বৃহস্পতিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৪

রাত্রির পাপ মুছে দিনের উৎসব

রাত্রির পাপ মুছে দিনের উৎসব

অন্তিমের রাত্রি তার ভয়ঙ্কর, সঘন গহন অন্ধকার 

ঢাকে দিক দিগন্তর, বিদ্যুতের দৃষ্টি দিয়ে শেষ বার 

ঊর্দ্ধ্বে চেয়ে খুঁজে ধ্রুবতারা। বুকের অঙ্কুর-আশা 

চোখ বোজে চির হতাশায়। কিছুই কি ছিলনা জেগে 

 তখনো-বা, অন্তরের অবিক্ষত শেষ বদ্ধশ্বাসে ? 

ছিল প্রেম, ছিল সৃজনের লজ্জানম্র কামনার‌ 

আধফোটা কুসুমের কলি -- গন্ধ-বর্ণ-মধুবিন্দু-ভরা। 

ধরিত্রীর সব বায়ু, জল, আলো-অন্ধকার মুহূর্তে নিঃশেষ।  
যুদ্ধহীন এই পরাজয়, দ্বন্দ্বহীন প্রাণ-সমর্পণ, এই অনন্ত বিনাশ, 

তার গ্লানি রবে নাকি পুরুষের সগৌরব আত্মশ্লাঘায় ? 

জীবধাত্রী নারী, গঙ্গোত্রী ধারার মতো রক্তস্রাবে তার 

সিক্ত হয় বসুন্ধরা। কাল থেকে কালান্তরে প্রাণের বিস্তার 

সেই দিব্য স্রোতে। অন্তহীন দুঃখে তবু কেন তার চির পরাভব ? 

কেন তার জীবনের বিনষ্টির শেষে শোক-ধোওয়া 

 ছলনার মরণ-উৎসব ! 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 
২৮-০৮-২০২৪
ব্যাঙ্গালোর। 
______________________________________________













মঙ্গলবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৪

অরবিন্দ (দুই)

                অরবিন্দ (দুই) 


SABITRI --- A Legend and A Symbol 

BOOK --ONE 

The Book of the beginning

CANTO 1 

The symbol of Dawn. 


"It was the hour before the Gods wake
Across the path of divine Event
The huge foreboding mind of Night, alone,
In her unlit temple of muse,
Lay stretched immobile upon Silence's Marge
Almost one felt, opaque, impenetrable,
In the sombre symbol of her eyeless muse,
The abysm of the unbodied Infinite ;
A fathomless zero occupied the world,

 A power of fallen boundless self awake 

Between the first and the Last Nothingness, 

Recalling tenebrous Womb from which it came, 

 Turned from the insoluble mystry of birth  

And the tardy process of mortality 

And longed to reach its end in vacant Nought."  

এই হোল তাঁর মহাকাব্যের ধরতাই যেখানে ভাষা  শব্দালঙ্কারে, বাক্যালঙ্কারে, ভাবে ও রসে মহাকাব্যোচিত। 

শ্রীঅরবিন্দ যেহেতু যোগী এবং কবি সেহেতু তাঁর সাহিত্য সৃষ্টির প্রেরণা ছিল আত্মগত বা আত্মিক ঋদ্ধি। জীবনের অভিজ্ঞতা ও বিকাশ এবং ক্রমবিকাশও সাহিত্যসাধকের আপন এলাকাভুক্ত হতে পারে, এই ছিল কবির বিশ্বাস। এতে কবির (সাহিত্য স্রষ্টা, সাহিত্যসাধক মাত্রেই কবি) কাব্যর সৃষ্টির অভ্যস্ত সীমা বা বেড়াগুলি ভেঙে যাবে তাঁর অগোচরেই এবং কবি মানসলোকের, নিজের স্বরূপের অসীম সম্ভাবনার মুখোমুখি হবে। তাঁর কাব্যচেতনাও মর্তলোক ছাড়িয়ে উদার অসীম অমর্ত্য লোকে কল্পনা ও সৃষ্টি- আকুলতার পাখনা মেলে ধরবে নির্বাধ এবং তাঁরই কথায় "become part of the spiritual empire." 

ঋষিকবির সাবিত্রী সেই অসীম আধ্যাত্মিক  সাম্রাজ্যের ভাব-ধ্বনিময় মহাকাব্য। তাঁর সাহিত্য সাধনার এই যে অন্তর্গত প্রেরণা সেটিও ক্রমে ক্রমে বিবর্তিত হয়েছে। ঊর্দ্ধ্ব থেকে ঊর্দ্ধ্বে ক্রমান্বয়ে ক্রমোন্নতি ঘটেছে সেই আন্তর প্রেরণার। 

তাই তাঁর সাধনা (যোগীর সাধনা) যতই অগ্রসর হয়েছে ততই বারে বারে তিনি তাঁর সৃষ্টিকর্মের পরিবর্তন ঘটিয়েছেন, সংস্কার ও পরিমার্জন করেছেন। সাবিত্রী মহাকাব্যটির পরিমার্জন ও পরিবর্ধন তার জীবনভর সাধনার অঙ্গ হয়ে উঠেছিল। 


উল্লেখিত পুস্তকগুলিই শেষ নয়। তাঁর রচিত সনেটগুলিও সাহিত্য জগতের বিস্ময়কর সৃষ্টি। সঙ্কলিত অষ্টআশিটি সনেটের মধ্যে চুয়াত্তরটি ১৯৩০ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে পণ্ডীচেরিতে লেখা। 

উৎসুক পাঠকদের জন্য একটি সনেটের উদাহরণ --- 

Man the thinking Animal (Sonnet no. ।v) 


A trifling unit in a boundless plan 

Amidst the enormous insignificance 

Of the unpeopled cosmos' fire-whirl dance 

Earth, as by accident, engendered man, 


A creature of his own grey ignorance, 

A mind half shadow and half gleam, a breath 

That wrestles, captive in a world of death, 

To live some lame brief years, yet his advance, 

Attempt of a divinity within, 

A consciousness in the inconscient Night, 

To realise its own supernal Light, 

Confronts the ruthless forces of the Unseen. 

Aspiring to godhead from insensible Clay 

He travels slow-footed towards the eternal day. 

রসিক পাঠক এ রসের স্বাদ কি তা জানেন। 'অধিকন্তু ন দোষায়' --- 

তাইঃ 

এই চতুর্দশপদীর বাঙলায় অনুবাদ যদিও দুরূহ তবু আমার পাঠকদের অনুরোধে তার ভাবানুবাদ করবার চেষ্টা করেছি। 

মানুষ চৈতন্যময় প্রাণ ( Man the thinking animal) 


অহৈতুকী সৃষ্টি এই বিপুল বিশ্ব ভূবনে 

নিষ্প্রাণ ওই মহাকাশে নিত্য নৃত্যলীলা মহা  অগ্নিশিখার ; 

তারি মাঝে মাতা ধরিত্রীর বুকে, কী বিস্ময়, জন্মেছে মানব ! 

না-জানার ধূসর অজ্ঞতা তার, চিত্ত তার আলোকে আঁধারে লীন, 

নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে বাঁচার সঙ্কল্প অপার -- মাত্র কিছুকাল। 

তবু তার মুক্তির সংগ্রাম, স্বর্গের আলোক-পিয়াসী আত্মা তার। 

 অন্তরে পেয়েছে সে দ্যুলোকের চেতনার জ্যোতিঃ‌। 

তমসার ঘন অন্ধকার চতুর্দিকে। তাই দিব্য আলোর সন্ধানে 

নিরন্তর যুদ্ধ তার অদৃশ্য, অজ্ঞেয় মহাশক্তির সাথে। 

এ মর্ত্যের কাদা ও মাটির ঢেলা প্রাকৃত মানুষ। 

শুধু তার অন্তরের শাশ্বতী চৈতন্যকণা নিয়ে, 

পরমব্রহ্ম পরমেশ্বর হতে চেয়ে নিজে, এ মানব 

'চরৈবেতি' -- চিরচলমান ; চলেছে চলেছে উধাও, 

অন্তহীন দূরে, অসীমের আলোকময় জগতের খোঁজে। 

(ভাবানুবাদ ---  দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়) 


তুলনীয় ঃ 

"মহাবিশ্বে মহাকাশে মহাকাল মাঝে 

আমি মানব একাকী ভ্রমি বিস্ময়ে, ভ্রমি বিস্ময়ে।। 

তুমি আছ বিশ্বনাথ অসীম রহস্য মাঝে

নীরবে একাকী আপন মহিমা-নিলয়ে।। 

অনন্ত এ দেশ-কালে, আগন্য এ দীপ্ত লোকে 

তুমি আছ মোরে চাহি, আমি চাহি তোমার পানে। 

স্তব্ধ সর্ব কোলাহল, শান্তিমগ্ন চরাচর --- 

এক তুমি, তোমা মাঝে আমি একা নির্ভয়ে।।"  

____________________________রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 


এবার উপসংহারে আরো দুটি কথা ঃ 


প্রায় একই সময়কালে তিন মহা নক্ষত্রের জন্ম হয়েছিল এই পুন্যভূমি বাঙলায়, তথা ভারতবর্ষে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১), স্বামী বিবেকানন্দ (১৮৬৩-১৯০২), ঝষি অরবিন্দ (১৮৭২-১৯৫০)। তিন জনই নবকলেবরে সুপ্রাচীন ভারতভূমির তপোবনের তপোসিদ্ধ নরদেব --- ব্যাস, বশিষ্ঠ , বাল্মীকি। নামগুলি উচ্চারিত হতেই 'হবিষা কৃষ্ণবর্ত্মেব'-- বা ঘৃতাঞ্জলি-প্রজ্বলন্ত যজ্ঞাগ্নি-ধূমের পবিত্র সুগন্ধের মতো ঈশ্বর সাধনার পরিমণ্ডলে আমারা প্রবেশ করতে চলেছি। অস্বীকার করা যায় না ; ভারতবর্ষের সাধনপিঠ তো তখন বাঙলাই। আর তিন জনই ঈশ্বরে-নিবেদিত-প্রাণ মহাসাধক। তবে গন্তব্য এক ও অভিন্ন হলেও পথ তাঁদের ছিল ভিন্ন ভিন্ন। 

না, তাঁদের "ক্ষুরষ্যধারা দুরত্যয়া"-- যে পথ চলে গিয়েছে দুরধিগম্য প্রজ্ঞার আলোকবলয়ে, সে পথে যাত্রা করবার আর সময় নেই, সাধনা নেই এবং বর্তমানে অবকাশও নেই। বরং তাঁদের সাহিত্য সৃজনের মধুচক্র হতে কয়েক বিন্দু মধু পান করে তৃপ্ত হই, --- এই ভালো, সেই ভালো। তাঁদের সৃষ্টির সবটুকু জানা, দীর্ঘ পঞ্চাশটি বছর আমার স্বল্প মেধার প্রচেষ্টায় অধ্যয়ন করে যা মনে হোল, অসম্ভব। স্বামী বিবেকানন্দের রচনা সম্ভার দশটি খণ্ডে সংকলিত হয়েছে, বিশ্বকবির হিমাদ্রী সদৃশ সৃজনকীর্তি (এখনো পর্যন্ত) ঊনত্রিশ খণ্ডে গোলাজাত এবং শ্রীঅরবিন্দের সৃষ্টি সাগর তো কূলকিনারা হারা--- অতলান্তিক। তবে পাঠ যাঁদের সাধনা তাঁরা অবশ্যই আছেন সাধনপিঠে সমাসীন। 


                        রবীন্দ্রের অরবিন্দ 


                     এই লেখাটির মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ঋষি  অরবিন্দ নয়, কবি অরবিন্দ। কবি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে  কবি অরবিন্দের সম্পর্কটি কি রকম ? অরবিন্দ যখন  দেশহিতব্রতে আত্মসমর্পণ করেছেন তখনই রবীন্দ্রনাথ  তাঁকে 'কবি' অভিধায় সম্বোধন করলেন, অনুজপ্রতিম  অরবিন্দকে শ্রদ্ধাবনত চিত্তে 'নমস্কার' জানালেন ---- 

"অরবিন্দ, রবীন্দ্রের লহ নমস্কার।" 

 .... তিনি লিখছেন, 

                ".... ভারতের বীণাপাণি, 

হে কবি, তোমার মুখে রাখি দৃষ্টি তাঁর 

তারে তারে দিয়েছেন বিপুল ঝঙ্কার। 

নাহি তাহে দুঃখ তান, নাহি ক্ষুদ্র লাজ 

নাহি দৈন্য, নাহি ত্রাস। তাই শুনি আজ 

কোথা হোতে ঝঞ্ঝাসাথে সিন্ধুর গর্জন, 

অন্ধবেগে নির্ঝরের উন্মত্ত নর্তন 

পাষাণপিঞ্জর টুটি, বজ্রগর্জরব 

ভেরিমন্ত্রে মেঘপুঞ্জ জাগায় ভৈরব। 

এ উদাত্ত সঙ্গীতের তরঙ্গ মাঝার, 

অরবিন্দ, রবীন্দ্রের লহ নমস্কার। ... 

 কবিতাটি লেখা ৭ই ভাদ্র ১৩১৪ সাল, 

   (তারিখ বাঙলায়)। 


এবার তাঁর দ্বিতীয় লেখা অরবিন্দের উপর । 


........ "ভাঙা শরীর নিয়ে যথেষ্ট কষ্ট করেই নামতে হয়েছে (পণ্ডিচেরী বন্দরে)। তা হোক্, অরবিন্দ ঘোষের সঙ্গে দেখা হয়েছে। প্রথম দৃষ্টিতেই বুঝলুম ইনি আত্মাকে সত্য করে পেয়েছেন। সেই তাঁর দীর্ঘ তপস্যার চাওয়া ও পাওয়ার দ্বারা তাঁর সত্তা ওতপ্রোত। আমার মন বললে,  ইনি এঁর অন্তরের আলো দিয়েই বাহিরে আলো জ্বালাবেন। (ইনি) আপনার মধ্যে ঋষি পিতামহদের এই বাণী অনুভব করছেন, ---যুক্তাত্মানঃ সর্বমে বাবিশন্তি-- পরিপূর্ণের যোগে সকলের মধ্যে প্রবেশাধিকার আত্মার শ্রেষ্ঠ অধিকার।

একটি বিষয় স্মরণীয় যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মহাপ্রয়াণ ঘটেছে ১৯৪১ সালে, আর শ্রী অরবিন্দ দেহ রেখেছেন ১৯৫০ সালে। শ্রী অরবিন্দের রচনা সমুহ ক্রমান্বয়ে এবং সম্পূর্ণ প্রকাশিত হয় ১৯৫৭ সাল নাগাদ। কবি অরবিন্দের রচনার সঙ্গে কবি রবীন্দ্রনাথের সম্যক পরিচয় ঘটেনি। তবুও কবিগুরুর দিব্য দৃষ্টিতে বহুপূ্র্বেই ধরা পড়েছিল অরবিন্দের অন্তরে বিরাজমান বিপুল ঐশ্বর্যসমন্বিত কাব্যপ্রতিভা। 

কবি অরবিন্দ কবি রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য সৃষ্টি বিষয়ে বিশদ কিছু বলেছেন এমন কোন আলোচনা পাওয়া যায় না। তবে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীতের তিনি পয়েছেন অতিন্দ্রিয় জগতের, পরম  চৈতন্যের দ্যুতি। "The Golden Book ofTagore"-- য়ে তাঁর 'On Tagore' মন্তব্য থেকে জানতে পারি তিনি রবীন্দ্রনাথের delicate soul-experience, that transmuted the earth tones by the touch of its radiance স্বীকার করবার পরও বলেছেন, ...this art does not own "supreme light of the spirit". যদিও এই কথাগুলি নিয়ে দীর্ঘ বিতর্কের অবকাশ আছে। 
আলোচনায় কথাগুলি এল। বলতেও হোল কেননা বাঙলা তথা সমগ্র বিশ্বের এই দুই জ্যোতির্ময় কবিব্যক্তিত্বের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে বিদ্বজ্জন সমাজেও বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে বা সৃষ্টি করা হয়েছে এক সময়। 

আবার তাঁদের সাহিত্যদর্শন বিষয়েও আন্তর্জাতিক পন্ডিত মহলে আলোচনা সমালোচনাও হয়েছে অগাধ। বিশ্বসাহিত্যের মহাপণ্ডিত, কবি ও সমালোচক K. D. Setna, শ্রী অরবিন্দ যার নাম দিয়েছিলেন অমল কিরণ, তিনি ছিলেন শ্রী অরবিন্দে নিবেদিতপ্রাণ। তার মতে "সাবিত্রী কেবল উচ্চস্তরের একটি কাব্যসৃষ্টির প্রয়াস নয়, কাব্যের সৃজনধর্ম আশ্রয় করে আত্মিক উপলব্ধির উন্মোচন এবং একটিকে আর একটি থেকে আলাদা করা যবে না। এ হোল শ্রী অরবিন্দের অধ্যাত্মজীবনের মহাকাব্য,..poetically spiritual autobiography. 

তাইই যদি হয় তবে রবীন্দ্রনাথের কাব্যসৃষ্টির সঙ্গে এই সৃজনের দ্বন্দ্ব আছে কি ? আছে। বিস্ময় জন্মায় নাকি, কেন থাকবে ? রবীন্দ্রনাথও তো এমনই এক অধ্যাত্মবাদী (উপনিষদীয় অধ্যাত্মভাবে নিমগ্ন তাপস)। কিন্তু ভাববার কথা এটিই যে রবীন্দ্রনাথ মানবিক বা বলা যায় সর্বমানবিক চেতনার সীমার মধ্যেই ইহজাগতিক ও জগদতীত বোধটিকে মেলাতে চেয়েছেন। এবং এই কারণেই Kathleen Raine-র (ইংরেজ কবি ও সমালোচক --১৯০৮-২০০৩) মত সমালোচক রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকর্মকে মহৎ সৃষ্টির শিরোপায় ভূষিত করেছেন। তিনি তাঁর 'Indian Poets and English Poetry' বইতে লিখছেন, রবীন্দ্রনাথ কোন তত্ত্বকে ধ্রুব বলে গ্রহণ করে' কবিতা (তাঁর সঙ্গীতও বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম গীতিকবিতা -- দু.চ.ব) রচনা করেন নি। তাঁর চতুর্দিকে পরিব্যপ্ত, পরিবিস্তীর্ণ জগৎ, এই ধরিত্রীর জল-স্থল, ধূলা মাটি, তরুলতা -ফুলফল, আকাশ-বাতাস, নরনারী, জীব-অজীব এবং আপন চিত্তদেশের সুখদুঃখ,  মিলন-বিরহ নিয়েই তার সাহিত্য সৃজন।  "The true Poet does not await Utopia or a superpoetry But gathers eternal beauty form the dust and light his eyes see daily". 

এমনধারা সাহিত্য আলোচনা শেষ হয় না। আলোচক অমল কিরণের (কবি অরবিন্দে নিবেদিতপ্রাণ) বক্তব্য হোল অরবিন্দ তার কাব্য-দর্শনের মধ্য দিয়ে 'অসীম  অতিন্দ্রিয়লোকের' সিংহদ্বার অতিক্রম করে গিয়েছেন। পক্ষান্তরে রবীন্দ্রনাথ মর্তলোকের খণ্ডিত জীবনের আনন্দ-বেদনায় অনন্তের, অসীমের আলোকরেখা দেখে থাকবেন হয়তো কিন্তু জগদতীত চৈতন্যেলোকের ঠিকানা তিনি পান নি। কেননা 'বলাকা'-য় যে তিনি বলেছেনঃ 

" হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনখানে।" 

অমল কিরণ মহাপণ্ডিত, দেবী বীণাপাণির বরপুত্র তিনি ; তবু তাঁর প্রতি সশ্রদ্ধ প্রণাম নিবেদন করে বলি, 

ইংরেজি অনুবাদে তিনি রবীন্দ্রনাথ পড়েছেন বলেই বোধ হয় রবীন্দ্র সৃষ্টির মর্মরস তাঁরও আয়ত্বের বাইরে রয়ে গেল। নিখিল ভূবনের সীমান্ত কোথায়, কোথায় বা তার অন্তিম ঠিকানা ? তা হলে তিনিই কি লিখতেন, 

"Till all is done form which the stars were made, 

Till the heart discovers God 

And the soul knows itself. And even then 

There is no End." 

                                     -------Arobindo 

"আপনাকে এই জানা আমার ফুরাবেনা। 

সেই জানারই সঙ্গে সঙ্গে তোমায় চেনা।।" 

                                    ---------রবীন্দ্রনাথ

দুই মহাকবির আর্তি এক স্বরে মিলে গেল না কি ? 


এই দুই কবিকুলগুরুর কাব্যদর্শনের অন্তঃস্তলে যে  বাদী-প্রতিবাদী-সম্বাদী সুরগুলি আছে তাই নিয়ে পরবর্তী পর্যায়ের এবং 'সাহিত্যের বিবেকানন্দ' বিষয়ে আলোচনা করবার ইচ্ছা রেখে -- 

                           (ক্রমশঃ)                           

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

১৮/০৭/২০২২
শিলিগুড়ি।  

বুধবার, ২১ আগস্ট, ২০২৪

এক ওথেলোর স্বগতোক্তি


এক ওথেলোর স্বগতোক্তি 


স্তব্ধ হও, হত শব সইতে পারে না কোলাহল, 
আহত দুর্বল দেহ বইতে পারে না বিদ্রোহ-নিশান। 
থাকুক সম্মুখে পড়ে নিহত শিকার, নিঃসাড় নীরব, 
বিক্ষত লাঞ্ছনা নিয়ে নিষ্পলক শুষ্ক-অশ্রু চোখে। 
আমি আততায়ী, আমি থাকি বসে নির্বিরোধী একা, 
দেখি চেয়ে চেয়ে আমার সক্ষম হাত লালা-রক্তে মাখা, 
মা'য়ের জঠরে গড়া স্রষ্টার ব্যর্থতম সৃষ্টির ফসল। 
কোথা রাখি ? বুক যে হয়েছে শূন্য কামনার অকাল মরণে, 
কোথা ধুই ? গঙ্গার পদ্মার যমুনার সাগর সঙ্গমের 
তরঙ্গে তরঙ্গে আছে মিশে শতাব্দীর শোনিতের রঙ ! 
কোথা যাই ? আমার পায়ের শব্দে শ্মশান শ্বাপদ 
হাসে হাসি বিদ্রুপের, জ্বলে ওঠে চিতার আগুন, 
ফাটে মাটি কবরখানার, শোকের অকাল রাত্রি নামে লোকালয়ে। 
কোন্ দিকে চাই? চোখের নৃশংস দৃষ্টি দিগন্ত পোড়ায়। 
আমি খুনি, ভালবাসি নিথর নিষ্প্রাণ মূর্তি বীভৎস সুন্দর ; 
স্বর্গের সেবার ভার ঘৃণা করি, আমি ক্রীতদাস  
নরকরাজার। 


দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 
২১-০৮-২০২৪
ব্যাঙ্গালোরু।
______________________________________________






শুক্রবার, ১৬ আগস্ট, ২০২৪

O Liberty, let the bird fly

O Liberty, let the bird fly 

I fly above the sky, over the mounds and hills, 
The oceans, rivers, cities, meadows and fields. 
None but the dark or sombre clouds or mist, 
Tempests, showers or hails hinder my sail. 
But I fear not, neither furl my wings ever ; 
Nor l throttle my voice of beauty and joyous life. 
But I fear you, the man bereft of mercy, 
With fiery fierce gun in hand aiming at me 
Lurking nowhere, to strip of my liberty, 
To call upon Hell to my being, my existence ! 

O humanity, what benignity you've bestowed, 
Brought upon the frail; but what did Prometheus 
To save Life and Civilization that you boast of, 
And by that eternal damnation suffers nature 
Is fire, in thousand forms -- hatred, animosity, 
Malice, hostality, detestation -- such and so on 
Are flameless but more Infernal than the fire 
That burns the corpse in the crematorium pyre. 

Dulal Chandra Bandyopadhyay
16-08-2024
Bangalore.
_______________________________________________





মঙ্গলবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৪

কথা ছিল

কথা ছিল

কথা ছিল, রাত্রি শেষে আসবে ঊষার আলো, 
মুছে যাবে কোণায় কোণায় লুকিয়ে থাকা কালো।‌ 
বিহঙ্গ গান, পুষ্প সুবাস, শীতল সমীরণে, 
জুড়াবে প্রাণ, গলবে হৃদয় বৈতালিকের গানে। 
কথা ছিল, আমার দুখের অশ্রুজল ধারা 
তোমার বুকের স্পর্শসুখে হবে বাঁধনহারা। 
তোমার সুখের দীপাবলি আমার প্রেমের শিখায়, 
জ্বালায়ে নিত্য পোহাবো তাপ উষ্ণ প্রণয়-ছোঁয়ায়। 
কথা ছিলেন, তোমার আমার মধুর ভালোবাসা, 
বসুন্ধরার আঙিনাতে গড়বে মিলন বাসা। 

কোথায়  গেল সে-শপথের উদার অঙ্গীকার, 
কোথায় গেল জীবন লীলায় মিলন পুষ্পহার। 
অকাল মেঘে ছেয়ে গেল ভোরের নীলাকাশ, 
ক্রূর কুটিল বিদ্যুৎ বান, মারণ বজ্রত্রাস। 

মরে গেল ঊষা, ঢেকে গেল দিন রাত্রি-অন্ধকারে, 
আশা-ভাষা-হারা জীবনকুসুম অকালে পড়ল ঝরে। 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 
১৩/০৮/২০২৪
বাঙ্গালোর।
















বৃহস্পতিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৪

প্রলয় শেষের সঙ্গীত

প্রলয় শেষের সঙ্গীত 

('তরুণ-অরুণ-কিরণ-কণিকা' বাঙলা দেশের বৈষম্য বিরোধী, মানবতাবাদী ছাত্রসমাজের উদ্দেশে  কবিতাটি উৎসর্গীকৃত।)

মহাপ্রলয়ের ভীষণ রাত্রি বুঝি আর পোহাবে না, 
প্রাণের মূল্যে মিটাতেই হবে অমানবতার দেনা। 
বিলাসকুঞ্জ জ্বলন্ত শ্মাশান, দেউল শোণিতসিক্ত, 
রক্ত পিয়াসী কাপালিক হাঁকে মায়া-দয়া-প্রেমরিক্ত। 
ন্যায় অন্যায়, ধর্মাধর্ম, পাপ ও পুন্য একাকার, 
অনলবর্ষী বাদলের মেঘে নরকের রণহুঙ্কার। 
নর নারী শিশু ক্রন্দনরোল, সংবিদহারা চেতনা, 
শ্যাম-শোভাময়ী বঙ্গজননী অবলুন্ঠিতা 'করুণা'। 

ফুরাবে এ-নিশা, ঐ পূর্বাশা, ক্ষীণ ঊষালোক জাগে, 
রবিকর সুরে বৈতান-গীতি বাজে আশাবরী রাগে। 
অনাদী কালের জীবন চলেছে মৃত্যুর পথ ধরে, 
মরে নাই প্রেম চিরজীবী সে পান্থশালার দ্বারে। 
তরুণ-অরুণ-কিরণ-কণিকা ছড়ায় নবীন আশা, 
ঘৃণা নয়, নয় দ্বেষ-বিদ্বেষ, জয়ী হবে ভালোবাসা। 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 
০৬-০৮- ২০২৪ 
ব্যাঙ্গালোর। 












মঙ্গলবার, ৬ আগস্ট, ২০২৪

২২শে শ্রাবণ

"জন্মদিন মৃত্যুদিন 
মাঝে তারি ভরি প্রাণভূমি কে গো তুমি। 
কোথা আছে তোমার ঠিকানা। 
কার কাছে আছো তুমি অন্তরঙ্গ সত্য  করে জানা।" 
                             অপূর্ণ (পরিশেষ), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর  

মহাপ্রাণের মহাপ্রয়াণ 

শোক দুঃখ আঘাত লাঞ্ছনা, 
অপঘাত  নিন্দা অপবাদ --- 
এসেছে জীবনে বারংবার। 
সাধুতার ছদ্মবেশে ক্রুরতার হাসি, 
অখ্যাতির নির্মমতা নেপথ্যে খ্যাতির, 
দ্বেষ হিংসা নীচতার ধৃষ্ঠ আস্ফালন -- 
সূর্যালোকে সশঙ্কিত শ্বাপদের মতন 
জ্যোতির্ময় তোমার দিব্য অভ্যুদয়ে 
নতমুখে অন্ধকারে নিয়েছে আশ্রয়। 
হে কবি, সম্বোধনে এ-টুক বলার। 
কুসুম বিছানো পথে যাত্রা ছিল না তোমার। 

হে বিশ্বপথিক,‌ তোমার চরণচিহ্ন সমুৎকীর্ণ 
বসুধার প্রান্তে প্রান্তে  ; অন্তহীন বৈচিত্রের 
অপূর্ব সুষমা উদ্ভাসিত দ্যুলোকে ভূলোকে, 
লোকে লোকান্তরে, তার বাণী তোমার বীণার তারে 
সুরে তানে ছন্দোময়। তোমার তুলির রেখায় লেখায় 
মানবের সাধনার সামমন্ত্র-লিপি যুগ যুগান্তের। 
কর্মে ধর্মে গীতিময় সে মহাজীবন একদিন গতিহারা, 
নিঃশব্দে নীরবে --- বাইশে শ্রাবণে। 

কালের শাসনে জীবনের দুই প্রান্ত বাঁধা --- 
জন্মদিন মৃত্যুদিন -- মাঝে তারি প্রাণের ভূমিতে 
এমনি শ্রাবণ সন্ধ্যা ঝরঝর-বাদল-বর্ষণ-ছন্দে 
এসেছে, গিয়েছে চলে বার বার বছরে বছরে। 
ফেরে নাই তারা অনাদরে। স্তুতি-স্তোত্রে, নব মন্ত্রে, 
নৃত্য-গীতে সাজায়েছো শ্রাবণের যে বরণমালা, 
আজো তার অমর্ত্য সৌরভ আসে ভেসে 
অশ্রুধারা-সিক্ত যূথীকার বিরহ ব্যথার দীর্ঘশ্বাসে। 
হে স্রষ্ঠা, রূপে-অরূপে-মেশা ভূবন-মেলার 
অপরূপ বাণীমূর্তি গড়েছ যা নিখিল অঙ্গনে 
অন্তরে বাহিরে দেখি তাই বাইশে শ্রাবণে। 

তোমার সে মেঘছায়া-সমাচ্ছন্ন সুস্নিগ্ধ শ্যামল 
বঙ্গদেশ আজ ভালো নেই কবি, ভালো নেই।‌ 
প্রকৃতির অভিশাপ নেমে আসে অকস্মাৎ, 
বিদ্বেষের অগ্নিশিখা পোড়ায় সমাজ, 
অসহায় মানবতা নিরাশায় কাঁদে অন্ধকারে, 
রূঢ় রাষ্ট্রে মূঢ়তার আত্মঘাতী মারণ তাণ্ডব। 
ভিটা ছেড়ে পরিযায়ী পরিত্রান খোঁজে ভিন দেশে। 
তবুও তোমার দানের মহৈশ্বর্য বুকে ধরে রাখি -- 
অকাল মৃত্যুর সে সঞ্জীবনী সুধা, অন্তরে তা জানি। 
তোমার প্রেমের বাণী মানবের শেষের পারানি। 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 
২২শে শ্রাবণ, ১৪৩১ 
ব্যাঙ্গালোর। 
___________________________________________






















Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...