বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

মৃত্যু সত্য, জগৎ মিথ্যা -- উপসংহার

মৃত্যু সত্য জগৎ মিথ্যা (উপসংহার)

ধর্মমত অসংখ্য (লোকায়ত ধর্মমতগুলি নিয়ে), ধর্মপথও বিচিত্র ও বহু দিকে সে-সকল পথের বিস্তার। বিভিন্ন ধর্মধরণার ধর্মপ্রবক্তারা অবতীর্ণ হয়েছেন, তাঁদের মত প্রকাশ করেছেন এবং সেই মতের প্রচারক গুরুদের আবির্ভাব ঘটেছে। তাঁরা পরম্পরাগতভাবে তাঁদের ধর্মীয় নীতি, ধর্মপালনের রীতি কখনো স্মৃতিগ্রন্থ আকারে, কখনো স্মৃতিশাস্ত্ররূপে লিখিতভাবে প্রকাশিত হয়েছে। ধর্মপ্রাণ মানুষ নিজ নিজ ইচ্ছায়, বা ধর্মমতগুলির আদর্শের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে, ভিন্ন ভিন্ন ধর্মে দীক্ষা নেন এবং ধর্মপালন করেন।
ধর্ম যেমন মানুষের জীবনযাপন, জীবনাচরণের ধারা ও ধারণাকে প্রভাবিত করে, নিয়ন্ত্রণ করে, তেমনি মানুষের সমাজকে নীতিবোধ, বিচার, ও শৃঙ্খলার বন্ধনে আবদ্ধ করে রাখে। এমনটিই ধর্মাদর্শের মূল কথা। কিন্তু ইতিহাস বলে তেমনটি হয় না, হয় নি ; কেননা আপন ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার দুর্বার কামনায়, ধর্মান্তরিত করার অদম্য আগ্রহে অন্য ধর্মের উপর, অন্য ধর্মাবলম্বীদের উপর আক্রমণ, নির্যাতন করা,  এমনকি তাদের বিধর্মী চিহ্নিত করে হত্যা করার অজস্র ঘটনা সংঘটিত হয়েছে, হয়ে আসছে, বিশেষ করে, প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মগুলির প্রবর্তনার সময়কাল থেকেই।
(এ-প্রসঙ্গে আমার 'বিন্দুতে সিন্ধু দর্শন' -প্রথম খণ্ডে দীর্ঘ প্রবন্ধ আছে)।

ধর্মমতগুলি, বিশেষতঃ 'অস্তিবাদী' ধর্মমতগুলি একটি ভয়ঙ্কর প্রলোভন দেখিয়ে, মানুষকে তার আত্মচেতনা থেকে উৎপাটিত করে, কাল্পনিক এক স্বর্গীয় জগতের কামনায় উন্মাদ করে দেয়। সে যে পৃথিবীতে আছে, যে সমাজে আছে, যে পার্থিব জীবনের বন্ধনে বাঁধা আছে -- সেই বাস্তব, প্রাণময় সংসার থেকে তাকে নির্বাসিত করে দেয়। হয় সে জীবনের অবশ্যম্ভাবী ত্রিতাপ (আধিদৈবিক, আধিভৌতিক ও আধ্যাত্মিক) দুঃখ থেকে মুক্তি পেতে চায়, নইলে দেবতাদের চিরসুখের আশ্রয়) স্বর্গলাভের বাসনায় কৃচ্ছ্রসাধনায় দেহ-মন সমর্পণ করে।

শ্রীমদ্ভগবদগীতা এবং উপনিষদের আলোচনাকালে এই বিষয়সমূহের উপর আলোকপাত করা হয়েছে। সেখানে আমরা দেখেছি একমাত্র প্রাচীন ভারতীয় ধর্মধারণার মধ্যেই সত্যের যথার্থ অন্বেষণ করা হয়েছে। মানবচিন্তনের আদিতম প্রকাশ বেদসংহিতা ও পরবর্তী কালে ব্রাহ্মণসংহিতা, এক এবং একমাত্র 'ঈশ্বরের' মূর্ত মূর্তির কথা বলেন নি ; প্রজাপতি, সবিতা (সূর্য) ইন্দ্র, বরুণ, মিত্র, মরুৎ, অশ্বিনীকুমারদ্বয় প্রভৃতি বহু দেবতার উল্লেখ থাকলেও মহর্ষি যাস্ক বললেন বেদের দেবতাগণ এক সর্বব্যাপী পরমাত্মার ভিন্ন ভিন্ন রূপ। এবং এই দেবতাবিষয়ক ধারণার সংহত রূপ আমরা পেলাম বেদান্ত বা উপনিষদগুলির মধ্যে। এই চরাচরব্যপ্ত পরমাত্মা 'ব্রহ্মরূপে' আলোচিত হয়েছেন। তিনিই স্রষ্টা, তাঁর মধ্যেই সৃষ্টির অস্তিত্ব এবং তেনাতেই সৃষ্টির বিনাশ। এই ব্রহ্মের ধারণা প্রাচীন ভারতীয় ধর্মধারণার ও ধর্মদর্শনের মূল ভাব ও ভাবনায় গভীরভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে এবং আজও তা শুধু প্রাচ্যভূমিতে নয়, পাশ্চাত্য দেশের দার্শনিক মতবাদগুলিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।‌ প্রাচীন ভারতীয় ধর্মদর্শনে এই ব্রহ্মই পরম চৈতন্যসত্ত্বা। ব্রহ্ম বা চৈতন্যসত্ত্বা অনাদি, অনন্ত, অক্ষয়, অব্যয়, অব্যক্ত অনির্বচনীয় এক অস্তিত্ব যিনি নির্বিকার। তাঁরই 'ইচ্ছা' এই সৃষ্টি। এই সৃষ্টির মধ্যে ওই পরমচৈতন্যের আলো আমার, অর্থাৎ ব্যক্তিপ্রাণের মধ্যেও বিদ্যমান। তাই 'বেদান্ত' প্রমাণ করেছেন যে সেই মর্ত্যলোক-অমর্ত্যলোক পরিব্যাপ্ত পরমচৈতন্যের লীলা যদি অনুভব ও অনুধাবন করা যায় তবে এই জ্ঞানে স্থিতিলাভ করা যায় যে 'আমি'ও এই সৃষ্টির একটি সম্বিৎ-কণা,  একমাত্র তখনই মৃত্যুভয় থেকে 'মুক্তি' সম্ভব। এই 'মুক্তি' শোক-সন্তাপ-বিষাদ-বিহীন এক অসীম আনন্দলোক। ব্রহ্মই আনন্দস্বরূপ পূর্ণসত্ত্বা। তার থেকেই বিশ্বচরাচর, সমস্ত দৃশ্যমান, অদৃশ্য ভূতূসত্ত্বার আগমন এবং তাঁর কাছেই প্রত্যাগমন।
"যতো ইমানি ভূতানি জায়ন্তে যেন যাতানি জীবন্তি।
তৎ প্রয়ন্তাভিসংবিশন্তি তৎ বিজিজ্ঞাসস্ব তৎ ব্রহ্মেতি।।" 
             -- তৈত্তেরীয় উপনিষদ - ৩/১
যাঁ থেকে এই অখিল বস্তুসমূহ ও ভূতবর্গ উৎপন্ন হয়েছে, উৎপন্ন হয়ে যাঁর আশ্রয়ে বেঁচে আছে, শেষে যাঁর পূর্ণসত্ত্বায় বিলীন হয় --- তাঁকেই জানতে হবে। তিনিই ব্রহ্ম।
সৃষ্টির কণামাত্র যদি তাঁর কাছ থেকে এসে তাঁতেই লয় প্রাপ্ত হয় তবে মৃত্যুর ধারণার মধ্যে কোনো সত্য নেই। এই ধারণাকে ধারণ করলে তো নিখিল জগতে, বিশ্বমানব-সমাজে কোন দ্বিমত, কোন দ্বন্দ্ব থাকে না।
জীবাত্মা চির শাশ্বত পরমাত্মার অংশ।
"অসূর্যা নাম যে লোকা অন্ধে তমসাবৃতাঃ।
তাংস্তে প্রেত্যাভিগচ্ছন্তি যে কে চাত্মহনো জনাঃ।।"
                   --- ঈশা উপনিষদ-- মন্ত্র ৩।

এই মন্ত্রে অতি সাংকেতিক ভাষায় এক গভীর দার্শনিক সত্য প্রকাশিত হয়েছে। নিজের দেবত্ব ( পরমাত্মা বা ব্রহ্মের অংশ) অচেতন হয়ে জীবনযাপন করলে সে জীবন নিতান্তই তুচ্ছ হয়ে যায়, অন্ধকারে নিমজ্জিত দুঃখময়, যন্ত্রনাক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। এই মন্ত্রে যে অন্ধকারের কথা বলা হয়েছে, তা জীবনদর্শনের অন্ধকার, অজ্ঞানতার অন্ধকার এবং আত্মচেতনাহীনতার অন্ধকার। পুরাণ কাহিনীত যে নরক (অসুরদের আবাসস্থল)-এর কথা বলা হয়েছে, যে স্থান 'অসূর্যা' --সূর্যরস্মিবিহীন, আত্মসচেতনতাহীন, ইন্দ্রিয়সর্বস্ব মানুষ, সেই স্বরচিত নরকে বাস করে' মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করে।
তাই উপনিষদ বলছেন চৈতন্যহীনতাই মৃত্যু, চৈতন্যলাভ করাই মৃত্যুহীন অস্তিত্বের বোধ ও সংবিদ্।
বর্তমান যুগের যুগপুরুষ, 'সর্বধর্মসমন্বয়ের' বাণী যাঁর শ্রীমুখনিঃসৃত, 'যত মত তত পথে'র যিনি প্রবক্তা, যিনি মাতৃসাধক ও মানবতার পূজারী তিনি তাঁর শিষ্যদের ও ভক্তদের (কল্পতরুরূপে) এই বলে আশীর্বাদ করেছিলেন,
"তোমাদের চৈতন্য হোক্।"

'চৈতন্যসাধনাই' মানবধর্মের শেষ কথা, জ্ঞানের পূর্ণ, জ্যোতির্ময় প্রকাশ। এই জ্ঞানের আলোকবর্তিকা মৃত্যুভীতির বিভীষিকাময় অন্ধকার থেকে মুক্তি দিয়ে এক মৃত্যুহীন আলোকিত জগতের কামনা জাগিয়ে তোলে।‌ 'স্বর্গ' লাভের জন্য অপরকে হত্যা বা পাপাচারসঞ্জাত সন্তাপে আত্মহননের প্রবৃত্তি থেকে মুক্ত করে। বিশ্বাত্মার সঙ্গে একাত্মতার অনুভবে মানুষ মৃত্যুঞ্জয়ী হতে পারে। দেহ থাকে না ; কিন্তু দেহাতীত সত্ত্বা থেকে যায়। নইলে প্রাণের চিরবহমান ধারা স্তব্ধ হয়ে যেত।

"ওঁ আসতো মা সদ্গময়
তমসো মা জ্যোতর্গময়
মৃত্যোর্মা অমৃতং সময়।।" 
ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ হি।।

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়।
১৯/০২/২০২৬
কলকাতা।
________________________________________


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...