সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

জাত্যাভিমান ধর্মান্ধতা এবং গান্ধী ও যুদ্ধ-৫

জাত্যাভিমান ধর্মান্ধতা এবং গান্ধী ও যুদ্ধ-৫ (উপসংহার)


এই সংক্ষিপ্ত আলোচনা মহাত্মা গান্ধীর মত একজন বিরাট ও স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের সমগ্র জীবনের শিক্ষা, সাধনা, সংগ্রাম ও সংঘাতের অনুপুঙ্খ ইতিবৃত্ত রচনার প্রয়াস নয় ; এই আলোচনা একান্তভাবে তাঁর অহিংসা ও মানবতাবাদের, যা তাঁর সময়কালের এক 'ক্ষীয়মান আদর্শ' ছিল, তার উপর বর্তমান কালের স্মৃতিচারণা। 'ক্ষীয়মান আদর্শ' শব্দযুগল এই কারণেই উচ্চারিত হয়েছে যে তিনি তাঁর ৭৮ বছরের জীবদ্দশায় (১৮৬৯- ১৯৪৮),  ৫৫ বছর ধরেই ওই অহিংসা ও মানবতাবাদের প্রতিষ্ঠা ও প্রচারে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি লন্ডনে 'আইন পাশ' করে ব্যারিস্টার হওয়ার পর দক্ষিণ আফ্রিকায় কর্মজীবন শুরু করেন। সেখানে তখন বর্ণবৈষম্যবাদের (apartheid) নির্মম তান্ডব। তিনি নিজেও তার শিকার হন এবং সেখানেই কালো-সাদা বিভাজনের বিরুদ্ধে অহিংস প্রতিবাদের অস্ত্র হিসাবে 'সত্যাগ্রহ' আন্দোলনের 'উপায়' বা 'পথ' অবলম্বন করেন। সেখানে এই আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন দীর্ঘ ২১ বছর (১৮৯৩-১৯১৪)। এরপর ভারতে প্রত্যাবর্তন করেই ইংরেজ রাজশক্তির বিরুদ্ধে শুরু হয় তাঁর 'অহিংসা ও সত্যাগ্রহের' অস্ত্র-হাতে 'গণআন্দোলন'। সে আন্দোলন শুধুমাত্র বিদেশী-বিতাড়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তা ছিল ভারতীয় জনচেতনায় এই বিশ্বাস প্রোথিত করা যে 'হিংসাকে' হিংসার তরবারি দিয়ে ধংস করা যায় না, যা 'সত্য' তাকে অসত্যের আবরণে আবরিত করে শুভ পরিণাম লাভ করা যায় না। গান্ধীবাদ এমন একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ যা তাঁর  রাজনৈতিক মঞ্চে পদার্পণের আগে যত প্রকারের (শাসনতন্ত্রিকতার বিরুদ্ধে) বিদ্রোহাত্মক ও বিপ্লবাত্মক 'মত ও পথের' ধারণার সৃষ্টি হয়েছে এবং যেগুলিকে প্রয়োগ করা হয়েছে -- সে সবের চাইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন, স্বতন্ত্র। ভারতে ফিরে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন ভারত শুধু বিদেশী শক্তির কাছেই অবদমিত হয়ে আছে এমন নয়, অধঃপতিত হয়ে আছে দারিদ্র্যজনিত হীনমন্যতা, সামাজিক ভাবে বর্ণান্ধতা এবং সম্প্রদায়গত বিচ্ছিন্নতার অভিশাপে। ইংরেজের বিরুদ্ধে হিংসাশ্রয়ী বিদ্রোহ ভারত রাষ্ট্রের সেই দুর্বলতাগুলিকে আরও প্রকট করে তুলবে। রাজশক্তির উৎকোচ প্রদান এবং বিভাজনের ক্রূর চক্রান্ত অচিরেই ভারতবাসীকে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ও আত্মহননের পথে নিয়ে যাবে। তাই তিনি অহিংসার পথ, (যে পথ বুদ্ধের বিশ্বজয়ের জনপথ, যে পথ সম্রাট অশোকের ধর্মবিজয়ের রাজপথ) অবলম্বন করেছিলেন।

  তাঁর এই 'অহিংসা ও সত্যাগ্রহ' একটি অখণ্ড ভারতসত্ত্বার সৃষ্টি করেছিল, কিন্তু পরিশেষে তা সফলতা লাভ করতে পারে নি। যাঁর কাছে 'দ্বিখণ্ডিত ভারত' দুঃস্বপ্নের মত ছিল তাঁকে হত্যা করার কারণ হিসেবে এই যুক্তিরই অবতারণা করা হয়েছিল যে তিনিই দেশ 'বিভাজনের জনক' ("He was not the father of the nation but murderer of the nation"). হন্তারকদের এই যুক্তি দেশের একটি বিপুল 'জনসংঘ'-কে প্রভাবিত করেছিল এবং এখনও করে চলেছে। দেশের সাধারণ মানুষ তাঁকে 'জাতির জনক'রূপে বরণ করেছিল, ক্ষমতালোভী নেতারা তাঁকে ভয় পেয়েছিল, ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী শক্তি তাঁর উদার মানবতাবাদের আদর্শ থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিল। তাই  তাঁর বিরুদ্ধে অসত্য প্রচার, তাঁর চরিত্র, মত ও পথের স্বতন্ত্র ও সত্য আদর্শের ধারণার উপর কলঙ্কের কালিমা লেপন করা হয়েছিল এবং এখনো সেই প্রয়াস অব্যাহত রয়েছে, থাকবেও বুঝিবা ততদিন যতদিন না শাসনতন্ত্র থেকে ছলনা, প্রবঞ্চনা, মিথ্যাচার ও ধর্মীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক অন্ধত্ব অপসারিত  হয়। হবেও হয়তো একদিন ; কিন্তু সেই দিনের নবোদিত প্রভাত-সূর্যকে বন্দনা করবার জন্য থাকবেনা কোন মানবিক প্রাণ, ধরিত্রী মায়ের কোলভ'রে পড়ে থাকবে  পারমানবিক অগ্নি-প্রলয়-শেষে ভষ্মে-ঢাকা মূর্ত বিভীষিকার ঝলসানো কঙ্কাল! 

 
"মর্ত্যলোকে মহাকালের নূতন খাতায়
পাতাজুড়ে নামবে একটা শূন্য,
গিলে ফেলবে দিনরাতের জমাখরচ ;
মানুষের কীর্তি হারাবে অমতার ভান,
তার ইতিহাসে লেপে দেবে
অনন্ত রাত্রির কালি।"
                       'আমি' --রবীন্দ্রনাথ।

তাই গান্ধীকে পূর্ণরূপে আমরা বুঝতে পারি না যেমন বুঝেছিলেন আইনস্টাইন (Albert Einstein - 1979-1955) এবং বিশ্বের সমকালের ও চিরকালের মানবতার বিবেক। 

"Gandhi is the most enlightened of the political men of our time. .... Generation to come will scarce believe that such a one as this ever in flesh and blood walked on this earth. .... In our time of utter moral decadence he was the only statesman to stand for a higher human relationship in the political sphere."
                     ------ Albert Einstein.

"Gandhi's assassination caused dismay and pain throughout India. It was as though the three bullets that entered his body and pierced the flesh of ten of millions. The nation was buffled, stunned and hurt by the sudden news that this man of peace, who loved his enemies, and would not have killed and insect, had been shot dead by his own countryman and co-religionist. Never in modern history has any man been mourned more deeply and more widely."
         (---- Louis Fischer, American journalist & biographer of Mahatma Gandhi).

"The light has gone out of our lives and there is darkness everywhere and I do not quite know what to tell you and how to say it. Our beloved leader, Bapu as we call him, the father of the nation, is no more. Perhaps, I am wrong to say that. Nevertheless, we will not see him again as we have seen him these many years. We will not run to him for advice and seek solace from him, and that is a terrible blow not to me only but to millions and millions in this country. And it is difficult to soften the blow by any advice that anyone can give you.
The light has gone out, I said, and yet I was wrong. For, the light has shown in this country was no ordinary light. The light that has illumined this country for these many years will illuminate this country for many more years, and a thousand years later that light will still be seen in this country and the world will see it and it will give solace to innumerable hearts. For, that light represented the living truth, and the eternal man was with us with his eternal truth reminding us of the right path, drawing us from error, taking this ancient country to freedom."
----Jawaharlal Nehru lamented on Mahatma's assassination through a radio address, on January 30, 1948. 

মহাত্মা গান্ধীর এই অপ্রত্যাশিত নিধনের পর এমনভাবেই হাহাকার স্বতঃস্ফূর্ত উচ্ছ্বসিত হয়েছিল শুধু ভারতেই নয় সমগ্র বিশ্বের সকল মানবপ্রেমীর অন্তর্দেশের ভিতর থেকে। তৎকালীন ভারত সরকারের কাছে, চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে, ৩৪৪১টি শোকবার্তা এসে পোঁছেছিল। ইউনাইটেড নেশনস-এর (The UN) পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছিল, অর্থ তার এমনই ছিল "যেন বিশ্বমানবতার উড়ান মাথা নত করেছিল শোকসন্তপ্ত লজ্জায় (as if Humanity lowered its Flag").

ভারতভাগ কেমনভাবে হয়েছিল, কেমন ছিল সেদিনের নৃশংসতা ; কেমন ছিল সে দিনগুলির অনমনীয়, রূঢ় দ্বিজাতিতত্ত্বের সমর্থনকারী এবং কঠোর, নির্মম সাম্প্রদায়িক বিভাজনপন্থীদের 'বিজয়োল্লাস' -- তার বিবরণ এখনও অজস্র বৃদ্ধ-প্রবৃদ্ধ মানুষের স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছে। তাই সবিস্তারে সে সবের বর্ণনা করবার প্রয়োজন আর নেই ; কিন্তু প্রশ্ন করতে ইচ্ছা করে বর্তমানে এই যে ভারত ভূখণ্ড হতে ছিন্ন ও বিচ্ছিন্ন হওয়া তিনটি দেশ (ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ) --তারা কি সুখে আছে ? এই তিনটি দেশের, বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানের অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা, আত্মরক্ষা, আত্মসম্মান এমনকি শাসনতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বও কাদের কাছে বন্ধক দেওয়া ? পশ্চিমের ধনতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির উপর দক্ষিণের এই ঘণ্ডিত দেশসকলের কতখানি নির্ভরশীলতা রয়েছে তার হিসাব পাওয়া যাবে বিশ্বব্যাংকের খতিয়ানে। আজকেও ভারত প্রতিরক্ষা খাতের প্রায় সবটাই ব্যয় করে আমেরিকা, রাশিয়া, ফ্রান্স প্রভৃতি দেশের তৈরী যুদ্ধবিমান, যুদ্ধাস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তি আমদানি করার জন্য। পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও সেই একই সংবাদ। এখন আবার বাংলাদেশও সামরিক শক্তি সঞ্চয় করতে চাইছে অস্ত্র সরবরাহকারী দেশগুলির বদান্যতায়। 

আর এই বিপুল সম্পদের অপচয় সমানে চলেছে এবং উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে ও অবিরাম বর্ধিত হয়েই চলেছে এই সমস্ত দেশের বিরাট সংখ্যক মানুষের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অনাহার, অপুষ্টি ও অকাল মৃত্যুর বিনিময়ে ! প্রাকৃতিক সম্পদের, সৌন্দর্যের লীলাভূমি দক্ষিণ গোলার্ধের এই উপমহাদেশ শুধুমাত্র হিংস্র সাম্প্রদায়িক নেশাগ্রস্ততার জন্যেই শতেক বা শতাধিক দেশীয় মূদ্রার  (১ মার্কিন ডলারের মূল্য ভারতের ৯২ টাকা) বিনিময়ে এক একটি বিদেশী মুদ্রা পায় ; আর তাই দিয়ে কিনে আনে ঐ 'বিদেশেরই' অস্ত্র কারখানায় নির্মিত অস্ত্রসম্ভার এবং সে সকল অস্ত্র প্রয়োগ করা হয় আত্মহননের প্রয়োজনেই, উন্মত্ত যদুবংশ-ধংসের 'প্রভাসতীর্থে'। (কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ৩৬ বছর পর প্রবাস তীর্থে মদ্যপ অবস্থায় নিজেদের মধ্যেই পরস্পর পরস্পরকে আক্রমণ করে যাদবকুল ধংস হয়ে যায়)।


যাই হোক্, আজ থেকে কম-বেশি ৭৮ বছর আগে, ৭৮ বছরের অর্ধনগ্ন এক ফকির (half-nacked Fakir) আপন বুকের রক্ত ঢেলে মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসার যে মূল্য চুকিয়ে গিয়েছেন সেই রক্তঋণ কি আমরা আজও শোধ করতে পেরেছি ? আজও কি অনুতপ্ত সংবিৎ জেগেছে আমাদের ? 'মেলেনি উত্তর'।

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
০১/০২/২০২৬
কলকাতা।
____________________________________







কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...