রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

মৃত্যু সত্য, জগৎ মিথ্যা-- পর্ব ৩

মৃত্যু সত্য, জগৎ মিথ্যা - পর্ব ৩ 


"শুধু দেবদাসের জন্য বড় কষ্ট হয়, তোমরা যে-কেহ এ কাহিনী পড়িবে, হয়তো আমাদেরই মত দুঃখ পাইবে। তবু যদি কখনও দেবদাসের মত এমন হতভাগ্য, অসংযমী পাপিষ্ঠের সহিত পরিচয় ঘটে, তাহার জন্য একটু প্রার্থনা করিও। প্রার্থনা করিও, আর যাহাই হোউক, যেন তাহার মত এমন করিয়া কাহারও মৃত্যু না ঘটে। মরণে ক্ষতি নাই, কিন্তু সে সময়ে যেন একটি স্নেহকরস্পর্শ তাহার ললাটে পোঁছে --- যেন একটিও করুণার্দ্র স্নেহময় মুখ দেখিতে দেখিতে এ জীবনের অন্ত হয়। মরিবার সময় যেন কাহারও এক ফোঁটা চোখের জল দেখিয়া সে মরিতে পারে।"


দেবদাসের জন্য 'না হয় দুই ফোঁটা' কেন সহস্র সহস্র  চোখের জলধারা এতকাল ধরে ঝরেছে, আগত, অনাগত কালেও ঝরবে, আসমুদ্র হিমাচলে তো বটেই, সাগরপারেরও অসংখ্য দেশেও ঝরে। কিন্তু 'পারু'র --- পার্বতীর জন্য রইল কি ?
ওই যে লেখক, তাঁর নায়ক 'অসংযমী পাপিষ্ঠের' স্মরণসভায় শেষ বাণী পাঠ করবার আগে, শোকার্তা, সংজ্ঞাহারা পারুকে ঘরে থুয়ে এলেন --- "তাহার পর দাসী-চাকর মিলিয়া ধরাধরি করিয়া পার্বতীর মূর্ছিত দেহ টানিয়া আনিয়া বাটীর ভিতর লইয়া গেল। পরদিন তাহার মূর্ছাভঙ্গ হইল, কিন্তু সে কোন কথা কহিল না। একজন দাসীকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিল, রাত্রিতে এসেছিলেন না ? সমস্ত রাত্রি !"
কিন্তু পাঠকের প্রশ্ন, এই একটি 'সমস্ত রাত্রি' কি 'পারু'র আকৈশোর দগ্ধপ্রেম বহ্নিশিখার শেষ আরতি, না-কি বাকি জীবনের মর্মবিদারী দুঃস্বপ্ন ? সে কথা তো 'নারীর মূল্য'-এর দোকানী বললেন না। শুধু চাঁদ সওদাগরের মত বাম হস্তে, অবহেলাভরে' কয়েকটি শব্দপুষ্প ছুঁড়ে দিয়ে বলে দিলেন, "এখন পার্বতীর কি হইয়াছে, কেমন আছে জানি না। সংবাদ লইতেও ইচ্ছা করে না।"
শুধুই কি পার্বতী ? আর চন্দ্রমুখী ? তার জন্য তো বেলপাতাও জুটে নি। পঞ্চদশ পরিচ্ছেদে, "আর একবার প্রণাম করিয়া চন্দ্রমুখী কাঁদিয়া কক্ষান্তরে পলাইয়া গেল।"  ব্যাস্, ছাড়াছাড়ি ! প্রণয়াস্পদের সঙ্গে আমৃত্যু বিরহযন্ত্রনার 'অভিশাপ' শিরোধার্য করে চিরান্ধকার কক্ষান্তরে আত্মনির্বাসন !
যদিও ষোড়শ পরিচ্ছেদে দেবদাস চন্দ্রমুখীকে শেষ চিঠি লিখেছিল, "বউ, মনে করিয়াছিলাম, আর কখনো ভালবাসব না। একে তো ভালবেসে শুধু হাতে ফিরে আসাটাই বড় যাতনা, তার পরে আবার নূতন করে ভালবাসতে যাওয়ার মত বিড়ম্বনা সংসারে আর নাই।"  এখানেও শরৎবাবু বলে দিলেন, "প্রত্যুত্তরে চন্দ্রমুখী কি লিখিয়াছিল তাহাতে আবশ্যক নাই।"
এই প্রকার বাক্যবিন্যাস সুমহান সাহিত্যস্রষ্টাদের পরিচয়বাহী। 'দেবদাসের মৃত্যু'র একটি জীবনের অসহনীয় বিয়োগান্তক পরিণতি --একথা মর্মবিদারী কিন্তু তার জীবনের সঙ্গে প্রেমের-সম্পর্কে যে দুটি নারী জড়িয়ে ছিল তারাও যে তারই সঙ্গে, তাদের প্রেমের নিষ্ফলা অপমৃত্যু বরণ করে শববাহী মান্দাসে আরোহণ করেছিল --- এ কথাও তো সত্য, এবং শুধু সত্যই নয়, মৃত প্রেমের স্মৃতি বুকে ধ'রে বাকি জীবনটুকু ব'য়ে ব'য়ে শেষে অশ্রুনদীর সুদূর কোন্ পাড়ে গিয়ে চিতায় চড়েছিল। তাই স্রষ্টার সৃষ্টিতে 'উপেক্ষিতা' থেকে আরো নিবিড়ভাবে তারা পাঠকের অন্তরে ঠাঁই নিয়েছে। এখানেই মনে হয়, অন্ততঃ মর্ত্য-জীবনের প্রতি অমর আসক্তি নিয়ে যারা বাঁচে কোথাও কি আছে তার শেষ সার্থকতা ! হয়তোবা আছে ; যারা 'স্থিরত্বমিচ্ছন্তি' তারা যেন মৃত্যুকে নিয়েও বাঁচতে চায়। বেঁচে থাকতে হয়ও, যেমন বাঁচতে হয়েছিল কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধভূমিতে অভিমন্যুর মৃত্যুর পর অন্তঃসত্ত্বা উত্তরাকে ; আবার উত্তরার আসন্ন সন্তানকে পালন করার জন্য আপন সন্তান-মৃত্যুর মহাশোক বুকে জ্বালিয়ে রেখে বাঁচতে হয়েছিল সুভদ্রাকে। পারুকেও নিত্যদিনের মরণ নিয়েই বাঁচতে হয়েছিল ভরা সংসারের ভার বইবার জন্যেই। এ সমস্ত জীবন তো জীবন্ত হয়েও মৃতবৎ ! এমনই সব অনেকানেক করুণ মৃত্যুর উদাহরণ আছে শরৎ সাহিত্যের পাতায় পাতায়। তাঁর ছোট গল্প 'অভাগীর স্বর্গ'এর অভাগীর স্বর্গলাভের মোহে মৃত্যুবরণ, 'বিলাসী' গল্পে মৃত্যুঞ্জয়ের মৃত্যু ও মৃত্যুঞ্জয়ের শোকে বিলাসীর আত্মহনন ; এমনকি মনুষ্যেতর জীব 'মহেশ'এর পালকের হাতে নিধনের মত অপমৃত্যুগুলির দায় আখেরে দুঃখ, দারিদ্র্য, হতাশা, সামাজিক বৈষম্য ও ক্রূরতার উপর বর্তালেও সে সব মৃত্যুর অন্তর্গূঢ় কারণ তো ভালোবাসাই। আমরা যাকে বলতে চাই সংসারটিকে যতই ভালোবাসো অন্তিমে 'মৃত্যুই সত্য, জগৎ মিথ্যা !'

ভিন দেশের কাব্যসাহিত্যের মৃত্যুর ভাষাচিত্র

এই যে কিছুক্ষণ আগে রোহিনীর মৃত্যুর কথা আলোচনা করেছিলাম না -- তখন 'ওথেলো'র ডেসডিমোনার কথা মনে পড়েছিল।
"রোহিনী বলিল, মরিব না, মারিও না। চরণে না রাখ, বিদায় দেও।
গোঃ। দিই।
এই বলিয়া গোবিন্দলাল পিস্তল উঠাইয়া রোহিনীর ললাটে লক্ষ্য করিলেন।
রোহিনী কাঁদিয়া উঠিল। বলিল, মারিও না! মারিও না। আমার নবীন বয়স, নূতন সুখ। আমি আর তোমায় দেখা দিব না, আর তোমার পথে আসিব না। এখনই যাইতেছি। আমায় মারিও না।
গোবিন্দলালের পিস্তলে খট্ করিয়া শব্দ হইল। তার পর বড় শব্দ, তার পর সব অন্ধকার ! রোহিনী গতপ্রাণা হইয়া ভূপতিতা হইল।"
এবার সাহিত্যবিশ্বের স্বরাট, মানবচরিত্রের অন্তর্দ্বন্দ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ নাট্যকার সেক্ষপিয়রের একটি সৃষ্টি:

 
"Des.O, banish me, my lord, but kill me not! 
Oth. Down strumpet.
Des. Kill me to-morrow ; let me live to-night.
Oth. Nay, an you strive ----
Des. But half an hour !
Oth. Being done, there is no pause.
Des. But while I say one prayer !
Oth. It is too late.    (Smothers her).
Des. O lord, lord, lord !"
                 (Othello ; Act 5, Scene 2)


যদিও স্থান, কাল, চরিত্র, বিষয় ও ভাষার দুরধিগম্য দূরত্ব বিদ্যমান তবু এই হননক্রিয়ার নৃশংসতা একই প্রকার বীভৎস, নারকীয়।
এমনই আরও বহু জিঘাংসা, রিরংসা, হিংসা, প্রতিহিংসা-জনিত রক্তপিপাসা, রক্তপিপাসুর নিরাবরণ চিত্রই না অঙ্কন করে গিয়েছেন এই দৈবদৃষ্টিসম্পন্ন মহান স্রষ্টা, চিত্রায়িত করেছেন মৃত্যুর অনিবার্যতা। 

"To be or not to be, that is the question : Whether 'tis nobler in the mind to suffer
The slings and arrows of outrageous fortune,
Or to take arms against a sea of troubles,
And by opposing them ? To die, to sleep--
No more ; and by a sleep to say we end
The heart-ache, and the thousand natural shocks
That flesh is heir to. 'Tis a consummation Devoutly to be wish'd. To die, to sleep ;
To sleep, perchance to dream. Aye, there's the rub ;
For in this sleep of death what dreams may come,
When we have shuffled off this mortal coil,
Must give us pause...." 

Hamlet-এই দীর্ঘ ভাষণের (এটি স্বগতোক্তি‌, soliloquy) মধ্যে ধ্বনিত হয়েছে মৃত্যু সম্পর্কে নাট্যকারের অন্তর্লোকের উপলব্ধি। 'হওয়া' বা 'না-হওয়া', 'থাকা' বা 'না-থাকার' অর্থ কি ? 'থাকা' বা বেঁচে থাকার মানে হোল তো তাই -- ভয়ঙ্কর, অজানা, অপ্রত্যাশিত নিয়তির (fortune) ছোঁড়া তীক্ষ্ণ তীর আর কঠিন প্রস্তরখন্ডের আঘাতে জর্জরিত হয়ে থাকা, বা জীবনের অসংখ্য, অনন্ত কষ্টের, যন্ত্রণার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করা। কিন্তু পূর্ণরূপে এই অন্তহীন প্রতিকূলতাকে প্রতিহত করতে হলে এক মাত্র উপায় -- to die, to sleep-- no more ; হয় মরণকে বরণ কর ; নয় (চিরকালের) নিদ্রার আশ্রয় নাও। মানুষ হয়ে জন্মেছ ; অতএব অনুপেক্ষণীয় ভাবে ভোগ করতে হবে মানসিক ক্লেশ, দৈহিক পীড়া এবং শোক ও সন্তাপ। সুতরাং মৃত্যু, মৃত্যুই জীবন সংগ্রামের চরম পরিসমাপ্তি, একমাত্র পরিপূর্ণতা বলে ভক্তিভরে' বরণ করতে হবে--''Tis consummation Devoutly to be wish'd''. মৃত্যু তো ঘুমেরই বিকল্প কিন্তু মৃত্যুরূপী ঘুম আনতে পারে দুঃসহ দুঃস্বপ্নের বিভীষিকাও --- এবং তা আত্মহননের প্রবৃত্তির বাধা হয়ে দাঁড়ায় --acting as a 'rub' or obstacle to suicide. (খ্রিষ্টীয় ধর্মদর্শনের দিকে ইঙ্গিতবাহী উচ্চারণ (utterance).

"To sleep, perchance to dream. Ay, there's
           the rub ;
For in that sleep of death what dreams may come,
When we have shuffled off this mortal coil,
Must give us pause."
'Hamlet- এর এই দীর্ঘ স্বগতোক্তির মধ্যে জীবন, মৃত্যু ও আত্মহননের উপর সুগভীর আত্মমগ্নতাজনিত দার্শনিক ‌উপলব্ধি অভিব্যক্ত হয়েছে। সমগ্র স্বগতোক্তিটির মধ্য দিয়ে অনুরণিত হয়েছে জীবনের মূল্য কি ? জীবন থাকলেই বা কি জীবন গেলেই বা কি ? "That's the question"-- unsolvable, unknowable. 

জীবন ও জগতের প্রতি এরূপ চিন্তা 'শূন্যবাদে'র দিকে নিয়ে যায় যা আমরা প্রবন্ধের প্রথমেই, বৌদ্ধ দর্শনের নির্বাণতত্বের আলোচনাকালে বলেছি। পাশ্চাত্য চিন্তায় যাকে Nihilism-- নাস্তিক্যবাদ বা ধংসবাদ বলা হয়েছে। মৃত্যুই একমাত্র সত্য, জীবনের কোন পরম লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য নেই ; শুধুমাত্র কিছুদিন, কালের একটি ভগ্নাংশ খণ্ডে, যার আবার নিশ্চয়তা বলে কিছু নেই, কোলাহলপূর্ণ পৃথিবীতে বেঁচে থেকে শেষ হয়ে যাওয়া ! মহানাট্যকার এমন কথা আরও তীব্রতর, তীক্ষ্ণতর ভাবে বলেছেন তাঁর 'ম্যাকবেথ' নাটকে--- 

মানসিকভাবে বিধ্বস্ত ম্যাকবেথ (... Direness, familiar to my slaughterous thoughts, cannot once start me). ওদিকে অন্দরমহল থেকে ভেসে আসছে কান্নার রোল। (স্রষ্টার সৃষ্টিতেই যাই)--
"Re-enter Seyton.
Mach. Wherefore was that cry ?
Sey. The queen, my lord, is dead.
Mac, She should have died hearafter ;
There should have been a time for such a ward.
Tomorrow, and tomorrow, and tomorrow,
Creeps in this petty pace from day to day
To the last syllable of recorded time,
And all our yesterdays have lighted fools
The way to dusty death. Out, out, brief  candle !
Life is but a walking shadow, a poor player,
That struts and frets his hour upon the stage,
And then is heard no more ; it is a tale
Told by an idiot, full of sound and fury,
Signifying nothing."
"হায়, চলমান ছায়া এ জীবন।
বিশ্বরঙ্গমঞ্চে দর্পভরে হাঁটে কিছুক্ষণ,
অস্থির চিত্তে, দুর্ভাবনার বিড়ম্বনা সহ্য করে' করে'
হেঁটে-চলে ঘুরে বেড়ায় বরাদ্দকৃত
ক্ষণিক সময়কাল টুকু --  
তারপর হারিয়ে যায় চির-নৈঃশব্দ্যের অন্তরালে,
মুছে দিয়ে চিরতরে পদচিহ্ন তার !" ৩
একেবারেই নিষ্ঠুর সত্যের নিরাবরণ ভাষামূর্তি ; যেমন পিকাশোর (Pablo Picasso 1881- 1973) 'চুম্বন' (the kiss), জীবন-মৃত্যুর মায়া-ছায়ার আলিঙ্গন !

(বাকি অংশ পরবর্তী ৪র্থ পর্বে)
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১৫/০২/২০২৬
কলকাতা।
_____________________________________

















1 টি মন্তব্য:

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...