শ্রীমদ্ভগবত গীতায় অর্জুন-পর্ব ১৪
শ্রীমদ্ভগবত গীতায় অর্জুন-পর্ব ১৩ (ত্রয়োদশ অধ্যায়), আলোচনায় ভগবান বাসুদেবের উপদেশবাণীর মধ্যে পেয়েছি 'ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞ' তত্ত্বের মহাজ্ঞান। যেখানে তিনি তার সৃষ্ট ভূবনমণ্ডলের দ্বৈত সত্ত্বার রূপ দেখিয়েছেন। গভীর, দুর্বোধ্য, দুর্জ্ঞেয় এই তত্ত্ব অতি সাধারণ বুদ্ধিতে যদি বুঝতে চাই এবং প্রকাশ করতে চাই তবে এইটুকু বলা যেতে পারে যে এই বিশ্বসংসার দুটি রূপে আমাদের কাছে প্রতিভাত হয়। একটি জড়জগৎ, অন্যটি চেতনজগৎ। জড়জগৎ প্রকৃতি। প্রকৃতি নিত্য বিকারগ্রস্ত, পরিবর্তনশীল, জন্ম-জরা-ক্ষয় ও লয়ের অধীন। তবু সেটিই ক্ষেত্র। ক্ষেত্র কর্ষিত হয়, ক্ষেত্রে 'বীজ' উপ্ত হয় এবং নূতন প্রাণ সঞ্চারিত ও সৃষ্ট হয়, (ভূমি হতে শস্য, মাতৃগর্ভ হতে প্রাণী)। এইসব সঞ্চার, এসকল সৃষ্টির স্থিতি আছে, ক্ষয় আছে এবং কালশেষে পরিণাম বা লয় আছে। এই যে জড়জগতের চলমানতা তার উৎস কোথায় ? শক্তি কি ? জড়জগতে এই যে কার্যগুলি হয়ে চলেছে তার কারণই বা কি ?
এইসকল গূঢ় ও জটীল প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গিয়েছেন আমাদের প্রাচীন ভারতের ঋষিগণ। তাঁরা বলেছেন, বিশ্বসৃষ্টির উৎস চৈতন্য, সৃষ্টির শাশ্বত চলমানতার শক্তি পূর্ণচৈতন্য ব্রহ্ম এবং কার্য্য ও কারণের হেতু কাল। আর এই সৃষ্টি, সৃষ্টির শাশ্বত চলমানতা ('সংসার'য়ের অর্থ হোল যা সঞ্চরমান বা গতিশীল), সৃষ্টি-র হেতু এক এবং অদ্বিতীয় অনাদি, অনন্ত, মহাচৈতন্যস্বরূপ পরমব্রহ্ম। তাঁর আকার নেই, তাই বিকার নেই। তিনি জ্ঞেয় নন, তিনি ধ্যেয়। তিনি অব্যক্ত, অচিন্ত্য। তিনি একাধারে তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং সৃষ্টিবিবিক্ত। তিনি জগতসংসারের সুখ-দুঃখ-শোক, জীবন-মরণের পারে আনন্দময় চিৎসত্ত্বা। আমাদের সকল প্রয়াসের গতি তাঁরই দিকে নিরন্তর ধাবিত -- জ্ঞানত বা অজ্ঞানত। ভূত জগতের সকল ক্ষণস্থায়ী 'চিৎকণা' (জীবাত্মা) জন্মমৃত্যুর চক্রে আবর্তিত হতে হতে, তাকেঁ স্মরণে রেখে, তার সঙ্গেই মিলিত হতে চায়। যাঁরা এই সাধনপথে আছেন তাঁরাই তাকে, সেই পরমানন্দময় উৎসকে লাভ করেন। অশেষ প্রকারের সাধন পথের মধ্যে ভক্তিপথই একমাত্র পথ যে পথের লক্ষ্য পরমাত্মার সাথে জীবাত্মার মহামিলন।
"ধায় যেন মোর সকল ভালোবাসা
প্রভু, তোমার পানে, তোমার পানে, তোমার পানে।
যায় যেন মোর সকল গভীর আশা
প্রভু, তোমার কানে তোমার কানে তোমার কানে।।"
----- রবীন্দ্রনাথ
অপরদিকে যিনি, যে ভক্ত 'অব্যভিচারিণী' ভক্তির মধ্যে দিয়ে তাঁর এই আনন্দময় উৎসের অভিমুখে যাত্রা করবেন, অপার করুণায় সচ্চিদানন্দঘন পরমেশ্বরও এগিয়ে আসবেন তাঁর কাছে। ভক্তবল্লভ তো চান তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে মিলিত হতে, একাকার হয়ে যেতে। অনন্তের দূত ডাক দিয়ে যান ভক্তকে, ভক্তের হৃদয়ে ঈশ্বরের চরণধ্বনি ধ্বনিত হয়,
''কতকালের সকাল সাঁঝে তোমার চরণধ্বনি বাজে
গোপনে দূত হৃদয় মাঝে গেছে আমায় ডেকে।।
আমার মিলন লাগি তুমি আসছে কবে থেকে।।"
--- ঐ
এরপর মিলন। 'তুমি' (পরমাত্মা) 'আমি' (জীবাত্মা) একাকার।
চতুর্দশ পর্ব (চতুর্দশ অধ্যায়, 'গুণত্রয়বিভাগযোগো') আলোচনা প্রারম্ভেই এতখানি ভূমিকার প্রয়োজন হোল এই কারণেই যে এই অধ্যায়ে ভগবান বাসুদেব জ্ঞানমার্গের শেষ সীমা অতিক্রম করে তার ভক্তকে বুঝাতে চাইছেন জীবাত্মা পরমাত্মারই অংশ। এই 'অংশ'বিশেষ কি ভাবে 'পূর্ণ'কে প্রাপ্ত হবে ?
শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, হে অর্জুন, এবার আমি সমস্ত জ্ঞানের সার যার দ্বারা মহাবিদ্বান জ্ঞানসাধকগণ (মুনয়ঃ) পরম সিদ্ধি লাভ করে শোক-দুঃখ-সমাচ্ছন্ন সংসারবন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে যান, সেই উত্তম জ্ঞানের (জ্ঞানানাং জ্ঞানুত্তমম্) কথাই বলছি। এই জ্ঞান প্রাপ্ত হলে, সাধক আমার স্বরূপ হৃদয়ঙ্গম করেন। তাঁরা তখন পুনর্জন্মরহিত হন (আদিতে জন্মলাভ করেন না) এবং প্রলয়কালে বা অন্তিমে ব্যাকুলতা প্রদর্শনও করেন না, জন্মমৃত্যুর শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে যান। দেখ পার্থ,
"মমযোনির্মহদ্ব্ব্রহ্ম তস্মিন গর্ভং দধাম্মহম্।
সম্ভবঃ সর্বভূতানাং মতো ভবতি ভারত।।"
আমার যে 'ব্রহ্মরূপ'য়ের প্রকৃতিরূপ অভিব্যক্তি (ত্রিগুণময়ী মায়া) তাইই 'যোনির্মহদ্ব্রহ্ম'-- যোনিরূপ মহৎ ব্রহ্ম, সৃষ্টির গর্ভাধানের স্থান, যেখানে চেতনরূপ বীজ সংস্থাপিত করি। এইভাবে জড় ও চেতনের সংযোগে ভূতগণের (জীব জগতের) উৎপত্তি সম্ভাবিত হয়েছে।।
____________________________________________
ব্যাখ্যা
শ্রীগীতার এই বাণীর (১৪/৩) তাৎপর্য্য নিগূঢ় ও দ্বান্দ্বিক। ব্রহ্ম এবং তাঁর অভিব্যক্তি ভিন্ন ভিন্ন। 'প্রকৃতি' এখানে 'মহাযোনি' অর্থাৎ 'গর্ভধারণকারিণী', (১৪/৪ শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ সে কথা বলবেনও) নারী। আর ব্রহ্ম স্বয়ং 'বীজস্থাপনকারী' পুরুষ। এখানে ব্রহ্মের দ্বৈত সত্ত্বা প্রকটিত যা, (পাঠকগণের স্মরণ করুন, প্রাথমিক কয়েকটি অধ্যায়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে) সাংখ্য দর্শনের 'প্রকৃতি পুরুষ' তত্ত্বের দ্বারা প্রতিপাদিত। সাংখ্য-কারিকার ভাষ্যে বলা হয়েছে,
"যথা স্ত্রীপুরুষসংযোগাৎ সুতোৎপত্তিস্তথা প্রধান-পুরুষ- সংযোগাৎ সর্গস্যোৎপত্তি।।
....... প্রকৃতি বলতে সাংখ্যে শুধুমাত্র primordial matter-ই বোঝায় না, female principle-ও বোঝায়। এদিক থেকে সাংখ্যদর্শন শুধুমাত্র জড়বাদ বা বস্তুবাদ নয়।, নারীপ্রধান্যমূলক চিন্তার ও পরিচায়ক।"
'লোকায়ত দর্শন'-- দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়।
জড়বাদী লোকায়ত দর্শনের নারী-পুরুষ-তত্বের প্রতিধ্বনি শ্রীকৃষ্ণের কথায় স্পষ্টিকৃত। 'ব্রহ্মযোনি' হলেন 'প্রকৃতি' (বস্তুবাদে নারীর প্রতিকল্প), স্বয়ং ব্রহ্ম হলেন বীজপ্রদ 'পুরুষ'। এখানেই, এই কারণেই ভারতীয় দর্শনে 'দ্বৈতবাদ'ও প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। অপরদিকে 'অদ্বৈতবাদী'বেদান্ত দর্শন ঘোষণা করছে,
''যতো বা ইমানি ভূতানি জায়ন্তে। যেন জাতানি জীবন্তি। যৎ প্রয়ন্ত্যভিসংবিশন্তি তৎ বিজিজ্ঞাসস্ব। তৎ ব্রহ্মেতি।।"
সমস্ত ভূতজগত, পদার্থ উৎপন্ন হয়েছে যাঁর থেকে, যাঁর আশ্রয়ে তারা আছে ও বেঁচে আছে এবং বিনাশকালে তারা যার মধ্যে বিলীন হয় তিনিই ব্রহ্ম। তাঁকেই জানতে ইচ্ছা কর।
তৈত্তিরীয় উপনিষদ, (পুত্র ও শিষ্য ভৃগুর প্রতি আচার্য ও পিতা বরুণ)।
সুধী পাঠক লক্ষ্য করে থাকবেন, শুধু 'সর্বোপনিষদ'-য়ের নয়, দ্বৈতবাদ, অদ্বৈতবাদ, সাংখ্য, পূর্বমীমাংসার সমস্তরকমের 'দ্বন্দ্বমূলক' তত্ত্বের সন্নিবেশ ঘটেছে শ্রীমদ্ভগবত গীতায়। এবং শেষে 'ভক্ত ও ভগবান' এই দুই অভেদাত্মার মিলনে বৈষ্ণবীয় 'অচিন্ত্যভেদাভেদ' তত্ত্বের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।
___________________________________________
শ্রীগীতার এই চতুর্দশ অধ্যায়ে বেদান্তের ঐ 'একোমেবাদ্বিতীয়ম্' ব্রহ্ম, অব্যক্ত চৈতন্য যাঁর থেকে সৃষ্টির জন্ম এবং যাঁর মধ্যে সৃষ্টির বিলয় -- তত্ত্বটির অভ্যন্তরেই প্রশ্ন উত্থিত হয়েছে। প্রকৃতি ও 'পুরুষ' (ব্রহ্ম) কি তবে ভিন্ন ভিন্ন সত্ত্বা ? সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ-- এই ত্রিগুণাত্মিকা প্রকৃতি কি নির্গুণ, সাক্ষীচৈতন্যের বীজ ধারণ করে ? প্রশ্নগুলি স্পষ্ট হয়েছে নিম্নোক্ত ১৪/৫ শ্লোকটিতে,
"সত্ত্বাম্ রজস্তম ইতি গুণাঃ প্রকৃতিসম্ভবাঃ।
নিবধ্নতি মহাবাহো দেহে দেহিনম্ অব্যয়ম্।।"
হে অর্জুন, প্রকৃতিজাত গুণত্রয় অবিনাশী পরমাত্মারূপ চৈতন্যসত্ত্বাকে দেহীর শরীরে বন্ধন করে এবং তাই জীবাত্মা।
(এই শ্লোকটিই জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার বিরহ-মিলনের চিরন্তন ও নিরন্তর লীলাবিলাস (মাথুর ও রাস)-সম্ভূত মধুর রসের সঞ্চার করেছে ; মহান ভাগবৎ পুরাণ যার আধার।)
প্রকৃতির এই তিনটি গুণ জীবাত্মা পায় বলেই সত্ত্বগুণের প্রভাবে সুখে আসক্ত হয়, রজোগুণের প্রভাবে কর্মে আসক্ত হয়, তমোগুণের আকর্ষণে জ্ঞানালোক রহিত প্রমাদ ও ভ্রান্তির অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়। রজোগুণ ও তমোগুণকে যদি সংহত করা যায় তবে সত্ত্বগুণ বর্ধিত হয়, রজোগুণ যদি সত্ত্বগুণকে আচ্ছন্ন করে তবে তমোগুণের বৃদ্ধি হয়, আবার তমোগুণ সত্ত্বগুণকে অভিভূত করলে রজোগুণ প্রবল হয়ে ওঠে। যদি প্রকৃতি-সঞ্জাত দেহীর অন্তঃকরণে এবং ইন্দ্রিয়গুলিতে চৈতন্য ও জ্ঞান সঞ্চারিত হয়ে তবে বুঝতে হবে সেই দেহীর (জীবাত্মার) সত্ত্বগুণ বর্ধিত হয়েছে। (স্মর্তব্য --ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব 'কল্পতরু' রূপ ধারণ করে শিষ্যদের বলেছিলেন, "চৈতন্য হোক্")।
শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, হে ভরতর্ষভ, রজোগুণ লোভ ও প্রবৃত্তি-বর্ধক, কর্মে স্বার্থপরতার কামনা সৃষ্টি করে, বিষয়ভোগের লালসার জন্ম দেয় এবং লালসার অপূর্ণতাহেতু মনের চঞ্চলতা ও অশান্তির দ্বারা জীব নিগ্রহ ভোগ করে। এই ভাবে শ্রীকৃষ্ণ বলে গেলেন সত্ত্বগুণান্বিত জীব মৃত্যুর পর নির্মল স্বর্গ লাভ করেন, রজোগুণসমন্বিত জীবাত্মা মৃত্যুর পর 'কর্মসঙ্গিষু' বা কর্মবীর মানুষদের মধ্যে পুনর্জন্ম লাভ করে, তমোগুণে আচ্ছন্ন মানুষ অধঃপতিত জীবযোনি প্রাপ্ত হয় -- 'মূঢ়যোনিষু জায়তে'। তিনি পর পর শ্লোকে সাত্ত্বিক, রাজসিক এবং তামসিক প্রবনতাসমূহের সুষ্পষ্ট পরিণতির কথাও বলেছেন। ১৪/১৮ শ্লোকে বলছেন,
ঊর্দ্ধ্বং গচ্ছন্তি সত্ত্বস্থা মধ্যে তিষ্ঠন্তি রাজসাঃ।
জঘন্যগুণবৃত্তিস্থা অধো গচ্ছন্তি তামসাঃ।।
সত্ত্বগুণে স্থিত থাকেন যারা তাঁরা স্বর্গ বা উচ্চলোক প্রাপ্ত হন, রজোগুণে স্থিত মানুষ 'মধ্য' বা মানবলোকে বার বার গমনাগমন করেন, তমোগুণসম্পন্ন মানুষ অধঃলোক প্রাপ্ত হন -- পশু বা কীটযোনি সম্ভূত হয়ে নরকের জীবন যাপন করেন।
কিন্তু এই তিনটি গুণের দ্বারা কর্তা, অর্থাৎ পরমাত্মা-অনুসন্ধানী পুরুষ (সাধক) প্রভাবিত হন না। মায়া থেকে জাত গুণত্রয় দেহের ইন্দ্রিয়গুলির সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্তরস্থিত 'চেতন' দেহজ বা দেহস্থিত ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত গুণগুলির দ্রষ্টা মাত্র। এই চেতন আবার শুধুমাত্র একটি ব্যক্তির নয়, সমষ্টির চেতনসত্ত্বার সঙ্গে তিনি অবিভাজ্য। তিনি ব্যপ্ত এবং ব্যক্তির ও সমষ্টির কর্মপ্রবনতার সাক্ষীস্বরূপ। জ্ঞানী পুরুষ (সাধক) প্রকৃতির মায়াসঞ্জাত ত্রিগুণের দ্বারা আক্রান্ত স্থূলশরীরের মোহ পরিত্যাগ করে জন্ম-জরা-মৃত্যু অতিক্রমণ করে পরমানন্দময় পরমাত্মাকে প্রাপ্ত হন।
(প্রকৃতিসঞ্জাত গুণত্রয়কে স্থূলশরীরের উৎপত্তির কারণ বলা হয়ে থাকে। মানবের স্থূলশরীর পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়, পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয়, পঞ্চভূত, মন-বুদ্ধি-অহংকার -- এই প্রকার ২৩ তত্ত্বের পিণ্ডরূপ)।
এতক্ষণ পর, চতুর্দশ অধ্যায়ের ২০-তম শ্লোকের পরে আবার অর্জুনের একটি প্রশ্ন। পুরুষ, প্রকৃতি, প্রকৃতিজাত গুণত্রয় (সত্ত্ব রজঃ তমঃ) এবং এই সকল গুণের দেহীদের উপর প্রভাব, সেই প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে গুণাতীত, চিদানন্দময় পরমাত্মার সঙ্গে মিলনের যে পন্থা ভগবান বাসুদেব বলে গেলেন তা অতীব জটীল ; দুরূহ এবং দুর্বোধ্যও বটে। স্বাভাবিক ভাবেই মর্ত্যমানবের প্রতিনিধি অর্জুনও ঈশ্বরসন্নিধানে বিমূঢ় ও বিহ্বল। সখা শ্রীকৃষ্ণের রহস্যাবৃত বাক্য শ্রবণ করে রথী পার্থ প্রশ্ন করছেন,
কৈঃ লিঙ্গৈঃ ত্রীন্ গুণানেতান অতীতো ভবতি প্রভো।
কিমাচারঃ কথম্ চ এতাংস্ত্রীন্ গুণানবিবর্ততে।।
হে সখা, এই যে তিনটি গুণের সম্মন্ধে আপনি দীর্ঘ আলোচনা করলেন, এবার আমাকে বলুন এই সত্ত্ব রজঃ ও তমঃ গুণের প্রভাবশূন্য (ত্রিগুণাতীত) পুরুষের লক্ষণ কি ? আচারই বা তাঁর কেমন ? প্রকৃতির মায়াসঞ্জাত এই ত্রিগুণের প্রভাব ছিন্ন করবার উপায়ই বা কি ?
___________________________________________________
ব্যাখ্যা
এ তো চিরন্তন মানবাত্মার প্রশ্ন। 'ব্রহ্মযোনি'-তে ভ্রূণরূপে দীর্ঘকাল অবস্থান করে, তারপর জীবযোনি প্রাপ্ত হয়ে, মর্ত্য পৃথিবীর সমস্ত 'গুণ' আন্তর-সংস্কারে (inner instinct) বহন করে, প্রকৃতির মধ্যেই জন্মলাভ করে, প্রকৃতির মধ্যেই লালিত হয়ে প্রকৃতির গুণত্রয় হতে মুক্ত হওয়া কি করে সম্ভব ? প্রাচীন সাংখ্য মতে 'প্রকৃতি ও পুরুষ' দুইটি ভিন্ন সত্ত্বা বলা হয়েছে ঠিকই ; কিন্তু তা নিরীশ্বরবাদী চিন্তায়, বাস্তবের 'নারী ও পুরুষ' ধারণাকে বিচারের মূলে স্থাপিত করে। পরবর্তী কালে 'চরক সংহিতায়' সাংখ্যদর্শনের প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়। চরকের মতে, " প্রকৃতিরই অব্যক্ত অংশটির নাম পুরুষ। প্রকৃতির যা বিকার (ওই ত্রিগুণ) বা পরিণামের দিক তার নাম ক্ষেত্র এবং যেটা অব্যক্ত দিক তার নাম ক্ষেত্রজ্ঞ :
"অব্যক্তমস্য ক্ষেত্রস্য ক্ষেত্রজ্ঞমৃষয়ো বিদুঃ।।"
অব্যক্ত ও চেতন একই। এই চেতন বা অব্যক্ত প্রকৃতি থেকে বুদ্ধি, বুদ্ধি থেকে অহংকার, অহংকার থেকে পঞ্চভূত এবং পঞ্চেন্দ্রিয়ের উৎপত্তি ; আর সেই উৎপত্তিকেই আমরা 'সৃষ্টি' আখ্যা দিয়ে থাকি।"
----- 'লোকায়ত দর্শন' -- দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়।
শ্রীমদ্ভগবত গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বেদ, বেদপরবর্তী ব্রাহ্মণ, উপনিষদ, যোগবাশিষ্ঠ, পুরাণ এবং সমসাময়িক কালের জড়বাদী, নিরীশ্বরবাদী, অদ্বৈতবাদী, দ্বৈতবাদী-- সমস্ত আধ্যাত্নিক দর্শনের আশ্রমগুলির (Schools of thoughts) একত্ব স্থাপনা করে অব্যক্ত অচিন্ত্য চৈতন্যসত্ত্বার মহাকাশে মহাসম্মীলন ঘটিয়েছেন। জয়তু দেবকীনন্দন !
_________________________________________________
অর্জুনের প্রশ্নের উত্তরে বাসুদেবের শাশ্বত বাণী, হে ভরতর্ষভ পার্থ, সত্ত্ব গুণের কার্যরূপ প্রকাশ চৈতন্যসত্ত্বারই অভিব্যক্তি। সেই প্রকাশ রজোগুণের প্রবৃত্তি, তমোগুণের প্রবৃত্তির প্রবল্যকেও দ্বেষ করেন না। সে চৈতন্যসত্ত্বা নির্বিকার ও উদাসীন। অব্যবহিত পূর্ব শ্লোকে (১৪/২১) "গুণাননেতানতীতো" 'এই তিন গুণের অতীত' শব্দগুচ্ছের অর্থ হোল, যে পুরুষ (এখানে ভক্ত) চিদানন্দময় চৈতন্যরূপী পরমাত্মাতেই জ্ঞানযোগে ও ধ্যানযোগে নিত্য স্থিত থাকেন, ত্রিগুণময়ী মায়ার সংসারবন্ধন স্বীকার করেও একমাত্র পরমগতি ঈশ্বরের কামনা করেন তিনিই গুণাতীত। তিনি সাক্ষীস্বরূপ ('উদাসীনবৎ')।
"সমদুঃখসুখঃ স্বস্থঃ সমলোষ্টাশ্মকাঞ্চনঃ।
তুল্যপ্রিয়াপ্রিয়ো ধীরঃ তুল্যনিন্দাত্মসংস্তুতিঃ।।"
সুখ দুঃখ, প্রিয় অপ্রিয়, স্তুতি নিন্দায় তাঁর সমভাব, সোনা-মাটি-পাথর-- তাঁর চোখে সমান। (টাকা মাটি, মাটি টাকা-- শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব) এবং তিনি অচঞ্চলভাবে ধৈর্যধারণ করতে পারেন।
আর জেনো, মানে অপমানে, শত্রু মিত্রে সমভাবাপন্ন এবং কর্মারম্ভে ও কর্মসাধনে কর্ত্তৃত্বাভিমান মুক্ত পুরুষই গুণাতীত হতে পারেন। ব্রহ্মচৈতন্যও তো এমনই। তিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি চালনা করছেন, তিনিই আবার ধংসও করছেন ; কিন্তু তিনি জড়িয়ে নেই। তাই তিনি গুণাতীত।
______________________-______________________
অতিরিক্ত উদাহরণ
মহাভারতের 'শান্তিপর্বে' এমনই এক বাণী আমরা পাই,
"সুখং বা যদি বা দুঃখং প্রিয়ং বা যদি বাহপ্রিয়ং
প্রাপ্তং প্রাপ্তমুপাসীত হৃদয়েনাপরাজিতঃ।
প্রিয়েনাতিভৃশং হৃষ্যেদপ্রিয়ে ন চ সংজ্বরেৎ
নমুহ্যেৎ অর্থকৃচ্ছ্রেষু ন চ ধর্ম্মংপরিত্যজেৎ।।"
"সুখ বা হোক্, দুঃখ বা হোক্
প্রিয় বা অপ্রিয়,
অপরাজিত চিত্তে সব
বরণ করিয়া নিও।
অতি হৃষ্ট হইবে না প্রিয় সমাগমে
অপ্রিয়ে হবে না ম্লান ব্যথিয়া মরমে।
করিবে না হা-হুতাশ হলে অঘটন,
ধর্ম ত্যজিবেনা কভু থাকিতে জীবন।।" (২)
'নবরত্নমালা', সত্যেন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথের অনুবাদ। উদ্ধার-- জগদীশ ভট্টাচার্য রচিত 'রবীন্দ্রসান্নিধ্যে'।
______________________________________________
অর্জুনের উচ্চারণে (১৪/২১) একত্রে তিনটি প্রশ্ন ছিল। 'সত্ত্ব রজঃ তমঃ' -- এই তিন গুণের অতীত যে পুরুষ তিনি কি কি লক্ষণযুক্ত ? তিনি কি প্রকার আচরণ করেন ? এবং মানুষ কি উপায়ে এই তিনটি গুণকে অতিক্রম করতে পার ? প্রথম ও দ্বিতীয় প্রশ্নের সম্মিলিত উত্তর দেবার পর এবার তৃতীর প্রশ্নের উত্তরে ভগবান যা বলছেন তা ভক্তিযোগ।।
মাঞ্চ যোহব্যভিচারেণ ভক্তিযোগেন সেবতে।
স গুণান সমতীত্য এতান ব্রহ্মভূয়ায় কল্পতে।।
হে পরমসখা অর্জুন, যে পুরুষ (একমাত্র চিদানন্দময় পরমাত্মাকেই কামনা করেন যে ভক্ত) 'অব্যভিচারিণী' ভক্তিরূপ যোগের দ্বারা 'আমাকে' নিরন্তর ভজনা করেন, তিনি প্রকৃতিরূপ মায়াসঞ্জাত ত্রিগুণের পাশবদ্ধতা ছাড়ায়ে সচ্চিদানন্দঘন পরমব্রহ্মের ভাব প্রাপ্ত হতে পারেন -- "ব্রহ্মভূয়ায় অল্পতে"। তখন অব্যক্ত, অব্যয়, অবিনাশী পরমাত্মারূপ চৈতন্যসত্ত্বার অমৃত, মানবধর্ম ও অক্ষয় আনন্দের অখন্ড 'একরস' এই যে 'আমি' -- আমার ভক্তের জন্ম-মৃত্যুহীন 'আশ্রয়' হয়ে থাকি।
"ব্রহ্মণো হি প্রতিষ্ঠা অহম অমৃতস্য অব্যয়স্য চ।
শাশ্বতস্য ধর্মস্য সুখস্য ঐকান্তিকস্য চ।।"
____________________________________________
ব্যাখ্যা
এতক্ষণে মহাভারতের মহানায়ক অর্জুনের সঙ্গে সঙ্গে জগতসংসারের ভক্তবৃন্দও যেন পতিতপাবন ভগবান বাসুদেবের করুণাসিঞ্চিত সান্ত্বনাবাণী লাভ করলেন। এই চতুর্দশ অধ্যায়ের 'গুণত্রয়বিভাগযোগ'-য়ে শুধুমাত্র 'সত্ত্ব রজঃ তমঃ' গুণের সূক্ষ্ম বিভাজন-ধারণার কথাই আসেনি, এসেছিল ব্রহ্মরূপী নির্বিকার সত্ত্বার কথা, এসেছিল 'প্রকৃতি-পুরুষ' তত্ত্ব, এসেছিল প্রকৃতির বা প্রকৃতিরূপ মায়ার কথাও। ভক্তহৃদয় দ্বিধায়-দ্বন্দ্বে, রহস্যে-ধন্ধে বিকল, বিহ্বল। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের এই অনন্ত ঐশ্বর্যের (ঈশ্বরের রূপ ও গুণ) ছিন্ন করি (তাঁর মায়াই না হয় হোল) কেমন করে ? মানুষরূপী 'আমি' তো তাঁরই সৃষ্ট ! মুক্তি চাইবোই বা কোন্ লজ্জায় ?
তাই এখন আর কোন সংশয় সঙ্কোচ রইল না। 'অহম ব্রহ্মাস্মি' হতে চাই না। তোমার সৃষ্টির মহা সিংহাসনে তুমি বিরাজ কর প্রভু।
"তুমি আছ মোরে চাহি
আমি চাহি তোমা পানে।"
----রবীন্দ্রনাথ।
"ত্বয়া হৃষিকেশ হৃদিস্থিতেন যথা নিযুক্তোহস্মি তথা করোমি।"
(ক্রমশঃ)
পরবর্তীকালের ১৫দশ পর্ব (পঞ্চদশ অধ্যায়)
__________________________________________
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন