রবিবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

সাধারণ মানুষরূপী রামচন্দ্র -- পর্ব তিন

মানুষরূপী রামচন্দ্র, পর্ব-তিন 

কিষ্কিন্ধ্যাকান্ড 

সীতা বিরহী রামচন্দ্রের তীব্র শোক 

অরণ্যকান্ডের শেষে আমরা দেখলাম তপস্বিনী শবরী রামচন্দ্রকে নরশ্রেষ্ঠ এবং দেবগণেরও শ্রেষ্ঠ বলে সম্বোধন করছেন। সিদ্ধা শবরীর প্রতি অনুকম্পায়ী রামচন্দ্র জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আপনার তপস্যা, সাধনা পূর্ণতার পথে কতখানি অগ্রসর হয়েছে ? কোন বিঘ্ন এসেছে কিনা ? আহার ও ক্রোধ সংযত হয়েছে কি ? তপস্যার সমস্ত নিয়ম আপনি কি পালন করছেন ? মনে সুখ পেয়েছন কি ?
বৃদ্ধা শবরী উত্তর দিলেন, 

"অদ্য মে সফলং তৃপ্তং স্বর্গশ্চৈব ভবিষ্যতি।
ত্বয়ি দেববরে রাম পূজিতে পুরুষর্ষভ।।
ত্ববাহং চক্ষুষা সৌম্য পূতা সৌমেন মানদ।
গমিষ্যামি অক্ষয়া লোকাং তৎ প্রসাদাৎ অরিন্দম।।" 

তোমাকেই আমার পূজার্ঘ্য নিবেদন করে আমার তপস্যা পূর্ণ হবে। মানদ, তোমার সৌম্য দৃষ্টিতে আমি অমৃত লাভ করেছি, পূত হয়েছি। হে অরিন্দম, তোমার প্রসাদে আমি অক্ষয় লোক প্রাপ্ত হব। 

শবরী তারপর সেই সকল তপস্বীদের তপস্যার কাহিনী বর্ণনা করলেন, যাঁদের সেবায় তিনি জীবন অতিবাহিত করেছেন এবং যাঁদের ভবিষ্যতবাণী ছিল রামচন্দ্র তাঁর আশ্রমে একদিন পদার্পণ করবেন। তাঁদের বাণী শিরোধার্য করে আমি এই পম্পা তীরে উৎপন্ন বহুল বন্য উপহার তোমার জন্য সঞ্চয় করে তোমার প্রতীক্ষায় অপেক্ষা করছি।
তাঁর আত্মকাহিনী বিবৃত করবার পর তিনি আত্মকলেবর ত্যাগ করার বাসনা প্রকাশ করেন এবং অগ্নিতে দেহ আহুতি দিয়ে " দিব্যরূপে দিব্যালঙ্কারভূষিতা হয়ে স্বর্গলোকে মহর্ষিগণের নিকট গমন করেন।"

(বৌদ্ধধর্ম ও জৈন ধর্মের মহাপরিনির্বাণ - য়ের সঙ্গে তুলনীয় যেখানে  মোক্ষ লাভের প্রতি বাসনা ছিল প্রবল)। 

শবরীর স্বর্গযাত্রার পর রাম লক্ষ্মণ নানাবিধ বৃক্ষলতা পরিশোভিত রমণীয় পম্পা নদীর তীরে গিয়ে উপস্থিত হলেন।
সীতা দেবী অপহৃতা হয়েছেন, ভাই ভারতের কাতর অনুরোধ উপরোধও প্রত্যাখ্যান করেছেন। স্বভাবতই রামচন্দ্র বিষন্ন। তবুও পম্পার শোভা দেখে তিনি অনুজ লক্ষ্মণের নিকট তাঁর মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন। 

"পশ্য রূপালি সৌমিত্রে বনানাং পুষ্পশালিনাম।
সৃজতাং পুষ্পবর্ষাণি বর্ষং তোয়মুচামিব।।"

কী অপরূপ এই পুষ্পিত বনরাজী ! দেখ, দেখ সৌমিত্রি, মেঘ যেমন জলবর্ষণ করে তরু লতা থেকে তেমনি পুষ্প বর্ষিত হচ্ছে।
এই নয়নলোভন সৌন্দর্য অবলোকন করে রামচন্দ্রের সীতা দেবীর কথা মনে পড়ে গেল। লক্ষ্মণকে তিনি বলছেন, আজ অনঙ্গদেব (মন্মথ) আমার মনে গভীর সন্তাপের সৃষ্টি করেছে। কোকিল তার কণ্ঠস্বরের মূর্ছনায় যেন আমাকেই আহ্বান করছে। ওই দেখ ডাহুক পাখী ডেকে উঠল। 

"এষ দাত্যূহকো হৃষ্টো রম্যে মাং বননির্ঝরে।
প্রণদন্ মন্মথাবিষ্টং শোচয়িষ্যতি লক্ষ্মণ।।
শ্রুতৈতস্য পুরা শব্দমাশ্রমস্থা মম প্রিয়া।
মামাহূয় প্রমুদিতা পরং পত্যনন্দত।।" 


ওই বননির্ঝরপ্রান্ত হতে কোকিল, ডাহুক পাখীরা মধুর সুরে কূজন করে আমায় শোকাকুল করেছে। এই তো কয়েক দিন আগে, বল ভাই, আমার প্রিয়া বনে বনে, বনাশ্রমে এমন তরু লতার মর্মরধ্বনি, পাখীদের কাকলি শুনে প্রফুল্ল মনে আমায় ডাকতেন, আনন্দে উচ্ছল হয়ে উঠতেন।  
তিনি আবারও বলছেন, 


"পশ্য লক্ষ্মণ পুষ্পানি নিষ্ফলানি ভবন্তি মে।
পুষ্পভারসমৃদ্ধানাং বনানাং শিশিরাত্যয়ে ।।
রুচিরাণ্যপি পুষ্পাণি পাদপানামতিশ্রিয়া।
নিষ্ফলানি মহীং যান্তি সমং মধুকরোৎকরৈঃ।।
অমী লক্ষ্মণ দৃশ্যন্তে চূতাঃ কসুমশালিনঃ।
বিভ্রমোৎসিক্তমনসঃ সাঙ্গরাগা নরা ইব।।
অহো কামস্য বামত্বং যো গতামপি দুর্লভাম্।
স্মারয়িস্মতি কল্যাণীং কল্যাণতরবাদিনীম্।।" 

পুষ্পভারসমৃদ্ধ এই বনানী সৌন্দর্য, দেখ লক্ষ্মণ আজ আমার কাছে নিষ্ফলা। ...... অহো, হায় হায়, অনঙ্গদেবের কি বিরূপ অভিশাপ, যাঁর মিলন এখন দুর্লভ সেই কল্যানতরভাষিণী (প্রিয়ংবদা) সীতার কথা স্মরণে আসছে আমার। যাঁর সহবাসে আমার যা কিছু মাধুর্যমণ্ডিত ছিল, তাঁর বিরহে আজ তার সব কিছুই অরমণীয় মনে হচ্ছে। আবারো বলছেন, 

যদি দৃশ্যতে সা সাধ্বী যদি চেহ বসেমহি।
স্পৃহয়েয়ং ন শক্রায় নাযোধ্যায়ৈ রঘুত্তম।। 

হে সাধ্বী, তুমি দেখা দাও ! যদি আমার সাধ্বী প্রিয়া দেখা দেন, যদি তাঁর সঙ্গে আমি এখানে বিহার করতে পারি তবে আমি ইন্দ্রের পদ, (স্বর্গের বৈভব) বা অযোধ্যার রাজ্য, রাজৈশ্বর্য -- কিছুই চাই না।
পম্পা তীরের নিসর্গ প্রকৃতির যে অপরূপ সৌন্দর্য এবং সেই সৌন্দর্য অবলোকন করে রামচন্দ্রের বৈদেহী-বিরহ-বিলাপ মহাকবি বাল্মীকি ("নমি আমি কবিগুরু তবে পদাম্বুজে" -- মাইকেল মধুসূদন দত্ত) যে অমৃতনিস্যন্দ ভাষায় বর্ণনা করেছেন তার অনুবাদ করা দুরূহ নয়, অসম্ভব। 
এখানে লক্ষ্মণের ভূমিকা অসাধারণ। তাঁর স্থৈর্য অপার। তিনি রামকে বলেছেন, 

মা মা শুচ। শোক পরিহার করুন। হে নরশ্রেষ্ঠ, শোক মানুষের বুদ্ধি নাশ করে। আপনি দীন ভাব ত্যাগ করুন প্রকৃতস্থ হোন। উদ্যমের দ্বারাই আমরা জানকী উদ্ধার করে আনব। শোক ত্যাগ করুন, কাম প্রবৃত্তি পরিহার করুন। আপনি আত্মবিস্মৃত হবেন না। আপনি শুদ্ধস্বভাব, সুশিক্ষিত, নরশ্রেষ্ঠ দাশরথী।

(ক্রমশঃ)
_____________________________________________





কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...