দুঃখ -- পর্ব-২
'দুঃখ' শব্দটির মধ্যে আমরা সমস্ত রকমের কষ্টের অনুভূতির কথা বলতে চাই, যেমন শোক, বিষাদ, ব্যথা, মনের বা শরীরের যন্ত্রনা, অনুতাপ-সন্তাপ-- সমস্ত কিছু যা আমরা জীবন যাত্রায়, জীবনাচরণে পরিত্যাগ করতে চাই, পরিহার করতে চাই, উপেক্ষা করতে চাই, প্রশমিত এবং উপশমিত করতে চাই। একটি সারমেয়- মাতার দু'দুটি সুন্দর শিশুর অপঘাত মৃত্যুর দুঃখের আঘাতটা তার কাছে কতদিন ছিল, তার মন, স্মৃতি, বোধ কেমন -- এসবের কতটুকুই বা আমাদের জানা ? তবে এই প্রাণীটি মানুষের ইতিহাসের আদিকালের সহচর ; তাই এদের প্রতি আমাদের সহবস্থান ও ভালোবাসার বন্ধন অচ্ছেদ্য এবং সেই ভালোবাসার সম্মন্ধেই ওই মা'কুকুরের দুঃখ নিজের দুঃখ হয়েই আমাদের অন্তরে গভীরভাবে বেজেছে। মনে হয়েছে যে অপঘাত ও স্বজাতি কলহে ওই মানবেতর প্রাণে যেমন সর্বনাশ নেমে এলো তেমনটি কি মানুষের সমাজে নেই ? আছে আছে এবং সহস্রগুণে তীব্রতর, পাশবিকতায় লাঞ্ছিত, মর্মান্তিকভাবেই আছে। সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারায়, ক্রমোন্নয়নের পথে জল-স্থল-আকাশজুড়ে অনন্ত অসংখ্য দুর্ঘটনায় অকালমরণ, সভ্যতার আদিকাল থেকে সংখ্যাতীত কুরুক্ষেত্রের বীভৎস নরসংহারে নরনারী শিশুদের মৃত্যু মানুষের জীবনধর্ম আর পশুদের জীবনধর্মকে এক বন্ধনীতে আবদ্ধ করে দিয়েছে। এ কী সত্য নয় ? মানব সভ্যতার ঊষাকাল থেকে বিশ্বময় ছড়িয়ে-থাকা এইরূপ পাশবিক নরমেধ যজ্ঞগুলির হিসাব ইতিবৃত্তে যতটুকু বর্ণিত আছে তা মহাসমুদ্রে ডুবন্ত হিমশৈলের চূড়া মাত্র। আমাদের দেশে রামায়ণ, মহাভারত মহাকাব্য দুটিতে রাজবংশ ধংশের কাহিনীর মধ্যে রক্ষকুলের এবং কুরু-পাণ্ডব কুলের স্বামী সন্তানহারা রমনীদের হাহাকারের সঙ্গে যখন একই ছন্দে মিশে যায় আমাদের পাড়ার অবোধ সারমেয়-মায়ের আর্তস্বর তখন মনে হয়না সভ্যতা একপা'ও অগ্রসর হয়েছে। আমরা নিজেদের সৃষ্টিগুলি নিয়ে না নিজে বাঁচতে শিখেছি, না প্রকৃতির দান নিরীহ প্রাণজগতকে বাঁচাতে পেরেছি।
কিছুটা দীর্ঘ হলেও এখানে আমরা মহাভারত মহাকাব্যের 'স্ত্রী' পর্ব, রাজশেখর বসু মহাশয়ের 'মহাভারত সারানুবাদ' থেকে কিয়দংশ উদ্ধার করছি,
।।স্ত্রীবিলাপপর্বাধ্যায়।।
'গান্ধারীর কুরুক্ষেত্র দর্শন'
"ব্যাসের আজ্ঞানুসারে ধৃতরাষ্ট্র ও যুধিষ্ঠিরাদি কৃষ্ণকে অগ্রবর্তী ক'রে কৌরব নারীদের নিয়ে কুরুক্ষেত্রে উপস্থিত হলেন। রুদ্রের ক্রীড়াস্থানের ন্যায় সেই যুদ্ধভূমি দেখে নারীরা উচ্চকণ্ঠে কাঁদতে কাঁদতে যান থেকে নামলেন।
গান্ধারী দূর থেকেই দিব্যচক্ষু দ্বারা সেই ভীষণ রণভূমি দর্শন করলেন। তিনি কৃষ্ণকে বললেন, দেখ, একাদশ অক্ষৌহিণীর অধিপতি দুর্যোধন গদা আলিঙ্গন করে রক্তাক্ত দেহে শুয়ে আছেন। আমার পুত্রের মৃত্যু অপেক্ষাও কষ্টকর এই, যে-নারীরা নিহত পতিগণের পরিচর্যা করছেন। লক্ষ্মণজননী দুর্যোধনপত্নী মস্তকে করাঘাত করে পতির বক্ষে পতিত হয়েছেন। আমার পতিপুত্রহীনা পুত্রবধূরা আলুলায়িত কেশে রণভূমিতে ধাবিত হচ্ছেন। মস্তকহীন দেহ এবং দেহহীন মস্তক দেখে অনেকেই মূর্ছিত হয়ে পড়ে গেছেন। ওই দেখ, আমার পুত্র বিকর্ণের তরুণী পত্নী মাংসলোভী গৃর্ধ্রদের তাড়াবার চেষ্টা করছেন, কিন্তু পারছেন না। কৃষ্ণ, তুমি নারীদের দারুণ ক্রন্দনের নিনাদ শোন। শ্বাপদগণ আমার পুত্র দুর্মুখের মুখমণ্ডলের অর্ধভাগ ভক্ষণ করেছে। কেশব, লোকে যাকে অর্জুন অপেক্ষা এবং তোমার চাইতেও দেড়গুণ অধিক শৌর্যশালী বলত সেই অভিমন্যু নিহত হয়েছেন, বিরাটদুহিতা বালিকা উত্তরা শোকে আকুল হয়ে পতির গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। উত্তরা বিলাপ করে বলছেন, বীর, তুমি আমাদের মিলনের ছ'মাসের মধ্যেই নিহত হলে ! ওই দেখ, মৎস্যরাজের কুলস্ত্রীগণ অভাগিনী উত্তরাকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। হায় ! কর্ণের পত্নী জ্ঞানশূন্য হয়ে ভূতলে প'ড়ে গিয়েছেন, শ্বাপদগণ কর্ণের দেহের অল্পই অবশিষ্ট রেখেছে। গৃর্ধ্র ও শৃগালগণ সিন্ধুসৌবীররাজ জয়দ্রথের দেহ ভক্ষণ করছে, আমার কন্যা দু্ঃশলা আত্মহত্যার চেষ্টা করছে ও শোকাশ্রুসিক্ত কণ্ঠে পাণ্ডবদের গালি দিয়ে চলছে। হা, হা, ওই দেখ, দুঃশলা তার পতির মস্তক না পেয়ে চারিদিকে ছুটে বেড়াচ্ছে। ওখানে ঊর্ধরেতা সত্যপ্রতিজ্ঞ ভীষ্ম শরশয্যায় শুয়ে আছেন। দ্রোণপত্নী কৃপী শোকে বিহ্বল হয়ে পতির সেবা করছেন, জটাধারী ব্রাহ্মণগণ দ্রোণের চিতা নির্মাণ করছেন। কৃষ্ণ, ওই দেখ, শকুনিকে শকুনদল বেষ্টন করে আছে, এই দুর্বুদ্ধিও অস্ত্রাঘাতে নিধনের ফলে স্বর্গে যাবেন !"
তারপর দেবী গান্ধারীর সেই জীবনের অস্তিত্ব- আলোড়নকারী বাক্য,
"মধুসূদন, তুমি কেন এই যুদ্ধ হতে দিলে ?"
গান্ধারী আরো বলেছিলেন যে, হে কৃষ্ণ, বিপুল শক্তির, বিরাট সৈন্যবাহিনীর, প্রবল সামর্থ্যের অধিকারী হয়েও, আমার ও কুন্তীর সন্তানদের, সমস্ত কুরুকুলের বীরদের তুমি যুদ্ধ থেকে বিরত করতে পার নি, তুমি সমস্ত জেনেশুনে এই সমূহ-বিনাশ উপেক্ষা করেছ, এর ফল তোমাকেও ভোগ করতে হবে। কুরু পাণ্ডবদের বংশ এবং জ্ঞাতিদের আত্মহননের ব্যবস্থা করে তুমি যে পাপ করলে, আজ থেকে ঠিক ছত্রিশ বছর পর তুমিও জ্ঞাতিহীন, বন্ধু-আমাত্যহীন, সন্তানহীন ও বনচারী হয়ে অত্যন্ত নিকৃষ্ট, এবং অবমাননার মৃত্যু বরণ করবে। আজ, নিজের চোখেই তো দেখছি, মহান ভরতবংশের অবলা নারীকুল শোকাহত হয়ে ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে, যুদুবংশ ধংশের পর তোমাদের রমণীকুলও কি সেই ভাবে অনাথিনী হবে না, শোকাতুর হয়ে, ভূমিশয্যায় বিলাপ করবে না ?
বাসুদেব কৃষ্ণ তখন ঈষৎ হাস্য করে বলেছিলেন, আপনি যা অভিশাপ দিলেন দেবী, তা অবশ্যম্ভাবী। বৃষ্ণিবংশের সংহারের হেতুও আমি হব। যে যাদবগণ মানুষ ও দেবদানবের অবধ্য তাঁরাও পরস্পরের হাতেই নিহত হবে। এবং হয়েওছিল তাই।
কুরু বংশের শিশু কিশোর তরুণ প্রৌঢ়দের অকাল মৃত্যুর পর আমরা দ্বারকায় গিয়েছি এবার এবং মহাভারতের 'স্ত্রীপর্ব', 'শান্তি পর্ব', 'অনুশাসন পর্ব', 'আশ্বমমেধিক পর্বে'র পর 'মৌষল পর্বে' উপস্থিত হয়েছি। সেখানে এসে দেখি দেবী গান্ধারীর অভিশাপ বর্ণে বর্ণে সত্য হয়ে উঠেছে। ভারতকথার কথক বৈশম্পায়ন জনমেজয়কে বললেন, যুধিষ্ঠিরের রাজ্য লাভের পর 'ষটত্রিংশ', ঠিক ছত্রিশতম বৎসরেই বৃষ্ণিবংশের প্রবল পরাক্রমশালী পুরুষেরা নিজেরাই পাপপরায়ণ হয়ে আত্মহননে লিপ্ত হয়েছিলেন। 'বৃষ্ণি'রা যাদবগোষ্ঠীর একটি শাখা। অপরাপর শাখাগুলি ছিল 'অন্ধক', 'ভোজ', 'কুক্কুর' ইত্যাদি। 'মৌষল' পর্বে দ্বারকায় ভয়ানক সব অতিপ্রাকৃত, কুলক্ষণযুক্ত, অমঙ্গলজনক ঘটনা, দুর্ঘটনার বিবরণ আছে।
"দ্বারকায় আরও নানাপ্রকার উৎপাত দেখা গেল। কৃষ্ণবর্ণা নারী নিদ্রিতা পুরাঙ্গনাদের মঙ্গলসূত্র এবং ভয়ঙ্কর রাক্ষসগণ যাদবদের অলঙ্কার, ছত্র, ধ্বজ ও কবচ হরণ করতে লাগল। কৃষ্ণের চক্র সকলের সমক্ষে আকাশে অন্তর্হিত হ'ল, দারুকের সমক্ষে অশ্বগণ কৃষ্ণের দিব্য রথ নিয়ে সাগরের উপর দিয়ে চ'লে গেল। অপ্সরারা বলরামের তালধ্বজ এবং কৃষ্ণের গড়ুরধ্বজ হরণ করে উচ্চরবে বললে, যাদবগণ, প্রভাসতীর্থে চলে যাও।"
এরপর অসহায়, নিরুপায়, নিরস্ত্র কৃষ্ণের সম্মুখেই কি ভাবে যদুকুলের বিনাশ হোল তার বীভৎস বিবরণ মৌষলপর্বের শ্লোকে শ্লোকে বিন্যস্ত আছে। শেষে কৃষ্ণকে যেতে হোল তাঁর অতিবৃদ্ধ পিতা বসুদেবের কাছেই। বলতে হোল, "হস্তিনাপুর থেকে অর্জুন না আসা পর্যন্ত আপনি নারীদের রক্ষা করুন।" এই বলে তিনি মৃত্যুপুরী পরিত্যাগী, শোকদগ্ধ, বনবাসী অগ্রজ বলরামের কাছে গেলেন। "যাদব শূন্য দ্বারকাপুরীতে থাকতে পারব না আমি, বনবাসী হয়ে বলরামের সঙ্গে তপস্যা করব"। কিন্তু সেখানে তিনি স্বচক্ষে দেখলেন কী অবিশ্বাস্য আধিদৈবিকভাবে বলরামের প্রাণ নির্গত হোল। শোক-বিষাদ-বিকল কৃষ্ণ তখন সেই বনভূমিতেই 'মহাযোগে' শয়ন করলেন। সেই সময় সেখানে 'জরা' নামের এক ব্যাধের আগমন ঘটে। সেই ব্যাধ দূর থেকে মৃগভ্রমে তীক্ষ্ণ তীর নিক্ষেপ করে কৃষ্ণের পদতল বিদ্ধ করলে।
মহাভারতের মহানায়ক শ্রীকৃষ্ণেরও নিধন হোল। সর্বস্বান্ত কৃষ্ণপিতা 'বসুদেবও' পরলোকে যাত্রা করলেন। ইতিমধ্যে অর্জুন দ্বারকায় এসে গিয়েছেন। তিনিই সকল মৃতজনের সৎকার ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করলেন। বাসুদেবের সঙ্গে তার পত্নীগণও -- দেবকী, ভদ্রা, মদিরা, রোহিনী সহমরণে গেলেন। এবার অর্জুন বলরাম ও কৃষ্ণের দেহের অন্বেষণে বেরিয়ে, শবদেহদুটি আনয়ন করে সেগুলিরও অন্তিমকার্যের ব্যবস্থা করলেন। এইবার আমরা আবারও রাজশেখর বসু মহাশয়ের 'মহাভারতের সারানুবাদ' ও কালীপ্রসন্ন সিংহের 'মহাভারত' থেকে মর্মদাহী কিছু অংশ উদ্ধার করছি,
সপ্তম দিনে তিনি (অর্জুন) কৃষ্ণের ষোল হাজার পত্নী,পৌত্র 'বজ্র' এবং অসংখ্য নারী, বালক ও বৃদ্ধদের নিয়ে (হস্তিনাপুরের উদ্দেশ্য) যাত্রা করলেন। রথী, গজারোহী, অশ্বারোহী অনুচরগণ এবং ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়াদি প্রজা তাঁর সঙ্গে গেলেন। অর্জুন দ্বারকার যে যে স্থান পরিত্যাগ করছিলেন সেই সেই স্থান সমূদ্র এসে গ্রাস করতে লাগলো।
কিছুদিন পরে তাঁরা গবাদিপশু ও ধান্যপ্রাচুর্য পরিপূর্ণ 'পঞ্চনদ প্রদেশে' প্রবেশ করলেন। সেখানে বাস করত অতি হিংস্র 'আভির' দস্যুদের এক বিপুল জনগোষ্ঠী। তারা যাদব রমণীদের দে'খে, লালসায় উন্মত্ত হয়ে গেল। লাঠি, সড়কি নিয়ে আক্রমণ করল। কুরুক্ষেত্রজয়ী ধনঞ্জয়ের মুখে আত্মদর্পের হাস্যরেখা। তিনি বললেন, যদি যমালয়ে যেতে না চাও তবে দূর হয়ে যাও এখান থেকে, না হলে আমার ভীষণ বাণে সকলের মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। দস্যুদের উপর সে উদ্ধত হুংকারের কোন প্রভাবই পড়ল না দেখে অর্জুন তাঁর গান্ডীব হস্তে ধারণ করলেন, অতি আয়াসে (কষ্টকরভাবে) জ্যা রোপণ করলেন ; কিন্তু হায় ! কোন দিব্যাস্ত্র তাঁর স্মরণে এল না। যাদবদের যে সকল সহগামী যোদ্ধারা তাঁর সঙ্গে ছিলেন তাঁদের সমবেত পরাক্রমকে বিধ্বস্ত করে দিয়ে দস্যুরা নারীদের হরণ করে নিয়ে গেল। 'কোন কোন নারী আবার স্বেচ্ছায় তাদের সঙ্গেই গেল !' (বিষয়টি লক্ষণীয়)।
________________________________________
ব্যাখ্যা
এতক্ষণ যে কথকথা আমরা গান করে গেলাম, (বাঙলার কথকঠাকুর সম্প্রদায় এই ভাবেই গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে পুরাণ পাঁচালী গেয়ে শোনাতেন), যে অনাথিনী রমনীদের হাহাকারের চিত্র অঙ্কন করবার চেষ্টা করলাম তার একটিই উদ্দেশ্য যা হোল, মারণান্তিক 'যুদ্ধজয়' মরীচিকার বিভীষিকা মাত্র। জয় কোন পক্ষেরই হয় না। পরাজয় হয় সভ্যতার, সংস্কৃতির, মানবতার আর সর্বোপরি নারীত্বের। অবলা নারীদের লাঞ্ছনার অন্ত থাকে না। যুদ্ধের পূর্বমুহূর্তে রাজকুল-শৌর্যের, অহংকারসর্বস্ব পরাক্রমের রণনিনাদ উদ্ঘোষিত হয়, যুদ্ধশেষে তাই পরিবর্তিত হয়ে যায় নারীশিশুদের বিষাদময় ক্রন্দনধ্বনিতে। স্বাভাবিকভাবেই আসে বর্ণশঙ্করতা। বর্ণান্ধ আর্যরা যে 'পবিত্রশোণিতে'র আত্মম্ভরিতার গর্বে অশ্বমেধ যজ্ঞ করেন, তা গিয়ে শেষ হয় নরমেধের 'জাতিবর্ণহীন' চিতাগ্নিতে।
এখানে স্মরণীয়, শ্রীমদ্ভগবদগীতার প্রথম অধ্যায়ে অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে যেমন বলেছিলেন,
"কুলক্ষয়ে প্রণশ্যন্তি কুলধর্মাঃ সনতনাঃ।
ধর্মে নষ্টে কুলং কৃতস্নম্ অধর্মঃ অভিভবত্যুত।।
অধর্মাভিভবাৎ কৃষ্ণ প্রদুষ্যন্তি কুলস্ত্রিয়ঃ।
স্ত্রীষু দুষ্টাসু বার্ষ্ণেয় জায়তে বর্ণশঙ্করঃ।।" ১/৪০-৪১।
দেখ কৃষ্ণ, কুলের বিনাশ হলে সনাতন কুলধর্ম নাশ হয়। ধর্ম নষ্ট হলে সমগ্র কুলকে তখন অধর্ম গ্রাস করে। পাপের প্রভাবে কুলস্ত্রীগণ (প্রকৃতির নিয়মেই) দূষিত হন এবং হে বৃষ্ণিবংশজাত কৃষ্ণ, তুমি জান, স্ত্রীগণ দূষিত হলে "বর্ণশঙ্করঃ জায়তে।" শঙ্কর জাতির জন্ম হয়।
(ভারতের বর্তমান সনাতনবাদীরা ভেবে দেখতে পারেন।)
_____________________________________
হৃতবীর্য, শত্রুবিনাশী অর্জুনের এমন পরিণতি কী কল্পনীয় ছিল ? শূন্যতূণীর, শ্লথবাহু অর্জুনের আয়ত্ব হতেই সেই ম্লেচ্ছ দস্যুরা 'বৃষ্টিক', 'অন্ধক' বংশীয় সুন্দরীদের হরণ করে নিয়ে গেল। কতিপয় বালক, প্রৌঢ় ও প্রৌঢ়া রমনীদের নিয়ে অর্জুন ইন্দ্রপ্রস্থে যেতে পেরেছিলেন। অক্রূরের পত্নীরা প্রব্রজ্যা নিয়েছিলেন, কৃষ্ণের পত্নীগণ রুক্মিণী, গান্ধারী (কৃষ্ণের এক স্ত্রী) শৈব্যা, হৈমবতী ও জাম্ববতী অগ্নিকুন্ডে প্রবেশ করলেন, সত্যভামা সহ অপরাপর কৃষ্ণসহচরীবৃন্দ হিমালয় অতিক্রম করে 'কলাপ' গ্রামে গিয়ে কৃষ্ণের ধ্যানে কাল যাপন করতে লাগলেন।
রামায়ণের কথা
'রামায়ণ' মহাকাব্যের চিরদুখিনী সীতাদেবীর অগ্নিপরীক্ষা ও অন্তিমপর্বে ভূতলপ্রবেশের (আত্মহননের) করুণার্দ্র কাহিনীর বর্ণনা রয়েছে মৎপ্রণীত 'বিন্দুতে সিন্ধুদর্শন' গ্রন্থে। ওদিকে তখন রক্ষোরাজ রাবণের পুত্র-পৌত্র-আমাত্য সহ সমস্ত রাক্ষসবীরদের অকাল মৃত্যুর পর তাঁদের অন্তঃপুরের অনাথিনী মাতা বধূ বনিতারা কী অবস্থায় ছিলেন ?
"রাবণ যদি বিভীষণের উপদেশ শুনতেন তবে লঙ্কা দুঃখময় শ্মশান হোত না। কুম্ভকর্ণ, অতিকায় ও ইন্দ্রজিতের মৃত্যুতেও কি রাবণের চৈতন্য হোল না ? আমার পুত্র, আমার ভ্রাতা, আমার স্বামী যুদ্ধে হত হয়েছে --- গৃহে গৃহে রাক্ষসীদের এই বিলাপই শোনা যাচ্ছে। লঙ্কা বীরশূন্য, আমাদের আর আশা নাই।"
এমনই "দুঃখময় শ্মশান"-এর ছবি আমরা আবারও এবং আরও অসংখ্যবার দেখতে পাব মনবেতিহাসের পাতায় পাতায়। এবং সর্বত্রই নারীদের মর্মবেদনার বিলাপ অশ্রুতই থেকে যায়। এই প্রবন্ধটির বিষয় সেটিই। (এবার পর্ব-৩)
(ক্রমশঃ)
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২৯/১২/২০২৫
কলকাতা।
_____________________________________