শ্রীমদ্ভগবদগীতায় অর্জুন- পর্ব ১৫
'অথো পঞ্চদশোধ্যায়'
এই অধ্যায়ে পরমাত্মন বাসুদেব তার অনাদি অনন্ত রূপের মহিমা বর্ণনা করছেন। তার সৃষ্ট ব্রহ্মাণ্ডের তুলনা করছেন উর্ধমূল অধোশাখা অশ্বথবৃক্ষের সঙ্গে।
"ঊর্ধ্বমূলমধঃশাখমশ্বত্থং প্রাহুরব্যয়ম্।
ছন্দাংসি যহ্য পর্ণানি যস্তং বেদ সঃ বেদবিৎ।।"
ঊর্ধে মূলরূপে বিরাজ করছেন আদিপুরুষ পরমেশ্বর। তিনিই নিম্নে বহুশাখা-বিশিষ্ট সংসাররূপে বিরাজমান। সেই মহা অশ্বত্থবৃক্ষের পত্রগুলি বেদ, এই কারণেই যে এই সংসাররূপ বৃক্ষকে শোভন নির্মল রাখার জন্য, রক্ষা করবার জন্য মন্ত্র ও কর্মকান্ড বর্ণিত আছে বেদ নামক মহাগ্রন্থের পত্রাবলীত।
এই উর্ধমূল, অধোঃশাখ মহবৃক্ষটির সঙ্গে সৃষ্টিতত্বের, জগতসংসারের তুলনা করেছেন শ্রীকৃষ্ণ। বৃক্ষটির মূল অবিনাশী, অনির্বচনীয় পরমাত্মা। মুখ্য শাখা সৃষ্টির কর্তা ব্রহ্মা। ব্রহ্মা হতে গুণত্রয়যুক্ত দেব মানব দানবাদি যোনিগুলির উৎপত্তি। যেগুলিতে কর্মানুসারে বন্ধন ও পূর্বকৃত কর্মের ফলভোগ করে জীবজগত।
(এই শ্লোকটিতে দেহাত্মবাদী লোকায়ত তন্ত্রসাধনার ইঙ্গিত দুর্লক্ষ্য নয়)। সংসারবৃক্ষের যে রূপ বর্ণিত হোল, ইন্দ্রিয়ানুভূতিতে যে রূপে এই সংসারকে পাওয়া যায় তত্বজ্ঞান হবার পর, অর্থাৎ বিশ্বসংসারের মূলটিকে জানলে, ওই ঊর্দ্ধজগতের অনন্ত মহাচৈতন্যস্বরূপ উৎসটিকে জানলে, প্রকৃতির ত্রিগুণের মায়ায় আবদ্ধ সংসারবন্ধন হতে মুক্তি লাভ করা যায়। এই সংসার নামক বৃক্ষের না আছে আদি, না আছে অন্ত (অনাদ্যন্ত পরমব্রহ্মের ইচ্ছায় কবে যে প্রকৃতি-পাশবদ্ধ এই 'সংসার'-মায়ার বন্ধন ছিন্ন করে বিগত ও বর্তমান পুরুষেরা (মানবপ্রাণ) মুক্তি লাভ করেন। ভাগবৎ প্রাপ্ত পুরুষেদের লক্ষণগুলি সম্মন্ধেও ভগবান বাসুদেব বলেছেন। বলেছেন যে যাঁদের মান ও মোহ বিনষ্ট হয়েছে, যাঁরা আসক্তিকে জয় করেছেন, পরমাত্মার ধ্যানে যাঁদের নিত্য নিরন্তর স্থিতি (অধ্যাত্মনিত্যা), যাঁরা নষ্টকাম এবং দুঃখ-সুখের দ্বন্দ্ব থেকে মুক্ত -- সেইসকল জ্ঞানী পুরুষগণ অবিনাশী পূ্র্ণ সত্ত্বার পদপ্রাপ্ত হন -- "গচ্ছন্তি অমূঢ়া (জ্ঞানবান) পদব্যয়ং তৎ।" 'পদম্ অব্যয়ম'-- পরমেশ্বরের অক্ষয় অব্যয় চির আনন্দের পদ বা পরমাশ্রয়টি কিরূপ ? ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন,
"ন তদ্ভাসয়তে সূর্যো ন শশাঙ্কো ন পাবকঃ।
যৎ গত্বা ন নিবর্তন্তে তদ্ধাম পরং মম।।"
সেই আপনাতে আপনি প্রকাশময় মহাচৈতন্যস্বরূপ ব্রহ্ম সূর্য, চন্দ্ৰ, অগ্নির দ্বারা প্রকাশিত নহেন ; সেই স্বয়ং-জ্যোতিষ্মান ব্রহ্মলোক প্রাপ্ত হন যাঁরা তাঁরা আর দুঃখ- শোকে আচ্ছন্ন সংসারবন্ধনে ফিরে আসেন না।
_________________________________________
ব্যাখ্যা
এই স্বর্গীয় পরমধামের (প্রায় একইরূপ, একই প্রকার) অনবদ্য বর্ণনা ভগবান বাসুদেবের শ্রীমুখে ধ্বননিময় হয়েছে আমাদের ছেড়ে আসা অষ্টম অধ্যায়ের ২১ তম শ্লোকে।
অব্যক্তোহক্ষর ইত্যুক্তস্তমাহুঃ পরমাং গতিম্।
যং প্রাপ্য ন নিবর্তন্তে তদ্ধাম পরমং মম।। (৮/২১)
আমাদের বেদসংহিতা ও বেদান্তগলি বার বার ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য দৃশ্যমান ভূতজগতের আদিতে ও অন্তিমে প্রবেশ করে উপলব্দি করবার চেষ্টা করেছেন জগৎ সৃষ্টির রহস্য। মর্ত্যলোক ছাড়িয়ে, সূর্য-চন্দ্র-গ্রহ-নক্ষত্র-নীহারিকারও পারে, দৃষ্টির অগোচরে থাকা মহাবিশ্বের গভীরে প্রবেশ করতে চেয়েছেন। অনন্ত বিশ্বসংসারের অনন্ত বিস্ময়ের জাল ছিন্ন করবার জন্য অনন্ত প্রশ্নও রেখে গিয়েছেন মানবীয় প্রজ্ঞার কাছে। 'জ্যোতির জ্যোতিঃ' - অনুসন্ধানে সাধনার উচ্চতম শৃঙ্গে ধ্যানমগ্ন হয়ে ছিলেন আমাদের মুনিঋষিগণ। পূর্বশ্রুত (১৩/১৭) মহা বাণীতে আমরা উক্ত শব্দগুচ্ছ শুনেছি এবং উপলব্দি করেছি 'তিনি 'তৎ', তিনিই ব্রহ্ম।'
"জ্যোতিষামপি তজ্জ্যোতিস্তমসঃ পরমুচ্যতে।"
এই 'তৎ', এই ব্রহ্মই জ্যোতি সমুহেরও জ্যোতি।
ঋগ্ বেদের 'ঋক-ষটক', ছয়টি মহামন্ত্র অনুবাদ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ষষ্ট মন্ত্রটিতে আজ থেকে পাঁচ (মতান্তরে দশও হতে পারে) হাজার বছর আগে মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষিগণের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল এই মহাবাক্য
"যৎ ক্রন্দসী অবসা তস্তভানে অভ্যৈক্ষেতাং মনসা রেজমানে।
যত্রাধি সূর উদিতো বিভাতি কস্মৈ দেবায় হবিষা বিধেম।।"
"মহাশক্তি-প্রতিষ্ঠিত দীপ্যমান দ্যুলোক ভূলোক।
যারে করে নিরীক্ষণ ; সূর্য যাঁহে লভিছে প্রকাশ ;
আর কোন্ দেবতারে দিব মোরা হবি ?"
"সূর্য যাঁহে লভিছে প্রকাশ" -- এই বাক্যাংশের ব্যঞ্জনায় মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষিগণ পেয়ে গিয়েছিলেন স্বপ্রকাশ পরম চৈতন্যরূপী ব্রহ্মের ভাবনা এবং 'জ্যোতির জ্যোতি' ব্রহ্মের ধ্যানে তাঁরা অনুভব করেছিলেন সেই পরম জ্যোতির কণা ভূতজগত এবং জীবাত্মাও। তাই তাঁরা সর্বভূতে ব্রহ্মের দর্শন লাভ করে, আপনাকে পরাজ্যোতিঃ স্রষ্টার সঙ্গে 'এক' হয়ে গিয়ে বলতে পেরেছিলেন, 'অহম ব্রহ্মাস্মি'।
____________________________________
'সুখ-দুঃখ-মোহ- শোকে'র ঊর্ধে এই দেহস্থিত জীবাত্মা আমারই অংশ। "মামৈবংশ জীবলোকে জীবভূত সনাতন।" পরমাত্মা যেমন অবিনাশী, তেমনই জীবের আত্মারও বিনাশ হয় না। বায়ু যেমন গন্ধের স্থান থেকে গন্ধকে গ্রহন করে অন্যস্থানে নিয়ে যায়, তেমনি দেহের বিনাশ হলে সেই দেহের অভ্যন্তরে থাকা মন সহ ইন্দ্রিয়গুলির কামনা-বাসনারূপ অদৃশ্য 'আর্তি'কে পরবর্তী দেহে (ঐ আত্মা যে দেহে আশ্রয় লাভ করবে) নিয়ে যায় -- "সংযাতি বায়ুর্গন্ধানিবাশয়াৎ"।
দেখ পার্থ, জীবের যে আত্মা, যাকে আমি আমারই অংশ বলেছি, সেই আত্মাই দেহস্থিত ইন্দ্রিয়গুলির মাধ্যমে, মনকে আশ্রয় করে বিষয়সমূহ (জাগতিক ভোগের সামগ্রী) নির্বিকারভাবে সেবন করে -- "বিষয়ান্ উপসেবতে"। কিন্তু এই সকল অবস্থাতে অচঞ্চলভাবে স্থিত আত্মাকে অজ্ঞানীরা জানতে পারে না। "বিমূঢ়া নানুপশ্যন্তি পশ্যন্তি জ্ঞানচক্ষুষা"। যোগীগণ নিত্য সাধনপথে থেকে আপন-হৃদয়ে-অবস্থিত আত্মাকে অনুভব করেন। অন্তঃকরণ শুদ্ধ,পবিত্র না হলে ( লোভ-মোহ- কাম-ক্রোধ-মুক্ত না হলে) 'আপনার মাঝে আপন যে জন' তাঁকে জানা যায় না।
শ্রীকৃষ্ণ আবারও বলছেন, শোন অর্জুন, যে 'জ্যোতির জ্যোতি'-বিষয়ে তোমাকে বললাম, যে জ্যোতির তেজরশ্মিতে এই জগৎ ভাসমান, সূর্যে নক্ষত্রে স্থিত থেকে যে তেজশক্তি অখিল জগৎকে প্রকাশিত করছে, যে তেজশক্তি চন্দ্রমায় স্থিত আছে, অগ্নিতে স্থিত আছে তা আমারই তেজশক্তি বলে জানবে। ওই অক্ষয় তেজশক্তি নিয়ে আমি এই জীবাত্মার আলয়ে (পৃথিবীতে) আসি, (ভূতদের) জীবজগতকে ধারণ করি, রসস্বরূপ বা অমৃতময় 'চন্দ্ৰ' হয়ে বৃক্ষ, লতা, ঔষধী, বনস্পতিদের পোষণ করি। অগ্নিরূপে (বৈশ্বানরো ভূত্বা) জীবশরীরে ভুক্ত অন্ন (সমস্ত খাদ্য) পরিপাক করে থাকি। আমিই সকল প্রাণীর হৃদয়ে অন্তর্যামীরূপে বিরাজ করি, আমার প্রণোদনায় স্মৃতি, জ্ঞান মানুষদের বোধ ও অনুভবের মধ্যে আসে, আবার বুদ্ধির মধ্যে সংশয়, বিপর্যয় প্রভৃতি দোষগুলির বিচারের দ্বারা পরিশুদ্ধ হয়, ''অপোহনম ভবতি''। সমস্ত বেদের দ্বারা যা বেদ্য (জানবার যোগ্য) ও বেদবেত্তা আমিই। আবার সমস্ত বেদান্তের কর্তাও আমি। সমগ্ৰ ভূতজগৎকে 'পৃথিবী' হয়ে আমিই ধারণ করি, 'চন্দ্ৰ' হয়ে আমিই পোষণ করি। (বৈদান্তিক দর্শনে চন্দ্ৰ বা 'চন্দ্ৰলোক' পরমব্রহ্ম বা স্রষ্টার অমৃতধারা বর্ষণ করে ; যার দ্বারা জীবজগত প্রাণবান ও রসসিক্ত হয়। পরবর্তী সময়ে আলোচিত হবে)।
দেখ সখা, এই সংসারে সমস্ত ভূতজগতে, (এখানে মানুষদেরকেই প্রাধান্য দিয়ে বলা হয়েছে) দৈহিক, ত্রিগুণসমন্বিত অস্তিত্ব নাশবান বা 'ক্ষরঃ' ; কিন্তু প্রাণীদের অন্তরে গুহ্য যে জীবাত্মা তা অবিনাশী বা 'অক্ষরঃ'। (৭/৪--৫, এবং ১৩/১ শ্লোকেও এই তত্বের বিষয়েই বলা হয়েছে)। এই প্রকার দুটি প্রাকৃত পুরুষ হতে ভিন্ন হলেন পরমেশ্বর পরমাত্মা যিনি জগৎকে ধারণ করেন, জীবাত্মাকে পোষণ করেন। এই যে পুরুষ (শ্রীকৃষ্ণ বলছেন 'আমি') তিনি নাশবান জড়জগতের অতীত এবং মায়াবিষ্ট জীবাত্মা হতে উত্তম। "যস্মাৎ ক্ষরম্ অতীত...... অতঃ অস্মি লোকে চ বেদে চ প্রথিতঃ পুরষোত্তম"।
আর তুমি জেনে রেখো, হে অর্জুন, এমনই পুরুষোত্তমরূপে আমাকে যিনি জানেন তিনি, সেই জ্ঞানী ভক্ত সর্বজ্ঞ পুরুষ এবং তিনি পরমেশ্বররূপে আমারই ভজনা করেন।
"যো মামেবমসংমূঢ়ো জানাতি পুরুষোত্তমম্।
স সর্ববিৎ ভবতি মাম সর্বভাবেন ভারত।।"
________________________________
ব্যাখ্যা
বিনাশশীল জড়জগৎবিবিক্ত, ত্রিগুণাতীত, 'স্রষ্টা' কিন্তু আপন সৃষ্টির প্রতি নিরাসক্ত, জীব ও জড়জগতের পালক ও পোষক, অনন্ত, অনাদি মহাচৈতন্যস্বরূপ এই 'অক্ষর' পুরুষ অবতারশ্রেষ্ঠ দেবকীনন্দন শ্রীকৃষ্ণ সারথীরূপে এখন অর্জুনের সম্মুখে অবতীর্ণ এবং তিনি 'পুরুষোত্তমযোগ'-য়ের সাধনফল সম্মন্ধে যে বাণী পরিশেষে উচ্চারণ করলেন তাইই পঞ্চদশ অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ। তিনি বলেছেন,
"ইতি গুহ্যতমম শাস্ত্রমিদমুক্তম ময়ানঘ।
এতদ্বুদ্ধ্বা বুদ্ধিমান্ স্যাৎ কৃতকৃত্যশ্চ ভারত।।"
তাঁকে পরমেশ্বর, পরমপুরুষ (তত্ত্বতঃ) জেনে ভক্ত যদি তাঁর সাধনায় আত্মসমর্পণ করেন তবেই ভক্ত কৃতকৃতার্থ, তাঁর জীবন ধন্য। "তত্ত্বতঃ" শব্দটি গভীর তাৎপর্য বহন করে। 'ভাগবত পুরাণ' বলছেন,
"সমস্ত তত্ত্ববিদগণ তাকেই 'তত্ত্বঃ' বলে থাকেন, যা অদ্বিতীয়, যা একক জ্ঞান। এই অদ্বয় জ্ঞানের স্বরূপকে ব্রহ্ম, পরমাত্মা বলা হয়ে থাকে। জগতের সমস্ত শ্রদ্ধাশীল মুনিগণ বেদ সমুহের শেষভাগ, যা বেদান্ত নামে পরিচিত তাঁরা তা শ্রবণের দ্বারা পরম আনন্দরূপ জ্ঞান প্রাপ্ত হন। সেই পরমব্রহ্মরূপ, আনন্দরূপ জ্ঞান লাভ করে মুনিগণ ও ঋষিগণ বৈরাগ্যযুক্ত প্রেম দ্বারা, অব্যভিচারিণী ভক্তির দ্বারা তাঁদের পবিত্র ও বিশুদ্ধ হৃদয়ে পরম শুদ্ধ পরমাত্মাকে প্রত্যক্ষ করেন।"
--- ভাগবত পুরাণ, ২য় অধ্যায়।
'পুরুষোত্তম' যোগে যে 'পরম পুরুষের' কথা বলা হয়েছে, তিনি কে, তাঁর ধারণা কেমন করে হবে ? এই প্রশ্নটি অত্যন্ত গূঢ়, 'উত্তর'ও মৌন হয়ে থাকে। আকারহীন, বিকারহীন, গুণাতীত, অচিন্ত্য, 'অবাঙমনোসগোচর' সেই জগদ্ধারক, জগৎ-পালক, বিশ্বব্যপ্ত পরমব্রহ্মরূপ মহাচৈতন্যকে ধারণা করাই বা যাবে কেমন করে ? ধ্যানের মাধ্যমে জ্ঞানের পথে তাঁর উপলব্ধি যার হবে তিনিও (সেই যোগী) তো "অহম ব্রহমাস্মি" হয়ে যাবেন। সমুদ্রের বিকার যে ঢেও, সে স্তিমিত হলে নিবাত নিস্তরঙ্গ অনন্ত গভীরে লীন হয়ে যায়।
এই অনির্বচনীয় পুরুষসত্ত্বার কথা বলেছেন কঠোপনিষদ,
"মহতঃ পরম্ অব্যক্তম্ অব্যক্তাৎ পুরুষঃ পর।
পুরুষাৎ ন পরং কিঞ্চিৎ সা কাষ্ঠা সা পরা গতিঃ।।" 'কঠ' ১/৩/১১।
অব্যক্ত (সৃষ্টির আদি ও অন্ত যা অব্যক্ত) সত্ত্বা মহান আত্মা অপেক্ষা উচ্চতর ; 'পুরুষ' অব্যক্ত সত্ত্বা অপেক্ষাও উচ্চতর। 'পুরুষ' অপেক্ষা উচ্চতর কিছু নাই। এখানেই সকল গতির পরিসমাপ্তি, ইহাই শেষ গন্তব্য।
সুধী পাঠককুলের স্মরণে আছে দ্বিতীয় অধ্যায়ের (সাংখ্যযোগ) সেই অমোঘ শ্রীকৃষ্ণবাণীঃ
"অব্যক্তাদীনি ভূতানি ব্যক্তমধ্যানি ভারত।
অব্যক্তনিধনান্যেব তত্র কা পরিদেবনা।।"
--শ্রীগীতা- ২/২৮
'অব্যক্ত' থেকে ভূতজগতের সৃষ্টি, কিছুসময়ের স্থিতি ; আবার অব্যক্তেই নিধন। তাই 'ব্যক্ত' অবস্থাটির অবশ্যম্ভাবী নিধনের জন্য কিসের শোক, কেনই বা বিলাপ। এখানেও সেই অব্যক্ত থেকে ক্ষয়-লয়, জন্ম-মৃত্যুর নিয়ত ঘূর্ণায়মান চক্রে আবর্তিত অশাশ্বত জগৎপ্রকৃতির সৃষ্টি হোল কেন ? এটি সীমার মধ্যে আবদ্ধ মানব-জ্ঞানের 'অতিপ্রশ্ন'। কেন না এই সৃষ্টি তাঁর আপন আনন্দের বিলাসকুঞ্জ। আর তিনি নিরাকার, রসস্বরূপ, নির্বিকল্প আনন্দস্বরূপ। একমাত্র তাঁকে লাভ করা, সেই ভূমানন্দে আশ্রয় লাভ করাই জীবাত্মার সাধনা। সেই সাধনাই নানা পথে, নানা মতে মানুষ করে চলেছে। তাঁর সঙ্গে জীবাত্মার মিলন হলে তো আর প্রশ্ন থাকে না। তিনি যে সুধারসসসিন্ধু।
"রসো বৈ সঃ।
রসং হ্যেবায়ঃ লব্ধানন্দী ভবতি।।
কো হ্যেবান্যাৎ কঃ প্রাণাৎ।
যদেষ আকাশ আনন্দো না স্যাৎ।।"
--- তৈত্তিরীয় উপনিষদ ২/৭ ।
(ক্রমশঃ)
পরবর্তী ষোড়শ পর্ব (ষোড়শ অধ্যায়) অচিরেই প্রকাশিত হবে।
ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ হি।
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২২ অক্টোবর, ২০২৫
ব্যাঙ্গালোর।
___________________________________
অসাধারন
উত্তরমুছুন