বৃহস্পতিবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২৪

সুগভীর প্রজ্ঞার একটি ঐতিহাসিক গ্রন্থ --- দুই



সুগভীর প্রজ্ঞার একটি ঐতিহাসিক গ্রন্থ 


                            দুই 


গ্রন্থটির শেষ, অষ্টম সর্গের শেষাংটি আবেগময়তায়  অত্যন্ত হৃদয়দ্রাবী। 

Here endth what I write
Who love the Master for his love of us
A little knowing little I have told
Touching the Teacher and the Ways of Peace.
Fifty five years thereafter showed he those
In many lands and many tongues gave
Our Asia Light, that still is beautiful
Conquering the World with spirit of strong grace
All which is written in holy books. ...... 

যে ভালোবাসা দিয়ে বেসেছেন তিনি ভালো,
সে ভালোবাসার সামান্য জেনেছি আমি।
পরশ পেয়েছি সে মহাগুরুর স্বর্গীয় করুণার,
দিয়েছেন তিনি সান্ত্বনা আর শান্তি-পথের দিশা।
তেমনিভাবেই প্রাচী ধরিত্রীর কত বিভিন্ন দেশে,
কত বিচিত্র ভাষায় জ্বেলেছেন তিনি জ্ঞানের দীপ্ত শিখা,
জয় করে' সারা বিশ্বভূবন অপরাজেয় সাধনার মহিমায়।
লেখনীতে লেখা, তুলিকায় আঁকা সেই দিব্য জীবনকাহিনী
আজও সত্য, আজও সুন্দর নরদেবতার বাণী।
                                                (ভাবানুবাদ মৎকৃত।) 


তারপর, পুস্তকসমাপ্তির ঠিক উপসংহারে, পরম শ্রদ্ধালু  লেখক অখিল নিরঞ্জন তথাগত বুদ্ধের উদ্দেশে যে স্তবগাথা গেয়েছেন তার তুলনা শুধুমাত্র আছে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় --- যেখানে অর্জুন সারথী কৃষ্ণকে বলছেন, 

"নষ্টোমহো স্মৃতির্লব্ধা তৎপ্রসাদাৎ ময়াচ্যুত।
স্থিতোহস্মি গতসন্দেহঃ করিষ্যে বচনং তব।।"
                                         অষ্টাদশ অধ্যায় ।।৭৩।।
"...... Ah ! Lover ! Brother ! Guide ! Lamp of Law !
I take my refuge in thy mame and Thee
I take my refuge in thy 0rder ! OM !"
হে আমার প্রিয়তম, ভাই, বন্ধু, জীবন পথের সাথী,
হে আমার মুক্তিপথের আলো, আমার শেষের আশ্রয়,
"তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা", ওঁ ।। 

গ্রন্থশেষের এই স্তবগাথাটি দশটি অসামান্য পংক্তিতে রচিত। (আমার পাঠকদের কাছে এই প্রার্থনা রইল যাঁরা এই অপূর্ব কাব্যটি পান নি, পড়ার সুযোগ যাদের আসেনি  তাঁরা অবশ্য অবশ্যই পাঠ করবেন)। 


কিষাগৌতমীর উপাখ্যান 


উপাখ্যানটি সকলের জানা। বুদ্ধদেব কি ভাবে মৃতসন্তান, শোকদগ্ধা মাতা কিসাগৌতমীকে জীবনের পরম সত্যের সন্ধান দিয়েছিলেন। তাকে বলা হয়েছিল, মৃত্যু যে ঘরে জীবনাবসান ঘটাতে পারেনি, সেই ঘর থেকে একমুঠো সর্ষে আহরণ করতে, স্পর্শে যার মৃত সন্তান পুনর্জীবন লাভ করবে। -- তাই নিয়েই এই কাহিনী। মৃতবৎসা  কিষাগৌতমীর আর্তনাদ, 

I went, my Lord, clasping to my  breast0
The babe, grown colder, asking at each hut ---
Here in the jungle, and towards the town ---
'I pray you, give me mastered, of your grace,
A tola black ; and each who had it gave,
For all the poor and piteous to the poor ;
But when I asked, in my friend's household here
Hath any peradventure ever died
Husband or wife, or child, or slave ? they said:
'O Sister, what is this you ask ? the dead
There are very many, and the living few.' 

লেখকের বর্ণনায় ভাষার যে পেলবতা, ঘটনার যে শোকাতুর, মর্মস্পর্শী ছবি ফুটে উঠেছে, তাতে মনে হয় তিনি যেন এই সজল শ্যামল দেশের কোমলহৃদয় এক কবি। আমাদের মন পড়ে কবি করুণা নিধান বন্দোপাধ্যায়য়ের 'জীবন ভিক্ষা' কবিতাটি,

"দেউলে দেউলে কাঁদিয়া ফিরি গো দুলালে আগলি বক্ষে
উষ্ণ-বিয়োগ-উৎস-সরিত দরদবিগলিত চক্ষে।
শত চুম্বনে মেলে না নয়ন  চুরি গেছে মোর আঁচলের ধন,
অভাগী বিহগী আজিকে আহত মরণ শ্যেনের পক্ষে।
...........................................….......................
জানি প্রভু তব পাণির পরশে  ননীর পুতুল জাগিবে হরষে
কোন পাষাণের বিষবাণে তার নয়নের মণি ভিন্ন ?"
....................................................................
অচঞ্চল বুদ্ধ যেন মূর্ত বিগ্রহ করুণার। কিষাদেবীকে বললেন, "

"থাকে যদি কোথা অশোক নিলয় ভিখ মাগি আন সর্ষপচয়---

পরশে তাহার দুলিয়া উঠিবে পরাণ-মৃণাল-ভগ্ন !" 

শোকার্ত মা কোথাও পেলেন না তেমন এক ঘর যেখানে মৃত্যুর চরণচিহ্ন আঁকা হয়ে যায়নি কখনো।
অবশেষে কিষাদেবী ত্রিতাপহারী ভগবান বুদ্ধের শ্রীচরণে আশ্রয় নিলেন, বললেন, 

"জীয়াতে চাহিনা তনয়ে আমার  ভবনে ভবনে উঠে হাহাকার,
হরো' জগতের বিরহ-আঁধার দাও গো অমৃত দীক্ষা।"

এই সুললিত কাব্যে বৌদ্ধ ধর্ম ও বৌদ্ধ দর্শনের সহজ সরল, মানবীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে বর্ণনা ও সম্যক ব্যাখ্যাও আছে। যেমন ত্রি-তাপ দুঃখ, শীল, সমাধি, প্রজ্ঞা, অষ্ট- নীতি এবং সর্বজনীন তিন সত্য। এই তিনটি সত্য বৌদ্ধদর্শনের চুড়ান্ত পরম প্রতিপাদ্য বিষয়। যা বৌদ্ধধর্মের নিরীশ্বরবাদের প্রধান ও অন্তিম সিদ্ধান্ত। 

প্রথম সত্য অসারত্ব (সংঘঠিত বা ঘটমান ঘটনাগুলির কোন অস্তিত্ব নেই)।
দ্বিতীয় সত্য অনস্তিত্ব  (অস্তিত্ব থাকলেও তা সাময়িক)।
তৃতীয় সত্য মধ্যপথ ( ঘটনাগুলির বিচার করতে হবে স্থায়িত্ব ও অস্থায়িত্বর মধ্যবর্তী ধারণায়)।
এইভাবে বুদ্ধের ধর্মমতের ও ধর্মদর্শনের নীতি, সত্য, বিচার, মত ও পথের বিবরণ যা ত্রিপিটক পুস্তকে লিপিবদ্ধ আছে, সেইসব সমস্ত বিবরণ ছাড়াও দুই সহস্রাব্দের অধিক কালে ধরে অসংখ্য পুঁথিতে যা কিছু লিপিবদ্ধ হয়েছে সে সবেরই একটি অতি সংক্ষিপ্ত সংস্করণ  আর্নল্ড সাহেবের এই Light of Asia বা 'প্রাচী ধরিত্রীর আলো' গ্রন্থটি। 

 
প্রভাব 

রাজকুমার সিদ্ধার্থের জন্ম থেকে তাঁর সাধনা ও আত্মোপলব্ধির বা বুদ্ধত্ব লাভের সময়কাল বাদ দিলে থাকে তাঁর ধর্মপ্রচারের কয়েকটি বছর। ঊনপঞ্চাশ বছর অব্যাহত ছিল এই মহাতীর্থঙ্করের ধর্মপ্রচার যাত্রা সেই সময়কালে তিনি ভারতীয় (অখণ্ড) উপমহাদেশের উত্তর ও উত্তরপূর্বের সুবিস্তীর্ণ অঞ্চলের বহু জনপদে পরিভ্রমণ করেন এবং ধর্মপ্রচারে আত্মসমর্পণ করেন। সারনাথ থেকে যাত্রা আরম্ভ করে গয়া, শ্রাবস্তী, বৈশালী, বিদিশা, কৌশাম্বী, উজ্জয়িনী প্রভৃতি রাজ্যের বিস্তৃত অঞ্চলে বিচরণ করেন, রাজপুরীর উপকণ্ঠে অবস্থান করেন। রাজা ও সম্রাটগণও তাঁর মানব-চৈতন্য-উন্মেষকারী দার্শনিকতায়, অহিংসা মন্ত্রে মুগ্ধ হয়ে তাঁর দীক্ষালাভ করেন। সম্রাট অশোক, বিম্বিসার, অজাতশত্রু, প্রসেনজিৎ ছাড়াও অসংখ্য রাজা ও রাজন্যবর্গ বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্টপোষকতা করেছিলেন এবং বৌদ্ধধর্ম প্রচার, বৌদ্ধমঠ, চৈত্য, বৌদ্ধবিহার, বৌদ্ধস্তুপ নির্মাণে সাহায্য করেছিলেন। বুদ্ধের জীবনকালে এবং তাঁর মহাগতি প্রাপ্তির পরও প্রায় এক হাজার বছর ধরে চলেছিল বৌদ্ধ ধর্ম সংস্থাপনের এরূপ মহাযজ্ঞ। বৌদ্ধ ধর্ম ছড়িয়ে পড়ে এশিয়া মহাদেশের সর্বত্র। চিন, তিব্বত, জাপান এবং শ্রীলঙ্কাসহ সুদূর দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দ্বীপময় ধরিত্রীর প্রান্তে প্রান্তে। যুদ্ধজয়ের পরিবর্তে ধর্মবিজয়ের পথ অবলম্বন করে সম্রাট অশোক ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।
আনুমানিক খ্রীষ্টপূর্ব ৪৮৩ অব্দে, আশি বৎসর বয়সে, কুশীনগরে এই মহাতীর্থঙ্কর মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন।
বৌদ্ধধর্ম সংক্রান্ত পুঁথি --- ত্রিপিটক, পালি ত্রিপিটক, প্রজ্ঞাপারমিতা --- অজস্রবার লিপিবদ্ধ ও প্রচারিত হয়েছে এই সময়কালের মধ্য। 


Light of Asia বা 'প্রাচী ধরিত্রীর আলো' কাব্যগ্রন্থটির স্বতন্ত্র প্রভাব। 


এশিয়া মহাদেশের প্রায় সর্বত্র বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারিত ও প্রসারিত হলেও ইউরোপ ভূখন্ডে তার তেমন প্রভাব ছিল না। কিন্তু ১৮৮৯ খ্রীষ্টাব্দে স্যার এডুইন আর্নল্ডের এই 'Light of Asia' কাব্যটি প্রকাশিত হবার সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপ ও আমেরিকার সারস্বত সমাজের গৌতম বুদ্ধের বিষয়ে ঔৎসুক্য অকস্মাৎ চরম আকার ধারণ করে এবং মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে গ্রন্থটির ন্যূন্যাধিক আশিটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়। শুধু পশ্চিমের দেশগুলিতেই নয়, সারা বিশ্বের ঐতিহাসিক, গবেষক, চিন্তাবিদ, নোবেল পুরস্কারজয়ী সাহিত্যসাধক, বিজ্ঞানী, দেশনায়কদের ভাবনার জগতেও আলোড়ন সৃষ্টি হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ, আইনষ্টাইন, কিপলিং, ইয়েটস ; ছিলেন চার্চিল, মহাত্মা গাঁধী, জওহরলাল নেহরু, ভি আর আম্মেদকর।
অস্কার ওয়াইল্ড (Oscar Wilde)-য়ের বিখ্যাত উপন্যাস দি পিকচার অব ডোরিয়ান গ্রে, (The Picture of
Dorain gray). উপন্যাসের চলচিত্রায়নে দখানো হয়েছে  প্রধান চরিত্র  বিধস্ত-জীবন, কারারুদ্ধ ডোরিয়ানকে তার বন্ধু Light Of Asia বইটি উপহার দিয়ে তাকে সুন্দর জীবনে ফিরে আসতে সাহায্য করেছিল। 
১৯৫৫ সালে উইনস্টন চার্চিল ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরুকে লিখছেন, 


"I hope You will think of the phrase , 'The Light Of Asia'. It seems to me that you might be able to do what no other human being could in giving India the lead, at least in the realm of thought, throughout Asia, with the freedom and dignity of the individual as the ideal rather than communist party drill book." 


এই ঐতিহাসিক চিঠির প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্য্য গভীর। একজন ইতিহাসের ছাত্র হিসাবে আমার মনে হয়েছে ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং ব্যক্তির আত্মসম্ভ্রম রক্ষা করবার  জন্যে তথাগত বুদ্ধের জাতি-ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায় ও শ্রেণী-নিরপেক্ষ দর্শন ও আদর্শের যে মূল ভাবনা তার অনুসরণের মধ্যে দিয়েই সমগ্র এশিয়ার মুক্তি ও সামাজিক উন্নতি সম্ভব। জহরলাল নেহেরুর পক্ষেই সেই চিন্তার দীপশিখা প্রজ্বলন করা সম্ভব ( যে হেতু Light Of Asia -- এই শব্দবন্ধটি, phrase, তিনি জানেন ; সাম্যবাদী মতবাদে (Communist drill book) যা নেই। 

এখানে মনে করা যেতেই পারে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে সমগ্র পৃথিবীর রাষ্ট্রগুলি, উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধের ছোট বড় সমস্ত দেশ দুই ক্ষমতাকেন্দ্রে (Power Bloc) ভাগ হয়ে গিয়েছিল --- সোভিয়েট ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (The USSR & The USA). গঠিত হয়েছিল যথাক্রমে NATO ( North Atlantic Treaty Organisation) আর WARSW pact অনুযায়ী সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার অন্য সাতটি দেশের বন্ধুত্বের চুক্তি)। জওহরলাল নেহেরু এবং ভারতের আরও কয়েকটি বন্ধুরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান, যাঁরা‌ কোন ক্ষমতার ভরকেন্দ্রেই থাকতে চাইলেন না, তাঁরা গড়ে তুললেন ওই জোট নিরপেক্ষ একটি অহিংসপন্থী আন্দোলন, বা Non Aligned Movement. এই আন্দোলনের অগ্রদূত ছিলেন জওহরলাল নেহেরু, ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট সুকর্ন, যুগোশ্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট জে বি টিটো, মিশরের প্রেসিডেন্ট জি এ নাসের এবং ঘানার প্রেসিডেন্ট কুয়ামি কুরমা।
কিন্তু তবুও জওহরলাল নেহরু যেহেতু সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারায় বিশ্বাসী ছিলেন এবং প্রায় প্রতিবেশী দেশ সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে তাঁর স্বাভাবিক ঝোঁক (inclination) ছিল ---- সে বিষয়ে অবহিত হয়েই চার্চিল সাহেব তাঁকে বুঝিয়ে দিতে চেয়েছিলেন জনগণতান্ত্রিক আদর্শ ভারতের ঐতিহাসিক ধারনাতেই বিদ্যমান ; কমিউনিষ্ট চিন্তাধারাতে নয়। 


যাই হোক্, এ-সব ইতিহাসের তথ্য ও তত্ত্ব আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে এইটি অনুধাবন করবার জন্য যে ওই স্যার এডুইন আর্নল্ডের লেখা কাব্য  'The Light Of Asia' বা 'প্রাচী ধরিত্রীর আলো'-র‌ প্রভাব কী গভীর ও পরিব্যপ্ত ছিল ঊনবিংশ শতকের শেষভাগ থেকে বিংশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত এবং যা আজিও প্রাসঙ্গিক। গ্রন্থটির ক্রমবর্ধিষ্ণু লোকপ্রিয়তা তাই প্রমাণ করে। 


                        (ক্রমশঃ)
____________________________________________





রবিবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২৪

সুগভীর প্রজ্ঞার একটি ঐতিহাসিক গ্রন্থ --- এক



সুগভীর প্রজ্ঞার একটি ঐতিহাসিক গ্রন্থ।

"The time may come, I hope, when this book and my Indian Song of Songs 

and Indian Idylls will preserve the memory of one who loved 

India and the Indian people."
                     --------------- Sir Edwin Arnold

                     এক

সভ্যতার ক্রমবিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানব চেতনার ক্রমবিকাশও অঙ্গে অঙ্গে বাঁধা পড়ে আছে। প্রথমটি জ্ঞানের, উপলব্ধির ও অভিজ্ঞতার প্রায়োগিক দিক, আর দ্বিতীয়টি মুক্তি ও মোক্ষলাভের পথ। এই মুক্তি ও মোক্ষলাভ কোন বিশেষ একটি ধর্মধারণায় বিচার্য নয়। এটি মানুষের জাগতিক জীবনের অনিশ্চয়তা, শোক দুঃখ বেদনা বিষাদ --- যা অবশ্যম্ভাবী, অনিবার্য, তাই থেকে মুক্ত হবার, সকল দুর্গতি ও বিপর্যয়কে স্বীকার করেও শান্ত সুন্দর এবং 'আনন্দময়' জীবন অতিবাহিত করবার সাধনা। সমস্ত ধর্মের মূলগত সাধনার হদিশ মানুষ প্রথম পেয়েছিল আজ থেকে প্রায় তিন হাজার বছর আগে শেষ তীর্থঙ্কর বা প্রথম পূর্ণরূপে-সিদ্ধ সাধক, শাক্যমুনি  তথাগত গৌতম বুদ্ধের সাধনপথে ও বাণীতে। 


বুদ্ধদেব, বৌদ্ধধর্ম, তার প্রভাব, অনুশীলন-মার্গের ইতিহাস সুদীর্ঘ এবং সুগভীর। আজও সে সবের চর্চা, সেই ধর্মানুসরণ অব্যাহত শুধু ভারতবর্ষে নয়, বিশ্বের বহু দেশে। বিশেষ করে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় --- চীন তিব্বত  জাপান শ্রীলঙ্কা হয়ে ইন্দোনেশিয়া, সুমাত্রা, জাভা, বোর্ণিও, বালি, থাইল্যান্ডসহ দ্বীপময় প্রাচ্যভূমির দেশে দেশান্তরে।
এহেন একটি জীবনাচরণ-সাধনার (নিরঞ্জন বুদ্ধের সাধনার পথ) মার্গ প্রদর্শকের আবির্ভাব ঘটেছিল আজ থেকে প্রায় তিনহাজার বছর আগে এই পুন্য ভারতভূমির উত্তরপ্রান্তে, হিমালয়ের কোলে কপিলাবস্তুর রাজ পরিবারে, রাজা শুদ্ধোদন ও রাণী মায়াদেবীর কোলে।
ভগবান বুদ্ধ ও বৌদ্ধধর্মের উপর অসংখ্য পুঁথি, অসংখ্য গ্রন্থ রচিত হয়েছে হাজার হাজার বছর ধরে  ; কিন্তু যে গ্রন্থটি সমগ্র বিশ্বের মানব-সমাজকে, মানব চেতনাকে আলোড়িত করেছিল, করে চলেছে, সেটি স্যার এডুইন আর্নল্ডের লেখা, The Light of Asia, or The Great Renunciation। এশিয়ার আলো বা মহা নিষ্ক্রমণ। আমি তার নামকরণ করেছি প্রাচী ধরিত্রীর আলো।
বইটি আটটি সর্গে (৫৩০০পংক্তি, ৪১০০ শব্দ) সম্পূর্ণ।
প্রথম সর্গ (Book the First)-- রাজপুত্র সিদ্ধার্থ বা গৌতমের জন্ম। তাঁর শৈশব ও কৈশোর।
দ্বিতীয় সর্গ ( Book the second)-- বিলাস, বৈভব ও ঈশ্বর্যের মধ্যে বেড়ে ওঠা। অষ্টাদশ বৎসর বয়সে যশোধরার সঙ্গে বিবাহ।
তৃতীয় সর্গ (Book the Third)-- পর্যাপ্ত সুখ ও বিলাস ব্যসনের মধ্যে জীবন অতিবাহিত হলেও রাজকুমারের অন্তরে কোথায়‌ যেন অতৃপ্তি, সংসারে নির্লিপ্ততা।
চতুর্থ সর্গ (Book the  fourth)-- রাজকুমার সিদ্ধার্থের মহানিষ্ক্রমণ।
পঞ্চম সর্গ ( Book the Fifth)-- আত্মগ্লানি-সঞ্জাত বিষাদ, নিরন্ন নির্জলা উপবাস, এক রাখালের দেওয়া দুগ্ধপান।
ষষ্ঠ সর্গ (Book the Sixth)-- সুজাতার পরমান্ন নিবেদন, 'মারী বা মার' দুর্গহের সঙ্গে সংগ্রাম, বোধিবৃক্ষের তলায় মহাধ্যানে লীন ও পরম সত্যের উপলব্ধি।
সপ্তম সর্গ (Book the Seventh)-- সন্তানের অদর্শনে পিতা শুদ্ধোদনের শোক, যুবরাজ্ঞী বিরোহিনী  যশোধরার নিরন্তর উদ্বেগ, সপ্তম বর্ষীয় বালক রাহুলের প্রশ্ন, 'পিতা কোথায়', অকস্মাৎ দুই ভিনদেশী বণিকের আগমন, তাদের মুখে বুদ্ধের বাণী। অতঃপর  সন্ন্যাসী বুদ্ধের স্বগৃহে আগমন, স্বাগত অনুষ্ঠান, স্ত্রী সহ পরিবারের সকলের বৌদ্ধধর্মে  দীক্ষালাভ।
অষ্টম সর্গ (Book the Eight)-- ভিক্ষু সম্প্রদায় গঠন, কিসা গৌতমীর উপাখ্যান।

সুধী পাঠকদের কাছে ভগবান বুদ্ধের জীবনীর এই সংক্ষিপ্তসার জানা, জানা অবশ্যপাঠ্য ইতিহাসের অংশ হিসাবে। কিন্তু সেই জীবনালেখ্য মানবতা, বিশ্বচেতনা ও জনগণতান্ত্রিকতার ক্রমোত্তরণের প্রচেষ্টায় কতখানি অনুঘটকের কাজ করেছে তা এই ঐতিহাসিক গ্রন্থটির বিপুল প্রচার ও প্রভাবের দ্বারা স্বীকৃত হয়েছে। প্রশ্ন উঠবে  'প্রাচী ধরিত্রীর আলো' বইটি প্রকাশিত হবার আগে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারিত, প্রসারিত হয়নি ? হয়েছিল। আড়ম্বরপূর্ণ   যাগ‌‌যজ্ঞের অগ্নিশিখার জ্যোতির্বলয়ের গন্ডীর মধ্যে থাকা অর্থাৎ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও‌ বৈশ্য সম্প্রদায়ের বাইরের শূদ্র বা ন-আর্য জনগোষ্ঠীর 'আপামর' নরনারী বুদ্ধের সরল, সহজ ও মানবিক বাণীর আবেদনে বিমোহিত হয়ে সাড়া দিয়েছিলেন-- 'বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি'।
সে যাই হোক্, আমরা ফিরে আসি 'প্রাচী ধরিত্রীর আলো' গ্রন্থটির প্রসঙ্গে। মুক্ত ছন্দের এই কাব্যটির আটটি সর্গের বর্ণিত আখ্যান সম্পূৰ্ণরূপে আলোচনার করবার প্রয়াস।   একটি দুর্বহ কর্মভার। (অদূর ভবিষ্যতে তাও পুস্তক আকারে প্রকাশিত হবে।) আমরা আলোচনা করি পূর্ণ আখ্যায়িকার কিছু খন্ডাংশ নিয়ে। 


কাব্যটির আরম্ভ হয়েছে এইভাবে, 


Book the First 

"The Scripture of the saviour of the World, 

Lord Buddha --- Prince Sidddrtha styled on earth --

In Earth and Heavens and Hell incomparable,

All- honoured, Wisest, Best, most pitiful ;  

The teacher of Nirvana and the Law." 


জগতের মুক্তিদাতা বুদ্ধদেব, সিদ্ধার্থ নাম নিয়ে
আবির্ভূত এই ধরাতলে। তুলনা নাইকো তার
ত্রিজগত মাঝে। শ্রদ্ধার দিব্যাসনে অধিষ্ঠান তার
পুরুষোত্তম, করুণাময়, জ্ঞানের আধার ---
বিশ্ববিধান আর মহাপরিনির্বাণের পথের দিশারী।    (অনুবাদ মৎকৃত) 


এখানেই  এডুইন আর্নল্ড মহাশয়ের লেখনীর মহিমা এবং  কথকথাটির আকর্ষণীয় গৌরচন্দ্রিকা। গৌতম বুদ্ধের প্রতি কতখানি শ্রদ্ধাবনত আত্মসমর্পণ, কী গভীর প্রেম ! মনে হয়না তিনি সাতসমুদ্র পারের কোন এক ভিনদেশী মানুষ। মনে হতেই পারে তিনি যেন এই ভারতভূমির একজন ভক্ত, ঈশ্বরে সমরর্পিত-প্রাণ বৈষ্ণব।
এবার দেখি সিদ্ধার্থের জন্ম লগ্নের বিবরণ, 


...That night The wife of King Suddhodana,
Maya, the Queen, asleep beside her Lord,  
Dreamed a strange dream ; dreamed that a star from heaven ----
Splendid, six-rayed in colour rosy-pearl,
Where of the token was an Elephant
Six tusked, and white as milk of Kamadhuk --
Shot through the void and sinking into her,
Entered her womb upon the right". 


যেন স্বর্গের আশীর্বাদ এল নেমে, মর্ত্য মানবী মায়ের বক্ষ পূর্ণ হোল দুগ্ধসুধায়, আলোয় আলোয় ভরে গেল  চরাচর। কম্পিত অরণ্য-পর্বত.... রাণীমার আনন্দ ছড়িয়ে পড়লো সর্বত্র। উদ্বেলিত হয়ে উঠল স্বর্গ মর্ত্য পাতাল ...। 


এইভাবে আরম্ভকাল হতে সমাপ্তি পর্যন্ত কথকের আবেগের, আনন্দের উচ্ছ্বাসে ভাব-সিক্ত এই কাহিনীকাব্যের সর্বাঙ্গ। সমস্তক্ষণ মনে হবে লেখক যেন বৈষ্ণবীয় ভক্তিরসে এবং ভারতীয় সভ্যতার, বিশেষ করে সাহিত্যরসে অভিসিঞ্চিত হয়েই এই গ্রন্থটি প্রণয়ন করেছেন। এক্ষেত্রে একটি সমগোত্রীয় বর্ণনা স্মরণে আসে, 


"কপিলাবস্তুর রাজবাড়ি। রাজরাণী মায়াদেবী ঘুমিয়ে রয়েছেন। ঘরের সামনে খোলা ছাদ, তার ওধারে বাগান। শহর মন্দির মঠ, আরও ওধারে দূরে হিমালয় পর্বতশ্রেণী --- সাদা বরফে ঢাকা। আর সেই পাহাড়ের উপরে আকাশ জুড়ে আশ্চর্য সাদা আলো। শুদ্ধোধন সেই আলোর দিকে চেয়ে আছেন, এমন সময় মায়াদেবী জেগে উঠে   বললেন, "মহারাজ, কি চমৎকার স্বপ্নই যে দেখলাম ! এতটুকু একটি সাদা হাতি, দ্বিতীয়ার চাঁদের মতন কচি কচি দুটো দাঁত, সে যেন হিমালয়ের ওপার থেকে মেঘের উপর দিয়ে আমার কোলে নেমে এল। তারপর সে কোথায় গেল দেখতে পেলেম না। "
                                                ---------অবনীন্দ্রনাথ 


কালি-কলম ও রঙ-তুলির এমন যুগলবন্দি আমাদের বিস্মিত করে। চোখে দেখি ছবি আর অন্তরে অনুরণিত হয় পণ্ডিত রবিশঙ্কর আর ইহুদী মেদুইনের সেতার ও বেহালায় প্রাচ্য পাশ্চাত্যের মিলনসঙ্গীত। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য কেননা লেখক ভারতের পুনেতে ডেকান কলেজের অধ্যক্ষ পদে আসীন ছিলেন এক সময়ে।

                        (ক্রমশঃ)
______________________________________________
                                          

বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০২৪

সহাস্য বিষন্নতা ও কবি জীবনান্দ

                          

সহাস্য বিষন্নতা ও কবি জীবনান্দ 

 এক 


হঠাৎই মনে হতেই পারে এমন একটি বিরোধাভাস অলঙ্কারের বাক্যবন্ধ দিয়ে কবি জীবনান্দের উপর আলোচনার সূচনা করা হোল কেন ? কেননা জীবনান্দের প্রায় বেশীরভাগ কবিতার আন্তর আবেদনে একটি সকরুণ সুর বেজে ওঠে। সে সুর জীবনদ্বন্দ্বের, সে সুর 'অতীতের' অবর্তমানতার, সে সুর 'সুন্দরের' ক্ষয়মানতার।
আবার সমকালিক অনেক বাঙলার আধুনিক কবি তাঁর কাব্যকে পরাবাস্তবতার অভিব্যক্তি বলেও চিহ্নিত করেছেন।
সত্যই কি জীবনান্দ পরাবাস্তববাদী কবি ? 
পরাবাস্তবতার সামান্য পরিচয় পাবার পর আমরা দেখি তার কাব্যদর্শন পরাবাস্তবতার মধ্যে পড়ে কি না।
এই পরাবাস্তববাদী আন্দোলন সূচিত হয় প্রথম  বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে মূলত ইউরোপখণ্ডের ফ্রান্স, স্পেন, বেলজিয়াম --- এইসব দেশে। পরাবাস্তববাদী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রথম উদ্গাতা হলেন কবি, শিল্পী, সমালোচক আঁদ্রে বেঁত।‌ তার সঙ্গে আরো যাঁরা ছিলেন তাঁদের মধ্যে সালভাদর দালি, ম্যাক্স আর্নষ্ট, রেনে মাগ্রিত উল্লেখযোগ্য। বিষয়টি বেশ জটীল। তবু সামান্য একটু সহজ করে বলা যেতেই পারে।
আন্দ্রে বেনট বলছেন,
"পরাবাস্তববাদ স্বপ্নের সর্বশক্তিতে বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে খেলা করে, চিন্তার অনির্দেশিত খেলায়। "
ঠিক কথা। মানব মনের উপরিতলের পরিচয় সহজেই, নিজের ক্ষেত্রে কিছুটা বোঝা যায় বা অন্যকে বোঝানোও যায় ; কিন্তু অন্তঃস্তলের পরিচয়, আপনার ক্ষেত্রেও মাঝে মাঝেই দুর্বোধ্য ঠেকে,
"আপনাকে এই জানা আমার ফুরাবে না।"
                                               ---- রবীন্দ্রনাথ।
আর অপরের মনের সন্ধান পেতেই তো যুগ যুগ ধরে এত
ডুবুরী, এত অভিযাত্রী ---- হোমার, ভার্জিল, তাসো, দান্তে  সেক্সপিয়ের ; ব্যাস, বাল্মীকি, ভবভূতি, কালিদাস, রবীন্দ্রনাথ। (এই নামগুলি প্রতিষ্ঠান অর্থে এখানে উল্লেখিত)।
‌আবার ব্রেনট এবং তাঁর সঙ্গীরা যেহেতু ফ্রয়েড মহাশয়ের (Sigmund Freud) অনুগামী, তাই তারা মনোবিজ্ঞানের গভীরে ডুব দিয়ে তাঁদের মতবাদের যুক্তি সাজিয়েছেন। তাদের শিল্প সৃষ্টিতেও 'সাইচিক' অভিব্যক্তি।
আমরা বেশ দূরে চলে গিয়েছিলাম। প্রয়োজনও আছে ; কেননা যে কবি 'হাজার বছর ধরে' পৃথিবীর পথে পথে  হাঁটছেন, সুদূর ধূসর অতীতের ইতিহাসের ধংসস্তুপে মনে মনে বা স্বপ্নাচ্ছন্নতায়, তাঁর অবচেতনের সুলুক সন্ধান না করলে তাঁর সৃষ্টির অন্দরমহলের খবরই বা পাব কেমন করে ? এখানে ব্রেনট আরো একটি কথা বলেছেন,
"অবচেতন মনের ক্রিয়াকলাপকে উদ্ভট ও আশ্চর্য সব রূপকল্প দ্বারা প্রকাশ করা" যা পরাবাস্তবতার অন্যতম লক্ষণ --- তাই তো  আমরা জীবনান্দের সৃষ্টির মধ্যে লক্ষ্যে করে থাকি।
এবার কবি জীবনান্দের কাব্যগ্রন্থের তালিকা যা বেশ
দীর্ঘই ---
ঝরা পালক, ধূসর পাণ্ডুলিপি, বনলতা সেন, সাতটি তারার তিমির, মহাপৃথিবী, বেলা অবেলা কালবেলা, রূপসী বাঙলা, সুদর্শনা, মনবিহঙ্গম, আলোপৃথিবী, ছায়া আবছায়া, কৃষ্ণা দশমী, জীবনান্দ দাশের দীর্ঘ কবিতা।‌
এসকল কাব্যগ্রন্থের মধ্যে অনেকগুলিই কবির তিরোভাব হবার পর প্রকাশিত হয়েছে। সেগুলি সম্পাদনা করেছেন আবদুল মান্নান সৈয়দ, দেবীপ্রসাদ বন্দোপাধ্যায়, ভূপেন্দ্র গুহ, ফয়জুল লতিফ, গৌতম মিত্র প্রভৃতি লেখক ও আলোচকবৃন্দ।
                            ক্রমশঃ 

সহাস্য বিষন্নতা ও কবি জীবনান্দ

                      দুই


তাঁর কাব্যগ্রন্থগুলির বিশদে আলোচনা করবার প্রয়াস রয়েছে অপর একটি গ্রন্থে ('বিন্দুতে সিন্ধু দর্শন--দ্বিতীয় খণ্ড)। বর্তমানে তাঁর বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থটির বহুপঠিত এবং বহুচর্চিত কবিতা 'বনলতা সেন '  সম্মন্ধে আলোচনা করবার চেষ্টা করব।
কবিতাটির প্রথম প্রকাশ বুদ্ধদেব বসুর কবিতা পত্রিকায়, ১৯৩৫ খ্রীষ্টাব্দের ডিসেম্বরে। পরে 'বনলতা সেন' কবির তৃতীয় কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। আবারো সেটি 'মহাপৃথিবী' কাব্যগ্রন্থে স্থান লাভ করে।
কবিতাটির প্রথম পংক্তি পাঠককে ঝাঁকুনি দেয়।
'হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে' --- সিংহল সমুদ্র, অন্ধকারে ঢাকা মালয় সাগর, বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগৎ। এসেছে বিধর্ভ নগর, নিশার তিমিরাচ্ছন্ন বিদিশা নগরী--- কবির এহেন অতীতচারী কল্পনার অভিযাত্রার সঙ্গী হবে যে পাঠক তারও তো মনে ক্লান্তিভার আসবেই নেমে। হাজার বছর ধরে দূরে, দূরান্তে পদচারণায় ক্লান্তি-শিথিল জীবনের পরমতম আশ্রয়--  একটি নিশ্চিন্ত আশ্রয় প্রেম। কোথায় সে, কি রূপ তার ? 


উত্তর ---  নাটোরে, বনলতা সেন। অন্ধকারে ঢাকা বিদিশা নগরীর রাত্রির মত তার কেশরাশি, শ্রাবস্তী নগরীর কারুকলার সৌন্দর্য দিয়ে গড়া তার মুখশ্রীমায়া। অকূল সমুদ্রের দিকভ্রষ্ট অভিযাত্রীর  অকস্মাৎ দেখা সবুজ দারুচিনি দ্বীপ খুঁজে পায়, তেমনি সেই আশাময়ী ভাষাময়ী প্রেমময়ীর আবির্ভাব, আশ্রয়দানের অর্ঘ্য (নীড়) সাজিয়ে চিরপরিচয়ের নির্ভার নির্ভরতায় আমন্ত্রণ জানিয়ে বলে, ''এতদিন কোথায় ছিলেন ?"
তারপর শ্রান্তিহরা, শান্তিময়ী 'অনন্ত' বিশ্রাম। অশ্রুত শব্দের শিশির-পতনের নৈশব্দমাখা সন্ধ্যায়, যখন রৌদ্রের আভাটুকুও মিলিয়ে যায় আকাশবিহারী চিলের ডানায়, কূলায়ে ফিরে পাখী, নদী তার ক্লান্তি ঢালে সাগরসঙ্গমে, সমস্ত রঙ একাকার হয়ে যায় সান্ধ্য অন্ধকারে, অস্তগত দিনের গল্পের পাণ্ডুলিপি লেখে ঝিলমিল জোনাকীর আলো --- সেই দিনশেষের, (জীবন শেষের!) একান্ত, একমাত্র অবলম্বন বনলতা সেন। সেই কি চিরন্তন নারীত্বের কল্পমূর্তি --- "the Eternal feminine" ? 


কবিতাটিতে কবি এক অত্যাশ্চার্য প্রেমের কল্পচিত্র অঙ্কন করেছেন। কবির মানসী, নাটোরের 'বনলতা সেন',  নাটোরের রাজপুরীর রাজকন্যা নয় ; যদি হোত তবে আমরা বাঙলা সংস্করণের পেত্রার্কার লরা, বা দান্তের বিয়াত্রিস, বা লিওর্নাদো 'দ্য ভিঞ্চির মোনালিসাকে পেতাম। দেহসুষমার গঠনে মানবী রূপের চিহ্নগুলি সংরক্ত আবেগের কলমের তুলি দিয়ে আঁকা হোত। কিন্তু এ কী! কোন্ সে সুদূর অতীতের, বিস্মৃতির ছায়াময়ী অস্পষ্টতায় হারিয়ে যাওয়া 'বিদিশা'র তমসাময়ী রাত্রি এসেছে সে নারীর চুলের উপমা হয়ে, মুখের আদলের উপমায় এসেছে 'শ্রাবস্তীর' কারুকার্যময়তা। আবার তার সঙ্গে কবির অন্তিম দেখা দিনান্ত বেলার 'অন্ধকারে'।
অবচেতন মনের অন্তঃস্তল থেকে, কোন্ সে বিষাদমগ্নতা  হতে উঠে এসেছে মিলনহীন প্রেমের কামনা। সফেন জীবনসমুদ্র পাড়ি দিয়ে দু' দণ্ড শান্তির প্রত্যাশা ! কবি বলছেন, 'দিয়েছিল' ; কিন্তু জীবনের 'সব লেন দেন' ফুরায় যখন, যখন থাকে শুধু অন্ধকার ?
পাঠককে এমনই এক বিশ্বাস অবিশ্বাসের আলো ছায়ায় অমোঘ আকর্ষণে টেনে আনতে পারেন যে শিল্পী তাকে তো বলতেই হবে পরাবাস্তবতার স্রষ্টা।
"Surrealist artists have drawn inspiration from mysticism, ancient cultures and indigenous art and knowledge as a way of imagining alternative realities."

ইংরেজি সাহিত্যের কবি এবং অধ্যাপক জীবনান্দ দাশের এই কবিতার সঙ্গে (Edgar Allen Poe) এডগার এলান পো-র 'To Helen' কবিতাটির মিল বিস্ময়কর। কয়েকটি লাইন উদ্ধার করি,
"Helen, thy beauty is to me
Like those Nicean barks of yore,
That gently, over a perfumed sea,
The weary way-worn wanderer bore
To his own native shore.''
Nicean barks, perfumed sea, way-worn wanderer, to his native shore -- এ সকল সমাসবদ্ধ শব্দগুলি যেন এই মাত্র জীবনান্দের 'বনলতা সেন' কবিতায় পড়ে এসেছি --- মনে হোল। তারপর ঐ,
"Thy hyacinth hair, thy classic face,
And naiad airs have brought me home
To the beauty of fair Greece,
And the grandeur of old Rome."
"চুল তার কবেকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য ;"
"Thy hyacinth hair, thy classic face."
What a parallel !The person, the object -- 

those are, as if, depicted similar to one another. 


এ তো গেল 'বনলতা সেন' কবিতাটির কথা।
এর পরও আসে তাঁর রূপসী বাঙলা', যে কাব্যগ্রন্থটি  তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়। জন্মভূমির সমস্তকে, (তার ইতিহাস-ভূগোল, তার অতীত, তার বর্তমান, তার পুরাণ (mythology), তার শিল্পকলা, সাহিত্য, লোকাচার, লোকসংস্কৃতি, লোকসঙ্গীত) চির অমলিন, চির অক্ষয় করে গিয়েছেন এই মরমীয়া কবি -- হাস্যরসের উচ্ছ্বাসে নয়, বেদনার অশ্রুজলধারায় অভিসিঞ্চিত করে।
দান্তের পোর্টেট দেখে কার্লাইল বলে ছিলেন, 


"I think it is the mournfulest (old english) face that ever was painted from reality, an altogether tragic, heart-affecting face." 


আমরাও কবি জীবনান্দের হাস্যোজ্জ্বল মুখ কখনো দেখিনি ; দেখেছি সদাবিষন্ন, ছায়াচ্ছন্ন এক বেদনাতুর মুখাবয়ব। 


(কিন্তু বন্ধুমহলে তাঁর হাস্যরসাত্মক মন্তব্যগুলি বহুচর্চিত।‌
সে কাহিনী বারান্তরে।)

ঋণ স্বীকার
বুদ্ধদেব বসু
ভূমেন্দ্র গুহ
সুজিত সরকার
সমকালিক দেশ পত্রিকা।
দুলাল চন্দ্র বন্দোপাধ্যায়
১৫ -১১ - ২০২৪
কলকাতা।
                             সমাপ্ত

সহাস্য বিষন্নতা ও কবি জীবনান্দ

                      দুই 


তাঁর কাব্যগ্রন্থগুলির বিশদে আলোচনা করবার প্রয়াস রয়েছে অপর একটি গ্রন্থে ('বিন্দুতে সিন্ধু দর্শন--দ্বিতীয় খণ্ড)। বর্তমানে তাঁর বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থটির বহুপঠিত এবং বহুচর্চিত কবিতা 'বনলতা সেন '  সম্মন্ধে আলোচনা করবার চেষ্টা করব।
কবিতাটির প্রথম প্রকাশ বুদ্ধদেব বসুর কবিতা পত্রিকায়, ১৯৩৫ খ্রীষ্টাব্দের ডিসেম্বরে। পরে 'বনলতা সেন' কবির তৃতীয় কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। আবারো সেটি 'মহাপৃথিবী' কাব্যগ্রন্থে স্থান লাভ করে।
কবিতাটির প্রথম পংক্তি পাঠককে ঝাঁকুনি দেয়।
'হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে' --- সিংহল সমুদ্র, অন্ধকারে ঢাকা মালয় সাগর, বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগৎ। এসেছে বিধর্ভ নগর, নিশার তিমিরাচ্ছন্ন বিদিশা নগরী--- কবির এহেন অতীতচারী কল্পনার অভিযাত্রার সঙ্গী হবে যে পাঠক তারও তো মনে ক্লান্তিভার আসবেই নেমে। হাজার বছর ধরে দূরে, দূরান্তে পদচারণায় ক্লান্তি-শিথিল জীবনের পরমতম আশ্রয়--  একটি নিশ্চিন্ত আশ্রয় প্রেম। কোথায় সে, কি রূপ তার ? 


উত্তর ---  নাটোরের বনলতা সেন। অন্ধকারে ঢাকা বিদিশা নগরীর রাত্রির মত তার কেশরাশি, শ্রাবস্তী নগরীর কারুকলার সৌন্দর্য দিয়ে গড়া তার মুখশ্রীমায়া। অকূল সমুদ্রের দিকভ্রষ্ট অভিযাত্রীর  অকস্মাৎ দেখা সবুজ দারুচিনি দ্বীপ খুঁজে পায়, তেমনি সেই আশাময়ী ভাষাময়ী প্রেমময়ীর আবির্ভাব, আশ্রয়দানের অর্ঘ্য (নীড়) সাজিয়ে চিরপরিচয়ের নির্ভার নির্ভরতায় আমন্ত্রণ জানিয়ে বলে, ''এতদিন কোথায় ছিলেন ?" 


তারপর শ্রান্তিহরা, শান্তিময়ী 'অনন্ত' বিশ্রাম। অশ্রুত শব্দের শিশির-পতনের নৈশব্দমাখা সন্ধ্যায়, যখন রৌদ্রের আভাটুকুও মিলিয়ে যায় আকাশবিহারী চিলের ডানায়, কূলায়ে ফিরে পাখী, নদী তার ক্লান্তি ঢালে সাগরসঙ্গমে, সমস্ত রঙ একাকার হয়ে যায় সান্ধ্য অন্ধকারে, অস্তগত দিনের গল্পের পাণ্ডুলিপি লেখে ঝিলমিল জোনাকীর আলো --- সেই দিনশেষের, (জীবন শেষের!) একান্ত, একমাত্র অবলম্বন বনলতা সেন। সেই কি চিরন্তন নারীত্বের কল্পমূর্তি --- "the Eternal feminine" ? 


কবিতাটিতে কবি এক অত্যাশ্চার্য প্রেমের কল্পচিত্র অঙ্কন করেছেন। কবির মানসী, নাটোরের 'বনলতা সেন',  নাটোরের রাজপুরীর রাজকন্যা নয় ; যদি হোত তবে আমরা বাঙলা সংস্করণের পেত্রার্কার লরা, বা দান্তের বিয়াত্রিস, বা লিওর্নাদো 'দ্য ভিঞ্চির মোনালিসাকে পেতাম। দেহসুষমার গঠনে মানবী রূপের চিহ্নগুলি সংরক্ত আবেগের কলমের তুলি দিয়ে আঁকা হোত। কিন্তু এ কী! কোন্ সে সুদূর অতীতের, বিস্মৃতির ছায়াময়ী অস্পষ্টতায় হারিয়ে যাওয়া 'বিদিশা'র তমসাময়ী রাত্রি এসেছে সে নারীর চুলের উপমা হয়ে, মুখের আদলের উপমায় এসেছে 'শ্রাবস্তীর' কারুকার্যময়তা। আবার তার সঙ্গে কবির অন্তিম দেখা দিনান্ত বেলার 'অন্ধকারে'।
অবচেতন মনের অন্তঃস্তল থেকে কোন্ সে বিষাদমগ্নতা  হতে উঠে এসেছে মিলনহীন প্রেমের কামনা। সফেন জীবনসমুদ্র পাড়ি দিয়ে দু' দণ্ড শান্তির প্রত্যাশা ! কবি বলছেন, 'দিয়েছিল' ; কিন্তু জীবনের 'সব লেন দেন' ফুরায় যখন, যখন থাকে শুধু অন্ধকার ?
পাঠককে এমনই এক বিশ্বাস অবিশ্বাসের আলো ছায়ায় অমোঘ আকর্ষণে টেনে আনতে পারেন যে শিল্পী তাকে তো বলতেই হবে পরাবাস্তবতার স্রষ্টা।
"Surrealist artists have drawn inspiration from mysticism, ancient cultures and indigenous art and knowledge as a way of imagining alternative realities."

ইংরেজি সাহিত্যের কবি এবং অধ্যাপক জীবনান্দ দাশের এই কবিতার সঙ্গে (Edgar Allen Poe) এডগার এলান পো-র 'To Helen' কবিতাটির মিল বিস্ময়কর। কয়েকটি লাইন উদ্ধার করি, 


"Helen, thy beauty is to me
Like those Nicean barks of yore,
That gently, over a perfumed sea,
The weary way-worn wanderer bore
To his own native shore.'' 


Nicean barks, perfumed sea, way-worn wanderer, to his native shore -- এ সকল সমাসবদ্ধ শব্দগুলি যেন এই মাত্র জীবনান্দের 'বনলতা সেন' কবিতায় পড়ে এসেছি --- মনে হোল। তারপর ঐ, 

"Thy hyacinth hair, thy classic face,
And naiad airs have brought me home
To the beauty of fair Greece,
And the grandeur of old Rome."
"চুল তার কবেকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য ;"
"Thy hyacinth hair, thy classic face."
What a parallel !The person, the object -- those are, as if, depicted similar to one another.
এ তো গেল 'বনলতা সেন' কবিতাটির কথা। 

এর পরও আসে তাঁর রূপসী বাঙলা', যে কাব্যগ্রন্থটি  তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়। জন্মভূমির সমস্তকে, (তার ইতিহাস-ভূগোল, তার অতীত, তার বর্তমান,  তার পুরাণ (mythology), তার শিল্পকলা, সাহিত্য, লোকাচার, লোকসংস্কৃতি, লোকসঙ্গীত) চির অমলিন, চির অক্ষয় করে গিয়েছেন এই মরমীয়া কবি -- হাস্যরসের উচ্ছ্বাসে নয়, বেদনার অশ্রুজলধারায় অভিসিঞ্চিত করে।
দান্তের পোর্টেট দেখে কার্লাইল বলে ছিলেন, 

"I think it is the mournfulest (old english) face that ever was painted from reality, an altogether tragic,  heart-affecting face." 

আমরাও কবি জীবনান্দে হাস্যোজ্জ্বল মুখ কখনো দেখিনি ; দেখেছি সদাবিষন্ন, ছায়াচ্ছন্ন এক বেদনাতুর মুখাবয়ব। 


(কিন্তু বন্ধুমহলে তাঁর হাস্যরসাত্মক মন্তব্যগুলি বহুচর্চিত।‌
সে কাহিনী বারান্তরে।)

ঋণ স্বীকার
বুদ্ধদেব বসু
ভূমেন্দ্র গুহ
সুজিত সরকার
সমকালিক দেশ পত্রিকা।
দুলাল চন্দ্র বন্দোপাধ্যায়
১৫ -১১ - ২০২৪
কলকাতা।
                             সমাপ্ত

বুধবার, ১৩ নভেম্বর, ২০২৪

সহাস্য বিষন্নতার কবি জীবনানন্দ

                           

সহাস্য বিষন্নতা ও কবি জীবনান্দ 

এক 


হঠাৎই মনে হতেই পারে এমন একটি বিরোধাভাস অলঙ্কারের বাক্যবন্ধ দিয়ে কবি জীবনানন্দের উপর আলোচনার সূচনা করা হোল কেন ? কেননা জীবনান্দের প্রায় বেশীরভাগ কবিতার আন্তর আবেদনে একটি সকরুণ সুর বেজে ওঠে। সে সুর জীবনদ্বন্দ্বের, সে সুর 'অতীতের' অবর্তমানতার, সে সুর 'সুন্দরের' ক্ষয়মানতার।
আবার সমকালিক অনেক বাঙলার আধুনিক কবি তাঁর কাব্যকে পরাবাস্তবতার অভিব্যক্তি বলেও চিহ্নিত করেছেন।
সত্যই কি জীবনান্দ পরাবাস্তববাদী কবি ? 
পরাবাস্তবতার সামান্য পরিচয় পাবার পর আমরা দেখি তার কাব্যদর্শন পরাবাস্তবতার মধ্যে পড়ে কি না।
এই পরাবাস্তববাদী আন্দোলন সূচিত হয় প্রথম  বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে মূলত ইউরোপখণ্ডের ফ্রান্স, স্পেন, বেলজিয়াম --- এইসব দেশে। পরাবাস্তববাদী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রথম উদ্গাতা হলেন কবি, শিল্পী, সমালোচক আঁদ্রে বেঁত।‌ তার সঙ্গে আরো যাঁরা ছিলেন তাঁদের মধ্যে সালভাদর দালি,ম্যাক্স আর্নষ্ট, রেনে মাগ্রিত উল্লেখযোগ্য। বিষয়টি বেশ জটীল। তবু সামান্য একটু সহজ করে বলা যেতেই পারে।
আন্দ্রে বেনট বলছেন,
"পরাবাস্তববাদ স্বপ্নের সর্বশক্তিতে বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে খেলা করে, চিন্তার অনির্দেশিত খেলায়। "
ঠিক কথা। মানব মনের উপরিতলের পরিচয় সহজেই, নিজের ক্ষেত্রে কিছুটা বোঝা যায় বা অন্যকে বোঝানোও যায় ; কিন্তু অন্তঃস্তলের পরিচয়, আপনার ক্ষেত্রেও মাঝে মাঝেই দুর্বোধ্য ঠেকে,
"আপনাকে মোর জানা আমার ফুরাবেনা।"
                                               ---- রবীন্দ্রনাথ।
আর অপরের মনের সন্ধান পেতেই তো যুগ যুগ ধরে এত
ডুবুরী, এত অভিযাত্রী ---- হোমার, ভার্জিল, তাসো, দান্তে  সেক্সপিয়ের ; ব্যাস, বাল্মীকি, ভবভূতি, কালিদাস, রবীন্দ্রনাথ। (এই নামগুলি প্রতিষ্ঠান অর্থে এখানে উল্লেখিত)।
‌আবার ব্রেনট এবং তাঁর সঙ্গীরা যেহেতু ফ্রয়েড মহাশয়ের (Sigmund Freud) অনুগামী, তাই তারা মনোবিজ্ঞানের গভীরে ডুব দিয়ে তাঁদের মতবাদের যুক্তি সাজিয়েছেন। তাদের শিল্প সৃষ্টিতেও 'সাইচিক' অভিব্যক্তি।
আমরা বেশ দূরে চলে গিয়েছিলাম। প্রয়োজনও আছে ; কেননা যে কবি 'হাজার বছর ধরে' পৃথিবীর পথে পথে  হাঁটছেন, সুদূর ধূসর অতীতের ইতিহাসের ধংসস্তুপে মনে মনে বা স্বপ্নাচ্ছন্নতায়, তাঁর অবচেতনের সুলুক সন্ধান না করলে তাঁর সৃষ্টির অন্দরমহলের খবরই বা পাব কেমন করে ? এখানে ব্রেনট আরো একটি কথা বলেছেন,
"অবচেতন মনের ক্রিয়াকলাপকে উদ্ভট ও আশ্চর্য সব রূপকল্প দ্বারা প্রকাশ করা" যা পরাবাস্তবতার অন্যতম লক্ষণ --- তাই তো  আমরা জীবনান্দের সৃষ্টির মধ্যে লক্ষ্যে করে থাকি।
এবার কবি জীবনান্দের কাব্যগ্রন্থের তালিকা যা বেশ
দীর্ঘই ---
ঝরা পালক, ধূসর পাণ্ডুলিপি, বনলতা সেন, সাতটি তারার তিমির, মহাপৃথিবী, বেলা অবেলা কালবেলা, রূপসী বাঙলা।





Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...