শনিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২২

পুনর্জন্ম

 অন্ধ তমসা ঢাকা রাত্রি হোক্ ক্ষয়, 
নব প্রভাতের রবি ছড়াক কিরণ। 
আত্মঘাতী বিদ্বেষের হোক্ আজ লয়– 
পাপহারা তাপহারা নূতন জীবন। 
ডুবজলে ডুব দিয়ে অতীতের পাঁক 
মুঠা মুঠা তুলে এনে ছড়িওনা আর। 
ক্ষোভ হিংসা ঈর্ষাগুলি অতলেই থাক – 
প্রেমের আলোয় ভরা মানব সংসার। 

       সম্পদের মোহঘোরে জড়ায়ে চেতনা, 
       ভোগের আলেয়া শিখা জ্বলিছে সম্মুখে ; 
       দুর্ণিবার বেগে ছোটে উলঙ্গ কামনা, 
       বিবেকের বাণীকন্যা কাঁদে নতমুখে। 
       নবোদিত অরুণের আলোকের গান 
       ছন্দে সুরে ভরে দিক ধরণীর প্রাণ। 

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় 
৩০–০৪–২০২২ 
শিলিগুড়ি।


মঙ্গলবার, ২৬ এপ্রিল, ২০২২

আলোর আলো

"The golden light came down into my heart. 
And all my speech is now a tune divine. 
A paean-song of Thee my single note; 
My words are drunk with the Immortal's wine." 
                          'The golden light' – Arobindo.

মানবচৈতন্য  আর বিশ্বচৈতন্যের মাঝখানে বিরহের দুর্লঙ্ঘ্য অন্তরাল। রবীন্দ্রনাথও তাঁর জীবনভর সাধনায় 
সেকথা বলেছেন বার বার তাঁর অমৃত-নিস্যন্দি ভাষায়। 

"তোমার আমার এ বিরহের অন্তরালে 
কতো আর সেতু বাঁধি।" 

এই সেতু বাঁধার প্রেরণা আসে প্রেমের মধ্যে দিয়ে, যার আধার নারী – সুচেতনা। 
_________________________________________

জ্বালো দীপ, সুচেতনা 

পোহায়নি রজনী এখনো, সুচেতনা, 
শুধু ওই অন্ধকার পারাবার শেষে, 
কূলহারা তারাগুলি কী আলোকে মিশে, 
নিজেরে হারায়ে চায় পূর্ণের পরশ। 
তুমিও কি তাই ? ঊষার জ্যোতির্লেখা – 
অকস্মাৎ দীপ্ত দীপ্তি এ কোন্ প্রকাশ ! 
অজানার উৎস হতে নিত্যঝরা‌ আলোকের ধারা ! 

মনে হয়, নিজেকে উৎসর্গ করি চরণে তোমার। 
কতো দিন, কতো রাত্রি এসেছে, গিয়েছে চলে – 
অহ্নিক গতির সাথে জীবনের চলমান পথে। 
কোন আলো, দিবস-নিশার কোনো প্রদীপশিখায় 
আপনা পাইনি খুঁজে সত্যরূপে, পূর্ণপরিচয়ে। 
আজ তুমি আছ, আমি আছি, আছে প্রেম আলো, 
শুভলগ্ন মিলনের, অমরার শিখা হতে জ্বালো – 
 দীপ জ্বালো। 

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় 
২৮/০৪/২০২২ 
শিলিগুড়ি। 





            (ক্রমশঃ)

রবিবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২২

জীবন সাধনা

 
"জীবনশেষের শেষ-জাগরণ-সম ঝলসিছে মহাবেদনা 
 নিমেষে দহিয়া যাহা কিছু আছে মম তীব্র ভীষণ
 চেতনা।" 
  – রবীন্দ্রনাথ, (খড়্গ,  গীতিমাল্য) 


যত দিন আছি , পেয়েছি তো পূর্ণ ভান্ড অমৃতের। 
শ্যামল সুন্দর এ পৃথিবী ,  তারাভরা, আলো ঝরা,
নিঃসীম আকাশ, তৃষাহরা পাত্রভরা জল, শ্বাস বায়ু, 
প্রাণ-মন, হৃদয়ের আকুল আবেগ, প্রীতি, ভালোবাসা। 
দিবালোক, রাত্রি-অন্ধকার, ঋতুমতী ধরিত্রীর বাৎসল্য সুবাস। 
জীবনের মহোৎসবে আনন্দের ঊর্মিল উচ্ছ্বাস। 

তবু কেন অপূর্ণতা ? 
আকাঙ্ক্ষার রাহু অনন্ত অতৃপ্তি নিয়ে 
নিত্য কেন আছে জেগে বুকের আকাশে ?
অনস্তিত্ব ভয়, জাগরণে ঘুমে, চেতনে বা অচেতনে, 
জ্বরের বিকার নিয়ে জন্মান্ধ করেছে আমাকে। 
যত পাই তত চাই, নিরন্তর ধাই – 
নিশিডাক, আলেয়ার শিখা একদিন সম্মুখে আমার
অকস্মাৎ নিভে যায়, দিগ্বিদিক লুপ্ত হয়, নামে অন্ধকার ! 

পূর্ণ থাকে সুধাময় এ বিশ্ব নিখিল, পূর্ণ চাঁদ জাগে পুণর্বার। 
সুচেতনা, কোথা তুমি ? দীক্ষা দাও, নির্বিকল্প প্রেম সাধনার। 

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় 
২৫/০৪/২০২২ 
কলকাতা।

____________________________________________



                                         

বুধবার, ২০ এপ্রিল, ২০২২

সুখের স্বর্গ নয় এ পৃথিবী


"Absent thee from felicity awhile, 
And in this harsh world draw thy breathe in pain..." 

--"Hamlet" , Shakespeare. 




 সুখের স্বর্গ নয় এ পৃথিবী --তুমি জানো , আমিও জানি ; 
তবু সুখ খুঁজে ফিরি নিরন্তর , বারে  বারে হার মানি । 
ছায়া ছায়া সুখের মায়ায় ছুটে যাই যেদিকে শ্মশান , 
দেখি, আছে পড়ে দগ্ধ বা অদগ্ধ অসংখ্য নিষ্প্রাণ – 
আমার অগ্রজ, বন্ধু , অক্লান্ত পথিক সুখ অন্বেষার । 
শুধু শকুনের মায়াকান্না, শ্বাপদের মিথ্যা হাহাকার ! 
যুদ্ধশেষে রণক্ষেত্র , মহামিলনের পুণ্যভূমি –
রাজা প্রজা , রাণী ভিখারিণী নাই , নাই আমি তুমি, 
নাই লোভ , মোহ -কাম -ক্রোধ , বাসনা প্রত্যাশা । 
নাই শত্রু, নাই মিত্র কিংবা স্বর্গারোহণের আশা । 

সুচেতনা, তাই তুমি মাননি' কী প্রেমহারা কামনা বন্ধন ? 
 ফেলে দিয়ে চন্দ্রহার , ত্যাগ করে' বাসর শয়ন – 
নিশিডাকে নিয়ে এলে চিরশান্তিপুরে , নীরব ইঙ্গিতে ? 
 অমোঘ সত্যের রূপ দেখালে কি বিকট ভঙ্গিতে ? 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 
২১-০৪-২০২২ 
কলকাতা । 














শনিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২২

বুদ্ধপূর্ণিমা

বুদ্ধ পূর্ণিমা


Sir Edwin Arnold - য়ের লেখা The light of Asia - 
বইটি প্রকাশিত হয় ১৮৭৯ খৃষ্টাব্দে। গৌতমবুদ্ধের জীবন ও তাঁর প্রচারিত ধর্মদর্শনের উপর আধারিত এই পুস্তকটি বিশ্বসাহিত্যের আকাশে একটি উজ্বল নক্ষত্র বিশেষ। এই অমিত্রাক্ষর ছন্দে (blank verse) রচিত মহাকাব্যটি পৃথিবীর বহু পণ্ডিত, গবেষক, সাহিত্যস্রষ্টা 
ও সাধন জগতের মানুষকে প্রভাবিত করেছে। তাঁদের মধ্যে নোবেলজয়ী স্রষ্টাও আছেন। 
স্বামী বিবেকানন্দ, মাহাত্মা গান্ধি, জওহরলাল নেহরু, বাবাসাহেব আম্বেদকর, কিপলিং, এলিয়ট, ইয়েটস, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রোমা রঁলা – এঁদের মতো অনেক মানবতাবাদী "এশিয়ার আলো"-য় আলোকিত। 
আলোচনা দীর্ঘায়িত করবার অবকাশ আছে কিন্তু সেটি  গ্রন্থ আকারে প্রকাশ করবার ইচ্ছাটুকু রেখে শুধু সেই মহা আবির্ভাবের ('দিব্য আলোর', যা এখনও অকলঙ্ক, জ্যোতির্ময়) শুভক্ষণটির স্মরণ করি। 

সদ্য রচিত কবিতাটি স্মরণের অন্তরালে বিস্মরণের প্রায়শ্চিত্ত। 
___________________________________________

বুদ্ধ পূর্ণিমা 

অহিংসার বাণী ভাসে অশ্রুজলে 

এলো নববর্ষ, বৈশাখী পূর্ণিমা, পূর্ণ চাঁদ, 
পরিপূর্ণ বসুন্ধরা সুশীতল জ্যোৎস্নার আলোয়। 
এমনই আছে এ জগৎ নিরবধি, অনাদি অনন্তকাল। 
কিন্তু পাপ আমার, পাপ তোমার জ্বালায়েছে চিতা, 
মানুষের হাতে পোড়ে মানব চেতনা নিরন্তর – 
সুনিশ্চিত লয় জেনে জয়ের কামনা, 
মরীচিকা অন্বেষণে নির্জলা মরণ ! 
তবু কেন আজ প্রাণে জাগে মৃতুহীন আশা ? 

আজ সেই বৈশাখী পূর্ণিমা। আকাশের নিঃসীম শূণ্যতা, 
অসীম মন্দিরে জাগে নিশার দেবতা, বরণ প্রদীপ নিয়ে হাতে - 
পুণ্য আবির্ভাব তিথি মৃত্যুঞ্জয়ী মানব আত্মার। 

মহাতীর্থঙ্কর, সত্য-সাধনায় রত অনাদ্যন্ত কাল, 
যুগ যুগান্তর পার হয়ে এমনই সে আত্মসৃজন – 
 শেষ জন্ম পরম সত্তার – বুদ্ধ নিরঞ্জন।‌ তারপর -- 
 হিংসাদীর্ণ পৃথিবীর বুক থেকে মহাপরিনির্বাণ। 

শুধু সেদিনের স্মৃতি, জ্যোৎস্নাময়ী নিশীথিনী 
স্মরণে রেখেছে বুকে বিষন্ন ব্যথায়। 
মানুষ পায়নি খোঁজ আপনার অন্তর-সত্ত্বার। 
ছায়া ছায়া দেবতার মায়াময় কুহকী ছলনা, 
কামনার অতৃপ্তির ঘোর মোহমুগ্ধ করেছে চেতনা ; 
তাই এত হিংসার তাণ্ডব, এত বিজিগীষা, 
অনিত্য সন্ধান – প্রাণের পূ্র্ণতা ক্ষয়ে' মরণ বরণ। 

ক্ষমা কর শাক্যমুনি, আত্মসংবিদ্-হারা চির অন্ধকারে, 
রয়ে যাবে মানবসংসার, অশাশ্বত জীবনের ব্যর্থ অহংকারে। 
তবু কোথা হতে আসে ভেসে অহিংসার মৃত্যুহীন বাণী, 
 করুণার শান্ত স্নিগ্ধ জ্যোতিঃ। বৈশাখী পূর্ণিমা রাত্রে 
জ্যোৎস্নায় পরিপূর্ণ নিখিল দেউল। পাদপীঠতলে তার, 
রাখি' দেব, অক্ষম প্রণতি।। 

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় 
৪ঠা বৈশাখ ১৪২৯ 
কোলকাতা। 
________________(পরিমার্জিত ও পুনঃ প্রকাশিত)

_____________________________________________




















বৃহস্পতিবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২২

নূতন বছর

সুচেতনা এসো 


শুক্লপক্ষ,  পূর্ণিমার চাঁদ পূর্বাশার দিগন্তের পারে,   
অস্তাচলে সন্ধ্যাসূর্য – তপোশ্রান্ত বিশ্ববসু গৈরিক বসন। 
সুচেতনা, কর শান্তি পাঠ – শুভক্ষণ সমাসন্ন ! 
সন্ধিক্ষণ – সুদূরের, অদূরের । 
সার্ধ-দ্বিসহস্রবর্ষ আগে এমনই প্রশান্ত ছিল বিশ্বচরাচর, 
এমনই মৌনতা, এমনই নিষ্কম্প ছিল সায়ান্ন সমীর, 
যুগান্তর এসেছিল কালান্তর পরে, হিংসাদীর্ণ পৃথিবীতে। 
 বিস্মৃত সে অভ্যুথান, বিস্মৃত সে বাণী, 
বিস্মৃতির গর্ভে লীন সত্যধর্ম, সত্য অন্বেষণ। 

ওই আছে পড়ে অপাপবিদ্ধ এক কিশোরীর লাশ – 
ক্ষতযোনী, বিস্রস্ত বসনা – 'সভ্যতার উলঙ্গ প্রতিমা', 
ওই নাচে তান্ডব নর্তনে কাপালিক – ভ্রাতৃরক্ত-লাঞ্ছিত ললাট। 
বার্ধক্য শৈশব দিশাহারা, পল গোনে সর্বনাশা কালবৈশাখীর। 

তবু পূর্ণ চাঁদ, বয়ে আনে বিস্মৃত সে স্মৃতি ; 
সেই পুন্যক্ষণ – মৃত মায়াদেবী কোলে তথাগত , 
সমাগত মূর্তি রূপে বিমূর্ত চেতনা। 
 দেখা দাও হে 'অতীত', উদ্ভাসিত হও 'বর্তমান'। 

জরা, ব্যাধি, মৃত্যু-ঘেরা জীবনের ক্ষণিক সাধনা শুধু প্রেম। 
জ্বালাও সে প্রেমের প্রদীপ, সুচেতনা, 
আগত ও অনাগত কাল সন্ধিক্ষণে, আরো একবার। 
চিনে নিতে দাও আপনারে মানুষী গৌরবে। 
প্রসন্ন দৃষ্টিতে দেখে নি চেতনার মানবী স্বরূপ। 
বৈশাখী পূর্ণিমা আর নূতন বছর হয়ে যাক্ একাকার – 
শ্মশান-দুর্গন্ধে নয় – সৃষ্টির সৌরভে। 

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়
নববর্ষ, ১৪১৯য়ের প্রাক্ সন্ধ্যা। 
_____________________________________________







মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ

প্রশ্ন সংক্রান্তির 

হারাইনি বিশ্বাস – 
প্রাণপণে বুকে ধরে রেখেছি এখনও ; 
কিন্তু দিনে দিনে ক্ষয়ে ক্ষয়ে, 
কৃষ্ণ পক্ষের চাঁদ অস্ত যায় পশ্চিম আকাশে। 
ভোর হয়, কিশোরীর রক্তস্রাব আলোর গুণ্ঠনে, 
সেবাঙ্গনে শিশুর বিকৃত দেহ – 
আবর্জনা স্তুপে ফেলা প্লাস্টিক পুতুল। 
সৈনিককের নাম নিয়ে লক্ষ্যহীন লক্ষ লক্ষ প্রাণ 
ঝরে পড়ে অকারণ ; লজ্জা পায় শ্বাপদ শকুন। 
সুভদ্রারা, শরম সঙ্কোচহারা দেখে হোথা ওই 
অভিমন্যু শব –অন্তঃসত্বা, শূণ্যদৃষ্টি উত্তরার কোলে। 

বিশ্বাসের আলিঙ্গনে বিষাক্ত চুম্বন ? 
সখার নির্ভয় হাতে কসাইয়ের ছুরি ? 
সপ্রেম ফুলের হারে সন্দেহের কীট ? 
পঙ্গু এ বিশ্বাস নিয়ে আর কতকাল, ওগো কবি, 
বলে দাও, অন্তহীন প্রতীক্ষায় রইবে শবরী ? 

পুনঃপ্রকাশিত 
১৮/১১/২০২৪
____________________________________








রবিবার, ১০ এপ্রিল, ২০২২

চৈতালি

চৈত্র ফুরায় নি কিন্তু বসন্ত বিদায় নিয়েছে। চৈত্র বাতাস  যেন বিরহের দীর্ঘশ্বাস । হাল্কা চলনে, সমিল পয়ারে এই কবিতাটি লিখে পাঠালাম।
________________________

প্রিয়তমা চৈতালি, 
পূর্ণ প্রেমের ডালি 
সমুখে আমার এনেছিল শেষ ফাগুনে। 

সাধ্য ছিল না নেবার, 
অথবা কিছুও দেবার– 
পুড়ছে জীবন মনস্তাপের আগুনে। 

আজ ভরা আছে বিত্ত, 
  আরো কিছু উদ্বৃত্ত, 
ভালো লাগবার ভালো ভালো বহু খেলনা। 

বইছি জীবন সহজেই 
সুখে থাকবার গরজেই 
বিবেক আবেগ বিবাগি বাতাসে ভাসিয়ে – 

এদিক ওদিক দেখিনা, 
কারো কথা গায়ে  মাখিনা, 
তবুও কে যেন তাড়না করছে শাসিয়ে। 

সকল পাওয়ার দেশে 
বেস তো রয়েছি ভেসে 
তাও কেন মন হয় উচাটন সহসা ? 

এখনও দখিনা বাতাসে, 
পাখি গায়, ফুল হাসে, 
দেখি বটে, তবে হাসতে হয় না ভরসা। 

যেদিন জীবনের মধুমাসে 
প্রেমের প্লাবন আসে, 
ভাসা বা ভাসানো হলো নাকো সেই দিন – 

লগ্ন গিয়েছে বয়ে 
বিদায়ের বাণী কয়ে' 
বড় বেদনার নিয়ে স্মৃতিভার বসে আছি উদাসীন।। 

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় 
১০/৪/২০২২ 
কলকাতা। 






বৃহস্পতিবার, ৭ এপ্রিল, ২০২২

বসন্ত বিলাপ

'চৈতালি' কাব্যে 'মানসী' কবিতায় বিশ্বকবি লিখছেন, 
"শুধু বিধাতার সৃষ্টি নহ তুমি নারী !" এই "নারী" অনাদি কালের কবি, শিল্পী, ভাস্কর – সকল স্রষ্টার সৃষ্টির জীবন্ত 
প্রেরণা। জীবনের দিনান্তবেলায় সে 'মানসীর' বিরহবেদনা যেন চৈত্রশেষের বিধুরতা। 

আজকের কবিতাটি  'আধুনিক' কবিতার অভিধান মানেনি সত্য কিন্তু সৃষ্টির 'সত্যটিকে' অস্বীকার করেনি। 
_____________________________________________

বসন্ত বিলাপ 

সেদিন‌ চৈত্রমাসে
বসন্ত শেষের উষ্ণতামাখা বনের দীর্ঘশ্বাসে 
মিশে গিয়েছিল বিরহী মনের স্বরলিপি বেদনার। 

সে গানের সুর হয়ে গেল হারা, 
আঁধারে যেমন ঝরে পড়ে তারা – 
উপলখণ্ডে জীবনের ধারা ক্ষতলাঞ্ছনা সার। 

নিশিডাক শুনে নিয়ত চলেছি, 
মণি ভেবে কত নুড়ি কুড়িয়েছি, 
অসার এসব সঞ্চিত ধন– নিঠুর নিয়তি হাসে। 

চাওয়া-পাওয়াগুলি মিলাই যখন, 
সব শেষে হাসে শূণ্য তখন – 
পূর্ণ চাঁদের মুখের মতন একটি আনন ভাসে। 

এতদিন আমি যে গান গেয়েছি, 
অনুরাগ ফুলে যে মালা গেঁথেছি, 
সব ভালো দিয়ে যে প্রেমপ্রতিমা মনোমন্দিরে গড়া – 

আর তার দেখা পাব কি জীবনে ? 
বাণী তার আমি শুনব কি গানে ? 
বাসন্তী বসনে, দাঁড়াও সমুখে রূপসী কলস্বরা।।

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় 
০৭/৪/২০২২ 
কলকাতা।







মঙ্গলবার, ৫ এপ্রিল, ২০২২

আত্মক্ষয় কি দৈববিধান ?

সংসারের অসীম ভূমিতে 
সুখ দুঃখ আনন্দ বেদনা নিরন্তর। 
সকালে দিঘীর জলে পদ্ম ওঠে ফুটে – 
কমলিনী, তরুণ অরুণ সোহাগিনী। 
পাশে তারই চাঁদের প্রেয়সী কুমুদিনী, 
দেখ দশা– ম্রিয়মাণ, পড়ে আছে লুটে, 
জলে আধডোবা – এ বিধান বিশ্বপ্রকৃতির। 
এ তো কাব্য – পেলব, মেদুর ; 
অচল পয়সার মূল্য ঢের বেশী এর চেয়ে। 

তবে আজ বাজুক দুন্দুভি, বাঁধ তার অগ্নিবীণার। 
চল কবি, হিংসার আগুণ জ্বলে ওই, নরমেধ মহাযজ্ঞ। 
পুড়ে রাজ্য, পুড়ে রাজা, ধনী ও ভিখারী, 
শিশুসব – আফোটা কুঁড়িটির মতো গর্ভে বিলীন
এখনও যে, কিম্বা সদ্যোজাত – সামান্য সমিধ্। 
পুরোহিত যন্ত্র পড়ে, – "সৃষ্টি লয় অনিবার্য, 
নিরাশীঃ নির্মমঃ ভূত্বা যুধ্যস্ব বিগতজ্বরঃ – 
কিসের সন্তাপ ? 'সাইরেন' শঙ্খরবে 
ব্রহ্মাস্ত্র আসুক নেমে, কালান্তক মারণ-বিলাস 
যুগান্ত কালের ধর্ম -- হে কোন্তেয়, তুমি ধর্মপাল।" 

"বৃথা চেয়ে থাকো গো মা", উত্তরা জননী, 
শোন নাকি দেব বাণী, তোমার সৃষ্টির মায়া 
জানবে কি তারা, যারা "একান্ত আত্মার দৃষ্টিহারা",
 পিশাচের শাস্ত্র পড়ে' তারা, "আত্মধ্বংসে নাই আত্মগ্লানি"।। 

_____________________________________________

রচনাটিতে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা থেকে একটি অসম্পূর্ণ শ্লোক(যার অর্থ ও ব্যঞ্জনা অত্যন্ত গভীর) এবং বিশ্বকবির সত্যদৃষ্টিসমুদ্ভাসিত কিছু আখর গ্রহন করা হয়েছে। 

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় 
০৫/০৪/২০২২ 
কলকাতা। 
______________________________________________








রবিবার, ৩ এপ্রিল, ২০২২

চৈত্রমাসের শেষ‌বেলায়

আশা অবিনশ্বর 

মরা পাতা আর ঝরা পাতা‌ যায় উড়ে, 
বিদায় বেলার করুণ রাগিনী সুরে, 
শেষ চৈত্রের শেষ প্রহরের বাণী, 
জল স্থল আর আকাশ বাতাস 
                     সবে করে কানাকানি। 
 বসন্তকাল, বাসন্তী রঙ, মলয়-অনিল-হারা 
ধরণীর মায়া ছেড়ে দিয়ে গেল যারা, 
কোথা যাবে তারা, কোথা রবে তারা – 
                            হয়ে গেল জানাজানি। 
মরে যায় যারা, ঝরে যায় যারা সন্ধ্যায়, 
রেখে যায় মায়া রাতের রজনীগন্ধায়, 
সে মায়া সুরভি ছড়ায় নিশীথ বাতাসে–  
                            নীরবে প্রেমের আরতি, 
সে প্রেমের আলো নিখিল ভরাবে প্রভাতে 
নবীন ঊষার শঙ্খ রবের ভাষাতে ; 
নববর্ষের নব আশা, নব অনুরাগ – 
                      মৃত্যুঞ্জয়ী নবজীবনের সাথী। 

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়
০৩/০৪/২০২২ 
সোনামুখী, বাঁকুড়া। 
___________________________________________









Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...