রবিবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২৩

ত্যাগ

ত্যাগ 
 

"তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জিথা " -- ঈশোপনিষদের এই অনুশাসনটির ভাবার্থ অবলম্বন করে আজকের কবিতাটি। 



নিত্য প্রভাতে সূর্য কিরণ, 
বাতাসে স্নেহের ছোঁওয়া, 
পাখীর কণ্ঠে অসীমের সুর, 
সুশীতল জলে নাওয়া। 
পূর্ণিমা রাতে জ্যোৎস্নার মায়া, 
আঁধার রাতের তারা, 
মা'র মুখশশী, শিশুমুখে হাসি, 
ফুলদল মনোহরা। 
প্রেয়সীর প্রেম 'নিকষিত হেম', 
মর্ত লীলার সার, 
বন্ধু সখার প্রীতি-বন্ধন 
পারিজাত ফুলহার। 

এত বৈভব, রাজৈশ্বর্য, 
তবু অতৃপ্ত চিত্ত ! 
মরুপিপাসায় ছুটেছো কোথায়-- 
কোন্ সে অধরা বিত্ত ? 
নিত্য চলার পথটির ধারে 
দেখোনি কি মরা শৈশব, 
জীর্ণ-বসনা মাতৃমূর্তি, 
অকাল জরার অবয়ব ? 
ভগ্ন প্রাচীর নিরালোক ঘর, 
জীবন্ত ক্ষুধার রসনা, 
উলঙ্গ দেহ, মরণ বাসনা, 
ক্রন্দনসার বেদনা ? 

পৃথিবীর এই পান্থশালায় 
আমি তুমি পথযাত্রী 
কাটাবো শ্রান্ত দুটো দিন, 
দুটো স্বপ্নিল রাত্রি। 
তারপর কোথা যাব তা জানিনা 
পান্থসখার বাঁশী 
বাজবে সুদূরে, যাবো কোন্ ঘরে 
বিলায়ে রত্নরাশী। 
বিশ্বভূবনে যা কিছু বা আছে 
 সুন্দর মধুময়, 
ভোগের লালসে পরিনত বিষে--- 
ত্যাগে হয় অক্ষয়।। 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 
২২শে জানুয়ারী, ২০২৩ । 
















শনিবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২৩

অ-স্থিরতা

স্থির নয় জানি কোন কিছু। 
আকাশের জ্যোতির্লোক হতে পৃথিবীর ধূলি, 
অধীর তরঙ্গধারা, দৃশ্য বা অদৃশ্য বেগ, পিছু তার 
তোমার আমার যাত্রা নিয়তি লিখন-- অনিবার্য। 
হে জীবন, দু-দন্ড সময় তুমি পাবে কি কখনো ? 
যদি পাও, শুনো না আলোর গান, বাতাসের তান, 
পাখীর কলকণ্ঠধ্বনি, মল্লারের বিলম্বিত শ্রাবণ ধারার। 
দেখো না ফুলের হাসি নবোদিত অরুণের সাথে, 
শরতের কাশফুলে চন্দ্রিমা-চুম্বন নির্জন নদীর পাড়ে 
 শরমের মধুচন্দ্রিমায়, সোনার মেখলা-পরা দিনান্তের 
 সান্ধ্য মেঘবালা, সন্ধ্যা তারার টিপ পরে' নির্নিমেষ 
থাক্ চেয়ে অন্ধকার দিগন্তের দুয়ারের ধারে। 

কান পেতে রেখো কিন্তু চলমান পথে, পথের দুধারে, 
 দু'পার জুড়ে। সভ্যতার বর্জ্য দিয়ে গড়া ঝোপ 
ঝোপ ঝুপড়ির সারি, নগ্নতার সৌন্দর্য অপার -- 
 দেখে নিও। 
দেখে নিও গর্ভ ছেঁড়া নদী -- তার নাড়ির লুন্ঠন, 
শুনে নিও বুক-ভাঙা পাহাড়ের পাষাণ ক্রন্দন, 
মৃত পলাশের বনে মৌটুসী মরে আছে মুধুহারা ঠোঁটে-- 
দৃষ্টি ফেলো সে পাখির উড়ানের স্বপ্নমরা নিষ্কম্প ডানায়। 

দূরে কালো ধোঁয়া ? নয় সে আগ্নেয় গিরি ! 
পরিত্যক্ত কয়লা খাদান হতে নরকাগ্নিশিখা। 
লুব্ধ সভ্যতা তার ভবিষ্যৎ চিতা জ্বালায়ে 
 রেখেছে নিজ হাতে। ধস নামে, ধংস হয়, 
বিধ্বংসী প্লাবনে কিংবা বীভৎস দহনে। 
আমাদেরই পাপ ভাসে স্থলে জলে আকাশে 
বাতাসে। লালসার দাবানলে পুড়ে হয় খাক্ 
স্নেহ প্রেম দয়া মায়া। আদিম যা ছিল --- 
সহজ সারল্যমাখা, নির্মল সুন্দর চরাচর, 
"এ দ্যুলোক মধুময়, মধুময় পৃথিবীর ধূলি"-- 
আজ তার চিহ্ন কিছু নাই। গোধূলির ধূলিকণা 
মারণ বীজানু নিয়ে আসে। নীলিমার নীল 
হিংসাদীর্ণ হননের রক্তমেঘে ঢাকা। তবু জানি 
বহতা কালের স্রোতে যাবে ভেসে এই দিন। 
অতীতের অনুসৃতি বর্তমানও হয়ে যাবে লীন। 


(বৃহদারণ্যক উপনিষদের মহাবাণী 
"মধু বাতা ঋতায়তে মধুক্ষরন্তি সিন্ধবঃ 
......"
রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, 
"এ দ্যুলোক মধুময়.....ধূলি।")


দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 
৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৩ 








 







সোমবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০২৩

সাগর সঙ্গমে

মানুষ মানুষ, শুধুই মানুষ, মানুষের ঢল -- 
গৌমুখ গঙ্গোত্রী হতে কলকল ছলছল 
যেমন চঞ্চল তরঙ্গধারা অবিরল সমুদ্রের ডাকে 
ধেয়ে আসে নিরবধি কাল। কোন্ স্বপ্ন দেখে', 
কি ধন পাবার লোভে? নাকি তার সঞ্চিত যা কিছু, 
নিত্য দিনের আহরণ, মাথা করে নিচু 
সুবিপুল এই জনস্রোত অর্ঘ্য পাত্র পূর্ণ করে' 
দিতে চায় বিসর্জন অনন্তের পায়ে যুগ যুগ ধরে' ! 

মানুষ মানুষ শুধু -- শ্রেণীহীন, জাতি‌-গোত্রহীন, 
বর্ণহীন আবালবৃদ্ধ নরনারী, ধনবান, নির্ধন-দীন, 
রাজ অট্টালিকা হতে ঝুপড়ির প্লাস্টিক বিলাসী, 
এ যাত্রায় সকলের সম-অধিকার। স্বদেশী, প্রবাসী, 
বিচিত্র বাস, ভিন্ন ভাষাভাষী। সুতীব্র শীতার্ত দেশ, 
বহ্নিমান প্রাণোচ্ছ্বাসে সর্বত্যাগী সাধকের বেশ, 
এক লক্ষ্যে ধেয়ে চলে সাগর সঙ্গমে মানব প্লাবন। 
পথের নেশাই পাথেয় যে তার, পথই তার অশন বসন। 

পুণ্য স্নান ? মোক্ষ, মুক্তি লাভ ? পাপের স্খালন ? 
ধর্মার্থ কামনা ? তা নয়, তা নয়। এ পূর্ণ অবগাহন! 
সম্মুখে দিগন্তহারা মহা পারাবার, গহন গভীর, 
আকাশ চুম্বিত ঢেও অনিঃশেষ স্থির ও অস্থির-- 
'নীরবের' পাঞ্চজন্যে অন্তর্ভেদী অতল আহ্বান 
ছুটে আসে ঢেও ভীষণ গর্জন, করে আলিঙ্গন। 
ধুয়ে যায় জীবনের তুচ্ছতার মলিন কামনা, 
ভেসে যায় না-পাওয়ার নিত্যকার হৃদয় বেদনা। 

কিছুই হয়না চাওয়া, কি রত্ন চাওয়ার আছে 
ডুবে রত্নাকরে ? নিমিত্তের সুখ ভিক্ষা অসীমের কাছে? 
মহাসিন্ধুর পুন্য স্পর্শ, মনে হয়, প্রতি বিন্দু জলে, 
অঙ্গে অঙ্গে শিহরণ, তরঙ্গের বিভঙ্গে কল্লোলে 
 অশ্রুত ধ্বনির নৃত্যছন্দ, অজানার রাগিনী-ঝঙ্কার, 
রক্তস্রোতে জেগেছে জোয়ার, দুঃখ সুখ একাকার, 
সঞ্চয় করেছি যত মিথ্যা মায়ায়, দুরাশার ছলে, 
ক্ষয় হোক্ লয় হোক্, যাক্ ভেসে সর্বনাশা জলে।। 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 
৩রা মাঘ, ১৯২৯ বঙ্গাব্দ।





















 
















শনিবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০২৩

পৌষ সংক্রান্তির পাঁচালী

 বাঙলার পাড়াগাঁয়ে কাদা জলে ভিজে। 
লক্ষ্মীপুরে আসিলেন অন্নপূর্ণা নিজে।। 
লক্ষ্মীর লক্ষ ছেলে কেঁদে বলে, দিদা। 
কি দিয়ে মিটাই বল উদরের খিদা।। 
কান্নার ফল তারা পেল হাতে হাতে। 
বর দিল অন্নপূর্ণা, থাকো দুধে ভাতে।। 
সেই থেকে পরমান্ন আর পুলি পিঠে। 
বাঙলার ছেলে পুলে খায় চেটে পুটে।। 
ঘরে ঘরে পৌষালী আনন্দ অপার। 
"থাকো পৌষ বারমাস যেও নাকো আর।।" 
অন্নপূর্ণা মায়েদের চরণের রেখা। 
বাংলার মেঠোপথে নিত্য পাবে দেখা।। 
মাটিমাখা দুখানি পা, জলে ভিজা গা। 
বাঙলার প্রতি ঘর ডাকে , মা মা।। 
বর্ষায় সজল স্নেহ, শরতে অভয়া। 
হেমন্তে সোনার স্বপ্ন হিমাদ্রী তনয়া। 
পৌষে সোনার ধানে উঠান ভরায়। 
রসে বশে বঙ্গকবি পৌষ-পাঁচালী গায়।। 

(কবিতাটি পাঁচালীর ঢঙে লেখা, পাঁচালীর সুরে
পঠিতব্য।) 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
৩০ শেষ পৌষ, ১৪২৯। 

সোমবার, ৯ জানুয়ারি, ২০২৩

ভরা থাক স্মৃতি সুধায়


বিদায়ের পাত্রখানি 

বিদায়ের ক্ষণ আসন্ন যখন 
            তখনই  সন্ধ্যা বেলা, 
তখনই তপন হারায় আপন 
               আলোর বর্ণমালা। 
পুষ্পবিতান বিষন্ন ম্লান, 
             পাখী কলতান হারা, 
শ্রান্ত চলন পথিক চরণ 
         খুঁজে ফিরে ধ্রুবতারা। 
দিশাহীনতার মর্মবেদনা
            জীবনের শেষপ্রান্তে, 
অন্তর জুড়ে স্মৃতির বেদনা
               ক্লান্ত দিবস অন্তে। 

পথে পথে কত কুড়ায়েছি ফুল
                গেঁথেছি প্রেমের হার, 
ছিন্ন হয়েছে কখন কোথায়
                      চিহ্নও নাই তার। 
অবমাননার যাতনায় যারা 
          কেঁদে কেঁদে গেছে চলে, 
চির বিদায়ের বিষন্ন পথ 
         ভিজায়ে চোখের জলে। 
বিস্মরণের ছায়ালোকে ঢাকা 
                স্নেহলতাদের স্মৃতি, 
অশ্রুত লোকের মৌন আঁধারে 
                আবেগের কলগীতি। 
ফুলশয্যার লজ্জার কুঁড়ি 
               বসন্ত বাতাসে ফুটে' 
চৈত্রের চিতা-ভস্মরাশীতে 
             কখন পড়েছে লুটে'। 
তারি মাঝে কিছু বেদনার বাণী
                 আনন্দ-মদির সুর 
  স্মরণ শিলায় স্বরলিপি লেখা
                   ব্যথাময় সুমধুর। 
অস্ত রবির সোনার থালায় 
              প্রভাত শিশির কনা, 
থাকে না কখনো, রেখে যায় দাগ 
               মরণের আলপনা। 
জীবন-দিনের এত ভালোবাসা, 
                মায়াময় আবেদন, 
উদাসী ধরণী, বইবে না কিছু -- 
               সবই কি বিস্মরণ ? 
তাই হোক্ তবে ; ঝরা ফুলদলে 
            গাঁথি বসে প্রেম-হার--- 
চির বিদায়ের আঁধার প্রহরে 
               দিয়ে যাব উপহার।  
দীর্ঘ দিনের মধুর ক্ষণের 
              হাসি বা অশ্রুরাশি, 
মানব চরণে নিবেদন করে' 
      বলে যাবো, "ভালোবাসি।।"  

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১১-০১-২০২৩ 
ব্যাঙ্গালোর। 


























Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...