত-সহস্র হেতু ঐতিহাসিকগণ গবেষণা করেছেন, করছেন এবং আগামী কালেও করবেন। কিন্তু সে সবের ক্ষয়-ক্ষত-ক্ষতির দগদগে ঘা-য়ের যন্ত্রনা নিরীহ মানুষের আপাত নির্দ্বন্দ্ব সমাজকে ভোগ করতে হয়, ভোগ করতে হয়েছে, ভোগ করতে হবে। 'সভ্যতার' নিয়তি। কিন্তু ওই যুদ্ধের 'শত সহস্র কারণ'-গুলির মধ্যে যখন 'ধর্ম', জাত্যাভিমান, রাষ্ট্রের একাধিপত্যের অভিমান উগ্র হয়ে ওঠে তখনই রক্তপাতের বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। যা হয়েছে ইউরোপখণ্ডের মধ্যেযুগের ধর্মযুদ্ধে, (খ্রিস্টান-অখ্রিষ্টান, ক্যাথলিক-ইহুদি, খ্রিস্টান-ইসলাম)। অন্যদিকে জাত্যাভিমান ও জাতিগত রাষ্ট্রের একাধিপত্যের অভিমান 'বিশ্বসভ্যতাকে' অসভ্য বর্বরতার দিকে নিয়ে গিয়েছে এবং এখনও সেই নৃশংসতার দৃষ্টান্ত পৃথিবীর দিকে দিকে দৃশ্যমান। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পৃথিবী নামক গ্রহটির ভূভাগে সঞ্চিত, প্রকৃতিজাত, প্রাণ ও প্রাণীসম্পদ লুণ্ঠনের ভয়ানক প্রতিযোগিতা।
এই যে বিশ্বব্যাপী সংঘাত, তার কি নিরসন বা প্রশমন হওয়ার সম্ভাবনা আছে ? এক বাক্যে, নির্দ্বিধায় বলে দেওয়া যায় "নেই"। কেন নেই ? তার কারণ বিচার করে দেখুন, পৃথিবীর প্রতিটি দেশ জুড়ে অত্যাধুনিক অস্ত্র নির্মাণ, অস্ত্র আমদানি ও অস্ত্র রপ্তানির নির্বিবেক আস্ফালন। ভাবা গিয়েছিল, গত শতাব্দীর মধ্যভাগে, যখন জার্মানি, জাপান, পোলান্ড, রাশিয়া, অষ্ট্রিয়া --- মহাভারতের যুদ্ধশেষে কুরুক্ষেত্রের শব-আকীর্ণ বধ্যভূমির মত নরনারী শিশুদের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছিল, তখন হয়তো বিশ্ববিবেকে এমন সন্তাপ সৃষ্টি হবে যাতে বিজ্ঞান গবেষণাগারগুলিকে, দূর ভবিষ্যত পর্যন্ত আর মানবপ্রাণের কষায়খানায় পরিনত করা হবে না। কিন্তু তা হয়েছে কি ? হবে কি?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আউৎউইৎসের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প, মৃত, অর্ধমৃত, পঙ্গু সৈনিক, সাধারণ মানুষের (শিশু কিশোর বনিতা বৃদ্ধদের), যা সমকালের ঐতিহাসিকেরা মোটামুটিভাবে পরিসংখ্যান দিয়েছিলেন -- সেই নরকের অস্পষ্ট ও সামান্য ছবি দেবার চেষ্টা করেছি আমার পূর্বতন "বিন্দুতে সিন্ধুদর্শন --১ম খণ্ড" গ্রন্থে।
এখানে সেই ইতিবৃত্তের পুনরাবৃত্তি না করে বলি কেন 'গান্ধীদের' এই ধরাধামে আগমন ঘটে এবং কেনই বা তাঁদের নিধন করা হয় ? 

(প্রশ্নের উত্তর দ্বিতীয় পর্বে)
* জয়দেব কেন্দুলীর এক বাউলভাইয়ের অনুরোধে আমার লেখা একটি বাউল গানের প্রথম দুটি কলি।
                       ( ক্রমশঃ)
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১শে জানুয়ারী,২০২৬ 
কলকাতা।
___________________________________________

শনিবার, ১০ জানুয়ারি, ২০২৬

Love

    Love 

(Happy Birthday to Krishiv)

We Love you for you are loving,
We Love you for you are having
The sweetness that soothes our hearts,
That smiles that a Jesmine knows the art,
And all love you for you are so cute,
That even in noise you remain mute.
But, above all, you are the grandson,
The ☀️ sun that does our souls brighten
Day in and day out ; and on your Birthday
To God we'll for you do pray and pray.
To you happy Birthday, happy Birthday.

---- Grandpa and Grandma.
January 10, 2026.

রবিবার, ৪ জানুয়ারি, ২০২৬

দুঃখ পর্ব-৩

               দুঃখ-পর্ব ৩ 


আমাদের প্রাচীন সাহিত্যের মধ্যে চতুর্বেদ, ব্রাহ্মণ ও আরণ্যকগুলি, উপনিষদসমূহ, শ্রীমদ্ভগবদগীতা, দর্শনগ্রন্থ (ষড়দর্শন), এবং বৌদ্ধ, জৈন ধর্মদর্শনের অসংখ্য গ্রন্থরাজি ছাড়াও অষ্টাদশটি পুরাণ আছে। দুটি প্রধান মহাকাব্য আছে। রামায়ণ ও মহাভারত। রামায়ণ প্রকৃত অর্থেই একটি অপরূপ কাব্য যেখানে রাম-রাবণের যুদ্ধ প্রধান হলেও অপ্রধান আখ্যানভাগ- -যেমন রামচন্দ্রের জন্মকালের প্রাক-কাহিনী থেকে সীতাহরণ, সীতাদেবীর সন্ধান, সাগরবন্ধন। মাঝখানে মহারণ। যুদ্ধের পরবর্তীকালে রামের অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তন, রামরাজত্ব, সীতাদেবীর পুনরায় নির্বাসন এবং রামসন্নিধানে সীতার কুণ্ঠিত পুনরাগমন ও তাঁর পাতাল প্রবেশ -- এই আখ্যানগুলির রামায়ণ মহাকাব্যের কাব্যিক প্রকাশ তুলনারহিত। (যদিও অনেক পণ্ডিতদের মতে রামায়ণের 'উত্তরা খণ্ড' প্রক্ষিপ্ত ; আমারা সে দ্বন্দ্বে যেতে চাই না)। রামায়ণকে 'প্রকৃত অর্থেই' কাব্য বলতে চেয়েছি এই কারণেই যে সে কাহিনী মহাকবির মনোভূমির ফসল। ব্রহ্মার নির্দেশ পেয়ে নারদ ঋষি যখন বাল্মীকিকে রামচরিত রচনা করবার আদেশ করেন তখন আদিকবি সত্যাসত্যের দ্বন্দ্বে দ্বিধান্বিত ছিলেন। কিন্তু নারদ বলেছিলেন, "সেই সত্য যা রচিবে তুমি।" বাল্মীকি ও নারদের কথোপকথনের কিছু অংশ আরেক কবির বাণীতেই শুনি, 

"ত্রিভূবন তোমাদের প্রত্যক্ষে বিরাজে --
কহ মোরে কার নাম অমর বাণীর ছন্দে বাজে।
কহ মোরে বীর্য কার ক্ষমারে করে না অতিক্রম,
কাহার চরিত্র ঘেরি সুকঠিন ধর্মের নিয়ম
ধরেছে সুন্দর কান্তি মানিক্যের অঙ্গদের মত,
মহৈশ্বৈর্যে আছে নম্র, মহাদৈন্যে কে হয়নি নত,
সম্পদে কে আছে ভয়ে, বিপদে কে একান্ত নির্ভীক,
কে পেয়েছে সব চেয়ে, কে দিয়েছে তাহার অধিক,
কে লয়েছে নিজ শিরে রাজভালে মুকুটের সম
সবিনয়ে সগৌরবে ধরামাঝে দুঃখ মহত্তম, --
কহ মোরে সর্বদর্শী, হে দেবর্ষি, তার পুন্য নাম।
নারদ কহিলা ধীরে -- অযোধ্যার রঘুপতি রাম।
জানি আমি জানি তাঁরে, শুনেছি তাঁহার কীর্তিকথা,
কহিলা বাল্মীকি, তবু নাহি জানি সমগ্র বারতা,
সকল ঘটনা তাঁর --- ইতিবৃত্ত রচিব কেমনে ?
পাছে পথভ্রষ্ট হই, এই ভয় জাগে মোর মনে।
নারদ কহিলা হাসি, সেই সত্য যা রচিবে তুমি,
ঘটে যা তা সব সত্য নহে। কবি, তব মনোভূমি
রামের জনমস্থান, অযোধ্যার চেয়ে সত্য জেনো। .."

অপরদিকে 'মহাভারত' আরেক মহাকবি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস কর্তৃক রচিত, এ কথা সর্বৈব সত্য, (যদিও একজন ব্যাসদেব, না বেদব্যাস গুরুকুল -- এ বিষয়ে নানা পণ্ডিতদের নানা মত আছে) মহাভারতের কাব্যসুষমাও 'অমৃতসমান'--এও সত্য, তা হলেও এই মহাগ্রন্থের ঘটনাগুলি, কিছু কিছু ব্যতিক্রম থাকলেও, ইতিহাসের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্লিষ্ট করে না। মহাভারতের আদিপর্বের একটি শ্লোকে বলা হয়েছে, 

"আচখ্যুঃ কবয়ঃ কেচিৎ সম্প্রত্যাচক্ষতে পরে।
আখ্যাস্যন্তি তথৈবান্যে ইতিহাসমিমং ভূবি।।"

এই ইতিহাস পূর্বেই কিছু কিছু কবি বলে গিয়েছিলেন, এখন অপর কবিরা বলছেন, আবার অন্য অন্য কবিরাও ভবিষ্যতে বলবেন।

প্রথমে ভারতবর্ষের ধর্মগ্রন্থ, দর্শনগ্রন্থগুলির অতি সামান্য পরিচয় দিয়ে 'রামায়ণ ও মহাভারত'-এর কথা উল্লেখ করছি এই কারণেই যে আমাদের দেশের 'ধর্ম' ও 'দর্শনে' যে জ্ঞানালোকের সন্ধান করা হয়েছে, মানবধর্মের সত্যরূপ প্রতিষ্ঠা করবার চেষ্টা হয়েছে দুই মহাকাব্যের কাহিনীর বা কাহিনীগুলির মধ্যে সে সব জ্ঞান ও দর্শনের ফলিতরূপ দুর্লভ না হলেও খুবই স্বল্পভাবে পরিদৃশ্যমান। বেদ ও ব্রাহ্মণ সংহিতাগুলির জটিল যজ্ঞাদি কর্মকাণ্ড ধীরে ধীরে ক্ষীয়মান হয়েছে। প্রস্থানত্রয়ী অর্থাৎ উপনিষদ, গীতা ও ব্রহ্মসূত্র বা বেদান্ত দর্শন জ্ঞানমার্গের সাধনা করেছেন এবং সে সাধনা মানুষের আত্মোপলব্ধির এমন এক সীমাহারা অনন্তে উপনীত হয়েছে যেখানে মানুষ বলতে পারে 'অহম ব্রহ্মাস্মি'* (বৃহদারণ্যক উপনিষদ)। কিন্তু এতদসত্ত্বেও ভারতবর্ষের ব্যবহারিক এবং সামাজিক জীবনে সেই উচ্চমার্গীয় জ্ঞানালোকের প্রকাশ ঘটেনি ; যদিওবা ঘটেছে তবু তা পাশবিক প্রবৃত্তির অন্ধকার থেকে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে আলোকিত করতে পারেনি। এমনকি যে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় সমাজের অভ্যন্তর থেকে উচ্চারিত ও উদ্গীত হয়েছে পরম কল্যাণময়ী জ্ঞানের মন্ত্র সে সবের মর্মার্থ 'স্মৃতিশাস্ত্রের' ব্যাখ্যায় এসে সংস্কার যুগপৎ কুসংস্কারসর্বস্বতায় পর্যবসিত হয়েছে। 'বিশ্বাসের' বা কোনটি ধর্ম আর কোনটি অধর্ম তার বিচার মানুষই করেছে এবং যুগোপযোগী করে নিয়েছে। ন-আর্য জনগোষ্ঠীর সমাজ, যে সমাজ আর্যদের আগমনের (যদি তাঁরা বহিরাগত হন) বহুকাল পূর্ব থেকেই ভারতবর্ষ নামক পূর্ব গোলার্ধের এক বিশাল ভূখণ্ডের ভিন্ন ভিন্ন স্থানে, ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক বিধিবিধান পালন করে বসবাস করত। প্রাচীন ভারতীয় গবেষকগণ যেমন সায়নাচার্য, মাধবাচার্য প্রভৃতি, আধুনিক গবেষকগণ যেমন অধ্যাপক রাধাকৃষ্ণণ, অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ দাসগুপ্ত, মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এবং, অধ্যাপক তুচি, রিচ ডেভিডস্, বেলেভার, রানাডে, মূয়ার, কাওয়েল প্রভৃতি বিদেশী গবেষকগণ (যাঁরা বৌদ্ধ, জৈন, চার্বাক দর্শন সহ ভারতীয় 'লোকায়তিক' দর্শনের উপর নিবিড় গবেষণা করেছেন), সকলেই একটি বিষয়ে নিঃসংশয় হয়েছেন যে ন-আর্য এবং আর্য উভয় জনগোষ্ঠীই আদি অবস্থায় রক্ষণশীলতাহীন (liberal) ছিল ; আবার স্ত্রী বা নারীদের প্রতি পুরুষদের নিষ্ঠুরতাও ছিল। মহাভারতের আদিপর্বে (অধ্যায় ১২২) একটি আখ্যানে বলা হয়েছে,

পুরাকালে উদ্দালক নামে এক মহর্ষি ছিলেন। তাঁহার পুত্র শ্বেতকেতু। একদিন পিতামাতার সঙ্গে শ্বেতকেতু বসিয়া আছেন, এমন সময় এক ব্রাহ্মণ আসিয়া তাঁহার জননীর হস্ত ধারণ পূর্বক কহিলেন, আইস আমরা যাই। ঋষিপুত্র পিতার সমক্ষেই মাতাকে বলপূর্বক ল ইয়া যাইতে দেখিয়া সাতিশয় ক্রুদ্ধ হইলেন। মহর্ষি উদ্দালক পুত্রকে তদবস্ত দেখিয়া কহিলেন, "বৎস ক্রোধ করিও না। ইহা নিত্যধর্ম --এষঃ ধর্মঃ সনাতনঃ। --  গাভীগণের ন্যায় স্ত্রীগণ শত সহস্র পুরুষে আসক্ত হইলেও উহারা অধর্মলিপ্ত হয় না।  ("এষঃ ধর্মঃ সনাতনঃ" -- মহাভারত, যোগবাশিষ্ঠ রামায়ণ, গীতা এবং আরো বহুতর পুরাণ কাহিনীতে বার বার বলা হয়েছে। উদ্ধৃত উদাহরণ সম্মন্ধে বর্তমান ব্রাহ্মণ্যবাদী সনাতনপন্থীদের মতামত জানতে ইচ্ছা করে)।
এই হোল কোন এক ঋষি পিতার 'ন্যায়শাস্ত্র'।
এবার দেখুন, ঋষিপুত্র পিতার বাক্য শ্রবণ করিয়া ক্ষান্ত হইলেন না, প্রত্যুত পূর্বাপেক্ষা অধিকতর ক্রুদ্ধ হইয়া মনুষ্যমধ্যে বলপূর্বক এই নিয়ম স্থাপন করিয়া দিলেন যে, অদ্যাবধি যে স্ত্রী পতিভিন্ন পুরুষান্তর সংসর্গ করিবে এবং যে পুরুষ কৌমারব্রতচারিণী বা পতিব্রতা স্ত্রীকে পরিত্যাগ করিয়া অন্য স্ত্রীতে আসক্ত হইবে, ইহাদের উভয়কেই ভ্রূণহত্যা সদৃশ ঘোরতর পাপপঙ্কে লিপ্ত হইতে হইবে। (কালীপ্রসন্ন সিংহের মহাভারত)।
আবার শুনুন, বৃহদারণ্যকের ঋষি বলছেন, স্ত্রী লোকের মধ্যে যখন 'শ্রী' উজ্জ্বল হয়, যখন সে 'মলোদ্বাসা' হয়, (স্ত্রীণাং যন্মলোদ্বাসাস্তস্মান্মলোদ্বাসসং.... ইত্যাদি, অর্থাৎ  নারী যখন ঋতুমতী অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসেন,  তখন সেই যশস্বিনী স্ত্রীলোকটির নিকট গমন করবে, তাকে কামনা করবে, সে কাম দিতে রাজী না হলে তাকে লাঠি দিয়ে বা হাত দিয়ে প্রহার করে অভিভূত করে বলবে, আমার ইন্দ্রিয়শক্তি দ্বারা, আমার মন দ্বারা তোমার যশকে কেড়ে নিচ্ছি। এইভাবে সে যশহীনা হয়।

তাকে 'যশহীনা' করে ভোগ করতেই হবে। 

পাঠক, ভেবে দেখুন 'নারীধর্ষণের মত অমর্যাদাকর ও গ্লানিময় সংস্কারটি, যা কিনা বেদ-উপনিষদের বিধান, সেটি কত প্রাচীন ! আরও অসংখ্য এমন সুক্ত, শ্লোক ও মন্ত্রাদি আছে আমাদের বেদ, ব্রাহ্মণ, উপনিষদ ও কিছু কিছু পুরাণগ্রন্থে যেগুলি বর্তমান পরিমার্জিত সমাজমানসিকতার উপরিতলে 'বিকৃতরুচির' প্রকাশ মনে হতে পারে ; কিন্তু এ কথাও তো সত্য যে সমাজে  স্ব-স্ব ভাবের নরপশুদেরও অস্তিত্ব রয়েছে, বিপুল পরিমাণেই রয়েছে যারা অবলা নারীদের অসহায়তার সুযোগ পেলেই পাশবিকভাবে যৌন নিপীড়ন করে, পুড়িয়ে মারে, নৃশংস হয়ে ওঠে। এবং এই ঘটনাগুলোর শেষ নেই, চরম কোন প্রতিবিধানও নেই।

আমাদের দেশের অতীতের সমাজজীবনের ইতিহাসে নারীত্বের, নারীর সম্মানের, নারী প্রাধান্যের গৌরবগাথারও অন্ত নেই। সে এক বিরাট বিপুল আলোচনার বিষয়। কিন্তু রামায়ণের সীতাদেবী এবং মহাভারতের দ্রৌপদীকে যদি আর্যসমাজের প্রতিনিধিস্থানীয় কল্পনা করা যায় তবে তাঁদের লাঞ্ছনার ও অবমাননার ট্রাজিক পরিণাম প্রমাণ করে নিষ্ঠুর ন্যায়শাস্ত্রীয় সংস্কারগুলির বেশিরভাগই পরিকল্পিত হয়েছিল রমনীদের অবদমিত করে রাখার নিমিত্তেই। সীতাদেবীর 'অগ্নিপরীক্ষা' কালে কালে এই ভারতীয় সমাজে (বিশেষ করে ভারতের পূর্বদেশে) 'সতীদাহ' নামক নারকীয় প্রথার জন্ম দিয়েছে এবং তা পৌরাণিক যুগ হতে আরম্ভ করে ঊনবিংশ/বিংশ শতক পর্যন্ত চলেছে অনির্বারিত ! এখনো কি 'নারীদাহ' বিচ্ছিন্ন হলেও সত্য নয় ? এবং যুদ্ধ ! (হায় রে যুদ্ধ)। যুদ্ধ -- গৃহযুদ্ধ বা বহিরাক্রমন-- বিশ্বের যে যে ভূখণ্ডে সংঘটিত হয়েছে, হয়ে চলেছে, যেমন ইউরোপে, মধ্য এশিয়ায়, উত্তর-পশ্চিম ভারতে, ভারত উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলীয় দেশে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সে সমস্ত দেশের নারীদের অবস্থার সঙ্গে আমাদের পাড়ার মৃতশাবক সারমেয় জননীর পার্থক্য কোথায় ?
আমরা আমাদের আলোচনার আরম্ভই করেছিলাম 'দুঃখ' দিয়ে। কিন্তু আমাদের উদ্দেশ্য 'দুঃখ' দেওয়া নয়, দুঃখের আঘাত কোন্ প্রাণে সবচেয়ে বেশী বাজে সেইটিই অনুসন্ধান করবার জন্য। এবার একটি রাষ্ট্রত্ত্বের বিষয় আলোচনা করা যাক্। মহান দার্শনিক নিৎসের মৃত্যুর পর তাঁর বোন Elisabeth Nietzsche তাঁর পাণ্ডুলিপির সংরক্ষণ ও এবং পরে সেই পাণ্ডুলিপিগুলি প্রকাশ করেন। সেখানে Fascism এবং Nazism -উপর আলোচনা আছে। Fascism রোমান 'ফ্যাসেসের' মতই একটি একমুখী আগ্রাসী রাষ্ট্রীয় শক্তি, যাকে ঐক্যের প্রতীকও বলা হয়েছে। সমস্ত পৃথিবীর, সমস্ত দেশের রাজতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র, ধর্মের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রতন্ত্র, অভিজাততন্ত্রের --- এমনকি সংখ্যাগরিষ্ঠের গণতন্ত্রের (brutal majority) মধ্যেও এই 'Fasces power' (যার থেকে এসেছে 'Fascism'), কখনো সংগুপ্তভাবে, কখনো উন্মুক্ত ও উলঙ্গরূপে পরিদৃশ্যমান। তখনই হয় 'সভ্যতার সংকট', মানবসমাজে নেমে আসে 'যুদ্ধ' নামক "নারীঘাতী, শিশুঘাতী" কুৎসিত বীভৎসার অন্ধকার। কারণ রাষ্ট্রের ক্রীড়নক সৈনিকেরাও তো মায়েদের জন্মদেওয়া শিশু)।
আর সেই Fasce power বলে, "পুরুষকে যুদ্ধের জন্য এবং নারীকে যোদ্ধা প্রজননের জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে -- অন্য সব কিছু বোকামি।" 
_____________________________________







বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারি, ২০২৬

2026

2026 

New year comes and goes by,
Leaving some indelible memories.
The world's sorrows and sufferings,
Weapons and weeping, toeilling and wailng,
Yet, with hope prevailing in heart we live,
Live in a world and with those souls
Whom we love and we're being loved.
'The year' is an illusion of Time eternal
That engulfs tears and laughter in one -- 
Weakness and power, penury and pleasures.
And even creation ruses tow'ds inevitable ruin.
Trust the Time but love your 'Years'.

Dulal Chandra Bandyopadhyay
New year's day
2026,
__________________________________

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...