বৃহস্পতিবার, ২৫ নভেম্বর, ২০২১

আমার সোনার চোখের পাতায় ঘুম নেমে আয়।

দিনের আলো ওই ফুরালো 
                অস্ত- শিখর চূড়ায়, 
ঘুম নেমে আয়, ঘুম নেমে আয়
            সোনার চোখের পাতায়।

দিগন্তিকাও সোনার মেয়ে, 
সোনার মেঘে গা ডুবিয়ে, 
সন্ধ্যাতারার টিপ্ পরে' সে 
               'পূরবী' - সুরে গায় ।

পূবে  যখন আঁধার কালো ,
অস্তাচলে শান্ত আলো ,
পথহারা এক ক্লান্ত পাখি 
             নীড়ের খোঁজে ওড়ে ।

একটি দুটি তারা ফুটে ,
চতুর্দশীর  চন্দ্র  ওঠে ,
দীঘির জলে শালুক ফোটে, 
                শিশির বিন্দু ঝরে।

ঘুম পাড়ানি মাসি পিসী 
সবাই কেন গেলো কাশী ?
গল্প তাদের রাজারপুরের 
               ঘুম পাড়ানি গান --

কোথায় হারা তাঁদের গীতি, 
দেব-দেউলে সন্ধ্যারতি,
খোল-করতাল,কাঁসর-ঘন্টা ,
              খঞ্জনী কলতান।
  
কানন ছোঁওয়া শীতল বাতাস ,
সাথে নিয়ে শিউলি সুবাস,
 নিঝুম রাতে সোনার সাথে 
                   থাকুক সংগোপন।

আকাশ বেয়ে চাঁদের তরী,
আসবে সুখের স্বপন পরী,
জাগর -নিশা শিয়রে মা
                  রইবে অনুক্ষণ।

ঘুমায় সোনা, ঘুমায় মাণিক
              ঘুমায় মায়ের কোলে।
 হীরা পান্না হাসি কান্না,
           আননে দেয়ালা দোলে।।
................................................................. 


পূরবী রাগ ,
কোমল গীতিময়তার জন্য 
শ্রুতিমধুর।

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়
২৯/১১/২০২১
ব্যাঙ্গালোর ।




 






     




সোমবার, ২২ নভেম্বর, ২০২১

ব্যর্থতা

দিন এলো দিনান্তের সীমান্ত রেখায়,
আমার ভিক্ষার ঝুলি কপর্দকহীন।
কী খুঁজে ফিরেছি আমি এতদিন,জীবনের হাটে?
কী চেয়েছি কার কাছে,হেথায় হোথায়,
ঘুরেছি কোথায়–কিছু নাই মনে।ওই দীন,
ভাঙা-চোরা-জড়ো-করা বুড়া, ওই ক্ষীণ
ভিখারিণী  ,ভাঙ্গা বাটি, বসে আছে তে-মাথার মোড়ে।
তাদের সঞ্চয় বেশি নয় ; তবু ,যা পেয়েছে তা তাদের  
বাঁচার  সহায়।

আমি  তো চাই নি কিছু যা চেয়েছে তারা –
অন্ন -জল ,বেশ -বাস ,ক্লান্তিহরা আরামের
 নিশ্চিত আশ্রয়--নির্বিরোধ জীবন যাপন ,
সবই তো পেয়েছি আমি বাঁচার মতন ; 
তাও এ কী তীব্র তৃষ্ণা সারাটি  জীবন !
ঠিক কী যে চাই,তাও জানা নাই তো  আমার।

তবে  মাঝে মাঝে পড়ে মনে ,উদয়-দিগন্ত কোণে ,
বহুদূরে ফেলে-আসা, ভাসা ভাসা ঊষার আলোর মতো 
আশা-- স্বপ্ন-সম্ভবা কিছু পাওয়ার দুরাশা ।
বর্ষা রাত্রে আলেয়া সে,মরীচিকা  গ্রীষ্ম দ্বিপ্রহরে,
দিনমানে  দৃষ্টির বিভ্রম ।যে দিকেই চাই দেখি,
'ওই' কি সে,যে রয়েছে  মিশে সহস্রের অশ্রান্ত চলনে--
আবরনে,আভরণে সুন্দরের দূতি ;কিন্তু মুখোমুখী 
পাই নাই তার পরিচয় যে আমার একান্ত আশ্রয় --
অনন্ত সুখের বা অসীম দুঃখের ,আর কল্পনার ,
সাধের রচিত মূর্তি-- মূর্ত কামনার !

দু'বাহু বাড়ায়ে ধাই ,বুকেতে জড়াতে চাই,
ছায়া হয়ে সরে যায় নিমেষে কোথায় !
হোল না, হোল না পাওয়া, যা ছিল একান্ত চাওয়া
 ব্যর্থ জীবন লীন অব্যর্থ  মায়ায় ।

২৪/১১/'২১
ব্যাঙ্গালোর ।

                 
 


 


বৃহস্পতিবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২১

রঙের উচ্ছ্বাস!


"চাঁপার কাঞ্চন আভা সে যে কার কণ্ঠস্বরে সাধা,
নাগ কেশরের গন্ধ সে যে কোন্ বেণীবন্ধে বাঁধা।
বাদলের চামেলী যে  
কালো-আঁখি-জলে ভিজে,
করবীর রাঙা রঙ
কঙ্কণঝঙ্কারসুরে মাখা–
কদম্বকেশরগুলি নিদ্রাহীন বেদনায়  আঁকা।।"
            –  রবীন্দ্রনাথ

আলোকের আভরণে দীপ্তিময়ী নববধূ সাজে
 কে তুমি রক্তাম্বরী ! মরি আমি লাজে ।
পুষ্পবর্ণ-মুগ্ধ রাজকবি,শব্দরত্নহারে
যথাযোগ্য উপহার দিয়েছে সবারে।
আমি দীন–
ভাবহীন, ভাষাহীন।
রসেরও সে মন্দাকিনী কবে, কতো দূরে,
সংসারমরুর তীরে হারা হয়ে গেছে চিরতরে।
কেন তবে হেন, হে বর্ণসুন্দরী ,
সুন্দরের নর্ম সহচরী,
ভিখারী কবির ঘরে এসে,
অকারণে ‌ভালোবেসে,
রঙের ঐশ্বর্য-সুরা দিয়ে গেলে দৃষ্টি-পাত্র ভরে।
 অস্তরাগে-রাঙা জীবনের দিগন্ত-বাসরে কেন আজ
বাজে বাঁশী পূরবীর সুরে।।

রাজকবি?কে আর?
–বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ।

ফুলের ছবি –
সৌজন্যে : ভাস্বতী বোন।

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়
১৮/১১/'২১
ব্যাঙ্গালুরু।

বুধবার, ১৭ নভেম্বর, ২০২১

Desire of Soul

Lost sixty years to locate where from
An aversion erupts and vexes my whole,
in and out, out and out.
What not have I got? Right from a doll
to play with to an alive nymph . A hut
Dilapidated, now looks a palace incarnated.
Yet dissatisfaction, a pain of void of nothingness.

A ragpicker, bent down, sitting tight
 beneath a tree, flinging off his goatish load.  
 He heaves a sigh, to enjoy dissolution.
Him I envy ! For he has shaken off his 'intimate' burden!
O His Majesty, I feel, cares little for the purse 
he lives on. 
A free soul, least concerned with what's bagged, 
For his life and soul are not conflated. 
Soul yearns for beatitude by denying 
Earthly load. 
 A ragamuffin despises, though awhile, his
Bag of life. 
And listens to his call of soul–
Why should I, for so long, craving for only gold? 
Not, for a single moment, I've relieved my self
From the soul-less tons of joy to my help . 
                 

শিশু দিবস ২০২১


               চাঁদ ও শিশু
................................................

অন্ধ-কালের নিভৃত অন্ধকারে
সুদূর সে কোন্ জ্যোতিঃপারাবার হতে
যে আলোর কণা প্রদীপ্ত অভিসারে
নিখিল বিধানে আকাশ গর্ভে জ্বলে,
সূর্য চন্দ্র তারা হয়ে তারা গগনের কোল ভরে।

দূর থাক্ দূরে, বলি,  চন্দ্রকলার ‌কথা,
প্রতিপদ হতে পদে পদে এর চলা-- 
অপূর্ণাঙ্গ ! তবুও দু'চোখ ভরে' 
দেখি তার ছলা কলা।
"সুন্দর তুমি মনোহর চাঁদ, পূর্ণিমা কতো দূরে?" 

ভূবন-ভরানো রূপ অরূপের খেলা
ভবনে ভবনে দেখি এ 'জীবনপুরে' ;
শিশুর হাসিতে লক্ষ চাঁদের মেলা
কালপারাবার হয়ে পারাপার যুগে ও যুগান্তরে।।
__________________________________________

Beauty of Innocence
_____________________

What I brood over so deeply?
Why I love so deadly this miry Earth?
Two images do glow in the core of my heart.
A child cherubic and a flower like a star.
The sun and the moon and the constellations,
In the sky they twinkle,they shine,
I stare and stare at them in awe,
Bow to them, but love to keep them afar.
For, they are but too heavenly to keep them nearer.

In a remote hamlet l have a little hut,
And over it's fencing gird,
A creeper mother bears a tiny myrtle bud.
The bees, at dawn, come  swarming and fly back in gloom.
I, too,cannot wait to see it in bloom.
A naked kid crowls about the courtyard, makes utter mischief,
Smears its body with mud in deep.
Scolding in vain, I take it in the arms,
One cannot but fall in love with such a 'crass',
When it smiles a smile of Innocence.
Is there anything left for this 'doll', but to embrace!

I gaze and gaze, but a saddened thought creeps in me,
Why am I not allowed, for good, to see such  
 eternally earthly beauty?
Who rings the bell, unseen, and bids me goodbye,
Why a lone swan sings  so melancholy–
 In the twilight sky?  

Dulal Bandyopadhyay,
9/11/'21
Bangalore 
---------------------------------------------------------------------------------------------------------
                                              
                                                      
                                    স্নেহাঞ্চল
                                                 
       কত রাত্রির তন্দ্রার ঘোরে কত যে স্বপ্ন দেখেছি -- 
       সত্যি নাহোক,তবুও তা নিয়ে কেঁদেছি আবার হেসেছি । 
        আজ মনে পড়ে জ্বরের বেঘোরে হটাৎই গভীর রাতে 
        স্বপ্ন দেখেছি,চম্কে জেগেছি --ছিলাম মায়ের সাথে । 

       মাটির উঠোন ,ঝাড়ু দেয় মা 'আমি তার পিছু পিছু 
      আঁচলটি ধরে কেঁদে কেঁদে ফিরি দাও মা,দাও মা কিছু ।
       কী যে চেয়েছি ,আজ তার কথা কিছু আর মনে নাই ; 
       সেই 'কিছুটির'' জন্যেই আজ বুকজোড়া হায় হায় !

        যাই বা চেয়েছি,হয়তো পেয়েছি,তবু কেন চোখে জল ?
        চাওয়া-পাওয়া সারা --চিরতরে হারা জননী-স্নেহাঞ্চল। 
        পুষ্প সুবাস ছিল না আঁচলে ,ছিল না ধূপের সৌরভ ,
        মৃন্ময়ী  মাতা , ধূলিমলিনতা ,সদাপ্রসন্ন গৌরব। 

        জন্মক্ষণের আঁশটে-গন্ধী বস্ত্র জন্মদাত্রীর 
        আঁচলে যে ধূলা লেগেছে ধরার --আদিমাতা জীবধাত্রীর।
        স্নেহ ভেজা সেই কাপড়ের খুঁট ছিন্ন হয়েছে কবে--
        জাগর রাত্রে তারই পরশ পাই শুধু অনুভবে ।

       জীবন ব্যাপিয়া কামনা-মরুর খুঁজি' মরীচিকা মায়া 
       রাত্রি আঁধারে চাই বারে বারে কোথা স্নেহলতা ছায়া।
      সেদিনের সেই অবোধ শিশুটি আজো কি রয়েছে লুকায়ে
      সব পাওয়া শেষে কাঁদে অবশেষে মায়ের আঁচল হারায়ে। 
 
        দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়
        ১৪/১১/২০২১ 
        ব্যাঙ্গালোর । 

সোমবার, ১ নভেম্বর, ২০২১

শ্যামাপূজার আগমনী ও সর্বধর্মসমন্বয়ী কাজী নজরুল

 শাক্তপদ রচয়িতাকুলে 
  কাজী নজরুল ইসলাম 
...............….....…..........................................

"কালো মেয়ের আঁধার কোলে 
শিশু রবি শশী দোলে,  
মায়ের একটু খানি রূপের ঝলক 
ওই স্নিগ্ধ বিরাট নীল গগন।" 
                 ––নজরুল ইসলাম। 
"কোন সাধনায় পেলি শ্যামা মায়ের চরণতল ?" 


      ‌‌‌ 
'ও মা দিগম্বরী নাচো গো', বলে' আমাদের মহা হিন্দুগণ  যখন পঞ্চ 'ম' - কার (মদ্য-মাংস-মৎস্য-মুদ্রা-মৈথুন)-  সহযোগে, মাতৃ-সাধনার নামে, মহা শ্মশানে, ঘোর-  তমসাবৃত অমানিশায়, 'সুধাপূর্ণ' করোটিভাণ্ড নিয়ে 
পশ্বাচারে মগ্ন, আত্মবিস্মৃত – তখন একজন ভিন্নধর্মী  সাধক বিশ্বজননীর প্রকৃত রূপের প্রতিমা গড়ে তুলছেন।  ত্রিভূবনেশ্বরী, জ্যোতির্ময়ী মাতৃসত্ত্বার বিপুল ক্রোড়ে  আলোকরশ্মির আধার সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র-নীহারিকা, আর  চৈতন্যের জ্যোতিঃ-স্বরূপ প্রাণ-কণিকা শিশুরা নিত্য  ক্রীড়া-চঞ্চল। বর্ণান্ধ, ধর্মোন্মাদ, যজ্ঞকুণ্ড-সম্মুখে সমাসীন, রক্তনেত্র রক্তাম্বর 'মাতৃভক্তগণ' ভেবে দেখবেন প্রকৃত সাধনমার্গের স্বরূপ। 

আমার পাঠক বন্ধুরা আমাকে আদেশ পাঠিয়েছেন,  আমি যেন আলোচনায় উদাহৃত সঙ্গীতটির উপর আরো  কিছু কথা বলি। তাই হোক । 

"নদী কভু পান নাহি করে নিজ জল, 
তরুগণ নাহি খায় নিজ নিজ ফল।" 

যা বলি, যেটুকু লিখি তা যদি না পায় শ্রোতা, না পায়  পাঠক তবে তার গতি হবে লক্ষ্য-বিহীন শূণ্যতায়। তাই  আমাদের উদ্দিষ্ট শ্রোতা যিনি ভোক্তা, পাঠক যিনি লেখকের আরাধ্য দেবতা। 

আলোচিত সঙ্গীতটি নিম্নরূপঃ
..............................................

"কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন। 
(তার)রূপ দেখে দেয় বুক পেতে শিব যার হাতে মরণ বাঁচন।। 
কালো মেয়ের আঁধার কোলে শিশু রবি শশী দোলে 
মায়ের একটুখানি রূপের ঝলক স্নিগ্ধ বিরাট নীল  গগন।। 
পাগলী মেয়ে এলোকেশী নিশীথিনীর দুলিয়ে কেশ 
নেচে বেড়ায় দিনের চিতায় লীলার যে তার নাই কো  শেষ। 
সিন্ধুতে মা'র বিন্দুখানিক ঠিকরে পড়ে আলোর মাণিক 
বিশ্বে মায়ের রূপ ধরে না মা আমার তাই দিগ্ বসন।।"

সর্বগ্রাসী মহান্ধকার। অস্তিত্ব শূণ্য বিপুল নাস্তি গহ্বর। সেই 'কালো'-ই কি কালো মেয়ে ? তাঁরই চরণ বিচ্ছুরিত আলোই কি বিশ্ব সৃষ্টির উৎস --- মাতৃ-জননেন্দ্রিয় ? 
শ্যামা মায়ের ব্রহ্মাণ্ডপ্রসবিনী, জগজ্জননী রূপের এই মূর্ত প্রতিমা (কালো মেয়ের আঁধার কোলে শিশু রবি  শশী দোলে) বিস্ময় জাগায়। এই সঙ্গীতটির ভাব ব্যাখ্যার অতীত, ধ্যান তন্ময়তায় লভ্য। 
..........................................................................


শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বেদ-বেদান্ত-স্মৃতি, এক কথায়  ভারতীয় দর্শন অনুশীলনের পীঠস্থান বঙ্গভূমির  নবদ্বীপের মায়াপুরে, পতিতপাবনী জাহ্নবীতীরে, পঞ্চদশ শতকের শেষভাগে,১৪৮৬খৃষ্টাব্দে আবির্ভূত  হন। ইতিহাসের এই শুভক্ষণগুলি সন্ধিক্ষণ, যে কালখণ্ডটিকে সাক্ষী রেখে আমরা একটি দেশের  সমাজচিত্র ও সমাজ- চরিত্রটিকে অনুধাবন করতে  পারি, বিশ্লেষণ করতে পারি। 

মহাপ্রভূর জন্মের পাঁচ'শ বছর আগে থেকে ষোড়শ  শতকের শেষভাগ পর্যন্ত এই পাঁচ-ছয় শতাব্দী ব্যাপি যে  সময়কাল, সেটি ছিল বৃহত্তর বাংলার(পূর্ব ও পশ্চিম  বাংলা, দক্ষিণ বিহার, পূর্ব উড়িষ্যা এবং অসম রাজ্য)  মধ্যযুগ। বৌদ্ধ, জৈন, ব্রাহ্মণ্য তান্ত্রিকতার যুগ। 
১২০৪ খৃষ্টাব্দে তুর্কী আক্রমণে বাঙলার সেন  রাজবংশের পতনের পর বাঙলার সমাজ, সামাজিক  জীবনছন্দ, সংস্কার-সংস্কৃতি, সাহিত্য এবং ধর্মধারণায়  অভূতপূর্ব উপপ্লবের সৃষ্টি হোল। সেন রাজত্বকালে যে  পবিত্রতাবাদী সমাজমনষ্কতা, সংস্কারশুদ্ধির বৈপ্লবিক  পরিবর্তন এসেছিল তা সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত হয়ে যায়। 
১২০৪খ্রীঃ থেকে ১৭৫৭খ্রীঃ --এই সময়কালের মধ্যস্থিত  যে যুগ (মধ্যযুগ) সেটি রাজনৈতিক, সামাজিক,  সাংস্কৃতিক ধর্মীয় ভাবে বিপর্যস্ত, ঘটনাবহুল এবং  দ্বন্দ্বসমাকীর্ণ। তবুও সে সবের সবিস্তার আলোচনা  উপেক্ষা করে' বলা যায়, এই সময়ে , এই বঙ্গদেশে,  ভারতবর্ষের দ্রাবিড়িয় ও আর্য সভ্যতার ঊষাকাল থেকে  আচরিত চারটি ধর্মধারণার (শাক্ত,বৈষ্ণব,শৈব,স্মার্ত)  মধ্যে দুটি ধর্মসম্প্রদায় প্রবলভাবে প্রাধান্য বিস্তার করে।  সেগুলির একটি বৈষ্ণব, অন্যটি শাক্ত। বৌদ্ধ ও জৈন  ধর্মের তান্ত্রিক সাধনা তখন ক্ষীয়মান। বৈষ্ণব এবং  শাক্ত এই দুটি ধর্মাচরণের বহুবিধ মত, পথ, সংস্কারগত  বিচিত্রতা ছিল। সাম্প্রদায়িক সংঘাতও ছিল ভয়ঙ্কর। কিন্তু মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেবের আবির্ভাব, তাঁর প্রেমধর্মের অসাম্প্রদায়িক, উদার মানবতাবাদী প্রচার বঙ্গভূমির সমাজ চেতনায় ঐতিহাসিক পরিবর্তন এনে দিয়েছিল। আবার সাথে সাথে শক্তিরূপিণী মাতৃপূজার প্রচলন ছিল সমান্তরাল ভাবে। এই মাতৃ আরাধনাও গূঢ়, গুহ্য তান্রিকতায় আচরিত হোত আদীম তন্ত্র সাধনার পঞ্চ 'ম'-কার রীতি প্রয়োগের মাধ্যমে। 'মাংস' সংগ্রহার্থে 'বলি'। এই বলি প্রথার শোণিত তৃষা বীভৎসতার সীমা অতিক্রম করে  মহিষ বলি, নরবলি, শিশুবলিকেও মাতৃ সাধনার উপচার রূপে গ্রহণ করেছিল। শক্তি আরাধনায় রক্তপাতহীন বৈষ্ণবীয় মত বহু পরে গৃহীত ও আচরিত হয়। যাই হোক, এই শাক্ত ধর্মধারণার ও ধর্মাচরণের ক্রমবিবর্তনের ইতিহাস সুদীর্ঘ। আমাদের আলোচনার বিষয় জগজ্জননী, ভবতারিণী শ্যামামায়ের উপাসনা। সঙ্গে সঙ্গে বৈষ্ণব ধর্ম ও দর্শনের উপর যৎসামান্য (যে  ধর্মমত ও ধর্মীয় দর্শন আকাশ সদৃশ ব্যপ্ত, সমুদ্রের ন্যায় গভীর) আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক হবে না। 

______________________________________________                      
                 
"শ্যামা পূজার আগমনী" - আলোচনাটির মাঝখানে ভাইফোঁটার 
অনুষ্ঠান উপলক্ষে একটি কবিতা লিখে দেওয়ার অনুরোধ এলো।
 সেটি লিখে পূর্ব আলোচনায় ফিরে যাব।

                             ভাই-বোন
                           ..................
                     
কত দিন পরে দাঁড়ালো দুয়ারে, আজ সহোদর ভাই,
আনন্দবিহ্বল, ছোখভরা জল, দেখি, যেন দেখি নাই।
রক্ত-রাখিতে বাঁধা হয়ে আছে প্রাণের সঙ্গে প্রাণ,
এক সুরে, এক ছন্দেই বাজে এক মরমের গান।
তবু দূরে  দূরে থাকি দুই পুরে, বহুজন মাঝে একা,
সব আশা শেষ, থাকে অবশেষ ভাইয়ের সঙ্গে দেখা।
পোহালো সে রাত, নূতন প্রভাত, নূতন সূর্য ওঠা,
শীতল শিশিরে চন্দন বেঁটে ভাইয়ের কপালে ফোঁটা।
এ-টিপ আমার সুখতারা হয়ে জ্বলুক কপালে তোর,
সকল দুঃখ মিলাক আঁধারে আসুক নূতন ভোর।
স্বর্ণধান্য, শ্যামল দূর্বা, শ্বেতচন্দন সৌরভ,
পুষ্পসুবাসে করুক প্রকাশ সোনার ভাইয়ের গৌরব।

                                  ভাইয়ের আশিষ 

'ভাইয়েরা তো আছে'-এই ভরসায় বোনেরা থাকুক সুখে,
বোনটি আমার, রব' চিরকাল তোমার সুখে ও দুঃখে। 

______________________________________________


আবারও ফিরে আসি প্রসঙ্গে।
বৈষ্ণব ধর্ম,--- হিন্দুধর্মের এই শাখাটির প্রাচীনত্ব অপরিমেয় ---
 উপনিষদ, পুরাণ, শ্রীমদ্ভাগবৎ গীতা রচনার সময়কাল থেকে বিষ্ণু উপাসনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। 
এই ধর্মদর্শনের প্রবক্তা পুস্তক শ্রীমৎ ভাগবত, বিষ্ণুপুরাণ, পদ্মপুরাণ, গড়ুরপুরাণ এবং আরো বহু "শ্রুতি"। ঐতিহাসিক ভাবে উপনিষদের সময় কাল থেকে চর্চিত ভক্তিবাদই প্রকৃতপক্ষে বৈষ্ণব ধর্ম ও দর্শনের মূল উৎস। এ-ধর্মের আরাধ্য দেবতা বিষ্ণু । আর 'বিষ্ণু জানাতি বৈষ্ণব'----।

অহিংসা, জগৎ-পরিব্যপ্ত পরমাত্মার অস্তিত্বে বিশ্বাস, জীবাত্মা পরমাত্মারই অংশ, তাঁর সঙ্গে মিলনই জীব-  জীবনের অভিষ্ট --- এই সূত্রগুলি বৈষ্ণব সাধনপন্থায় অনুসৃত। 
তৈত্তিরীয় উপনিষদ একটি শ্লোকে এই জগৎচরাচর, ব্রহ্মাণ্ড পরিব্যপ্ত পরমাত্মার (ব্রহ্ম) উপলব্ধি ব্যক্ত করেছেন। 

"যতো বা ইমানি ভূতানি জায়ন্তে যেন জাতানি জীবন্তি। 
যৎ প্রয়ন্ত্যভিসংবিশন্তি  তৎ বিজিজ্ঞা সস্ব তৎ  ব্রহ্মেতি।।" 
 
এ আমার গণ্ডুষে সিন্ধু পান করার আস্পর্ধা দেখানোর  প্রয়াস --- আমি ক্ষমাপ্রার্থী। 
তবে সুধী পাঠক এতক্ষণে বুঝে গিয়েছেন যে বিশ্বপ্লাবী  জ্যোতিরালোকে উদ্ভাসিত আকাশগঙ্গার ন্যায় বৈষ্ণব ধর্মের সুরধুনীর তীরে এসে তরী না পাওয়াই স্বাভাবিক এবং তাই লেখকের মূল বিষয়ে ফিরে যাওয়ার তাড়া । ঠিক তাই। 

সমগ্র ভারতবর্ষে, ভারতবর্ষের বাইরে যত বিষ্ময় জাগানো বিপুলাকৃতি মন্দির নির্মাণ ও প্রতিষ্ঠা হয়েছে তার সিংহভাগই বিষ্ণুমন্দির। 
সেই অর্থে বাঙলায় পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারতের মতো ঐরূপ ভাস্কর্য সমন্বিত স্থাপত্য গড়ে ওঠেনি, একমাত্র প্রতিবেশী রাজ্য উড়িষ্যায় পুরীর জগন্নাথ দেবের মন্দির ছাড়া। কিন্তু বাঙলায় যা সৃষ্টি হোল তা বৈষ্ণব ধর্মের প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী। ১৪৮৬ খ্রীষ্টাব্দে মহাপ্রভুর আগমনের আগে ও পরে অসংখ্য, বৈচিত্র্যময়, রসঘন সাহিত্য সৃষ্টি একাধারে মহাপ্রভুর প্রেমধর্মের স্বরূপ ও বাংলা ভাষার দিব্যরূপের প্রকাশ এবং বিকাশ ঘটিয়েছিল । লক্ষ্মণ সেনের রাজসভার রাজকবি, গীতগোবিন্দ-রচয়িতা, কবি জয়দেবের কান্ত-কোমল-ছন্দ-চলন পদাবলী থেকে শুরু করে , বিদ্যাপতি-মৈথিলীর রসমাধুরীতে স্নান করে, বড়ু -দ্বিজ-বহুদ্বিজ, জ্ঞানদাস, গোবিন্দ দাস ইত্যাদি ইত্যাদি কতো..,সবার উপর কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্য চরিতামৃত পান করবার সৌভাগ্য যাঁর হবে তিনিই কণামাত্র আস্বাদ পাবেন গৌরচন্দ্র বিচ্ছুরিত প্রেম জ্যোৎস্নার।
মহাপ্রভু শ্রী চৈতন্যদেবের প্রচারিত বৈষ্ণবধর্ম, গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম, যার সর্ববৃহৎ প্রতিপক্ষ শাক্তধর্ম ছিল না , ছিল শাক্ত সম্প্রদায়। 

শাক্ত ধর্মাচরণের দুটি ধারা। একটি তন্ত্রসাধন, অন্যটি  ভক্তিবাদী। তান্ত্রিকদের সাধনা উপচারিক, জটিল,  কোথাও বা কখনো কখনো শোণিত-সিক্ত, হোমধূম-  সমাচ্ছন্ন, পৈশাচিকতার সমগোত্রীয়। অপর দিকে  ভক্তিবাদী (বৈষ্ণবীয় পন্থা অনুসৃত) সাধনায় আদ্যাশক্তি  কালীর সঙ্গে ভক্তের সম্পর্ক মা ও সন্তানের। তন্ত্রসাধন-  ক্রিয়া এবং পদ্ধতি লিপিবদ্ধ আছে এমন পুরাণ, পুঁথি,  গ্রন্থ (তন্ত্রসার ইত্যাদি) সহস্রাধিক। সে সমস্তই সাধকদের  বিচরণক্ষেত্র। কিন্তু ভক্তিবাদী সম্প্রদায়ের কাছে, বৈষ্ণব  পদাবলীর মতোই, শাক্তগীতি-শ্যামাসঙ্গীত, কালীকীর্তন। 
বৈষ্ণব পদাবলী, দেবী দুর্গার আগমনী-বিজয়ার মতোই  শাক্তগীতি বাংলাদেশে মাতৃ-আরাধনার নবদিগন্ত উন্মুক্ত  করে দিয়েছে এবং সঙ্গে সঙ্গে বাঙলা সাহিত্যের  মন্দাকিনী ধারায় এনে দিয়েছে ষাঁড়া ষাঁড়ির কোটাল।  আগমনী বিজয়ার প্রখ্যাত সব কবিরাই শাক্তগীতির  রচয়িতা এবং সুরস্রষ্টা। ভক্তকবি রামপ্রসাদ সেন,  দাশরথী রায়, নীলকন্ঠ ঠাকুর, কমলাকান্ত --তাঁদের  সঙ্গীত সাধনার কথা, তাঁদের সুরের মূর্ছনা  বঙ্গজনমানসের অক্ষয় ঐশ্বর্য। কোন বঙ্গসন্তানই বা  বিমোহিত না হয়েছেন ভবানী চরণ দাস, কমলা ঝরিয়া,  মৃনাল কান্তি ঘোষ, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, পান্নালাল ভট্টাচার্যদের মত প্রাতঃস্মরণীয় গায়কদের সুধাকণ্ঠ নিঃসৃত শ্যামা সঙ্গীতে? 
নূতন করে কিই বা বলার  আছে ? কিন্তু নজরুলের  শ্যামাসঙ্গীত? এইটি  বলার জন্যে এত ভনিতা, এত  সাতকাহনী ভূমিকা, এত  'ধান ভানতে শিবের গীত।' 

শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের, 'যত মত তত পথ' এই উদার, মানবতাবাদী, অহিংস, সর্বধর্মসমন্বয়ী মাতৃ- সাধনা কালী-আরাধনার এক নূতন যুগের, নূতন রূপের, নূতন ধারার প্রবর্তন করে। কালী, ভৈরবী, তারা, বগলা, ছিন্নমস্তা, ধূমাবতী প্রভৃতি দশমাতৃকা থেকে ষোড়শ মাতৃকা –--  গৌরী, পদ্মা, শচী, মেধা, সাবিত্রী, বিজয়া, জয়া, দেবসেনা, স্বাহা, স্বধা, শান্তি, পুষ্টি, ধৃতি, তুষ্টি, আত্মদেবতা, কুলদেবতা ---  মাতৃ-সাধনার সমস্ত রূপ ও মূর্তি অবিভাজ্য হয়ে গেল জগজ্জননী ভবতারিণীর মধ্যে। তন্ত্র সাধনার ক্ষেত্ৰগুলি বাঙলায় ও বাঙলার বাইরে এখনো মাতৃপূজার তীর্থক্ষেত্ররূপে বিরাজমান।  আবার ভয়ঙ্কর তান্ত্রিকতা এখন ক্রমক্ষীয়মান হলেও লোকায়ত কালী সাধনায় পশুবলি একটি কৌলিক ও শোণিত রঞ্জিত অনিবার্য প্রথা। 


 সাধক রামকৃষ্ণ দেবের ভবতারিণী কবি নজরুলের কল্পদৃষ্টিতে বিশ্বপরিব্যাপ্ত মাতৃসত্ত্বায় রূপান্তরিত হয়েছে। আর তাঁর যুগান্তকারী সমন্বয়ী চেতনায়, যুগাবতার শ্রীরামকৃষ্ণের মতোই, কালী-কৃষ্ণ একাকার। প্রথম ভাবনার প্রতিফলন প্রথমে উদাহৃত সঙ্গীতটি এবং
দ্বিতীয় ভাবনার বাক-প্রতিমাঃ

"শ্যামা মায়ের কোলে চড়ে জপবো আমি শ্যামের নাম।"

             এরপর কয়েকটি অতুলনীয় শ্যামাসঙ্গীত।
             ভক্ত পাঠকদের উদ্দেশে "প্রণিপাতেন"
                                    নিবেদন,
(আপনাদের সুচিন্তিত মন্তব্য আমার সাধনপথের পাথেয়।)

রামপ্রসাদ সেন (১৭১৮/১৭২৩--১৭৭৫) রচিত (প্রায় ২৫৬-২৮০) গানগুলির মধ্যে মাত্র গোটা পঞ্চাশেক গান, আকাশবাণী, পূরাতন গ্রামোফোন রেকর্ড বা ভক্তিগীতির জলসায় শোনার সৌভাগ্য হয়েছে।


সাধক রামপ্রসাদ (১৭১৮---১৭৭৫) এক স্বতন্ত্র ধারার কবি গীতিকার ও সুরকার। 

১)মন রে কৃষি কাজ জানো না 
২)আমায় দে মা তবিলদারী 
৩)চাই না মাগো রাজা হতে 
৪) অপার সংসার 
৫)চিন্তাময়ী তারা তুমি 
৬)অন্ন দে গো অন্নদা 
৭)সময় তো থাকবেনা গো মা 
৮)খুব দে রে মন কালী বলে 
৯)বসন পরো, পরো বসন 
১০)কাজ কিরে মন যেয়ে কাশী 

                                                সাধক কমলাকান্ত (১৭৬৯-১৮২১), 
শাক্তপদাবলীর এক অনন্যসাধারণ স্রষ্টা। তাঁর রচিত কয়েকটি অবিস্মরণীয় গানঃ 

১)সদানন্দময়ী কালী 
২)শ্যামা মা কি আমার কালো রে 
৩) যত্নে হৃদয়ে রেখো আদরিণী শ্যামা মাকে। 
৪) জানো না রে মন পরম কারণ শ্যামা মা শুধু মেয়ে নয়। 
৫) আনন্দময়ী মাগো 
৭)মজলো আমার মনভ্রমরা শ্যামাপদ নীল কমলে 
৮) আর কিছু চাইনা শ্যামা বিনে তোমার চরণ দুটি


এই মহাসাধকদের সঙ্গীত সম্পর্কে বিস্তারিত বলা নিষ্প্রয়োজন, কেননা তাঁদের সঙ্গীত প্রতিটি বঙ্গবাসীর শতাব্দীব্যাপী পুরুষানুক্রমিক উত্তরাধিকার। কিন্তু কালের নিরিখে অর্বাচীন হলেও নজরুলের ভক্তিগীতি শুধু বাংলা সাহিত্যে নয়, বাংলার সমাজে, বাংলার জনমানসে এক গভীর অবিমোচনীয়, আবেগরেখা অঙ্কন করেছে ; যে রেখা শুধু ধর্মভাবের নয়, অবিচ্ছেদ্য অসাম্প্রদায়িকতার।


রবীন্দ্রসঙ্গীত আর নজরুলগীতি সমস্বরে উচ্চারিত হয়।
এখানে তুলনা নয়, গরিমার কথা। আকাশগঙ্গার সঙ্গে পতিতপাবনী জাহ্নবীর তুলনা করা যায় না।
 দুরধিগম্য অমর্ত্য মহিমায় সমুজ্বল রবীন্দ্রসঙ্গীত যেন সেই অসীম, সুদূর, সৃষ্টিপরিব্যপ্ত আকাশগঙ্গা। আর নজরুলগীতি আমাদের কলুষনাশিনী, জীবনদায়িনী মন্দাকিনী। বিরহ-মিলনের আবেগ-তরঙ্গ আর ভক্ত প্রাণের অশ্রুধারায় সমুচ্ছ্বসিত। কাজী সাহেবের গানের সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। তাঁর জীবনীকারদের মতে সংখ্যাটি নির্ভুল নয়। আরও অনেক অনেক বেশী। তিনি " জৈষ্ঠ্যের ঝড়" (অচিন্ত কুমার সেনগুপ্ত)। শুধু যে "প্রলয় দোলায়" কাঁপিয়ে দিয়েছেন রক্ষণশীলতার জগদ্দল পাথর, ভেঙে দিয়েছেন জাত্যাভিমানের প্রাচীর তাই নয়, আপন সৃষ্ট সম্পদও ছড়িয়ে দিয়েছেন দুই হাতে--"সৃষ্টির মহানন্দে"। মণিমুক্তাতুল্য কত যে সঙ্গীত তিনি ফেলে দিয়েছেন জলসাঘরে,  বিলিয়ে দিয়েছেন ব্ন্ধুদের -- তার খোঁজ রেখেছে ক'জনা ? অদ্যাবধি প্রাপ্ত তিন সহস্রাধিক গানের মধ্যে ভক্তিগীতির সংখ্যা প্রায় ১২০০, সেগুলিকে বাছাই করে দেখা গিয়েছে এবং শ্যামাসঙ্গীত কম-বেশি ২৫০টি। এবং আশ্চর্য,  প্রতিটি গানই, বাংলায় সুদীর্ঘ আচরিত শাক্ত  সাধনপন্থার মর্মমূলে যে ভক্তি, যে আবেগ প্রকাশ পায়  তার বাণীমূর্তি যেন। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিচিত্র রাগ রাগিনী আশ্রিত সুরের বিস্ময়কর অভিব্যক্তি। কয়েকটি  চিরস্মরণীয় গান : 


কাজী নজরুল ইসলাম (২৪-০৫-১৮৯৯---২৯-৮-১৯৭৬)
বিপ্লবী, বিদ্রোহী, প্রেমিক কবি, সাধক, গীতিকার সুরকার, শিল্পী। 


 ১)বল রে জবা বল 
২)মহাকালের কোলে এসে 
৩)আমার কালো মেয়ে রাগ করেছে 
৪)রাঙা জবা বায়না ধরে 
৫)মহাবিদ্যা আদ্যাশক্তি 
৬)মা গো চিন্ময়ী রূপ ধরে আয় 
৭)ত্রিজগৎ আলো করে আছে কালো মেয়ের পায়ের শোভা 
৮)তোর ভুবনে জ্বলে এতো আলো 
৯)আর লুকাবি কোথায় মা 
১০)আমার আর কোন গুণ নেই মা 

নজরুল রচিত ভক্তিগীতি, বিশেষ করে শ্যামাসঙ্গীত, শাক্তগীতির শতাব্দী কালের ধারাবাহিকতার অনুসরণ নয়; তা স্বতন্ত্রতায়, কাব্যময়তায়, সাধনমার্গীয়  তন্ময়তায়, সুরে ও শৈলীতে অনন্যসাধারণ। 
আর দুটি কথা বলেই অন্য প্রসঙ্গে যাবো। নজরুল মানবতার জ্যোতির্ময় মূর্তি। মানবীয় আবেগের পবিত্র, নিষ্কলুষ ভগীরথ। এ হেন স্রষ্টার সৃষ্টি- ভাগীরথীর তীরে এসে দাঁড়িয়ে আবেগের তরঙ্গস্রোতে ভাসতেই থাকে বঙ্গজনমানস, ভাসে, ভেসে চলেছে আজও, ভাসবে আগামী অনন্তকাল, যতদিন থাকবে বাঙলা, বাঙালী, বঙ্গভূমি। 
কেউ প্রশ্ন করবে না হিন্দু না তিনি মুসলিম !  


তাঁর কয়েকটি ইসলামী গান, শ্যামা সঙ্গীত, এবং  বৈষ্ণবীয় ভাবের কীর্ত্তন পরপর দেখি যদি,
 মনে হয় তিনি যেন সর্বধর্ম সাধনায় সিদ্ধ, প্রেম ও ভক্তির মূর্ত  মানবীয় বিগ্রহ। 

১) তাওহীদেরই মুর্শিদ আমার মুহাম্মদের নাম 
২) আল্লাহকে যে পাইতে চায় 
৩) নবী মোর পরম মণি 
৪) আল্লাহতে পূর্ণ ইমান 
৫) মজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই 
৬) রমজানের ই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ 
                           

১। শ্যামা  নামের লাগলো আগুন আমার দেহ ধূপ কাঠিতে 
২। মাগো চিন্ময়ী রূপ ধরে আয় 
৩)বল রে জবা বল 
৪)শ্মশানে জাগিছে শ্যামা মা 
৫)শ্যামা মায়ের কোলে চড়ে 
                                                       
                                                             
আজ যখন মন্দিরের আঙিনায় পূজারীর রক্তস্রোত, মসজিদে, গীর্জায় অমঙ্গলের কালো ছায়া, ধর্মোন্মাদদের উন্মত্ত উল্লাস, জাতিবাদ, উগ্র রাষ্ট্রবাদ, বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যবাদ বিশ্বজনীন মানব সংসারটিকে নরকে পরিণত করেছে, তখন তাঁর মতো এক অকৃত্রিম, উদার,  মানবতাবাদী জীবন সাধকের পুণরাবির্ভাব ঘটুক এখানে এই বাংলার মাটিতে --- হে আল্লাহ, হে ঈশ্বর একমাত্র এই টুকুই প্রার্থনা ।

পরিশেষে তাঁর এই অবশ্য-স্মরণীয় কবিতাটি আবার স্মরণ করি : 

"আমারে সকল ক্ষুদ্রতা হতে 
বাঁচাও প্রভু উদার। 
হে প্রভু ! শেখাও, নীচতার চেয়ে 
নীচ পাপ নাহি আর। 

যদি শতেক জন্মে পাপে হই পাপী, 
যুগ যুগান্ত নরকেও যাপি-- 
জানি জানি প্রভু , তারও আছে ক্ষমা --
ক্ষমা নাহি নীচতার ।

ক্ষুদ্র করো না, হে প্রভু, আমার 
  হৃদয়ের পরিসর,
যেন সকলেই সম ঠাঁই পায় 
শত্রু মিত্র পর।

নিন্দা না করি ঈর্ষায় কারো-- 
অন্যের সুখে সুখ পাই আরো, 
কাঁদি তারই তরে অশেষ যে দুঃখী 
ক্ষুদ্র আত্মা যার ।।" 
  

২৯শে আগস্ট ১৯৭৬সালে উদারতার গগনবিহারী এই  মানুষটির মহাপ্রয়াণ ঘটে। তারপর থেকে এই প্রায় অর্ধ  শতাব্দী কাল দুই বাংলা --- এপার ওপার, যতটুকুই  ভালো আছে, সৌভ্রাতৃত্বের বন্ধনে যতটুকু বাঁধা আছে  তার সমস্তটটুকুই দুখু মিঞারই অবদান। 

মাতৃশক্তির জয় হোক, জয় হোক মানবতার।।

"শামা পূজার আগমনী শীর্ষক" আলোচনাটি আপাততঃ এখানেই  
  
                                সমাপ্ত। 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১৩ই অক্টোবর, ২০২২ 
ব্যাঙ্গালোর। 

 
-





Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...