শুক্রবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

মানুষ রূপী রাম চন্দ্র। রাম ও সুগ্রীবের মৈত্রী এবং রামের বালীবধ -- পর্ব চার


মানুষরূপী রামচন্দ্র - পর্ব চার 


রাম ও সুগ্রীবের মিত্রতা সংকল্পিত হোল। সন্ধি স্থাপিত হোল। তাঁরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হোলেন যে রাম বালীর দ্বারা অপহৃতা (সুগ্রীবের) ভার্যা রুমাকে এবং কিষ্কিন্ধ্যারাজ্য পুনরুদ্ধারে মিত্র সুগ্রীবকে সাহায্য করবেন।

সুগ্রীবও  সীতা অন্বেষণে ও সীতা উদ্ধারে রামকে সর্বপ্রকার সাহায্য করবেন। তিনি আরও বললেন যে,
এখন স্মরণে আসছে, রাক্ষস যখন তাঁকে হরণ করে নিয়ে যায় তখন তিনি 'হা রাম, হা লক্ষ্মণ' বলে আর্তনাদ করছিলেন। আমরা পাঁচজন পর্বতে তখন উপবিষ্ট ছিলাম। আমাদের দেখে সেই হতভাগিনী তাঁর উত্তরীয় ও আভরণ ফেলে দিয়েছেন। আমরা সে সমস্ত সংগ্রহ করে রেখেছি।
এই সংবাদ শুনে রাম উতলা হয়ে উঠলেন।
--- হে বন্ধু, শিঘ্র আন, শিঘ্র আন আমার প্রিয়ার সে আবরণ, সেই আভরণ! 

রাম সীতা দেবীর সেই পরিত্যক্ত দ্রব্যগুলি বুকের মধ্যে ধারণ করে 'হা প্রিয়া, হা প্রিয়া' বলে , দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে রোদন করতে লাগলেন। 

(বনবাসেও যাঁর সঙ্গ ও সান্নিধ্য ছাড়তে চাননি রাম সেই প্রিয়তমা প্রেয়সীকে হারিয়ে কী নিদারুণ বিরহ বেদনা তাঁর অন্তস্তল থেকে প্রতিনিয়ত আগ্নেয় গিরির লাভাস্রোতের মত উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছে তারই চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এখানে। প্রেমিক রামচন্দ্রের এই মানুষী মূর্তি মহাকবির দৈব লেখনীতে যে ভাবে উৎকীর্ণ হয়েছে তার ভাষান্তর করা সুকঠিন।) 

সুগ্রীবের সান্ত্বনা, 

--- সখা, শোক পরিহার কর। আমারও পত্নীবিচ্ছেদ ঘটেছে। কিন্তু অশিক্ষিত বানর হয়েও আমি ধৈর্য হারিয়ে ফেলিনি, শোকসন্তপ্ত হয়ে উঠিনি। আমি করজোড়ে তোমাকে অনুরোধ করছি, শোক করো না, পৌরুষ আশ্রয় কর, শোকাচ্ছন্ন লোকের সুখ নষ্ট হয়, তেজ ক্ষয় পায়, প্রাণ বিনাশ ও হতে পারে।
এবং পরস্পর সমবেদনায় দুই প্রাণের মৈত্রী নিবিড় হয়ে উঠল।

রামচন্দ্র প্রতীজ্ঞাবদ্ধ হলেন। তিনি বালীকে বধ করবেন।
"শরবনজাত, কঙ্ক পক্ষযুক্ত স্বর্ণভূষিত আমার এই বজ্রতুল্য বাণ সমুহ তোমার শত্রু বালীকে ভূতলশায়ী করবে।"
এরপর মহাকবি বালী ও সুগ্রীবের দ্বন্দ্ব- সংঘাতের দীর্ঘ ইতিহাস বর্ণনা করেছেন। সুগ্রীব বালীর অপরাজেয় বীর্য ও শৌর্যের কথা রামের কাছে ব্যক্ত করেছেন। বালীর তুলনায় রামের বল বীর্যের সমকক্ষতা সম্পর্কে সুগ্রীব সন্দেহ প্রকাশ করলে রাঘব এক বাণে সপ্ত শালবৃক্ষ ভেদ করে আপন অতিকায় শক্তিমত্তার পরিচয় দিলেন।
রামের উপদেশ ও মন্ত্রনায় সুগ্রীব বালীকে যুদ্ধে আহ্বান করেন। রাম গহন বনে প্রচ্ছন্ন হয়ে রইলেন। প্রথম বার সুগ্রীব বালীর দ্বারা পরাস্ত ও নিদারুণ আহত হয়ে ফিরে আসেন। কিন্তু দ্বিতীয় বার এই দুই ভ্রাতার দৈরথে সুগ্রীবকে চিহ্নিত করে রাম সংগোপনে অপেক্ষা করতে লাগলেন।
"অবশেষে (যখন) রাম দেখলেন সুগ্রীব ক্রমশ হীনবল হয়ে পড়ছেন এবং তাঁর দিকে বারবার চাইছেন, তখন সুগ্রীবকে আর্ত দেখে মহাবল রাম ভুজঙ্গসম শর সন্ধান করে কৃতান্তের কালচক্রের ন্যায় জ্যা আকর্ষণ করলেন। সেই প্রদীপ্ত অশনিতুল্য শর মুক্ত হয়েই ঘোর রবে বালীর বক্ষে পতিত হোল, তিনি আশ্বিন পূর্ণিমার উৎসবান্তে উৎক্ষিপ্ত ইন্দ্রধ্বজের ন্যায় অচেতন হয়ে ভূপতিত হোলেন।"
বিপুল শক্তির আধার বালী মুহূর্ত কয়েকের মধ্যে চেতনা ফিরে পেলেন। অস্ত্রবিদ্ধ অবস্থায় কাতর দৃষ্টিতে দেখলেন তাঁর সম্মুখে অগ্রসরমান রাম ও লক্ষ্মণকে। তাঁদের দেখে বালী ঘনায়মান মৃত্যু অন্ধকারে উল্কাপিন্ডের তেজ বিকিরণের যে কথাগুলি বলেছেন তা রামচরিত্রের উপর অক্ষয় কলঙ্ক আরোপ, 

"দমঃ শমঃ ক্ষমাঃ ধর্মো ধৃতি সত্ত্বং পরাক্রমঃ।
পার্থিবানাং গুণা রাজন্ দন্ডশ্চাপ্যপকারিষু।।
তান্ গুণান সম্প্রধার্য অহমগ্র্যংচ অভিজনং তব।
তারয়া প্রতিষিদ্ধঃ সন্ সুগ্রীবেণ সমাগত। ...।।"

এইভাবে তাঁর দীর্ঘ বক্তব্যের বাক্যবাণে রাম নৈতিকভাবে পরাভূত।
বালী বলেছেন,
জগৎ সংসার এই কথা বলে যে, রাম মহতী কুলজাত। রাম বীর্যবান, করুণাময়, অনুকম্পায়ী, কালজ্ঞ, অধ্যবসায়ী, প্রজাহিতব্রতী। দম শম ক্ষমা ধৈর্য বীর্য পরাক্রম --- এইসব রাজোচিত গুণ ও আভিজাত্য তোমার আছে, এমত ধারণার বশবর্তী হয়ে আমি তারার কথা না শুনে সুগ্রীবের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম আমি অন্যের সাথে যুদ্ধে নিরত আছি, এমন অসতর্ক অবস্থায় রাম আমাকে আঘাত করবেন না। এখন জানলাম, তুমি দুরাত্মা ধর্মধ্বজী অধার্মিক, তৃণাচ্ছাদিত কূপ ও প্রছন্ন অগ্নির ন্যায় সাধুবেশী পাপাচারী। তোমার ধর্মের কপট আবরণ আমি বুঝতে পারিনি। তুমি না কাকুস্থ ? বিনা অপরাধে শরাঘাতে আমাকে হত্যা করেছ, এই গর্হিত কাজ করে তুমি সভ্যসমাজে মুখ দেখাবে কিভাবে ?
আমার চর্ম লোম অস্থি কিছুই তোমার ন্যায় ধার্মিকের কাজে লাগবে না, আমি পঞ্চনখ হলেও আমার মাংস তোমার অভক্ষ। তুমি আমায় বধ করলে কোন সার্থকতা পাবার উদ্দেশ্য ? 

(বালীর এই প্রশ্নের অভ্যন্তরে লুকিয়ে আছে পারিবারিক-দ্বন্দ্বে-লিপ্ত দক্ষিণের ন-আর্য রাজ্যগুলিকে ভেঙে স্বস্বার্থে  রাজা রামচন্দ্রের সাম্রাজ্য বিস্তার করা। অনার্য সমাজকে হীনতর প্রমাণ করা।) 

বালি আরো বলছেন , 

--- গোপনে না থেকে তুমি যদি প্রকাশ্যে আমার সামনে শত্রুরূপে  আসতে তবে আজই তুমি নিহত হতে। আমি জানি তুমি সুগ্রীবের মিত্রতা লাভের কামনায় আমায় হত্যা করলে, কিন্তু আমাকে যদি বলতে তবে দুরাত্মা রাবণের কণ্ঠ বন্ধন করে তোমার কাছে জীবিত এনে দিতাম এবং এক দিনেই মৈথিলীকে উদ্ধার করে নিয়ে আসতাম। 

প্রত্যুত্তরে রামের যুক্তিগুলি নিতান্তই অর্বাচীন। অনেক দুর্বল যুক্তি দেবার পর তিনি যে যুক্তির অবতারণা করলেন তার মহামানবীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে সাম্প্রদায়িক। রাম মনুর বিধান ব্যাখ্যা করবার পর বলছেন, 


--- তোমাকে আমি ক্রোধবশে বধ করিনি, বধ করে আমার মনস্তাপও হয় নি। লোকে প্রকাশ্যে বা প্রচ্ছন্ন ভাবে জাল পাশ প্রভৃতির দ্বারা বহু মৃগ ধরে থাকে। মৃগ নিশ্চিন্ত বা ত্রস্ত, সতর্ক বা অসতর্ক, যেমনই থাকুক, মাংসাশী লোকে তাকে বধ করে, তাতে দোষের কিছু থাকে না। ধর্মজ্ঞ রাজর্ষিরাও মৃগয়ায় পরাম্মুখ হন না। তুমি তো শাখামৃগ, তোমাকে হনন করা আমার যুক্তিতে অধর্ম নয়। 

বালী মৃত্যু আসন্ন জেনে রামের এই কূট যুক্তির উত্তর দিলেন না, কেননা তখন তিনি পুত্র অঙ্গদের জন্য উদ্বিগ্ন। তিনি বললেন, 

--- রাম, আমি নিজের বা পত্নী তারার জন্য শোকাহত নই, আমার একমাত্র স্নেহলালিত বালক অঙ্গদের জন্য কাতর হয়েছি। তুমি তাকে রক্ষা ক'রো।
বালী কিন্তু মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতর হয়েও নিজে রাজাসুলভ এবং রামের প্রতি রাজকীয় সম্মান প্রদর্শন করে গিয়েছেন।
__________________________________________



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...