সোমবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

সাধারণ মানুষরূপী রামচন্দ্র

অযোধ্যাকান্ড 


পাঠ -- এক 


চন্ডালরাজ গুহর আতিথ্য গ্রহণ করার পর লক্ষ্মণ ও সীতা সহ রামচন্দ্র গঙ্গা পার হয়ে সমৃদ্ধ শস্যসম্পন্ন বৎসদেশে উপস্থিত হলেন। সেখানে রাম লক্ষ্মণ বরাহ ঝষ্য পৃষত ও মহারুরু এই চার প্রকার পশু বধ করে তাদের পবিত্র মাংস নিয়ে ক্ষুদিত হয়ে সায়ংকালে বাসের নিমিত্ত বনে প্রবেশ করলেন।

সন্ধ্যা বন্দনার পর রাম লক্ষ্মণকে বললেন, জনপদের বাইরে আজ আমাদের প্রথম রাত্রি। আজ মহারাজ নিশ্চয়ই ক্ষুধার্ত হয়ে শুয়ে আছেন। কৈকেয়ীর কামনা সিদ্ধ হয়েছে, তিনি তুষ্টি লাভ করেছেন। আমি চলে আসায় আমার বৃদ্ধ পিতা অনাথ হয়েছেন, কৈকেয়ীর বশবর্তী হয়ে সেই কামাত্মা এখন কি করবেন ?  রাজার এই ব্যসন ও মতিভ্রম দেখে মনে হচ্ছে যে ধর্ম ও অর্থ অপেক্ষা কামই প্রবল। কোন মূর্খ লোকও কি পারে ---যেমন আমার পিতা করেছেন ? সস্ত্রীক ভরতই সুখী তিনি একাকীই অধিরাজের ন্যায় সমগ্র কৌশল রাজ্য ভোগ করবেন। কৈকেয়ী অতি ক্ষুদ্রমতি, তিনি বিদ্বেষবশে আমার মাতাকে বিষ দিতে পারেন।••••••••••। 


কিছু দূর যাবার পর তাঁরা ভরদ্বাজ মুনির আশ্রমে উপস্থিত হলেন। (ভরদ্বাজ মুনির কাছে রামচন্দ্র লোকালয় ছেড়ে নির্জন স্থানে বাস করার ইচ্ছা পোষণ করলেন।) মহামুনি ভরদ্বাজ বললেন, বৎস, এখান থেকে দশ ক্রোশ দূরে চিত্রকূট নামে গন্ধমাদনসদৃশ এক পর্বত আছে, সেখানে অনেক গোলাঙ্গুল, বানর ও ভল্লুক বাস করে। সেই পর্বতের শৃঙ্গ দেখলে কল্যান, মোহমুক্তি হয়। ভরদ্বাজ মুনির নির্দিষ্ট পথে যেতে যেতে সীতা অদৃষ্টপূর্ব পাদপ গুল্ম ও পুষ্পিত লতা সম্মন্ধে রামকে প্রশ্ন করতে লাগলেন, এবং লক্ষ্মণ সীতার ইচ্ছানুসারে নানাপ্রকার পুষ্পাদি এনে দিলেন। এক ক্রোশ গিয়ে দুই ভ্রাতা বহুপ্রকার পবিত্র মৃগ বধ করে এনে যমুনাতীরস্থ বনে ভোজন করলেন। তারপর তাঁরা ময়ূর নাদিত হস্থিবানরসঙ্কল  সুন্দর সমতল নদীতটে রাত্রিযাপনের জন্য আশ্রয় নিলেন। 


(এখানে চিত্রকূট যাবার যে পথ তার অপূর্ব সুন্দর মহাকব্যিক বর্ণনা আছে।) 


প্রভাতকালে সকলে যমুনা নদীর পবিত্র জল স্পর্শ করে চিত্রকূট অভিমুখে যেতে লাগলেন। রাম বললেন, দেখ, শীত ঝতুর অবসানে পুষ্পিত কিংশুক বৃক্ষসকল যেন প্রদীপ্ত হয়েছে। ভল্লাতক (ভেলা) ও বিল্ব ফলপুষ্পে অবনত হয়ে আছে, গাছে গাছে কলসের ন্যায় মধুচক্র ঝুলছে। দাত্যূহ ও ময়ূর ডাকছে। বনভূমি পুষ্পে আকীর্ণ। ওই দেখ, চিত্রকূট পর্বত, তার সমভূমির রমণীয় কাননে আমরা বাস করব। মনে হচ্ছে এখানে প্রচুর ফলমূল পাওয়া যাবে। ঋষিরাও এখানে বাস করেন।

তাঁরা বাল্মীকির আশ্রমে এসে কৃতাঞ্জলি হয়ে প্রণাম করে নিজ পরিচয় দিলেন। মহর্ষি আনন্দিত হয়ে তাঁদের অভ্যর্থনা ও সৎকার করলেন।
তারপর রাম লক্ষ্মণকে বললেন, আমাদের বাসগৃহ নির্মাণের জন্য তুমি উত্তম দৃঢ় কাষ্ঠ সংগ্রহ কর। লক্ষ্মণ অনেক গাছ কেটে এনে এক পর্ণশালা নির্মাণ করলেন। রাম বললেন, আমাদের বহুকাল এখানে বাস করতে হবে সেজন্য যথাশাস্ত্র বাস্তুশান্তি করা আবশ্যক, অতএব তুমি মৃগ বধ করে নিয়ে এস। লক্ষ্মণ পবিত্র কৃষ্ণমৃগ বধ করে এনে তার মাংস অগ্নিপক্ক ও শোণিতশূণ্য করে রামকে দিলেন। রাম স্নান করে, মন্ত্রপাঠ ও জপ করে যথাবিধি হোম দেবার্চনা ও বাস্তুশান্তির পর গৃহপ্রবেশ করলেন। রমণীয় চিত্রকূট পর্বত, মাল্যবতী নদী, মৃগপক্ষীসমন্বিত কানন, এবং বায়ুপ্রবাহ থেকে সুরক্ষিত পর্ণকুটীর -- এই সকল লাভ করে তাঁরা নির্বাসনের দুঃখ ভুলে আনন্দে কালযাপন করতে লাগলেন।
(লক্ষ্যণীয় মহারাজ দশরথের জ্যেষ্ঠ পুত্র রাজকীয় প্রকৃতির অধিকারী রাম অনুজ ভ্রাতাকে আদেশ করেছেন। নব গৃহনির্মাণ ও গৃহপ্রতিষ্ঠার উৎসব পালন করছেন মৃগমাংস  ভক্ষণের মধ্য দিয়ে) 


(মূল বাল্মীকি রামায়ণ ও রাজশেখর বসু মহাশয়ের অনুবাদ থেকে মানুষরূপী রামচন্দ্রের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলি ধারাবাহিক তুলে ধরবার চেষ্টা করব। যাঁরা আদি মহাকবির মহাগ্রন্থ পড়ে উঠতে পারেননি তাঁদের জন্য এই লেখা। পাঠশেষে আলোচনা করা হবে।)  

1 টি মন্তব্য:

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...