সহাস্য বিষন্নতা ও কবি জীবনান্দ
এক
হঠাৎই মনে হতেই পারে এমন একটি বিরোধাভাস অলঙ্কারের বাক্যবন্ধ দিয়ে কবি জীবনান্দের উপর আলোচনার সূচনা করা হোল কেন ? কেননা জীবনান্দের প্রায় বেশীরভাগ কবিতার আন্তর আবেদনে একটি সকরুণ সুর বেজে ওঠে। সে সুর জীবনদ্বন্দ্বের, সে সুর 'অতীতের' অবর্তমানতার, সে সুর 'সুন্দরের' ক্ষয়মানতার।
আবার সমকালিক অনেক বাঙলার আধুনিক কবি তাঁর কাব্যকে পরাবাস্তবতার অভিব্যক্তি বলেও চিহ্নিত করেছেন।
সত্যই কি জীবনান্দ পরাবাস্তববাদী কবি ?
পরাবাস্তবতার সামান্য পরিচয় পাবার পর আমরা দেখি তার কাব্যদর্শন পরাবাস্তবতার মধ্যে পড়ে কি না।
এই পরাবাস্তববাদী আন্দোলন সূচিত হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে মূলত ইউরোপখণ্ডের ফ্রান্স, স্পেন, বেলজিয়াম --- এইসব দেশে। পরাবাস্তববাদী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রথম উদ্গাতা হলেন কবি, শিল্পী, সমালোচক আঁদ্রে বেঁত। তার সঙ্গে আরো যাঁরা ছিলেন তাঁদের মধ্যে সালভাদর দালি, ম্যাক্স আর্নষ্ট, রেনে মাগ্রিত উল্লেখযোগ্য। বিষয়টি বেশ জটীল। তবু সামান্য একটু সহজ করে বলা যেতেই পারে।
আন্দ্রে বেনট বলছেন,
"পরাবাস্তববাদ স্বপ্নের সর্বশক্তিতে বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে খেলা করে, চিন্তার অনির্দেশিত খেলায়। "
ঠিক কথা। মানব মনের উপরিতলের পরিচয় সহজেই, নিজের ক্ষেত্রে কিছুটা বোঝা যায় বা অন্যকে বোঝানোও যায় ; কিন্তু অন্তঃস্তলের পরিচয়, আপনার ক্ষেত্রেও মাঝে মাঝেই দুর্বোধ্য ঠেকে,
"আপনাকে এই জানা আমার ফুরাবে না।"
---- রবীন্দ্রনাথ।
আর অপরের মনের সন্ধান পেতেই তো যুগ যুগ ধরে এত
ডুবুরী, এত অভিযাত্রী ---- হোমার, ভার্জিল, তাসো, দান্তে সেক্সপিয়ের ; ব্যাস, বাল্মীকি, ভবভূতি, কালিদাস, রবীন্দ্রনাথ। (এই নামগুলি প্রতিষ্ঠান অর্থে এখানে উল্লেখিত)।
আবার ব্রেনট এবং তাঁর সঙ্গীরা যেহেতু ফ্রয়েড মহাশয়ের (Sigmund Freud) অনুগামী, তাই তারা মনোবিজ্ঞানের গভীরে ডুব দিয়ে তাঁদের মতবাদের যুক্তি সাজিয়েছেন। তাদের শিল্প সৃষ্টিতেও 'সাইচিক' অভিব্যক্তি।
আমরা বেশ দূরে চলে গিয়েছিলাম। প্রয়োজনও আছে ; কেননা যে কবি 'হাজার বছর ধরে' পৃথিবীর পথে পথে হাঁটছেন, সুদূর ধূসর অতীতের ইতিহাসের ধংসস্তুপে মনে মনে বা স্বপ্নাচ্ছন্নতায়, তাঁর অবচেতনের সুলুক সন্ধান না করলে তাঁর সৃষ্টির অন্দরমহলের খবরই বা পাব কেমন করে ? এখানে ব্রেনট আরো একটি কথা বলেছেন,
"অবচেতন মনের ক্রিয়াকলাপকে উদ্ভট ও আশ্চর্য সব রূপকল্প দ্বারা প্রকাশ করা" যা পরাবাস্তবতার অন্যতম লক্ষণ --- তাই তো আমরা জীবনান্দের সৃষ্টির মধ্যে লক্ষ্যে করে থাকি।
এবার কবি জীবনান্দের কাব্যগ্রন্থের তালিকা যা বেশ
দীর্ঘই ---
ঝরা পালক, ধূসর পাণ্ডুলিপি, বনলতা সেন, সাতটি তারার তিমির, মহাপৃথিবী, বেলা অবেলা কালবেলা, রূপসী বাঙলা, সুদর্শনা, মনবিহঙ্গম, আলোপৃথিবী, ছায়া আবছায়া, কৃষ্ণা দশমী, জীবনান্দ দাশের দীর্ঘ কবিতা।
এসকল কাব্যগ্রন্থের মধ্যে অনেকগুলিই কবির তিরোভাব হবার পর প্রকাশিত হয়েছে। সেগুলি সম্পাদনা করেছেন আবদুল মান্নান সৈয়দ, দেবীপ্রসাদ বন্দোপাধ্যায়, ভূপেন্দ্র গুহ, ফয়জুল লতিফ, গৌতম মিত্র প্রভৃতি লেখক ও আলোচকবৃন্দ।
ক্রমশঃ
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন