বুধবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২৬

জাত্যাভিমান ধর্মান্ধতা এবং গান্ধী ও যুদ্ধ--পর্ব ৩

জাত্যাভিমান ধর্মান্ধতা এবং গান্ধী ও যুদ্ধ--পর্ব ৩

একজন সৈনিক, যিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রাণ দিয়েছিলেন তার একটি কবিতা এখানে উদ্ধার করি--,
Anthem for doomed youth

What passing-bells for these who die as cattle ?
Only the monstrous anger of the guns.
Only the stuttering rifles' rapid rattle
Can patter out their hasty orisons.
No mockeries now for them ; no prayers nor bells ;
Nor any voice of mouring save the choirs,
The shrill, demented choirs of wailing shells ;
And bulges calling for them from sad shires.
What candles may be held to speed them all ?
Not in the hands of boys, but in their eyes
Shall shine the holy glimmers of good byes.
The pallor of girls' brows shall be their pall ;
Their flowers the tenderness of patient minds,
And each slow dusk a drawing-down of blinds.
                ---- Wilfred Owen (1893 - 1918)
_________________________________________


মৃত যৌবনের সঙ্গীত

"কেন যে শোনাও বিদায়-বেলার ঘন্টাধ্বনি
মরল যারা তাদের আমরা গবাদিপশুই মানি।..."

এই কবিতাটি ছাড়াও উইলফ্রেড ওয়েনের আরো যে কবিতাগুলি আছে যেমন 'Dulce et Decorum Est', 'Futility', 'Strange Meeting' প্রভৃতির যে ভাষা, যে স্ব-অনুভূত, স্বচক্ষে দৃষ্ট মানুষের প্রাণের নির্মম আত্মাহুতির দহন ফুটে ফুটে উঠেছে সেগুলি আর কোন প্রতিশব্দে বর্ণনা করা যায় না। নরক যেন পৃথিবীর বুকে জীবন্ত হয়ে হাহাকার করে ওঠে। (প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে আরও অনেক কবির লেখনীতে যুদ্ধের বীভৎসতার ছবি আছে)। শুধু কবিরাই নন সারা পৃথিবীর সুধীসমাজের চিত্তদেশ সেই নরমেধ যজ্ঞের অগ্নিশিখার দহন পুড়িয়ে নিষ্প্রাণ করে দিয়েছিল। তাঁদের কয়েকজনের, যেমন বার্ট্রান্ড রাসেল (Bertrand Russell), লুডভিগ ভিটগেনস্টাইন (Ludwig wittgenstein), এলেইন (Alain যাঁর মর্মবিদারী গ্রন্থ Slavery, Mud and Blood)-দের সঙ্গে এক সাথেই উচ্চারিত হয় মহাত্মা গান্ধীর নাম। এছাড়াও মহাত্মার গুণগ্রাহী ও তাঁর অহিংসার মত ও পথের সহযাত্রী ছিলেন রোমা রোলাঁ (Romain Rolland), হেরম্যান হেসে (Herman Hesse), লিও তলস্তয় (Leo Tolstoy, যাঁর সুবিখ্যাত গ্রন্থ War and Peace). এমনই আরও বহু মণীষীর নাম বলা যায় যাঁরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঐ নরসংহারের উন্মত্ততা দেখে নির্বাক, মুহ্যমান হয়ে পড়েছিলেন। এনাদের সকলের মধ্যমণি ছিলেন আমাদের বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ইউরোপের কবি শিল্পী সাহিত্যিক দার্শনিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে তিনি যুদ্ধের বিরুদ্ধে তাঁর তীক্ষ্ণ তীব্র যুক্তিকঠোর বিরোধিতা সচ্চোরে ঘোষণা করে গিয়েছেন। রোমা রোলাঁর সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ ও নিবিড় বন্ধুত্বের বিষয়ে একটি অসামান্য গ্রন্থ রচনা করেছেন সুলেখক সুপণ্ডিত চিন্ময় গুহ মহাশয়। তাঁর রচিত 'Correspondence between Rabindranath Tagore and Romain Rolland from 1919 to 1940' যাঁরা পড়েছেন তাঁরা জানেন যুদ্ধের বিরুদ্ধে এই দুই মহাচিন্তকের লেখনী কী অসম ও নির্ভীক সংগ্রাম চালিয়ে গিয়েছেন দুই দশকের অধিক কাল ধরে, এবং একই সঙ্গে ভারতে ইংরেজ শাসনের যে সাম্রাজ্যবাদী নৃশংসতার দৃষ্টান্ত সেগুলিকেও বার বার ধ্বিক্কার জানিয়েছেন। ১৯১৯ সালে জালিওনাওয়ালাবাগে গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে বৃটিশ সরকারের দেওয়া 'স্যার' উপাধি পরিত্যাগ করেন। এছাড়াও তাঁকে আচার্যরূপে, পরামর্শদাতারূপে সমকালের স্বাধীনতার সংগ্রামের নেতৃবৃন্দ বরণ করেছিলেন। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, জহরলাল নেহরু, বালগঙ্গাধর তিলক এবং গান্ধী স্বয়ং বিশ্বকবির সুগভীর রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রতান্ত্রিক দর্শনের পথ অনুসরণ করেছেন, যে দর্শনের মূল সুর ছিল আন্তর্জাতিক মানবতাবাদ।
দেখুন, মৎপ্রণীত 'বিন্দুতে সিন্ধুদর্শন - প্রথম খণ্ড' গ্রন্থে আমি স্যার এডুইন আর্নল্ড (Sir Edwin Arnold) রচিত বিখ্যাত 'The Light of Asia' গ্রন্থটি সম্মন্ধে বিশদভাবে আলোচনা করেছি। যে কাব্য তথাগত বুদ্ধের জীবনী, তাঁর জীবনদর্শন ও ধর্মদর্শনের একটি চিরন্তন, চির- অক্ষয় দেউলস্বরূপ। এই কাব্য যার ভিত্তিতে অহিংসা, যার চূড়াতেও অহিংসা, সমকালের শ্রেষ্ঠ মণীষীদের, নোবেল পুরস্কার বিজয়ীদের এমনভাবেই প্রভাবিত করেছিল যে তাঁরা প্রত্যেকেই এক একজন বুদ্ধদেবের মতই অহিংসার তপস্যাকেই জীবনের ব্রতরূপে গ্রহণ করেছিলেন। মহাত্মা গান্ধীও তাঁদেরই একজন। তাঁর জীবন সাধনা নিয়ে অনেক বিতর্ক ও বিরুদ্ধ মতামত আছে ; কিন্তু তাঁর আদর্শকে নস্যাৎ করবার ধৃষ্টতা সমকালের মহাপ্রতাপান্বিত রাজশক্তিরও ছিল না। তাই তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত, পরিচালিত যে স্বাধীনতার আন্দোলন তা তো স্বাভাবিকভাবেই বলপ্রয়োগহীন, অস্ত্রহীন, হিংস্রতাহীন হবে এবং সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হবেই।
সাম্প্রদায়িকতা শুধুমাত্র ধর্মবিশ্বাসকেন্দ্রিক নয়। তার বহু প্রকারের কুৎসিত কদর্য রূপ আছে। রাজনৈতিক, সামাজিক, বর্ণভিত্তিক (দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্য, apartheid, ছিল যার নির্লজ্জ উদাহরণ), স্বজাতির মধ্যেও ধনবৈষম্যের পার্থক্যগত সাম্প্রদায়িকতা। কিন্তু (ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা ছাড়া) এই যে উদাহৃত সাম্প্রদায়িকতার কথা বলা হোল সেগুলিকেও গোষ্ঠীগত ধর্মবিশ্বাসের অজুহাতেই ব্যবহার করা হয়। আব্রাহামীয় ধর্মমতগুলির পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ইতিহাস বিদিত। ইহুদি-খ্রিষ্টান, ক্যাথলিক- প্রটেস্টান্ট ধর্মদ্বন্দ্ব যেমন সারাটা মধ্যযুগ জুড়ে অসংখ্য রক্তক্ষয়ী সংঘাত ঘটিয়েছে। আর ইসলাম ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রায় দু'শ বছর ধরে চলা ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধের বিভীষিকাময় ইতিবৃত্ত ইউরোপ তথা বিশ্ব ইতিহাসের এক নৃশংসতম 'মহাভারত', যার কিছুটা আমরা পাই মহাকবি তাসোর (Torquato Tasso) 'জেরুজালেম লিবারেতা' 'Gerusalemme Liberate' কাব্যে (যদিও এটি শুধুমাত্র প্রথম ক্রুসেডের একটি কল্পনাপ্রসূত আখ্যায়িকা)। মনে হতে পারে বুদ্ধ নিরঞ্জনের অহিংসা মন্ত্রের উপাসক মহাত্মা গান্ধীর প্রসঙ্গ থেকে অনেকখানি সরে এসেছি ; কিন্তু এই আপাত অপ্রয়োজনীয় প্রাসঙ্গিকতার উল্লেখ এই কারণেই যে তা হলেই আমরা বুঝে নিতে পারব গান্ধী কেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অভিমুখ অহিংস পথের দিকে ঘুরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন।
মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী একজন ব্যক্তিবিশেষ নন, গান্ধী এক আদর্শ ; যে আদর্শ ব্যক্তিজীবনের জীবনাচরণে, সমাজমানসের পুনর্গঠনে, দেশ এবং সমগ্র বিশ্বের রাষ্ট্রতন্ত্রের আত্মোপলব্ধির মন্ত্র উচ্চারণ করে বলে "মা মা হিংসি"। তাঁর স্বাধীনতা আন্দোলনের সারশিক্ষা ছিল,

"অহিংসা, অভয়, অপরিগ্রহ, সত্যাগ্রহ, সর্বোদয়, সাধারণ জীবনযাপন, সমত্ব ও সমবিচার, ভ্রাতৃত্ব এবং আত্মবিবর্তন।" 'অহিংসা' দুর্বলের শস্ত্র নয়, বরং অহিংসা হিংসার প্রবলতম প্রতিপক্ষ। তিনি বলছেন, "Non violence is not just absence of harm, but a powerful force for change, rooted in love and compassion." আবার আত্মশুদ্ধি বা আত্মবিবর্তন (be the change) বিষয়ে তাঁর ব্যাখ্যা "Be the change you wish to see the world." নিজেকে নয়, নিজের ধর্ম সমাজ বা রাষ্ট্রকে নয়, সমগ্র বিশ্বকে তুমি কিভাবে দেখবে ! শত্রুরূপে না বন্ধুরূপে ? তার নির্ধারণ করতে হবে তোমাকেই। এই জাগতিক আত্মীয়তার বোধ স্বাভাবিক ভাবেই বিংশ শতাব্দীর পৃথিবীর কাছে কাল্পনিক মনে হয়েছিল, মনে হয়েছিল "an utopian imaginativeness towards the world powers that preach for glorification of warfare."
'অপরিগ্রহ' বোঝাতে তিনি বলছেন, "living minimally to reduce greed and inequality." তিনি যখন এ কথা বলছেন তখন বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদী লুন্ঠন এবং ভোগবাদ চরম অবস্থায় পোঁচেছে। ইউরোপখণ্ডের উগ্র রাষ্ট্রবাদী মত্ততা দেখেছেন, ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন দেখেছেন, দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যের ঘৃণ্যরূপ দেখেছেন এবং দেশে ফিরে এসে দেখেছেন হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে ধূমায়িত সংহাত। এর মধ্যে ১৯০৬ সালের ৩০শে ডিসেম্বর 'অল ইন্ডিয়া মুসলিম লিগ' (খাজা সলিমুল্লাহ মূল প্রতিষ্ঠাতা), এবং ২৭শে সেপ্টেম্বর ১৯২৫ সালে কট্টর হিন্দু সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (মূল প্রতিষ্ঠাতা কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার) প্রতিষ্ঠা এবং কর্মকাণ্ড আরম্ভ হয়ে গিয়েছে। কাজেই ক্ষমতালাভের লোভ (greed), আর 'বিভাজন ও বৈষম্য' তখন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের আদর্শের মধ্যে নগ্নভাবে প্রভাব বিস্তার করতে আরম্ভ করেছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ১৯০০ সালের গোড়ার দিক থেকেই ইংরেজ বিতাড়নের পন্থার আরও একটি অসম উপসর্গ, যা বৃটিশ সরকারের প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র ও সহিংস আক্রমণ। বহুধাবিভক্ত এত সব প্রতিকূলতার মধ্যে তাঁকে সংগ্রাম করতে হয়েছিল।
তাই 'অভয়' বা fearlessness -- এই আদর্শটি তিনি যেমন আত্মশক্তি জাগরণের প্রয়াসে গ্রহণ করেছিলেন, ঠিক তেমনি জনসাধারণের ভিতরেও আত্মবিশ্বাস জাগানোর চেষ্টা করেছিলেন। অভয় সম্মন্ধে তিনি বলেছেন, "courage to stand for truth, even alone, drawing strength from inner conviction."


তিনি বুঝেছিলেন শুধুমাত্র অস্ত্র দিয়ে শত্রু নিধনের মাধ্যমে সত্ত্ব, স্বদেশ, স্বাধিকার --কিছুই রক্ষা করা যায় না। কারণ অস্ত্রের তৃষ্ণা মেটাতে রক্তের প্রয়োজন এবং সেই রক্তের চাহিদা মেটাতে হয় অস্ত্রকে মুক্তি দিয়ে। 'The sword wishes to get out of its  scabbard, সে তখন দেখেনা 'কেবা আত্ম, কেবা পর'। আর মানুষের অন্তরেই বাস করে সেই লালসা-সমভূত আগ্রাসন যার দাস বৃত্তি করে অস্ত্র। তাই মানুষের অন্তরের, মানুষের মননশীলতার পরিবর্তন প্রয়োজন।
"The mind is its own place, and itself,
Can make a Heaven of Hell, a Hell of Heaven."
                            --- Paradise Lost: Milton. 

অপরদিকে Marlow-র Doctor Faustus-য়েও মূল মন্ত্রটি এইভাবেই উচ্চারিত হয়েছে। The concept of hell is mainly a spiritual one. এবং যাঁরা মহাত্মা গান্ধীর জীবনীর উপর গবেষণা করেছেন তাঁরা জানেন গান্ধী কেন স্বাধীনতা আন্দোলনের বা স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল মন্ত্র হিসেবে আত্মিক শুদ্ধির আদর্শকে পাথেয় করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে সর্বপ্রথম ও সর্ববৃহৎ আন্দোলন ১৯২২ সালের অসহযোগ আন্দোলন। এই আন্দোলনের দেশ ইংরেজের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। আন্দোলন যখন তুঙ্গে, চুড়ান্ত পর্যায়ে তখন একটি বিশাল বিক্ষুব্ধ জনতা উত্তর প্রদেশের গোরোক্ষপুর জেলার চৌরিচৌরায় একটি পুলিশ ষ্টেশনের উপর চড়াও হয় এবং ঐ থানায় আগুন ধরিয়ে দেয়। তাতে ২২জন পুলিশকর্মী জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মারা যান। গান্ধীজী এই নৃশংসতা সহ্য করতে না পেরে তাঁর আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন। তিনি জানতেন এই হিংস্রতার দ্বারা অর্জিত স্বাধীনতায় এমনই নৃশংসতা অব্যাহত থাকবে। (আজকেও কি সেই নারকীয় ঘটনার পুনরাবৃত্তি আমরা দেখি না ?) কিন্তু ১৯৪২ সালে 'quit India Movement'-- যে আন্দোলনে গান্ধীজীর ডাক ছিল 'করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গে' , 'Do or Die'-- তখন ভারতের বহুস্থানে হিংসাত্মক ঘটনা সংঘটিত হলেও গান্ধী পশ্চাদপসরণ করেন নি, বা করতে পারেন নি কেননা তখন আন্দোলনের রাশ চলে গিয়েছিল নেহরু -জিন্নাদের হাতে। হতাশ গান্ধী (বোধ হয়) স্মরণ করেছিলেন মহাভারতের (ভীষ্মপর্ব) ও গীতার বাণী,
অর্জুন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধভূমিত শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপ দর্শন করছেন আর জিজ্ঞাসা করছেন,

যথা প্রদীপ্তং জ্বলনং পতঙ্গা
বিশন্তি নাশায় সমৃদ্ধবেগাঃ।
তথৈব নাশায় বিশন্তি লোকাঃ
অস্তবাপি বক্ত্রাণি সমৃদ্ধবেগাঃ।।...

পতঙ্গরা যেমন আত্মনাশের জন্য সমৃদ্ধবেগে প্রদীপ্ত অনলে প্রবেশ করে সেইরূপ সর্বলোক (সমস্ত জানপ্রাণ) নিজেদেরকেই নাশ করার জন্য তোমার মুখসমূহে প্রবেশ করছে। তুমি জ্বলন্ত বদনে সব দিক থেকে সমগ্র লোক গ্রাস করতে করতে লেহন করে ; বিষ্ণু, তোমার উগ্র প্রভা সমগ্র জগৎ তেজে পূরিত করে সন্তপ্ত করছ। বল, কে তুমি উগ্ররূপ ? ......"
শ্রীকৃষ্ণ উত্তরে বলেছিলেন। 

"কালোহস্মি লোকক্ষয়কৃৎ প্রবৃদ্ধো
লোকান্ সমাহর্তুমিহ প্রবৃত্তঃ।
ঋতেহপি ত্বাং না ভবিষ্যন্তি সর্বে
যেহবস্থিতাঃ প্রত্যনীকেষু যোধাঃ।।..."

আমি লোকক্ষয়কারী অনাদী (প্রবৃদ্ধ) মহাকাল। এখন লোকসমূহকে ধংস করার জন্যই প্রবৃত্ত হয়েছি। যে সমস্ত যোদ্ধারা পক্ষ-প্রতিপক্ষ সৈন্যবাহিনীতে অবস্থিত আছে তারা, তুমি ছাড়া আর কেউ, থাকবেনা। হে অর্জুন, যাদের তুমি দেখছ তারা আমার দ্বারা পূর্বেই নিহত হয়েছে, তুমি নিমিত্তমাত্র। 'ময়ৈবৈতে নিহতা পূর্বমেব নিমিত্তমাত্রং ভব সব্যসাচিন্।।'

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কাল ছিল মানব সভ্যতার ঘোর তমসাচ্ছন্ন অধ্যায়। 'বর্বর' সভ্যতার ঊষাকাল থেকে ধর্মকেন্দ্রিক যত যুদ্ধ হয়ে এসেছে তাদের মধ্যে এমন পৈশাচিক মারণোৎসব পৃথিবী আর কখনো দেখেনি কেননা 'মিত্রশক্তি' ও 'অক্ষশক্তি' -- দুইয়েরই উদ্দেশ্য ছিল এক একটি জাতিকে, স্বাজাত্যাভিমানের নেশায় বিলুপ্ত করে দেওয়ার উন্মত্ত বুভুক্ষা -- রক্তপান করবার পিপাসা। ১৯৩৯-'৪০ সালেই যখন 'গান্ধীরা' এই মানবতার ঘাতকদের বিশ্বজোড়া আবির্ভাব দেখেছিলেন তখন মহাকালের ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া তাঁদের আর কিছু করবার ছিল না।

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২১/০১/২০২৬, কলকাতা।









কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...