"জন্মদিন মৃত্যুদিন
মাঝে তারি ভরি প্রাণভূমি কে গো তুমি।
কোথা আছে তোমার ঠিকানা।
কার কাছে আছো তুমি অন্তরঙ্গ সত্য করে জানা।"
অপূর্ণ (পরিশেষ), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মহাপ্রাণের মহাপ্রয়াণ
শোক দুঃখ আঘাত লাঞ্ছনা,
অপঘাত নিন্দা অপবাদ ---
এসেছে জীবনে বারংবার।
সাধুতার ছদ্মবেশে ক্রুরতার হাসি,
অখ্যাতির নির্মমতা নেপথ্যে খ্যাতির,
দ্বেষ হিংসা নীচতার ধৃষ্ঠ আস্ফালন --
সূর্যালোকে সশঙ্কিত শ্বাপদের মতন
জ্যোতির্ময় তোমার দিব্য অভ্যুদয়ে
নতমুখে অন্ধকারে নিয়েছে আশ্রয়।
হে কবি, সম্বোধনে এ-টুক বলার।
কুসুম বিছানো পথে যাত্রা ছিল না তোমার।
হে বিশ্বপথিক, তোমার চরণচিহ্ন সমুৎকীর্ণ
বসুধার প্রান্তে প্রান্তে ; অন্তহীন বৈচিত্রের
অপূর্ব সুষমা উদ্ভাসিত দ্যুলোকে ভূলোকে,
লোকে লোকান্তরে, তার বাণী তোমার বীণার তারে
সুরে তানে ছন্দোময়। তোমার তুলির রেখায় লেখায়
মানবের সাধনার সামমন্ত্র-লিপি যুগ যুগান্তের।
কর্মে ধর্মে গীতিময় সে মহাজীবন একদিন গতিহারা,
নিঃশব্দে নীরবে --- বাইশে শ্রাবণে।
কালের শাসনে জীবনের দুই প্রান্ত বাঁধা ---
জন্মদিন মৃত্যুদিন -- মাঝে তারি প্রাণের ভূমিতে
এমনি শ্রাবণ সন্ধ্যা ঝরঝর-বাদল-বর্ষণ-ছন্দে
এসেছে, গিয়েছে চলে বার বার বছরে বছরে।
ফেরে নাই তারা অনাদরে। স্তুতি-স্তোত্রে, নব মন্ত্রে,
নৃত্য-গীতে সাজায়েছো শ্রাবণের যে বরণমালা,
আজো তার অমর্ত্য সৌরভ আসে ভেসে
অশ্রুধারা-সিক্ত যূথীকার বিরহ ব্যথার দীর্ঘশ্বাসে।
হে স্রষ্ঠা, রূপে-অরূপে-মেশা ভূবন-মেলার
অপরূপ বাণীমূর্তি গড়েছ যা নিখিল অঙ্গনে
অন্তরে বাহিরে দেখি তাই বাইশে শ্রাবণে।
তোমার সে মেঘছায়া-সমাচ্ছন্ন সুস্নিগ্ধ শ্যামল
বঙ্গদেশ আজ ভালো নেই কবি, ভালো নেই।
প্রকৃতির অভিশাপ নেমে আসে অকস্মাৎ,
বিদ্বেষের অগ্নিশিখা পোড়ায় সমাজ,
অসহায় মানবতা নিরাশায় কাঁদে অন্ধকারে,
রূঢ় রাষ্ট্রে মূঢ়তার আত্মঘাতী মারণ তাণ্ডব।
ভিটা ছেড়ে পরিযায়ী পরিত্রান খোঁজে ভিন দেশে।
তবুও তোমার দানের মহৈশ্বর্য বুকে ধরে রাখি --
অকাল মৃত্যুর সে সঞ্জীবনী সুধা, অন্তরে তা জানি।
তোমার প্রেমের বাণী মানবের শেষের পারানি।
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২২শে শ্রাবণ, ১৪৩১
ব্যাঙ্গালোর।
___________________________________________
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন