শুক্রবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

মানুষ রূপী রাম চন্দ্র। রাম ও সুগ্রীবের মৈত্রী এবং রামের বালীবধ -- পর্ব চার


মানুষরূপী রামচন্দ্র - পর্ব চার 


রাম ও সুগ্রীবের মিত্রতা সংকল্পিত হোল। সন্ধি স্থাপিত হোল। তাঁরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হোলেন যে রাম বালীর দ্বারা অপহৃতা (সুগ্রীবের) ভার্যা রুমাকে এবং কিষ্কিন্ধ্যারাজ্য পুনরুদ্ধারে মিত্র সুগ্রীবকে সাহায্য করবেন।

সুগ্রীবও  সীতা অন্বেষণে ও সীতা উদ্ধারে রামকে সর্বপ্রকার সাহায্য করবেন। তিনি আরও বললেন যে,
এখন স্মরণে আসছে, রাক্ষস যখন তাঁকে হরণ করে নিয়ে যায় তখন তিনি 'হা রাম, হা লক্ষ্মণ' বলে আর্তনাদ করছিলেন। আমরা পাঁচজন পর্বতে তখন উপবিষ্ট ছিলাম। আমাদের দেখে সেই হতভাগিনী তাঁর উত্তরীয় ও আভরণ ফেলে দিয়েছেন। আমরা সে সমস্ত সংগ্রহ করে রেখেছি।
এই সংবাদ শুনে রাম উতলা হয়ে উঠলেন।
--- হে বন্ধু, শিঘ্র আন, শিঘ্র আন আমার প্রিয়ার সে আবরণ, সেই আভরণ! 

রাম সীতা দেবীর সেই পরিত্যক্ত দ্রব্যগুলি বুকের মধ্যে ধারণ করে 'হা প্রিয়া, হা প্রিয়া' বলে , দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে রোদন করতে লাগলেন। 

(বনবাসেও যাঁর সঙ্গ ও সান্নিধ্য ছাড়তে চাননি রাম সেই প্রিয়তমা প্রেয়সীকে হারিয়ে কী নিদারুণ বিরহ বেদনা তাঁর অন্তস্তল থেকে প্রতিনিয়ত আগ্নেয় গিরির লাভাস্রোতের মত উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছে তারই চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এখানে। প্রেমিক রামচন্দ্রের এই মানুষী মূর্তি মহাকবির দৈব লেখনীতে যে ভাবে উৎকীর্ণ হয়েছে তার ভাষান্তর করা সুকঠিন।) 

সুগ্রীবের সান্ত্বনা, 

--- সখা, শোক পরিহার কর। আমারও পত্নীবিচ্ছেদ ঘটেছে। কিন্তু অশিক্ষিত বানর হয়েও আমি ধৈর্য হারিয়ে ফেলিনি, শোকসন্তপ্ত হয়ে উঠিনি। আমি করজোড়ে তোমাকে অনুরোধ করছি, শোক করো না, পৌরুষ আশ্রয় কর, শোকাচ্ছন্ন লোকের সুখ নষ্ট হয়, তেজ ক্ষয় পায়, প্রাণ বিনাশ ও হতে পারে।
এবং পরস্পর সমবেদনায় দুই প্রাণের মৈত্রী নিবিড় হয়ে উঠল।

রামচন্দ্র প্রতীজ্ঞাবদ্ধ হলেন। তিনি বালীকে বধ করবেন।
"শরবনজাত, কঙ্ক পক্ষযুক্ত স্বর্ণভূষিত আমার এই বজ্রতুল্য বাণ সমুহ তোমার শত্রু বালীকে ভূতলশায়ী করবে।"
এরপর মহাকবি বালী ও সুগ্রীবের দ্বন্দ্ব- সংঘাতের দীর্ঘ ইতিহাস বর্ণনা করেছেন। সুগ্রীব বালীর অপরাজেয় বীর্য ও শৌর্যের কথা রামের কাছে ব্যক্ত করেছেন। বালীর তুলনায় রামের বল বীর্যের সমকক্ষতা সম্পর্কে সুগ্রীব সন্দেহ প্রকাশ করলে রাঘব এক বাণে সপ্ত শালবৃক্ষ ভেদ করে আপন অতিকায় শক্তিমত্তার পরিচয় দিলেন।
রামের উপদেশ ও মন্ত্রনায় সুগ্রীব বালীকে যুদ্ধে আহ্বান করেন। রাম গহন বনে প্রচ্ছন্ন হয়ে রইলেন। প্রথম বার সুগ্রীব বালীর দ্বারা পরাস্ত ও নিদারুণ আহত হয়ে ফিরে আসেন। কিন্তু দ্বিতীয় বার এই দুই ভ্রাতার দৈরথে সুগ্রীবকে চিহ্নিত করে রাম সংগোপনে অপেক্ষা করতে লাগলেন।
"অবশেষে (যখন) রাম দেখলেন সুগ্রীব ক্রমশ হীনবল হয়ে পড়ছেন এবং তাঁর দিকে বারবার চাইছেন, তখন সুগ্রীবকে আর্ত দেখে মহাবল রাম ভুজঙ্গসম শর সন্ধান করে কৃতান্তের কালচক্রের ন্যায় জ্যা আকর্ষণ করলেন। সেই প্রদীপ্ত অশনিতুল্য শর মুক্ত হয়েই ঘোর রবে বালীর বক্ষে পতিত হোল, তিনি আশ্বিন পূর্ণিমার উৎসবান্তে উৎক্ষিপ্ত ইন্দ্রধ্বজের ন্যায় অচেতন হয়ে ভূপতিত হোলেন।"
বিপুল শক্তির আধার বালী মুহূর্ত কয়েকের মধ্যে চেতনা ফিরে পেলেন। অস্ত্রবিদ্ধ অবস্থায় কাতর দৃষ্টিতে দেখলেন তাঁর সম্মুখে অগ্রসরমান রাম ও লক্ষ্মণকে। তাঁদের দেখে বালী ঘনায়মান মৃত্যু অন্ধকারে উল্কাপিন্ডের তেজ বিকিরণের যে কথাগুলি বলেছেন তা রামচরিত্রের উপর অক্ষয় কলঙ্ক আরোপ, 

"দমঃ শমঃ ক্ষমাঃ ধর্মো ধৃতি সত্ত্বং পরাক্রমঃ।
পার্থিবানাং গুণা রাজন্ দন্ডশ্চাপ্যপকারিষু।।
তান্ গুণান সম্প্রধার্য অহমগ্র্যংচ অভিজনং তব।
তারয়া প্রতিষিদ্ধঃ সন্ সুগ্রীবেণ সমাগত। ...।।"

এইভাবে তাঁর দীর্ঘ বক্তব্যের বাক্যবাণে রাম নৈতিকভাবে পরাভূত।
বালী বলেছেন,
জগৎ সংসার এই কথা বলে যে, রাম মহতী কুলজাত। রাম বীর্যবান, করুণাময়, অনুকম্পায়ী, কালজ্ঞ, অধ্যবসায়ী, প্রজাহিতব্রতী। দম শম ক্ষমা ধৈর্য বীর্য পরাক্রম --- এইসব রাজোচিত গুণ ও আভিজাত্য তোমার আছে, এমত ধারণার বশবর্তী হয়ে আমি তারার কথা না শুনে সুগ্রীবের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম আমি অন্যের সাথে যুদ্ধে নিরত আছি, এমন অসতর্ক অবস্থায় রাম আমাকে আঘাত করবেন না। এখন জানলাম, তুমি দুরাত্মা ধর্মধ্বজী অধার্মিক, তৃণাচ্ছাদিত কূপ ও প্রছন্ন অগ্নির ন্যায় সাধুবেশী পাপাচারী। তোমার ধর্মের কপট আবরণ আমি বুঝতে পারিনি। তুমি না কাকুস্থ ? বিনা অপরাধে শরাঘাতে আমাকে হত্যা করেছ, এই গর্হিত কাজ করে তুমি সভ্যসমাজে মুখ দেখাবে কিভাবে ?
আমার চর্ম লোম অস্থি কিছুই তোমার ন্যায় ধার্মিকের কাজে লাগবে না, আমি পঞ্চনখ হলেও আমার মাংস তোমার অভক্ষ। তুমি আমায় বধ করলে কোন সার্থকতা পাবার উদ্দেশ্য ? 

(বালীর এই প্রশ্নের অভ্যন্তরে লুকিয়ে আছে পারিবারিক-দ্বন্দ্বে-লিপ্ত দক্ষিণের ন-আর্য রাজ্যগুলিকে ভেঙে স্বস্বার্থে  রাজা রামচন্দ্রের সাম্রাজ্য বিস্তার করা। অনার্য সমাজকে হীনতর প্রমাণ করা।) 

বালি আরো বলছেন , 

--- গোপনে না থেকে তুমি যদি প্রকাশ্যে আমার সামনে শত্রুরূপে  আসতে তবে আজই তুমি নিহত হতে। আমি জানি তুমি সুগ্রীবের মিত্রতা লাভের কামনায় আমায় হত্যা করলে, কিন্তু আমাকে যদি বলতে তবে দুরাত্মা রাবণের কণ্ঠ বন্ধন করে তোমার কাছে জীবিত এনে দিতাম এবং এক দিনেই মৈথিলীকে উদ্ধার করে নিয়ে আসতাম। 

প্রত্যুত্তরে রামের যুক্তিগুলি নিতান্তই অর্বাচীন। অনেক দুর্বল যুক্তি দেবার পর তিনি যে যুক্তির অবতারণা করলেন তার মহামানবীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে সাম্প্রদায়িক। রাম মনুর বিধান ব্যাখ্যা করবার পর বলছেন, 


--- তোমাকে আমি ক্রোধবশে বধ করিনি, বধ করে আমার মনস্তাপও হয় নি। লোকে প্রকাশ্যে বা প্রচ্ছন্ন ভাবে জাল পাশ প্রভৃতির দ্বারা বহু মৃগ ধরে থাকে। মৃগ নিশ্চিন্ত বা ত্রস্ত, সতর্ক বা অসতর্ক, যেমনই থাকুক, মাংসাশী লোকে তাকে বধ করে, তাতে দোষের কিছু থাকে না। ধর্মজ্ঞ রাজর্ষিরাও মৃগয়ায় পরাম্মুখ হন না। তুমি তো শাখামৃগ, তোমাকে হনন করা আমার যুক্তিতে অধর্ম নয়। 

বালী মৃত্যু আসন্ন জেনে রামের এই কূট যুক্তির উত্তর দিলেন না, কেননা তখন তিনি পুত্র অঙ্গদের জন্য উদ্বিগ্ন। তিনি বললেন, 

--- রাম, আমি নিজের বা পত্নী তারার জন্য শোকাহত নই, আমার একমাত্র স্নেহলালিত বালক অঙ্গদের জন্য কাতর হয়েছি। তুমি তাকে রক্ষা ক'রো।
বালী কিন্তু মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতর হয়েও নিজে রাজাসুলভ এবং রামের প্রতি রাজকীয় সম্মান প্রদর্শন করে গিয়েছেন।
__________________________________________



বুধবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

বণীবন্দনা

বাণীবন্দনা 

(আজ সরস্বতী পূজা।  বাগ্দেবী আরাধনার এই পুন্য লগ্নে তাঁর শ্রীচরণ বন্দনা করি। মহাকবি বাল্মীকি রচিত মূল রামায়ণের রামচরিত আলোচনা 'মানুষরূপী রামচন্দ্র' চতুর্থ পর্ব দু'দিন পর প্রকাশিত হবে।)

বাক দেবী

বৈতর্ণ নদীর পাড়ে, পৃথিবী শেষ প্রান্তে আছি বসে, 
বধির, নির্বাক। মনে হয় নরকের দুঃশব্দের ঢেও 
প্লাবিত করেছে আজ ধরণীর তপোবনাশ্রম -- 
এখানেই সৃষ্টির সে-প্রথম তমোহরা ঊষসী প্রকাশ, আদিধ্বনি, 
আদিপিতা স্রষ্টার আনন্দিত মহা উচ্চারণ -- মহা-ওঙ্কার ! 
তুমি সেই বাক, সেই সুর, সেই স্বর, সেই বিদ্যা-জ্ঞান, 
চেতনার ভোরের আলোক। 
তপোসিদ্ধ কবি বাল্মীকি, বেদব্যাস, কলিদাস, ভবভূতি 
-- এমনি অসংখ্য বাণীর সাধক দেশে ও দেশান্তরে -- 
তোমার ভাণ্ডার হতে করে আহরণ, স্বর্গ হতে তুলে যেন 
মন্দার কুসুম, 
অঞ্জলি অঞ্জলি কথা অর্ঘ্য দিয়ে গেল তারা  মানুষের  ঘরে। 
মননের কুশ্রীতায় বিকৃত করেছি শব্দ, পঙ্কিল হয়েছে ভাষা --- 
লালিত্য-মাধুর্য-হারা শ্বাপদ হুঙ্কার ! 
এসো মা ভারতী, শ্রী হ্রী নিষ্কলঙ্ক শ্বেতকায়া, শ্বেত আবরণে, 
শ্বেতপদ্মে উপবিষ্ট শ্বেত বীণাধরা দেবী, শ্বেতহংস সাথে। 
বাজুক চরণে মা নূপুর নিক্কন, বীণার ঝঙ্কারে তোল সুর, 
শুচি, রুচি-শুদ্ধ বাণী ঝরুক ধরায়। 
একটি প্রেমের গানে ভরুক জীবন, নরকের অন্ত হোক্ একটি কথায়। 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১৪/০২/ ২০২৪
কলকাতা।







রবিবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

সাধারণ মানুষরূপী রামচন্দ্র -- পর্ব তিন

মানুষরূপী রামচন্দ্র, পর্ব-তিন 

কিষ্কিন্ধ্যাকান্ড 

সীতা বিরহী রামচন্দ্রের তীব্র শোক 

অরণ্যকান্ডের শেষে আমরা দেখলাম তপস্বিনী শবরী রামচন্দ্রকে নরশ্রেষ্ঠ এবং দেবগণেরও শ্রেষ্ঠ বলে সম্বোধন করছেন। সিদ্ধা শবরীর প্রতি অনুকম্পায়ী রামচন্দ্র জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আপনার তপস্যা, সাধনা পূর্ণতার পথে কতখানি অগ্রসর হয়েছে ? কোন বিঘ্ন এসেছে কিনা ? আহার ও ক্রোধ সংযত হয়েছে কি ? তপস্যার সমস্ত নিয়ম আপনি কি পালন করছেন ? মনে সুখ পেয়েছন কি ?
বৃদ্ধা শবরী উত্তর দিলেন, 

"অদ্য মে সফলং তৃপ্তং স্বর্গশ্চৈব ভবিষ্যতি।
ত্বয়ি দেববরে রাম পূজিতে পুরুষর্ষভ।।
ত্ববাহং চক্ষুষা সৌম্য পূতা সৌমেন মানদ।
গমিষ্যামি অক্ষয়া লোকাং তৎ প্রসাদাৎ অরিন্দম।।" 

তোমাকেই আমার পূজার্ঘ্য নিবেদন করে আমার তপস্যা পূর্ণ হবে। মানদ, তোমার সৌম্য দৃষ্টিতে আমি অমৃত লাভ করেছি, পূত হয়েছি। হে অরিন্দম, তোমার প্রসাদে আমি অক্ষয় লোক প্রাপ্ত হব। 

শবরী তারপর সেই সকল তপস্বীদের তপস্যার কাহিনী বর্ণনা করলেন, যাঁদের সেবায় তিনি জীবন অতিবাহিত করেছেন এবং যাঁদের ভবিষ্যতবাণী ছিল রামচন্দ্র তাঁর আশ্রমে একদিন পদার্পণ করবেন। তাঁদের বাণী শিরোধার্য করে আমি এই পম্পা তীরে উৎপন্ন বহুল বন্য উপহার তোমার জন্য সঞ্চয় করে তোমার প্রতীক্ষায় অপেক্ষা করছি।
তাঁর আত্মকাহিনী বিবৃত করবার পর তিনি আত্মকলেবর ত্যাগ করার বাসনা প্রকাশ করেন এবং অগ্নিতে দেহ আহুতি দিয়ে " দিব্যরূপে দিব্যালঙ্কারভূষিতা হয়ে স্বর্গলোকে মহর্ষিগণের নিকট গমন করেন।"

(বৌদ্ধধর্ম ও জৈন ধর্মের মহাপরিনির্বাণ - য়ের সঙ্গে তুলনীয় যেখানে  মোক্ষ লাভের প্রতি বাসনা ছিল প্রবল)। 

শবরীর স্বর্গযাত্রার পর রাম লক্ষ্মণ নানাবিধ বৃক্ষলতা পরিশোভিত রমণীয় পম্পা নদীর তীরে গিয়ে উপস্থিত হলেন।
সীতা দেবী অপহৃতা হয়েছেন, ভাই ভারতের কাতর অনুরোধ উপরোধও প্রত্যাখ্যান করেছেন। স্বভাবতই রামচন্দ্র বিষন্ন। তবুও পম্পার শোভা দেখে তিনি অনুজ লক্ষ্মণের নিকট তাঁর মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন। 

"পশ্য রূপালি সৌমিত্রে বনানাং পুষ্পশালিনাম।
সৃজতাং পুষ্পবর্ষাণি বর্ষং তোয়মুচামিব।।"

কী অপরূপ এই পুষ্পিত বনরাজী ! দেখ, দেখ সৌমিত্রি, মেঘ যেমন জলবর্ষণ করে তরু লতা থেকে তেমনি পুষ্প বর্ষিত হচ্ছে।
এই নয়নলোভন সৌন্দর্য অবলোকন করে রামচন্দ্রের সীতা দেবীর কথা মনে পড়ে গেল। লক্ষ্মণকে তিনি বলছেন, আজ অনঙ্গদেব (মন্মথ) আমার মনে গভীর সন্তাপের সৃষ্টি করেছে। কোকিল তার কণ্ঠস্বরের মূর্ছনায় যেন আমাকেই আহ্বান করছে। ওই দেখ ডাহুক পাখী ডেকে উঠল। 

"এষ দাত্যূহকো হৃষ্টো রম্যে মাং বননির্ঝরে।
প্রণদন্ মন্মথাবিষ্টং শোচয়িষ্যতি লক্ষ্মণ।।
শ্রুতৈতস্য পুরা শব্দমাশ্রমস্থা মম প্রিয়া।
মামাহূয় প্রমুদিতা পরং পত্যনন্দত।।" 


ওই বননির্ঝরপ্রান্ত হতে কোকিল, ডাহুক পাখীরা মধুর সুরে কূজন করে আমায় শোকাকুল করেছে। এই তো কয়েক দিন আগে, বল ভাই, আমার প্রিয়া বনে বনে, বনাশ্রমে এমন তরু লতার মর্মরধ্বনি, পাখীদের কাকলি শুনে প্রফুল্ল মনে আমায় ডাকতেন, আনন্দে উচ্ছল হয়ে উঠতেন।  
তিনি আবারও বলছেন, 


"পশ্য লক্ষ্মণ পুষ্পানি নিষ্ফলানি ভবন্তি মে।
পুষ্পভারসমৃদ্ধানাং বনানাং শিশিরাত্যয়ে ।।
রুচিরাণ্যপি পুষ্পাণি পাদপানামতিশ্রিয়া।
নিষ্ফলানি মহীং যান্তি সমং মধুকরোৎকরৈঃ।।
অমী লক্ষ্মণ দৃশ্যন্তে চূতাঃ কসুমশালিনঃ।
বিভ্রমোৎসিক্তমনসঃ সাঙ্গরাগা নরা ইব।।
অহো কামস্য বামত্বং যো গতামপি দুর্লভাম্।
স্মারয়িস্মতি কল্যাণীং কল্যাণতরবাদিনীম্।।" 

পুষ্পভারসমৃদ্ধ এই বনানী সৌন্দর্য, দেখ লক্ষ্মণ আজ আমার কাছে নিষ্ফলা। ...... অহো, হায় হায়, অনঙ্গদেবের কি বিরূপ অভিশাপ, যাঁর মিলন এখন দুর্লভ সেই কল্যানতরভাষিণী (প্রিয়ংবদা) সীতার কথা স্মরণে আসছে আমার। যাঁর সহবাসে আমার যা কিছু মাধুর্যমণ্ডিত ছিল, তাঁর বিরহে আজ তার সব কিছুই অরমণীয় মনে হচ্ছে। আবারো বলছেন, 

যদি দৃশ্যতে সা সাধ্বী যদি চেহ বসেমহি।
স্পৃহয়েয়ং ন শক্রায় নাযোধ্যায়ৈ রঘুত্তম।। 

হে সাধ্বী, তুমি দেখা দাও ! যদি আমার সাধ্বী প্রিয়া দেখা দেন, যদি তাঁর সঙ্গে আমি এখানে বিহার করতে পারি তবে আমি ইন্দ্রের পদ, (স্বর্গের বৈভব) বা অযোধ্যার রাজ্য, রাজৈশ্বর্য -- কিছুই চাই না।
পম্পা তীরের নিসর্গ প্রকৃতির যে অপরূপ সৌন্দর্য এবং সেই সৌন্দর্য অবলোকন করে রামচন্দ্রের বৈদেহী-বিরহ-বিলাপ মহাকবি বাল্মীকি ("নমি আমি কবিগুরু তবে পদাম্বুজে" -- মাইকেল মধুসূদন দত্ত) যে অমৃতনিস্যন্দ ভাষায় বর্ণনা করেছেন তার অনুবাদ করা দুরূহ নয়, অসম্ভব। 
এখানে লক্ষ্মণের ভূমিকা অসাধারণ। তাঁর স্থৈর্য অপার। তিনি রামকে বলেছেন, 

মা মা শুচ। শোক পরিহার করুন। হে নরশ্রেষ্ঠ, শোক মানুষের বুদ্ধি নাশ করে। আপনি দীন ভাব ত্যাগ করুন প্রকৃতস্থ হোন। উদ্যমের দ্বারাই আমরা জানকী উদ্ধার করে আনব। শোক ত্যাগ করুন, কাম প্রবৃত্তি পরিহার করুন। আপনি আত্মবিস্মৃত হবেন না। আপনি শুদ্ধস্বভাব, সুশিক্ষিত, নরশ্রেষ্ঠ দাশরথী।

(ক্রমশঃ)
_____________________________________________





বুধবার, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

সাধারণ মানুষরূপী রামচন্দ্র



সাধারণ মানুষরূপী রামচন্দ্র 

পাঠ -- দুই 

অরণ্যকান্ড ও কিষ্কিন্ধ্যাকান্ড 


অরণ্যকান্ডের শেষে আমরা দেখলাম সীতার সন্ধানে গভীর বন থেকে গভীরতর বনান্তরে যেতে যেতে রাম লক্ষ্মণের সঙ্গে সাক্ষাৎ হোল মুমুর্ষ জটায়ুর।
"যেতে যেতে একস্থানে রাম দেখলেন, গিরিশৃঙ্গের ন্যায় জটায়ু রক্তাক্ত দেহে পড়ে আছেন। ধনুতে ক্ষুরধার শর সন্ধান করে রাম বললেন, এই পক্ষিরূপধারী রাক্ষসই সীতাকে খেয়েছে তাতে সন্দেহ নাই, একে আমি বধ করছি। জটায়ু সফেন রুধির বমন করতে করতে অতি দীন বাক্যে বললেন, আয়ুষ্মান, তুমি যাকে খুঁজছ সেই দেবীকে রাবণ হরণ করেছে, আমার প্রাণও হরণ করেছে। অসহায়া সীতাকে রাবণ নিয়ে যাচ্ছে দেখে আমি তার সঙ্গে যুদ্ধ করে তাকে ভূপাতিত করেছি, তার ধনু শর রথ ও ছত্র চূর্ণ করেছি, সারথিকেও বধ করেছি। অবশেষে আমাকে পরিশ্রান্ত দেখে রাবণ খড়্গাঘাতে আমার পক্ষ ছেদন করে সীতাকে আকাশমার্গে নিয়ে গেছে। রাক্ষস আমাকে মেরে রেখেছে, তুমি আবার মেরো না।
ধনু ফেলে দিয়ে রাম সরোদনে জটায়ুকে আলিঙ্গন করে লক্ষ্মণকে বললেন, রাজ্যনাশ বনবাস,  সীতাবিয়োগ, জটায়ুর মরণ সবই আমার ভাগ্যে হোল, আমার অলক্ষ্মী আগ্নিকেও দগ্ধ করতে, সাগরকেও শুষ্ক করতে পারে। এই মহাবল গৃধ্ররাজ পিতৃবয়স্য জঠায়ুও মরণাপন্ন হয়েছেন। 
( রাম সাশ্রুনেত্রে আসন্নমৃত্যু জটায়ুর কাছে জানতে চাইলেন রাবণের বীর্য, রূপ কি প্রকার, জানতে চাইলেন সীতার অবস্থা তখন কেমন ছিল। জটায়ু বললেন মায়াবী রাবণ মেঘ ও ঝটিকা সৃষ্টি করে সীতাকে আকাশ পথে নিয়ে গেছে।) জটায়ুর মুখ থেকে সমাংস রুধির নির্গত হতে লাগল 'বিশ্রবার পুত্র, কুবেরের ভ্রাতা' --এই কথা বলেই তিনি প্রাণত্যাগ করলেন। রাম কৃতাঞ্জলি হয়ে বললেন, 'বল বল', কিন্তু জটায়ুর মস্তক তখন ভূলুণ্ঠিত হল, তিনি চরণ প্রসারিত করে শয়ন করলেন।মৃত জটায়ুর জন্য রাম বহু বিলাপ করলেন। তাঁর আদেশে লক্ষ্মণ কাঠ নিয়ে এলে রাম চিতা রচনা করে গৃধ্ররাজকে দাহ করলেন। তারপর মৃগমাংসের পিন্ড দিয়ে হরিদ্বর্ণ তৃণময় ক্ষেত্রে পক্ষীদের ভোজন করালেন এবং দুই ভ্রাতা গোদাবরীতে গিয়ে তর্পণ করলেন।

(এরপর ভ্রাতৃদ্বয়ের দক্ষিণ দিকে ক্রৌঞ্চারণ্যে যাত্রা, আবার পূর্বদিকে --- মাতঙ্গ মুনির আশ্রমে, আরো গহনারণ্যে, পাতালতুল্য গভীর অন্ধকারময় গিরিকন্দর, সেখানে তীক্ষ্ণদশনা, লম্বোদরী, ভীমাকৃতি রাক্ষসী অয়োমুখী গোটা হরিণ খেতে খেতে লক্ষ্মণের কাছে এসে তাকে কামনা করে। লক্ষণ কুপিত হয়ে খড়্গাঘাতে তার কর্ণ নাসিকা ও স্তন কর্তণ করে।
আবার তাঁরা অগ্রসর হন। আবার কবন্ধ রাক্ষস। সে ছিল শাপগ্রস্ত, শ্রী নামক দানবের পুত্র দনু। রাম লক্ষ্মণের দ্বারা নিহত ও সৎকৃত হয়ে সে মুক্তি লাভ করলে বানররাজ ভ্রাতা বালীর দ্বারা বিতাড়িত সুগ্রীবের সন্ধান দিলেন। সুগ্রীব কামরূপী, কৃতজ্ঞ এবং নিজেও সাহায্য প্রার্থী। তোমার ভার্যার অনুসন্ধানের জন্য তিনি মহাকায় বানরদের চতুর্দিকে পাঠাবেন এবং মেরুশৃঙ্গ বা পাতালে গিয়েও রাক্ষস বধ করে সীতাকে তোমার হস্তে দেবেন।
এবার সুগ্রীবের বাস সম্মন্ধে বললেন,
পশ্চিম দিকে যেখানে বহু পুষ্পিত বৃক্ষ দেখা যাচ্ছে সেখান দিয়েই তোমার মাত্রার উত্তম পথ। যেতে যেতে তোমরা ফলভারে অবনত অনেক মহাবৃক্ষ দেখবে, শাখা নমিত করে তাদের অমৃততুল্য ফল ভক্ষণ ক'রো। পর্বত থেকে পর্বতে, বন থেকে বনে গিয়ে পম্পার তীরে উপস্থিত হবে। এই পুষ্করিণীতে কঙ্কর ও শৈবাল নেই, কমল ও উৎপলে শোভিত, তলদেশ বালুকাময় অপিচ্ছিল। তার তীরে বহুপ্রকার পক্ষী কূজন করে, তারা মানুষকে ভয় করে না। তোমরা সেই সকল ঘৃতপিন্ডতুল্য স্থল পক্ষী ভক্ষণ ক'রো। পম্পার জলে এক-কন্টক উৎকৃষ্ট রোহিত, চক্রতুন্ড ও নলমীন মৎস্য আছে, লক্ষ্মণ শরাঘাতে তাদের মেরে ত্বক ও শল্ক ছাড়িয়ে শূলপক্ক করে দেবেন। তোমার ভোজন হলে লক্ষ্মণ তোমাকে পদ্মপত্রে পম্পার নির্মল জল এনে দেবেন।
ওখানকার বনে মতঙ্গ মুনির শিষ্যগণ বাস করতেন। ফল মূল আহরণের শ্রমে তাঁদের যে স্বেদবিন্দু পড়ত তার থেকে বিবিধ পুষ্প উৎপন্ন হয়েছে, এই সকল পুষ্প কখনও শীর্ণ বা ম্লান হয় না। তাঁরা এখন গত হয়েছেন, কেবল তাদের পরিচারিণী শবরী নামে এক শ্রমণী ওখানে আছেন। এই ধর্মশীলা সন্ন্যাসিনী তোমাকে দর্শন করে স্বর্গলোকে যাবেন। রাম, তুমি পম্পার পশ্চিম তীর দিয়ে গেলে মতঙ্গ ঋষির আশ্রম দেখতে পাবে। সেই রমণীয় স্থানের নাম মতঙ্গ বন। হস্তীরা সেখানে যেতে পারে না। তার অদূরেই ব্রহ্মার রচিত ঋষ্যমূক পর্বত। লোকে তার শিখরে শুয়ে নিদ্রাবস্থায় যত ধনের স্বপ্ন দেখে, জাগ্রত হলে ততই পায়। এই পর্বতে এক দুষ্প্রবেশ্য গুহা আছে, সুগ্রীব তার সহচর বানরদের সঙ্গে তার মধ্যে বাস করেন, সময়ে সময়ে পর্বতের উপরেও থাকেন।

(রাম ক্ষত্রীয় রাজ কুমার। তাঁর খাদ্যাভ্যাস রাজকীয় হবে --তাই স্বাভাবিক। পাঠান্তরে মানুষরূপী রামচন্দ্রের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলি ধারাবাহিক আলোচনা করা হবে। )




সোমবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

সাধারণ মানুষরূপী রামচন্দ্র

অযোধ্যাকান্ড 


পাঠ -- এক 


চন্ডালরাজ গুহর আতিথ্য গ্রহণ করার পর লক্ষ্মণ ও সীতা সহ রামচন্দ্র গঙ্গা পার হয়ে সমৃদ্ধ শস্যসম্পন্ন বৎসদেশে উপস্থিত হলেন। সেখানে রাম লক্ষ্মণ বরাহ ঝষ্য পৃষত ও মহারুরু এই চার প্রকার পশু বধ করে তাদের পবিত্র মাংস নিয়ে ক্ষুদিত হয়ে সায়ংকালে বাসের নিমিত্ত বনে প্রবেশ করলেন।

সন্ধ্যা বন্দনার পর রাম লক্ষ্মণকে বললেন, জনপদের বাইরে আজ আমাদের প্রথম রাত্রি। আজ মহারাজ নিশ্চয়ই ক্ষুধার্ত হয়ে শুয়ে আছেন। কৈকেয়ীর কামনা সিদ্ধ হয়েছে, তিনি তুষ্টি লাভ করেছেন। আমি চলে আসায় আমার বৃদ্ধ পিতা অনাথ হয়েছেন, কৈকেয়ীর বশবর্তী হয়ে সেই কামাত্মা এখন কি করবেন ?  রাজার এই ব্যসন ও মতিভ্রম দেখে মনে হচ্ছে যে ধর্ম ও অর্থ অপেক্ষা কামই প্রবল। কোন মূর্খ লোকও কি পারে ---যেমন আমার পিতা করেছেন ? সস্ত্রীক ভরতই সুখী তিনি একাকীই অধিরাজের ন্যায় সমগ্র কৌশল রাজ্য ভোগ করবেন। কৈকেয়ী অতি ক্ষুদ্রমতি, তিনি বিদ্বেষবশে আমার মাতাকে বিষ দিতে পারেন।••••••••••। 


কিছু দূর যাবার পর তাঁরা ভরদ্বাজ মুনির আশ্রমে উপস্থিত হলেন। (ভরদ্বাজ মুনির কাছে রামচন্দ্র লোকালয় ছেড়ে নির্জন স্থানে বাস করার ইচ্ছা পোষণ করলেন।) মহামুনি ভরদ্বাজ বললেন, বৎস, এখান থেকে দশ ক্রোশ দূরে চিত্রকূট নামে গন্ধমাদনসদৃশ এক পর্বত আছে, সেখানে অনেক গোলাঙ্গুল, বানর ও ভল্লুক বাস করে। সেই পর্বতের শৃঙ্গ দেখলে কল্যান, মোহমুক্তি হয়। ভরদ্বাজ মুনির নির্দিষ্ট পথে যেতে যেতে সীতা অদৃষ্টপূর্ব পাদপ গুল্ম ও পুষ্পিত লতা সম্মন্ধে রামকে প্রশ্ন করতে লাগলেন, এবং লক্ষ্মণ সীতার ইচ্ছানুসারে নানাপ্রকার পুষ্পাদি এনে দিলেন। এক ক্রোশ গিয়ে দুই ভ্রাতা বহুপ্রকার পবিত্র মৃগ বধ করে এনে যমুনাতীরস্থ বনে ভোজন করলেন। তারপর তাঁরা ময়ূর নাদিত হস্থিবানরসঙ্কল  সুন্দর সমতল নদীতটে রাত্রিযাপনের জন্য আশ্রয় নিলেন। 


(এখানে চিত্রকূট যাবার যে পথ তার অপূর্ব সুন্দর মহাকব্যিক বর্ণনা আছে।) 


প্রভাতকালে সকলে যমুনা নদীর পবিত্র জল স্পর্শ করে চিত্রকূট অভিমুখে যেতে লাগলেন। রাম বললেন, দেখ, শীত ঝতুর অবসানে পুষ্পিত কিংশুক বৃক্ষসকল যেন প্রদীপ্ত হয়েছে। ভল্লাতক (ভেলা) ও বিল্ব ফলপুষ্পে অবনত হয়ে আছে, গাছে গাছে কলসের ন্যায় মধুচক্র ঝুলছে। দাত্যূহ ও ময়ূর ডাকছে। বনভূমি পুষ্পে আকীর্ণ। ওই দেখ, চিত্রকূট পর্বত, তার সমভূমির রমণীয় কাননে আমরা বাস করব। মনে হচ্ছে এখানে প্রচুর ফলমূল পাওয়া যাবে। ঋষিরাও এখানে বাস করেন।

তাঁরা বাল্মীকির আশ্রমে এসে কৃতাঞ্জলি হয়ে প্রণাম করে নিজ পরিচয় দিলেন। মহর্ষি আনন্দিত হয়ে তাঁদের অভ্যর্থনা ও সৎকার করলেন।
তারপর রাম লক্ষ্মণকে বললেন, আমাদের বাসগৃহ নির্মাণের জন্য তুমি উত্তম দৃঢ় কাষ্ঠ সংগ্রহ কর। লক্ষ্মণ অনেক গাছ কেটে এনে এক পর্ণশালা নির্মাণ করলেন। রাম বললেন, আমাদের বহুকাল এখানে বাস করতে হবে সেজন্য যথাশাস্ত্র বাস্তুশান্তি করা আবশ্যক, অতএব তুমি মৃগ বধ করে নিয়ে এস। লক্ষ্মণ পবিত্র কৃষ্ণমৃগ বধ করে এনে তার মাংস অগ্নিপক্ক ও শোণিতশূণ্য করে রামকে দিলেন। রাম স্নান করে, মন্ত্রপাঠ ও জপ করে যথাবিধি হোম দেবার্চনা ও বাস্তুশান্তির পর গৃহপ্রবেশ করলেন। রমণীয় চিত্রকূট পর্বত, মাল্যবতী নদী, মৃগপক্ষীসমন্বিত কানন, এবং বায়ুপ্রবাহ থেকে সুরক্ষিত পর্ণকুটীর -- এই সকল লাভ করে তাঁরা নির্বাসনের দুঃখ ভুলে আনন্দে কালযাপন করতে লাগলেন।
(লক্ষ্যণীয় মহারাজ দশরথের জ্যেষ্ঠ পুত্র রাজকীয় প্রকৃতির অধিকারী রাম অনুজ ভ্রাতাকে আদেশ করেছেন। নব গৃহনির্মাণ ও গৃহপ্রতিষ্ঠার উৎসব পালন করছেন মৃগমাংস  ভক্ষণের মধ্য দিয়ে) 


(মূল বাল্মীকি রামায়ণ ও রাজশেখর বসু মহাশয়ের অনুবাদ থেকে মানুষরূপী রামচন্দ্রের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলি ধারাবাহিক তুলে ধরবার চেষ্টা করব। যাঁরা আদি মহাকবির মহাগ্রন্থ পড়ে উঠতে পারেননি তাঁদের জন্য এই লেখা। পাঠশেষে আলোচনা করা হবে।)  

শনিবার, ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা

লক্ষ চরণ-পতন ছন্দে বিচিত্র স্বরে সুরে 
মিলায়ে প্রাণের মত্ত আবেগ আমি মরি ঘুরে ঘুরে। 
বইয়ের পসরা রয়েছে সাজানো যেদিকে তাকাই সেদিকে, 
গলি গলি চলি--- মুগ্ধ নয়ন বেপথু এদিকে ওদিকে। 
বিপণির সারে, বই থরে থরে বিচিত্র তাদের আবরণ, 
শীর্ণ, পৃথুলা যেমন গতর তেমনই চিত্র আভরণ। 
ভিতরে সবার প্রবেশাধিকার হবেনা শতেক জনমে, 
হাতে তুলে নেব, পাতা ওল্টাব ? আড়ষ্ট হই শরমে। 

কোটি মানুষের মানস-তটিনী দিক দিগন্ত হতে 
কথা কাহিনীতে, কাব্য ও গীতে মিলে' অজস্র স্রোতে 
সৃজন মেলার মহামোহনায় তোলে ধ্বনি, তোলে সুর-- 
মিলনানন্দে, বিরহ-ব্যথায়, হাসি গানে সুমধুর। 
ভগীরথ যাঁরা এসেছেন তাঁরা সৃষ্টিশঙ্খ বজায়ে, 
জ্ঞানের সাগর তীর্থাঙ্গনে রাখেন অর্ঘ্য সাজায়ে। 
অজ্ঞান-তিমির-অন্ধ আমার বহু সাধনার পুন্য -- 
গ্রন্থ-কমল-সুরভী-সুধায় জীবন হয়েছে ধন্য। 
মনে সাধ জাগে লিখি দুটি বাণী মানস সিন্ধুকূলে 
বালুকা বেলায় তরঙ্গ রেখায় বেদনা অশ্রু জলে। 
যে রসোচ্ছ্বাসে শ্লোকের স্ফুরণ আসেনা সে ঢেও বুকে, 
তমসার তীরে ব্যর্থ জীবন কাঁদে আলোকের শোকে। 

(কবিতাটি পুনঃপ্রকাশিত)
৩১ শেষ জানুয়ারি ২০২৪
     
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
৩রা ফেব্রুয়ারী,২০২৩।
কলকাতা বইমেলা।



















বৃহস্পতিবার, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

শব্দ খুঁজি


শব্দ খুঁজি 


একান্তে থাকি বসে, শব্দ খুঁজি দীর্ঘ প্রহর ধরে।
বুকভরা ব্যাকুলতা কণ্ঠে উঠে আসে দমকে দমকে,
প্রকাশ তার ইঙ্গিতে আভাসে। শব্দ খুঁজি দিনে রাতে,
শব্দ খুঁজি সকালে সন্ধ্যায়। সন্তানের জন্মদান কালে
জননীর বাৎসল্যের আর্ত সুখে, মৃতবৎসা গোমাতার
বিমূঢ় দৃষ্টিতে। হাসপাতাল --স্বজনের জীবন- মরণ, 

উৎকণ্ঠা -- শব্দহীন পাষাণ সময় প্রতিক্ষার। বর্ষণ,

প্লাবন, জলোচ্ছ্বাস, -- ভাঙা ঘর -- নিরাশ্রয়, মূক,
শূন্যদৃষ্টি কিষান দম্পতি বসে আছে মুখোমুখী।
থানা থেকে বলছি, " মৃতদেহ পাওয়া গেছে অমুকের
হোগলার ঝোপে!" স্থবির, নিশ্চল বা অচেতন
বৃদ্ধ পিতা মাতা --- নৈঃশব্দের ডাক ডাকে টিকটিকি।
খবরে ভাসে খুন, ধর্ষণ, হনন পাঁচালী -- শব্দ খুঁজি।

হাঁটি পথে, গাছের হলুদ পাতা ঝরে পড়ে পায়ে,
আসে বসন্ত ফুলবনে, মরা ডালে ভরা ফুল অকস্মাৎ--
শব্দ খুঁজি আমি। খসা পাতা, হাসা ফুল ভাষাহীন।
সৌরভ প্রথম প্রেমের কিশোর বেলার 'কস্তুরীমৃগসম',
নিঃশব্দে বিবশ করে। বিহ্বলতা নবযৌবনের--
কোকিলের অক্লান্ত কুহুর মতোই, আছে সু্র শব্দহারা।
সন্তাপের দীর্ঘশ্বাস বার্ধক্যের, অপূর্ণতা খোঁজার প্রয়াশ
অপ্রকাশ্যে, পূর্ণ নীরবতায়। শব্দ নাই গভীর দুঃখের,
শব্দ নাই নিবিড় সুখের, সৃষ্টির, বিলয়ের। তবু অন্বেষণ।
গভীরের শব্দগুলি কেন যেন ভালোবাসে 'নীরবের' মায়ার বাঁধন !

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
০১/০২/২০২৪
কলকাতা।
















Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...