মৃত্যু সত্য, জগৎ মিথ্যা--পর্ব ১
আমি বেঁচে আছি, তাই জগৎসংসার আছে। আমি নেই এই জগৎসংসার নেই। এও তো সত্য।
আমি জানি, আমার আজকের এই আলোচনার 'শীর্ষক' অত্যন্ত রূঢ়, ভীতিপ্রদ, অনাকাঙ্ক্ষিত এবং বিকর্ষণধর্মী, নিষ্প্রাণধর্মী (sickening) মনে হওয়াই স্বাভাবিক ; কিন্তু ভেবে দেখলে এর চাইতে চরম সত্য, এর চাইতে ধ্রুব বাক্য আর কিছুই হতে পারে না। 'জন্ম' হয় জন্মদাতার এবং জন্মদাত্রীর দেহজ ও মনোজ বাসনার বা ইচ্ছার উপর নির্ভর করে ; অর্থাৎ যে প্রাণকণিকাটি জাত হচ্ছে তার জন্ম হতেও পারে বা না-হতেও পারে, কিন্তু একবার প্রাণযুক্ত প্রাণীরূপে জন্ম গ্রহণ করলে তাকে মৃত্যু বরণ করতেই হবে। এই নিশ্চিত পরিণাম নিজের বা অপরের 'ইচ্ছার' দ্বারা এড়ানো সম্ভব নয়। জন্ম হলেই, জীবনের সূচনা থেকেই মরণের অজস্র হেতু এসে উপস্থিত হতে থাকে এবং একদিন অকস্মাৎ 'মরণরূপী' শিকারীর তীর এসে স্পন্দিত হৃৎপিণ্ডটিকে স্তব্ধ করে দেয়। "অন্তবন্ত ইমে দেহাঃ.. এই দেহসকল বিনাশশীল.." --- এইটিই সত্য। এর পরে কি ?
এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার শুরু থেকেই আরম্ভ হয়েছে মানুষের দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক পথের সন্ধান। আমাদের ভারতীয় ধর্মধারণা ও দর্শন চিন্তায় 'আত্মা' নাম দিয়ে একটি 'ধারণার' সৃষ্টি হয়েছে। ঋক্ বেদের সময়কাল থেকে যার যাত্রা, ব্রাহ্মণগন্থগুলি, আরণ্যক, সর্ব উপনিষদ হয়ে শ্রীমদ্ভগবদগীতায় সেই 'ধারণা' প্রাঞ্জল ভাষায় উদ্ঘোষিত হয়েছে, যেখানে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন, "শরীরের বিনাশ হয় ; কিন্তু আত্মার মৃত্যু নেই।"
"ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিৎ
না অয়ং ভূত্বা ভবিতা বা না ভূয়ঃ।
অজো নিত্যঃ শ্বাশ্বতোহয়ং পুরাণো।
ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে।। (২/২০)"
এই আত্মা কোন এক কালে জন্মগ্রহণ করেন এমন নয়, কোন কালে তাঁর মৃত্যু হবে এমনও নয়, আত্মা সৃষ্ট হয়ে আবার সত্ত্বাবান্ হয়ে ওঠে তাও নয় ; কেননা আত্মা জন্মরহিত, নিত্য, শাশ্বত ও চির পূরাতন। শরীর বা দেহের বিনাশ হয়, কিন্তু আত্মার বিনাশও হয় না, আত্মা বিনষ্টও হয় না।
এবার এই 'আত্মা' নামক রূপহীন, গুণহীন, অক্ষয়, অব্যয় এক বায়বীয় 'ধারণা'র উপর নির্ভর করে জীবনের পরিণাম সম্মন্ধে আশাবাদী 'সুখ' কতক্ষণ লালন করা যায় ? তাই ওই গীতোক্ত 'ধারণা', যা সকল বৈদান্তিক মতবাদের সংক্ষিপ্ত রূপ, সেই 'আত্মা'র অস্তিত্বকেই অস্বীকার করেছেন পরবর্তী কালের বৌদ্ধ, জৈন, চার্বাক প্রভৃতি দার্শনিক তত্ত্বগুলি। বৈদান্তিকদের এই 'আত্মা', শুধুমাত্র জীবের মৃত্যুহীন অস্তিত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি, তাঁরা বলেছেন এই জীবাত্মাই 'পরমাত্মা'র সঙ্গে এক হয়ে থাকেন। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে ব্যপ্ত হয়ে আছেন সেই পরমাত্মা যাকে বেদান্ত (সমস্ত উপনিষদ, আরণ্যক ও ব্রাহ্মণ সংহিতা) 'ব্রহ্ম' নামে উচ্চারণ করেছেন। 'ব্রহ্ম' এমন একটি 'ধারণা' - যাঁর ব্যাখ্যা তো সুদূরের কল্পনা, তাঁর সম্মন্ধে কিছু বলা মানেই তাঁকে না-জানা ; কেননা তিনি 'অবাঙনসোগোচর' -- বাক্যে তাঁর বর্ণনা করা যায় না, মনের দ্বারাও তিনি গোচরীভূত হন না, এমনকি তিনি অচিন্তনীয়। তিনি ত্রিগুণাতীত (সত্ত্ব রজঃ তমঃ - এই তিন গুণ) ; অতএব জ্ঞানাতীত বা অজ্ঞেয়। (ভারতীয় দার্শনিক সমাজে 'অজ্ঞেয়বাদের' (পাশ্চাত্য দুনিয়ার T. H. Huxley, Herbert Spencer প্রভৃতি দার্শনিকগণ যাকে 'Agnosticism, বা 'Religion of unknowable' বলেন), সৃষ্টি হয়েছে, এবং তাঁদের মতে যাঁর অস্তিত্ব বা অনস্তিত্ব জানার কোন উপায়ই নেই, যা প্রমাণের উপর নির্ভর করে না, তেমন ধারণা তো অপ্রয়োজনীয়, অনির্ভরযোগ্য, এবং অসত্য। অপরদিকে বৌদ্ধধর্মের 'মহাযানী শাখা', যা নাগার্জুন সবিস্তারে ও অতি গভীরে ব্যাখ্য করেছেন, বিশ্বাস করে যে চরম সত্য হোল সমস্ত কিছুই 'শূন্য'। শূন্যবাদ বা 'অনাত্মা' অতি জটীল কার্য-কারণ (প্রতীত্যসমুৎপাদ) সম্মন্ধে বাঁধা। আরেকটি কথা, জীব ও জীবের জীবন কোন অতিন্দ্রীয় শক্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বা নির্ধারিত নয়। মুক্তি বা মোক্ষ প্রদানকারী কর্তা (ব্রহ্ম, ঈশ্বর, ভগবান) বলেও কোন কিছুরই অস্তিত্ব নেই।
বৌদ্ধ দর্শন বিশ্বাস করে, জগৎসংসার দুঃখময়। "সব্বম্ দুঃখম।" আর এই দুঃখ এই জন্যই যে জীবন তো জন্ম, জরা, ব্যাধি ও মৃত্যুর অবশ্যম্ভাবিতায় গ্রস্ত ও কবলিত (eclipsed). মুক্তি কোথায় ? যদিও এই সর্বময় দুঃখ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার, নির্বাণ লাভ করবার কথাও তথাগত বলেছেন। তিনি বলেছেন, হ্যাঁ, দুঃখই একমাত্র সত্য, কেননা জীবের সকল সাধনা, কর্মপ্রচেষ্টা, সংগ্রাম ও প্রাপ্তি মরণের প্রতিক্ষায় থাকে। এক চরম ও পরম শূন্যতা। এই সমূহ দুঃখ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য তিনি চারটি সত্য (চতুঃসত্য) ও আটটি পথের কথা (অষ্টাঙ্গিক মার্গ) বলছেন। তিনি বলেছেন, দুঃখ আছে, দুঃখের কারণ আছে, দুঃখ নিরোধ করা যায়, দুঃখ নিরোধ করবার উপায় আছে। এই উপায়গুলিই হোল আটটি পথ বা অষ্টাঙ্গিক মার্গ ('সম্যক দৃষ্টি', 'সৎ সঙ্কল্প', 'সত্য ও সংযত বচন', 'সৎ কর্ম', 'আজীব' বা সৎ উপায় অবলম্বন করে জীবন অতিবাহিত করা, 'ব্যায়াম' (দেহ ও মনের উপর নিয়ন্ত্রণ), 'স্মৃতি' (নিজের দেহ রূপ, বেদনাবোধ ও চিত্ত-বিক্ষোভ সম্মন্ধে সচেতন থাকা) এবং 'সমাধি' (যার দ্বারা পরিনির্বাণ লাভ করা যায়)।
একেবারে রূঢ় বাস্তবতার নিরিখে তিনি জীবনকে দেখেছেন। আত্মা, পরমাত্মা, ব্রহ্ম বা ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকার করেন নি ঠিকই কিন্তু জগতের ও জীবনের অস্তিত্বকে অস্বীকার না করেও 'জীবকেই' আপন পরিণতির নিয়ন্ত্রক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং চেতনা-সম্পন্ন জীব মানুষকে বলেছেন এই সত্য স্বীকার করে নিতে যে মৃত্যু বা 'নিঃশেষ'কে বরণ করাই তার জন্য অবধারিত। বাসনার তাড়নায় বার বার জন্মলাভ, (বৌদ্ধ ধর্মদর্শন জন্মান্তরবাদের প্রবর্তক) বার বার জীবনযন্ত্রনা ভোগ করা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য কোন অলীক 'পরাশক্তির' সাধনা ব্যতিরেকেই আত্মসাধনার মধ্যে দিয়ে (অষ্টাঙ্গিক মার্গ অবলম্বন করে), দুঃখময়, যন্ত্রনাক্ষুব্ধ জীবন থেকে নির্বাণ লাভ করা যায়। এখানেও এ মৃত্যু বা জীবনের মহাপরিনির্বাণের কথাই বলা হয়েছে। সুতরাং মৃত্যুই সত্য। বৈদান্তিক মতবাদের সমর্থকদের ধারণায় ব্রহ্মই পরম সত্ত্বা, জীবন ও জগতের তিনিই উৎস, জগৎ ও জীবন সচ্চিদানন্দঘন ব্রহ্মেই লীন হয়ে চিরানন্দ ও চিদানন্দ লাভ করে -- বৌদ্ধ মতবাদ এই ধারণাকে অস্বীকার করেছেন কিন্তু সম্পূর্ণরূপে নস্যাৎ করে দিয়েছেন এমনও নয়। হাজার হাজার বছর ধরে 'বুদ্ধতত্ত্বের' উপর, বুদ্ধ ধর্মধারণার বিভিন্ন শাখা আলোচনা করেছেন, সমালোচনার করেছেন, তর্ক-বিতর্ক করেছেন এবং 'শূন্যবাদ' প্রতিষ্ঠা করেছেন। সে এক অসীম, গভীর জ্ঞানসমুদ্র। সে সবের উপর ভারতে, তিব্বতে, চিন, জাপান এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গবেষণা হয়েছে, বিভিন্ন গ্রন্থ রচনা করা হয়েছে। নাগার্জুন, চন্দ্রকীর্তি, ধর্মকীর্তি প্রভৃতির মত বৌদ্ধপণ্ডিতগণের অভ্যুত্থান ঘটেছে। মহাপণ্ডিত, জ্ঞানের বিচিত্র বিষয়ের উপর তপঃসিদ্ধ 'দ্বিতীয় বুদ্ধ' নাগার্জুন রচিত 'মূলমধ্যমককারিকা' এমন এক শূন্যবাদের (void or utter emptiness) বৌদ্ধিক ধারণার কথা বলেছেন যা 'মৃত্যুর' মতই পরম বিনাশ। ভগবান বুদ্ধের 'মহাপরিনির্বাণের' অন্তিমতাকে যখন তিনি বলছেন -- সে এক সমস্ত কামনা-বাসনা ত্যাগের মধ্যে দিয়ে জীবনচক্র পরিক্রমনের পর (মহাযানী পন্থা), গভীর সমাধির মধ্যে এক তৃষ্ণাবিহীন পরিসমাপ্তি -- এই পরিণাম বা 'মৃত্যু' তখন আর মৃত্যু বা যন্ত্রনাময়, শোক-তাপদগ্ধ অবস্থা নয়। মৃত্যু ও জীবন উভয়ই তখন সত্যরূপে প্রতিভাত হবে। সে এক আলোকিত জগৎ যেখানে 'দুঃখের' নির্বাপণ। 'জীবন' দুঃখময়, মৃত্যু সকল দুঃখের পরিসমাপ্তি।
"অনেক দিনের অনেক কথা, ব্যাকুলতা, বাঁধা বেদনডোরে --
মনের মাঝে উঠেছে আজ ভ'রে।
যখন পূজার হোমানলে উঠবে জ্বলে একে একে তারা,
আকাশপানে ছুটবে বাঁধনহারা,
অস্তরবির ছবির সাথে মিলবে আয়োজন --
আমার ব্যথার পূজা হবে সমাপন।"
বৌদ্ধচিন্তনের ব্যাখ্যায় নাগার্জুন যে 'পঞ্চস্কন্দ-এর' (রূপ, সংজ্ঞা, সংস্কার, বিজ্ঞান এবং বেদনা বা অনুভব) আলোচনা করেছেন, উদ্ধৃত রবীন্দ্র সংগীতের, "অনেক দিনের অনেক কথা, ব্যাকুলতা বাঁধা বেদনডোরে" -- মহাবাণীটিই হোল 'মহাযানী বৌদ্ধধর্মের' সেই 'বেদনাস্কন্দ'। পূজার হোমানলে বা জীবনের সাধনার মধ্যে দিয়ে, সমস্ত ক্ষণিকতাসর্বস্ব ভোগের বাসনা, অপূর্ণতার বেদনাবোধ যখন জ্বলে পুড়ে নিঃশেষিত হবে তখনই সেই দুঃসহ, জরা-ব্যাধি-মৃত্যুক্লিষ্ট জীবনের অবসান। এখানেও 'হোমানলের, অস্তরবির ছবির' কল্পচিত্রের মাধ্যমে এক আলোকিত অবস্থাপ্রাপ্তির কথা আছে যেখানে মৃত্যুযন্ত্রণা, মৃত্যুজনিত শোকোচ্ছ্বাসের মর্মান্তিক হাহাকার নেই।
লক্ষণীয়, বৌদ্ধ মতবাদ (যে তত্ত্বে আত্মা, পরমাত্মা বা ব্রহ্ম বা ঈশ্বরের স্বীকৃতি নেই) শেষ পারে অর্থাৎ নির্বাণ তত্ত্বে আরোহণ করে যখন 'শূন্যতা' (emptiness or utter void)-কে প্রতিষ্ঠা করছে তখন বেদান্তবাদের 'পূর্ণতা' সঙ্গে কোথায় যেন তার গভীর মিল। বৌদ্ধ ধর্মদর্শনের 'শূন্যবাদ' সৃষ্টির অস্তিত্বকে অস্বীকার করেছে এমন নয়, তবে হাজার হাজার বছরের সাধনায় এই সিদ্ধান্তে এসে উপনীত হয়েছে যে ভূতজগতে কোন বস্তু, এমনকি প্রাণেরও স্বাধীন সত্ত্বা নেই। বৌদ্ধদর্শনে হেতুবাদ বা কার্যকারণ মীমাংসা অতি কঠোর। সন্তানের (প্রাণের) জন্মের জন্য যেমন পিতা মাতা, ধরিত্রীর মত আশ্রয়, ধরিত্রীর সৃষ্টির জন্য যেমন সৌরমণ্ডল, সৌরমণ্ডলের সৃষ্টির জন্য যেমন নীহারিকা, ছায়াপথ এবং ক্রমান্বয়ে আরো কিছু, আরো আরো অজানা অনন্ত. ... কারণ আছে ; কিন্তু এ সকল কোনটিরও অস্তিত্ব চিরন্তন নয়, সকলের সৃষ্টির পিছনে আছে 'কার্যকারণ শৃঙ্খলা' -- 'প্রতীত্যসমুৎপাদ'। এখান থেকেই বৌদ্ধ ধর্মদর্শনেরও বিশ্বাস জন্মান্তরবাদের উপর। অতৃপ্ত কামনার ভ্রান্ত ও ব্যর্থ কারণে মানুষের বার বার জন্মলাভ এবং বার বার জীবনের অবশ্যম্ভাবী দুঃখ বরণ করা। এই চিরন্তন দুঃখ-নিরোধ, বা দুঃখ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্যই নির্বাণ, বা পরিনির্বাণ।
এ স্থলেও আমরা বেদান্তের চিন্তার প্রতিবিম্ব পাই। কঠ উপনিষদে নচিকেতা স্বয়ং 'মৃত্যুকেই' (মৃত্যুলোকের অধিপতি-- যম) জিজ্ঞাসা করলেন
"যস্মিন্নিদং বি চিকিৎসন্তি মৃত্যো
যৎ সাম্পরায়ে মহতি ব্রূহি নস্তৎ। ..."
হে মৃত্যু, সর্বশেষ বা চরম গন্তব্য যে পরলোক তত্ত্ব -- আত্মা, সে বিষয় নিয়ে সংশয় রয়েছে। (সবই যখন নশ্বর, অচিরস্থায়ী) তখন এই নচিকেতা রহস্যময় আত্মার বিষয় ছাড়া অন্য কিছু জানতে ইচ্ছা করে না।
পরলোক, আত্মা, পরমাত্মা, স্রষ্টা বা সর্বোপরি ব্রহ্মকে 'কার্যকারণ' সম্মন্ধের উর্ধ্বে রেখে উপনিষদ শুধু বিচার করেছেন, উপদেশ দিয়েছেন কি ভাবে, কি প্রকার যোগের দ্বারা বা সাধনার দ্বারা সেই আত্মাকে লাভ করতে হবে। কামনা ত্যাগের দ্বারা আত্মাকে উপলব্ধি করেন যিনি তিনিই দেহের 'মৃত্যু' বা বিনাশ থেকে মুক্ত হয়ে 'অ-মৃত' অবস্থা লাভ করেন। নচিকেতার প্রশ্নের উত্তরে, এই আত্মা বিষয়ে যম তিনটি মন্ত্র উচ্চারণ করেছেন,
১। "অণোরণীয়ান্ মহতো মহীয়ান্
আত্মাহস্য জন্তোর্নিহিতো গুহায়াম্।
তমক্রতুঃ পশ্যতি বীতশোকো
ধাতুপ্রসাদাৎ মহিমানম্ আত্মনঃ।।"
২। "আসিনো দূরং ব্রজতি শয়ানো জাতি সর্বতঃ।
কস্তং মদামদং দেবং মদন্যো জ্ঞাতুমর্হতি।।"
৩। "অশরীরং শরীরেষু অনবস্থেষু অবস্থিতম্।
মহান্তং বিভুমাত্মানং মত্বা ধীরো ন শোচতি"।।
আত্মা অনু থেকে আণিয়ান, মহৎ থেকে মহীয়ান হয়েও জীবহৃদয়ের গভীরদেশে বিরাজ করেন। যিনি, যে মানব কামনা বাসনার দাসত্ব থেকে মুক্ত, তিনি মনের পবিত্রতা ও নিষ্কলঙ্কতার মাধ্যমে এ অন্তর্গূঢ় আত্মার মহিমা উপলব্ধি করেন এবং শোকমুক্ত হন।
অচল থেকেও তিনি চলমান (দূরে গমনক্ষম), শায়িত হয়েও সর্বত্রগামী, আমিই (যম বলছেন) সেই আনন্দ ও নিরানন্দ বিরুদ্ধ-ভাবাপন্ন, একমাত্র প্রকাশমান সত্যবস্তুকে জানি। (আর কেউ জানে না)।
এই আত্মা দেহহীন, অবিনশ্বর ; কিন্তু দেহধারী নশ্বর ভূতসমূহের অন্তরে অবস্থান করেন। আত্মা অসীম ; তবু সকল বস্তুতে অবস্থিত। এই তত্ত্ব যিনি জানেন সেতু বিবেকবান ব্যক্তি শোক করেন না।
(কঠ উপনিষদ, মন্ত্র ২০/২১/২২)
ঠিক একই ভাবে বৃহদারণ্যক উপনিষদও আত্মার মহিমা কীর্তন করেছেন,
"যঃ সর্বেষু ভূতেষু তিষ্ঠন্ সর্বেভ্যো ভূতেভ্যো অন্তরো যং সর্বাণি ভূতানি ন বিদুঃ যস্য সর্বাণি ভূতানি শরীরং যঃ সর্বাণি ভূতানি অন্তরো যময়তি এষ তে আত্মা অন্তর্ণিয়ন্তৃ (অন্তর্যামী) অমৃতঃ ---।।"
সমস্ত জীবের অন্তরে যিনি সারাৎসার, যাঁকে সব জীব জানতে পারে না, সকল জীব যাঁর শরীর, যিনি অন্তরে থেকে জীবকে নিয়ন্ত্রণ করেন, তিনিই তোমার আত্মা।
এতক্ষণ আমরা মৃত্যুর দর্শনশাস্ত্রগত ধারণার কথা আলোচনা করেছি। এই ধারণা অনুযায়ী দেহের বিনাশ হয় কিন্তু 'আত্মা' যা সর্বভূতে, সমস্ত জগতে, মরামর প্রাণে ব্যপ্ত হয়ে আছেন ; তাঁর মৃত্যু বা বিনাশ হয় না। গীতার বাণীতে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন এই নশ্বর দেহ জীর্ণ, পুরাতন বস্ত্রের মত। দেহ বিনাশশীল কিন্তু দেহাভ্যন্তরে যিনি, 'চৈতন্যস্বরূপ' আত্মা রূপে বিরাজমান তিনি শাশ্বত, তিনি জীবের মধ্যে আসীন জীবাত্মা এবং সমগ্র বিশ্বচরাচরে পরিব্যপ্ত পরমাত্মা। তিনি চৈতন্য, তিনিই প্রাণ-অপ্রাণ, সাকার-নিরাকার সকল ভূত ভাবের উৎস এবং অন্ত। যাঁরা সাধনার মধ্যে দিয়ে এই ধারণাকে উপলব্ধি করেন, তাঁরা ভবযন্ত্রনা থেকে, জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্ত হয়ে সেই পরম চৈতন্যসত্ত্বায় মিলে যান। এই সাধনাই জীবের জীবন্মুক্তির সাধনা।
"তোহে জনমি পুনঃ তোহে সমাগত
সাগর লহরি সমানা।" ---বিদ্যাপতি।
এ তো গেল জন্ম-মৃত্যুর দর্শনশাস্ত্রগত ও বেদান্ত-তত্ত্বগত আলোচনা। কিন্তু একটি জীব, একজন মানুষ কি মৃত্যুকে তেমনভাবেই আলিঙ্গন করে, যেমন করে সে জীবনকে ; মরণকে সে কি তেমনই ভালোবাসে যেমন ভালোবাসে জীবনকে ?
(এবার এই প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজার চেষ্টা করব আমরা
মৃত্যু সত্য, জগৎ মিথ্যা আলোচনার ২-য় পর্বে।)
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
০৮/০২/ ২০২৬।
কলকাতা।
_______________________________________
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন