জাত্যাভিমান, ধর্মান্ধতা এবং গান্ধী ও যুদ্ধ--পর্ব ২
(প্রবন্ধের এই অংশটিতে ধৈর্য রাখতে হবে। পরের অংশে মূল বিষয়ের অবতারণা করা হবে।)
'যুদ্ধ' নামক মহাকালের কাপালিক যজ্ঞানুষ্ঠানের আরম্ভ এবং শেষ বলে কিছু নেই। মানুষের সভ্যতার, বলা ভালো আসুরী-পন্থী উন্নতির, এই মারণ ব্যাধির সম্পূর্ণ নিরাময়ের ওষুধও অদ্যাবধি অনাবিষ্কৃত। তবু বৈদ্য যাঁরা, ভিষক যাঁরা তাঁরা তো 'যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশ' -- এই প্রয়াসে চেষ্টা করেই যাবেন। 'গান্ধী' সম্প্রদায় সেই ভিষক গোষ্ঠীর মানবাত্মা। তাঁরা জানেন
"হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্ব,
ঘোর কুটীল পন্থ তাহার লোভ জটিলবন্ধ ..."
-----রবীন্দ্রনাথ
তবু মানুষের প্রতি ভালোবাসা, এই পৃথিবীটার প্রতি ভালোবাসা তাঁদেরকে প্রতিনিয়ত প্রাণিত করে এই মন্ত্রে যে জীবন ও জগৎ যতক্ষণ আছে ততক্ষণ আছে প্রাণের লীলা। যদি জীবন তার নির্দিষ্ট কালটুকু, এই আলোকোজ্জ্বল, আনন্দময় জগতে কাটিয়ে যেতে না পারে, যদি জীবন অকালে ঝরে যায়, যদি জগৎ বিকৃত, বিক্ষত, কুৎসিত হয়ে পড়ে তবে মানুষের সভ্যতা তো নিরর্থক। মাতৃস্তন্য পান করে শিশু বাঁচে, বড় হয় ; কিন্তু সেই মাতৃস্তন্য-অমৃতভাণ্ড যদি লালসার তরবারি ছিন্ন করে নিয়ে যায় তবে না বাঁচেন জননী, না বাঁচে শিশু, না কোন প্রয়োজনে লাগে ঘাতকের। জন্মদাত্রী জননীর সঙ্গে এই ধরিত্রীমাতার কোন পার্থক্য নেই। এখানেই লুকিয়ে আছে সত্যের রহস্য। প্রতিটি ব্যক্তি মানুষের প্রাণের উৎস যেমন মাতৃগর্ভ, জীবনে প্রাথমিকভাবে বেঁচে থাকা যেমন মাতৃদুগ্ধ এবং স্থিতি যেমন মাতৃক্রোড় ঠিক তেমনি সমগ্র প্রাণীজগতের কাছে এই পৃথিবীও মাতৃবৎ। প্রাণের অস্তিত্বের জন্য যেমন মা, বিশ্বপ্রাণের অস্তিত্বের জন্য তেমনই এই বসুন্ধরা। কবি বলেছেন না,
"আমারে তুলিয়া লহ অয়ি বসুন্ধরে,
কোলের সন্তানে তব কোলের ভিতরে,
বিপুল অঞ্চলতলে, ওগো মা মৃণ্ময়ী.."
--- ঐ
এই বলা শুধুমাত্র কবির কাব্যোচ্ছ্বাস নয়। বিশ্বের মানব-অন্তরের আর্তি। মা যেমন অবিভাজ্য, এই ভূবনমণ্ডলও যদি তেমনি অবিভাজ্য, অবিভক্ত হোত তবে তবে যুদ্ধ নামক নরসংহারের প্রয়োজন থাকত না। কিন্তু সে হয়নি, হচ্ছে না এবং হবে না। আদিম শিকারজীবী সাম্যবাদী সমাজের পরবর্তী কাল, খাদ্য উৎপাদনের সময়কাল হতেই আরম্ভ হয়েছে সবলতমের ক্ষমতার প্রতিযোগিতা। আহরণ, সঞ্চয় ; সঞ্চয়ের জন্য লুণ্ঠন, লুণ্ঠনের ভাগ বাঁটোয়ারা এবং লোভাতুরের হিংস্রতা। অতিসম্পদের উন্মত্ত আচরণ ও সম্পদহীনতার পর-অধিনতা। এ বিষয়ে আমাদের দেশের চাইতে বিদেশে গবেষণা করা হয়েছে অনেক বেশী, লেখা হয়েছে অনেক গ্রন্থ। জার্মান দার্শনিকগণ যেমন George W.F. Hegel, Ludwig Feuerbach, Bruno Bauer এবং সর্বোপরি Karl Marx ও Engles আদিম সাম্যবাদী ব্যবস্থা থেকে ঐতিহাসিক ক্রমপর্যায়ে সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং তার পর হতে কি ভাবে ঔপনিবেশিক আগ্রাসন ও সাম্রাজ্যবাদের সৃষ্টি হয়েছে তার বিশদে আলোচনা করে গিয়েছেন। Marks ও Engles-এর Historical Materialism (ঐতিহাসিক বস্তুবাদ), Dialectic Materialism (দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ)-লেখাগুলিতে ধনতন্ত্রের ধারণা, ধনতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা এবং ধনতন্ত্রবাদের অভ্যন্তরে, পাকা ফলের ভিতরে কীটের মত জন্ম-নেওয়া দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের তত্ব আমরা জেনেছি। এবং এই ধনতন্ত্রই যে মানুষের ক্রম-উন্মেসিত চেতনাকে, শিক্ষা সংস্কৃতির সাধনা এমনকি 'ধর্মধারণা'কেও নিয়ন্ত্রণ করে তারও মীমাংসা তাঁরা করেছেন অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে। কিন্তু ধনবৈষম্যের দ্বন্দ্ব থেকে সংহাত ও সংগ্রামের শেষে নারকীয় ও ধংসাত্মক পরিণামের সৃষ্টি হয়, এ কথা যেমন গবেষণাসিদ্ধ, তেমনি 'ধর্মও' কখনো কখনো ভিন্ন ভিন্ন নির্দয় তত্বের অবতারণা করে, ভিন্ন ভিন্ন জীবনাচরণের নির্দেশ দিয়ে বা 'স্মৃতিগ্রন্থ' রচনা করে মানবসমাজে বিভেদের বিষবৃক্ষ রোপণ করে-- এও ততোধিক সত্য।
এখানে মনে রাখতে হবে যে 'ধর্ম' (religion) আর ধর্মধারণা বা ধর্মদর্শন কিন্তু এক নয়। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মগুলির সৃষ্টি ও প্রতিষ্ঠা হয়েছে ন্যূনধিক দুই থেকে আড়াই হাজার বছর আগে (ভারতীয় ধর্মধারণার কথা পরে)। ইউরোপে এবং মধ্যপ্রাচ্যে আব্রাহামীয় ধর্ম, একেশ্বরবাদী ধর্মের প্রচার ও প্রসার ঘটেছিল। ইহুদি ধর্ম, খ্রিষ্ট ধর্ম, ইসলাম ধর্মগুলিকে আব্রাহামীয় মূল ধর্মের মধ্যেই পড়ে। তার সঙ্গে বাহাই ধর্ম, দ্রুজ ধর্ম রাসতাফারী প্রভৃতি ধর্মগুলিরও উৎস আদি পিতা নবী আব্রাহাম বা ইব্রাহিম। "The Abrahamic religions of The Semitic, a group of religious doctrines of Monotheistic belief that admire and offer sacrifices for Abraham by Judaism, Christianity, Islam and some other sects of same believers."
নবী ইব্রাহিম বা আব্রাহামের জন্মের সময়কাল সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মতবিরোধ আছে, তবে একটি সর্বসম্মত ধারনা এই যে এই আদি মানব, আদিপিতার অস্তিত্ব ছিল খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ থেকে ১৭০০ সালের মধ্যে। ইসলামিক ও প্রাচীন বাইবেলের সূত্রমতে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের মেসোপটেমিয়া অঞ্চলের উর নামক শহরে জন্মগ্রহণ করেন।
ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের ধর্মমতের উৎস ও প্রসার সম্মন্ধে এই অতি সামান্য (আব্রাহামীয় ধর্মমত, যার বিভিন্ন মূল শাখার ইতিহাস সমুদ্রের মতো গভীর, আকাশের মত ব্যপ্ত) ভূমিকা দেওয়া হোল এই কারণেই যে এই সমস্ত ধর্মমতগুলি একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী হলেও ইউরোপের মানবেতিহাস দেখেছে ইহুদি ও খ্রিস্টান, খ্রিস্টান ও ইসলামের মধ্যকার অসংখ্য রক্তক্ষয়ী সংঘাতের দৃশ্য ও দৃষ্টান্ত। এই ঘটনার প্রধান যে কারণসমূহ আছে তার মধ্যে মূল কারণ ছিল রাজার হাতে, ধর্মগুরুদের হাতে ধর্মের নিয়ন্ত্রণ। (এই প্রসঙ্গে মৎপ্রণীত 'বিন্দুতে সিন্ধুদর্শন --প্রথম খণ্ড'-এ 'ধর্মসংকটের বলি মানবতা' প্রবন্ধটিতে সবিস্তারে বর্ণনা করা হয়েছে)। বর্বরদের অবিরাম আক্রমণে পশ্চিম রোম সাম্রাজ্য সম্পূর্ণ ধংস হয়ে গেল ৪৭৬ খ্রিষ্টাব্দে। তারপরও দীর্ঘদিন পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল, যার রাজধানী ছিল কনস্টান্টিনোপোল (Constantinople). সম্রাট কনসস্টানটাইন (Constantine the Great (AD 272-337) ৩১২ খ্রিষ্টাব্দে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেন। ইতিহাস বলছে, He played a pivotal role in elevating the glorious status of Christian religion and Christian culture in Rome, simultaneously decriminalising Christian practice and ceasing Christian persecution. This was a turning point in Christianisation of the Roman Empire.
ইতিহাসের এই তথ্যগুলি দেওয়ার উদ্দেশ্যে হোল মহান ক্ষমতাশালী সম্রাটদের, রাজাদের, সামন্ত প্রভুদের হাতে ধর্মের দণ্ড যাওয়ার ফলে সাধারণের সাধনার 'উপায়' বা 'পথ' আর রইল আর না। স্বভাবতঃই ধর্ম হয়ে উঠলো শাসনের, ত্রাশনের, জোর করে অন্য ধর্মের জাতি গোষ্ঠীকে ধর্মান্তরিতকরণের, নির্দিষ্ট ধর্মভুক্ত জাতি গঠনের এবং অন্তিম ফলস্বরূপ জাতিরাষ্ট্র গঠনের হাতিয়ার ; আর সেই হাতিয়ারে ভর করে এসেছে রাষ্ট্রতন্ত্র এবং রাষ্ট্রের একাধিপত্য কায়েম করবার বাসনার ফলে জন্ম হয়েছে ঔপনিবেশিকতা ও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের। জাতিরাষ্ট্রের সর্বগ্রাসী আগ্রাসনে সংঘটিত হয়েছে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে যুদ্ধ এবং সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের পরিণতি হয়েছে মহাযুদ্ধ।
আবার একই দেশের গণ্ডির মধ্যে ধর্মান্ধতা এনেছে সাম্প্রদায়িক বিভাজন, বিভেদ এবং দাঙ্গা ও সংখ্যালঘুদের উৎসাদন ও উৎসার্জন। ইউরোপখণ্ডের ইতিহাস ছেড়ে একেবারে ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিবৃত্ত আলোচনায় আসি। এখানে ইংরেজ এসেছিল একটি বানিজ্যিক সংস্থারূপে, ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী। (১৬৫১ সালে হুগলিতে তাদের প্রথম বানিজ্যিক কুঠি স্থাপিত হয়। কিন্তু প্রকৃত আরম্ভ বলতে ১৬৫৮ সাল, যদিও ১৬০০ খৃষ্টাব্দে ইংল্যান্ডের রাণী প্রথম এলিজাবেথ এই বাণিজ্যিক সংস্থাকে ভারতে ব্যবসা করবার সনদ প্রদান করেন। এই কোম্পানির সঙ্গে জব চার্নকের নাম ও জড়িত থাকার কারণ ১৬৯০ খ্রিস্টাব্দে তিনি প্রথমে সুতানুটি ও পরে কলকাতা ও গোবিন্দপুর নামের আরো দুটি গ্রাম যুক্ত করে যে কুঠি স্থাপনা করেন তাই কলকাতা শহরের আদি পত্তনরূপে ইতিহাসে স্বীকৃতি লাভ করেছে। এই কথাগুলি কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক)। এই ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ভারতবর্ষে ইংরেজ সাম্রাজ্য বিস্তারের ও প্রতিষ্ঠার সূচনা। পরের ইতিহাস প্রায় দু'শ বছরের ইংরেজ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ভারতবর্ষ -- পূর্বে রেঙ্গুন (বর্তমানের মায়ানমার) থেকে পশ্চিমের গুজরাট, উত্তরের হিমালয়, উত্তরপশ্চিমদেশের আফগানিস্তান ছুঁয়ে দক্ষিণের রামেশ্বরম। দেশের বহু রাজার রাজত্ব ছিনিয়ে নিতে নদীস্রোতের মত রক্তের স্রোত বহাতেও তারা কসুর করেনি। সমগ্র ভারতবর্ষ দখল যখন শেষের পর্বে তখন, ঠিক একশ'বছর পর (১৮৫৭ সালে) ইংরেজ সাম্রাজ্য শক্তির বিরুদ্ধে একটি সর্বভারতীয় স্তরে প্রকৃত বিদ্রোহ সংঘটিত হয় এবং তার বিয়োগান্তক পরিণতিও হয় শেষ মোগল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদূর শাহের পতন ও তাঁকে হত্যার মধ্যে দিয়ে।
ইংরেজ শাসনের দুটি ফল ফলেছিল। প্রথমটি হোল বহু রাজতন্ত্রে বিভাজিত ভারতে একটি স্বাদেশিকতাবোধ অর্থাৎ ভারতীয়ত্ব এবং দ্বিতীয়ত উনবিংশ শতাব্দীর শেষ অধ্যায় থেকে ভারতীয়দের ঐক্যবদ্ধভাবে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার জাগরণ। কিন্তু সেই যে ১৮৮০-র দশকের সময়কাল থেকে ১৯৪৭-এ স্বাধীনতা লাভ করা পর্যন্ত ভারতবর্ষের যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা তা বিকৃত হয়েছে, বিচ্যুত হয়েছে হিন্দু ও মুসলমান সাম্প্রদায়িক বিভাজনের জন্যে। কিন্তু স্বাধীনতার সংগ্রাম থামেনি। অজস্র অজস্র রাজনৈতিক নেতা নেতৃত্ব দিয়েছেন। সহিংস ও অহিংস আন্দোলন যুগপৎ চলেছে। ওদিকে বিংশ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকেই ইউরোপেও পরিব্যাপ্ত পরিসরে জাতিরাষ্ট্রগুলির মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪ -১৯১৯) তার একটি ভয়ঙ্কর পরিণতি। এবং সেই সময় থেকেই, দেশের এবং বিদেশের এই অমানবিক যুদ্ধকে প্রতিহত করবার জন্য দুটি পথ অবলম্বন করা হয়েছে পৃথিবীর সর্বত্র জুড়ে। রাষ্ট্রনেতারা বিভিন্ন রাজনৈতিক রণকৌশল ও রণনীতি প্রয়োগ করবার চেষ্টা করেছেন। এমনকি রাজনীতি থেকে দূরে সরে থাকতে চাওয়া বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিদ্বান, শিল্পী, সাহিত্যিক, দার্শনিকেরাও তাঁদের মত সোচ্চারে ঘোষণা করেছেন। এই দ্বিতীয় দলের মানুষদের মত ছিল সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে, রূঢ় জাতিসত্তার বিরুদ্ধে, নিষ্ঠুর রাষ্ট্রবাদের বিপক্ষে এবং অহিংসার ও মানবতার সপক্ষে। এখানেই 'গান্ধী'-দের আলোচনা হতে পারে।
মানবতাবাদী, অহিংসাধর্মের প্রবর্তক ও প্রচারক, যুদ্ধের বিরুদ্ধে 'যুদ্ধ' করে যাঁরা জীবনদান করে গিয়েছেন, চরম ব্যর্থতা ও বিফলতার গরল পান করে গিয়েছেন যাঁরা, তাঁদের কথা বলার জন্যই এতখানি পশ্চাৎপট স্থাপনা করা হোল।
এবার পর্ব ৩, আগামীতে।
(ক্রমশঃ)
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১৬/০১/ ২০২৬
কলকাতা।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন