শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

মৃত্যু সত্য জগৎ মিথ্যা-- পর্ব ২

মৃত্যু সত্য, জগৎ মিথ্যা -- পর্ব ২ 

এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা মাত্র, 'এই যে আমি লিখছি, তুমি পড়ছো' -- এই ক্রিয়া দুটি স্তব্ধ হয়ে যাবার কথা। এই যে এতোদিন আশায়-আকাঙ্ক্ষায়, স্নেহে- প্রেমে, রাগে-অনুরাগে, বন্ধুত্বে-বৈরিতায় আমরা এই পৃথিবীতে রয়েছি, এ ধরার রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ ভোগ করেছি ও করছি -- সবই কি একদিন -- একদিনই বা বলি কেন, যে কোন মুহূর্তে 'না' হয়ে যাবে, এবং যাবেই !
"পথের শেষ কোথায়, শেষ কোথায়, কী আছে শেষে !
      এত কামনা, এত সাধনা কোথায় মেশে।
ঢেও ওঠে পড়ে কাঁদার, ‌ সম্মুখে ঘন আঁধার,
পার আছে গো, পার আছে,  পার আছে কোন দেশে।
আজ ভাবি মনে মনে  মরীচিকা অন্বেষণে, হায়,
বুঝি তৃষ্ণার শেষ নেই। মনে ভয় লাগে সেই--
হাল-ভাঙা পাল-ছেঁড়া ব্যথা চলেছে নিরুদ্দেশে।।"                                                                 -

'ঢেও ওঠে পড়ে কাঁদার' -- এইটিই বাস্তব, এইটিই জীবনের মৃত্যুভীতির হাহাকার ! পিতা- মাতা চায় জীবনের জন্ম দিতে, সেই জীবনকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং 'জীবনে'র নিত্যদিনের, প্রতিটি মুহূর্তর, পল-অনুপলের উচ্চকিত আর্তি, "আমি বাঁচতে চাই, আমি বাঁচতে চাই।" দুর্ঘটনায়, দুর্দৈবে, মন্বন্তরে, মহামারিতে, রাষ্ট্রীয়-সাম্প্রদায়িক-সামাজিক বিপর্যয়ে অর্ধমৃত, মুমুর্ষু মানুষ তার কণ্ঠস্বরের শেষ উচ্চারণে বলে যায়, "বাঁচাও, আমায় বাঁচতে দাও।" শুধু তাই নয়, জীবনকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য, দীর্ঘায়ু লাভের কামনায় মানুষ কত না উপায় খোঁজে, কত না নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান করে, এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাড়ি দেয়। ব্যাধিগ্রস্ত হলে, সহায়-সম্বল হারালে চিকিৎসক, বদ্যি, ধর্মগুরু, জ্যোতিষীদের শরণাপন্ন হয় ; মঠে, মন্দিরে, মশজিদে, গীর্জায় গিয়ে প্রার্থনা করে। মানুষের এ সমস্ত কর্মধারা ধাবিত হয় একমাত্র এই লক্ষ্যে যে সে যেন 'মৃত্যুকে' বলতে পারে, "না" ! অতি পরিচিত এই পরিণতি, 

"অহন্যহনি ভূতানি গচ্ছন্তি যমমন্দিরম্।
শেষাঃ স্থিরত্বমিচ্ছন্তি কিমাশ্চর্যমতঃ পরম্।।"

-- এ দৃশ্য প্রতিনিয়ত জীবিত মানুষেরা দেখছে। তবু তারা 'স্থিরত্বমিচ্ছন্তি', স্থিত হয়েই থাকতে চায়, বাঁচতে চায়। এটিই আশ্চর্য। এখানে নিত্য নিয়মিত মৃত্যু দেখে দেখেও বাঁচতে চাওয়ার মধ্যে আশ্চর্য এই যে 'জীবনের প্রতি এই ভালোবাসার' জন্ম হয় কি ভাবে এবং কেন যখন দেখি মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী ! তার বহু কারণের মধ্যে জীবনের একমাত্র প্রধান কারণ এই যে বিশ্বচরাচরের প্রতি আকর্ষণের বিহ্বলতা, আর বসুন্ধরার প্রতি ভালোবাসা - প্রেম। এই প্রসঙ্গে আমাদের অমর সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'কবি' উপন্যাসের কথা স্মরণে আসে। 

"....... নিতাইও নিজের দুই হাতের বন্ধনের মধ্যে দুর্বল শিশুর মত তাহাকে (বসন্তকে) গ্রহণ করিয়া বলিল --  ভয় কি ? রোগ হ'লেই কি মরে বসন ? শরীর সারলেই --- ও রোগ ভালো হয়ে যাবে।
এবার সে এক বিচিত্র হাসি হাসিয়া বসন্ত নীরবে শুধু ঘাড় নাড়াইয়া জানাইয়া দিল -- না না না। কিছুক্ষণ পরে মুখ ফুটিয়াছে বলিল --আমি আর বাঁচবো না !
তারপর হঠাৎ বলিয়া উঠিল --- আমি জানতাম কবিয়াল ! যেদিন সেই গান তোমার মনে এসেছে ---সেই দিনই জেনেছি আমি।
---- কোন্ গান বসন ?
---- জীবন এত ছোট কেনে -- হায় !
ও ঝর ঝর করিয়া সে কাঁদিয়া ফেলিল। নিতাইয়ের ছোখে এবার জল আসিল। সঙ্গে সঙ্গে অসমাপ্ত গানটা আবার মনে গুঞ্জন করিয়া উঠিল ---
এই খেদ মোর মনে,
ভালবেসে মিটল না সাধ এ জীবনে।
হায় ! জীবন এত ছোট কেনে,
এ ভূবনে ?
কিন্তু গানটি অসমাপ্তই থাকছে। মৃত্যুতাড়িত জীবনের গান তো অসমাপ্তই !"

বসন্তের মৃত্যু আসন্ন ; সে কথা বসন্ত জেনে গিয়েছে, নিতাইও। ছটফট করছে বসন্ত। হঠাৎই কয়েক মুহূর্তের জন্য শান্ত হয়ে গেল সে। বড় বড় চোখ ছোট তার, সেই দুটি চোখ আরও বিস্ফারিত করে নিতাইয়ের মুখের দিকে তুলে বলল --- "আমি মরছি ?"
"নিতাই ম্লানহাসিমুখে তাহার কপালে হাত বুলাইয়া দিয়া এবার বলিল --- ভগবানের নাম --- গোবিন্দের নাম করলে কষ্ট কম হবে বসন।
---- না। ছিলা-ছেঁড়া ধনুকের মতো বিছানার উপর লুটাইয়া পড়িয়া বসন্ত বলিল ---না। কী দিয়েছে ভগবান আমাকে ? স্বামীপুত্র ঘরসংসার কী দিয়েছে? -- না।"

সাহিত্যের ভিতরে, গভীরে সমাজদর্শনের বাস্তব দৃষ্টিপাত করে তারাশঙ্কর বুঝিয়ে দিলেন কেন তিনি উপন্যাসে ও ছোট গল্পের অপরাজেয় শিল্পী। (অসহায় নিতাই বসন্তের এই অভিযোগ নিজের উপরই নিয়েছিল)। বসন্ত-নিতাইদের সম্প্রদায় নেহাতই লোকায়ত চিন্তাজগতের বসবাসকারী মানুষ। নিতাইয়ের ভগবান-গোবিন্দের উপর বিশ্বাস, জীবনের পরপারে ঈশ্বরের আশ্রয় প্রার্থনা --- এই যে ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কার --- সেটি উপনিষদীয় প্রজ্ঞার প্রকাশ নয়, যা প্রকৃতপক্ষে আমাদের, বিশেষ করে বাঙলার, চৈতন্য মহাপ্রভু সাধিত ও প্রচারিত 'প্রেমধর্মের'ই উচ্ছ্বাস। তাঁর প্রেম-ভক্তির অনুরাগরসসিক্ত ধর্মধারণা বাঙলার ঘরে ঘরে, আচণ্ডালে, আপামর জনসাধারণের মধ্যে কি যে বিপুল প্রভাব ফেলেছিল, ফেলেছে -- তারই মূর্তিমান উদাহরণ এই নিতাই। ভগবানের নাম --- গোবিন্দের নাম যে শেষের শান্তি, মৃত্যুযন্ত্রণা উপসমকারী --- লোকায়ত সমাজমানসেও তা বদ্ধমূল হয়েছে, হয়ে আছে। 

বসন্ত নিতাইয়ের কথা মেনেছিল। তারই প্রতি একান্ত ভালোবাসায়, তাকেই ভগবানের আসনে বসিয়ে তার আদেশ পালন করেছিল নিতাইয়ের বসন। " বসন্ত এপাশে ফিরিয়া তাহারই দিকে চাহিয়া বলিল --- গোবিন্দ, রাধানাথ দয়া কর। আসছে জন্মে দয়া ক'রো।"

"আসছে জন্মে" বসন্তের সাধ যেন মেটে। যেন সে 'স্বামীপুত্রসংসার' পায়। মৃত্যুর পর স্বর্গ চায়না বসন্তরা, চির অবলুপ্তিও (পরিণির্বান) মেনে নিতে পারেনা, অতৃপ্ত 'তৃষ্ণা' মেটাতে আবার এই 'মৃত্যুময়' পৃথিবীতেই ফিরে ফিরে আসতে চায়। 

বসন্ত নিতাইয়ের 'ভালবাসার সাধ না মেটার' আর্তনাদ  একজোড়া নরনারীর অন্তর থেকে বেরিয়ে এসে, সমগ্র প্রাণ জগৎকে ভাসিয়ে দিয়ে এক চিরবহমান, ভূমণ্ডলগ্রাসী অতলান্ত অশ্রুনদীর মত বইতে থাকে। নিরুত্তর আকাশের দিকে চেয়ে থাকে, মরীচিকার বিদ্রুপের মত আশার আলোকের উৎস খুঁজে, সঙ্গীতের সুর শুনে মনে হয়, "আমার আশেপাশে দাঁড়িয়ে কে যেন বিনিয়ে বিনিয়ে কাঁদছে।" 

বসন্ত মরে গেল। বসন্ত-হারা নিতাইয়ের বিরহবেদনার অন্তর্দাহী কথাশিল্প যাঁরা পড়েছেন তাঁরা জানেন। আমরা শেষ করবো এই কথা বলে যে বসন্তের সঙ্গে প্রেম-বিরহ সম্পর্ক নিতাইকে শুধু আরো আবেগময় কবি করে তুলেছিল, এমন নয়, তাকে দার্শনিকও করে তুলেছিল ; কিন্তু এমন এক 'দর্শন' সে লাভ করেছিল যাকে লোকায়তিক 'প্রেমের দর্শন'  বলাই যুক্তিযুক্ত। সে গান বেঁধেছিল-- 

"মরণ তোমার হার হোল যে মানের কাছে
ভাবলে যারে কেড়ে নিলে সে যে দেখি
মনেই আছে
মনের মাঝেই বসে আছে।..." 

এই স্মরণের মাধ্যমেই 'মৃত্যু' জীবনের কাছে একদিকে যেমন হার মানে, তেমনি মৃত্যুপথযাত্রীকেও 'নরক' নামক কাল্পনিক, ধর্মীয় সংস্কার-লালিত, নিরন্তর চিতাবহ্নিপ্রজ্বলিত দেশে চিরনির্বাসনের আতঙ্ক থেকে শেষ মুহূর্তের মুক্তি দিয়ে যায়। না যদি এমন হোত, তবে 'জীবন', নিরানন্দঘেরা অন্ধকার হতাশায়, অলস নৈষ্কর্মের মধ্যে দুটো দিন বেঁচে থেকে স্তব্ধ হয়ে যেতো।

তারাশঙ্করের উপন্যাসে, ছোটগল্পে বহু মুমুর্ষু প্রাণের মৃত্যুযন্ত্রণা, মৃত্যুবোধ, মৃত্যুভীতির অনন্যসাধারণ সব বর্ণনা আছে। সে সব স্থানে লেখকের অন্তর্দেশের অনুভব, অনুভূতি, আসন্ন মৃত্যুর শেষ-শয্যায়-শায়িত চরিত্রগুলির সঙ্গে তাঁর একাত্মতা এমন মরমী ভাষায় প্রকাশ পেয়েছে যার তুলনা বিপুল বাঙলা সাহিত্যের ভাণ্ডারে দুর্লভ। এমনকি ভিন দেশের সাহিত্যে সহজলভ্য নয় এবং তা এই কারণেই যে সেখানে মৃত্যুর বিভীষিকাময় রূপের প্রাধান্যই বেশি। জীবনের এই যে ট্রাজিক পরিণতি--  মৃত্যু, তার ভয়ানক সব চিত্রকল্প আমরা পেয়েছি গ্রীস দেশের প্রাচীন নাট্যকারত্রয়ী এসকাইলাস (Aeschylus, আনু. ‌৫২৫-৪৫৬ খ্রিঃ পূঃ), ইউরিপিদিস (Europides, আনু. ৪৮৫- ৪০৬ খ্রিঃ পূঃ) ও সোফোক্লিসের (Sophocles, আনু. ৪৯৭-৪০৬)  রচনায়। এই সকল নাটকগুলির বিষয়বস্তুই ছিল মানুষের ইচ্ছা ও ভাগ্যের দ্বন্দ্ব, অনুপেক্ষণীয় নিষ্ঠুর দৈব প্রভাব (দেবতাদের দ্বারা মানুষের জীবন ও ভাগ্যের নিয়ন্ত্রণ), আত্মদর্পের নির্মম পরিণাম, পারিবারিক এবং রাজনৈতিক বিদ্রোহ, বিপজ্জনক অহংকার ও ঔদ্ধত্য (arrogance). এবং এই নাটকের শেষ অঙ্কে দর্শকদের অন্তর জুড়ে জেগে ওঠে এক অদ্ভুত অনুভূতি যাকে সমালোচকেরা বলেছেন catharsis -- আবেগের মুক্তি ও হতভাগ্যের প্রতি করুণা।
কিন্তু এই 'catharsis' এমন এক করুণা যার সঙ্গে যুক্ত থাকে নিজেকে শান্ত করার অদম্য আগ্রহ। অপরদিকে মৃত্যুর ট্রাজিক যন্ত্রনা-ভোগকারীর প্রতি সহমর্মিতা বোধে একাত্ম-হয়ে-যাওয়া ভারতীয় সমাজের অতি কোমল, দরদী আকুলতা মূর্ত হয়ে ওঠে তারাশঙ্কর, শরৎচন্দ্রের সৃষ্টিতে। আলোচনা সামান্য দীর্ঘায়িত করে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুচেতনা, যা অন্তিমে উপনিষদীয় পূর্ণতার আলোকাশ্রয়ী--(তাঁর অন্তর্বেদনার গভীরের এবং ব্যপ্তির কথা, নানা সুরের কথা, ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তিত, বিবর্তিত হওয়ার কথা এই স্বল্প পরিসরে অসম্ভব তো বটেই, এমনকি সে কথা আলোচনা করবার ধৃষ্টতাও আমার নেই)-- তেমনই যেন তারাশঙ্করের সৃষ্টিতে কোথাও কোথাও লক্ষ্য করা যায়।
"তাই 'আরোগ্য নিকেতন' উপন্যাসে মৃত্যুর রূপ-কল্পনা উপনিষদের প্রভাবপ্রসূত বললে ভুল বলা হয় না। মৃত্যুর জন্য শান্ত সমাহিত প্রতীক্ষার ধ্যান অসম্ভব কিছু নয়। মৃত্যু চুড়ান্ত কোনও অবসান নয়, এই প্রত্যয়ে যদি কেউ স্থিত হতে পারেন, মৃত্যু জীবনেরই সহায়ক এবং সূর্য যেমন জগতের ও জীবনের পরিপোষক, তেমনই যম তথা মৃত্যু ও জগতের ও জীবনের নিয়ামক, মৃত্যুর ধারাই প্রাণধারার অপরিহার্য পরিপূরকমাত্র, এই যদি 'সত্য' হয়, যা হলে সত্যনিষ্ঠ মুমূর্ষুর শান্ত-সমাহিত প্রার্থনা বা উপাসনার ভাষায় সূর্য ও যম তথা জীবন ও মৃত্যু একাকার হয়ে উঠতে, পরস্পরের পরিপূরক হয়ে উঠতে বাধা কোথায় ?...." 

এই উপন্যাসের অষ্টাদশ পরিচ্ছদে আমরা দেখি, বিগত রাত্রির দীর্ঘ, চিন্তান্বিত জাগরণের ফলে সকালবেলা দেরিতে ঘুম ভেঙেছে জীবনমশাইয়ের। জেগে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর মনে পড়ে গেল গণেশ ভটচাজের সেই অসুস্থ মেয়েটির কথা। উৎকণ্ঠিত বোধ করলেন -- কেমন আছে সে ! কিন্তু শান্তচিত্তে উৎকণ্ঠা প্রশমিত করে, "হাত জোড় করে জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন, -- নমঃ বিবস্বতে ব্রাহ্মণভাস্বতে বিষ্ণুর্তেজসে জগৎসবিত্রে সূচয়ে সবিত্রে কর্মদায়িনে -- নমঃ।

মৃত্যুধ্রুব এই পৃথিবীতে এত চঞ্চল হলে চলবে কেন ?"
বস্তুত 'আরোগ্য নিকেতন' উপন্যাসে "ভারতীয় দৃষ্টিতে মৃত্যুকে তিনি যে ভাবে বিশ্লেষণ করেছেন, তাতে তাঁর নিষ্ঠা ও পাণ্ডিত্যের গভীর পরিচয় থাকলেও সেই বিশ্লেষণ প্রাণের প্রাচুর্যে উদ্দীপ্ত নয়, জীবনরসরসিকতায় অভিসিঞ্চিত নয়। ভারতীয় ঐতিহ্যেকে, এক্ষেত্রে উপনিষদিক মৃত্যুভাবনাকে (সঙ্গে তো কবিরাজি ও পাশ্চাত্য চিকিৎসাবিধির তথা পূরাতন ও নূতন দৃষ্টিভঙ্গির দ্বন্দ্বের চিত্র আছেই) প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য কৃতসঙ্কল্প লেখকের উদ্যোগ আয়োজন বেশ প্রকটরূপেই অনুভূত হতে থাকে।"
অবশ্য তাঁর ও পূর্ব পূর্ববর্তী, বাঙলার উপন্যাসের আলোকবর্তিকা প্রদর্শক ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও 'মৃত্যু' প্রতি তাঁর রচনায় ওই 'স্বর্গলোকের' প্রলোভনই দেখিয়েছেন। তাঁর 'চন্দ্রশেখর' উপন্যাসে 'মহাভারতের' শব-আকীর্ণ কুরুক্ষেত্রের মতো এক মৃত্যু- প্রান্তরের দৃশ্য উৎকীর্ণ করেছেন।
" চন্দ্রশেখর বলিলেন, "আমি প্রতাপের জন্য অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হইতেছি।
রামানন্দ স্বামী বলিলেন, "আমি তাহার তত্ত্ব লইয়া আসিতেছে।
এই বলিয়া রামানন্দ স্বামী চন্দ্রশেখর ও শৈবলিনীকে বিদায় করিয়া দিয়া যুদ্ধক্ষেত্রাভিমুখে যাত্রা চলিলেন।সেই ধূমময় আহতের আর্তচিৎকারে ভীষণ যুদ্ধক্ষেত্রে অগ্নিবৃষ্টির মধ্যে, প্রতাপকে ইতস্ততঃ অন্বেষণ করিতে লাগিলেন। দেখিলেন, কোথাও শবের উপর শব স্তূপাকৃত হইয়াছে --- কেহ মৃত, কেহ অর্ধমৃত, কাহারও অঙ্গ ছিন্ন, কাহারও বক্ষ বিদ্ধ, কেহ 'জল ! জল !' করিয়া আর্তনাদ করিতেছে --- কেহ মাতা, ভ্রাতা, পিতা, বন্ধু প্রভৃতির নাম করিয়া ডাকিতেছে। রামানন্দ স্বামী সেই সকল শবের মধ্যে প্রতাপের অনুসন্ধান করিলেন, পাইলেন না। ........ পরে একজন পলায়নপর সিপাহীর কাছে 'কেবল একজন বীর হিন্দু যোদ্ধার' কথা শুনে, যখন 'আহত, মৃতপ্রায়, তখনো জীবিত' প্রতাপের সন্ধান পেয়েছিলেন তখন প্রতাপের শেষের কথাগুলি বাংলা সাহিত্যে এই প্রথম একটি বিশেষ দিক নির্দেশ করে, যার উপলক্ষ্য 'ভালোবাসার জন্য মৃত্যুবরণ'। 

"কি বুঝিবে, তুমি সন্নাসী ! এ জগতে মনুষ্য কে আছে যে আমার এ ভালোবাসা বুঝিবে ? কে বুঝিবে, আজি এই ষোড়শ বৎসর, আমি শৈবলিনীকে কত ভালোবাসিয়াছি। পাপচিত্তে আমি তাহার অনুরক্ত নহি --- আমার ভালোবাসার নাম --- জীবন বিসর্জনের আকাঙ্ক্ষা।..... এ জন্মে এ অনুরাগে মঙ্গল নাই বলিয়া, এ দেহ পরিত্যাগ করিলাম।" 

কিন্তু এই 'মানবিক ভালবাসার' মধ্যে পাপ-পুন্য  বিচারের অবতারণা করা হয়েছে যা ভারতের বৈদিক ও বৈদান্তিক ধ্যানধারণার প্রকাশ পেয়েছে যা কিছুটা ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রের আর্য মূল্যবোধের প্রতি ঝোঁক (তাঁর গীতার ব্যাখ্যায়, 'কৃষ্ণচচিত্রে' লক্ষ্যণীয়) এবং তাইই যেন উদ্ঘোষিত হয়েছে রামানন্দ স্বামীর প্রতাপের প্রতি বিদায়বাণীতে,
"...... ইন্দ্রিয়জয়ে যদি পুণ্য থাকে, তবে অনন্ত স্বর্গ তোমারই। যদি চিত্তসংযমে পুণ্য থাকে, তবে দেবতারাও তোমার তুল্য পুণ্যবান্ নহেন। যদি পরোপকারে স্বর্গ থাকে, তবে দধীচির অপেক্ষাও তুমি স্বর্গের অধিকারী। প্রার্থনা করি, জন্মান্তরে যেন তোমার মত ইন্দ্রিয়জয়ী হই।

রামানন্দ স্বামী নীরব হইলেন। ধীরে ধীরে প্রতাপের প্রাণ বিমুক্ত হইল। তৃণ-শয্যায় অনিন্দ্যজ্যোতিঃ স্বর্ণতরু পড়িয়া রহিল।"
এবার ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্রের মন্তব্য,
"তবে যাও, প্রতাপ, অনন্তধামে। যাও, যেখানে ইন্দ্রিয়জয়ে কষ্ট নাই, রূপে মোহ নাই, প্রণয়ে পাপ নাই,  সেইখানে যাও ! যেখানে সুখ অনন্ত, প্রণয় অনন্ত, সুখে অনন্ত পুণ্য, সেইখানে যাও। যেখানে পরের দুঃখ পরে জানে, পরের ধর্ম পরে রাখে, পরের জয় পরে গায়, পরের জন্য পরকে মরিতে হয় না, সেই মহৈশ্বৈর্যময় লোকে যাও ! লক্ষ শৈবলিনী পথপ্রান্তে পাইলেও, ভালোবাসিতে চাহিবে না।"


আমরা দেখলাম মুমুর্ষু, অর্ধমৃত, শোণিতলাঞ্ছিত শবদেহের স্তুপ পেরিয়ে গেলেন রামানন্দ স্বামী --- কেমন যেন নির্বিকার, পৌঁছে গেলেন আসন্নমরণ প্রতাপের কাছে, 'প্রতাপের শৈবলিনীর প্রতি ভালোবাসার' কথাও যা হোল এবং অন্তিম সময়ে প্রাণহীন প্রতাপের জন্য যে আশীর্বাদ বাণী তিনি ব্যক্ত করলেন -- সমস্তটির মধ্যে মর্ত্যলোকের জীবনের প্রতি মোহ, জীবনের যন্ত্রণার প্রতি মর্মান্তিক ব্যাকুলতা, মৃত্যুজনিত শোকোচ্ছ্বাস যেন শীতলতায় নির্জীব, ঔদাসীন্যে পাষাণ!

কিন্তু তারাশঙ্করের 'কবি' এমন এক লোকায়ত জীবনের উপন্যাস যেখানে মৃত্যুর ভাবনা, মৃত্যুর অকাল সংঘটন অনেক বেশি উষ্ণ, বিয়োগান্তক ও মানবিক। ঠিক যেমন শরৎচন্দ্রের 'দেবদাস' উপন্যাসটিতে আমরা পাই।  লোকায়ত ভাবনায় মৃত্যুর রূপ কী নিদারুণ, বিয়োগান্তক ও দুঃসহ বেদনাবোধের জন্ম দেয় ----
(রচনার পরবর্তী ৩য় পর্বে তা আলোচিত)

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১২/০২/২০২৬
কলকাতা।



















কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...