শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

সুখ-১

                    সুখ-১

সুখ শব্দটি উচ্চারণ করলেই প্রথমেই অতুলপ্রসাদের একটি গান মনে পড়ে যায়,
"সুখের কথা বলো না আর
বুঝেছি সুখ কেবল ফাঁকি।"

সুখের অবিরাম অন্বেষণে হতাশ একজনের মুখে এ কথা মানায় কিন্তু নবোদ্ভিন্ন-যৌবন কোন তরুণ এই কথা শুনে স্বেচ্ছায় দুঃখ দুর্দশার পথ বরণ করে, রাজকুমার সিদ্ধার্থের মত নিদ্রামগ্ন, শ্লথবস্ত্র, যৌবনবতী, সুন্দরী যশোধারা, হাসি-কান্নার দেয়ালা-দোলানো ঘুমন্ত সন্তান, পিতা-মাতা আর রাজ্যপাটের নিশ্চিত সুখ বিসর্জন দিয়ে রাত্রির অন্ধকারে, আরো অন্ধকারময় ভবিষ্যতের লক্ষ্যবিহীন মহানিষ্ক্রমনে গৃহত্যাগ করবে ? তরুণীদের কথা এর সঙ্গে যুক্ত করা হোল না এই কারণেই যে একটি নারীকেও, এ আমি আমার চোখের 'দিব্য' খেয়ে বলতে পারি, আমার দেখা এই সত্তর বছরের সজ্ঞান জীবনে, দেখিনি যে তিনি আত্মসুখের জন্য ব্রত পালন করেছেন। তাঁদের মধ্যে কিছু ব্যতিক্রম থাকতেই পারে, কিন্তু সকলেই প্রায় কৈশোর কাল থেকে মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত পিতা, ভ্রাতা, স্বামী, পুত্র এমনকি বৃদ্ধ পুরুষ-আত্মীয়দের নিঃস্বার্থ সেবা করেই জীবন অতিবাহিত করেন। এই সেবাব্রতই তাঁদের সুখ। আমরা ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল, মেরি ব্রেকেনরিজ, ক্লারা বার্টন, মেরি এলিজা মাহোনি, মেরি সিকোল, ভার্জানিয়া অ্যাভেলন হেনডারসন প্রভৃতি বিশ্বের প্রাতঃস্মরণীয় শুশ্রুষাকারিণী (nurse)-দের নাম নিতে পারি, স্মরণে আনতে পারি মাদার টেরেসাদের মত অনাথ অনাথিনীদের মাতৃরূপিণীদের এবং ভগিনী নিবেদিতা, সারা বুল, মেরি ফ্রাঙ্কে, হেনরিয়েটা মুলার প্রভৃতির মত সেবাব্রতীদের কথা। এঁরা কি এমন 'সুখ' চেয়েছিলেন যে জীবন, যৌবন, অর্থ, বিলাস ও গৃহাভ্যন্তরের 'আরাম' --- সমস্তকিছু ত্যাগ করে অসুস্থ, যন্ত্রনাদগ্ধ, মৃত্যুপথযাত্রী মানুষ, অসহায়, অবোধ, অশিক্ষা-কুশিক্ষার অন্ধকারে নিমজ্জিত মানুষের মাঝখানে গিয়ে, তাদের দুঃসহ ব্যথার ও পীড়ার কষ্ট নিজের বলে বরণ করে নেওয়ার মধ্যেই কি তাঁরা সুখ খুঁজে পেয়েছিলেন ? এ কেমন সুখের সন্ধান ? এতো গেল কয়েকজন বিরল নারীর কথা। সাধারণ্যে আমরা কি দেখি ? প্রথমেই দেখি আমাদের মা'কে যিনি ভালোবাসার সুখ 'পেয়েছেন কি পাননি' -- সে বিচার না করে যখন থেকে গর্ভ ধারণ করেছেন তখন থেকেই তাঁর সুখ 'আমাকে' নিয়ে। দীর্ঘ ন' মাস, দশ মাস ধরে তাঁর দেহে আমি, দেহের নিত্য নিত্য 'অ-সুখের' বিড়ম্বনায় আমি, তাঁর স্বপ্নে-দুস্বপ্নে, আনন্দে-অবসাদে, আশায়-নৈরাশ্যে, স্বাদে-বিস্বাদে আমি। বিবমিষা, বমন, উপবাস, জাগরণ, ঘুমঘোর -- সবই আমারই জন্য। তারপর মৃত্যু যন্ত্রণার অধিক প্রসবযন্ত্রণা ! এরপর প্রসবোত্তর কালে 'আমি' নামক এই প্রাণীটির লালন পালন ও বছরের পর বছর পরিচর্যার সেবা দিয়ে একটি নবজীবন সৃজনের যে প্রাণপাত সাধনব্রত তারই মধ্যে জন্মদাত্রীর 'সুখ'। (এই জীবনাচরণের ব্যতিক্রম আছে এবং সে সবের কিছু উদাহরণ আলোচনার আরম্ভেই উপস্থাপনা করা হয়েছে)।
তাই, প্রথমেই আমি এই কথাটিই বলতে চেয়েছিলাম যে নারীজাতির জগতে সুখের সংজ্ঞা সম্পূর্ণ ভিন্ন, স্বতন্ত্র ও 'মহাজাগতিক'। এই 'মহাজাগতিক' শব্দটি 'জননীদের' ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করার বাসনা। কেননা 'প্রসবযন্ত্রণা'কে আমরা বলতে পারি বিশ্বজগতের সৃজন বেদনার সমতুল। বেদান্ত বলেন,
আদিতে 'প্রাণ'ই ছিল এবং সেই মহাপ্রাণ বা এক ও অদ্বিতীয় 'মহাচৈতন্য'---- অবয়বহীন নিরাকার এমন এক শক্তি যাঁর সন্ধান, স্বভাব, স্পন্দন---এক কথায় তাঁর অস্তিত্ব মানুষের জ্ঞানের ও বোধের বাইরের বিষয় ; কেননা এই যে দ্যুলোক-ভূলোক পরিব্যপ্ত মহাবিশ্ব, তার মধ্যেই আমরা যারা আছি তারা সমস্তটা না চোখ দিয়ে দেখতে পারবো, না মন-বুদ্ধি-অনুভূতি দিয়ে আত্মস্থ করতে পারব। শিশুর কাছে মাতৃগর্ভের অন্ধকার সম্পর্কে যেমন অজ্ঞতা থাকে, জীবের কাছেও তেমনি ব্রহ্মাণ্ডের 'কামারশালা' এবং ব্রহ্মাণ্ডের অন্তরে তার সৃজনক্রিয়া বিষয়টি চির-অজ্ঞাত। বেদান্ত ওই আদি, নিরাকার অজ্ঞাত শক্তিটিকে বলছেন 'ব্রহ্ম'। 

কঠ উপনিষদে পুত্র ও শিষ্য ভৃগুকে পিতা (যিনি আচার্যও) ব্রহ্মের স্বরূপ সম্বন্ধে বলছেন,
যতো বা ইমানি ভূতানি জায়ন্তে যেন জাতানি জীবন্তি।
যৎ প্রয়ন্তাভিসংবিশন্তি তৎ বিজিজ্ঞাসস্ব তৎ 'ব্রহ্মেতি'।।
                                         (তৈত্তিরীয় উপনিষদ)।
'যা' থেকে (এই 'যা' একটি অবয়বহীন ধারণা) থেকে এই বিশ্বের সমস্ত কিছুর (প্রাণ অপ্রাণ) উৎপত্তি, যা এই  সমস্ত কিছুর আশ্রয়, যার মধ্যে সমস্ত কিছু অস্তিত্বযুক্ত থাকে, যার মধ্যেই সমস্ত কিছুর লয় হয় (তাঁকে জানতে চাও), তিনিই ব্রহ্ম। 'তাঁকে জানতে চাও' -এমন আদেশ দিলেই তো আর হবে না ; তাঁকে জানার উপায় কি ? তার উত্তরে ব্রহ্মবিদ্যা-অন্বেষু শিষ্যকে আচার্য বলছেন, 

'তপস্যা ব্রহ্ম বিজিজ্ঞাসস্ব, তপোব্রহ্মেতি।।' তপস্যাকেই ব্রহ্ম বলা হোল। 

কিন্তু বেদ-বেদান্ত উক্ত এই যে ব্রহ্মজিজ্ঞাসা তাতে তো না হয় 'তপস্যা' বা কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনার মধ্যে দিয়ে নিবিড়, একাগ্রতায় দীর্ঘজীবন সাধনার মাধ্যমে ব্রহ্ম নামক পরমাত্মার সঙ্গে জীবাত্মার মিলন হোল ; কিন্তু নিরাকার, নির্বিকার ব্রহ্ম বা পরমাত্মা বা চরাচর পরিব্যপ্ত 'মহাচৈতন্য' থেকে 'সৃষ্টি' নামক এই দৃশ্যমান, স্পর্শযোগ্য ভূতজগতের জন্মের বিষয়টিকে তো আমাদের জীবৎকালে অস্বীকার করা যায় না। এইখানেই ভারতীয় দর্শনের আরেকটি বিস্ময়। ভারতবর্ষে বেদ, বেদান্ত, পুরাণ, এমনকি সর্বোপনিষদের সার গীতায় ব্রহ্মতত্ত্বের (যা পরম পুরুষেরই কথা বলে), তার বাইরেও নিরীশ্বরবাদ, অনাত্মার ধারণার জন্ম, প্রচার ও প্রসার প্রায় সমান্তরালভাবে প্রবহমান ছিল এবং আছে। সেটি হোল পুরুষ-প্রকৃতি তত্ত্ব। যা 'তন্ত্র' সাধনার কথা বলে। তাঁদের দর্শনশাস্ত্রগত সিদ্ধান্ত এই যে বেদান্ত দর্শন যদি নির্বিকার পুরুষের কথা বলেও তবুও প্রকৃতির বা নারীসত্তাকে অস্বীকার করার অর্থ সৃষ্টিকেই অস্বীকার করা। আদি সাংখ্যদর্শন বা পরবর্তী কালের সমস্ত তান্ত্রিকদর্শনের, উপ-তান্ত্রিক দর্শনের (বৌদ্ধ, জৈমিনী, বশিষ্ঠ, কপিল, পুরস্কৃত, ভার্গব, ভৃগু , শুক্র, বৃহস্পতি) স্রষ্টাগণ প্রকৃতিকেই সৃষ্টির উৎসরূপে প্রতিপন্ন করেছেন।  সাংখ্য দর্শনের ভাষ্যেকার গৌড়পাদ 'সাংখ্যকারিকা'-য় লিখেছেন,
"যথা স্ত্রী-পুরুষ সংযোগাৎ সুতোৎপত্তিঃ তথা প্রধান পুরুষ সংযোগাৎ সর্গস্যোৎপত্তিঃ।।"

নারী ও পুরুষের সংযোগে যেমন সন্তানের জন্ম হয়, ঠিক তেমনি প্রধান পুরুষের (সঙ্গে প্রকৃতির) সংযোগের ফলে এই সৃষ্টির উৎপত্তি সম্ভাবিত হয়েছে। এই যদি শেষ মীমাংসা হয় তবে যে 'ব্রহ্মময়ী' এই বিশ্বচরাচরের জন্ম দিলেন, তাঁর 'শূন্যের' (নাগার্জুনের শূন্যতা), গর্ভ হতে প্রসব করার যন্ত্রনা আর এই মাটির পৃথিবীতে এক জননীর প্রসবযন্ত্রণার মধ্যে পার্থক্য কোথায় ?
"রূপহীন জ্ঞানাতীত ভীষণা শকতি
ধরেছে আমার কাছে জননীমৃরতি।।"
                                  'জন্ম'-- রবীন্দ্রনাথ।
মাটির পৃথিবীতে জন্মদাত্রী মাতাই ওই 'রূপহীন জ্ঞানাতীত' বিশ্বজননীর মূর্ত মুর্তি। মরণযন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে আর্ত ক্রন্দন-ক্লিষ্ট সংসারের আঁতুর ঘরে সদ্যপ্রসবিনী জননী যখন তাঁর সৃষ্টির মুখ অবলোকন করেন তখন সেই বেদনাসিন্ধুমন্থনসঞ্জাত সৃষ্টির আনন্দই তাঁর সুখ।

এই যে দর্শনশাস্ত্রগত সুখের কথা হোল সেটি ধারণা করা আমাদের মতো সাধারণ পুরুষ মানুষের পক্ষে দুরূহই শুধু নয়, সম্পূর্ণ দুর্বোধ্য। বোধ্য হয়ে ওঠে একমাত্র জন্মদাত্রীর জন্মদান করবার সেই মুহূর্তটিতে যখন তিনি প্রাণান্তকর যন্ত্রণার ভিতর, মুহ্যমান নেত্রপাতে তাঁর সৃষ্টিকে অবলোকন করেন। এইখানে এই সত্যটি প্রতিষ্ঠা পায় যে 'দুঃসহ বেদনার তপস্যায়' সৃষ্টির আনন্দেই নিহিত রয়েছে চিরকালের সুখ। বেদান্তের এমন একটি ধারণাকে ধারণ করতে পারলেই দুঃখময় জগতে সুখের উপলব্ধি সম্ভব, অন্যথায় জীবের জীবন যেখানে অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুর ভয়ে নিরন্তর ভীত, সন্ত্রস্ত সেখানে সুখী হবার উপায় কোথায় ? ‌'ভোগবাদী' চিন্তায় এক ধরণের সুখানুভূতি আছে। তাই 'ভোগবাদ' এক ধরনের দর্শনে পরিণত হয়েছে। ধনসম্পদ আহরণ কর, ভোগ কর, ইন্দ্রিয়ের সকল কামনাগুলিকে পরিতৃপ্ত করার চেষ্টা কর। এবং সেই প্রয়াসের জন্য সৎ-অসৎ, শুভ-অশুভ, ন্যায়-অন্যায় বিচার বিসর্জন দিয়ে, পৃথিবীর ভূমিকে, মানবসমাজকে শাসনে, শোষণে নিষ্পিষ্ট নিপীড়িত করে সুখী হবার নিরন্তর প্রচেষ্টা তাই ভোগবাদী সুখ। এই সুখ আত্মসর্বস্ব, স্বার্থপরতায় সংকীর্ণ। এমন সুখ ক্ষণস্থায়ী কিন্তু মাদকতায় তীব্র। অপরিত্যজ্য এবং এই 'সুখের' হঠাৎ বিদায় বা সমাপ্তি অসহনীয় যন্ত্রণাদায়ক। তাই অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে মানুষের মনে হয়েছে, এই শিক্ষা লাভ করেছে মানুষ যে ব্যক্তিক সুখের সামগ্রী, উপাদান ও উৎস ভাগ নেওয়ার মধ্যেই সুখে বৃদ্ধি। অন্যকে সুখ দান করলেই নিজের সুখ গাঢ় হয়ে ওঠে। ঠিক এই কারণেই মানুষের সমাজে, সামাজিক, পারিবারিক ও জাতীয় অনুষ্ঠানে এত আমন্ত্রণ নিয়ন্ত্রণ ও উৎসবের আয়োজন ও আপ্যায়ন।
ইন্দ্রিয় ভোগের জীবন সীমিত ও ক্ষণিক। বিষয়-বৈভব সংক্রান্ত শিক্ষার উদ্দেশ্য এক সীমিত জীবনাচরণ। কিন্তু প্রকৃত শিক্ষা গভীর অর্থবাহী যা মানব নামক প্রাণকে এক অনন্ত সত্ত্বার অনুভূতি দেয়। সকল প্রাণের সঙ্গে মিলনের যে আনন্দ তারই ভিতরে আছে আপন 'অনন্তসত্ত্বার' উপলব্ধি। এটি এমন এক আত্মসচেতনতা যা মানুষকে আপন ক্ষুদ্রতা, তুচ্ছতা, ক্ষণিকতা থেকে মুক্ত করে' অস্তিত্বের অসীমতার দিকে নিয়ে যায়।  বেদান্ত বলেন সংসারের সীমিত স্বার্থপরতার গণ্ডিকে অতিক্রম করাই মানুষের সংস্কারগত মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।
"যো বৈ ভূমা তৎ সুখম্ না অল্পে সুখমস্তি।
ভূমৈব সুখম্ ভূমাত্বেব বিজিজ্ঞাসিতব্যম্।।"
                  ------ ছান্দোগ্য উপনিষদ।

অনেকের মধ্যে, বিরাট জগতের মধ্যে নিজেকে যুক্ত করতে পারলে, নিজেকে ছড়িয়ে দিতে পারলে এমন এক মুক্তির স্বাদ পাওয়া যায় যা হারিয়ে যাওয়া থেকে, মৃত্যুভয় থেকে, নিজের অন্তরের ও বাহিরের ক্ষয় ক্ষতির আফশোস থেকে আলাদা। সেই স্বাদ স্বস্তি ও সান্ত্বনার অনুভূতি এবং তাইই প্রকৃত অর্থে সুখ। কবির কথায়,
"আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া।"
বেঁচে থাকার একমাত্র উদ্দেশ্য (কিছু ব্যতিক্রম থাকলেও সত্য) প্রতিটি মুহূর্তে সুখের সন্ধান এবং এই সুখের পথে যা কিছু অন্তরায় সেগুলিকে হয় উপেক্ষা করা, নয় দূরে সরিয়ে রাখতে চাওয়া। কিন্তু জীবনের অভিজ্ঞতায়, তাও জ্ঞানত ষাট বছরের অভিজ্ঞতায়, দেখেছি সুখের প্রতিকূল বিষয়, সুখের বিরুদ্ধ ঘটনাপরম্পরাকে, অপ্রত্যাশিত প্রাকৃতিক ও ভৌতিক বিপর্যয় সমূহকে ঠেকিয়ে রাখা যায় না। সেসব অনিবার্য ও অনুপেক্ষণীয়। তার পরেও আছে স্বকৃত অপরাধের জন্য আত্মগ্লানি। এই অনুতাপ ও সন্তাপ-সম্ভূত আত্মগ্লানিই 'অসুখের'  মর্মবিদারী কারণগুলির অন্যতম।
এ প্রসঙ্গে একটি গল্প নয়, স্বচক্ষে দেখা একটি জীবনের কথা বলি,
                      (ক্রমশঃ)
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২৮/০২/২০২৬
কলকাতা।
___________________________________









বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

মৃত্যু সত্য, জগৎ মিথ্যা -- উপসংহার

মৃত্যু সত্য জগৎ মিথ্যা (উপসংহার)

ধর্মমত অসংখ্য (লোকায়ত ধর্মমতগুলি নিয়ে), ধর্মপথও বিচিত্র ও বহু দিকে সে-সকল পথের বিস্তার। বিভিন্ন ধর্মধরণার ধর্মপ্রবক্তারা অবতীর্ণ হয়েছেন, তাঁদের মত প্রকাশ করেছেন এবং সেই মতের প্রচারক গুরুদের আবির্ভাব ঘটেছে। তাঁরা পরম্পরাগতভাবে তাঁদের ধর্মীয় নীতি, ধর্মপালনের রীতি কখনো স্মৃতিগ্রন্থ আকারে, কখনো স্মৃতিশাস্ত্ররূপে লিখিতভাবে প্রকাশিত হয়েছে। ধর্মপ্রাণ মানুষ নিজ নিজ ইচ্ছায়, বা ধর্মমতগুলির আদর্শের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে, ভিন্ন ভিন্ন ধর্মে দীক্ষা নেন এবং ধর্মপালন করেন।
ধর্ম যেমন মানুষের জীবনযাপন, জীবনাচরণের ধারা ও ধারণাকে প্রভাবিত করে, নিয়ন্ত্রণ করে, তেমনি মানুষের সমাজকে নীতিবোধ, বিচার, ও শৃঙ্খলার বন্ধনে আবদ্ধ করে রাখে। এমনটিই ধর্মাদর্শের মূল কথা। কিন্তু ইতিহাস বলে তেমনটি হয় না, হয় নি ; কেননা আপন ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার দুর্বার কামনায়, ধর্মান্তরিত করার অদম্য আগ্রহে অন্য ধর্মের উপর, অন্য ধর্মাবলম্বীদের উপর আক্রমণ, নির্যাতন করা,  এমনকি তাদের বিধর্মী চিহ্নিত করে হত্যা করার অজস্র ঘটনা সংঘটিত হয়েছে, হয়ে আসছে, বিশেষ করে, প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মগুলির প্রবর্তনার সময়কাল থেকেই।
(এ-প্রসঙ্গে আমার 'বিন্দুতে সিন্ধু দর্শন' -প্রথম খণ্ডে দীর্ঘ প্রবন্ধ আছে)।

ধর্মমতগুলি, বিশেষতঃ 'অস্তিবাদী' ধর্মমতগুলি একটি ভয়ঙ্কর প্রলোভন দেখিয়ে, মানুষকে তার আত্মচেতনা থেকে উৎপাটিত করে, কাল্পনিক এক স্বর্গীয় জগতের কামনায় উন্মাদ করে দেয়। সে যে পৃথিবীতে আছে, যে সমাজে আছে, যে পার্থিব জীবনের বন্ধনে বাঁধা আছে -- সেই বাস্তব, প্রাণময় সংসার থেকে তাকে নির্বাসিত করে দেয়। হয় সে জীবনের অবশ্যম্ভাবী ত্রিতাপ (আধিদৈবিক, আধিভৌতিক ও আধ্যাত্মিক) দুঃখ থেকে মুক্তি পেতে চায়, নইলে দেবতাদের চিরসুখের আশ্রয়) স্বর্গলাভের বাসনায় কৃচ্ছ্রসাধনায় দেহ-মন সমর্পণ করে।

শ্রীমদ্ভগবদগীতা এবং উপনিষদের আলোচনাকালে এই বিষয়সমূহের উপর আলোকপাত করা হয়েছে। সেখানে আমরা দেখেছি একমাত্র প্রাচীন ভারতীয় ধর্মধারণার মধ্যেই সত্যের যথার্থ অন্বেষণ করা হয়েছে। মানবচিন্তনের আদিতম প্রকাশ বেদসংহিতা ও পরবর্তী কালে ব্রাহ্মণসংহিতা, এক এবং একমাত্র 'ঈশ্বরের' মূর্ত মূর্তির কথা বলেন নি ; প্রজাপতি, সবিতা (সূর্য) ইন্দ্র, বরুণ, মিত্র, মরুৎ, অশ্বিনীকুমারদ্বয় প্রভৃতি বহু দেবতার উল্লেখ থাকলেও মহর্ষি যাস্ক বললেন বেদের দেবতাগণ এক সর্বব্যাপী পরমাত্মার ভিন্ন ভিন্ন রূপ। এবং এই দেবতাবিষয়ক ধারণার সংহত রূপ আমরা পেলাম বেদান্ত বা উপনিষদগুলির মধ্যে। এই চরাচরব্যপ্ত পরমাত্মা 'ব্রহ্মরূপে' আলোচিত হয়েছেন। তিনিই স্রষ্টা, তাঁর মধ্যেই সৃষ্টির অস্তিত্ব এবং তেনাতেই সৃষ্টির বিনাশ। এই ব্রহ্মের ধারণা প্রাচীন ভারতীয় ধর্মধারণার ও ধর্মদর্শনের মূল ভাব ও ভাবনায় গভীরভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে এবং আজও তা শুধু প্রাচ্যভূমিতে নয়, পাশ্চাত্য দেশের দার্শনিক মতবাদগুলিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।‌ প্রাচীন ভারতীয় ধর্মদর্শনে এই ব্রহ্মই পরম চৈতন্যসত্ত্বা। ব্রহ্ম বা চৈতন্যসত্ত্বা অনাদি, অনন্ত, অক্ষয়, অব্যয়, অব্যক্ত অনির্বচনীয় এক অস্তিত্ব যিনি নির্বিকার। তাঁরই 'ইচ্ছা' এই সৃষ্টি। এই সৃষ্টির মধ্যে ওই পরমচৈতন্যের আলো আমার, অর্থাৎ ব্যক্তিপ্রাণের মধ্যেও বিদ্যমান। তাই 'বেদান্ত' প্রমাণ করেছেন যে সেই মর্ত্যলোক-অমর্ত্যলোক পরিব্যাপ্ত পরমচৈতন্যের লীলা যদি অনুভব ও অনুধাবন করা যায় তবে এই জ্ঞানে স্থিতিলাভ করা যায় যে 'আমি'ও এই সৃষ্টির একটি সম্বিৎ-কণা,  একমাত্র তখনই মৃত্যুভয় থেকে 'মুক্তি' সম্ভব। এই 'মুক্তি' শোক-সন্তাপ-বিষাদ-বিহীন এক অসীম আনন্দলোক। ব্রহ্মই আনন্দস্বরূপ পূর্ণসত্ত্বা। তার থেকেই বিশ্বচরাচর, সমস্ত দৃশ্যমান, অদৃশ্য ভূতূসত্ত্বার আগমন এবং তাঁর কাছেই প্রত্যাগমন।
"যতো ইমানি ভূতানি জায়ন্তে যেন যাতানি জীবন্তি।
তৎ প্রয়ন্তাভিসংবিশন্তি তৎ বিজিজ্ঞাসস্ব তৎ ব্রহ্মেতি।।" 
             -- তৈত্তেরীয় উপনিষদ - ৩/১
যাঁ থেকে এই অখিল বস্তুসমূহ ও ভূতবর্গ উৎপন্ন হয়েছে, উৎপন্ন হয়ে যাঁর আশ্রয়ে বেঁচে আছে, শেষে যাঁর পূর্ণসত্ত্বায় বিলীন হয় --- তাঁকেই জানতে হবে। তিনিই ব্রহ্ম।
সৃষ্টির কণামাত্র যদি তাঁর কাছ থেকে এসে তাঁতেই লয় প্রাপ্ত হয় তবে মৃত্যুর ধারণার মধ্যে কোনো সত্য নেই। এই ধারণাকে ধারণ করলে তো নিখিল জগতে, বিশ্বমানব-সমাজে কোন দ্বিমত, কোন দ্বন্দ্ব থাকে না।
জীবাত্মা চির শাশ্বত পরমাত্মার অংশ।
"অসূর্যা নাম যে লোকা অন্ধে তমসাবৃতাঃ।
তাংস্তে প্রেত্যাভিগচ্ছন্তি যে কে চাত্মহনো জনাঃ।।"
                   --- ঈশা উপনিষদ-- মন্ত্র ৩।

এই মন্ত্রে অতি সাংকেতিক ভাষায় এক গভীর দার্শনিক সত্য প্রকাশিত হয়েছে। নিজের দেবত্ব ( পরমাত্মা বা ব্রহ্মের অংশ) অচেতন হয়ে জীবনযাপন করলে সে জীবন নিতান্তই তুচ্ছ হয়ে যায়, অন্ধকারে নিমজ্জিত দুঃখময়, যন্ত্রনাক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। এই মন্ত্রে যে অন্ধকারের কথা বলা হয়েছে, তা জীবনদর্শনের অন্ধকার, অজ্ঞানতার অন্ধকার এবং আত্মচেতনাহীনতার অন্ধকার। পুরাণ কাহিনীত যে নরক (অসুরদের আবাসস্থল)-এর কথা বলা হয়েছে, যে স্থান 'অসূর্যা' --সূর্যরস্মিবিহীন, আত্মসচেতনতাহীন, ইন্দ্রিয়সর্বস্ব মানুষ, সেই স্বরচিত নরকে বাস করে' মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করে।
তাই উপনিষদ বলছেন চৈতন্যহীনতাই মৃত্যু, চৈতন্যলাভ করাই মৃত্যুহীন অস্তিত্বের বোধ ও সংবিদ্।
বর্তমান যুগের যুগপুরুষ, 'সর্বধর্মসমন্বয়ের' বাণী যাঁর শ্রীমুখনিঃসৃত, 'যত মত তত পথে'র যিনি প্রবক্তা, যিনি মাতৃসাধক ও মানবতার পূজারী তিনি তাঁর শিষ্যদের ও ভক্তদের (কল্পতরুরূপে) এই বলে আশীর্বাদ করেছিলেন,
"তোমাদের চৈতন্য হোক্।"

'চৈতন্যসাধনাই' মানবধর্মের শেষ কথা, জ্ঞানের পূর্ণ, জ্যোতির্ময় প্রকাশ। এই জ্ঞানের আলোকবর্তিকা মৃত্যুভীতির বিভীষিকাময় অন্ধকার থেকে মুক্তি দিয়ে এক মৃত্যুহীন আলোকিত জগতের কামনা জাগিয়ে তোলে।‌ 'স্বর্গ' লাভের জন্য অপরকে হত্যা বা পাপাচারসঞ্জাত সন্তাপে আত্মহননের প্রবৃত্তি থেকে মুক্ত করে। বিশ্বাত্মার সঙ্গে একাত্মতার অনুভবে মানুষ মৃত্যুঞ্জয়ী হতে পারে। দেহ থাকে না ; কিন্তু দেহাতীত সত্ত্বা থেকে যায়। নইলে প্রাণের চিরবহমান ধারা স্তব্ধ হয়ে যেত।

"ওঁ আসতো মা সদ্গময়
তমসো মা জ্যোতর্গময়
মৃত্যোর্মা অমৃতং সময়।।" 
ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ হি।।

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়।
১৯/০২/২০২৬
কলকাতা।
________________________________________


রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

মৃত্যু সত্য, জগৎ মিথ্যা-পর্ব ৪

মৃত্যু সত্য, জগৎ মিথ্যা -- পর্ব ৪


সাহিত্যের পাতা থেকে ইতিহাসের পাতা ছুঁয়ে বর্তমান খবরের কাগজে আসি, খবরের বিভিন্ন মাধ্যমে আসি। 'মানুষের ইতিহাস মানুষের রক্তে ভেজা' -- এই প্রবাদবাক্যটি ধ্রুব সত্যরূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। ইতিহাস পাঠের প্রথম অধ্যায় থেকেই 'যুদ্ধ' নামক ঘটনার সঙ্গে আমরা পরিচিত। পুরাণ কাহিনী, মহাকাব্যগুলিতেও যুদ্ধের, বীরত্বের, মারণাস্ত্রের এমনকি প্রাণদানের, মৃত্যুবরণেরও মহিমাকীর্তন। রামায়ণ, মহাভারত ইলিয়াড, ওডিসি, এনিড (ভার্জিল), জেরুজালেম লিবারেতা (টর্কাতো তাসো) প্রভৃতি মহাকাব্যের মূল বিষয়বস্তু যুদ্ধ। পাশ্চাত্যের গ্রীক, রোমান, পারসিক সভ্যতাগুলির পত্তন ঘটেছে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে, পতনও হয়েছে হয় অন্তর্দ্বন্দ্বে, নয় বহিরাক্রমনে। তারপর মধ্যযুগে বর্বরদের ইতিহাস। ইউরোপখণ্ডের ভিজিগোথ, অস্ট্রোগোথ, ফ্রাঙ্ক, ভ্যান্ডাল, লোম্বার্ড, ভাইকিং প্রভৃতি জার্মানিক ও যাযাবর গোষ্ঠীগুলির অভিযান, রোম সাম্রাজ্যের নগরে নগরে, জনপদে জনপদে কত যে রক্তনদীর প্লাবন বইয়েছিল তার হিসাব মহাকালও সম্যক দিয়ে যেতে পারেননি। ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে ওসমানী  সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদের আক্রমণে পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপোলের পতনের মধ্যে দিয়ে ১৫০০ বছরের রোম সাম্রাজ্যের পতন সম্পূর্ণ হোল। সেই আক্রমণে, সেই অবরোধে যে রক্তপ্লাবন ঘটেছিল তা ইতিহাসের বিরলতম একটি নরসংহারের উদাহরণ। কিন্তু শেষ হয়নি মনুষ্যত্ববোধের শোণিতক্ষরণ। দু'শবছর ধরে চলেছে রক্তলাঞ্ছিত ধর্মযুদ্ধ (Crusade)। দেশে দেশে যুদ্ধ ছাড়াও এসেছে বিপ্লব, বিদ্রোহ। ফরাসী বিপ্লবে হত্যালীলা এক অদ্ভুত শিল্পে (গিলোটিন) পরিণত হয়ে গেল এবং পরবর্তীতে তারই প্রভাব পড়েছিল রাশিয়ার কম্যুনিস্ট (বলশেভিক) আন্দোলনে, চীনদেশের গণবিদ্রোহে। রাজপরিবার, সামন্তপ্রভু, রাজন্যবর্গ ও ভূমধ্যকারী, জমিদারদের নির্মম নিধনের বিধান ছিল সে সকল বিপ্লবের 'আদর্শের' মূল মন্ত্র। মধ্যযুগ পেরিয়ে এসেছিল নবজাগরণ, এসেছে জ্ঞান-বিজ্ঞান-ঋদ্ধ আধুনিক যুগ। কিন্তু মানবিকতার অপমৃত্যু বিরামহীন ! বিংশ শতাব্দীর দুটি দুটি বিশ্বযুদ্ধ দেখিয়ে দিয়ে গেল মানব সভ্যতার অন্তরে বাসকরা সভ্যতাবিরোধী 'শয়তানদের' মানসিকতার কুৎসিত বীভৎসতার রূপ। মানুষের পরম জ্ঞানের, বিস্ময়কর বিজ্ঞানের কর্ষিত ফল কতখানি বিষময় হতে পারে, সৃষ্টি করতে পারে মৃত্যুগহ্বর গ্যাসচেম্বার, সৃষ্টি করতে পারে মর্ত্যলোকে জাহান্নামের 'ইনফারনো' -- অনির্বাণ অগ্নিকুণ্ড, যেখানে পুড়িয়ে ফেলা যায় প্রাণচঞ্চল আস্ত নগর, নগরী।
"The mind in its own place, and in itself,
Can make a Heaven of Hell, and a Hell of Heaven."
             ---- 'Paradise Lost' -- Milton.

এবার যদি এই প্রাচী ধরিত্রীর কথায় আসি তবে এই ভারতবর্ষের বুকে যুগে যুগে সংঘটিত হয়েছে বহিরাক্রমনের ধ্বংসলীলা, মৃত্যুর তাণ্ডব। প্রাচীনকালে পারসিকদের আক্রমণ ; তারপর ক্রমান্বয়ে এসেছে আলেকজান্ডার, শক, পহ্লব, কুষাণ, মুহাম্মদ বিন কাসিম, সুলতান মাহমুদ। এরপর এসেছে পাঠান, মোগল এবং ইংরেজ - যাদের ভারত বিজয় অভিযান শোণিতসিক্ত পথ ধরে হলেও তারা এই উপমহাদেশেই সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ভারতের জাতিসত্ত্বায়, সামাজিকতায়, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে সম্পৃক্ত হয়ে গিয়েছিল এবং এখনও একাত্ম হয়েই রয়েছে। কিন্তু সে-সকল শক্তির হত্যাকাণ্ডের ইতিবৃত্ত 'মানবসভ্যতার' বিজয়গাথার জয়ধ্বনি নয় -- হিংসার, ধর্মান্ধতার নিষ্ঠুর আস্ফালন আর, সর্বোপরি মানবতার পরাভবের, বিষাদময় ট্র্যাজেডি।
কিন্তু এই যে ধ্বংসলীলা, নরমেধ যজ্ঞানুষ্ঠান-- তাই কি সভ্যতার শেষ কথা ?
".. বিজয়রথের চাকা
উড়ায়েছে ধূলিজাল, উড়িয়াছে বিজয়পতাকা।
শূন্যপথে চাই,
আজ তার কোনো চিহ্ন নাই।"
........................................
.........................................
রাজছত্র ভেঙে পড়ে ; রণডঙ্কা শব্দ নাহি তোলে ;
জয়স্তম্ভ মূঢ়সম অর্থ তার ভোলে ;
রক্তমাখা অস্ত্রহাতে যত রক্ত-আঁখি
শিশুপাঠ্য কাহিনীতে রহে মুখ ঢাকি।" 

এই কবিতাটিতে তিনি, তাঁর আজীবন-লালিত আশাবাদী বিশ্বাসের কথাও বলেছেন। বলেছেন ধ্বংসযজ্ঞের হোতারাই চিরবহমান, চিরপ্রাণবান,  সৃষ্টিশীল এক বিপুল বিরাট মৃত্যুহীন মানবসমাজের, মানবসত্ত্বার ভাগ্য নির্ধারণ করে না। এই মানবসত্ত্বা জন্মের পর জন্মের মধ্য দিয়ে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ঐ নরসংহারের 'চিতাভস্ম'পরে', রাজ্য-সাম্রাজ্যের ধ্বংসস্তূপের ভিত্তির মূলে প্রোথিত করে, উন্মোচিত করে নব নব সৃজনের বিজয় কেতন।
"দুঃখ সুখ দিবস রজনী
মন্দ্রিত করিয়া তোলে জীবনের মহামন্ত্রধ্বনি।
শত শত সাম্রাজ্যের ভগ্নশেষ-'পরে
ওরা কাজ করে।" 

তবু 'ওরা'ই যে মরে-- এ কথা তো মিথ্যা নয়। ওরাই তো নরমেধ যজ্ঞকুণ্ডের আহুতি, উৎসর্গীকৃত বলি। মারি, মড়ক, বন্যায় -- দাঙ্গায়, মন্বন্তরে, বিদ্রোহ-বিপ্লবে, ক্রান্তিকালের উপপ্লবে গ্রাম-গঞ্জ-নগর-শহর যখন শ্মশান হয়ে যায়, যখন কালান্তক যুদ্ধের শেষে বিজয়ীদের তাণ্ডবে, লুণ্ঠনে, নির্বিচার হত্যায়, নারীধর্ষণে জনপদের পর জনপদ জীবন্ত নরকে পরিণত হয় তখন সেই নরকাগ্নিতে পুড়ে মরে 'ওরা'।

"১১৭৬ সালে গ্রীষ্মকালে একদিন পদচিহ্ন গ্রামে রৌদ্রের উত্তাপ বড় প্রবল। গ্রাম খানি গৃহময় কিন্তু লোক দেখি না। ...... .... ...... ............
আজ হাটবার, হাটে হাট লাগে নাই। ভিক্ষার দিন, পথে ভিক্ষুকেরা বাহির হয় নাই। তন্তুবায় তাঁত বন্ধ করিয়া গৃহপ্রান্তে পড়িয়া কাঁদিতেছে। ব্যবসায়ী ব্যবসা ভুলিয়া শিশুক্রোড়ে করিয়া কাঁদিতেছে। দাতারা দান বন্ধ করিয়াছে। অধ্যাপক টোল বন্ধ করিয়াছে, শিশুও বুঝি আর সাহস করিয়া কাঁদে না। রাজপথে লোক দেখি না, সরোবরে স্নাতক দেখি না, গৃহদ্বারে মনুষ্য দেখি না, বৃক্ষে পক্ষী দেখি না, গোচারণে গরু দেখি না, কেবল শ্মশানে শৃগাল কুক্কুর।"
         --- 'আনন্দমঠ' বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।

আমাদের এই হতভাগ্য বাঙলাদেশ এমন অগুন্তি আধিদৈবিক, আধিভৌতিক নারকীয় বিপর্যয়ের সাক্ষী হয়ে আছে। তুর্কী আক্রমণ, বর্গি-হাঙ্গামা, ছিয়াত্তরের মন্বন্তর, বিগত শতকের ৪৬-এর দাঙ্গা, পঞ্চাশের, ষাটের দুর্ভিক্ষ ! কোটি মানুষের অকাল মৃত্যু ঘটেছে, লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত, ঠিকানাহীন হয়েছে, শিশুপ্রাণ ঝরে পড়েছে পথে পথে, নারীদের লুণ্ঠিত হয়েছে নারীত্বের সম্ভ্রম। 'যা গেছে তা গেছে চলে', রেখে গিয়েছে বিষাদবিধুর স্মৃতি।
তাও কি সম্বিৎ ফিরেছে আমাদের ? এখনো মানবতাহীন, ক্ষমতালিপ্সু রাজনীতি, সেই 'নীতি'র অভ্যন্তরে সিঁধেল চোরের মত ঢুকে পড়ে ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা, শ্রেণীবৈষম্যের ছায়া ছায়া ঘাতকের মায়াময় মূর্তি, যাদের দেখা যায় কিন্তু একটি সমাজের, এমনকি একটি দেশের সর্বনাশের আগে চেনা যায় না। মিত্রতা নয়, ভ্রাতৃত্বের বন্ধন নয়, অভিন্ন-আত্মা একত্বের সাধনা নয়, উদার মানবতাবাদের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে রাষ্ট্রতন্ত্র, সমগ্র বিশ্বজুড়ে, নির্দয় রাষ্ট্রযন্ত্ররূপে নিষ্পেষণ করে চলেছে দুর্বল, অসহায়, নিরাশ্রয় এক বিপুল সংখ্যক 'গণদেবতাকে' যাঁরা মানবসভ্যতার স্থপতি, রক্ষক ও প্রতিপালক। তাঁদের কর্মসাধনার স্বীকৃতি নেই, পৃথিবীর প্রতি ভালোবাসার মূল্য নেই, প্রাণের প্রতি প্রেমের চরিতার্থতা নেই। অনাদ্যন্ত কাল তাঁদেরই মৃত্যু সংবাদে ভারি হয়ে থাকে ইতিহাস, নিত্য নিত্য তাঁদেরই সংবাদে খোরাক ও খোরাকি জুটিয়ে নেয় সংবাদের মাধ্যমগুলি -- নিরুপায় ঔদাসীন্যের দীর্ঘশ্বাসে নিস্তব্ধ হয়ে যায় অক্ষম, জরাতুর, বৃদ্ধ  মানবতা---- 'বুদ্ধ তথাগত।' আসন্ন অকালমৃত্যুর দুঃস্বপ্ন নিয়ে জীবনের প্রতি হতাশ কবি লেখেন,
"... Of the wide world l stand alone, and think
Till love and fame to nothingness do sink."
               'The terror of death',--- Keats.
বাঁচবার সান্ত্বনা কোথায়। 'সভ্যতার সংকট' যেমন ছিল তেমনি আছে -- নির্দয়, নির্মম, নিষ্ঠুর, অপরিবর্তণীয়। মানুষ যখন মানুষের মৃত্যুর কারণ, তখন এই সত্যই প্রতিষ্ঠা লাভ করে,
'Death conquers all, death consumes all, death ends all.'
মৃত্যু সত্য, জগৎ মিথ্যা।

এতক্ষণ আমাদের আলোচনার অভিমুখ ছিল একমুখী। সৃষ্টি যাই হোক্ --- যা হয়েছিল, হয়েছে বা হবে -- সে সমস্তই বিনাশের অন্ধকারে লীন হবে একদিন। আজ যা সৃষ্টি হয়েছে, আজ যার জন্য হোল তা পিছনে দাঁড়িয়ে রয়েছে বিনাশের, মরণের ছায়া। ধরণীর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণকণা থেকে ওই সুদূরের নীহারিকামণ্ডল, আলোকমন্দাকিনী 'ছায়াপথ' -- তাদের সকলের অন্তিম গতি নাকি 'এক' --নিশ্চত বিদায়। তাহলে এই অসীম সৃষ্টির কি কোন মূল্য নেই ? এই জগৎসংসার জুড়ে যে অনন্ত, বিচিত্র আয়োজন -- সে কি নিছকই নিরর্থক ? যা ব্যক্ত হয়ে জগৎ ও প্রাণ ব্যাপ্ত করে আছে, তা আবারও অব্যক্ত (শূন্য) হয়ে যাবে ? সেই অব্যক্ত বা 'শূন্য' কি ? সেই শূন্য যদি সৃষ্টির উৎস, যুগপৎ অন্ত হয় তবে, এই মুহূর্তের 'আমি' ও 'আমার ভূবন' থাকি বা না-থাকে তাতে কী বা এসে যায় ?
"অব্যক্তাদীনি ভূতানি ব্যক্তমধ্যানি ভারত।
অব্যক্তনিধনান্যেব তত্র কাজ পরিদেবনা।।"
                              --- শ্রীগীতা।
         "বৃথা এ ক্রন্দন
বৃথা এ অনলভরা দুরন্ত বাসনা।"
                               ---- রবীন্দ্রনাথ।
কিন্তু 'পরিদেবনা' -- 'অনলভরা দুরন্ত বাসনার'র জন্যই তো জীবন। বৃথা জেনেও বাসনার মোহ এমনই সর্বনাশা যে তার জন্যই প্রয়োজন হয়েছে 'ঈশ্বর' নামক এক অদৃশ্য সত্ত্বার আরাধনা। মরে যাব জানি, তবে মরার পরেও আমার অপূর্ণ বাসনা, অতৃপ্ত কামনার তৃপ্তি চাই। 'ঈশ্বর' সেই অপূর্ণতার, সেই অতৃপ্তির প্রয়োজন মিটিয়ে দিতে পারেন বলেই ঈশ্বর আরাধনার নানা পথ, নানা মতের উদ্ভব হয়েছে -- এগুলিই 'ধর্মমত' এবং 'ধর্মপথ'। ধর্মমত অসংখ্য (লোকায়ত ধর্মমতগুলি নিয়ে) ও বিচিত্র। ধর্মের পথও বহুদিশারী।

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১৭/০২/২০২৬
কলকাতা।
___________________________________________













রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

মৃত্যু সত্য, জগৎ মিথ্যা-- পর্ব ৩

মৃত্যু সত্য, জগৎ মিথ্যা - পর্ব ৩ 


"শুধু দেবদাসের জন্য বড় কষ্ট হয়, তোমরা যে-কেহ এ কাহিনী পড়িবে, হয়তো আমাদেরই মত দুঃখ পাইবে। তবু যদি কখনও দেবদাসের মত এমন হতভাগ্য, অসংযমী পাপিষ্ঠের সহিত পরিচয় ঘটে, তাহার জন্য একটু প্রার্থনা করিও। প্রার্থনা করিও, আর যাহাই হোউক, যেন তাহার মত এমন করিয়া কাহারও মৃত্যু না ঘটে। মরণে ক্ষতি নাই, কিন্তু সে সময়ে যেন একটি স্নেহকরস্পর্শ তাহার ললাটে পোঁছে --- যেন একটিও করুণার্দ্র স্নেহময় মুখ দেখিতে দেখিতে এ জীবনের অন্ত হয়। মরিবার সময় যেন কাহারও এক ফোঁটা চোখের জল দেখিয়া সে মরিতে পারে।"


দেবদাসের জন্য 'না হয় দুই ফোঁটা' কেন সহস্র সহস্র  চোখের জলধারা এতকাল ধরে ঝরেছে, আগত, অনাগত কালেও ঝরবে, আসমুদ্র হিমাচলে তো বটেই, সাগরপারেরও অসংখ্য দেশেও ঝরে। কিন্তু 'পারু'র --- পার্বতীর জন্য রইল কি ?
ওই যে লেখক, তাঁর নায়ক 'অসংযমী পাপিষ্ঠের' স্মরণসভায় শেষ বাণী পাঠ করবার আগে, শোকার্তা, সংজ্ঞাহারা পারুকে ঘরে থুয়ে এলেন --- "তাহার পর দাসী-চাকর মিলিয়া ধরাধরি করিয়া পার্বতীর মূর্ছিত দেহ টানিয়া আনিয়া বাটীর ভিতর লইয়া গেল। পরদিন তাহার মূর্ছাভঙ্গ হইল, কিন্তু সে কোন কথা কহিল না। একজন দাসীকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিল, রাত্রিতে এসেছিলেন না ? সমস্ত রাত্রি !"
কিন্তু পাঠকের প্রশ্ন, এই একটি 'সমস্ত রাত্রি' কি 'পারু'র আকৈশোর দগ্ধপ্রেম বহ্নিশিখার শেষ আরতি, না-কি বাকি জীবনের মর্মবিদারী দুঃস্বপ্ন ? সে কথা তো 'নারীর মূল্য'-এর দোকানী বললেন না। শুধু চাঁদ সওদাগরের মত বাম হস্তে, অবহেলাভরে' কয়েকটি শব্দপুষ্প ছুঁড়ে দিয়ে বলে দিলেন, "এখন পার্বতীর কি হইয়াছে, কেমন আছে জানি না। সংবাদ লইতেও ইচ্ছা করে না।"
শুধুই কি পার্বতী ? আর চন্দ্রমুখী ? তার জন্য তো বেলপাতাও জুটে নি। পঞ্চদশ পরিচ্ছেদে, "আর একবার প্রণাম করিয়া চন্দ্রমুখী কাঁদিয়া কক্ষান্তরে পলাইয়া গেল।"  ব্যাস্, ছাড়াছাড়ি ! প্রণয়াস্পদের সঙ্গে আমৃত্যু বিরহযন্ত্রনার 'অভিশাপ' শিরোধার্য করে চিরান্ধকার কক্ষান্তরে আত্মনির্বাসন !
যদিও ষোড়শ পরিচ্ছেদে দেবদাস চন্দ্রমুখীকে শেষ চিঠি লিখেছিল, "বউ, মনে করিয়াছিলাম, আর কখনো ভালবাসব না। একে তো ভালবেসে শুধু হাতে ফিরে আসাটাই বড় যাতনা, তার পরে আবার নূতন করে ভালবাসতে যাওয়ার মত বিড়ম্বনা সংসারে আর নাই।"  এখানেও শরৎবাবু বলে দিলেন, "প্রত্যুত্তরে চন্দ্রমুখী কি লিখিয়াছিল তাহাতে আবশ্যক নাই।"
এই প্রকার বাক্যবিন্যাস সুমহান সাহিত্যস্রষ্টাদের পরিচয়বাহী। 'দেবদাসের মৃত্যু'র একটি জীবনের অসহনীয় বিয়োগান্তক পরিণতি --একথা মর্মবিদারী কিন্তু তার জীবনের সঙ্গে প্রেমের-সম্পর্কে যে দুটি নারী জড়িয়ে ছিল তারাও যে তারই সঙ্গে, তাদের প্রেমের নিষ্ফলা অপমৃত্যু বরণ করে শববাহী মান্দাসে আরোহণ করেছিল --- এ কথাও তো সত্য, এবং শুধু সত্যই নয়, মৃত প্রেমের স্মৃতি বুকে ধ'রে বাকি জীবনটুকু ব'য়ে ব'য়ে শেষে অশ্রুনদীর সুদূর কোন্ পাড়ে গিয়ে চিতায় চড়েছিল। তাই স্রষ্টার সৃষ্টিতে 'উপেক্ষিতা' থেকে আরো নিবিড়ভাবে তারা পাঠকের অন্তরে ঠাঁই নিয়েছে। এখানেই মনে হয়, অন্ততঃ মর্ত্য-জীবনের প্রতি অমর আসক্তি নিয়ে যারা বাঁচে কোথাও কি আছে তার শেষ সার্থকতা ! হয়তোবা আছে ; যারা 'স্থিরত্বমিচ্ছন্তি' তারা যেন মৃত্যুকে নিয়েও বাঁচতে চায়। বেঁচে থাকতে হয়ও, যেমন বাঁচতে হয়েছিল কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধভূমিতে অভিমন্যুর মৃত্যুর পর অন্তঃসত্ত্বা উত্তরাকে ; আবার উত্তরার আসন্ন সন্তানকে পালন করার জন্য আপন সন্তান-মৃত্যুর মহাশোক বুকে জ্বালিয়ে রেখে বাঁচতে হয়েছিল সুভদ্রাকে। পারুকেও নিত্যদিনের মরণ নিয়েই বাঁচতে হয়েছিল ভরা সংসারের ভার বইবার জন্যেই। এ সমস্ত জীবন তো জীবন্ত হয়েও মৃতবৎ ! এমনই সব অনেকানেক করুণ মৃত্যুর উদাহরণ আছে শরৎ সাহিত্যের পাতায় পাতায়। তাঁর ছোট গল্প 'অভাগীর স্বর্গ'এর অভাগীর স্বর্গলাভের মোহে মৃত্যুবরণ, 'বিলাসী' গল্পে মৃত্যুঞ্জয়ের মৃত্যু ও মৃত্যুঞ্জয়ের শোকে বিলাসীর আত্মহনন ; এমনকি মনুষ্যেতর জীব 'মহেশ'এর পালকের হাতে নিধনের মত অপমৃত্যুগুলির দায় আখেরে দুঃখ, দারিদ্র্য, হতাশা, সামাজিক বৈষম্য ও ক্রূরতার উপর বর্তালেও সে সব মৃত্যুর অন্তর্গূঢ় কারণ তো ভালোবাসাই। আমরা যাকে বলতে চাই সংসারটিকে যতই ভালোবাসো অন্তিমে 'মৃত্যুই সত্য, জগৎ মিথ্যা !'

ভিন দেশের কাব্যসাহিত্যের মৃত্যুর ভাষাচিত্র

এই যে কিছুক্ষণ আগে রোহিনীর মৃত্যুর কথা আলোচনা করেছিলাম না -- তখন 'ওথেলো'র ডেসডিমোনার কথা মনে পড়েছিল।
"রোহিনী বলিল, মরিব না, মারিও না। চরণে না রাখ, বিদায় দেও।
গোঃ। দিই।
এই বলিয়া গোবিন্দলাল পিস্তল উঠাইয়া রোহিনীর ললাটে লক্ষ্য করিলেন।
রোহিনী কাঁদিয়া উঠিল। বলিল, মারিও না! মারিও না। আমার নবীন বয়স, নূতন সুখ। আমি আর তোমায় দেখা দিব না, আর তোমার পথে আসিব না। এখনই যাইতেছি। আমায় মারিও না।
গোবিন্দলালের পিস্তলে খট্ করিয়া শব্দ হইল। তার পর বড় শব্দ, তার পর সব অন্ধকার ! রোহিনী গতপ্রাণা হইয়া ভূপতিতা হইল।"
এবার সাহিত্যবিশ্বের স্বরাট, মানবচরিত্রের অন্তর্দ্বন্দ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ নাট্যকার সেক্ষপিয়রের একটি সৃষ্টি:

 
"Des.O, banish me, my lord, but kill me not! 
Oth. Down strumpet.
Des. Kill me to-morrow ; let me live to-night.
Oth. Nay, an you strive ----
Des. But half an hour !
Oth. Being done, there is no pause.
Des. But while I say one prayer !
Oth. It is too late.    (Smothers her).
Des. O lord, lord, lord !"
                 (Othello ; Act 5, Scene 2)


যদিও স্থান, কাল, চরিত্র, বিষয় ও ভাষার দুরধিগম্য দূরত্ব বিদ্যমান তবু এই হননক্রিয়ার নৃশংসতা একই প্রকার বীভৎস, নারকীয়।
এমনই আরও বহু জিঘাংসা, রিরংসা, হিংসা, প্রতিহিংসা-জনিত রক্তপিপাসা, রক্তপিপাসুর নিরাবরণ চিত্রই না অঙ্কন করে গিয়েছেন এই দৈবদৃষ্টিসম্পন্ন মহান স্রষ্টা, চিত্রায়িত করেছেন মৃত্যুর অনিবার্যতা। 

"To be or not to be, that is the question : Whether 'tis nobler in the mind to suffer
The slings and arrows of outrageous fortune,
Or to take arms against a sea of troubles,
And by opposing them ? To die, to sleep--
No more ; and by a sleep to say we end
The heart-ache, and the thousand natural shocks
That flesh is heir to. 'Tis a consummation Devoutly to be wish'd. To die, to sleep ;
To sleep, perchance to dream. Aye, there's the rub ;
For in this sleep of death what dreams may come,
When we have shuffled off this mortal coil,
Must give us pause...." 

Hamlet-এই দীর্ঘ ভাষণের (এটি স্বগতোক্তি‌, soliloquy) মধ্যে ধ্বনিত হয়েছে মৃত্যু সম্পর্কে নাট্যকারের অন্তর্লোকের উপলব্ধি। 'হওয়া' বা 'না-হওয়া', 'থাকা' বা 'না-থাকার' অর্থ কি ? 'থাকা' বা বেঁচে থাকার মানে হোল তো তাই -- ভয়ঙ্কর, অজানা, অপ্রত্যাশিত নিয়তির (fortune) ছোঁড়া তীক্ষ্ণ তীর আর কঠিন প্রস্তরখন্ডের আঘাতে জর্জরিত হয়ে থাকা, বা জীবনের অসংখ্য, অনন্ত কষ্টের, যন্ত্রণার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করা। কিন্তু পূর্ণরূপে এই অন্তহীন প্রতিকূলতাকে প্রতিহত করতে হলে এক মাত্র উপায় -- to die, to sleep-- no more ; হয় মরণকে বরণ কর ; নয় (চিরকালের) নিদ্রার আশ্রয় নাও। মানুষ হয়ে জন্মেছ ; অতএব অনুপেক্ষণীয় ভাবে ভোগ করতে হবে মানসিক ক্লেশ, দৈহিক পীড়া এবং শোক ও সন্তাপ। সুতরাং মৃত্যু, মৃত্যুই জীবন সংগ্রামের চরম পরিসমাপ্তি, একমাত্র পরিপূর্ণতা বলে ভক্তিভরে' বরণ করতে হবে--''Tis consummation Devoutly to be wish'd''. মৃত্যু তো ঘুমেরই বিকল্প কিন্তু মৃত্যুরূপী ঘুম আনতে পারে দুঃসহ দুঃস্বপ্নের বিভীষিকাও --- এবং তা আত্মহননের প্রবৃত্তির বাধা হয়ে দাঁড়ায় --acting as a 'rub' or obstacle to suicide. (খ্রিষ্টীয় ধর্মদর্শনের দিকে ইঙ্গিতবাহী উচ্চারণ (utterance).

"To sleep, perchance to dream. Ay, there's
           the rub ;
For in that sleep of death what dreams may come,
When we have shuffled off this mortal coil,
Must give us pause."
'Hamlet- এর এই দীর্ঘ স্বগতোক্তির মধ্যে জীবন, মৃত্যু ও আত্মহননের উপর সুগভীর আত্মমগ্নতাজনিত দার্শনিক ‌উপলব্ধি অভিব্যক্ত হয়েছে। সমগ্র স্বগতোক্তিটির মধ্য দিয়ে অনুরণিত হয়েছে জীবনের মূল্য কি ? জীবন থাকলেই বা কি জীবন গেলেই বা কি ? "That's the question"-- unsolvable, unknowable. 

জীবন ও জগতের প্রতি এরূপ চিন্তা 'শূন্যবাদে'র দিকে নিয়ে যায় যা আমরা প্রবন্ধের প্রথমেই, বৌদ্ধ দর্শনের নির্বাণতত্বের আলোচনাকালে বলেছি। পাশ্চাত্য চিন্তায় যাকে Nihilism-- নাস্তিক্যবাদ বা ধংসবাদ বলা হয়েছে। মৃত্যুই একমাত্র সত্য, জীবনের কোন পরম লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য নেই ; শুধুমাত্র কিছুদিন, কালের একটি ভগ্নাংশ খণ্ডে, যার আবার নিশ্চয়তা বলে কিছু নেই, কোলাহলপূর্ণ পৃথিবীতে বেঁচে থেকে শেষ হয়ে যাওয়া ! মহানাট্যকার এমন কথা আরও তীব্রতর, তীক্ষ্ণতর ভাবে বলেছেন তাঁর 'ম্যাকবেথ' নাটকে--- 

মানসিকভাবে বিধ্বস্ত ম্যাকবেথ (... Direness, familiar to my slaughterous thoughts, cannot once start me). ওদিকে অন্দরমহল থেকে ভেসে আসছে কান্নার রোল। (স্রষ্টার সৃষ্টিতেই যাই)--
"Re-enter Seyton.
Mach. Wherefore was that cry ?
Sey. The queen, my lord, is dead.
Mac, She should have died hearafter ;
There should have been a time for such a ward.
Tomorrow, and tomorrow, and tomorrow,
Creeps in this petty pace from day to day
To the last syllable of recorded time,
And all our yesterdays have lighted fools
The way to dusty death. Out, out, brief  candle !
Life is but a walking shadow, a poor player,
That struts and frets his hour upon the stage,
And then is heard no more ; it is a tale
Told by an idiot, full of sound and fury,
Signifying nothing."
"হায়, চলমান ছায়া এ জীবন।
বিশ্বরঙ্গমঞ্চে দর্পভরে হাঁটে কিছুক্ষণ,
অস্থির চিত্তে, দুর্ভাবনার বিড়ম্বনা সহ্য করে' করে'
হেঁটে-চলে ঘুরে বেড়ায় বরাদ্দকৃত
ক্ষণিক সময়কাল টুকু --  
তারপর হারিয়ে যায় চির-নৈঃশব্দ্যের অন্তরালে,
মুছে দিয়ে চিরতরে পদচিহ্ন তার !" ৩
একেবারেই নিষ্ঠুর সত্যের নিরাবরণ ভাষামূর্তি ; যেমন পিকাশোর (Pablo Picasso 1881- 1973) 'চুম্বন' (the kiss), জীবন-মৃত্যুর মায়া-ছায়ার আলিঙ্গন !

(বাকি অংশ পরবর্তী ৪র্থ পর্বে)
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১৫/০২/২০২৬
কলকাতা।
_____________________________________

















শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

মৃত্যু সত্য জগৎ মিথ্যা-- পর্ব ২

মৃত্যু সত্য, জগৎ মিথ্যা -- পর্ব ২ 

এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা মাত্র, 'এই যে আমি লিখছি, তুমি পড়ছো' -- এই ক্রিয়া দুটি স্তব্ধ হয়ে যাবার কথা। এই যে এতোদিন আশায়-আকাঙ্ক্ষায়, স্নেহে- প্রেমে, রাগে-অনুরাগে, বন্ধুত্বে-বৈরিতায় আমরা এই পৃথিবীতে রয়েছি, এ ধরার রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ ভোগ করেছি ও করছি -- সবই কি একদিন -- একদিনই বা বলি কেন, যে কোন মুহূর্তে 'না' হয়ে যাবে, এবং যাবেই !
"পথের শেষ কোথায়, শেষ কোথায়, কী আছে শেষে !
      এত কামনা, এত সাধনা কোথায় মেশে।
ঢেও ওঠে পড়ে কাঁদার, ‌ সম্মুখে ঘন আঁধার,
পার আছে গো, পার আছে,  পার আছে কোন দেশে।
আজ ভাবি মনে মনে  মরীচিকা অন্বেষণে, হায়,
বুঝি তৃষ্ণার শেষ নেই। মনে ভয় লাগে সেই--
হাল-ভাঙা পাল-ছেঁড়া ব্যথা চলেছে নিরুদ্দেশে।।"                                                                 -

'ঢেও ওঠে পড়ে কাঁদার' -- এইটিই বাস্তব, এইটিই জীবনের মৃত্যুভীতির হাহাকার ! পিতা- মাতা চায় জীবনের জন্ম দিতে, সেই জীবনকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং 'জীবনে'র নিত্যদিনের, প্রতিটি মুহূর্তর, পল-অনুপলের উচ্চকিত আর্তি, "আমি বাঁচতে চাই, আমি বাঁচতে চাই।" দুর্ঘটনায়, দুর্দৈবে, মন্বন্তরে, মহামারিতে, রাষ্ট্রীয়-সাম্প্রদায়িক-সামাজিক বিপর্যয়ে অর্ধমৃত, মুমুর্ষু মানুষ তার কণ্ঠস্বরের শেষ উচ্চারণে বলে যায়, "বাঁচাও, আমায় বাঁচতে দাও।" শুধু তাই নয়, জীবনকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য, দীর্ঘায়ু লাভের কামনায় মানুষ কত না উপায় খোঁজে, কত না নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান করে, এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাড়ি দেয়। ব্যাধিগ্রস্ত হলে, সহায়-সম্বল হারালে চিকিৎসক, বদ্যি, ধর্মগুরু, জ্যোতিষীদের শরণাপন্ন হয় ; মঠে, মন্দিরে, মশজিদে, গীর্জায় গিয়ে প্রার্থনা করে। মানুষের এ সমস্ত কর্মধারা ধাবিত হয় একমাত্র এই লক্ষ্যে যে সে যেন 'মৃত্যুকে' বলতে পারে, "না" ! অতি পরিচিত এই পরিণতি, 

"অহন্যহনি ভূতানি গচ্ছন্তি যমমন্দিরম্।
শেষাঃ স্থিরত্বমিচ্ছন্তি কিমাশ্চর্যমতঃ পরম্।।"

-- এ দৃশ্য প্রতিনিয়ত জীবিত মানুষেরা দেখছে। তবু তারা 'স্থিরত্বমিচ্ছন্তি', স্থিত হয়েই থাকতে চায়, বাঁচতে চায়। এটিই আশ্চর্য। এখানে নিত্য নিয়মিত মৃত্যু দেখে দেখেও বাঁচতে চাওয়ার মধ্যে আশ্চর্য এই যে 'জীবনের প্রতি এই ভালোবাসার' জন্ম হয় কি ভাবে এবং কেন যখন দেখি মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী ! তার বহু কারণের মধ্যে জীবনের একমাত্র প্রধান কারণ এই যে বিশ্বচরাচরের প্রতি আকর্ষণের বিহ্বলতা, আর বসুন্ধরার প্রতি ভালোবাসা - প্রেম। এই প্রসঙ্গে আমাদের অমর সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'কবি' উপন্যাসের কথা স্মরণে আসে। 

"....... নিতাইও নিজের দুই হাতের বন্ধনের মধ্যে দুর্বল শিশুর মত তাহাকে (বসন্তকে) গ্রহণ করিয়া বলিল --  ভয় কি ? রোগ হ'লেই কি মরে বসন ? শরীর সারলেই --- ও রোগ ভালো হয়ে যাবে।
এবার সে এক বিচিত্র হাসি হাসিয়া বসন্ত নীরবে শুধু ঘাড় নাড়াইয়া জানাইয়া দিল -- না না না। কিছুক্ষণ পরে মুখ ফুটিয়াছে বলিল --আমি আর বাঁচবো না !
তারপর হঠাৎ বলিয়া উঠিল --- আমি জানতাম কবিয়াল ! যেদিন সেই গান তোমার মনে এসেছে ---সেই দিনই জেনেছি আমি।
---- কোন্ গান বসন ?
---- জীবন এত ছোট কেনে -- হায় !
ও ঝর ঝর করিয়া সে কাঁদিয়া ফেলিল। নিতাইয়ের ছোখে এবার জল আসিল। সঙ্গে সঙ্গে অসমাপ্ত গানটা আবার মনে গুঞ্জন করিয়া উঠিল ---
এই খেদ মোর মনে,
ভালবেসে মিটল না সাধ এ জীবনে।
হায় ! জীবন এত ছোট কেনে,
এ ভূবনে ?
কিন্তু গানটি অসমাপ্তই থাকছে। মৃত্যুতাড়িত জীবনের গান তো অসমাপ্তই !"

বসন্তের মৃত্যু আসন্ন ; সে কথা বসন্ত জেনে গিয়েছে, নিতাইও। ছটফট করছে বসন্ত। হঠাৎই কয়েক মুহূর্তের জন্য শান্ত হয়ে গেল সে। বড় বড় চোখ ছোট তার, সেই দুটি চোখ আরও বিস্ফারিত করে নিতাইয়ের মুখের দিকে তুলে বলল --- "আমি মরছি ?"
"নিতাই ম্লানহাসিমুখে তাহার কপালে হাত বুলাইয়া দিয়া এবার বলিল --- ভগবানের নাম --- গোবিন্দের নাম করলে কষ্ট কম হবে বসন।
---- না। ছিলা-ছেঁড়া ধনুকের মতো বিছানার উপর লুটাইয়া পড়িয়া বসন্ত বলিল ---না। কী দিয়েছে ভগবান আমাকে ? স্বামীপুত্র ঘরসংসার কী দিয়েছে? -- না।"

সাহিত্যের ভিতরে, গভীরে সমাজদর্শনের বাস্তব দৃষ্টিপাত করে তারাশঙ্কর বুঝিয়ে দিলেন কেন তিনি উপন্যাসে ও ছোট গল্পের অপরাজেয় শিল্পী। (অসহায় নিতাই বসন্তের এই অভিযোগ নিজের উপরই নিয়েছিল)। বসন্ত-নিতাইদের সম্প্রদায় নেহাতই লোকায়ত চিন্তাজগতের বসবাসকারী মানুষ। নিতাইয়ের ভগবান-গোবিন্দের উপর বিশ্বাস, জীবনের পরপারে ঈশ্বরের আশ্রয় প্রার্থনা --- এই যে ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কার --- সেটি উপনিষদীয় প্রজ্ঞার প্রকাশ নয়, যা প্রকৃতপক্ষে আমাদের, বিশেষ করে বাঙলার, চৈতন্য মহাপ্রভু সাধিত ও প্রচারিত 'প্রেমধর্মের'ই উচ্ছ্বাস। তাঁর প্রেম-ভক্তির অনুরাগরসসিক্ত ধর্মধারণা বাঙলার ঘরে ঘরে, আচণ্ডালে, আপামর জনসাধারণের মধ্যে কি যে বিপুল প্রভাব ফেলেছিল, ফেলেছে -- তারই মূর্তিমান উদাহরণ এই নিতাই। ভগবানের নাম --- গোবিন্দের নাম যে শেষের শান্তি, মৃত্যুযন্ত্রণা উপসমকারী --- লোকায়ত সমাজমানসেও তা বদ্ধমূল হয়েছে, হয়ে আছে। 

বসন্ত নিতাইয়ের কথা মেনেছিল। তারই প্রতি একান্ত ভালোবাসায়, তাকেই ভগবানের আসনে বসিয়ে তার আদেশ পালন করেছিল নিতাইয়ের বসন। " বসন্ত এপাশে ফিরিয়া তাহারই দিকে চাহিয়া বলিল --- গোবিন্দ, রাধানাথ দয়া কর। আসছে জন্মে দয়া ক'রো।"

"আসছে জন্মে" বসন্তের সাধ যেন মেটে। যেন সে 'স্বামীপুত্রসংসার' পায়। মৃত্যুর পর স্বর্গ চায়না বসন্তরা, চির অবলুপ্তিও (পরিণির্বান) মেনে নিতে পারেনা, অতৃপ্ত 'তৃষ্ণা' মেটাতে আবার এই 'মৃত্যুময়' পৃথিবীতেই ফিরে ফিরে আসতে চায়। 

বসন্ত নিতাইয়ের 'ভালবাসার সাধ না মেটার' আর্তনাদ  একজোড়া নরনারীর অন্তর থেকে বেরিয়ে এসে, সমগ্র প্রাণ জগৎকে ভাসিয়ে দিয়ে এক চিরবহমান, ভূমণ্ডলগ্রাসী অতলান্ত অশ্রুনদীর মত বইতে থাকে। নিরুত্তর আকাশের দিকে চেয়ে থাকে, মরীচিকার বিদ্রুপের মত আশার আলোকের উৎস খুঁজে, সঙ্গীতের সুর শুনে মনে হয়, "আমার আশেপাশে দাঁড়িয়ে কে যেন বিনিয়ে বিনিয়ে কাঁদছে।" 

বসন্ত মরে গেল। বসন্ত-হারা নিতাইয়ের বিরহবেদনার অন্তর্দাহী কথাশিল্প যাঁরা পড়েছেন তাঁরা জানেন। আমরা শেষ করবো এই কথা বলে যে বসন্তের সঙ্গে প্রেম-বিরহ সম্পর্ক নিতাইকে শুধু আরো আবেগময় কবি করে তুলেছিল, এমন নয়, তাকে দার্শনিকও করে তুলেছিল ; কিন্তু এমন এক 'দর্শন' সে লাভ করেছিল যাকে লোকায়তিক 'প্রেমের দর্শন'  বলাই যুক্তিযুক্ত। সে গান বেঁধেছিল-- 

"মরণ তোমার হার হোল যে মানের কাছে
ভাবলে যারে কেড়ে নিলে সে যে দেখি
মনেই আছে
মনের মাঝেই বসে আছে।..." 

এই স্মরণের মাধ্যমেই 'মৃত্যু' জীবনের কাছে একদিকে যেমন হার মানে, তেমনি মৃত্যুপথযাত্রীকেও 'নরক' নামক কাল্পনিক, ধর্মীয় সংস্কার-লালিত, নিরন্তর চিতাবহ্নিপ্রজ্বলিত দেশে চিরনির্বাসনের আতঙ্ক থেকে শেষ মুহূর্তের মুক্তি দিয়ে যায়। না যদি এমন হোত, তবে 'জীবন', নিরানন্দঘেরা অন্ধকার হতাশায়, অলস নৈষ্কর্মের মধ্যে দুটো দিন বেঁচে থেকে স্তব্ধ হয়ে যেতো।

তারাশঙ্করের উপন্যাসে, ছোটগল্পে বহু মুমুর্ষু প্রাণের মৃত্যুযন্ত্রণা, মৃত্যুবোধ, মৃত্যুভীতির অনন্যসাধারণ সব বর্ণনা আছে। সে সব স্থানে লেখকের অন্তর্দেশের অনুভব, অনুভূতি, আসন্ন মৃত্যুর শেষ-শয্যায়-শায়িত চরিত্রগুলির সঙ্গে তাঁর একাত্মতা এমন মরমী ভাষায় প্রকাশ পেয়েছে যার তুলনা বিপুল বাঙলা সাহিত্যের ভাণ্ডারে দুর্লভ। এমনকি ভিন দেশের সাহিত্যে সহজলভ্য নয় এবং তা এই কারণেই যে সেখানে মৃত্যুর বিভীষিকাময় রূপের প্রাধান্যই বেশি। জীবনের এই যে ট্রাজিক পরিণতি--  মৃত্যু, তার ভয়ানক সব চিত্রকল্প আমরা পেয়েছি গ্রীস দেশের প্রাচীন নাট্যকারত্রয়ী এসকাইলাস (Aeschylus, আনু. ‌৫২৫-৪৫৬ খ্রিঃ পূঃ), ইউরিপিদিস (Europides, আনু. ৪৮৫- ৪০৬ খ্রিঃ পূঃ) ও সোফোক্লিসের (Sophocles, আনু. ৪৯৭-৪০৬)  রচনায়। এই সকল নাটকগুলির বিষয়বস্তুই ছিল মানুষের ইচ্ছা ও ভাগ্যের দ্বন্দ্ব, অনুপেক্ষণীয় নিষ্ঠুর দৈব প্রভাব (দেবতাদের দ্বারা মানুষের জীবন ও ভাগ্যের নিয়ন্ত্রণ), আত্মদর্পের নির্মম পরিণাম, পারিবারিক এবং রাজনৈতিক বিদ্রোহ, বিপজ্জনক অহংকার ও ঔদ্ধত্য (arrogance). এবং এই নাটকের শেষ অঙ্কে দর্শকদের অন্তর জুড়ে জেগে ওঠে এক অদ্ভুত অনুভূতি যাকে সমালোচকেরা বলেছেন catharsis -- আবেগের মুক্তি ও হতভাগ্যের প্রতি করুণা।
কিন্তু এই 'catharsis' এমন এক করুণা যার সঙ্গে যুক্ত থাকে নিজেকে শান্ত করার অদম্য আগ্রহ। অপরদিকে মৃত্যুর ট্রাজিক যন্ত্রনা-ভোগকারীর প্রতি সহমর্মিতা বোধে একাত্ম-হয়ে-যাওয়া ভারতীয় সমাজের অতি কোমল, দরদী আকুলতা মূর্ত হয়ে ওঠে তারাশঙ্কর, শরৎচন্দ্রের সৃষ্টিতে। আলোচনা সামান্য দীর্ঘায়িত করে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুচেতনা, যা অন্তিমে উপনিষদীয় পূর্ণতার আলোকাশ্রয়ী--(তাঁর অন্তর্বেদনার গভীরের এবং ব্যপ্তির কথা, নানা সুরের কথা, ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তিত, বিবর্তিত হওয়ার কথা এই স্বল্প পরিসরে অসম্ভব তো বটেই, এমনকি সে কথা আলোচনা করবার ধৃষ্টতাও আমার নেই)-- তেমনই যেন তারাশঙ্করের সৃষ্টিতে কোথাও কোথাও লক্ষ্য করা যায়।
"তাই 'আরোগ্য নিকেতন' উপন্যাসে মৃত্যুর রূপ-কল্পনা উপনিষদের প্রভাবপ্রসূত বললে ভুল বলা হয় না। মৃত্যুর জন্য শান্ত সমাহিত প্রতীক্ষার ধ্যান অসম্ভব কিছু নয়। মৃত্যু চুড়ান্ত কোনও অবসান নয়, এই প্রত্যয়ে যদি কেউ স্থিত হতে পারেন, মৃত্যু জীবনেরই সহায়ক এবং সূর্য যেমন জগতের ও জীবনের পরিপোষক, তেমনই যম তথা মৃত্যু ও জগতের ও জীবনের নিয়ামক, মৃত্যুর ধারাই প্রাণধারার অপরিহার্য পরিপূরকমাত্র, এই যদি 'সত্য' হয়, যা হলে সত্যনিষ্ঠ মুমূর্ষুর শান্ত-সমাহিত প্রার্থনা বা উপাসনার ভাষায় সূর্য ও যম তথা জীবন ও মৃত্যু একাকার হয়ে উঠতে, পরস্পরের পরিপূরক হয়ে উঠতে বাধা কোথায় ?...." 

এই উপন্যাসের অষ্টাদশ পরিচ্ছদে আমরা দেখি, বিগত রাত্রির দীর্ঘ, চিন্তান্বিত জাগরণের ফলে সকালবেলা দেরিতে ঘুম ভেঙেছে জীবনমশাইয়ের। জেগে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর মনে পড়ে গেল গণেশ ভটচাজের সেই অসুস্থ মেয়েটির কথা। উৎকণ্ঠিত বোধ করলেন -- কেমন আছে সে ! কিন্তু শান্তচিত্তে উৎকণ্ঠা প্রশমিত করে, "হাত জোড় করে জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন, -- নমঃ বিবস্বতে ব্রাহ্মণভাস্বতে বিষ্ণুর্তেজসে জগৎসবিত্রে সূচয়ে সবিত্রে কর্মদায়িনে -- নমঃ।

মৃত্যুধ্রুব এই পৃথিবীতে এত চঞ্চল হলে চলবে কেন ?"
বস্তুত 'আরোগ্য নিকেতন' উপন্যাসে "ভারতীয় দৃষ্টিতে মৃত্যুকে তিনি যে ভাবে বিশ্লেষণ করেছেন, তাতে তাঁর নিষ্ঠা ও পাণ্ডিত্যের গভীর পরিচয় থাকলেও সেই বিশ্লেষণ প্রাণের প্রাচুর্যে উদ্দীপ্ত নয়, জীবনরসরসিকতায় অভিসিঞ্চিত নয়। ভারতীয় ঐতিহ্যেকে, এক্ষেত্রে উপনিষদিক মৃত্যুভাবনাকে (সঙ্গে তো কবিরাজি ও পাশ্চাত্য চিকিৎসাবিধির তথা পূরাতন ও নূতন দৃষ্টিভঙ্গির দ্বন্দ্বের চিত্র আছেই) প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য কৃতসঙ্কল্প লেখকের উদ্যোগ আয়োজন বেশ প্রকটরূপেই অনুভূত হতে থাকে।"
অবশ্য তাঁর ও পূর্ব পূর্ববর্তী, বাঙলার উপন্যাসের আলোকবর্তিকা প্রদর্শক ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও 'মৃত্যু' প্রতি তাঁর রচনায় ওই 'স্বর্গলোকের' প্রলোভনই দেখিয়েছেন। তাঁর 'চন্দ্রশেখর' উপন্যাসে 'মহাভারতের' শব-আকীর্ণ কুরুক্ষেত্রের মতো এক মৃত্যু- প্রান্তরের দৃশ্য উৎকীর্ণ করেছেন।
" চন্দ্রশেখর বলিলেন, "আমি প্রতাপের জন্য অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হইতেছি।
রামানন্দ স্বামী বলিলেন, "আমি তাহার তত্ত্ব লইয়া আসিতেছে।
এই বলিয়া রামানন্দ স্বামী চন্দ্রশেখর ও শৈবলিনীকে বিদায় করিয়া দিয়া যুদ্ধক্ষেত্রাভিমুখে যাত্রা চলিলেন।সেই ধূমময় আহতের আর্তচিৎকারে ভীষণ যুদ্ধক্ষেত্রে অগ্নিবৃষ্টির মধ্যে, প্রতাপকে ইতস্ততঃ অন্বেষণ করিতে লাগিলেন। দেখিলেন, কোথাও শবের উপর শব স্তূপাকৃত হইয়াছে --- কেহ মৃত, কেহ অর্ধমৃত, কাহারও অঙ্গ ছিন্ন, কাহারও বক্ষ বিদ্ধ, কেহ 'জল ! জল !' করিয়া আর্তনাদ করিতেছে --- কেহ মাতা, ভ্রাতা, পিতা, বন্ধু প্রভৃতির নাম করিয়া ডাকিতেছে। রামানন্দ স্বামী সেই সকল শবের মধ্যে প্রতাপের অনুসন্ধান করিলেন, পাইলেন না। ........ পরে একজন পলায়নপর সিপাহীর কাছে 'কেবল একজন বীর হিন্দু যোদ্ধার' কথা শুনে, যখন 'আহত, মৃতপ্রায়, তখনো জীবিত' প্রতাপের সন্ধান পেয়েছিলেন তখন প্রতাপের শেষের কথাগুলি বাংলা সাহিত্যে এই প্রথম একটি বিশেষ দিক নির্দেশ করে, যার উপলক্ষ্য 'ভালোবাসার জন্য মৃত্যুবরণ'। 

"কি বুঝিবে, তুমি সন্নাসী ! এ জগতে মনুষ্য কে আছে যে আমার এ ভালোবাসা বুঝিবে ? কে বুঝিবে, আজি এই ষোড়শ বৎসর, আমি শৈবলিনীকে কত ভালোবাসিয়াছি। পাপচিত্তে আমি তাহার অনুরক্ত নহি --- আমার ভালোবাসার নাম --- জীবন বিসর্জনের আকাঙ্ক্ষা।..... এ জন্মে এ অনুরাগে মঙ্গল নাই বলিয়া, এ দেহ পরিত্যাগ করিলাম।" 

কিন্তু এই 'মানবিক ভালবাসার' মধ্যে পাপ-পুন্য  বিচারের অবতারণা করা হয়েছে যা ভারতের বৈদিক ও বৈদান্তিক ধ্যানধারণার প্রকাশ পেয়েছে যা কিছুটা ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রের আর্য মূল্যবোধের প্রতি ঝোঁক (তাঁর গীতার ব্যাখ্যায়, 'কৃষ্ণচচিত্রে' লক্ষ্যণীয়) এবং তাইই যেন উদ্ঘোষিত হয়েছে রামানন্দ স্বামীর প্রতাপের প্রতি বিদায়বাণীতে,
"...... ইন্দ্রিয়জয়ে যদি পুণ্য থাকে, তবে অনন্ত স্বর্গ তোমারই। যদি চিত্তসংযমে পুণ্য থাকে, তবে দেবতারাও তোমার তুল্য পুণ্যবান্ নহেন। যদি পরোপকারে স্বর্গ থাকে, তবে দধীচির অপেক্ষাও তুমি স্বর্গের অধিকারী। প্রার্থনা করি, জন্মান্তরে যেন তোমার মত ইন্দ্রিয়জয়ী হই।

রামানন্দ স্বামী নীরব হইলেন। ধীরে ধীরে প্রতাপের প্রাণ বিমুক্ত হইল। তৃণ-শয্যায় অনিন্দ্যজ্যোতিঃ স্বর্ণতরু পড়িয়া রহিল।"
এবার ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্রের মন্তব্য,
"তবে যাও, প্রতাপ, অনন্তধামে। যাও, যেখানে ইন্দ্রিয়জয়ে কষ্ট নাই, রূপে মোহ নাই, প্রণয়ে পাপ নাই,  সেইখানে যাও ! যেখানে সুখ অনন্ত, প্রণয় অনন্ত, সুখে অনন্ত পুণ্য, সেইখানে যাও। যেখানে পরের দুঃখ পরে জানে, পরের ধর্ম পরে রাখে, পরের জয় পরে গায়, পরের জন্য পরকে মরিতে হয় না, সেই মহৈশ্বৈর্যময় লোকে যাও ! লক্ষ শৈবলিনী পথপ্রান্তে পাইলেও, ভালোবাসিতে চাহিবে না।"


আমরা দেখলাম মুমুর্ষু, অর্ধমৃত, শোণিতলাঞ্ছিত শবদেহের স্তুপ পেরিয়ে গেলেন রামানন্দ স্বামী --- কেমন যেন নির্বিকার, পৌঁছে গেলেন আসন্নমরণ প্রতাপের কাছে, 'প্রতাপের শৈবলিনীর প্রতি ভালোবাসার' কথাও যা হোল এবং অন্তিম সময়ে প্রাণহীন প্রতাপের জন্য যে আশীর্বাদ বাণী তিনি ব্যক্ত করলেন -- সমস্তটির মধ্যে মর্ত্যলোকের জীবনের প্রতি মোহ, জীবনের যন্ত্রণার প্রতি মর্মান্তিক ব্যাকুলতা, মৃত্যুজনিত শোকোচ্ছ্বাস যেন শীতলতায় নির্জীব, ঔদাসীন্যে পাষাণ!

কিন্তু তারাশঙ্করের 'কবি' এমন এক লোকায়ত জীবনের উপন্যাস যেখানে মৃত্যুর ভাবনা, মৃত্যুর অকাল সংঘটন অনেক বেশি উষ্ণ, বিয়োগান্তক ও মানবিক। ঠিক যেমন শরৎচন্দ্রের 'দেবদাস' উপন্যাসটিতে আমরা পাই।  লোকায়ত ভাবনায় মৃত্যুর রূপ কী নিদারুণ, বিয়োগান্তক ও দুঃসহ বেদনাবোধের জন্ম দেয় ----
(রচনার পরবর্তী ৩য় পর্বে তা আলোচিত)

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১২/০২/২০২৬
কলকাতা।



















রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

মৃত্যু সত্য জগৎ মিথ্যা পর্ব ১

মৃত্যু সত্য‌, জগৎ মিথ্যা--পর্ব ১


আমি বেঁচে আছি, তাই জগৎসংসার আছে। আমি নেই এই জগৎসংসার নেই। এও তো সত্য।
আমি জানি, আমার আজকের এই আলোচনার 'শীর্ষক' অত্যন্ত রূঢ়, ভীতিপ্রদ, অনাকাঙ্ক্ষিত এবং বিকর্ষণধর্মী, নিষ্প্রাণধর্মী (sickening) মনে হওয়াই স্বাভাবিক ; কিন্তু ভেবে দেখলে এর চাইতে চরম সত্য, এর চাইতে ধ্রুব বাক্য আর কিছুই হতে পারে না। 'জন্ম' হয় জন্মদাতার এবং জন্মদাত্রীর দেহজ ও মনোজ বাসনার বা ইচ্ছার উপর নির্ভর করে ; অর্থাৎ যে প্রাণকণিকাটি জাত হচ্ছে তার জন্ম হতেও পারে বা না-হতেও পারে, কিন্তু একবার প্রাণযুক্ত প্রাণীরূপে জন্ম গ্রহণ করলে তাকে মৃত্যু বরণ করতেই হবে। এই নিশ্চিত পরিণাম নিজের বা অপরের 'ইচ্ছার' দ্বারা এড়ানো সম্ভব নয়। জন্ম হলেই, জীবনের সূচনা থেকেই মরণের অজস্র হেতু এসে উপস্থিত হতে থাকে এবং একদিন অকস্মাৎ 'মরণরূপী' শিকারীর তীর এসে স্পন্দিত হৃৎপিণ্ডটিকে স্তব্ধ করে দেয়। "অন্তবন্ত ইমে দেহাঃ.. এই দেহসকল বিনাশশীল.."  --- এইটিই সত্য। এর পরে কি ?
এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার শুরু থেকেই আরম্ভ হয়েছে মানুষের দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক পথের সন্ধান। আমাদের ভারতীয় ধর্মধারণা ও দর্শন চিন্তায় 'আত্মা' নাম দিয়ে একটি 'ধারণার' সৃষ্টি হয়েছে। ঋক্ বেদের সময়কাল থেকে যার যাত্রা, ব্রাহ্মণগন্থগুলি, আরণ্যক, সর্ব উপনিষদ হয়ে শ্রীমদ্ভগবদগীতায় সেই 'ধারণা' প্রাঞ্জল ভাষায় উদ্ঘোষিত হয়েছে, যেখানে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন, "শরীরের বিনাশ হয় ; কিন্তু আত্মার মৃত্যু নেই।"
"ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিৎ
না অয়ং ভূত্বা ভবিতা বা না ভূয়ঃ।
অজো নিত্যঃ শ্বাশ্বতোহয়ং পুরাণো।
ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে।। (২/২০)"
এই আত্মা কোন এক কালে জন্মগ্রহণ করেন এমন নয়,  কোন কালে তাঁর মৃত্যু হবে এমনও নয়, আত্মা সৃষ্ট হয়ে আবার সত্ত্বাবান্ হয়ে ওঠে তাও নয় ; কেননা আত্মা জন্মরহিত, নিত্য, শাশ্বত ও চির পূরাতন। শরীর বা দেহের বিনাশ হয়, কিন্তু আত্মার বিনাশও হয় না, আত্মা বিনষ্টও হয় না।
এবার এই 'আত্মা' নামক রূপহীন, গুণহীন, অক্ষয়, অব্যয় এক বায়বীয় 'ধারণা'র উপর নির্ভর করে জীবনের পরিণাম সম্মন্ধে আশাবাদী 'সুখ' কতক্ষণ লালন করা যায় ? তাই ওই গীতোক্ত 'ধারণা', যা সকল বৈদান্তিক মতবাদের সংক্ষিপ্ত রূপ, সেই 'আত্মা'র অস্তিত্বকেই অস্বীকার করেছেন পরবর্তী কালের বৌদ্ধ, জৈন, চার্বাক প্রভৃতি দার্শনিক তত্ত্বগুলি। বৈদান্তিকদের এই 'আত্মা', শুধুমাত্র জীবের মৃত্যুহীন অস্তিত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি, তাঁরা বলেছেন এই জীবাত্মাই 'পরমাত্মা'র সঙ্গে এক হয়ে থাকেন। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে ব্যপ্ত হয়ে আছেন সেই পরমাত্মা যাকে বেদান্ত (সমস্ত উপনিষদ, আরণ্যক ও ব্রাহ্মণ সংহিতা) 'ব্রহ্ম' নামে উচ্চারণ করেছেন। 'ব্রহ্ম' এমন একটি 'ধারণা' - যাঁর ব্যাখ্যা তো সুদূরের কল্পনা, তাঁর সম্মন্ধে কিছু বলা মানেই তাঁকে না-জানা ;  কেননা তিনি 'অবাঙনসোগোচর' -- বাক্যে তাঁর বর্ণনা করা যায় না, মনের দ্বারাও তিনি গোচরীভূত হন না, এমনকি তিনি অচিন্তনীয়। তিনি ত্রিগুণাতীত (সত্ত্ব রজঃ তমঃ - এই তিন গুণ) ; অতএব জ্ঞানাতীত বা অজ্ঞেয়। (ভারতীয় দার্শনিক সমাজে 'অজ্ঞেয়বাদের' (পাশ্চাত্য দুনিয়ার T. H. Huxley, Herbert Spencer প্রভৃতি দার্শনিকগণ  যাকে 'Agnosticism, বা 'Religion of unknowable' বলেন), সৃষ্টি হয়েছে, এবং তাঁদের মতে যাঁর অস্তিত্ব বা অনস্তিত্ব জানার কোন উপায়ই নেই, যা প্রমাণের উপর নির্ভর করে না, তেমন ধারণা তো অপ্রয়োজনীয়, অনির্ভরযোগ্য, এবং অসত্য। অপরদিকে বৌদ্ধধর্মের 'মহাযানী শাখা', যা নাগার্জুন সবিস্তারে ও অতি গভীরে ব্যাখ্য করেছেন, বিশ্বাস করে যে চরম সত্য হোল সমস্ত কিছুই 'শূন্য'। শূন্যবাদ বা 'অনাত্মা' অতি জটীল কার্য-কারণ (প্রতীত্যসমুৎপাদ) সম্মন্ধে বাঁধা। আরেকটি কথা, জীব ও জীবের জীবন কোন অতিন্দ্রীয় শক্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বা নির্ধারিত নয়। মুক্তি বা মোক্ষ প্রদানকারী কর্তা (ব্রহ্ম, ঈশ্বর, ভগবান) বলেও কোন কিছুরই অস্তিত্ব নেই।
বৌদ্ধ দর্শন বিশ্বাস করে, জগৎসংসার দুঃখময়। "সব্বম্ দুঃখম।" আর এই দুঃখ এই জন্যই যে জীবন তো জন্ম, জরা, ব্যাধি ও মৃত্যুর অবশ্যম্ভাবিতায় গ্রস্ত ও কবলিত (eclipsed). মুক্তি কোথায় ? যদিও এই সর্বময় দুঃখ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার, নির্বাণ লাভ করবার কথাও তথাগত বলেছেন। তিনি বলেছেন, হ্যাঁ, দুঃখই একমাত্র সত্য, কেননা জীবের সকল সাধনা, কর্মপ্রচেষ্টা, সংগ্রাম ও প্রাপ্তি মরণের প্রতিক্ষায় থাকে। এক চরম ও পরম শূন্যতা। এই সমূহ দুঃখ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য তিনি চারটি সত্য (চতুঃসত্য) ও আটটি পথের কথা (অষ্টাঙ্গিক মার্গ) বলছেন। তিনি বলেছেন, দুঃখ আছে, দুঃখের কারণ আছে, দুঃখ নিরোধ করা যায়, দুঃখ নিরোধ করবার উপায় আছে। এই উপায়গুলিই হোল আটটি পথ বা অষ্টাঙ্গিক মার্গ ('সম্যক দৃষ্টি', 'সৎ সঙ্কল্প', 'সত্য ও সংযত বচন', 'সৎ কর্ম', 'আজীব' বা সৎ উপায় অবলম্বন করে জীবন অতিবাহিত করা, 'ব্যায়াম' (দেহ ও মনের উপর নিয়ন্ত্রণ), 'স্মৃতি' (নিজের দেহ রূপ, বেদনাবোধ ও চিত্ত-বিক্ষোভ সম্মন্ধে সচেতন থাকা) এবং 'সমাধি' (যার দ্বারা পরিনির্বাণ লাভ করা যায়)।
একেবারে রূঢ় বাস্তবতার নিরিখে তিনি জীবনকে দেখেছেন। আত্মা, পরমাত্মা, ব্রহ্ম বা ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকার করেন নি ঠিকই কিন্তু জগতের ও জীবনের অস্তিত্বকে অস্বীকার না করেও 'জীবকেই' আপন পরিণতির নিয়ন্ত্রক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং চেতনা-সম্পন্ন জীব মানুষকে বলেছেন এই সত্য স্বীকার করে নিতে যে মৃত্যু বা 'নিঃশেষ'কে বরণ করাই তার জন্য অবধারিত। বাসনার তাড়নায় বার বার জন্মলাভ, (বৌদ্ধ ধর্মদর্শন জন্মান্তরবাদের প্রবর্তক) বার বার জীবনযন্ত্রনা ভোগ করা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য কোন অলীক 'পরাশক্তির' সাধনা ব্যতিরেকেই আত্মসাধনার মধ্যে দিয়ে (অষ্টাঙ্গিক মার্গ অবলম্বন করে), দুঃখময়, যন্ত্রনাক্ষুব্ধ জীবন থেকে নির্বাণ লাভ করা যায়। এখানেও এ মৃত্যু বা জীবনের মহাপরিনির্বাণের কথাই বলা হয়েছে। সুতরাং মৃত্যুই সত্য। বৈদান্তিক মতবাদের সমর্থকদের ধারণায় ব্রহ্মই পরম সত্ত্বা, জীবন ও জগতের তিনিই উৎস, জগৎ ও জীবন সচ্চিদানন্দঘন ব্রহ্মেই লীন হয়ে চিরানন্দ ও চিদানন্দ লাভ করে -- বৌদ্ধ মতবাদ এই ধারণাকে অস্বীকার করেছেন কিন্তু সম্পূর্ণরূপে নস্যাৎ করে দিয়েছেন এমনও নয়। হাজার হাজার বছর ধরে 'বুদ্ধতত্ত্বের' উপর, বুদ্ধ ধর্মধারণার বিভিন্ন শাখা আলোচনা করেছেন, সমালোচনার করেছেন, তর্ক-বিতর্ক করেছেন এবং 'শূন্যবাদ' প্রতিষ্ঠা করেছেন। সে এক অসীম, গভীর জ্ঞানসমুদ্র। সে সবের উপর ভারতে, তিব্বতে, চিন, জাপান এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গবেষণা হয়েছে, বিভিন্ন গ্রন্থ রচনা করা হয়েছে। নাগার্জুন, চন্দ্রকীর্তি, ধর্মকীর্তি প্রভৃতির মত বৌদ্ধপণ্ডিতগণের অভ্যুত্থান ঘটেছে। মহাপণ্ডিত, জ্ঞানের বিচিত্র বিষয়ের উপর তপঃসিদ্ধ 'দ্বিতীয় বুদ্ধ' নাগার্জুন রচিত 'মূলমধ্যমককারিকা' এমন এক শূন্যবাদের (void or utter emptiness) বৌদ্ধিক ধারণার কথা বলেছেন যা 'মৃত্যুর' মতই পরম বিনাশ। ভগবান বুদ্ধের 'মহাপরিনির্বাণের' অন্তিমতাকে যখন তিনি বলছেন -- সে এক সমস্ত কামনা-বাসনা ত্যাগের মধ্যে দিয়ে জীবনচক্র পরিক্রমনের পর (মহাযানী পন্থা), গভীর সমাধির মধ্যে এক তৃষ্ণাবিহীন পরিসমাপ্তি -- এই পরিণাম বা 'মৃত্যু' তখন আর মৃত্যু বা যন্ত্রনাময়, শোক-তাপদগ্ধ অবস্থা নয়। মৃত্যু ও জীবন উভয়ই তখন  সত্যরূপে প্রতিভাত হবে। সে এক আলোকিত জগৎ যেখানে 'দুঃখের' নির্বাপণ। 'জীবন' দুঃখময়, মৃত্যু সকল দুঃখের পরিসমাপ্তি।
"অনেক দিনের অনেক কথা, ব্যাকুলতা, বাঁধা বেদনডোরে --
মনের মাঝে উঠেছে আজ ভ'রে।
যখন পূজার হোমানলে উঠবে জ্বলে একে একে তারা,
আকাশপানে ছুটবে বাঁধনহারা,
অস্তরবির ছবির সাথে মিলবে আয়োজন --
আমার ব্যথার পূজা হবে সমাপন।" 
বৌদ্ধচিন্তনের ব্যাখ্যায় নাগার্জুন যে 'পঞ্চস্কন্দ-এর' (রূপ, সংজ্ঞা, সংস্কার, বিজ্ঞান এবং বেদনা বা অনুভব) আলোচনা করেছেন, উদ্ধৃত রবীন্দ্র সংগীতের, "অনেক দিনের অনেক কথা, ব্যাকুলতা বাঁধা বেদনডোরে" -- মহাবাণীটিই হোল 'মহাযানী বৌদ্ধধর্মের' সেই 'বেদনাস্কন্দ'। পূজার হোমানলে বা জীবনের সাধনার মধ্যে দিয়ে, সমস্ত ক্ষণিকতাসর্বস্ব ভোগের বাসনা, অপূর্ণতার বেদনাবোধ যখন জ্বলে পুড়ে নিঃশেষিত হবে তখনই সেই দুঃসহ, জরা-ব্যাধি-মৃত্যুক্লিষ্ট জীবনের অবসান। এখানেও 'হোমানলের, অস্তরবির ছবির' কল্পচিত্রের মাধ্যমে এক আলোকিত অবস্থাপ্রাপ্তির কথা আছে যেখানে মৃত্যুযন্ত্রণা, মৃত্যুজনিত শোকোচ্ছ্বাসের মর্মান্তিক হাহাকার নেই।

লক্ষণীয়, বৌদ্ধ মতবাদ (যে তত্ত্বে আত্মা, পরমাত্মা বা ব্রহ্ম বা ঈশ্বরের স্বীকৃতি নেই) শেষ পারে অর্থাৎ নির্বাণ তত্ত্বে আরোহণ করে যখন 'শূন্যতা' (emptiness or utter void)-কে প্রতিষ্ঠা করছে তখন বেদান্তবাদের 'পূর্ণতা' সঙ্গে কোথায় যেন তার গভীর মিল। বৌদ্ধ ধর্মদর্শনের 'শূন্যবাদ' সৃষ্টির অস্তিত্বকে অস্বীকার করেছে এমন নয়, তবে হাজার হাজার বছরের সাধনায় এই সিদ্ধান্তে এসে উপনীত হয়েছে যে ভূতজগতে কোন বস্তু, এমনকি প্রাণেরও স্বাধীন সত্ত্বা নেই। বৌদ্ধদর্শনে হেতুবাদ বা কার্যকারণ মীমাংসা অতি কঠোর। সন্তানের (প্রাণের) জন্মের জন্য যেমন পিতা মাতা, ধরিত্রীর মত আশ্রয়, ধরিত্রীর সৃষ্টির জন্য যেমন সৌরমণ্ডল, সৌরমণ্ডলের সৃষ্টির জন্য যেমন নীহারিকা, ছায়াপথ এবং ক্রমান্বয়ে আরো কিছু, আরো আরো অজানা অনন্ত. ... কারণ আছে ; কিন্তু এ সকল কোনটিরও অস্তিত্ব চিরন্তন নয়, সকলের সৃষ্টির পিছনে আছে 'কার্যকারণ শৃঙ্খলা' -- 'প্রতীত্যসমুৎপাদ'। এখান থেকেই বৌদ্ধ ধর্মদর্শনেরও বিশ্বাস জন্মান্তরবাদের উপর। অতৃপ্ত কামনার ভ্রান্ত ও ব্যর্থ কারণে মানুষের বার বার জন্মলাভ এবং বার বার জীবনের অবশ্যম্ভাবী দুঃখ বরণ করা। এই চিরন্তন দুঃখ-নিরোধ, বা দুঃখ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্যই নির্বাণ, বা পরিনির্বাণ।
এ স্থলেও আমরা বেদান্তের চিন্তার প্রতিবিম্ব পাই। কঠ উপনিষদে নচিকেতা স্বয়ং 'মৃত্যুকেই' (মৃত্যুলোকের অধিপতি-- যম) জিজ্ঞাসা করলেন
"যস্মিন্নিদং বি চিকিৎসন্তি মৃত্যো
যৎ সাম্পরায়ে মহতি ব্রূহি নস্তৎ। ..."
হে মৃত্যু, সর্বশেষ বা চরম গন্তব্য যে পরলোক তত্ত্ব --  আত্মা, সে বিষয় নিয়ে সংশয় রয়েছে। (সবই যখন নশ্বর, অচিরস্থায়ী) তখন এই নচিকেতা রহস্যময় আত্মার বিষয় ছাড়া অন্য কিছু জানতে ইচ্ছা করে না।
পরলোক, আত্মা, পরমাত্মা, স্রষ্টা বা সর্বোপরি ব্রহ্মকে 'কার্যকারণ' সম্মন্ধের উর্ধ্বে রেখে উপনিষদ শুধু বিচার করেছেন, উপদেশ দিয়েছেন কি ভাবে, কি প্রকার যোগের দ্বারা বা সাধনার দ্বারা সেই আত্মাকে লাভ করতে হবে।‌ কামনা ত্যাগের দ্বারা আত্মাকে উপলব্ধি করেন যিনি তিনিই দেহের 'মৃত্যু' বা বিনাশ থেকে মুক্ত হয়ে 'অ-মৃত' অবস্থা লাভ করেন। নচিকেতার প্রশ্নের উত্তরে, এই আত্মা বিষয়ে যম তিনটি মন্ত্র উচ্চারণ করেছেন,
১। "অণোরণীয়ান্ মহতো মহীয়ান্ 
আত্মাহস্য জন্তোর্নিহিতো গুহায়াম্। 
তমক্রতুঃ পশ্যতি বীতশোকো 
ধাতুপ্রসাদাৎ মহিমানম্ আত্মনঃ।।" 

২। "আসিনো দূরং ব্রজতি শয়ানো জাতি সর্বতঃ।
কস্তং মদামদং দেবং মদন্যো জ্ঞাতুমর্হতি।।"

৩। "অশরীরং শরীরেষু অনবস্থেষু অবস্থিতম্।
মহান্তং বিভুমাত্মানং মত্বা ধীরো ন শোচতি"।। 


আত্মা অনু থেকে আণিয়ান, মহৎ থেকে মহীয়ান হয়েও জীবহৃদয়ের গভীরদেশে বিরাজ করেন। যিনি, যে মানব কামনা বাসনার দাসত্ব থেকে মুক্ত, তিনি মনের পবিত্রতা ও নিষ্কলঙ্কতার মাধ্যমে এ অন্তর্গূঢ় আত্মার মহিমা উপলব্ধি করেন এবং শোকমুক্ত হন।
অচল থেকেও তিনি চলমান (দূরে গমনক্ষম), শায়িত হয়েও সর্বত্রগামী, আমিই (যম বলছেন) সেই আনন্দ ও নিরানন্দ বিরুদ্ধ-ভাবাপন্ন, একমাত্র প্রকাশমান সত্যবস্তুকে জানি। (আর কেউ জানে না)।
এই আত্মা দেহহীন, অবিনশ্বর ; কিন্তু দেহধারী নশ্বর ভূতসমূহের অন্তরে অবস্থান করেন। আত্মা অসীম ; তবু সকল বস্তুতে অবস্থিত। এই তত্ত্ব যিনি জানেন সেতু বিবেকবান ব্যক্তি শোক করেন না।
‌                     (কঠ উপনিষদ, মন্ত্র ২০/২১/২২)


ঠিক একই ভাবে বৃহদারণ্যক উপনিষদও আত্মার মহিমা কীর্তন করেছেন,
"যঃ সর্বেষু ভূতেষু তিষ্ঠন্ সর্বেভ্যো ভূতেভ্যো অন্তরো যং সর্বাণি ভূতানি ন বিদুঃ যস্য সর্বাণি ভূতানি শরীরং যঃ সর্বাণি ভূতানি অন্তরো যময়তি এষ তে আত্মা অন্তর্ণিয়ন্তৃ (অন্তর্যামী) অমৃতঃ ---।।" 


সমস্ত জীবের অন্তরে যিনি সারাৎসার, যাঁকে সব জীব জানতে পারে না, সকল জীব যাঁর শরীর, যিনি অন্তরে থেকে জীবকে নিয়ন্ত্রণ করেন, তিনিই তোমার আত্মা।

এতক্ষণ আমরা মৃত্যুর দর্শনশাস্ত্রগত ধারণার কথা আলোচনা করেছি। এই ধারণা অনুযায়ী দেহের বিনাশ হয় কিন্তু 'আত্মা' যা সর্বভূতে, সমস্ত জগতে, মরামর প্রাণে ব্যপ্ত হয়ে আছেন ; তাঁর মৃত্যু বা বিনাশ হয় না। গীতার বাণীতে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন এই নশ্বর দেহ জীর্ণ, পুরাতন বস্ত্রের মত। দেহ বিনাশশীল কিন্তু দেহাভ্যন্তরে যিনি, 'চৈতন্যস্বরূপ' আত্মা রূপে বিরাজমান তিনি শাশ্বত, তিনি জীবের মধ্যে আসীন জীবাত্মা এবং সমগ্র বিশ্বচরাচরে পরিব্যপ্ত পরমাত্মা। তিনি চৈতন্য, তিনিই প্রাণ-অপ্রাণ, সাকার-নিরাকার সকল ভূত ভাবের উৎস এবং অন্ত। যাঁরা সাধনার মধ্যে দিয়ে এই ধারণাকে উপলব্ধি করেন, তাঁরা ভবযন্ত্রনা থেকে, জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্ত হয়ে সেই পরম চৈতন্যসত্ত্বায় মিলে যান। এই সাধনাই জীবের জীবন্মুক্তির সাধনা। 

"তোহে জনমি পুনঃ  তোহে সমাগত
       সাগর লহরি সমানা।" ---বিদ্যাপতি।

এ তো গেল জন্ম-মৃত্যুর দর্শনশাস্ত্রগত ও বেদান্ত-তত্ত্বগত আলোচনা। কিন্তু একটি জীব, একজন মানুষ কি মৃত্যুকে তেমনভাবেই আলিঙ্গন করে, যেমন করে সে জীবনকে ; মরণকে সে কি তেমনই ভালোবাসে যেমন ভালোবাসে জীবনকে ?
(এবার এই প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজার চেষ্টা করব আমরা
মৃত্যু সত্য, জগৎ মিথ্যা আলোচনার ২-য় পর্বে।)

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
০৮/০২/ ২০২৬
কলকাতা।
_______________________________________














সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

জাত্যাভিমান ধর্মান্ধতা এবং গান্ধী ও যুদ্ধ-৫

জাত্যাভিমান ধর্মান্ধতা এবং গান্ধী ও যুদ্ধ-৫ (উপসংহার)


এই সংক্ষিপ্ত আলোচনা মহাত্মা গান্ধীর মত একজন বিরাট ও স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের সমগ্র জীবনের শিক্ষা, সাধনা, সংগ্রাম ও সংঘাতের অনুপুঙ্খ ইতিবৃত্ত রচনার প্রয়াস নয় ; এই আলোচনা একান্তভাবে তাঁর অহিংসা ও মানবতাবাদের, যা তাঁর সময়কালের এক 'ক্ষীয়মান আদর্শ' ছিল, তার উপর বর্তমান কালের স্মৃতিচারণা। 'ক্ষীয়মান আদর্শ' শব্দযুগল এই কারণেই উচ্চারিত হয়েছে যে তিনি তাঁর ৭৮ বছরের জীবদ্দশায় (১৮৬৯- ১৯৪৮),  ৫৫ বছর ধরেই ওই অহিংসা ও মানবতাবাদের প্রতিষ্ঠা ও প্রচারে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি লন্ডনে 'আইন পাশ' করে ব্যারিস্টার হওয়ার পর দক্ষিণ আফ্রিকায় কর্মজীবন শুরু করেন। সেখানে তখন বর্ণবৈষম্যবাদের (apartheid) নির্মম তান্ডব। তিনি নিজেও তার শিকার হন এবং সেখানেই কালো-সাদা বিভাজনের বিরুদ্ধে অহিংস প্রতিবাদের অস্ত্র হিসাবে 'সত্যাগ্রহ' আন্দোলনের 'উপায়' বা 'পথ' অবলম্বন করেন। সেখানে এই আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন দীর্ঘ ২১ বছর (১৮৯৩-১৯১৪)। এরপর ভারতে প্রত্যাবর্তন করেই ইংরেজ রাজশক্তির বিরুদ্ধে শুরু হয় তাঁর 'অহিংসা ও সত্যাগ্রহের' অস্ত্র-হাতে 'গণআন্দোলন'। সে আন্দোলন শুধুমাত্র বিদেশী-বিতাড়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তা ছিল ভারতীয় জনচেতনায় এই বিশ্বাস প্রোথিত করা যে 'হিংসাকে' হিংসার তরবারি দিয়ে ধংস করা যায় না, যা 'সত্য' তাকে অসত্যের আবরণে আবরিত করে শুভ পরিণাম লাভ করা যায় না। গান্ধীবাদ এমন একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ যা তাঁর  রাজনৈতিক মঞ্চে পদার্পণের আগে যত প্রকারের (শাসনতন্ত্রিকতার বিরুদ্ধে) বিদ্রোহাত্মক ও বিপ্লবাত্মক 'মত ও পথের' ধারণার সৃষ্টি হয়েছে এবং যেগুলিকে প্রয়োগ করা হয়েছে -- সে সবের চাইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন, স্বতন্ত্র। ভারতে ফিরে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন ভারত শুধু বিদেশী শক্তির কাছেই অবদমিত হয়ে আছে এমন নয়, অধঃপতিত হয়ে আছে দারিদ্র্যজনিত হীনমন্যতা, সামাজিক ভাবে বর্ণান্ধতা এবং সম্প্রদায়গত বিচ্ছিন্নতার অভিশাপে। ইংরেজের বিরুদ্ধে হিংসাশ্রয়ী বিদ্রোহ ভারত রাষ্ট্রের সেই দুর্বলতাগুলিকে আরও প্রকট করে তুলবে। রাজশক্তির উৎকোচ প্রদান এবং বিভাজনের ক্রূর চক্রান্ত অচিরেই ভারতবাসীকে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ও আত্মহননের পথে নিয়ে যাবে। তাই তিনি অহিংসার পথ, (যে পথ বুদ্ধের বিশ্বজয়ের জনপথ, যে পথ সম্রাট অশোকের ধর্মবিজয়ের রাজপথ) অবলম্বন করেছিলেন।

  তাঁর এই 'অহিংসা ও সত্যাগ্রহ' একটি অখণ্ড ভারতসত্ত্বার সৃষ্টি করেছিল, কিন্তু পরিশেষে তা সফলতা লাভ করতে পারে নি। যাঁর কাছে 'দ্বিখণ্ডিত ভারত' দুঃস্বপ্নের মত ছিল তাঁকে হত্যা করার কারণ হিসেবে এই যুক্তিরই অবতারণা করা হয়েছিল যে তিনিই দেশ 'বিভাজনের জনক' ("He was not the father of the nation but murderer of the nation"). হন্তারকদের এই যুক্তি দেশের একটি বিপুল 'জনসংঘ'-কে প্রভাবিত করেছিল এবং এখনও করে চলেছে। দেশের সাধারণ মানুষ তাঁকে 'জাতির জনক'রূপে বরণ করেছিল, ক্ষমতালোভী নেতারা তাঁকে ভয় পেয়েছিল, ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী শক্তি তাঁর উদার মানবতাবাদের আদর্শ থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিল। তাই  তাঁর বিরুদ্ধে অসত্য প্রচার, তাঁর চরিত্র, মত ও পথের স্বতন্ত্র ও সত্য আদর্শের ধারণার উপর কলঙ্কের কালিমা লেপন করা হয়েছিল এবং এখনো সেই প্রয়াস অব্যাহত রয়েছে, থাকবেও বুঝিবা ততদিন যতদিন না শাসনতন্ত্র থেকে ছলনা, প্রবঞ্চনা, মিথ্যাচার ও ধর্মীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক অন্ধত্ব অপসারিত  হয়। হবেও হয়তো একদিন ; কিন্তু সেই দিনের নবোদিত প্রভাত-সূর্যকে বন্দনা করবার জন্য থাকবেনা কোন মানবিক প্রাণ, ধরিত্রী মায়ের কোলভ'রে পড়ে থাকবে  পারমানবিক অগ্নি-প্রলয়-শেষে ভষ্মে-ঢাকা মূর্ত বিভীষিকার ঝলসানো কঙ্কাল! 

 
"মর্ত্যলোকে মহাকালের নূতন খাতায়
পাতাজুড়ে নামবে একটা শূন্য,
গিলে ফেলবে দিনরাতের জমাখরচ ;
মানুষের কীর্তি হারাবে অমতার ভান,
তার ইতিহাসে লেপে দেবে
অনন্ত রাত্রির কালি।"
                       'আমি' --রবীন্দ্রনাথ।

তাই গান্ধীকে পূর্ণরূপে আমরা বুঝতে পারি না যেমন বুঝেছিলেন আইনস্টাইন (Albert Einstein - 1979-1955) এবং বিশ্বের সমকালের ও চিরকালের মানবতার বিবেক। 

"Gandhi is the most enlightened of the political men of our time. .... Generation to come will scarce believe that such a one as this ever in flesh and blood walked on this earth. .... In our time of utter moral decadence he was the only statesman to stand for a higher human relationship in the political sphere."
                     ------ Albert Einstein.

"Gandhi's assassination caused dismay and pain throughout India. It was as though the three bullets that entered his body and pierced the flesh of ten of millions. The nation was buffled, stunned and hurt by the sudden news that this man of peace, who loved his enemies, and would not have killed and insect, had been shot dead by his own countryman and co-religionist. Never in modern history has any man been mourned more deeply and more widely."
         (---- Louis Fischer, American journalist & biographer of Mahatma Gandhi).

"The light has gone out of our lives and there is darkness everywhere and I do not quite know what to tell you and how to say it. Our beloved leader, Bapu as we call him, the father of the nation, is no more. Perhaps, I am wrong to say that. Nevertheless, we will not see him again as we have seen him these many years. We will not run to him for advice and seek solace from him, and that is a terrible blow not to me only but to millions and millions in this country. And it is difficult to soften the blow by any advice that anyone can give you.
The light has gone out, I said, and yet I was wrong. For, the light has shown in this country was no ordinary light. The light that has illumined this country for these many years will illuminate this country for many more years, and a thousand years later that light will still be seen in this country and the world will see it and it will give solace to innumerable hearts. For, that light represented the living truth, and the eternal man was with us with his eternal truth reminding us of the right path, drawing us from error, taking this ancient country to freedom."
----Jawaharlal Nehru lamented on Mahatma's assassination through a radio address, on January 30, 1948. 

মহাত্মা গান্ধীর এই অপ্রত্যাশিত নিধনের পর এমনভাবেই হাহাকার স্বতঃস্ফূর্ত উচ্ছ্বসিত হয়েছিল শুধু ভারতেই নয় সমগ্র বিশ্বের সকল মানবপ্রেমীর অন্তর্দেশের ভিতর থেকে। তৎকালীন ভারত সরকারের কাছে, চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে, ৩৪৪১টি শোকবার্তা এসে পোঁছেছিল। ইউনাইটেড নেশনস-এর (The UN) পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছিল, অর্থ তার এমনই ছিল "যেন বিশ্বমানবতার উড়ান মাথা নত করেছিল শোকসন্তপ্ত লজ্জায় (as if Humanity lowered its Flag").

ভারতভাগ কেমনভাবে হয়েছিল, কেমন ছিল সেদিনের নৃশংসতা ; কেমন ছিল সে দিনগুলির অনমনীয়, রূঢ় দ্বিজাতিতত্ত্বের সমর্থনকারী এবং কঠোর, নির্মম সাম্প্রদায়িক বিভাজনপন্থীদের 'বিজয়োল্লাস' -- তার বিবরণ এখনও অজস্র বৃদ্ধ-প্রবৃদ্ধ মানুষের স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছে। তাই সবিস্তারে সে সবের বর্ণনা করবার প্রয়োজন আর নেই ; কিন্তু প্রশ্ন করতে ইচ্ছা করে বর্তমানে এই যে ভারত ভূখণ্ড হতে ছিন্ন ও বিচ্ছিন্ন হওয়া তিনটি দেশ (ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ) --তারা কি সুখে আছে ? এই তিনটি দেশের, বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানের অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা, আত্মরক্ষা, আত্মসম্মান এমনকি শাসনতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বও কাদের কাছে বন্ধক দেওয়া ? পশ্চিমের ধনতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির উপর দক্ষিণের এই ঘণ্ডিত দেশসকলের কতখানি নির্ভরশীলতা রয়েছে তার হিসাব পাওয়া যাবে বিশ্বব্যাংকের খতিয়ানে। আজকেও ভারত প্রতিরক্ষা খাতের প্রায় সবটাই ব্যয় করে আমেরিকা, রাশিয়া, ফ্রান্স প্রভৃতি দেশের তৈরী যুদ্ধবিমান, যুদ্ধাস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তি আমদানি করার জন্য। পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও সেই একই সংবাদ। এখন আবার বাংলাদেশও সামরিক শক্তি সঞ্চয় করতে চাইছে অস্ত্র সরবরাহকারী দেশগুলির বদান্যতায়। 

আর এই বিপুল সম্পদের অপচয় সমানে চলেছে এবং উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে ও অবিরাম বর্ধিত হয়েই চলেছে এই সমস্ত দেশের বিরাট সংখ্যক মানুষের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অনাহার, অপুষ্টি ও অকাল মৃত্যুর বিনিময়ে ! প্রাকৃতিক সম্পদের, সৌন্দর্যের লীলাভূমি দক্ষিণ গোলার্ধের এই উপমহাদেশ শুধুমাত্র হিংস্র সাম্প্রদায়িক নেশাগ্রস্ততার জন্যেই শতেক বা শতাধিক দেশীয় মূদ্রার  (১ মার্কিন ডলারের মূল্য ভারতের ৯২ টাকা) বিনিময়ে এক একটি বিদেশী মুদ্রা পায় ; আর তাই দিয়ে কিনে আনে ঐ 'বিদেশেরই' অস্ত্র কারখানায় নির্মিত অস্ত্রসম্ভার এবং সে সকল অস্ত্র প্রয়োগ করা হয় আত্মহননের প্রয়োজনেই, উন্মত্ত যদুবংশ-ধংসের 'প্রভাসতীর্থে'। (কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ৩৬ বছর পর প্রবাস তীর্থে মদ্যপ অবস্থায় নিজেদের মধ্যেই পরস্পর পরস্পরকে আক্রমণ করে যাদবকুল ধংস হয়ে যায়)।


যাই হোক্, আজ থেকে কম-বেশি ৭৮ বছর আগে, ৭৮ বছরের অর্ধনগ্ন এক ফকির (half-nacked Fakir) আপন বুকের রক্ত ঢেলে মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসার যে মূল্য চুকিয়ে গিয়েছেন সেই রক্তঋণ কি আমরা আজও শোধ করতে পেরেছি ? আজও কি অনুতপ্ত সংবিৎ জেগেছে আমাদের ? 'মেলেনি উত্তর'।

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
০১/০২/২০২৬
কলকাতা।
____________________________________







Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...