রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

মৃত্যু সত্য, জগৎ মিথ্যা-পর্ব ৪

মৃত্যু সত্য, জগৎ মিথ্যা -- পর্ব ৪


সাহিত্যের পাতা থেকে ইতিহাসের পাতা ছুঁয়ে বর্তমান খবরের কাগজে আসি, খবরের বিভিন্ন মাধ্যমে আসি। 'মানুষের ইতিহাস মানুষের রক্তে ভেজা' -- এই প্রবাদবাক্যটি ধ্রুব সত্যরূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। ইতিহাস পাঠের প্রথম অধ্যায় থেকেই 'যুদ্ধ' নামক ঘটনার সঙ্গে আমরা পরিচিত। পুরাণ কাহিনী, মহাকাব্যগুলিতেও যুদ্ধের, বীরত্বের, মারণাস্ত্রের এমনকি প্রাণদানের, মৃত্যুবরণেরও মহিমাকীর্তন। রামায়ণ, মহাভারত ইলিয়াড, ওডিসি, এনিড (ভার্জিল), জেরুজালেম লিবারেতা (টর্কাতো তাসো) প্রভৃতি মহাকাব্যের মূল বিষয়বস্তু যুদ্ধ। পাশ্চাত্যের গ্রীক, রোমান, পারসিক সভ্যতাগুলির পত্তন ঘটেছে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে, পতনও হয়েছে হয় অন্তর্দ্বন্দ্বে, নয় বহিরাক্রমনে। তারপর মধ্যযুগে বর্বরদের ইতিহাস। ইউরোপখণ্ডের ভিজিগোথ, অস্ট্রোগোথ, ফ্রাঙ্ক, ভ্যান্ডাল, লোম্বার্ড, ভাইকিং প্রভৃতি জার্মানিক ও যাযাবর গোষ্ঠীগুলির অভিযান, রোম সাম্রাজ্যের নগরে নগরে, জনপদে জনপদে কত যে রক্তনদীর প্লাবন বইয়েছিল তার হিসাব মহাকালও সম্যক দিয়ে যেতে পারেননি। ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে ওসমানী  সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদের আক্রমণে পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপোলের পতনের মধ্যে দিয়ে ১৫০০ বছরের রোম সাম্রাজ্যের পতন সম্পূর্ণ হোল। সেই আক্রমণে, সেই অবরোধে যে রক্তপ্লাবন ঘটেছিল তা ইতিহাসের বিরলতম একটি নরসংহারের উদাহরণ। কিন্তু শেষ হয়নি মনুষ্যত্ববোধের শোণিতক্ষরণ। দু'শবছর ধরে চলেছে রক্তলাঞ্ছিত ধর্মযুদ্ধ (Crusade)। দেশে দেশে যুদ্ধ ছাড়াও এসেছে বিপ্লব, বিদ্রোহ। ফরাসী বিপ্লবে হত্যালীলা এক অদ্ভুত শিল্পে (গিলোটিন) পরিণত হয়ে গেল এবং পরবর্তীতে তারই প্রভাব পড়েছিল রাশিয়ার কম্যুনিস্ট (বলশেভিক) আন্দোলনে, চীনদেশের গণবিদ্রোহে। রাজপরিবার, সামন্তপ্রভু, রাজন্যবর্গ ও ভূমধ্যকারী, জমিদারদের নির্মম নিধনের বিধান ছিল সে সকল বিপ্লবের 'আদর্শের' মূল মন্ত্র। মধ্যযুগ পেরিয়ে এসেছিল নবজাগরণ, এসেছে জ্ঞান-বিজ্ঞান-ঋদ্ধ আধুনিক যুগ। কিন্তু মানবিকতার অপমৃত্যু বিরামহীন ! বিংশ শতাব্দীর দুটি দুটি বিশ্বযুদ্ধ দেখিয়ে দিয়ে গেল মানব সভ্যতার অন্তরে বাসকরা সভ্যতাবিরোধী 'শয়তানদের' মানসিকতার কুৎসিত বীভৎসতার রূপ। মানুষের পরম জ্ঞানের, বিস্ময়কর বিজ্ঞানের কর্ষিত ফল কতখানি বিষময় হতে পারে, সৃষ্টি করতে পারে মৃত্যুগহ্বর গ্যাসচেম্বার, সৃষ্টি করতে পারে মর্ত্যলোকে জাহান্নামের 'ইনফারনো' -- অনির্বাণ অগ্নিকুণ্ড, যেখানে পুড়িয়ে ফেলা যায় প্রাণচঞ্চল আস্ত নগর, নগরী।
"The mind in its own place, and in itself,
Can make a Heaven of Hell, and a Hell of Heaven."
             ---- 'Paradise Lost' -- Milton.

এবার যদি এই প্রাচী ধরিত্রীর কথায় আসি তবে এই ভারতবর্ষের বুকে যুগে যুগে সংঘটিত হয়েছে বহিরাক্রমনের ধ্বংসলীলা, মৃত্যুর তাণ্ডব। প্রাচীনকালে পারসিকদের আক্রমণ ; তারপর ক্রমান্বয়ে এসেছে আলেকজান্ডার, শক, পহ্লব, কুষাণ, মুহাম্মদ বিন কাসিম, সুলতান মাহমুদ। এরপর এসেছে পাঠান, মোগল এবং ইংরেজ - যাদের ভারত বিজয় অভিযান শোণিতসিক্ত পথ ধরে হলেও তারা এই উপমহাদেশেই সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ভারতের জাতিসত্ত্বায়, সামাজিকতায়, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে সম্পৃক্ত হয়ে গিয়েছিল এবং এখনও একাত্ম হয়েই রয়েছে। কিন্তু সে-সকল শক্তির হত্যাকাণ্ডের ইতিবৃত্ত 'মানবসভ্যতার' বিজয়গাথার জয়ধ্বনি নয় -- হিংসার, ধর্মান্ধতার নিষ্ঠুর আস্ফালন আর, সর্বোপরি মানবতার পরাভবের, বিষাদময় ট্র্যাজেডি।
কিন্তু এই যে ধ্বংসলীলা, নরমেধ যজ্ঞানুষ্ঠান-- তাই কি সভ্যতার শেষ কথা ?
".. বিজয়রথের চাকা
উড়ায়েছে ধূলিজাল, উড়িয়াছে বিজয়পতাকা।
শূন্যপথে চাই,
আজ তার কোনো চিহ্ন নাই।"
........................................
.........................................
রাজছত্র ভেঙে পড়ে ; রণডঙ্কা শব্দ নাহি তোলে ;
জয়স্তম্ভ মূঢ়সম অর্থ তার ভোলে ;
রক্তমাখা অস্ত্রহাতে যত রক্ত-আঁখি
শিশুপাঠ্য কাহিনীতে রহে মুখ ঢাকি।" 

এই কবিতাটিতে তিনি, তাঁর আজীবন-লালিত আশাবাদী বিশ্বাসের কথাও বলেছেন। বলেছেন ধ্বংসযজ্ঞের হোতারাই চিরবহমান, চিরপ্রাণবান,  সৃষ্টিশীল এক বিপুল বিরাট মৃত্যুহীন মানবসমাজের, মানবসত্ত্বার ভাগ্য নির্ধারণ করে না। এই মানবসত্ত্বা জন্মের পর জন্মের মধ্য দিয়ে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ঐ নরসংহারের 'চিতাভস্ম'পরে', রাজ্য-সাম্রাজ্যের ধ্বংসস্তূপের ভিত্তির মূলে প্রোথিত করে, উন্মোচিত করে নব নব সৃজনের বিজয় কেতন।
"দুঃখ সুখ দিবস রজনী
মন্দ্রিত করিয়া তোলে জীবনের মহামন্ত্রধ্বনি।
শত শত সাম্রাজ্যের ভগ্নশেষ-'পরে
ওরা কাজ করে।" 

তবু 'ওরা'ই যে মরে-- এ কথা তো মিথ্যা নয়। ওরাই তো নরমেধ যজ্ঞকুণ্ডের আহুতি, উৎসর্গীকৃত বলি। মারি, মড়ক, বন্যায় -- দাঙ্গায়, মন্বন্তরে, বিদ্রোহ-বিপ্লবে, ক্রান্তিকালের উপপ্লবে গ্রাম-গঞ্জ-নগর-শহর যখন শ্মশান হয়ে যায়, যখন কালান্তক যুদ্ধের শেষে বিজয়ীদের তাণ্ডবে, লুণ্ঠনে, নির্বিচার হত্যায়, নারীধর্ষণে জনপদের পর জনপদ জীবন্ত নরকে পরিণত হয় তখন সেই নরকাগ্নিতে পুড়ে মরে 'ওরা'।

"১১৭৬ সালে গ্রীষ্মকালে একদিন পদচিহ্ন গ্রামে রৌদ্রের উত্তাপ বড় প্রবল। গ্রাম খানি গৃহময় কিন্তু লোক দেখি না। ...... .... ...... ............
আজ হাটবার, হাটে হাট লাগে নাই। ভিক্ষার দিন, পথে ভিক্ষুকেরা বাহির হয় নাই। তন্তুবায় তাঁত বন্ধ করিয়া গৃহপ্রান্তে পড়িয়া কাঁদিতেছে। ব্যবসায়ী ব্যবসা ভুলিয়া শিশুক্রোড়ে করিয়া কাঁদিতেছে। দাতারা দান বন্ধ করিয়াছে। অধ্যাপক টোল বন্ধ করিয়াছে, শিশুও বুঝি আর সাহস করিয়া কাঁদে না। রাজপথে লোক দেখি না, সরোবরে স্নাতক দেখি না, গৃহদ্বারে মনুষ্য দেখি না, বৃক্ষে পক্ষী দেখি না, গোচারণে গরু দেখি না, কেবল শ্মশানে শৃগাল কুক্কুর।"
         --- 'আনন্দমঠ' বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।

আমাদের এই হতভাগ্য বাঙলাদেশ এমন অগুন্তি আধিদৈবিক, আধিভৌতিক নারকীয় বিপর্যয়ের সাক্ষী হয়ে আছে। তুর্কী আক্রমণ, বর্গি-হাঙ্গামা, ছিয়াত্তরের মন্বন্তর, বিগত শতকের ৪৬-এর দাঙ্গা, পঞ্চাশের, ষাটের দুর্ভিক্ষ ! কোটি মানুষের অকাল মৃত্যু ঘটেছে, লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত, ঠিকানাহীন হয়েছে, শিশুপ্রাণ ঝরে পড়েছে পথে পথে, নারীদের লুণ্ঠিত হয়েছে নারীত্বের সম্ভ্রম। 'যা গেছে তা গেছে চলে', রেখে গিয়েছে বিষাদবিধুর স্মৃতি।
তাও কি সম্বিৎ ফিরেছে আমাদের ? এখনো মানবতাহীন, ক্ষমতালিপ্সু রাজনীতি, সেই 'নীতি'র অভ্যন্তরে সিঁধেল চোরের মত ঢুকে পড়ে ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা, শ্রেণীবৈষম্যের ছায়া ছায়া ঘাতকের মায়াময় মূর্তি, যাদের দেখা যায় কিন্তু একটি সমাজের, এমনকি একটি দেশের সর্বনাশের আগে চেনা যায় না। মিত্রতা নয়, ভ্রাতৃত্বের বন্ধন নয়, অভিন্ন-আত্মা একত্বের সাধনা নয়, উদার মানবতাবাদের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে রাষ্ট্রতন্ত্র, সমগ্র বিশ্বজুড়ে, নির্দয় রাষ্ট্রযন্ত্ররূপে নিষ্পেষণ করে চলেছে দুর্বল, অসহায়, নিরাশ্রয় এক বিপুল সংখ্যক 'গণদেবতাকে' যাঁরা মানবসভ্যতার স্থপতি, রক্ষক ও প্রতিপালক। তাঁদের কর্মসাধনার স্বীকৃতি নেই, পৃথিবীর প্রতি ভালোবাসার মূল্য নেই, প্রাণের প্রতি প্রেমের চরিতার্থতা নেই। অনাদ্যন্ত কাল তাঁদেরই মৃত্যু সংবাদে ভারি হয়ে থাকে ইতিহাস, নিত্য নিত্য তাঁদেরই সংবাদে খোরাক ও খোরাকি জুটিয়ে নেয় সংবাদের মাধ্যমগুলি -- নিরুপায় ঔদাসীন্যের দীর্ঘশ্বাসে নিস্তব্ধ হয়ে যায় অক্ষম, জরাতুর, বৃদ্ধ  মানবতা---- 'বুদ্ধ তথাগত।' আসন্ন অকালমৃত্যুর দুঃস্বপ্ন নিয়ে জীবনের প্রতি হতাশ কবি লেখেন,
"... Of the wide world l stand alone, and think
Till love and fame to nothingness do sink."
               'The terror of death',--- Keats.
বাঁচবার সান্ত্বনা কোথায়। 'সভ্যতার সংকট' যেমন ছিল তেমনি আছে -- নির্দয়, নির্মম, নিষ্ঠুর, অপরিবর্তণীয়। মানুষ যখন মানুষের মৃত্যুর কারণ, তখন এই সত্যই প্রতিষ্ঠা লাভ করে,
'Death conquers all, death consumes all, death ends all.'
মৃত্যু সত্য, জগৎ মিথ্যা।

এতক্ষণ আমাদের আলোচনার অভিমুখ ছিল একমুখী। সৃষ্টি যাই হোক্ --- যা হয়েছিল, হয়েছে বা হবে -- সে সমস্তই বিনাশের অন্ধকারে লীন হবে একদিন। আজ যা সৃষ্টি হয়েছে, আজ যার জন্য হোল তা পিছনে দাঁড়িয়ে রয়েছে বিনাশের, মরণের ছায়া। ধরণীর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণকণা থেকে ওই সুদূরের নীহারিকামণ্ডল, আলোকমন্দাকিনী 'ছায়াপথ' -- তাদের সকলের অন্তিম গতি নাকি 'এক' --নিশ্চত বিদায়। তাহলে এই অসীম সৃষ্টির কি কোন মূল্য নেই ? এই জগৎসংসার জুড়ে যে অনন্ত, বিচিত্র আয়োজন -- সে কি নিছকই নিরর্থক ? যা ব্যক্ত হয়ে জগৎ ও প্রাণ ব্যাপ্ত করে আছে, তা আবারও অব্যক্ত (শূন্য) হয়ে যাবে ? সেই অব্যক্ত বা 'শূন্য' কি ? সেই শূন্য যদি সৃষ্টির উৎস, যুগপৎ অন্ত হয় তবে, এই মুহূর্তের 'আমি' ও 'আমার ভূবন' থাকি বা না-থাকে তাতে কী বা এসে যায় ?
"অব্যক্তাদীনি ভূতানি ব্যক্তমধ্যানি ভারত।
অব্যক্তনিধনান্যেব তত্র কাজ পরিদেবনা।।"
                              --- শ্রীগীতা।
         "বৃথা এ ক্রন্দন
বৃথা এ অনলভরা দুরন্ত বাসনা।"
                               ---- রবীন্দ্রনাথ।
কিন্তু 'পরিদেবনা' -- 'অনলভরা দুরন্ত বাসনার'র জন্যই তো জীবন। বৃথা জেনেও বাসনার মোহ এমনই সর্বনাশা যে তার জন্যই প্রয়োজন হয়েছে 'ঈশ্বর' নামক এক অদৃশ্য সত্ত্বার আরাধনা। মরে যাব জানি, তবে মরার পরেও আমার অপূর্ণ বাসনা, অতৃপ্ত কামনার তৃপ্তি চাই। 'ঈশ্বর' সেই অপূর্ণতার, সেই অতৃপ্তির প্রয়োজন মিটিয়ে দিতে পারেন বলেই ঈশ্বর আরাধনার নানা পথ, নানা মতের উদ্ভব হয়েছে -- এগুলিই 'ধর্মমত' এবং 'ধর্মপথ'। ধর্মমত অসংখ্য (লোকায়ত ধর্মমতগুলি নিয়ে) ও বিচিত্র। ধর্মের পথও বহুদিশারী।

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১৭/০২/২০২৬
কলকাতা।
___________________________________________













কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...