This blog contains short stories, poems written by me in Bengali and English and also a few translations in English of some great works of the legendary Rabindranath Tagore.
মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬
অমূল্য
Individuality is a cage
When I'm in me and shut the door
And bar descant and light and air
From the vaster world, in my thoughts
Enters the Inferno. A huge flame of
Murderous envy rages up, burns up
The soul ;
O, my Soul, that was once illuminated.
By the first Light of the first revelation --
First Morning's Sun was bestowed love ;
Love of Light -- Love that congugated
Heaven and earth, the sky and the ocean
That created me and in me gave birth to
That Light, the light of sentience and virtue
Those proclaimed the Oneness with all
That unknowable being and that even now Exists.
My love, live a short while in bliss and in peace.
And sink in the Eternity of the One.
Nowhere you find void between floating Islands.
Dulal Chandra Bandyopadhyay
16/06/2026
Kolkata.
শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬
রানার জন্মদিন
রানার জন্মদিন
এ 'বিস্ময়' মূর্তি ধরে নামে পৃথিবীতে,
অন্তহীন আকাশের আলোর কণিকা--
চেতনার দীপ্ত দীপ আছে যাঁর হাতে
তিনিই গড়েন এই প্রাণের মণিকা --
আপন মাধুর্য পান করেন আপনি।
বিশ্বচৈতন্যের সাথে একাত্ম বিলাস
জীবনের সাধনার মহামন্ত্রধ্বনি ;
যে জেনেছে সে পেয়েছে সত্যের আশ্বাস।
জন্মদিনে জন্মদিনে নবজন্ম আসে,
যেমন ঊষার আলো অনন্ত আকাশে।
---বাবা-মা
২১শে জ্যেষ্ঠ, ১৪৩৩।
শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬
Day of despair
Oh ! My running is now slowing down ;
For yonder I see a lightless world.
A waveless sea of gloom invisible,
And irresistible for me to plunge In.
The worrisome path of life, burdened with
Illusions, my soul finds redemption at last.
Sufferings I love more than the joyous Heaven.
Ask not why, as you know my sweet heart,
For the whole humanity knows for sure
That the God Himself seeks assuagement
When His loving creature man holds out
His hands for a cup of blood nor of His'
But of his brother for the Last Supper.
Dulal Chandra Bandyopadhyay
December 25, 2o24/ May 23, 2026
(Revised)
Kolkata.
শনিবার, ৯ মে, ২০২৬
২৫শে বৈশাখে
২৫শে বৈশাখে
"দেবতার স্তবগীতে দেবেরে মানব করি আনে,
তুলিব দেবতা করি মানুষেরে মোর ছন্দে গানে।
ভগবন্, ত্রিভূবন তোমাদের প্রত্যক্ষে বিরাজে --
কহ মোরে কার নাম অমর বীণার ছন্দে বাজে।
কহ মোরে বীর্য কার ক্ষমারে করে না অতিক্রম,
কাহার চরিত্র ঘেরি সুকঠিন ধর্মের নিয়ম
ধরেছে সুন্দর কান্তি মাণিক্যের অঙ্গদের মতো
মহৈশ্বর্যে আছে নম্র, মহাদৈন্যে কে হয়নি নত,
সম্পদে কে থাকে ভয়ে, বিপদে কে একান্ত নির্ভিক,
কে পেয়েছে সব চেয়ে, কে দিয়েছে তাহার অধিক,
কে লয়েছে নিজ শিরে রাজভালে মুকুটের সম
সবিনয়ে সগৌরবে ধরামাঝে দুঃখ মহত্তম ---
কহ মোরে, সর্বদর্শী হে দেবর্ষি, তাঁর পুন্য নাম।"
নারদ কহিলা ধীরে, "অযোধ্যার রঘুপতি রাম।"
"জানি আমি জানি তাঁরে, শুনেছি তাঁহার কীর্তিকথা -
কহিলা বাল্মীকি, তবু নাহি জানি সমগ্র বারতা,
সকল ঘটনা তাঁর -- ইতিবৃত্ত রচিব কেমনে।
পাছে সত্যভ্রষ্ট হই এই ভয় জাগে মোর মনে।"
নারদ কহিলা হাসি, "সেই সত্য যা রচিবে তুমি,
ঘটে যা তা সব সত্য নহে। কবি তব মনোভূমি
রামের জনমস্থান, অযোধ্যার চেয়ে সত্য জেনো।"
যে কবির সঙ্গে দেবর্ষি নারদের আলাপন হয়েছিল, আর যে বঙ্গকবি সেই আলাপন পুনরুদ্ধার করছেন তাঁর অনুকরণীয় 'ভাষা ও ছন্দে' -- দুই ঋষিকবির কালের ব্যবধান প্রায় তিন চার হাজার বছর। আর যে নরোত্তমের কথকথা রচনা করবার প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়েছিল, সেই পুরুষোত্তম 'রাম' ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন ওই প্রথমোক্ত কবিগুরু বাল্মীকির 'মনোভূমিতে'। দেবর্ষি নারদের কথায়,
"সেই সত্য যা রচিবে তুমি
ঘটে যা তা সব সত্য নহে। কবি, তব মনোভূমি
রামের জনমস্থান অযোধ্যার চেয়ে সত্য জেনো।"
আদি মহাকবি ও সেই মহাকাব্যের নবভাষ্যকার স্মরণে আছেন, সে-মহাকাব্যও শত সহস্র সংস্করণের মধ্যে দিয়ে আজও জীবন্ত হয়ে আছেন, সেই মহাকবির মানসপুরুষ 'রামচন্দ্র' অযোধ্যায় নবরূপে, মানবরূপে নয় দেবতারূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। যোদ্ধৃবেশে তাঁকে দেখানো হয়নি, শাসক রূপেও তাঁকে দেখানো হয়নি, হিন্দুদের ঘরে ঘরে পূজিত লক্ষ্মী-নারায়ণ, শিব-পার্বতী, রাধা-কৃষ্ণ প্রভৃতি নিত্য পূজার্হ দেবদেবীরদের মতোও তাঁকে প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। পৌরাণিক কিংবদন্তি অনুসারে রামায়ণ রচিত হয়েছিল ১৫০০ থেকে ২০০০ খ্রিষ্টপুর্বাব্দে। লোকায়তিক ধারণায় কল্পনা করাই যায় যে রাম রাবণের কাহিনী মহাকবি বাল্মীকি দ্বারা সুষম সঙ্কলনের বহুকাল পূর্ব থেকেই জনপদে জনপদে, জনসমাজে, ঘরে ঘরে, মুখে মুখে কথিত ও আলোচিত হয়ে আসছিল। ঐতিহাসিকতার মাপকাঠিতে রামচন্দ্রের জন্ম কোথায় হয়েছিল, কখন হয়েছিল তার বাস্তবতা বিচার্য হতেই পারে না। তাঁর জন্ম, অযোধ্যার রাজপুরীর, রাজপরিবারের জন্ম এবং সঙ্গে সঙ্গে লঙ্কার রক্ষোরাজ রাবণ ও তাঁর একলক্ষ পুত্র আর সোয়া লক্ষ নাতির মহাপরিবারের অস্তিত্ব, ধর্ম-কর্ম-জীবনাচরণ -- সকলই ওই যুগ যুগ ধরে চলে আসা কাহিনীরই নবনির্মান। নবনির্মান এক অতিমানবীয় সৃজনপ্রতিভার চমৎকার। "কবি, তব মনোভূমি অযোধ্যার চেয়ে সত্য জেনো।" তবে কি রাজা, রাজপরিবার, রাজপুত্র- রাজকন্যা, সৈন্যসামন্ত, জনপদ ও জনপদগুলির নাম, বর্ণবিভাজিত জনসমাজ ছিল না ? ছিল বৈ কি ! এবং ছিল বলেই সেই সকল নাম, ধাম ও গণদেবতাদের নিয়েই মহাকাব্যের এক বিরাট বিপুল পশ্চাৎপদ রচনার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল। রাম নামক অযোধ্যার এক রাজপুত্রের, মিথিলার রাজা জনকের এক রাজকন্যার বিবাহও হয়েছিল। বিদেশী কোন রাজা, নাম তার রাবণ, রামচন্দ্রের স্ত্রী সীতাকে অপহরণ করেছিলেন, যুদ্ধও হয়েছিল। এবং সেই অতীতের স্মরণের, বিস্মরণের, বাস্তবের, অবাস্তবের সমস্ত ঘটনাগুলিকে কবিকল্পনার নবরসে পরিসিক্ত করে গড়ে উঠেছে রামায়ণ। ঠিক যেমন শত দিক থেকে শত জলধারা বহে আসে, বহন করে নিয়ে আসে নদীতীরের ভগ্ন দেউল, রাজকীয় কীর্তির ধ্বংসস্তূপের রাশি ; নিয়ে আসে অনাদিকালের অসংখ্য চিতার ভস্মরাশি, অর্ধদগ্ধ কাষ্ঠখণ্ডের সঙ্গে অনতিদগ্ধ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, অস্থি-চর্ম --- সঞ্চিত হয় সরোবরের পঙ্কস্তরে। দীর্ঘ সঞ্চিত সেই পঙ্ককুণ্ড হতে জন্ম নেয় পঙ্কজ শতদল। বিশ্বে এমন সংখ্যাতীত মহান কাব্য, মহাকাব্য, পুরাণ, পাঁচালী -- সকল সাহিত্য- সৃষ্টিই এইরূপ অতীত-সরসীর পঙ্কজাত চির অম্লান সুরভিত শতদল।
বাল্মীকি রামায়ণের রাম দোষে গুণে পূর্ণ মানুষ, নরোত্তম, রাজর্ষি, কিন্তু আরাধ্য দেবতা নন। তিনি 'অবতার', দৈব ঐশ্বর্য তাঁর ছিল কিন্তু যখন মানবরূপে অবতীর্ণ হয়েছেন তখন মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকেই তাঁর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা। শ্রদ্ধা পুরুষোত্তম শ্রীরামের প্রতি। শ্রীরামচন্দ্রের ত্যাগ, তিতিক্ষা, সত্যের সাধনা, প্রজাহিতৈষণা --- এমন সকল মানবতার পরাকাষ্ঠাস্বরূপ গুণাবলী যেমন ছিল, তেমনি বানররাজ বালি হত্যা, সীতাদেবীর প্রতি বার বার নির্মমতা প্রদর্শন, নিষ্কারণে নিষ্ঠুরভাবে শূদ্র তপস্বী শম্বুকের শিরশ্ছেদ ইত্যাদি কর্মগুলি করুণাময় নরচন্দ্রমা রামচরিত্রে কলঙ্কের চিহ্ন অঙ্কন করেছে। রামায়ণ মহাকাব্যের রামকে, সময়কালের বর্ণবিভাজিত সমাজের, একটি রাজ্যের সুমহান একটি রাজচরিত্রকে তিন, মতান্তরে পাঁচ হাজার বছর পরে একটি আধুনিক রাষ্ট্রের আদর্শরূপে যদি প্রতিষ্ঠা করবার প্রয়াস হয় তবে সেখানে যুক্তি হার মানে, অন্ধ ভক্তি জয়লাভ করে। রামচন্দ্রের রামরাজ্যে রাজধর্ম ছিল 'এক আদর্শ রাজার করণীয় কর্তব্যের বিধান', তখন 'হিন্দু, হিন্দুত্ব বা হিন্দুধর্ম' শব্দগুলির না ছিল কোন অর্থ, না ছিল অস্তিত্ব। অবশ্য মহাকবি তুলুসীদাস, মহাকবি কীর্তিবাস প্রভৃতি ভক্তিবাদের প্রবক্তা ও সাধকদের দ্বারা নবদূর্বাদলশ্যাম রামচন্দ্র দেবতারূপে, বিষ্ণুর অবতাররূপে নয় বরং অনেকখানি স্বয়ং বিষ্ণুর স্থানেই পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, কিন্তু সে তো কবিদের কাব্যরসের তীর্থনীরে অভিষিক্ত হয়ে।
"জগদ্রাম সূত রাম প্রসাদেতে গায়।
সীতারাম খেলা কর আমার হিয়ায়।।" --
এমনিভাবেও রামায়ণ রচয়িতাগণ (কবি জগদ্রাম রায় ও তাঁর পুত্র রামপ্রসাদ রায়) শ্রীরামচন্দ্রের বন্দনাগান গেয়েছেন ; কিন্তু 'জয় শ্রীরাম' ধ্বনির মধ্যে দিয়ে যে রনহুংকার উদ্ঘোষিত হয় সেইটিই তাঁর প্রতি একমাত্র মঙ্গলাচরণের মন্ত্র হলে যোদ্ধৃবেশে রামচন্দ্রকে আমরা হয়তো পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে পারব কিন্তু 'রামরাজ্য' অধরাই থেকে যাবে।
যাই হোক্ রামায়ণের শ্রীরামচন্দ্রের সম্মন্ধে আমাদের ঋষিকবির মূল্যায়নটিকে মাথায় রেখে এই আলোচনা। আদিকবি ভারতের কবি বাল্মীকি ও বঙ্গের 'শতেক যুগের শতেক' কবিদের একাসনে আহ্বান করে, স্মরণ করি, বরণ করি আমাদের প্রাণের ঠাকুর, হৃদয়হরণ কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আজ ২৫শে বৈশাখে।
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২৫শে বৈশাখ, ১৪৩৩।
_____________________________________________
শনিবার, ২৮ মার্চ, ২০২৬
শান্তি--৩
শান্তি-৩
বেদ হতে বেদান্তদর্শন -- শত সহস্র বছরের সাধনায় আহৃত ও লব্ধ জ্ঞান --- তার মধ্যে কোথাও মানুষ (শুধু কি মানুষ ? সমস্ত ভূতজগৎ)-কে বাদ দিয়ে ব্রহ্ম বা পরমাত্মা বা 'মহান পুরুষ'-অস্তিত্ব স্বীকার করা হয় নি। প্রকৃতিকে মায়া বলে বিচ্ছিন্ন করে পুরুষ এবং পুরুষকে অজ্ঞেয় বলে প্রকৃতিকে জগৎ সৃষ্টির কারণরূপে সিদ্ধ করা হয়নি। এমনকি আদি যে নাস্তিক্যবাদী বা নিরীশ্বরবাদী কপিলের সাংখ্যদর্শন, সেখানেও প্রকৃতি ও পুরুষের মহাসংগমের (এই ঘোর জটিল সৃষ্টিতত্ত্বের অবতারণা অন্যত্র করবার বাসনা রইল) স্বীকৃতি আছে যেখানে একদিকে যেমন দৃশ্যমান বিশ্বজগতের উপর, অন্যদিকে অদৃশ্য চৈতন্যজগতের উপর সমান মহিমা অর্পিত হয়েছে। অদৃশ্য যে চৈতন্য এই বিশাল বিপুল অনন্ত সৃষ্টির উৎস এবং সৃষ্টিকে ধারণ করে আছে তার কণিকারূপ মূর্ত মূর্তি মানুষ। মানুষই জ্ঞানের সাধনার পথ ধরে ব্রহ্ম হয়ে উঠতে পারে, বলতে পারে 'অহম্ ব্রহ্মাস্মি', বলতে পারে 'অয়ম আত্মা ব্রহ্ম', বলতে পারে 'প্রজ্ঞানম্ ব্রহ্ম' এবং 'তৎ তম্ অসি'।
"এই ত্রাণকারী আত্মজ্ঞান প্রাচীন ভারতীয় ঋষিদের পবিত্র ও সংযত হৃদয়ে প্রতিভাত হয়েছিল। তাঁরা মানবের প্রতি ভালোবাসা ও করুণাপরবশ হয়ে জ্ঞানের অধিকার, সম্ভাবনা ও শক্তির ঐতিহ্যের মতো, জ্ঞান-গঙ্গার নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহের মতো -- বংশপরম্পরায় রক্ষা করার ব্যবস্থা করে গিয়েছেন।"
----- স্বামী রঙ্গনাথানন্দ মহারাজ।
উপনিষদের বাণীগুলি মানব প্রাণের শান্তির, শক্তির, নির্ভয়তার চিরন্তন প্রেরণা। নিয়ত মৃত্যুভয়, রোগ-শোক-জরা ও একাকিত্বের ভয় থেকে মুক্তি দিয়ে মানুষকে প্রকৃত সত্যের অন্বেষণে নিরত করে।" এই কারণেই ভারতীয় সনাতন (বৈদান্তিক) ধর্মকে চিরন্তন দর্শন বা Aldous Huxley-র ভাষায় 'দর্শনের অনন্ত প্রবাহ' বলা হয়। ঈশা উপনিষদের সুন্দর শান্তিপাঠেই আমরা আশ্বাস পাই যে, মানবের অনুসন্ধান ব্যর্থ যাবে না ; ঋষিগণ শুদ্ধ দৃষ্টিতে যা উপলব্ধি করেছিলেন, আমাদের দৃষ্টি শুদ্ধ হলে আমরাও তা (পরম অবিনাশী সত্যকে) উপলব্ধি করতে পারব।"
--- তদেব।
কি সেই সত্য, যা মানবজগৎ যুগ যুগান্তর ধরে অনুসন্ধান করে চলেছে ? মিথ্যা মায়ার ছায়া ঘুচিয়ে একটি 'সত্যের আশ্রয়' যা তাকে ভয় থেকে --- বিনাশের ভয় থেকে মুক্ত করে 'চিরন্তন জীবনের' (বংশপরম্পরায় বহমান প্রাণকে না হারানোর) ভরসার আশীর্বাদ বহন করে আনবে। এমন এক সত্যের উপলব্ধি এসেছে, বৈদান্তিক জ্ঞানের ভিতর দিয়ে। কঠোপনিষদের একটি মহামন্ত্রেই আমরা সেই সত্যের আলোকিত জগতে পোঁছাতে পারি, --
"নিত্যোহনিত্যানাং চেতনশ্চেতনানাম্
একো বহুনাং যো বিদধাতি কামান।
তমাত্মস্থং যেহনুপশ্যন্তি ধীরাঃ
তেষাং শান্তিঃ শাশ্বতী নেতরেষাম্।।"
এই মন্ত্রটি বার বার, একাগ্রতাসহকারে পাঠ করলে এক প্রদীপ্ত সত্যের আলোকে, শান্তির সান্ত্বনায় আমাদের অন্তর প্রসন্নতায়, জ্যোৎস্নাময়ী শারদাকাশের মত, অপরিম্লান পূর্ণতায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। মন্ত্রটি বলছেন,
সকল অনিত্য বস্তুর মধ্যে 'তিনি'ই নিত্য। সচেতন প্রাণের তিনি চৈতন্যস্বরূপ। তিনি 'এক', তবু বহু সকাম জীবের মধ্যে বাস করেন, জীবের কামনার ও কর্মের ফল প্রদান করেন। যেসব 'ধীঃ'যুক্ত জীব (প্রজ্ঞাবান মানুষ) নিজ আত্মায় তাঁর অস্তিত্ব উপলব্ধি করেন, তাঁরাই শাশ্বত শান্তি লাভ করেন -- আর কেউ নয়।
লক্ষ্যণীয় এখানে 'নিজ আত্মায়', সেই 'নিত্য' এবং 'চৈতন্যস্বরূপ' --- এই মহাসৃষ্টির চৈতন্যসত্ত্বাকে অনুভব করতে পারলেই শাশ্বত শান্তির, ভ্রান্তিহীন সত্যের আশ্রয় লাভ করা সম্ভব হবে। তখন মৃত্যুর মধ্যে মৃত্যুহীনকে, বিকৃতির মধ্যে অবিকারীকে, বহুর মধ্যে 'এক'কে আত্মস্থ করতে পারলেই ভয় থাকবে না। 'বহুর মধ্যে এক', একই চৈতন্যের প্রকাশ ওই দূরাতিদূর আলোকপথের সীমান্তহারা প্রান্তসীমায় জ্যোতিষ্ক-মণ্ডলের একটি নক্ষত্রের মধ্যে দিয়ে যেমন প্রতিভাসিত, ব্রহ্মাণ্ডের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ধূলিকণাসদৃশ এই পৃথিবীর প্রাণকণিকা--- আমার মধ্যেও তাইই প্রকাশিত-- এই বোধ অর্জিত হয় যে সাধনার দ্বারা তা প্রেম, বিশ্বজয়ী প্রেম যা শুধু জীবের, বিশেষ করে পূর্ণচৈতন্যের অধিকারী মানুষের অন্তরে বিরাজ করে। এই প্রেমে দৃষ্টি দিয়ে সে যখন জগৎসংসারকে দেখে তখন কোথাও তার শত্রু নেই, নেই তার বিনাশের ভয়।
"চেতনার অনন্ত বিস্তারের ফলেই এরূপ ভয়হীনতা আসে। যখন সৎরূপের (সৃষ্টির উৎস পরম সত্ত্বা) সঙ্গে আমাদের একত্ববোধ হবে, একমাত্র তখনই মৃত্যুর অস্তিত্ব বিলুপ্ত হবে। যখন জ্ঞানস্বরূপের (প্রজ্ঞা-ব্রহ্মের) সঙ্গে আমাদের একত্ববোধ হবে, একমাত্র তখনই অজ্ঞানের অস্তিত্ব লোপ পাবে। যখন আনন্দস্বরূপের ("আনন্দাদ্ধ্যেব খল্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে..") সঙ্গে আমাদের একত্ববোধ হবে, তখনই দুঃখের অস্তিত্ব লোপ পাবে। বেদান্ত মতে মানবাত্মা অনন্ত অস্তিত্বস্বরূপ, অনন্ত জ্ঞানস্বরূপ এবং অনন্ত আনন্দস্বরূপ।"
---- স্বামী রঙ্গনাথানন্দ মহারাজ।
মানবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার, অর্থাৎ মহাসৃষ্টির আকারবিশিষ্ট ভৌতিক অস্তিত্বের বিপরীত রূপহীন বিমূর্ত চৈতন্যময় সত্ত্বার একাত্মতা অনুভব করবার যে জ্ঞানমার্গীয় ধর্মধারণা তাই সমস্ত ধর্মমতের, (একেশ্বরবাদী আব্রাহামিক, বহুদেবতাবাদী প্যাগানিজম ও বেদবাদী আর্যধর্মাবলম্বীদের) মূল আদর্শ। তবুও এই মূল ধর্মাদর্শ থেকে, শুধুমাত্র ধর্মীয় স্মৃতিশাস্ত্রের ভিন্নতার জন্য পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী আত্মহননে লিপ্ত হয়, কেন 'বিশ্বনিয়ন্তার' শুভ ও মঙ্গলময় ইচ্ছার বিরুদ্ধাচরণ করে' পরোক্ষে বিশ্বধংসের তান্ডবে, আপন আত্মার ঐশ্বর্য বিস্মৃত হয়ে, মানুষ তার পশুপ্রবৃত্তিগুলিকেই জাগিয়ে প্রথিবীটাকে নরকে পরিণত করেই চলেছে বার বার ? এর কারণ অসংখ্য ; কিন্তু মূল কারণ ঐ 'পশুপ্রবৃত্তি' ! সম্রাটের সাম্রাজ্য বিস্তারের উদগ্র আকাঙ্ক্ষা থেকে 'বাবু কর্তৃক উপেনের দুইবিঘা জমি দখল' ; গ্রাম্য পরিবারের ক্ষুদ্র সম্পত্তির লালসাসম্ভূত ভ্রাতৃহনন থেকে বিশ্বযুদ্ধের গণহত্যা এবং নিত্যদিনের যত খুন, লুণ্ঠন, শোষণ, পেষণ, বলাৎকার, ধর্ষণ --- সবই ওই পশুপ্রবৃত্তিসঞ্জাত। আরও ভয়ঙ্কর ও পৈশাচিক হয়ে ওঠে যখন এই নরকসৃষ্টির প্রয়াসগুলিকে ধর্মীয় সংস্কারের 'কর্তব্য'রূপে গণ্য করা হয়। বর্ণাশ্রমী 'ব্রাহ্মণদের' অমানবিক কুসংস্কার স্বীকার করে রামচন্দ্রের শম্বুক (শূদ্র তপস্বী) হত্যার মতই বর্তমানের দলিতনিধন -- একই রকমের 'ধর্মে'র বিকৃত ব্যভিচার। শ্রীমদ্ভগবদগীতায় ধর্মাবতারের মূর্ত প্রতীক শ্রীকৃষ্ণ নিজেই অর্জুনকে যুদ্ধে প্রবৃত্ত করেছিলেন এই বলে যে যুদ্ধ ক্ষত্রিয়ের 'ধর্ম'-- এষঃ ধর্মঃ সনাতন। আবার মহাভারতের স্ত্রীপর্বে, শান্তিপর্বে কুরুক্ষেত্রের মহাশ্মশানে স্বামী-সন্তান-হারা নারীদের হাহাকারের মাঝে তিনি ছিলেন কখনো নীরব, কখনো'বা নিরুত্তর। বিশ্বজনীন মানব সভ্যতায়, সামাজিক উপপ্লব, সে যত বড় বা ছোটই হোক্ -- তা সে রাবণের সীতা অপহরণ, দ্রৌপদীর লাঞ্ছনা বা ট্রয়ের যুবরাজ প্যারিস কর্তৃক স্পার্টার রাণী হেলেনকে অপহরণ থেকে আরম্ভ করে মানব সভ্যতার মহাকাব্যের ইতিহাস জুড়ে এমন লক্ষকোটি অপরাধের কলঙ্কিত অধ্যায় পার হয়ে আজ যখন কোন নিভৃত গৃহাভ্যন্তরে, কোন সেবা-শুশ্রূষাদায়িনী, প্রাণধাত্রী অবলা অসহায় নারী ধর্ষণ ও নৃশংস নিধনের শিকার হন তখন মানুষ নামক জাতিটির পশুপ্রবৃত্তির উপর আর কোন সন্দেহ থাকে না। বন্য সর্পশ্বাপদদের যা প্রাকৃতিক ও স্বভাবজ প্রবৃত্তি, মানুষের মধ্যে তার প্রকাশ যদি ঘটে, এই ধরিত্রীর মানবসমাজে কোনদিনও, কোথাও ধ্বনিত হবে না শান্তির 'মহাওঙ্কারধ্বনি'।
কিন্তু চেতনাহীন পাশবিকতার পাশাপাশি চৈতন্যময় মহামানবতার --- নৃশংসতার বিরুদ্ধে প্রেমের, হিংস্রতার পরিবর্তে অহিংসার, নিপীড়নের বিপরীতে সেবার সাধনা কি হয়নি, হয়না ? হয়, হয়ে আসছে এবং হবেও। মনুষত্বের সাধনায় আত্মোৎসর্গীকৃত মহামানবগণ ---সুদূর প্রাচীনকাল থেকে, পৃথিবীর কোণায় কোণায় ছড়িয়ে-থাকা বিভিন্ন, বৈচিত্র্যময় জাতির মধ্যে জন্ম গ্রহণ করেছেন। শুধু ভারতবর্ষের মানবতীর্থেই যে যুগে যুগে অসংখ্য ঋষি, মুনি, মণীষী, মহাকবিগণ --- বাল্মীকি, ব্যাসদেব, বুদ্ধ, জৈনমুনি, মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য, শ্রীরামকৃষ্ণ প্রভৃতি দেবতা নয় --- মানব চেতনার বিগ্রহদের আবির্ভাব ঘটেছিল এমনও নয় --- গ্রীস থেকে চীন, রোম থেকে শ্যামদেশ ---- জরাথুষ্ট্র, মুশা, ইশা, মুহম্মদ, কনফুসিয়াস -- তাঁরাও এই ধরিত্রীর বুকেই বিচরণ করে গিয়েছেন ; "তাঁরা বলে গেল ক্ষমা কর সবে, বলে গেল ভালবাসো, / অন্তর হতে বিদ্বেষবিষ নাশো" ; কিন্তু তাঁদের বাণীর দোহাই দিয়েই বিদ্বেষের নরমেধযজ্ঞের অগ্নিশিখা লক্ লক্ জ্বলে উঠেছে দেশে দেশে, কালে বিরামহীন নিরবচ্ছিন্নতায়।
"তোমার বাণীর আড়াল টানি তোমায় ঢাকি ..."।
পরিশেষে এ-কথাই বলার যে যতদিন না মানুষ -- ক্ষমতাবান এবং ক্ষমতালোভী মানুষ -- তার দুঃখের সাধনার মধ্য দিয়ে আত্মোপলব্ধির ঐশ্বর্যে আপনার অন্তরের ঈশ্বরকে লাভ করবে ততদিন আত্মা-আত্মীয়-আত্মহননের নরকবাস থেকে তার মুক্তি নেই, ততদিন শান্তির ঠাঁই থাকুক শ্মশানে আর শান্তির মন্ত্র ধ্বনিত হোক্ মানবতার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার শ্রাদ্ধবাসরে।
"বায়ুরনিলমমৃতম্ অথেদং ভস্মান্তং শরীরম্।
ওঁ ক্রতো স্মর কৃতং স্মর ক্রতো স্মর কৃতং স্মর।"
(ঈশা উপনিষদ, মন্ত্র ১৭)
অন্তিম মুহূর্ত, আমার জীবনের শক্তিতরঙ্গ (ধীরে ধীরে) অমৃত সাগরে বিলীন হতে চলেছে (ঐ বিশ্বপ্রাণের সঙ্গে আমার প্রাণবায়ু মিলিত হবে!) !
ওঁ! এখনিই এই নশ্বর দেহ ভস্মে পরিণত হবে !
ওঁ ! তাই হোক্, এই শরীর ভস্মীভূতই হয়ে যাক্ তবে !
"অথ ইদং শরীরং ভস্মান্তং ভূয়াৎ। ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।।
হে আমার চিত্ত, (আসন্ন মৃত্যুর এই মহালগ্নে) স্মরণ কর ; তোমার সৎকর্মগুলি স্মরণ কর ; তোমার অসৎ কর্মগুলিও স্মরণ কর !
"ধর্ম, ঈশ্বর বা পরকালের ধারণা কোথা থেকে এল ? মানুষ ঈশ্বর ঈশ্বর করে বেড়ায় কেন ?
.................................................................
............. ......... ......................... ............. এখানে সেখানে, মন্দিরে গির্জায়, স্বর্গে মর্তে, নানা স্থানে এবং নানা উপায়ে অন্বেষণ করবার পর অবশেষে আমরা যেখান থেকে আরম্ভ করেছিলাম অর্থাৎ আমাদের আত্মাতেই বৃত্তপথে ঘুরে আসি এবং দেখতে পাই--- যার জন্য সমগ্র জগতে অন্বেষণ করেছিলাম, যার জন্য আমরা মন্দির, গির্জা প্রভৃতিতে কাতর হয়ে প্রার্থনা এবং অশ্রুবিসর্জন করেছিলাম, যাঁকে আমরা সুদূর আকাশে মেঘরাশি দিয়ে ঢাকা --- অব্যক্ত রহস্যময় বলে মনে করেছিলাম, তিনি আমাদের নিকট থেকেও নিকটতর, প্রাণের প্রাণ; তিনিই আমার দেহ, তিনিই আমার আত্মা। তুমিই আমি--- আমিই তুমি। এই তোমার স্বরূপ --- একে প্রকাশ কর। তোমাকে পবিত্র হতে হবে না ---- তুমি পবিত্রস্বরূপই আছ। তোমাকে পূর্ণ হতে হবে না, তুমি পূর্ণস্বরূপই আছ। প্রকৃতিই পর্দার ন্যায় আড়ালে সত্যকে ঢেকে রেখেছে। তুমি যে কোন সৎ-চিন্তা, সৎ-কার্য কর, তা জেনো, শুধু সেই তমসার আবরণকে ধীরে ধীরে ছিন্ন করছে, আর সেই প্রকৃতির আড়ালে শুদ্ধস্বরূপ অনন্ত ঈশ্বর প্রকাশিত হচ্ছেন।"
অনাদিকালের ঈশ্বর-অন্বেষণের যে সাধনা তার মূল, লক্ষ্য ও পথ, ঋদ্ধি ও সিদ্ধি এবং অন্তিম অনুভব এই কথাগুলির মধ্যে দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে ; প্রকাশ করেছেন স্বামী বিবেকানন্দ যিনি সর্বধর্মের মূলিভূত একত্বের, মানবতাবাদের জীবন্ত বিগ্রহ শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের ভাববসন্তান -- ঠিক তেমনি যেমন ছিলেন ব্যাসদেবের পুত্র শুকদেব। আত্মজিজ্ঞাসা, আত্মজ্ঞান, আত্মোপলব্ধি এবং সকলের ভিতর আত্মদর্শন --- এই সাধনার ধর্মক্ষেত্রেই জ্যোতির্ময় মূর্তি ধারণ করে দন্ডায়মান আছেন মানুষের ঈশ্বর --আত্মবিস্মৃত আত্মহননের কুরুক্ষেত্রে নয়।
" .... নক্ষত্রের অক্ষৌহিণী হতে
অরণ্যের পতঙ্গ অবধি, মিলাইছে এক স্রোতে
সঙ্গীতের তরঙ্গিণী বৈকুণ্ঠের শান্তিসিন্ধুপারে।"
'ভাষা ও ছন্দ', -- রবীন্দ্রনাথ।
বিশ্বের সকল দেশে, সকল সমাজে, সকল ঘরে, প্রতিটি মানুষের অন্তরে 'শান্তি' বিরাজ করুক।
(সমাপ্ত)
শ্রী দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২৫/০৩/২০২৬
কলকাতা।
____________________________________
বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২৬
শান্তি-২
শান্তি -২
"উদ্ভ্রান্ত সেই আদিম যুগে
স্রষ্টা যখন নিজের প্রতি অসন্তোষে
নূতন সৃষ্টিকে বার বার করছিলেন বিধ্বস্ত..."
ঋগ্বেদের রচনাকাল স্মরণে রাখলে স্বীকার করে নিতেই হবে যে সেই সুদূর অতীতের বাধাবন্ধনহীন প্রকৃতির দৌরাত্ম্যের দিনরাত্রিগুলিতে মানুষের বাঁচার উপায় কি ছিল ঘন ঘন রুষ্ট হওয়া জল, স্থল, আকাশকে তুষ্ট করা ছাড়া ? নিরন্ধ্র অন্ধকারে আচ্ছন্ন, হিংস্র শ্বাপদসঙ্কুল অরণ্যানী, সেখানে কখনো প্রলয়ঙ্করী ঝঞ্ঝা, কখনো সর্বদাহী সর্বগ্রাসী দাবানল ! উর্ধাকাশে ঘোর ঘনঘটা, বিরামবিহীন ধারাবর্ষণ, মহাপ্লাবন, অগ্নুৎপাত, ভূকম্পন, তুষারপাত ! জীবনে, জগতে মৃত্যুভীষণা নিশীথিনীর অন্ধকারে একমাত্র আশা রাত্রিশেষের ঊষা আর 'প্রথম দিনের সূর্য'। এবার ঋগ্বেদের উপাস্যদের নাম নিলেই এই সত্য উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে যে আধিদৈবিক 'শক্তি' সমূহ তখন দেবতা হয়ে উঠেছিলেন। অগ্নি, বরুণ, বিষ্ণু, রুদ্র, সাবিত্রী (সূর্য), বায়ু, ঊষা, পৃথিবী, সরস্বতী (বাগ্দেবী), অশ্বিনীকুমারদ্বয় (চিকিৎসার দেবতা)। ঋগ্বেদের মন্ত্র রচয়িতাগণ (মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি) জগতকে ত্রিস্থানিক বিভাজন করে সেই সেই স্থানের অধিকারী দেবতাদের উপাসনা করবার জন্য ঋকগুলি উচ্চারণ করতেন। 'ভূলোক' অর্থাৎ পৃথিবী স্থানের অধিকারী দেবতা অগ্নি, ধরিত্রী, সোম। ভূবর্লোক বা অন্তরীক্ষ (আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যস্থিত স্থান) এবং স্বলোক বা দ্যুলোকের অধিকারী দেবতা বিষ্ণু, রুদ্র মিত্র প্রভৃতি। এইভাবে ঋগ্বেদে মোট ৩৩ প্রকারের দেবতার উল্লেখ আছে।
এই সমস্ত দেবতাদের উদ্দেশে প্রার্থনা, বিভিন্ন প্রকার যজ্ঞের আয়োজন ও অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁদের আবাহন, ঘৃতাহুতি সহ সুভক্ষ্য পশু ও সুরা (সোমরস) উৎসর্গ করা হোত নিত্য নিয়মিত যজ্ঞানুষ্ঠানে। যজ্ঞের প্রকারভেদ ছিল। অগ্নিহোত্র (প্রতিদিনের যজ্ঞানুষ্ঠান) থেকে রাজা মহারাজাদের, স্বরাট-সম্রাটদের রাজসূয়, অশ্বমেধ প্রভৃতি বৎসরব্যাপী --এমনকি দ্বাদশ বৎসরব্যাপী যজ্ঞের আয়োজনও করা হোত। উদ্দেশ্য পূর্বোক্ত দেবতাদের সন্তুষ্ট করে পার্থিব চতুবর্গ (ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ) লাভ করা। যজুর্বেদসংহিতাসহ ব্রাহ্মণসংহিতা, স্মৃতিশাস্ত্র প্রভৃতি শত শত গ্রন্থরাজী রচিত হয়েছে এ-সকল হোম, যজ্ঞ, যাগ, হবন ইত্যাদি বহুবিধ নামের বৈদিক ধর্মাচরণের ক্রিয়া ও অনুষ্ঠানের উপর। ভারতবর্ষের ব্রাহ্মণ্যবাদী ধর্মীয় সংস্কারে এই প্রকার ক্রিয়াচার হাজার হাজার বছর ধরে চলে এসেছে এবং এখনও সে সব ক্রিয়াকল্প অব্যাহতও আছে। আর বৈদিককালের সেই তেত্রিশজন দেবতা এখন বংশবিস্তার করে তেত্রিশ কোটিতে কোথাও রূপান্তরিত, কোথাও বিবর্তিত হয়ে বিরাজ করছেন। বৈদিক দেবতা ও দেবীগণ (ইন্দ্র, বরুণ, কিংবা ঊষা সরস্বতী), যাঁদের অস্তিত্ব বিমূর্ত ছিল এখন তাঁরাও মূর্তিমন্ত হয়ে আমাদের কাছে পূজা চাইছেন বা পূজিত হচ্ছেন। "মানুষই দেবতা গড়ে / তাহার কৃপার 'পরে / করে দেব মহিমা বিস্তার।"
আলোচনাটিকে বর্তমান যুগের সীমানা পর্যন্ত আনা হোল এইটিই প্রমাণ করবার জন্য যে আমাদের ভারতীয় 'সনাতন' ধর্মধারণা একেশ্বরবাদী নয়। কিন্তু তবুও এই কথাটি বিচার্য যে মূল ভারতীয় ধর্মধারণায় বলা হয়েছে সমস্ত দেবতা এক পরমেশ্বরের ভিন্ন ভিন্ন রূপ বা জগৎচরাচরের স্রষ্টা ও নিয়ন্তা এক পরমশক্তি। ঋগ্বেদের প্রথম রচনায় যে বহুদেবতার উপাসনা হোত, তা কালের গতি ও জ্ঞানের প্রগতির সঙ্গে সঙ্গে 'এক ব্রহ্ম, দ্বিতীয় নাস্তি'-তে পর্যবসিত হয়ে এসেছিল। (স্মরণীয়, আমরা আগেই বলেছি যে ঋগ্বেদ প্রকটিত হয়েছিলেন প্রায় দুই হাজার বছর ধরে, প্রথম মণ্ডল এবং দশম মণ্ডলের মধ্যে ব্যবধান দু'হাজার বছর)।
আমাদের রবীন্দ্রনাথ বেদ-উপনিষদ, কালিদাস রচিত অভিজ্ঞান শকুন্তলম্, রঘুবংশ প্রভৃতি ও অপরাপর সংস্কৃত সাহিত্য এবং রামায়ণ-মহাভারতের বিস্তর ও বিক্ষিপ্ত অংশ অনুবাদ করে গিয়েছেন। সে-সকল অনুবাদ রঙে, রূপে, রসে কোথাও কোথাও মূল রচনাকেও ছাড়িয়ে তাঁর নিজস্ব ভাবের ঋদ্ধতায় মহিমান্বিত হয়ে উঠেছে। তাদের মধ্যে ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের ১২১ সূক্তের দশটি ঋকের মধ্যে ছ'টির অনুবাদও আছে। সেই ঋক্-ষটক্-এর একটি উদ্ধার করেছি ওই 'এক ব্রহ্ম' চিন্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণতার মীমাংসা করার জন্যইঃ
"যা আত্মজা বলদা যস্য বিশ্ব উপাসতে প্রশিষং যস্য দেবাঃ।
যস্য ছায়ামৃতং যস্য মৃত্যুঃ কস্মৈ দেবায় হবিষা বিধেম।।"
রবীন্দ্রনাথ এই মহামন্ত্রের দুটি অনুবাদ করেছেন। প্রথমটি---
"আত্মদা বলদা যিনি ; সর্ব বিশ্ব, সকল দেবতা
বহিছে শাসন যাঁর ; মৃত্যু ও অমৃত যাঁর ছায়া ;
আর কোন দেবতারে দিব মোরা হবি ?"
(১৮৯৪সালের ফাল্গুনে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় প্রকাশিত)।
দ্বিতীয়টি আরো পনের বছর পর ---
"আপনারে দেন যিনি,
সদা যিনি দিয়েছেন বল,
বিশ্ব যাঁর পূজা করে,
পূজে যাঁরে দেবতা সকল,
অমৃত যাঁহার ছায়া,
যাঁর ছায়া মহান্ মরণ,
সেই কোন্ দেবতারে
হবি মোরা করি সমর্পণ !"
(১৯০৯ সালের ২২শে অগ্রহায়ণ)।
অনুদিত ছয়টি মন্ত্রেই এই প্রশ্ন যে দেবতাদের দেবতা, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের স্রষ্টা, নিয়ন্ত্রক ও সমস্ত ভূতজগতের 'আত্মা' ও বল-প্রদায়ক এক অবিভাজ্য মহাশক্তি ছাড়া আর কোন্ দ্বিতীয় সত্ত্বা আছে যাকে 'হবি' উৎসর্গ করা যায় ? এই 'আত্মদা' শব্দার্থের যুগে যুগে, অসংখ্য পণ্ডিত, গবেষক বিভিন্ন ধরণের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু আমাদের ঋষিকবি যখন বলেন 'আপনারে দেন যিনি' তখন যেন শব্দটির প্রকৃত অর্থ আমাদের বোধগম্য হয়ে ওঠে। যিনি 'আত্ম',-- সহজার্থে অহং বা আপন সত্ত্বা, বা আপন চৈতন্যসত্ত্বা জগৎসংসারের সবার মধ্যে বিতরণ করেন।
আরো একটি মন্ত্রে আদিপ্রজ্ঞা ঋগ্বেদ বলছেন,
"যং ক্রন্দসী অবসা তস্তভানে অভ্যৈক্ষেতাং মনসা রেজমানে।
যত্রাধি সূর উদিতো বিভাতি কস্মৈ দেবায় হবিষা বিধেম।।"
"মহাশক্তি-প্রতিষ্ঠিত দীপ্যমান দ্যুলোক ভূলোক
যাঁরে করে নিরীক্ষণ ; সূর্য যাঁহে লভিছে প্রকাশ ;
আর কোন্ দেবতারে দিব মোরা হবি ?"
এখানেই নির্ধারিত হয়ে গেছে আমাদের প্রাচীন ভারতীয় ধর্মধারণার প্রকৃত রূপ। এক অনন্ত অসীম অনির্বচনীয় সত্ত্বা, আমাদের অজ্ঞাত, বোধাতীত মহাশক্তিকে আমরা জানবার চেষ্টা করে গিয়েছি যুগ যুগান্তর, অনাদি অতীত থেকে বর্তমান--- বিগত, আগত, অনাগত কালের তিনিই ভারতীয় ধর্মচিন্তার আধার ও আধেয়। এই ধর্মবোধ কোন প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের অনুসরণ বা অনুশীলন নয়। এটিকেই শাশ্বতকালের, সনাতন ধর্ম-অন্বেষুদের সাধনার লক্ষ্য ও পথ। (এখানে 'সনাতন' শব্দটি বর্তমানের উগ্র সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্ববাদীরা যে অর্থে ব্যবহার করেন তা সম্পূর্ণ ভিন্ন -- বিকৃত, সংকীর্ণ, স্বার্থপরতাসর্বস্ব)। ভারতবর্ষের বেদ ও উপনিষদের কোনখানে 'ঈশ্বর' (পাশ্চাত্যের God অর্থে) শব্দটি নেই ; প্রাচীন শাস্ত্রগ্রন্থ- সমুদ্রের কচিৎ কোথাও তার দেখা গেলেও তা ব্যবহৃত হয়েছে ঐশ্বর্যবান অর্থে। 'ঈশ্বর' (ভগবান) এসেছেন শঙ্করাচার্যের বৈদিক ও উপনিষদীয় ভাষ্য থেকে। কিন্তু এখানেও 'ঈশ্বর' কোন সম্প্রদায়গত আরাধ্য দেবতা নন। তিনি 'একমেবাদ্বিতীয়ম্' পরমাত্মা, পরম চৈতন্য যাঁর দ্বারা এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি স্থিতি এবং বিলয় সম্ভাবিত হয়। ভারতবর্ষের ধর্মদর্শনের শঙ্করাচার্যই ব্যাসদেব, তৎপুত্র শুকদেবের উত্তরসূরী, শ্রেষ্ঠ ধর্ম- ব্যখ্যাতা।
(ভগবান শঙ্করাচার্য (৭৮৮-- ৮২০ খ্রিঃ) পরম বেদজ্ঞ, ও দার্শনিক। তিনি প্রধান দশ'টি উপন্যাসের ভাষ্য রচনা করেছেন। ঈশা, কেন, কঠ, প্রশ্ন, মুণ্ডক, মাণ্ডুক্য, তৈত্তিরীয়, ঐতরেয়, ছান্দ্যোগ্য এবং বৃহদারণ্যক)।
ঈশা উপনিষদের প্রথম মন্ত্রের বলা হয়েছে,
"ঈশাবাস্যমিদং সর্বং যৎ কিঞ্চ জগতাং জগৎ।"
তিনি এই অদ্বৈতবেদান্তের প্রবক্তা, অদ্বৈতবাদ এবং ভক্তিবাদের প্রতিষ্ঠাতা। বেদান্ত সৃষ্টিতত্ত্বের অনুসন্ধানে নিরন্তর সাধনা কর-চলা পথের নির্দেশ দেন। কখনও এই মহাসৃষ্টির স্রষ্টাকে পুরুষরূপে স্বীকার করেছেন ---
শৃন্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রাঃ।
আ যে দিব্যানি ধামানি তস্থুঃ
বেদাহমেতং পুরুষং মহান্তং
আদিত্যবর্ণ তমসঃ প্ররস্তাত।।
----- শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ।
হে বিশ্বের অমৃতের পুত্রগণ, শোন, তোমরা তাঁর সন্তান (এই 'পুত্র' উচ্চারণে নর বা নারী আলাদা করা হয় নি) যিনি দিব্যধামে, সমস্ত 'তমসা' -- অন্ধকারের পারে, বাস করেন, যিনি আদিত্য বর্ণের (সূর্যসন্নিভ), যিনি 'পরম এবং এক' -- পরাহমেকং।
এই মন্ত্রের ভিন্ন ব্যাখ্যাও আছে। হে দিব্যধামবাসী অমৃতের পুত্রগণ, তোমরা শোন, মহাতমশার পরপারে আদিত্যের মত জ্যোতির্ময় মহান যে পুরুষ (স্রষ্টা) তাঁকে আমি জেনেছি -- বেদাহমেতং।
'তমসা' এখানে 'জ্ঞানান্ধকার' ; 'আদিত্যবর্ণ' এখানে 'জ্যোতিস্যাং জ্যোতিঃ' আলোর আলো- বা প্রজ্ঞা। উপনিষদ বলছেন 'প্রজ্ঞানম্ ব্রহ্ম'।
এই যদি প্রাচীন ভারতীয় ধর্মধারণা হয় তবে তার মধ্যে তো বিভেদের, বাদ বিসম্বাদের, জাতি বা বর্ণবৈষম্যের কোন কলঙ্ক, কোন অমানবিক নৃশংসতার অবকাশ নেই। প্রজ্ঞার আলোকিত পথে যদি এই বিশ্বচরাচরের স্রষ্টা 'আলোর আলো'-র সঙ্গে আমাদের চেতনার আলো একাত্মতা অনুভব করতে পারে তবে আলাদা করে 'ভগবান বা ঈশ্বরের' শরণাপন্ন হবার প্রয়োজন কোথায় ? উপনিষদ কোন ঈশ্বর নয়, সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে যে গভীর আলোচনা করেছেন তা মানবকেও স্রষ্টার সঙ্গে একাত্ম করে দিয়েছে।
ঈশা উপনিষদ এবং অন্যান্য যজুর্বেদীয় উপনিষদের শান্তিপাঠ আরম্ভ হয়েছে এমন এক মন্ত্র দিয়ে যা মানবপ্রাণের বিশ্বৈকানুভবের চূড়ান্ত প্রকাশ। এই ব্রহ্মাণ্ডের শান্তিময় স্বরূপ কি ?
"ওঁ পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাৎ পূর্ণমুদচ্যতে।
পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে।।
ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ... "
যা এখানে নেই, অর্থাৎ দৃশ্য নয় (অদৃশ্য মহান সত্ত্বা) তিনি পূর্ণ, যা এখানে দৃশ্যমান তাও পূর্ণ, পূর্ণ থেকে (অদৃশ্য মহাসত্ত্বা) থেকে পূর্ণ এই দৃশ্য জগৎ সৃষ্ট হয়েছে, পূর্ণ জগৎব্যপ্ত মহাসত্ত্বা (যিনি ব্রহ্ম) অপরিবর্তিত (অক্ষর) থাকেন। ওই পূর্ণ থেকে এই পূর্ণ অদৃশ্য বা বিনষ্ট হলেও পূ্র্ণ অক্ষয় থাকে।
"হে পূর্ণ, তব চরণের কাছে
যাহা কিছু সব আছে আছে আছে।
নাই নাই ভয়, সে শুধু আমারই
নিশিদিন কাঁদি তাই।।"
ঈশ্বরে বিশ্বাসী মানুষ 'আস্তিক' এবং ঈশ্বরে অবিশ্বাসী মানুষ 'নাস্তিক' -- দুই জনই কিন্তু স্বীকার করেছেন ঈশ্বরের অস্তিত্বে, প্রতক্ষে বা পরোক্ষে। যিনি বলছেন 'God is not Great', যিনি বলছেন 'God is Dead' -- তাঁরা কি বলছেন না 'ঈশ্বরের মহান হওয়া' উচিত ছিল, বা 'ঈশ্বরের বেঁচে থাকার' প্রয়োজন ছিল ? এসকল কথা নিরর্থক কেননা ঈশ্বর বা God থাকুন বা না থাকুন এই 'সৃষ্টি' তো আছে। আছে এই প্রাণময়ী, শ্যামলাঞ্চলা পৃথিবী, ওই সূর্য-চন্দ্র-গ্রহ-নক্ষত্র নীহারিকার আলোকোদ্ভাসিত নভোমণ্ডল। আছে আলো, আছে কাল। আছে জন্ম, আছে মৃত্যু -- সৃজন প্রলয়ের নিরন্তর বহমান ধারা।
"মহাবিশ্বে মহাকাশে মহাকাল মাঝে
আমি মানব একাকী ভ্রমি বিস্ময়ে, ভ্রমি বিস্ময়ে।।
তুমি আছ, বিশ্বনাথ, অসীম রহস্যমাঝে
নীরবে একাকী আপন মহানিলয়ে।।"
প্রশ্ন করি, খুঁজি স্রষ্টাকে এবং দ্রষ্টাকে ? সেই বিস্ময়কর সত্ত্বাকেই মানুষ ঈশ্বরের মহাসিংহাসনে প্রতিষ্ঠা করে ভিন্ন ভিন্ন নামে আরাধনা করেছে। ঈশ্বর, আল্লাহ, God, অহুরা মাজদা -- এমনই শত সহস্র ভাষায়, শত সহস্র নামে। এই বিস্ময়বোধ, এই অন্বেষণ মানুষের ধর্মধারণার আদি সুর, আদি জ্ঞান ও বিজ্ঞানের উৎস।
"My religiosity consists in a humble admiration of the infinitely superior spirit that reveals itself in the little that we, with our weak and transitory understanding, can comprehend of reality. Mortality is of the highest importance -- but for us, not for God."
--- Albert Einstein.
এই পর্যন্ত, এমনটিই হোত যদি, তবে কোন দ্বন্দ্ব নেই ; কিন্তু যখন 'আমার ঈশ্বরকে' শ্রেষ্ঠ আসন দান করবার নির্বোধ অহংকারে 'ওদের God-কে' আমরা আক্রমণ করি তখনই ঈশ্বরও নিহত হন এবং সাথে সাথে আমরাও। তখন ধর্ম আর মানুষের সমাজকে, মানুষের প্রাণকে ধারণ করতে পারে না। মানবতা বা মানুষের চেতনা অন্ধ হিংসা ও প্রতিহিংসায় উন্মাদ হয়ে যায়।
পরবর্তী পর্বে
(ক্রমশঃ)
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২২/৩/২০২৬
কলকাতা।
__________________________________
বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ, ২০২৬
শান্তি-১
শান্তি ১
'শান্তি' শব্দের প্রকৃত অর্থ কি, কেও কি বলতে পারবে ? পারবে একজনই যে বলতে পারে না, এমনকি, ইঙ্গিতে-ভঙ্গিতে, প্রকাশে-অভিব্যক্তিতেও জানান দিতে পারে না। সে কে ? সে হোল এক, একা, একটি প্রাণহীন শবদেহ, যাকে, দাহ করবার জন্যই হোক্ বা মাটি দেওয়ার জন্যই হোক্ শ্মশানে কিংবা গোরস্থানে আনা হয়েছে। জীবন থাকা কালে 'শান্তি'র কোন অস্তিত্ব নেই। এইখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, এই আগের বাক্যে 'এক একা একটি' বিশেষণগুচ্ছ প্রয়োগ করা হোল কেন ওই শবদেহটির ক্ষেত্রে ? আরো তো সহযাত্রীরা ছিল তার সঙ্গে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায়। হ্যাঁ, ছিল ; কিন্তু যারা ছিল তাদের সাথে আর কি যোগ আছে ঐ মড়াটির ? তবে সে তো নিঃসঙ্গই, এমনকি তার আজীবনের সঙ্গী -- দেহ-কাঠামো, কর্মেন্দ্রিয়-জ্ঞানেন্দ্রিয়গুলি আর তার সঙ্গে নেই। চিন্তা-ভাবনা, স্মরণ-মননশূণ্য, নিশ্চেষ্ট, নির্বিকার, অন্তরের এবং বাইরের আঘাত-অভিঘাত- নিরপেক্ষ এই 'অবস্থাটিই' শান্তির শান্ত বিমূর্ত মূর্তি। সমস্ত জীবজগতের কথা বাদই দিলাম, পূর্ণচৈতন্যের মানব নামক জীবটির কাছে 'শান্তি' শব্দটি যে এক নির্মম বিদ্রুপের মত ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতে থাকে -- মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়ার জন্মক্ষণ থেকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার আগে শেষ নিঃশ্বাসটি ফেলে যাওয়া পর্যন্ত -- এই তো নিয়তি।
তাই হলে জীবন কি এক সত্যিই ট্রাজেডি ? হ্যাঁ এবং না। ('না' এর কথা পরে।) গভীরভাবে বিচার করলে দেখা যাবে, মানবসমাজের, মানবসংসারের অশান্তির যত কারণ আছে তার মধ্যে বেশিরভাগই মানুষের স্বকৃত ও স্ব-আরোপিত। সমস্ত রকমের প্রাকৃতিক বিপর্যয় সহ্য করে, প্রতিরোধ করে, জয় করে, নব নব সৃজনের দুর্মর প্রচেষ্টায় বেঁচে থাকার যে জীবনসংগ্রাম তার পরিণাম পরাভবের নয় ; কিন্তু দেশে দেশে, কালে কালে যে সকল যুদ্ধ, জাতিদাঙ্গা, আক্রমণ, আগ্রাসন, লুণ্ঠন সংঘটিত হয়েছে তার জন্য যে নরকের অশান্তি, সে সবই ভোগ করতে হয়েছে, হয়ে আসছে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে যাঁরা অশান্তি চায় নি, চায় না। মানব সমাজে মানুষে মানুষে বিভেদ, ঘৃণা ও নৃশংসতা -- তার অনেকখানিই দায় বর্তায় ধর্মধারণার উপর, ধর্মমতগুলির পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের উপর, ঈশ্বর নামক একটি বিধান-স্রষ্টা ও তাঁর নির্মিত স্বর্গ ও নরক সৃষ্টির কাল্পনিক বিশ্বাসের উপর। রাজ্য- সাম্রাজ্যলোভী রাজা, সম্রাটদের আক্রমণ, আগ্রাসন, লুণ্ঠন, শিশুনারী নির্বিশেষে হত্যা ও ধর্ষণ হয়, হয়েছে ও হবে। ইউরোপের মধ্যযুগে ভ্যাণ্ডাল, হুন, ফ্রাঙ্ক, অষ্ট্রোগোথ, ভিসিগোথ, ল্যাম্বার্ডদের অমানবিক ধ্বংসলীলায় (অ্যাটিলা দ্য হুনকে বলা হোত 'ঈশ্বরের কশাঘাৎ', Scourge of God) যত রক্তবন্যা বয়েছিল ইউরোপের মাটিতে, তার চাইতে কম শোণিতাক্ত হয় নি বিশ্বের মানবসমাজ ধর্ম নামক খড়্গের আঘাতে। অ্যাংলো আমেরিকান লেখক Christopher Hitchens, (1949-2011) তাঁর একটি বিতর্কিত বইতে (God is not Great, How Religion poisons Everything) লিখছেন যে যে-কোন "Organized Religion is violent, irrational, intolerant, allied to racism, tribalism, and bigotry, invested in ignorance and hostile to free inquiry, contemptuous of women and coercive towards children".
বইটির নামের মধ্যে একটি বিষম বিতর্কের অবতারণা করা হয়েছে। আব্রাহামিক ধর্মগুলির মধ্যে ইসলাম ধর্মের একটি মহান উচ্চারণ 'ঈশ্বর মহান' বা 'God is Great'. এখানেই দ্বন্দ্ব। হিচেন তাঁর গ্রন্থের নাম রেখেছেন 'God is not Great.' তাই যাঁরা আব্রাহামীয় একেশ্বরবাদী যেমন ইহুদি, খ্রিস্টান এবং ইসলাম ধর্মের মধ্যে পড়েন না, তাঁদের পক্ষে এই দ্বান্দ্বিক আলোচনায় লিপ্ত হওয়ার পরিসর অত্যন্ত সংকীর্ণ। কিন্তু তিনি শুধু ইসলাম নয় বাকি অন্যান্য বহু ধর্মধারণা নিয়েই তাঁর এই গবেষণামূলক গ্রন্থটি প্রণয়ন করেছেন। তিনি (বিশেষ করে ঐ প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মগুলির বিষয়ে) ধর্মীয় মতবাদ সৃজন, সে মতবাদের প্রচার ও অন্য ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে তার দ্বন্দ্বের যে ঐতিহাসিক পরম্পরা সে-সবের বিশদে আলোচনা ও ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন কত অসংখ্য রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ সংঘটিত হয়েছে ধর্মবিশ্বাসকে কেন্দ্র করে। মধ্যযুগের ক্রুসেড, ইনকুইজিশন ছাড়াও উনবিংশ শতাব্দীতে বেলফাস্ট (আয়ারল্যান্ড) দ্বন্দ্ব, বেইরুট বা লেবাননের গৃহযুদ্ধ, ভারতের সাম্প্রদায়িক জাতিদাঙ্গার উদাহরণ দিয়ে লেখক প্রশ্ন করেছেন এ সকল হিংস্রতা, হত্যা, বাস্তুচ্যুত হওয়া কি মঙ্গলময় ঈশ্বর অনুমোদিত ? এমনকি যে ধর্মমত 'অহিংসার' মন্ত্রে দীক্ষিত, সেই বৌদ্ধধর্মে বিশ্বাসী মায়ানমার নিষ্ঠুর রাষ্ট্রবাদের ত্রাসনে ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী রোহিঙ্গাদের উপর নামিয়ে এনেছে এমন নারকীয় নিষ্পেষণ যার জন্য তারা দেশহারা, আশ্রয়হারা হয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে, অমানবোচিত জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়েছে। লাঞ্ছনা, ঘৃণা ও নির্বাসনের শিকার হয়েছে।
ধর্মে ধর্মে এমন সব সংঘাত ও সংঘর্ষের কথা, ঈশ্বরের অস্তিত্ব, সর্বশক্তিমানের (God the Great) সর্বময় ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের ধারণাকে প্রশ্ন করেছেন, সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, এমনকি অস্বীকারও করেছেন আমার বর্তমান আলোচিত একমাত্র লেখক খ্রিষ্টোফার হিচেনস্ -- তা কিন্তু নয়। আরও বহু বিদ্বান ও চিন্তাবিদ আছেন যাঁরা ধর্মীয় ধারণা ও ঈশ্বরবাদী বিশ্বাসকে বাস্তববাদী (materialistic) বিতর্কের দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করেছেন। তাঁদের মধ্যে আছেন Richard Dawkins, Danial Dennett, Marlin Amis, George Orwell, Noam Chomsky প্রভৃতি। এনারা প্রায় সকলেই মানবিক চেতনার উন্মেষ ও ক্রমোন্নয়নের পক্ষেই মত প্রকাশ করেছেন, যার দ্বারা মানবতার, মানবজাতির প্রকৃত মঙ্গল সম্ভাবিত হতে পারে এবং এই পৃথিবী নামক আশ্রয়টি ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সকলের জন্য একটি শান্তিপূর্ণ আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে।
যে ধর্মধারণাগুলি এক এবং অদ্বিতীয় কোন ঈশ্বরকে অবলম্বন করেছে, বিশ্বাস করেছে, যাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে জাগতিক ও পরাজাগতিক শান্তিলাভের কামনায়, তাহলে সেই ঈশ্বরের বিশ্বজনীন কল্যাণ ও মঙ্গল বিধানের ক্ষমতা কি তবে প্রশ্নাতীত নয় ? আবার প্রশ্নটির অন্য দিক থেকেও ওঠা বিতর্কও স্বাভাবিক যে যখন আমরা বলছি 'ঈশ্বর মহান' বা 'ঈশ্বর মহান নয়' তখন তো আমরা স্বীকার করেই নিচ্ছি যে 'ঈশ্বর' নামধারী কোনো এক অদৃশ্য সর্বশক্তিমান নিয়ন্ত্রকের অস্তিত্ব আছে। এবং যাঁরা ধর্মপ্রবক্তা বা ঈশ্বরের অবতার বা জীবনপথের প্রদর্শক বা জীবনদ্বন্দ্বের মুক্তিদাতা (Supreme Leaders or Liberators) তাঁরা সেই অদৃশ্য 'সর্বশক্তিমান নিয়ন্ত্রকের' বাণী বহন করে এনেছেন দুঃখময় জগতের যন্ত্রনাক্ষুব্ধ মানুষের ঐহিক ও পারত্রিক জীবনকে শান্তিময় ও মঙ্গলময় করে তোলার জন্যই। "তবে কেন পঙ্গু সৃষ্টি, খণ্ডিত এ অস্তিত্বের ব্যথা !"
'অস্তিত্বের ব্যথা' বিশেষতঃ ধর্মকে কেন্দ্র করেই হয়ে আসছে -- এ কথা তো সত্য। ঈশ্বর আছেন, তিনি স্বর্গ নামক এক কল্পিত সুখ-শান্তিময় স্থানে বাস করেন, তিনি ধর্ম সৃষ্টি করেছেন ; ধর্মের রীতি নীতি, বিধি বিধান, সাধন-আরাধনা, সংস্কার পালনের মধ্য দিয়ে তাঁর কাছে যাওয়া যায়। এই ধরাধামে তাঁর প্রতিনিধি বা ধর্মগুরুরা আছেন যাঁদের সাহায্য ব্যতিরেকে, আশীর্বাদ ছাড়া, করুণা ব্যতিত ঈশ্বরের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায় না, স্বর্গলাভেরও সম্ভাবনা থাকে না। পাপ নিয়েই মানুষ জন্মগ্রহন করে এবং নরকে তার স্থান নির্ধারিত , সেখানে purgatory বা শুদ্ধিলোক যদিও আছে কিন্তু সেই শুদ্ধিলোকের দীর্ঘ দহনযন্ত্রনা ভোগ করতেই হবে। তার পরেও অনন্ত নরকবাসের বিভীষিকাময় ভীতি এই বিশ্বাসের শিকড় একদিকে যেমন সুদূর অতীতের অধোলোকে নিমজ্জিত তেমনি তার শাখা প্রশাখা বিস্তার করে আছে সমগ্র পৃথিবীর সমস্ত জনপদে -- রাজার প্রাসাদ হতে ভিখারীর ভগ্ন কুটীরের জীর্ণ চালাঘরে। মধ্যযুগের পাপমুক্তির জন্য গীর্জা কর্তৃক নির্ধারিত, ধর্মযাজকদের কাছ থেকে মুক্তিপত্র (Letter of Indulgence) কেনার প্রচলন ছিল, যা ধর্মভীরু, নিরীহ, সন্ত্রস্ত মানুষেরা কপর্দকশূন্য অবস্থায় থাকলেও, সামন্তপ্রভুদের কাছে শ্রমদানের প্রতিজ্ঞার মাধ্যমে, কিনতে বাধ্য হোত যাতে মৃত্যুর পর তাদের শুদ্ধিকরণের ভয়াবহ অন্ধলোকে যেতে না হয়। আবার শুদ্ধিলোকে বা purgatory-র অগ্নিকুণ্ডের জ্বালা সহ্য করে' (purifying suffering or satispassion) উত্তীর্ণ হতে না পারলে শেষবিচারের দিন (সৃষ্টির অন্তিমকাল) পর্যন্ত মহানরকে অবস্থান। এই শেষ বিচারেরধারণা সমস্ত মানবীয় চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করে। 'শেষবিচার' হোল In Abrahamic religions (Judaism, Christianity, Islam, and Zoroastrianism) Judgement Day or The Last Judgement is a core theological concept which is a future event where God or Jesus Christ returns to judge all humanity ---- both living and resurrected dead ---- based on their faith, words, and actions leading to eternal reward or punishment.
কিন্তু তবুও বিচারের ভার তুলে নিয়েছিলেন ধর্মযাজক ও ধর্মগুরুরা। অবিশ্বাসী ও অখ্রিষ্টানদের উপর, বিশেষ করে ক্যাথলিকদের নির্মমতা কী বীভৎস ছিল তার অসংখ্য উদাহরণ আছে। মধ্যযুগে ১০৬৪ সাল থেকে ১৫২৬ সাল পর্যন্ত ক্যাথলিক ধর্মযাজকেরা অখ্রিষ্টানদের নির্মূল করার জন্য নির্বাসন, জোরপূর্বক ধর্মান্তরিতকরণ এবং গনহত্যার মত এমন সব নির্বিবেক, নির্বিচার, নিষ্ঠুর পন্থা অবলম্বন করেছিল যে সমগ্র পশ্চিম ইউরোপ একজাতি, এক ধর্মের ভূখণ্ডে রূপান্তরির হয়ে গিয়েছিল। এবং সেই সময়েই অখ্রিষ্টানদের কয়েকটি বিশাল বিশাল গোষ্ঠী ভবঘুরে বা Gipsy-তে পরিনত হয়ে যায়, যাঁরা মূলত উত্তর ভারত থেকে স্থানান্তরিত হয়ে, বলকান অঞ্চল দিয়ে ইউরোপে প্রবেশ করেছিল। এই অভিবাসিত যাযাবর জাতি ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের ভিন্ন ভিন্ন ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় প্রান্তিকভাবে বসতি স্থাপন করেছিল। মধ্যযুগের ইউরোপ তাদের মিশরীয় মনে করত বলেই তাদের Gypsy বলা হোত। আব্রাহামিক কোন ধর্ম, কোন ভগবান তাদের রক্ষা করতে পারে নি। (ইতিহাসের ঘোর কলঙ্কের বিষয় এই যে সেই সব ভবঘুরে জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন, বিচিত্র সংস্কার, সংস্কৃতি, নৃত্য-সঙ্গীতের মত শৈল্পিক সৌন্দর্য, দৈহিক এবং মানসিক ঐশ্বর্য থাকা সত্ত্বেও এই বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়কালে এসেও কিছু উন্মাদ, নৃশংস একনায়কতন্ত্রী রাষ্ট্রতন্ত্রের হাতে চিরবিনাশের অন্ধকারে হারিয়ে গেল তারা ! (অতি সামান্যই অবশিষ্ট রয়েছে এখনো, এখানে ওখানে)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়েরও আগে থেকে (১৯৩৩-১৯৪৫) ৬০/৭০ লক্ষ ইহুদিদের সঙ্গে নাৎসি বাহিনী প্রায় ৫০০,০০০ রোমানি ভবঘুরেদের হত্যা করেছিল -- "The cruelest Holocaust along with the Nazi Genocide of the Jews in the history of Europe!"
তাহলে তখন 'ঈশ্বর' নামের ব্রহ্মাণ্ডের 'সর্বশক্তিমান মুক্তিদাতা' কেউ ছিলেন না বা থাকলেও তিনি অসহায় মানববিশ্বের কল্যাণময় প্রাণশক্তি হতেই পারেন না। এমন ই চিন্তার ঝলক আমরা পাই Friedrich Nietzsche-য়ের লেখা থেকেঃ
"God is Dead. God remains Dead. And we killed him." ----'The grey science'. (প্রবন্ধের অন্যত্র এ বিষয়ে আলোচনা করা হবে।)
এতক্ষণ ইউরোপীয় ভূখণ্ডের ইতিহাসের কতিপয় ধর্মীয় দ্বন্দ্ব সংঘাতের কথা বলেছি, অন্ধ ধর্মবিশ্বাসের নরমেধ যজ্ঞকুণ্ডে মানবপ্রাণের আহুতিদানের কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরেছি। এবার তাই যদি ভিন্ন ভিন্ন দেশের প্রসঙ্গে আলোচনায় যাই তবে দেখব খ্রিস্টান ও ইসলাম সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের সঙ্গে সমান্তরালভাবে সশস্ত্র ধর্ম-বিজয়াভিযানের শোণিত-তরঙ্গ, ঢেউয়ের পর ঢেউ, আছড়ে পড়েছিল এশিয়া, আফ্রিকা, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার সর্বত্র। এ সমস্ত স্থানে প্রথমদিকে এসেছিল ক্যাথলিক ধর্মযাজক ও ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ। পরবর্তী সময়ে ইসলাম ধর্মের ধর্মগুরু ও নবাব-সুলতানেরা। বিশ্বের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে এসেছিল শান্তির শ্বেতপতাকাবাহী অহিংস ধর্মপ্রচারকদের দ্বারা নয়, এসেছিল রক্তমাখা অস্ত্রহাতে, রক্তক্ষয়ী হনন, লুণ্ঠন, ধর্ষণ ও নিপীড়নের মধ্যে দিয়ে। ইতিহাসের এই হাজার হাজার বছরের যুদ্ধ, বিপ্লব, উপপ্লবের আলোচনা এখানে অপ্রাসঙ্গিক কিন্তু প্রাসঙ্গিক যা তা হোল 'ধর্ম' ও 'ধার্মিক' সম্প্রদায়ই যদি 'শান্তির' পথ অবলম্বন না করে তবে ধর্ম ও ধার্মিকতার বিমূর্ত মূর্তি 'ঈশ্বরের' অস্তিত্বে কি বিশ্বাস রাখা যায় ? এই অবিশ্বাস থেকেই নাস্তিক্যবাদের জন্ম। এই মতবাদটিই ইউরোপীয় নাস্তিক বা নিরীশ্বরবাদীদের চিন্তাকে ঋদ্ধ করেছে।
এবার আসি প্রতীচ্য ছেড়ে প্রাচীন প্রাচ্য ভূমিখণ্ডে --- প্রধানভাবে এবং প্রাসঙ্গিক কারণেই এই ভারতবর্ষে, কেননা এখানে 'ঈশ্বর' বা 'ভগবান' বিষয়ে যত আলোচনা হয়েছে, মানবসভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে, ততখানি আর কোন দেশের কোন সভ্যতায় হয় নি। 'ঋক্শ্রুতি' বা ঋক্বেদ, বা 'ঋকবেদ সংহিতা' আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর, মতান্তরে দশ হাজার বছরও হতে পারে, আগে রচিত হতে আরম্ভ করে এবং গবেষকদের মতে দশ মণ্ডলের এই মহাগ্রন্থ সম্পূর্ণ রূপে প্রকটিত হয়েছে দুই হাজার বছর কাল ধরে। ঋক্ বেদ বিশ্বমানবসভ্যতার আদিমতম সাহিত্য, মানুষের মনন ও দর্শনের প্রথম অভিব্যক্তি। বাক্, বাক্যগঠন ও ভাষার ব্যাকরণগত ও ছন্দায়িত (ত্রিষ্টুপ, গায়ত্রী, জগতী প্রভৃতি ছন্দে ঋক্ মন্ত্রগুলির আবৃত্তকরণ হয়) চলনের প্রথম উচ্চারিত উদাহরণ। শুধু তাই নয় ঋগ্বেদ, যা পরবর্তী সামবেদ, যজুর্বেদ এবং আরো পরবর্তীতে, যুগ পর্বের ব্যবধানে সংকলিত অথর্ববেদের, ব্রাহ্মণগ্রন্থগুলির, আরণ্যক ও উপনিষদসমূহের উৎসস্বরূপ। (যোগবাশিষ্ঠ রামায়ণ, মদ্ভাগবৎগীতা, রামায়ণ, মহাভারতাদি পুরাণ গ্রন্থাবলীর আলোচনা প্রসঙ্গান্তরে করার অবকাশ থাকবে)।
আমাদের বা এই ভারতবর্ষের মত উপমহাদেশের ধর্মধারণা ও ঈশ্বরবিশ্বাস নিয়ে আলোচনা আরম্ভ করতে হলেই বেদসংহিতার প্রসঙ্গ অবধারিত। তাই বেদের সময়কাল থেকে আমাদের শান্তি ও সান্ত্বনার একমাত্র আশ্রয় 'ঈশ্বর'-য়ের মূর্ত এবং বিমূর্ত রূপের আলোচনা করতেই হবে --
(পরবর্তী পর্বে)।
--ক্রমশঃ--
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১৯/০২/২০২৬
কলকাতা।
রবিবার, ৮ মার্চ, ২০২৬
সুখ ৩
সুখ-৩
"যস্মিন্ সর্বাধিক ভূতানি আত্মৈবাভূৎ বিজানতঃ।
তত্র কো মোহঃ কঃ শোক একত্বম্ অনুপশ্যতঃ।।"
(ঈশা উপনিষদ-- মন্ত্র ৭)
বিশ্বময় ভূতবর্গের (প্রাণ ও আপ্রাণ) সঙ্গে যখন একত্বের অনুভূতি হয়, আমার আমি যখন জগৎ সংসারের সমস্ত দেশে কাল ও পাত্রে একাত্ম হয়ে যায়, তখন কোথায় বা শোক, কোথায় বা মোহ ? পৃথকবোধ থেকেই তো ঘৃণা আসে, একাত্মবোধে কোথায় বা ঘৃণা, কোথায় বা সর্বগ্রাসী মোহ ? এই জ্ঞান লাভ করলে শোক দুঃখ মোহ ভয় কিছুই থাকে না।
সুখ ও দুঃখ বিষয়ে আমাদের ঈশা উপনিষদে এত সুন্দর সুন্দর বাণী আছে যা আমাদের সমস্ত দৈহিক ও আত্মিক দুঃখ থেকে মুহূর্তে মুক্তি দান করে, নিরন্তর মৃত্যুভীতি থেকে মুক্ত করে এক প্রশান্ত আনন্দের অনুভূতি জাগায়। বস্তুত আমাদের সকল দুঃখের কারণ হোল এই নিরন্তর মৃত্যুভয়। জীবন যেমন ভাবেই কাটুক না কেন দীর্ঘায়ু লাভের বাসনা, মৃত্যুঞ্জয়ী হবার কামনা, রোগ থেকে রক্ষা পাবার ইচ্ছা যে কত দুর্নিবার, কত উৎকট, অপ্রকৃতিস্থ হতে পারে তার বিভীষিকাময় দৃশ্য আমরা দেখেছি বিগত 'করোনা' বিশ্বমারির সময়কালে। ইতিহাস জুড়ে এমন ঘটনার অন্ত নেই এবং এখনও তা চলেছে। অসংখ্য যুদ্ধের কথা ছেড়ে দিলেও মন্বন্তরে, দুর্ভিক্ষে, ভূমিকম্পে, প্লাবনে, অতি ঝরায়, খরায়, প্লেন-রেল-পথ দুর্ঘটনায় নিরন্তর মৃত্যুমিছিল চলে এসেছে, চলেছে পৃথিবীর সমস্ত দেশে। বর্তমান সময়কালে, এইটি আশা করা গিয়েছিল যে বিজ্ঞান, বিশেষকরে চিকিৎসাবিজ্ঞানের, যানবাহনের এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থার বৈপ্লবিক উন্নতির ফলে মানুষের এই মৃত্যুভীতির সামান্য হলেও উপসম হবে। হয়নি, বরং বেড়েছে। বিশ্বব্যাপী অনেক বিপর্যয়ের পূর্বাভাস এখন মানুষের আয়ত্বে এবং সে-সব বিপর্যয় প্রশমিত করবার বৈজ্ঞানিক কৌশলও মানুষের জানা ; কিন্তু সেই জ্ঞানে-বিজ্ঞানে-ঋদ্ধ মানবগোষ্ঠী যদি সমষ্টিগতভাবে মানুষের মঙ্গল বিধানের জন্য সাধনার পরিবর্তে সাম্প্রদায়িক, সামাজিক, ধর্মীয় গোষ্ঠীতন্ত্রে বিভাজিত হয়ে যায়, যদি উগ্র রাষ্ট্রতন্ত্রের মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে সম্প্রসারণবাদী, সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের অশ্বমেধের ঘোড়াকে লাগামহীন তাড়িয়ে দুর্বলতর দেশের উপর শাসন, শোষণ ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের উল্লাসে উন্মত্ত হয়ে ওঠে তবে জাগতিক মানবতার সুখের দিন যে কোনদিনও সম্ভাবিত হবে না, বরং স্বর্গীয় সৌন্দর্য এবং অফুরান ঐশ্বর্যে-ভরা এই প্রাণময়ী ধরিত্রী যে নরকে পরিণত হবে - এ-তো দিনের শেষে রাত্রি আসার মতই সত্য। বর্তমান পৃথিবীর দিকে দৃষ্টিপাত করলেই সভ্যতাবিরোধী এই বর্বর-যুগের (মধ্যযুগের ইউরোপ ৮০০ খ্রিঃ থেকে কনস্টান্টিনোপোলের ধংস ১৪৫৩ খ্রিঃ) অন্ধকার আজও ছেয়ে রয়েছে। আমেরিকার, ইস্রায়েলের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলির সুদীর্ঘকালের দ্বন্দ্ব এতকাল তুষের আগুনের মতো কখনো ধিকি ধিকি, কখনো বা প্যালেস্তাইনের গাজা অঞ্চলে গণচিতার মত স্থানে স্থানে জ্বলছিল, এখন তা দাবানলেল মত ছড়িয়ে পড়েছে ইরান থেকে লেবাননের বেরুট পর্যন্ত। শান্তিকামী বিশ্বব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত। অগ্নিমুখী "নাগিনীরা দিকে দিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস।"
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরপরই ১৯২৫ এবং ১৯২৬ সালে রবীন্দ্রনাথ দু'দুবার ইটালি যাত্রা করেছিলেন। ২০শ শতকের গোড়ার দিক থেকেই ইংল্যান্ডে তো বটেই, ১৯২১ সাল থেকে ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড (তখন রোমা রোলাঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব নিবিড়) ইটালি প্রভৃতি দেশে তাঁর যাতায়াত ছিল নিয়মিত। ইটালিতে মুসোলিনির সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়ে সমগ্র ইউরোপজুড়ে নানা বিরূপ সমালোচনা হয়েছিল সেই সময়, কেননা সেই সময় ইটালিতে মুসোলিনির নেতৃত্বে ন্যাশনাল ফ্যাসিস্ট পার্টি (Partito Nationale Fascista বা PNF) ক্ষমতাসীন ছিল যাদের 'আদর্শ' ছিল সমাজতন্ত্র বিরোধী চরম জাতিয়তাবাদ। এই ক্ষমতাসীন দল ছিল সমস্ত বিরুদ্ধ কণ্ঠস্বরের প্রতি নির্মম ঘাতকস্বরূপ ; ঠিক যেমন জার্মানিতে ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট ওয়ার্কার্স পার্টি, (Nationalsozialistsche Deutsche Arbeiterpartie বা সংক্ষেপে Nazi party, নাৎসি বাহিনী নামেই ইতিহাসে প্রসিদ্ধ)। যাই হোক্ জার্মানির বিষয়ে বারান্তরে আলোচনা করা যাবে।
এখন আমরা ফিরে যাই ওই রবীন্দ্রনাথ ও মুসোলিনি প্রসঙ্গে। সরল ও নিষ্কলুষ মনের আবেগপ্রবণ কবি প্রথম সাক্ষাতে মুসোলিনির মত একজন কুটীল ও ধুরন্ধর একনায়ককে ঠিক চিনতে পারেন নি। মুসোলিনির আতিথেয়তা তাঁকে মুগ্ধ করেছিল এবং তিনি মুসোলিনি ও সমকালের ইতালির প্রসংশাও করছিলেন। সেই সংবাদ তখন বিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল এবং কবির উদার মানবতাবাদী অন্তরসত্ত্বা বিরুদ্ধ সমালোচনার আঘাতে জর্জরিত হয়ে উঠেছিল। তাঁর সেই দুঃসহ দুঃখের দিনে, তাঁর হয়ে লেখনী-অস্ত্র ধারণ করেছিলেন অভিন্নহৃদয় বন্ধু রোমা রোলাঁ। এই ঘটনা ও ঘটনার পরম্পরা ঐতিহাসিক তাৎপর্যবাহী। সে বিষয়ে সবিস্তারে যাওয়ার অবকাশ এই ক্ষুদ্র প্রবন্ধটিতে সম্ভব না হলেও আমরা সেই সময়ে একনায়কতন্ত্র, নিষ্ঠুর রাষ্ট্রতন্ত্র ও চরম জাতিয়তাবাদের বিরোধিতায় তিনি কি মত পোষণ করতেন এবং কতখানি ধিক্কার জানিয়েছিলেন তার উদাহরণ রয়েছে তাঁর একখানি ঐতিহাসিক পত্রে যেটি তিনি লিখেছিলেন ৫ই আগষ্ট, ১৯২৬ সালে, 'ম্যানচেস্টার গার্ডিয়ান'( Manchester Guardian)-এর ঠিকানায়। দীর্ঘ এই চিঠির অতি সামান্য কিছু অংশ,
"I have said over and over again that the aggressive spirit of nationalism and imperialism, religiously cultivated by most of the nations of the West, is a menace to the whole world. The demonstration that it produces in European politics is sure to have disastrous effects, especially upon the peoples of the East who are helpless to exploit the western methods of exploitation. It would be most foolish, if it were not almost criminal, to express my admiration for a political ideal which openly declares its loyalty to brute force as the motive power of civilization. The barbarism is not altogether incompatible with material prosperity may be taken for granted, but the cost is terribly great ; indeed it is fatal. The work of unscrupulous force as the vehicle of nationalism keeps ignited the fire of international jealousy, and makes for universal incendiarism, for a fearful orgy of devastation. The mischief of the infection of this mortal aberration is great because today the races of humanity have come close together, and any process of destruction set going does work on an enormously vast scale. Knowing all this, could it be believed that I should have played my fiddle while an unholy fire was being fed with human sacrifice ?"
'Aggressive spirit of nationalism religiously cultivated by most of the nations of the West' পাশ্চাত্যের বহু রাষ্ট্রের ধর্মান্ধতাপুষ্ট চরম আগ্রাসনবাদী সাম্রাজ্যবাদ ও জাতিয়তাবাদের উগ্রসুরা 'is menance to the whole world'-- সমগ্র বিশ্বের কাছে এক ভয়াবহ সর্বনাশ। এর পর এই চিঠির শব্দে শব্দে, পঙক্তিতে পঙক্তিতে তিনি যুদ্ধোন্মাদ ইউরোপের যে ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও অমানবিক রাষ্ট্রচরিত্রের বহিরাবরণ উন্মোচন করেছেন, সভ্যতাগর্বী পাশ্চাত্যের হিংস্রতার নগ্নরূপ অনাবৃত করে দিয়েছেন তা শুধু তাঁর সময়কালের জন্যই প্রাসঙ্গিক ছিল এমন নয়, আজও যাঁরা প্রভাতী সংবাদ শোনবার জন্যে সংবাদপত্রের পাতা খোলেন বা সংবাদ মাধ্যমের পর্দায় চোখ রাখেন তাঁরাও সেই একই পরিবর্তনহীন দৃশ্যের সম্মুখীন হন প্রতিটি দিন -- দূর অতীতের ১৯২৬ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত, একটি সম্পূর্ণ শতাব্দী অতিক্রান্ত হবার পরও। শতাব্দীপূর্বে আমাদের দূরদর্শী ঋষিকবি নিষ্ঠুর রাষ্ট্রযন্ত্রের, উন্মত্ত জাত্যাভিমানের নারকীয় পরিণাম অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাই এমন অকুতোভয়, বীরত্বব্যঞ্জক, ক্ষমতালোলুপতার বিরুদ্ধে ভর্ৎসনার ভাষা ; যেন নিষ্কোষিত তলোয়ার, যা নিয়ে সমরাস্ত্রের-দম্ভে অন্ধ, উদ্ধতমস্তক ইউরোপীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একজন অপরাজেয় সৈনিকের রূপ ধারণ করেছিলেন এবং লিখেছিলেন "Knowing all this, could it be believed that I should have played my fiddle while an unholy fire was being fed with human sacrifice ?"
না, রবীন্দ্রনাথের এই সব্যসাচীর রূপ আত্মবিস্মৃত বাঙালি জাতির অন্তরে আজ আর জাগ্রত আছে কিনা সন্দেহ জাগে যখন দেখি 'তাঁর দেশ, তাঁর 'মা ভৈঃ' মন্ত্রে দীক্ষিত সমাজ' আত্মসংবিদহারা, সাম্প্রদায়িকতার মাদকাসক্ত এবং একতাছিন্ন আত্মহননে লিপ্ত। যাঁরা জানেন রবীন্দ্রনাথ আনন্দবাদী ছিলেন, ললিত লতার পেলবতায় প্রেমের গান লিখে গিয়েছেন, বর্ষা-শরৎ-বসন্তে নৃত্য করবার ছন্দোময় সুর সৃষ্টি করে গিয়েছেন তাঁরা যোদ্ধৃবেশের রবীন্দ্রনাথকে হয় চিনতে পারেন নি, নয় তো হীনমন্যতাবোধে উপেক্ষা করে গিয়েছেন ; না হয়, দুই চোখ দুই হাতে ঢেকে সেই আগুন ঝরানো লেখা 'সভ্যতার সংকট' ও 'মানহারা মানবতার' নবোদ্বোধনের রচনাসমূহ এবং বিভিন্ন বক্তৃতার তীব্র তীক্ষ্ণ দীপ্র উচ্চারণের বাণীর দলিলগুলি বিস্মৃতির অন্ধঘরে তালাবন্ধ করে রেখে দিয়েছেন।
এতক্ষণ রবীন্দ্রনাথের ইতিহাসপ্রসিদ্ধ একটি চিঠির কিয়দংশ উদ্ধার করেছি আমাদের মূল বক্তব্য থেকে সরে আসার জন্য নয় ; বরং মানুষের প্রকৃত সুখ কি এবং কোথায় তার হদিশ পাওয়ার জন্য। এ প্রসঙ্গে তাঁর একটি স্বল্পশ্রুত সঙ্গীত সম্পূর্ণ উদ্ধার করি,
"বাধা দিলে বাধবে লড়াই
মরতে হবে।
পথ জুড়ে কি করবি বড়াই,
সরতে হবে।
লুট-করা ধন ক'রে জড়ো
কে হতে চাস সবার বড়ো,
এক নিমেষে পথের ধূলায়
পড়তে হবে।
নাড়া দিতে গিয়ে তোমায়
নড়তে হবে।।
নিচে বসে আছিস কে রে,
কাঁদিস কেন।
লজ্জাডোরে আপনাকে
বাঁধিস কেন।
ধনী যে তুই দুঃখধনে
সেই কথাটি রাখিস মনে,
ধুলার 'পরে স্বর্গ তোমায়
গড়তে হবে।
বিনা অস্ত্র, বিনা সহায়
লড়তে হবে।।"
বীরের সুখ এখানেই। "ধনী যে তুই দুঃখধনে।" দুঃখের ভিতরে সুখ, শোকের অন্তরে আত্মোপলব্ধির আনন্দ, দারিদ্র্যের গ্লানির অন্তরে অপরাজেয় প্রাণের ঐশ্বর্যের ভাবনা তিনি আমাদের দিয়ে গিয়েছেন এই বিশ্বাসেই যে, পরাধীন, শোষণে-ত্রাশনে নিষ্প্রাণ ভারতের 'সুখের' সম্ভাবনার উৎস নিহিত আছে দুঃখী মানুষের একাত্মবোধের মধ্যে। তিনি জানতেন 'ঐক্যবদ্ধ' হওয়ার তাগিদ আসে ব্যক্তিক স্বার্থপরতার তাড়নায় যা ক্ষণভঙ্গুর, কিন্তু একাত্মতার প্রেরণা আসে মানবপ্রেমের ধর্মে। সকলের সুখের মধ্যে, সমাজের, দেশের, এমনকি, বিশ্বসংসারের সুখের ভিতর সুখের সন্ধান করাই নিরন্তর দুঃখ থেকে চিরন্তন মুক্তি ; অন্যথায় 'সুখ' হিংসায় উন্মত্ত, হৃদয়হীন, রুক্ষ, মরুময় পৃথিবীতে চির-অপসৃয়মান মরীচিকা।
"ধূলার পরে স্বর্গ তোমায়
গড়তে হবে।।"
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
০৭/০৩/ ২০২৬
কলকাতা।
_____________________________________
শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬
সুখ ২
সুখ-২
অধুনা ঝাড়খণ্ডের অজয় নদের পাড়েই আমাদের গ্রাম ভাগ্যপুর। এই অঞ্চলটি বৃহত্তর বাঙলারই একটি অংশ। বাঙলা ভাষা, বাঙলা সংস্কার-সংস্কৃতি, অশন-বসন, উৎসব-অনুষ্ঠান সবই বর্তমানের পশ্চিম বর্ধমানের মত ; কিন্তু যেহেতু 'অজয় নদ অন্তরায়' তাই বছরের চার পাঁচ মাস -- পারাপার শুধু ডিঙিনৌকা। আমাদের গ্রামে স্কুল পাঠশালা যা ছিল তা ওই ঈশ্বর চন্দ্রের 'বর্ণপরিচয় প্রথম ভাগ', 'দ্বিতীয় ভাগ' আর সংখ্যা গণনার 'ধারাপাত'। তাই ছোটনাগপুরের এই নির্জলা প্রান্তরে, পাহাড় টিলার ঢালে, সীমিত জমিতে অত্যল্প ধান চাষের মতই পড়াশোনার চাষও ছিল এইটুকু। তবে বামুন পাড়ার কিছু কিছু বাবা-মা চাইতেন তাঁদের ছেলে সন্তানেরা লেখাপড়াটা এমন শিখুক যাতে চাকরি-বাকরি করতে পারে এবং আখেরে তাঁদের দুঃখ ঘোচাতে পারে। দুঃখ বামুনদেরই বেশি কেননা, জমি-জিরেত তাঁদের যথেষ্ট থাকলেও তাঁরা, তাঁদের ছেলেরা তো আর হাল-কোদাল ধরত না। এমনই এক বামুন ঘর, অঘোর চক্রবর্ত্তী তাঁর ছয় ছেলে আর তিন মেয়ে নিয়ে সংসার চালাতে গিয়ে নাজেহাল। পৌরহিত্য, ঝাড়ফুঁক, হস্তরেখা বিচার এমনকি ভিক্ষা পর্যন্ত করেও বড় ছেলে নিরঞ্জনকে বীরভূমের দুবরাজপুরের এক ছাত্রাবাসে রেখে পড়িয়েছিলেন। নিরু মেধাবী ছিল এবং হেতমপুর রাজকলেজ থেকে বি-এ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম-এ পাশ করে কৃষ্ণনগর কলেজে অধ্যাপকের চাকরি পেয়ে গেল। প্রথম প্রথম দু' তিন বছর দেশের বাড়িতে যাওয়া-আসা, টাকা-পয়সা দেওয়া নিয়মিত ছিল। অঘোর ঠাকুর আর তাঁর স্ত্রী কাত্যায়নী দেবীর বুকে সন্তান-গর্বের জোয়ার। নিরুর জন্য পাত্রীর পিতাদের নিত্য আগমন কিন্তু অঘোর ঠাকুরের 'বরপণ' চাহিদার ঘায়ে আহত ও আশাহত হয়ে তাঁরা আর দ্বিতীয়বার সৌভাগ্যপুরমুখো হতেন না।
বিশ্বের বড় বড় ট্রাজেডিগুলোর অবিবেকী, অদূরদর্শী কিছু কিছু কারণ থাকে, যেমন রামায়ণের সোনার হরিণ, মহাভারতের পাশাখেলা, ইলিয়াডে গ্রীকরাণী হেলেন অপহরণ, 'ওথেলো'-তে রুমাল --- এই রকম আর-কি, --- সংসারের অকস্মাৎ বিপর্যয়ের বেলাতেও তেমনি কিছু কিছু হেতু থাকেই থাকে যেগুলি আমাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়। অঘোর বাবুর সংসারে, তাঁর ওই পণাপণির একগুঁয়েমি তেমনই এক হেতু হয়ে উঠেছিল কি ? কেননা হঠাৎই কিছুদিন নিরু নিরুত্তর থাকার পর, তার লেখা একটি চিঠি এসে হাজির। চিঠি দীর্ঘ ; কিন্তু মূল বক্তব্যটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত, শ্মশানে শবদাহের পর একঢেলা পিণ্ডির মতন। ছেলে তারই সহকর্মী জনৈকা 'লেখা সরকার' নাম্নী এক 'বাঙাল' নমঃশূদ্র মেয়েকে বাধ্য হয়ে বিয়ে করেছে, বাবা যদি অনুমতি দেন তবে তাঁর বৌমাকে নিয়ে নিরঞ্জন ঘরে আসবে।
মধ্যাহ্নভোজনের থালা পড়ে রইল। অঘোর ঠাকুর বার কয়েক কপালে করাঘাত করে ঘন ঘন বিড়ি টানতে লাগলেন। কাত্যায়নী দেবী তো শয্যাশায়িনী হয়ে পড়লেন। অপরাপর ছেলে মেয়েরা ঘরের দাওয়ায় এ-কোনে, সে-কোনে বসে পড়ল। যাই হোক্, সে দিনটা সেই ভাবেই কেটে গেল। পরের দিনগুলি একটু একটু পিছোতে পিছোতে অঘোর ঠাকুরের সংসার আবার অভাব অনটন ও মানহীন অগৌরবের অবস্থায় ফিরে গেল। গ্রামময় কানাকানি, জানাজানি হওয়াতে অঘোর ঠাকুরের 'ইনকাম'ও বেশ কমে গেল। সঙ্গে এসে জুটল নিন্দা, ভর্ৎসনা, বিদ্রুপ আর উপেক্ষা। কাত্যায়নী দেবী মরমে মরে গিয়ে একদিন স্বামীর পায়ের কাছে বসে, অস্থিসার পায়ে তেল মালিশ করতে করতে বললেন,
" এখন তো কতই এমন হয়, তুমি নিরুকে ক্ষমা করে দাও। একটা চিঠি লিখে বৌমাকে নিয়ে আসতে বল। ছেলেকে না দেখার কষ্ট আমি সহ্য করতে পারছি না। সংসারেরও সাহায্য হবে ; ওরা দুজনেই তো রোজগার করে।"
অঘোর ঠাকুরের দুটো চোখ রাগে রক্তজবার মত লাল হয়ে গেল, অঘোর সন্নাসীর মতোই দুর্বোধ্য এক হুংকার ছেড়ে, লাল গামছা কাঁধে ফেলে বাইরে বেরিয়ে গেলেন। মু'আঁধারি সন্ধ্যায় ঘরে ফিরলেন, হ্যারিকেনের আলোয় একটা চিঠিও লিখলেন। কিন্তু সেই চিঠিতে নিরুর উপর অনন্ত দোষারোপের পর, 'পুনশ্চ' বাক্যে লিখে দিলেন, "মৃত্যুর আগে আমি যেন তোমার মুখ না দেখি।"
চিঠি পোস্ট করবার পর ঘরে ফিরে স্ত্রীর ও সন্তানদের মূক, বিষাদবিপন্ন মুখগুলি দেখে অঘোর ঠাকুরের সংবিদ ফিরে এল। ভাবলেন, এতখানি নিষ্ঠুরতা ঠিক হোল না। কিন্তু তখন আর কিছুই করার ছিল না, অনুতপ্ত হওয়া ছাড়া। ধনুক থেকে ব্রহ্মবাণ বেরিয়ে গিয়েছে। ওদিকে নিরঞ্জন সেই চিঠি পেয়ে এমনই ভেঙে পড়েছিল যে তিনদিন আর কলেজেই গেল না। লেখা বার বার জানতে চাইছে, হয়েছেটা কি ? অবশেষে নিরঞ্জন বালিশের তলা থেকে চিঠি বার করে লেখার হাতে দিয়ে বলল, "আমি বাবার ত্যাজ্যপুত্র হয়ে গেলাম।" লেখা বার বার বোঝানোর চেষ্টা করে গেল, "বাবার এই অভিযান সঙ্গত, কিন্তু চল, আমরা যাই, তাঁদের পায়ে অপরাধ স্বীকার করি, তাঁরা অবশ্যই ক্ষমা করে দেবেন।" নিরঞ্জন কোন উত্তর দিল না। জ্যেষ্ঠপুত্রসুলভ অভিমানের সঙ্গে অবিমৃষ্যকারিতাজনিত সন্তাপে বিবশ হয়ে গেল নিরঞ্জন।
অঘোর ঠাকুরের সাংসারিক সমস্ত সুখ, সুখের আশা, সুখের আশ্রয় এবং নিরঞ্জনের নব বিবাহিত জীবনের আবেগ-সংরক্ত সুখের এখানেই সমাপ্তিরেখা টেনে দেওয়া যেত ; কিন্তু জীবনের গতি বিচিত্র, অনিশ্চয়তার বাঁক পদে পদে। নিরঞ্জনের মেজ ভাই, ভরাযৌবন বোধনের ছিল সংসারের প্রতি গভীর টান এবং গ্রামের চাষাভূষো, বাউরী বাগতি, ডোম চুয়াড়, সাঁওতাল শবরদের সঙ্গে ওঠাবসা এবং তাড়ি-মাড়ি মহুয়ার দিকেও অল্পবিস্তর ঝোঁক। কীর্তনীয়া, বাউলদের আখড়ায় আখড়ায় ঘুরে, দু'এক বার গাঁজার কলকেতে দম মেরে বুঝে গিয়েছিল ''সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই"। তাই দাদার বিয়েটাকে সে নিজের বিশ্বাসের জয় বলেই মনে করেছিল। বৌদিকে দেখার জন্যও মনটা ছোঁক্ ছোঁক্ করছিল। বয়সের ধর্ম আর কি !
এখন বেহাল সংসারের হাল ধরল সেই। বামুনের কাজকর্ম সম্পূর্ণ ছেড়ে লেগে পড়ল চাষের কাজে। আবার মনে মনে ভাবল, ফেরাতে হবে দাদাকে নইলে মা'টা মরে যাবে অকালে। পূজা পার্বণের কাজ না পেয়ে বাপটাও মুষড়ে পড়েছে। তাই ঘরের কাউকে কিছু না জানিয়েই একদিন তার বর্ণপরিচয় দ্বিতীয় ভাগের বিদ্যা সম্বল করে চিঠি লিখল দাদাকে। বিশেষ অর্থ-অনর্থ না বুঝেই লিখে দিল, "তোমাকে অদ্য না এলে মায়ের 'দুরাবস্থা' ঘটিয়াছে।"
একটি সপ্তাহ কেটেছে সবে, হঠাৎই এমনই এক চৈত্র মাসের বিকালবেলায় সৌভাগ্যপুরের পাড়ায় পাড়ায়, ঘরে ঘরে গুঞ্জন অঘোর ঠাকুরের বড় ছেলে তার 'বেজাত' বউ নিয়ে গাঁয়ে ফিরেছে। বামুন পাড়া ছাড়া বাকি সমস্ত পাড়ার বউ-বিটি থেকে বুড়া-বুড়ি দল বেঁধে এসে হাজির অঘোর ঠাকুরের উঠানে। বউ দেখে তো সবার চোখ চড়কগাছ। কী সুন্দর, কী সুন্দর ! আর ব্যবহারটি দেখলে ? মুখের কথাগুলি ? আহা, কী মিষ্টি, কী মিষ্টি !
ব্যাস্, খবর রটে গেল চৈত্রের দমকা হাওয়ার ঢেওয়ে ঢেওয়ে। পরদিন বামুন পাড়ার গিন্নিবান্নি, নবোঢ়া-অনুঢ়ারাও, বুড়োদের বাধার বাঁধ ভেঙে কাত্যায়নীর সংসারে। হ্যাঁ, নূতন বউ এখন কাত্যায়নী দেবীর কোলের কাছটিতেই এসে আশ্রয় নিয়েছে বা উল্টো করে বললে, বৌমাকে পাওয়ার পর থেকে শাশুড়িমা তাকে আর কাছ ছাড়া করেন নি। ফেরার পথে সকলেই একবাক্যে স্বীকার করে গেল, 'সত্যি বউটি রূপে লক্ষ্মী, গুণে সরস্বতী।' কেউ কেউ আবার কাত্যায়নী ঠাকরাণের কাছে আবদার করেও গেল, 'ভোজনটি ফাঁকি দিও না।' আর এইটিই চাইছিল বোধন। দাদাকে গিয়ে বলল, "দাদা, বৌভাতের ব্যবস্থা করতে হবে তো।''
সৌভাগ্যপুর গ্রামে এমন আবেগের মিষ্টান্ন-রসে সিক্ত, সার্বজনীন বৌভাতের ভোজ আগে কেও কখনো দেখেছিল কিনা তাই নিয়ে আলোচনা চলেছিল দিনের পর দিন মাঠের আলে, পুকুরঘাটে, কু্ঁয়োর পাড়ে। কিন্তু আসল আসরটি দেখা গেল তালবাগানের তাড়ির ঝুপড়িতে। গ্রামের বামুন-অবামুন, গোত্র-অপগোত্রের সব যুবকেরা গোল হয়ে বসা, মধ্যমণি বোধন, মধ্যিখানে তাড়ির ভাঁড় নয়, তাড়ির হাঁড়ি। আলোচনার বিষয় লেখা বৌদি। সেই শেষ চৈত্রের পলাশ- রাঙা পড়ন্ত বিকালের, তাড়িখেকো গ্রাম্যযুবকদের প্রগলভ শব্দগুলো নাই বা শোনালাম ; তবে সলজ্জ হাসির মধ্যে বোধনের যে বিজয়ীর গর্ব, তাড়ির ঢোকে ঢোকে ছলকে ছলকে উঠছিল -- তার সেই 'সুখানুভূতি'র প্রকাশ আমি আজও মনে রেখেছি।
একজন প্রায়-অশিক্ষিত, অ-মার্জিত, মেঠো মানুষ তার অপার, নিষ্কলুষ সত্যের আলোকদীপ্ত ভালোবাসার স্পর্শ দিয়ে নিশ্চিত অনুতাপের দুঃখ থেকে তার পরিবারটিকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল, জাতি-বর্ণ-হীন মানবপ্রেমের আমন্ত্রণে স্ববর্ণ-অসবর্ণের বাঁধ ভেঙে দিয়েছিল, অন্তঃসারশূন্য, অসাড়, সংস্কারাচ্ছন্ন পল্লীসমাজে একটি অসবর্ণ বিবাহ অনুষ্ঠানকে উচ্চনীচের ভেদাভেদহীন মিলনোৎসবে পরিণত করে দিয়েছিল ; তাও আবার এই 'প্রগতিশীল' সময়কাল থেকে অর্ধশতাব্দী আগের এক বিদ্যা-বিদ্যালয়শূন্য পাণ্ডববর্জিত দেশে -- সে ঘটনা আজও আমার সুখের স্মৃতি হয়ে বেঁচে আছে।
জনান্তিকে বলে রাখি বোধনের তাড়ির আড্ডার বন্ধু ছিলাম 'আমিও'।
(ক্রমশঃ)
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
০৪/০৩/২০২৬
কলকাতা।
__________________________________
শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
সুখ-১
সুখ-১
সুখ শব্দটি উচ্চারণ করলেই প্রথমেই অতুলপ্রসাদের একটি গান মনে পড়ে যায়,
"সুখের কথা বলো না আর
বুঝেছি সুখ কেবল ফাঁকি।"
সুখের অবিরাম অন্বেষণে হতাশ একজনের মুখে এ কথা মানায় কিন্তু নবোদ্ভিন্ন-যৌবন কোন তরুণ এই কথা শুনে স্বেচ্ছায় দুঃখ দুর্দশার পথ বরণ করে, রাজকুমার সিদ্ধার্থের মত নিদ্রামগ্ন, শ্লথবস্ত্র, যৌবনবতী, সুন্দরী যশোধারা, হাসি-কান্নার দেয়ালা-দোলানো ঘুমন্ত সন্তান, পিতা-মাতা আর রাজ্যপাটের নিশ্চিত সুখ বিসর্জন দিয়ে রাত্রির অন্ধকারে, আরো অন্ধকারময় ভবিষ্যতের লক্ষ্যবিহীন মহানিষ্ক্রমনে গৃহত্যাগ করবে ? তরুণীদের কথা এর সঙ্গে যুক্ত করা হোল না এই কারণেই যে একটি নারীকেও, এ আমি আমার চোখের 'দিব্য' খেয়ে বলতে পারি, আমার দেখা এই সত্তর বছরের সজ্ঞান জীবনে, দেখিনি যে তিনি আত্মসুখের জন্য ব্রত পালন করেছেন। তাঁদের মধ্যে কিছু ব্যতিক্রম থাকতেই পারে, কিন্তু সকলেই প্রায় কৈশোর কাল থেকে মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত পিতা, ভ্রাতা, স্বামী, পুত্র এমনকি বৃদ্ধ পুরুষ-আত্মীয়দের নিঃস্বার্থ সেবা করেই জীবন অতিবাহিত করেন। এই সেবাব্রতই তাঁদের সুখ। আমরা ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল, মেরি ব্রেকেনরিজ, ক্লারা বার্টন, মেরি এলিজা মাহোনি, মেরি সিকোল, ভার্জানিয়া অ্যাভেলন হেনডারসন প্রভৃতি বিশ্বের প্রাতঃস্মরণীয় শুশ্রুষাকারিণী (nurse)-দের নাম নিতে পারি, স্মরণে আনতে পারি মাদার টেরেসাদের মত অনাথ অনাথিনীদের মাতৃরূপিণীদের এবং ভগিনী নিবেদিতা, সারা বুল, মেরি ফ্রাঙ্কে, হেনরিয়েটা মুলার প্রভৃতির মত সেবাব্রতীদের কথা। এঁরা কি এমন 'সুখ' চেয়েছিলেন যে জীবন, যৌবন, অর্থ, বিলাস ও গৃহাভ্যন্তরের 'আরাম' --- সমস্তকিছু ত্যাগ করে অসুস্থ, যন্ত্রনাদগ্ধ, মৃত্যুপথযাত্রী মানুষ, অসহায়, অবোধ, অশিক্ষা-কুশিক্ষার অন্ধকারে নিমজ্জিত মানুষের মাঝখানে গিয়ে, তাদের দুঃসহ ব্যথার ও পীড়ার কষ্ট নিজের বলে বরণ করে নেওয়ার মধ্যেই কি তাঁরা সুখ খুঁজে পেয়েছিলেন ? এ কেমন সুখের সন্ধান ? এতো গেল কয়েকজন বিরল নারীর কথা। সাধারণ্যে আমরা কি দেখি ? প্রথমেই দেখি আমাদের মা'কে যিনি ভালোবাসার সুখ 'পেয়েছেন কি পাননি' -- সে বিচার না করে যখন থেকে গর্ভ ধারণ করেছেন তখন থেকেই তাঁর সুখ 'আমাকে' নিয়ে। দীর্ঘ ন' মাস, দশ মাস ধরে তাঁর দেহে আমি, দেহের নিত্য নিত্য 'অ-সুখের' বিড়ম্বনায় আমি, তাঁর স্বপ্নে-দুস্বপ্নে, আনন্দে-অবসাদে, আশায়-নৈরাশ্যে, স্বাদে-বিস্বাদে আমি। বিবমিষা, বমন, উপবাস, জাগরণ, ঘুমঘোর -- সবই আমারই জন্য। তারপর মৃত্যু যন্ত্রণার অধিক প্রসবযন্ত্রণা ! এরপর প্রসবোত্তর কালে 'আমি' নামক এই প্রাণীটির লালন পালন ও বছরের পর বছর পরিচর্যার সেবা দিয়ে একটি নবজীবন সৃজনের যে প্রাণপাত সাধনব্রত তারই মধ্যে জন্মদাত্রীর 'সুখ'। (এই জীবনাচরণের ব্যতিক্রম আছে এবং সে সবের কিছু উদাহরণ আলোচনার আরম্ভেই উপস্থাপনা করা হয়েছে)।
তাই, প্রথমেই আমি এই কথাটিই বলতে চেয়েছিলাম যে নারীজাতির জগতে সুখের সংজ্ঞা সম্পূর্ণ ভিন্ন, স্বতন্ত্র ও 'মহাজাগতিক'। এই 'মহাজাগতিক' শব্দটি 'জননীদের' ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করার বাসনা। কেননা 'প্রসবযন্ত্রণা'কে আমরা বলতে পারি বিশ্বজগতের সৃজন বেদনার সমতুল। বেদান্ত বলেন,
আদিতে 'প্রাণ'ই ছিল এবং সেই মহাপ্রাণ বা এক ও অদ্বিতীয় 'মহাচৈতন্য'---- অবয়বহীন নিরাকার এমন এক শক্তি যাঁর সন্ধান, স্বভাব, স্পন্দন---এক কথায় তাঁর অস্তিত্ব মানুষের জ্ঞানের ও বোধের বাইরের বিষয় ; কেননা এই যে দ্যুলোক-ভূলোক পরিব্যপ্ত মহাবিশ্ব, তার মধ্যেই আমরা যারা আছি তারা সমস্তটা না চোখ দিয়ে দেখতে পারবো, না মন-বুদ্ধি-অনুভূতি দিয়ে আত্মস্থ করতে পারব। শিশুর কাছে মাতৃগর্ভের অন্ধকার সম্পর্কে যেমন অজ্ঞতা থাকে, জীবের কাছেও তেমনি ব্রহ্মাণ্ডের 'কামারশালা' এবং ব্রহ্মাণ্ডের অন্তরে তার সৃজনক্রিয়া বিষয়টি চির-অজ্ঞাত। বেদান্ত ওই আদি, নিরাকার অজ্ঞাত শক্তিটিকে বলছেন 'ব্রহ্ম'।
কঠ উপনিষদে পুত্র ও শিষ্য ভৃগুকে পিতা (যিনি আচার্যও) ব্রহ্মের স্বরূপ সম্বন্ধে বলছেন,
যতো বা ইমানি ভূতানি জায়ন্তে যেন জাতানি জীবন্তি।
যৎ প্রয়ন্তাভিসংবিশন্তি তৎ বিজিজ্ঞাসস্ব তৎ 'ব্রহ্মেতি'।।
(তৈত্তিরীয় উপনিষদ)।
'যা' থেকে (এই 'যা' একটি অবয়বহীন ধারণা) থেকে এই বিশ্বের সমস্ত কিছুর (প্রাণ অপ্রাণ) উৎপত্তি, যা এই সমস্ত কিছুর আশ্রয়, যার মধ্যে সমস্ত কিছু অস্তিত্বযুক্ত থাকে, যার মধ্যেই সমস্ত কিছুর লয় হয় (তাঁকে জানতে চাও), তিনিই ব্রহ্ম। 'তাঁকে জানতে চাও' -এমন আদেশ দিলেই তো আর হবে না ; তাঁকে জানার উপায় কি ? তার উত্তরে ব্রহ্মবিদ্যা-অন্বেষু শিষ্যকে আচার্য বলছেন,
'তপস্যা ব্রহ্ম বিজিজ্ঞাসস্ব, তপোব্রহ্মেতি।।' তপস্যাকেই ব্রহ্ম বলা হোল।
কিন্তু বেদ-বেদান্ত উক্ত এই যে ব্রহ্মজিজ্ঞাসা তাতে তো না হয় 'তপস্যা' বা কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনার মধ্যে দিয়ে নিবিড়, একাগ্রতায় দীর্ঘজীবন সাধনার মাধ্যমে ব্রহ্ম নামক পরমাত্মার সঙ্গে জীবাত্মার মিলন হোল ; কিন্তু নিরাকার, নির্বিকার ব্রহ্ম বা পরমাত্মা বা চরাচর পরিব্যপ্ত 'মহাচৈতন্য' থেকে 'সৃষ্টি' নামক এই দৃশ্যমান, স্পর্শযোগ্য ভূতজগতের জন্মের বিষয়টিকে তো আমাদের জীবৎকালে অস্বীকার করা যায় না। এইখানেই ভারতীয় দর্শনের আরেকটি বিস্ময়। ভারতবর্ষে বেদ, বেদান্ত, পুরাণ, এমনকি সর্বোপনিষদের সার গীতায় ব্রহ্মতত্ত্বের (যা পরম পুরুষেরই কথা বলে), তার বাইরেও নিরীশ্বরবাদ, অনাত্মার ধারণার জন্ম, প্রচার ও প্রসার প্রায় সমান্তরালভাবে প্রবহমান ছিল এবং আছে। সেটি হোল পুরুষ-প্রকৃতি তত্ত্ব। যা 'তন্ত্র' সাধনার কথা বলে। তাঁদের দর্শনশাস্ত্রগত সিদ্ধান্ত এই যে বেদান্ত দর্শন যদি নির্বিকার পুরুষের কথা বলেও তবুও প্রকৃতির বা নারীসত্তাকে অস্বীকার করার অর্থ সৃষ্টিকেই অস্বীকার করা। আদি সাংখ্যদর্শন বা পরবর্তী কালের সমস্ত তান্ত্রিকদর্শনের, উপ-তান্ত্রিক দর্শনের (বৌদ্ধ, জৈমিনী, বশিষ্ঠ, কপিল, পুরস্কৃত, ভার্গব, ভৃগু , শুক্র, বৃহস্পতি) স্রষ্টাগণ প্রকৃতিকেই সৃষ্টির উৎসরূপে প্রতিপন্ন করেছেন। সাংখ্য দর্শনের ভাষ্যেকার গৌড়পাদ 'সাংখ্যকারিকা'-য় লিখেছেন,
"যথা স্ত্রী-পুরুষ সংযোগাৎ সুতোৎপত্তিঃ তথা প্রধান পুরুষ সংযোগাৎ সর্গস্যোৎপত্তিঃ।।"
নারী ও পুরুষের সংযোগে যেমন সন্তানের জন্ম হয়, ঠিক তেমনি প্রধান পুরুষের (সঙ্গে প্রকৃতির) সংযোগের ফলে এই সৃষ্টির উৎপত্তি সম্ভাবিত হয়েছে। এই যদি শেষ মীমাংসা হয় তবে যে 'ব্রহ্মময়ী' এই বিশ্বচরাচরের জন্ম দিলেন, তাঁর 'শূন্যের' (নাগার্জুনের শূন্যতা), গর্ভ হতে প্রসব করার যন্ত্রনা আর এই মাটির পৃথিবীতে এক জননীর প্রসবযন্ত্রণার মধ্যে পার্থক্য কোথায় ?
"রূপহীন জ্ঞানাতীত ভীষণা শকতি
ধরেছে আমার কাছে জননীমৃরতি।।"
'জন্ম'-- রবীন্দ্রনাথ।
মাটির পৃথিবীতে জন্মদাত্রী মাতাই ওই 'রূপহীন জ্ঞানাতীত' বিশ্বজননীর মূর্ত মুর্তি। মরণযন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে আর্ত ক্রন্দন-ক্লিষ্ট সংসারের আঁতুর ঘরে সদ্যপ্রসবিনী জননী যখন তাঁর সৃষ্টির মুখ অবলোকন করেন তখন সেই বেদনাসিন্ধুমন্থনসঞ্জাত সৃষ্টির আনন্দই তাঁর সুখ।
এই যে দর্শনশাস্ত্রগত সুখের কথা হোল সেটি ধারণা করা আমাদের মতো সাধারণ পুরুষ মানুষের পক্ষে দুরূহই শুধু নয়, সম্পূর্ণ দুর্বোধ্য। বোধ্য হয়ে ওঠে একমাত্র জন্মদাত্রীর জন্মদান করবার সেই মুহূর্তটিতে যখন তিনি প্রাণান্তকর যন্ত্রণার ভিতর, মুহ্যমান নেত্রপাতে তাঁর সৃষ্টিকে অবলোকন করেন। এইখানে এই সত্যটি প্রতিষ্ঠা পায় যে 'দুঃসহ বেদনার তপস্যায়' সৃষ্টির আনন্দেই নিহিত রয়েছে চিরকালের সুখ। বেদান্তের এমন একটি ধারণাকে ধারণ করতে পারলেই দুঃখময় জগতে সুখের উপলব্ধি সম্ভব, অন্যথায় জীবের জীবন যেখানে অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুর ভয়ে নিরন্তর ভীত, সন্ত্রস্ত সেখানে সুখী হবার উপায় কোথায় ? 'ভোগবাদী' চিন্তায় এক ধরণের সুখানুভূতি আছে। তাই 'ভোগবাদ' এক ধরনের দর্শনে পরিণত হয়েছে। ধনসম্পদ আহরণ কর, ভোগ কর, ইন্দ্রিয়ের সকল কামনাগুলিকে পরিতৃপ্ত করার চেষ্টা কর। এবং সেই প্রয়াসের জন্য সৎ-অসৎ, শুভ-অশুভ, ন্যায়-অন্যায় বিচার বিসর্জন দিয়ে, পৃথিবীর ভূমিকে, মানবসমাজকে শাসনে, শোষণে নিষ্পিষ্ট নিপীড়িত করে সুখী হবার নিরন্তর প্রচেষ্টা তাই ভোগবাদী সুখ। এই সুখ আত্মসর্বস্ব, স্বার্থপরতায় সংকীর্ণ। এমন সুখ ক্ষণস্থায়ী কিন্তু মাদকতায় তীব্র। অপরিত্যজ্য এবং এই 'সুখের' হঠাৎ বিদায় বা সমাপ্তি অসহনীয় যন্ত্রণাদায়ক। তাই অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে মানুষের মনে হয়েছে, এই শিক্ষা লাভ করেছে মানুষ যে ব্যক্তিক সুখের সামগ্রী, উপাদান ও উৎস ভাগ নেওয়ার মধ্যেই সুখে বৃদ্ধি। অন্যকে সুখ দান করলেই নিজের সুখ গাঢ় হয়ে ওঠে। ঠিক এই কারণেই মানুষের সমাজে, সামাজিক, পারিবারিক ও জাতীয় অনুষ্ঠানে এত আমন্ত্রণ নিয়ন্ত্রণ ও উৎসবের আয়োজন ও আপ্যায়ন।
ইন্দ্রিয় ভোগের জীবন সীমিত ও ক্ষণিক। বিষয়-বৈভব সংক্রান্ত শিক্ষার উদ্দেশ্য এক সীমিত জীবনাচরণ। কিন্তু প্রকৃত শিক্ষা গভীর অর্থবাহী যা মানব নামক প্রাণকে এক অনন্ত সত্ত্বার অনুভূতি দেয়। সকল প্রাণের সঙ্গে মিলনের যে আনন্দ তারই ভিতরে আছে আপন 'অনন্তসত্ত্বার' উপলব্ধি। এটি এমন এক আত্মসচেতনতা যা মানুষকে আপন ক্ষুদ্রতা, তুচ্ছতা, ক্ষণিকতা থেকে মুক্ত করে' অস্তিত্বের অসীমতার দিকে নিয়ে যায়। বেদান্ত বলেন সংসারের সীমিত স্বার্থপরতার গণ্ডিকে অতিক্রম করাই মানুষের সংস্কারগত মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।
"যো বৈ ভূমা তৎ সুখম্ না অল্পে সুখমস্তি।
ভূমৈব সুখম্ ভূমাত্বেব বিজিজ্ঞাসিতব্যম্।।"
------ ছান্দোগ্য উপনিষদ।
অনেকের মধ্যে, বিরাট জগতের মধ্যে নিজেকে যুক্ত করতে পারলে, নিজেকে ছড়িয়ে দিতে পারলে এমন এক মুক্তির স্বাদ পাওয়া যায় যা হারিয়ে যাওয়া থেকে, মৃত্যুভয় থেকে, নিজের অন্তরের ও বাহিরের ক্ষয় ক্ষতির আফশোস থেকে আলাদা। সেই স্বাদ স্বস্তি ও সান্ত্বনার অনুভূতি এবং তাইই প্রকৃত অর্থে সুখ। কবির কথায়,
"আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া।"
বেঁচে থাকার একমাত্র উদ্দেশ্য (কিছু ব্যতিক্রম থাকলেও সত্য) প্রতিটি মুহূর্তে সুখের সন্ধান এবং এই সুখের পথে যা কিছু অন্তরায় সেগুলিকে হয় উপেক্ষা করা, নয় দূরে সরিয়ে রাখতে চাওয়া। কিন্তু জীবনের অভিজ্ঞতায়, তাও জ্ঞানত ষাট বছরের অভিজ্ঞতায়, দেখেছি সুখের প্রতিকূল বিষয়, সুখের বিরুদ্ধ ঘটনাপরম্পরাকে, অপ্রত্যাশিত প্রাকৃতিক ও ভৌতিক বিপর্যয় সমূহকে ঠেকিয়ে রাখা যায় না। সেসব অনিবার্য ও অনুপেক্ষণীয়। তার পরেও আছে স্বকৃত অপরাধের জন্য আত্মগ্লানি। এই অনুতাপ ও সন্তাপ-সম্ভূত আত্মগ্লানিই 'অসুখের' মর্মবিদারী কারণগুলির অন্যতম।
এ প্রসঙ্গে একটি গল্প নয়, স্বচক্ষে দেখা একটি জীবনের কথা বলি,
(ক্রমশঃ)
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২৮/০২/২০২৬
কলকাতা।
___________________________________
বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
মৃত্যু সত্য, জগৎ মিথ্যা -- উপসংহার
মৃত্যু সত্য জগৎ মিথ্যা (উপসংহার)
ধর্মমত অসংখ্য (লোকায়ত ধর্মমতগুলি নিয়ে), ধর্মপথও বিচিত্র ও বহু দিকে সে-সকল পথের বিস্তার। বিভিন্ন ধর্মধরণার ধর্মপ্রবক্তারা অবতীর্ণ হয়েছেন, তাঁদের মত প্রকাশ করেছেন এবং সেই মতের প্রচারক গুরুদের আবির্ভাব ঘটেছে। তাঁরা পরম্পরাগতভাবে তাঁদের ধর্মীয় নীতি, ধর্মপালনের রীতি কখনো স্মৃতিগ্রন্থ আকারে, কখনো স্মৃতিশাস্ত্ররূপে লিখিতভাবে প্রকাশিত হয়েছে। ধর্মপ্রাণ মানুষ নিজ নিজ ইচ্ছায়, বা ধর্মমতগুলির আদর্শের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে, ভিন্ন ভিন্ন ধর্মে দীক্ষা নেন এবং ধর্মপালন করেন।
ধর্ম যেমন মানুষের জীবনযাপন, জীবনাচরণের ধারা ও ধারণাকে প্রভাবিত করে, নিয়ন্ত্রণ করে, তেমনি মানুষের সমাজকে নীতিবোধ, বিচার, ও শৃঙ্খলার বন্ধনে আবদ্ধ করে রাখে। এমনটিই ধর্মাদর্শের মূল কথা। কিন্তু ইতিহাস বলে তেমনটি হয় না, হয় নি ; কেননা আপন ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার দুর্বার কামনায়, ধর্মান্তরিত করার অদম্য আগ্রহে অন্য ধর্মের উপর, অন্য ধর্মাবলম্বীদের উপর আক্রমণ, নির্যাতন করা, এমনকি তাদের বিধর্মী চিহ্নিত করে হত্যা করার অজস্র ঘটনা সংঘটিত হয়েছে, হয়ে আসছে, বিশেষ করে, প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মগুলির প্রবর্তনার সময়কাল থেকেই।
(এ-প্রসঙ্গে আমার 'বিন্দুতে সিন্ধু দর্শন' -প্রথম খণ্ডে দীর্ঘ প্রবন্ধ আছে)।
ধর্মমতগুলি, বিশেষতঃ 'অস্তিবাদী' ধর্মমতগুলি একটি ভয়ঙ্কর প্রলোভন দেখিয়ে, মানুষকে তার আত্মচেতনা থেকে উৎপাটিত করে, কাল্পনিক এক স্বর্গীয় জগতের কামনায় উন্মাদ করে দেয়। সে যে পৃথিবীতে আছে, যে সমাজে আছে, যে পার্থিব জীবনের বন্ধনে বাঁধা আছে -- সেই বাস্তব, প্রাণময় সংসার থেকে তাকে নির্বাসিত করে দেয়। হয় সে জীবনের অবশ্যম্ভাবী ত্রিতাপ (আধিদৈবিক, আধিভৌতিক ও আধ্যাত্মিক) দুঃখ থেকে মুক্তি পেতে চায়, নইলে দেবতাদের চিরসুখের আশ্রয়) স্বর্গলাভের বাসনায় কৃচ্ছ্রসাধনায় দেহ-মন সমর্পণ করে।
শ্রীমদ্ভগবদগীতা এবং উপনিষদের আলোচনাকালে এই বিষয়সমূহের উপর আলোকপাত করা হয়েছে। সেখানে আমরা দেখেছি একমাত্র প্রাচীন ভারতীয় ধর্মধারণার মধ্যেই সত্যের যথার্থ অন্বেষণ করা হয়েছে। মানবচিন্তনের আদিতম প্রকাশ বেদসংহিতা ও পরবর্তী কালে ব্রাহ্মণসংহিতা, এক এবং একমাত্র 'ঈশ্বরের' মূর্ত মূর্তির কথা বলেন নি ; প্রজাপতি, সবিতা (সূর্য) ইন্দ্র, বরুণ, মিত্র, মরুৎ, অশ্বিনীকুমারদ্বয় প্রভৃতি বহু দেবতার উল্লেখ থাকলেও মহর্ষি যাস্ক বললেন বেদের দেবতাগণ এক সর্বব্যাপী পরমাত্মার ভিন্ন ভিন্ন রূপ। এবং এই দেবতাবিষয়ক ধারণার সংহত রূপ আমরা পেলাম বেদান্ত বা উপনিষদগুলির মধ্যে। এই চরাচরব্যপ্ত পরমাত্মা 'ব্রহ্মরূপে' আলোচিত হয়েছেন। তিনিই স্রষ্টা, তাঁর মধ্যেই সৃষ্টির অস্তিত্ব এবং তেনাতেই সৃষ্টির বিনাশ। এই ব্রহ্মের ধারণা প্রাচীন ভারতীয় ধর্মধারণার ও ধর্মদর্শনের মূল ভাব ও ভাবনায় গভীরভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে এবং আজও তা শুধু প্রাচ্যভূমিতে নয়, পাশ্চাত্য দেশের দার্শনিক মতবাদগুলিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। প্রাচীন ভারতীয় ধর্মদর্শনে এই ব্রহ্মই পরম চৈতন্যসত্ত্বা। ব্রহ্ম বা চৈতন্যসত্ত্বা অনাদি, অনন্ত, অক্ষয়, অব্যয়, অব্যক্ত অনির্বচনীয় এক অস্তিত্ব যিনি নির্বিকার। তাঁরই 'ইচ্ছা' এই সৃষ্টি। এই সৃষ্টির মধ্যে ওই পরমচৈতন্যের আলো আমার, অর্থাৎ ব্যক্তিপ্রাণের মধ্যেও বিদ্যমান। তাই 'বেদান্ত' প্রমাণ করেছেন যে সেই মর্ত্যলোক-অমর্ত্যলোক পরিব্যাপ্ত পরমচৈতন্যের লীলা যদি অনুভব ও অনুধাবন করা যায় তবে এই জ্ঞানে স্থিতিলাভ করা যায় যে 'আমি'ও এই সৃষ্টির একটি সম্বিৎ-কণা, একমাত্র তখনই মৃত্যুভয় থেকে 'মুক্তি' সম্ভব। এই 'মুক্তি' শোক-সন্তাপ-বিষাদ-বিহীন এক অসীম আনন্দলোক। ব্রহ্মই আনন্দস্বরূপ পূর্ণসত্ত্বা। তার থেকেই বিশ্বচরাচর, সমস্ত দৃশ্যমান, অদৃশ্য ভূতূসত্ত্বার আগমন এবং তাঁর কাছেই প্রত্যাগমন।
"যতো ইমানি ভূতানি জায়ন্তে যেন যাতানি জীবন্তি।
তৎ প্রয়ন্তাভিসংবিশন্তি তৎ বিজিজ্ঞাসস্ব তৎ ব্রহ্মেতি।।"
-- তৈত্তেরীয় উপনিষদ - ৩/১
যাঁ থেকে এই অখিল বস্তুসমূহ ও ভূতবর্গ উৎপন্ন হয়েছে, উৎপন্ন হয়ে যাঁর আশ্রয়ে বেঁচে আছে, শেষে যাঁর পূর্ণসত্ত্বায় বিলীন হয় --- তাঁকেই জানতে হবে। তিনিই ব্রহ্ম।
সৃষ্টির কণামাত্র যদি তাঁর কাছ থেকে এসে তাঁতেই লয় প্রাপ্ত হয় তবে মৃত্যুর ধারণার মধ্যে কোনো সত্য নেই। এই ধারণাকে ধারণ করলে তো নিখিল জগতে, বিশ্বমানব-সমাজে কোন দ্বিমত, কোন দ্বন্দ্ব থাকে না।
জীবাত্মা চির শাশ্বত পরমাত্মার অংশ।
"অসূর্যা নাম যে লোকা অন্ধে তমসাবৃতাঃ।
তাংস্তে প্রেত্যাভিগচ্ছন্তি যে কে চাত্মহনো জনাঃ।।"
--- ঈশা উপনিষদ-- মন্ত্র ৩।
এই মন্ত্রে অতি সাংকেতিক ভাষায় এক গভীর দার্শনিক সত্য প্রকাশিত হয়েছে। নিজের দেবত্ব ( পরমাত্মা বা ব্রহ্মের অংশ) অচেতন হয়ে জীবনযাপন করলে সে জীবন নিতান্তই তুচ্ছ হয়ে যায়, অন্ধকারে নিমজ্জিত দুঃখময়, যন্ত্রনাক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। এই মন্ত্রে যে অন্ধকারের কথা বলা হয়েছে, তা জীবনদর্শনের অন্ধকার, অজ্ঞানতার অন্ধকার এবং আত্মচেতনাহীনতার অন্ধকার। পুরাণ কাহিনীত যে নরক (অসুরদের আবাসস্থল)-এর কথা বলা হয়েছে, যে স্থান 'অসূর্যা' --সূর্যরস্মিবিহীন, আত্মসচেতনতাহীন, ইন্দ্রিয়সর্বস্ব মানুষ, সেই স্বরচিত নরকে বাস করে' মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করে।
তাই উপনিষদ বলছেন চৈতন্যহীনতাই মৃত্যু, চৈতন্যলাভ করাই মৃত্যুহীন অস্তিত্বের বোধ ও সংবিদ্।
বর্তমান যুগের যুগপুরুষ, 'সর্বধর্মসমন্বয়ের' বাণী যাঁর শ্রীমুখনিঃসৃত, 'যত মত তত পথে'র যিনি প্রবক্তা, যিনি মাতৃসাধক ও মানবতার পূজারী তিনি তাঁর শিষ্যদের ও ভক্তদের (কল্পতরুরূপে) এই বলে আশীর্বাদ করেছিলেন,
"তোমাদের চৈতন্য হোক্।"
'চৈতন্যসাধনাই' মানবধর্মের শেষ কথা, জ্ঞানের পূর্ণ, জ্যোতির্ময় প্রকাশ। এই জ্ঞানের আলোকবর্তিকা মৃত্যুভীতির বিভীষিকাময় অন্ধকার থেকে মুক্তি দিয়ে এক মৃত্যুহীন আলোকিত জগতের কামনা জাগিয়ে তোলে। 'স্বর্গ' লাভের জন্য অপরকে হত্যা বা পাপাচারসঞ্জাত সন্তাপে আত্মহননের প্রবৃত্তি থেকে মুক্ত করে। বিশ্বাত্মার সঙ্গে একাত্মতার অনুভবে মানুষ মৃত্যুঞ্জয়ী হতে পারে। দেহ থাকে না ; কিন্তু দেহাতীত সত্ত্বা থেকে যায়। নইলে প্রাণের চিরবহমান ধারা স্তব্ধ হয়ে যেত।
"ওঁ আসতো মা সদ্গময়
তমসো মা জ্যোতর্গময়
মৃত্যোর্মা অমৃতং সময়।।"
ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ হি।।
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়।
১৯/০২/২০২৬
কলকাতা।
________________________________________
রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
মৃত্যু সত্য, জগৎ মিথ্যা-পর্ব ৪
মৃত্যু সত্য, জগৎ মিথ্যা -- পর্ব ৪
সাহিত্যের পাতা থেকে ইতিহাসের পাতা ছুঁয়ে বর্তমান খবরের কাগজে আসি, খবরের বিভিন্ন মাধ্যমে আসি। 'মানুষের ইতিহাস মানুষের রক্তে ভেজা' -- এই প্রবাদবাক্যটি ধ্রুব সত্যরূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। ইতিহাস পাঠের প্রথম অধ্যায় থেকেই 'যুদ্ধ' নামক ঘটনার সঙ্গে আমরা পরিচিত। পুরাণ কাহিনী, মহাকাব্যগুলিতেও যুদ্ধের, বীরত্বের, মারণাস্ত্রের এমনকি প্রাণদানের, মৃত্যুবরণেরও মহিমাকীর্তন। রামায়ণ, মহাভারত ইলিয়াড, ওডিসি, এনিড (ভার্জিল), জেরুজালেম লিবারেতা (টর্কাতো তাসো) প্রভৃতি মহাকাব্যের মূল বিষয়বস্তু যুদ্ধ। পাশ্চাত্যের গ্রীক, রোমান, পারসিক সভ্যতাগুলির পত্তন ঘটেছে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে, পতনও হয়েছে হয় অন্তর্দ্বন্দ্বে, নয় বহিরাক্রমনে। তারপর মধ্যযুগে বর্বরদের ইতিহাস। ইউরোপখণ্ডের ভিজিগোথ, অস্ট্রোগোথ, ফ্রাঙ্ক, ভ্যান্ডাল, লোম্বার্ড, ভাইকিং প্রভৃতি জার্মানিক ও যাযাবর গোষ্ঠীগুলির অভিযান, রোম সাম্রাজ্যের নগরে নগরে, জনপদে জনপদে কত যে রক্তনদীর প্লাবন বইয়েছিল তার হিসাব মহাকালও সম্যক দিয়ে যেতে পারেননি। ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে ওসমানী সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদের আক্রমণে পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপোলের পতনের মধ্যে দিয়ে ১৫০০ বছরের রোম সাম্রাজ্যের পতন সম্পূর্ণ হোল। সেই আক্রমণে, সেই অবরোধে যে রক্তপ্লাবন ঘটেছিল তা ইতিহাসের বিরলতম একটি নরসংহারের উদাহরণ। কিন্তু শেষ হয়নি মনুষ্যত্ববোধের শোণিতক্ষরণ। দু'শবছর ধরে চলেছে রক্তলাঞ্ছিত ধর্মযুদ্ধ (Crusade)। দেশে দেশে যুদ্ধ ছাড়াও এসেছে বিপ্লব, বিদ্রোহ। ফরাসী বিপ্লবে হত্যালীলা এক অদ্ভুত শিল্পে (গিলোটিন) পরিণত হয়ে গেল এবং পরবর্তীতে তারই প্রভাব পড়েছিল রাশিয়ার কম্যুনিস্ট (বলশেভিক) আন্দোলনে, চীনদেশের গণবিদ্রোহে। রাজপরিবার, সামন্তপ্রভু, রাজন্যবর্গ ও ভূমধ্যকারী, জমিদারদের নির্মম নিধনের বিধান ছিল সে সকল বিপ্লবের 'আদর্শের' মূল মন্ত্র। মধ্যযুগ পেরিয়ে এসেছিল নবজাগরণ, এসেছে জ্ঞান-বিজ্ঞান-ঋদ্ধ আধুনিক যুগ। কিন্তু মানবিকতার অপমৃত্যু বিরামহীন ! বিংশ শতাব্দীর দুটি দুটি বিশ্বযুদ্ধ দেখিয়ে দিয়ে গেল মানব সভ্যতার অন্তরে বাসকরা সভ্যতাবিরোধী 'শয়তানদের' মানসিকতার কুৎসিত বীভৎসতার রূপ। মানুষের পরম জ্ঞানের, বিস্ময়কর বিজ্ঞানের কর্ষিত ফল কতখানি বিষময় হতে পারে, সৃষ্টি করতে পারে মৃত্যুগহ্বর গ্যাসচেম্বার, সৃষ্টি করতে পারে মর্ত্যলোকে জাহান্নামের 'ইনফারনো' -- অনির্বাণ অগ্নিকুণ্ড, যেখানে পুড়িয়ে ফেলা যায় প্রাণচঞ্চল আস্ত নগর, নগরী।
"The mind in its own place, and in itself,
Can make a Heaven of Hell, and a Hell of Heaven."
---- 'Paradise Lost' -- Milton.
এবার যদি এই প্রাচী ধরিত্রীর কথায় আসি তবে এই ভারতবর্ষের বুকে যুগে যুগে সংঘটিত হয়েছে বহিরাক্রমনের ধ্বংসলীলা, মৃত্যুর তাণ্ডব। প্রাচীনকালে পারসিকদের আক্রমণ ; তারপর ক্রমান্বয়ে এসেছে আলেকজান্ডার, শক, পহ্লব, কুষাণ, মুহাম্মদ বিন কাসিম, সুলতান মাহমুদ। এরপর এসেছে পাঠান, মোগল এবং ইংরেজ - যাদের ভারত বিজয় অভিযান শোণিতসিক্ত পথ ধরে হলেও তারা এই উপমহাদেশেই সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ভারতের জাতিসত্ত্বায়, সামাজিকতায়, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে সম্পৃক্ত হয়ে গিয়েছিল এবং এখনও একাত্ম হয়েই রয়েছে। কিন্তু সে-সকল শক্তির হত্যাকাণ্ডের ইতিবৃত্ত 'মানবসভ্যতার' বিজয়গাথার জয়ধ্বনি নয় -- হিংসার, ধর্মান্ধতার নিষ্ঠুর আস্ফালন আর, সর্বোপরি মানবতার পরাভবের, বিষাদময় ট্র্যাজেডি।
কিন্তু এই যে ধ্বংসলীলা, নরমেধ যজ্ঞানুষ্ঠান-- তাই কি সভ্যতার শেষ কথা ?
".. বিজয়রথের চাকা
উড়ায়েছে ধূলিজাল, উড়িয়াছে বিজয়পতাকা।
শূন্যপথে চাই,
আজ তার কোনো চিহ্ন নাই।"
........................................
.........................................
রাজছত্র ভেঙে পড়ে ; রণডঙ্কা শব্দ নাহি তোলে ;
জয়স্তম্ভ মূঢ়সম অর্থ তার ভোলে ;
রক্তমাখা অস্ত্রহাতে যত রক্ত-আঁখি
শিশুপাঠ্য কাহিনীতে রহে মুখ ঢাকি।"
এই কবিতাটিতে তিনি, তাঁর আজীবন-লালিত আশাবাদী বিশ্বাসের কথাও বলেছেন। বলেছেন ধ্বংসযজ্ঞের হোতারাই চিরবহমান, চিরপ্রাণবান, সৃষ্টিশীল এক বিপুল বিরাট মৃত্যুহীন মানবসমাজের, মানবসত্ত্বার ভাগ্য নির্ধারণ করে না। এই মানবসত্ত্বা জন্মের পর জন্মের মধ্য দিয়ে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ঐ নরসংহারের 'চিতাভস্ম'পরে', রাজ্য-সাম্রাজ্যের ধ্বংসস্তূপের ভিত্তির মূলে প্রোথিত করে, উন্মোচিত করে নব নব সৃজনের বিজয় কেতন।
"দুঃখ সুখ দিবস রজনী
মন্দ্রিত করিয়া তোলে জীবনের মহামন্ত্রধ্বনি।
শত শত সাম্রাজ্যের ভগ্নশেষ-'পরে
ওরা কাজ করে।"
তবু 'ওরা'ই যে মরে-- এ কথা তো মিথ্যা নয়। ওরাই তো নরমেধ যজ্ঞকুণ্ডের আহুতি, উৎসর্গীকৃত বলি। মারি, মড়ক, বন্যায় -- দাঙ্গায়, মন্বন্তরে, বিদ্রোহ-বিপ্লবে, ক্রান্তিকালের উপপ্লবে গ্রাম-গঞ্জ-নগর-শহর যখন শ্মশান হয়ে যায়, যখন কালান্তক যুদ্ধের শেষে বিজয়ীদের তাণ্ডবে, লুণ্ঠনে, নির্বিচার হত্যায়, নারীধর্ষণে জনপদের পর জনপদ জীবন্ত নরকে পরিণত হয় তখন সেই নরকাগ্নিতে পুড়ে মরে 'ওরা'।
"১১৭৬ সালে গ্রীষ্মকালে একদিন পদচিহ্ন গ্রামে রৌদ্রের উত্তাপ বড় প্রবল। গ্রাম খানি গৃহময় কিন্তু লোক দেখি না। ...... .... ...... ............
আজ হাটবার, হাটে হাট লাগে নাই। ভিক্ষার দিন, পথে ভিক্ষুকেরা বাহির হয় নাই। তন্তুবায় তাঁত বন্ধ করিয়া গৃহপ্রান্তে পড়িয়া কাঁদিতেছে। ব্যবসায়ী ব্যবসা ভুলিয়া শিশুক্রোড়ে করিয়া কাঁদিতেছে। দাতারা দান বন্ধ করিয়াছে। অধ্যাপক টোল বন্ধ করিয়াছে, শিশুও বুঝি আর সাহস করিয়া কাঁদে না। রাজপথে লোক দেখি না, সরোবরে স্নাতক দেখি না, গৃহদ্বারে মনুষ্য দেখি না, বৃক্ষে পক্ষী দেখি না, গোচারণে গরু দেখি না, কেবল শ্মশানে শৃগাল কুক্কুর।"
--- 'আনন্দমঠ' বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।
আমাদের এই হতভাগ্য বাঙলাদেশ এমন অগুন্তি আধিদৈবিক, আধিভৌতিক নারকীয় বিপর্যয়ের সাক্ষী হয়ে আছে। তুর্কী আক্রমণ, বর্গি-হাঙ্গামা, ছিয়াত্তরের মন্বন্তর, বিগত শতকের ৪৬-এর দাঙ্গা, পঞ্চাশের, ষাটের দুর্ভিক্ষ ! কোটি মানুষের অকাল মৃত্যু ঘটেছে, লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত, ঠিকানাহীন হয়েছে, শিশুপ্রাণ ঝরে পড়েছে পথে পথে, নারীদের লুণ্ঠিত হয়েছে নারীত্বের সম্ভ্রম। 'যা গেছে তা গেছে চলে', রেখে গিয়েছে বিষাদবিধুর স্মৃতি।
তাও কি সম্বিৎ ফিরেছে আমাদের ? এখনো মানবতাহীন, ক্ষমতালিপ্সু রাজনীতি, সেই 'নীতি'র অভ্যন্তরে সিঁধেল চোরের মত ঢুকে পড়ে ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা, শ্রেণীবৈষম্যের ছায়া ছায়া ঘাতকের মায়াময় মূর্তি, যাদের দেখা যায় কিন্তু একটি সমাজের, এমনকি একটি দেশের সর্বনাশের আগে চেনা যায় না। মিত্রতা নয়, ভ্রাতৃত্বের বন্ধন নয়, অভিন্ন-আত্মা একত্বের সাধনা নয়, উদার মানবতাবাদের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে রাষ্ট্রতন্ত্র, সমগ্র বিশ্বজুড়ে, নির্দয় রাষ্ট্রযন্ত্ররূপে নিষ্পেষণ করে চলেছে দুর্বল, অসহায়, নিরাশ্রয় এক বিপুল সংখ্যক 'গণদেবতাকে' যাঁরা মানবসভ্যতার স্থপতি, রক্ষক ও প্রতিপালক। তাঁদের কর্মসাধনার স্বীকৃতি নেই, পৃথিবীর প্রতি ভালোবাসার মূল্য নেই, প্রাণের প্রতি প্রেমের চরিতার্থতা নেই। অনাদ্যন্ত কাল তাঁদেরই মৃত্যু সংবাদে ভারি হয়ে থাকে ইতিহাস, নিত্য নিত্য তাঁদেরই সংবাদে খোরাক ও খোরাকি জুটিয়ে নেয় সংবাদের মাধ্যমগুলি -- নিরুপায় ঔদাসীন্যের দীর্ঘশ্বাসে নিস্তব্ধ হয়ে যায় অক্ষম, জরাতুর, বৃদ্ধ মানবতা---- 'বুদ্ধ তথাগত।' আসন্ন অকালমৃত্যুর দুঃস্বপ্ন নিয়ে জীবনের প্রতি হতাশ কবি লেখেন,
"... Of the wide world l stand alone, and think
Till love and fame to nothingness do sink."
'The terror of death',--- Keats.
বাঁচবার সান্ত্বনা কোথায়। 'সভ্যতার সংকট' যেমন ছিল তেমনি আছে -- নির্দয়, নির্মম, নিষ্ঠুর, অপরিবর্তণীয়। মানুষ যখন মানুষের মৃত্যুর কারণ, তখন এই সত্যই প্রতিষ্ঠা লাভ করে,
'Death conquers all, death consumes all, death ends all.'
মৃত্যু সত্য, জগৎ মিথ্যা।
এতক্ষণ আমাদের আলোচনার অভিমুখ ছিল একমুখী। সৃষ্টি যাই হোক্ --- যা হয়েছিল, হয়েছে বা হবে -- সে সমস্তই বিনাশের অন্ধকারে লীন হবে একদিন। আজ যা সৃষ্টি হয়েছে, আজ যার জন্য হোল তা পিছনে দাঁড়িয়ে রয়েছে বিনাশের, মরণের ছায়া। ধরণীর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণকণা থেকে ওই সুদূরের নীহারিকামণ্ডল, আলোকমন্দাকিনী 'ছায়াপথ' -- তাদের সকলের অন্তিম গতি নাকি 'এক' --নিশ্চত বিদায়। তাহলে এই অসীম সৃষ্টির কি কোন মূল্য নেই ? এই জগৎসংসার জুড়ে যে অনন্ত, বিচিত্র আয়োজন -- সে কি নিছকই নিরর্থক ? যা ব্যক্ত হয়ে জগৎ ও প্রাণ ব্যাপ্ত করে আছে, তা আবারও অব্যক্ত (শূন্য) হয়ে যাবে ? সেই অব্যক্ত বা 'শূন্য' কি ? সেই শূন্য যদি সৃষ্টির উৎস, যুগপৎ অন্ত হয় তবে, এই মুহূর্তের 'আমি' ও 'আমার ভূবন' থাকি বা না-থাকে তাতে কী বা এসে যায় ?
"অব্যক্তাদীনি ভূতানি ব্যক্তমধ্যানি ভারত।
অব্যক্তনিধনান্যেব তত্র কাজ পরিদেবনা।।"
--- শ্রীগীতা।
"বৃথা এ ক্রন্দন
বৃথা এ অনলভরা দুরন্ত বাসনা।"
---- রবীন্দ্রনাথ।
কিন্তু 'পরিদেবনা' -- 'অনলভরা দুরন্ত বাসনার'র জন্যই তো জীবন। বৃথা জেনেও বাসনার মোহ এমনই সর্বনাশা যে তার জন্যই প্রয়োজন হয়েছে 'ঈশ্বর' নামক এক অদৃশ্য সত্ত্বার আরাধনা। মরে যাব জানি, তবে মরার পরেও আমার অপূর্ণ বাসনা, অতৃপ্ত কামনার তৃপ্তি চাই। 'ঈশ্বর' সেই অপূর্ণতার, সেই অতৃপ্তির প্রয়োজন মিটিয়ে দিতে পারেন বলেই ঈশ্বর আরাধনার নানা পথ, নানা মতের উদ্ভব হয়েছে -- এগুলিই 'ধর্মমত' এবং 'ধর্মপথ'। ধর্মমত অসংখ্য (লোকায়ত ধর্মমতগুলি নিয়ে) ও বিচিত্র। ধর্মের পথও বহুদিশারী।
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১৭/০২/২০২৬
কলকাতা।
___________________________________________
রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
মৃত্যু সত্য, জগৎ মিথ্যা-- পর্ব ৩
মৃত্যু সত্য, জগৎ মিথ্যা - পর্ব ৩
"শুধু দেবদাসের জন্য বড় কষ্ট হয়, তোমরা যে-কেহ এ কাহিনী পড়িবে, হয়তো আমাদেরই মত দুঃখ পাইবে। তবু যদি কখনও দেবদাসের মত এমন হতভাগ্য, অসংযমী পাপিষ্ঠের সহিত পরিচয় ঘটে, তাহার জন্য একটু প্রার্থনা করিও। প্রার্থনা করিও, আর যাহাই হোউক, যেন তাহার মত এমন করিয়া কাহারও মৃত্যু না ঘটে। মরণে ক্ষতি নাই, কিন্তু সে সময়ে যেন একটি স্নেহকরস্পর্শ তাহার ললাটে পোঁছে --- যেন একটিও করুণার্দ্র স্নেহময় মুখ দেখিতে দেখিতে এ জীবনের অন্ত হয়। মরিবার সময় যেন কাহারও এক ফোঁটা চোখের জল দেখিয়া সে মরিতে পারে।"
দেবদাসের জন্য 'না হয় দুই ফোঁটা' কেন সহস্র সহস্র চোখের জলধারা এতকাল ধরে ঝরেছে, আগত, অনাগত কালেও ঝরবে, আসমুদ্র হিমাচলে তো বটেই, সাগরপারেরও অসংখ্য দেশেও ঝরে। কিন্তু 'পারু'র --- পার্বতীর জন্য রইল কি ?
ওই যে লেখক, তাঁর নায়ক 'অসংযমী পাপিষ্ঠের' স্মরণসভায় শেষ বাণী পাঠ করবার আগে, শোকার্তা, সংজ্ঞাহারা পারুকে ঘরে থুয়ে এলেন --- "তাহার পর দাসী-চাকর মিলিয়া ধরাধরি করিয়া পার্বতীর মূর্ছিত দেহ টানিয়া আনিয়া বাটীর ভিতর লইয়া গেল। পরদিন তাহার মূর্ছাভঙ্গ হইল, কিন্তু সে কোন কথা কহিল না। একজন দাসীকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিল, রাত্রিতে এসেছিলেন না ? সমস্ত রাত্রি !"
কিন্তু পাঠকের প্রশ্ন, এই একটি 'সমস্ত রাত্রি' কি 'পারু'র আকৈশোর দগ্ধপ্রেম বহ্নিশিখার শেষ আরতি, না-কি বাকি জীবনের মর্মবিদারী দুঃস্বপ্ন ? সে কথা তো 'নারীর মূল্য'-এর দোকানী বললেন না। শুধু চাঁদ সওদাগরের মত বাম হস্তে, অবহেলাভরে' কয়েকটি শব্দপুষ্প ছুঁড়ে দিয়ে বলে দিলেন, "এখন পার্বতীর কি হইয়াছে, কেমন আছে জানি না। সংবাদ লইতেও ইচ্ছা করে না।"
শুধুই কি পার্বতী ? আর চন্দ্রমুখী ? তার জন্য তো বেলপাতাও জুটে নি। পঞ্চদশ পরিচ্ছেদে, "আর একবার প্রণাম করিয়া চন্দ্রমুখী কাঁদিয়া কক্ষান্তরে পলাইয়া গেল।" ব্যাস্, ছাড়াছাড়ি ! প্রণয়াস্পদের সঙ্গে আমৃত্যু বিরহযন্ত্রনার 'অভিশাপ' শিরোধার্য করে চিরান্ধকার কক্ষান্তরে আত্মনির্বাসন !
যদিও ষোড়শ পরিচ্ছেদে দেবদাস চন্দ্রমুখীকে শেষ চিঠি লিখেছিল, "বউ, মনে করিয়াছিলাম, আর কখনো ভালবাসব না। একে তো ভালবেসে শুধু হাতে ফিরে আসাটাই বড় যাতনা, তার পরে আবার নূতন করে ভালবাসতে যাওয়ার মত বিড়ম্বনা সংসারে আর নাই।" এখানেও শরৎবাবু বলে দিলেন, "প্রত্যুত্তরে চন্দ্রমুখী কি লিখিয়াছিল তাহাতে আবশ্যক নাই।"
এই প্রকার বাক্যবিন্যাস সুমহান সাহিত্যস্রষ্টাদের পরিচয়বাহী। 'দেবদাসের মৃত্যু'র একটি জীবনের অসহনীয় বিয়োগান্তক পরিণতি --একথা মর্মবিদারী কিন্তু তার জীবনের সঙ্গে প্রেমের-সম্পর্কে যে দুটি নারী জড়িয়ে ছিল তারাও যে তারই সঙ্গে, তাদের প্রেমের নিষ্ফলা অপমৃত্যু বরণ করে শববাহী মান্দাসে আরোহণ করেছিল --- এ কথাও তো সত্য, এবং শুধু সত্যই নয়, মৃত প্রেমের স্মৃতি বুকে ধ'রে বাকি জীবনটুকু ব'য়ে ব'য়ে শেষে অশ্রুনদীর সুদূর কোন্ পাড়ে গিয়ে চিতায় চড়েছিল। তাই স্রষ্টার সৃষ্টিতে 'উপেক্ষিতা' থেকে আরো নিবিড়ভাবে তারা পাঠকের অন্তরে ঠাঁই নিয়েছে। এখানেই মনে হয়, অন্ততঃ মর্ত্য-জীবনের প্রতি অমর আসক্তি নিয়ে যারা বাঁচে কোথাও কি আছে তার শেষ সার্থকতা ! হয়তোবা আছে ; যারা 'স্থিরত্বমিচ্ছন্তি' তারা যেন মৃত্যুকে নিয়েও বাঁচতে চায়। বেঁচে থাকতে হয়ও, যেমন বাঁচতে হয়েছিল কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধভূমিতে অভিমন্যুর মৃত্যুর পর অন্তঃসত্ত্বা উত্তরাকে ; আবার উত্তরার আসন্ন সন্তানকে পালন করার জন্য আপন সন্তান-মৃত্যুর মহাশোক বুকে জ্বালিয়ে রেখে বাঁচতে হয়েছিল সুভদ্রাকে। পারুকেও নিত্যদিনের মরণ নিয়েই বাঁচতে হয়েছিল ভরা সংসারের ভার বইবার জন্যেই। এ সমস্ত জীবন তো জীবন্ত হয়েও মৃতবৎ ! এমনই সব অনেকানেক করুণ মৃত্যুর উদাহরণ আছে শরৎ সাহিত্যের পাতায় পাতায়। তাঁর ছোট গল্প 'অভাগীর স্বর্গ'এর অভাগীর স্বর্গলাভের মোহে মৃত্যুবরণ, 'বিলাসী' গল্পে মৃত্যুঞ্জয়ের মৃত্যু ও মৃত্যুঞ্জয়ের শোকে বিলাসীর আত্মহনন ; এমনকি মনুষ্যেতর জীব 'মহেশ'এর পালকের হাতে নিধনের মত অপমৃত্যুগুলির দায় আখেরে দুঃখ, দারিদ্র্য, হতাশা, সামাজিক বৈষম্য ও ক্রূরতার উপর বর্তালেও সে সব মৃত্যুর অন্তর্গূঢ় কারণ তো ভালোবাসাই। আমরা যাকে বলতে চাই সংসারটিকে যতই ভালোবাসো অন্তিমে 'মৃত্যুই সত্য, জগৎ মিথ্যা !'
ভিন দেশের কাব্যসাহিত্যের মৃত্যুর ভাষাচিত্র
এই যে কিছুক্ষণ আগে রোহিনীর মৃত্যুর কথা আলোচনা করেছিলাম না -- তখন 'ওথেলো'র ডেসডিমোনার কথা মনে পড়েছিল।
"রোহিনী বলিল, মরিব না, মারিও না। চরণে না রাখ, বিদায় দেও।
গোঃ। দিই।
এই বলিয়া গোবিন্দলাল পিস্তল উঠাইয়া রোহিনীর ললাটে লক্ষ্য করিলেন।
রোহিনী কাঁদিয়া উঠিল। বলিল, মারিও না! মারিও না। আমার নবীন বয়স, নূতন সুখ। আমি আর তোমায় দেখা দিব না, আর তোমার পথে আসিব না। এখনই যাইতেছি। আমায় মারিও না।
গোবিন্দলালের পিস্তলে খট্ করিয়া শব্দ হইল। তার পর বড় শব্দ, তার পর সব অন্ধকার ! রোহিনী গতপ্রাণা হইয়া ভূপতিতা হইল।"
এবার সাহিত্যবিশ্বের স্বরাট, মানবচরিত্রের অন্তর্দ্বন্দ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ নাট্যকার সেক্ষপিয়রের একটি সৃষ্টি:
"Des.O, banish me, my lord, but kill me not!
Oth. Down strumpet.
Des. Kill me to-morrow ; let me live to-night.
Oth. Nay, an you strive ----
Des. But half an hour !
Oth. Being done, there is no pause.
Des. But while I say one prayer !
Oth. It is too late. (Smothers her).
Des. O lord, lord, lord !"
(Othello ; Act 5, Scene 2)
যদিও স্থান, কাল, চরিত্র, বিষয় ও ভাষার দুরধিগম্য দূরত্ব বিদ্যমান তবু এই হননক্রিয়ার নৃশংসতা একই প্রকার বীভৎস, নারকীয়।
এমনই আরও বহু জিঘাংসা, রিরংসা, হিংসা, প্রতিহিংসা-জনিত রক্তপিপাসা, রক্তপিপাসুর নিরাবরণ চিত্রই না অঙ্কন করে গিয়েছেন এই দৈবদৃষ্টিসম্পন্ন মহান স্রষ্টা, চিত্রায়িত করেছেন মৃত্যুর অনিবার্যতা।
"To be or not to be, that is the question : Whether 'tis nobler in the mind to suffer
The slings and arrows of outrageous fortune,
Or to take arms against a sea of troubles,
And by opposing them ? To die, to sleep--
No more ; and by a sleep to say we end
The heart-ache, and the thousand natural shocks
That flesh is heir to. 'Tis a consummation Devoutly to be wish'd. To die, to sleep ;
To sleep, perchance to dream. Aye, there's the rub ;
For in this sleep of death what dreams may come,
When we have shuffled off this mortal coil,
Must give us pause...."
Hamlet-এই দীর্ঘ ভাষণের (এটি স্বগতোক্তি, soliloquy) মধ্যে ধ্বনিত হয়েছে মৃত্যু সম্পর্কে নাট্যকারের অন্তর্লোকের উপলব্ধি। 'হওয়া' বা 'না-হওয়া', 'থাকা' বা 'না-থাকার' অর্থ কি ? 'থাকা' বা বেঁচে থাকার মানে হোল তো তাই -- ভয়ঙ্কর, অজানা, অপ্রত্যাশিত নিয়তির (fortune) ছোঁড়া তীক্ষ্ণ তীর আর কঠিন প্রস্তরখন্ডের আঘাতে জর্জরিত হয়ে থাকা, বা জীবনের অসংখ্য, অনন্ত কষ্টের, যন্ত্রণার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করা। কিন্তু পূর্ণরূপে এই অন্তহীন প্রতিকূলতাকে প্রতিহত করতে হলে এক মাত্র উপায় -- to die, to sleep-- no more ; হয় মরণকে বরণ কর ; নয় (চিরকালের) নিদ্রার আশ্রয় নাও। মানুষ হয়ে জন্মেছ ; অতএব অনুপেক্ষণীয় ভাবে ভোগ করতে হবে মানসিক ক্লেশ, দৈহিক পীড়া এবং শোক ও সন্তাপ। সুতরাং মৃত্যু, মৃত্যুই জীবন সংগ্রামের চরম পরিসমাপ্তি, একমাত্র পরিপূর্ণতা বলে ভক্তিভরে' বরণ করতে হবে--''Tis consummation Devoutly to be wish'd''. মৃত্যু তো ঘুমেরই বিকল্প কিন্তু মৃত্যুরূপী ঘুম আনতে পারে দুঃসহ দুঃস্বপ্নের বিভীষিকাও --- এবং তা আত্মহননের প্রবৃত্তির বাধা হয়ে দাঁড়ায় --acting as a 'rub' or obstacle to suicide. (খ্রিষ্টীয় ধর্মদর্শনের দিকে ইঙ্গিতবাহী উচ্চারণ (utterance).
"To sleep, perchance to dream. Ay, there's
the rub ;
For in that sleep of death what dreams may come,
When we have shuffled off this mortal coil,
Must give us pause."
'Hamlet- এর এই দীর্ঘ স্বগতোক্তির মধ্যে জীবন, মৃত্যু ও আত্মহননের উপর সুগভীর আত্মমগ্নতাজনিত দার্শনিক উপলব্ধি অভিব্যক্ত হয়েছে। সমগ্র স্বগতোক্তিটির মধ্য দিয়ে অনুরণিত হয়েছে জীবনের মূল্য কি ? জীবন থাকলেই বা কি জীবন গেলেই বা কি ? "That's the question"-- unsolvable, unknowable.
জীবন ও জগতের প্রতি এরূপ চিন্তা 'শূন্যবাদে'র দিকে নিয়ে যায় যা আমরা প্রবন্ধের প্রথমেই, বৌদ্ধ দর্শনের নির্বাণতত্বের আলোচনাকালে বলেছি। পাশ্চাত্য চিন্তায় যাকে Nihilism-- নাস্তিক্যবাদ বা ধংসবাদ বলা হয়েছে। মৃত্যুই একমাত্র সত্য, জীবনের কোন পরম লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য নেই ; শুধুমাত্র কিছুদিন, কালের একটি ভগ্নাংশ খণ্ডে, যার আবার নিশ্চয়তা বলে কিছু নেই, কোলাহলপূর্ণ পৃথিবীতে বেঁচে থেকে শেষ হয়ে যাওয়া ! মহানাট্যকার এমন কথা আরও তীব্রতর, তীক্ষ্ণতর ভাবে বলেছেন তাঁর 'ম্যাকবেথ' নাটকে---
মানসিকভাবে বিধ্বস্ত ম্যাকবেথ (... Direness, familiar to my slaughterous thoughts, cannot once start me). ওদিকে অন্দরমহল থেকে ভেসে আসছে কান্নার রোল। (স্রষ্টার সৃষ্টিতেই যাই)--
"Re-enter Seyton.
Mach. Wherefore was that cry ?
Sey. The queen, my lord, is dead.
Mac, She should have died hearafter ;
There should have been a time for such a ward.
Tomorrow, and tomorrow, and tomorrow,
Creeps in this petty pace from day to day
To the last syllable of recorded time,
And all our yesterdays have lighted fools
The way to dusty death. Out, out, brief candle !
Life is but a walking shadow, a poor player,
That struts and frets his hour upon the stage,
And then is heard no more ; it is a tale
Told by an idiot, full of sound and fury,
Signifying nothing."
"হায়, চলমান ছায়া এ জীবন।
বিশ্বরঙ্গমঞ্চে দর্পভরে হাঁটে কিছুক্ষণ,
অস্থির চিত্তে, দুর্ভাবনার বিড়ম্বনা সহ্য করে' করে'
হেঁটে-চলে ঘুরে বেড়ায় বরাদ্দকৃত
ক্ষণিক সময়কাল টুকু --
তারপর হারিয়ে যায় চির-নৈঃশব্দ্যের অন্তরালে,
মুছে দিয়ে চিরতরে পদচিহ্ন তার !" ৩
একেবারেই নিষ্ঠুর সত্যের নিরাবরণ ভাষামূর্তি ; যেমন পিকাশোর (Pablo Picasso 1881- 1973) 'চুম্বন' (the kiss), জীবন-মৃত্যুর মায়া-ছায়ার আলিঙ্গন !
(বাকি অংশ পরবর্তী ৪র্থ পর্বে)
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১৫/০২/২০২৬
কলকাতা।
_____________________________________
শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
মৃত্যু সত্য জগৎ মিথ্যা-- পর্ব ২
মৃত্যু সত্য, জগৎ মিথ্যা -- পর্ব ২
এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা মাত্র, 'এই যে আমি লিখছি, তুমি পড়ছো' -- এই ক্রিয়া দুটি স্তব্ধ হয়ে যাবার কথা। এই যে এতোদিন আশায়-আকাঙ্ক্ষায়, স্নেহে- প্রেমে, রাগে-অনুরাগে, বন্ধুত্বে-বৈরিতায় আমরা এই পৃথিবীতে রয়েছি, এ ধরার রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ ভোগ করেছি ও করছি -- সবই কি একদিন -- একদিনই বা বলি কেন, যে কোন মুহূর্তে 'না' হয়ে যাবে, এবং যাবেই !
"পথের শেষ কোথায়, শেষ কোথায়, কী আছে শেষে !
এত কামনা, এত সাধনা কোথায় মেশে।
ঢেও ওঠে পড়ে কাঁদার, সম্মুখে ঘন আঁধার,
পার আছে গো, পার আছে, পার আছে কোন দেশে।
আজ ভাবি মনে মনে মরীচিকা অন্বেষণে, হায়,
বুঝি তৃষ্ণার শেষ নেই। মনে ভয় লাগে সেই--
হাল-ভাঙা পাল-ছেঁড়া ব্যথা চলেছে নিরুদ্দেশে।।" -১
'ঢেও ওঠে পড়ে কাঁদার' -- এইটিই বাস্তব, এইটিই জীবনের মৃত্যুভীতির হাহাকার ! পিতা- মাতা চায় জীবনের জন্ম দিতে, সেই জীবনকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং 'জীবনে'র নিত্যদিনের, প্রতিটি মুহূর্তর, পল-অনুপলের উচ্চকিত আর্তি, "আমি বাঁচতে চাই, আমি বাঁচতে চাই।" দুর্ঘটনায়, দুর্দৈবে, মন্বন্তরে, মহামারিতে, রাষ্ট্রীয়-সাম্প্রদায়িক-সামাজিক বিপর্যয়ে অর্ধমৃত, মুমুর্ষু মানুষ তার কণ্ঠস্বরের শেষ উচ্চারণে বলে যায়, "বাঁচাও, আমায় বাঁচতে দাও।" শুধু তাই নয়, জীবনকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য, দীর্ঘায়ু লাভের কামনায় মানুষ কত না উপায় খোঁজে, কত না নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান করে, এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাড়ি দেয়। ব্যাধিগ্রস্ত হলে, সহায়-সম্বল হারালে চিকিৎসক, বদ্যি, ধর্মগুরু, জ্যোতিষীদের শরণাপন্ন হয় ; মঠে, মন্দিরে, মশজিদে, গীর্জায় গিয়ে প্রার্থনা করে। মানুষের এ সমস্ত কর্মধারা ধাবিত হয় একমাত্র এই লক্ষ্যে যে সে যেন 'মৃত্যুকে' বলতে পারে, "না" ! অতি পরিচিত এই পরিণতি,
"অহন্যহনি ভূতানি গচ্ছন্তি যমমন্দিরম্।
শেষাঃ স্থিরত্বমিচ্ছন্তি কিমাশ্চর্যমতঃ পরম্।।"
-- এ দৃশ্য প্রতিনিয়ত জীবিত মানুষেরা দেখছে। তবু তারা 'স্থিরত্বমিচ্ছন্তি', স্থিত হয়েই থাকতে চায়, বাঁচতে চায়। এটিই আশ্চর্য। এখানে নিত্য নিয়মিত মৃত্যু দেখে দেখেও বাঁচতে চাওয়ার মধ্যে আশ্চর্য এই যে 'জীবনের প্রতি এই ভালোবাসার' জন্ম হয় কি ভাবে এবং কেন যখন দেখি মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী ! তার বহু কারণের মধ্যে জীবনের একমাত্র প্রধান কারণ এই যে বিশ্বচরাচরের প্রতি আকর্ষণের বিহ্বলতা, আর বসুন্ধরার প্রতি ভালোবাসা - প্রেম। এই প্রসঙ্গে আমাদের অমর সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'কবি' উপন্যাসের কথা স্মরণে আসে।
"....... নিতাইও নিজের দুই হাতের বন্ধনের মধ্যে দুর্বল শিশুর মত তাহাকে (বসন্তকে) গ্রহণ করিয়া বলিল -- ভয় কি ? রোগ হ'লেই কি মরে বসন ? শরীর সারলেই --- ও রোগ ভালো হয়ে যাবে।
এবার সে এক বিচিত্র হাসি হাসিয়া বসন্ত নীরবে শুধু ঘাড় নাড়াইয়া জানাইয়া দিল -- না না না। কিছুক্ষণ পরে মুখ ফুটিয়াছে বলিল --আমি আর বাঁচবো না !
তারপর হঠাৎ বলিয়া উঠিল --- আমি জানতাম কবিয়াল ! যেদিন সেই গান তোমার মনে এসেছে ---সেই দিনই জেনেছি আমি।
---- কোন্ গান বসন ?
---- জীবন এত ছোট কেনে -- হায় !
ও ঝর ঝর করিয়া সে কাঁদিয়া ফেলিল। নিতাইয়ের ছোখে এবার জল আসিল। সঙ্গে সঙ্গে অসমাপ্ত গানটা আবার মনে গুঞ্জন করিয়া উঠিল ---
এই খেদ মোর মনে,
ভালবেসে মিটল না সাধ এ জীবনে।
হায় ! জীবন এত ছোট কেনে,
এ ভূবনে ?
কিন্তু গানটি অসমাপ্তই থাকছে। মৃত্যুতাড়িত জীবনের গান তো অসমাপ্তই !" ২
বসন্তের মৃত্যু আসন্ন ; সে কথা বসন্ত জেনে গিয়েছে, নিতাইও। ছটফট করছে বসন্ত। হঠাৎই কয়েক মুহূর্তের জন্য শান্ত হয়ে গেল সে। বড় বড় চোখ ছোট তার, সেই দুটি চোখ আরও বিস্ফারিত করে নিতাইয়ের মুখের দিকে তুলে বলল --- "আমি মরছি ?"
"নিতাই ম্লানহাসিমুখে তাহার কপালে হাত বুলাইয়া দিয়া এবার বলিল --- ভগবানের নাম --- গোবিন্দের নাম করলে কষ্ট কম হবে বসন।
---- না। ছিলা-ছেঁড়া ধনুকের মতো বিছানার উপর লুটাইয়া পড়িয়া বসন্ত বলিল ---না। কী দিয়েছে ভগবান আমাকে ? স্বামীপুত্র ঘরসংসার কী দিয়েছে? -- না।"
সাহিত্যের ভিতরে, গভীরে সমাজদর্শনের বাস্তব দৃষ্টিপাত করে তারাশঙ্কর বুঝিয়ে দিলেন কেন তিনি উপন্যাসে ও ছোট গল্পের অপরাজেয় শিল্পী। (অসহায় নিতাই বসন্তের এই অভিযোগ নিজের উপরই নিয়েছিল)। বসন্ত-নিতাইদের সম্প্রদায় নেহাতই লোকায়ত চিন্তাজগতের বসবাসকারী মানুষ। নিতাইয়ের ভগবান-গোবিন্দের উপর বিশ্বাস, জীবনের পরপারে ঈশ্বরের আশ্রয় প্রার্থনা --- এই যে ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কার --- সেটি উপনিষদীয় প্রজ্ঞার প্রকাশ নয়, যা প্রকৃতপক্ষে আমাদের, বিশেষ করে বাঙলার, চৈতন্য মহাপ্রভু সাধিত ও প্রচারিত 'প্রেমধর্মের'ই উচ্ছ্বাস। তাঁর প্রেম-ভক্তির অনুরাগরসসিক্ত ধর্মধারণা বাঙলার ঘরে ঘরে, আচণ্ডালে, আপামর জনসাধারণের মধ্যে কি যে বিপুল প্রভাব ফেলেছিল, ফেলেছে -- তারই মূর্তিমান উদাহরণ এই নিতাই। ভগবানের নাম --- গোবিন্দের নাম যে শেষের শান্তি, মৃত্যুযন্ত্রণা উপসমকারী --- লোকায়ত সমাজমানসেও তা বদ্ধমূল হয়েছে, হয়ে আছে।
বসন্ত নিতাইয়ের কথা মেনেছিল। তারই প্রতি একান্ত ভালোবাসায়, তাকেই ভগবানের আসনে বসিয়ে তার আদেশ পালন করেছিল নিতাইয়ের বসন। " বসন্ত এপাশে ফিরিয়া তাহারই দিকে চাহিয়া বলিল --- গোবিন্দ, রাধানাথ দয়া কর। আসছে জন্মে দয়া ক'রো।"
"আসছে জন্মে" বসন্তের সাধ যেন মেটে। যেন সে 'স্বামীপুত্রসংসার' পায়। মৃত্যুর পর স্বর্গ চায়না বসন্তরা, চির অবলুপ্তিও (পরিণির্বান) মেনে নিতে পারেনা, অতৃপ্ত 'তৃষ্ণা' মেটাতে আবার এই 'মৃত্যুময়' পৃথিবীতেই ফিরে ফিরে আসতে চায়।
বসন্ত নিতাইয়ের 'ভালবাসার সাধ না মেটার' আর্তনাদ একজোড়া নরনারীর অন্তর থেকে বেরিয়ে এসে, সমগ্র প্রাণ জগৎকে ভাসিয়ে দিয়ে এক চিরবহমান, ভূমণ্ডলগ্রাসী অতলান্ত অশ্রুনদীর মত বইতে থাকে। নিরুত্তর আকাশের দিকে চেয়ে থাকে, মরীচিকার বিদ্রুপের মত আশার আলোকের উৎস খুঁজে, সঙ্গীতের সুর শুনে মনে হয়, "আমার আশেপাশে দাঁড়িয়ে কে যেন বিনিয়ে বিনিয়ে কাঁদছে।"
বসন্ত মরে গেল। বসন্ত-হারা নিতাইয়ের বিরহবেদনার অন্তর্দাহী কথাশিল্প যাঁরা পড়েছেন তাঁরা জানেন। আমরা শেষ করবো এই কথা বলে যে বসন্তের সঙ্গে প্রেম-বিরহ সম্পর্ক নিতাইকে শুধু আরো আবেগময় কবি করে তুলেছিল, এমন নয়, তাকে দার্শনিকও করে তুলেছিল ; কিন্তু এমন এক 'দর্শন' সে লাভ করেছিল যাকে লোকায়তিক 'প্রেমের দর্শন' বলাই যুক্তিযুক্ত। সে গান বেঁধেছিল--
"মরণ তোমার হার হোল যে মানের কাছে
ভাবলে যারে কেড়ে নিলে সে যে দেখি
মনেই আছে
মনের মাঝেই বসে আছে।..."
এই স্মরণের মাধ্যমেই 'মৃত্যু' জীবনের কাছে একদিকে যেমন হার মানে, তেমনি মৃত্যুপথযাত্রীকেও 'নরক' নামক কাল্পনিক, ধর্মীয় সংস্কার-লালিত, নিরন্তর চিতাবহ্নিপ্রজ্বলিত দেশে চিরনির্বাসনের আতঙ্ক থেকে শেষ মুহূর্তের মুক্তি দিয়ে যায়। না যদি এমন হোত, তবে 'জীবন', নিরানন্দঘেরা অন্ধকার হতাশায়, অলস নৈষ্কর্মের মধ্যে দুটো দিন বেঁচে থেকে স্তব্ধ হয়ে যেতো।
তারাশঙ্করের উপন্যাসে, ছোটগল্পে বহু মুমুর্ষু প্রাণের মৃত্যুযন্ত্রণা, মৃত্যুবোধ, মৃত্যুভীতির অনন্যসাধারণ সব বর্ণনা আছে। সে সব স্থানে লেখকের অন্তর্দেশের অনুভব, অনুভূতি, আসন্ন মৃত্যুর শেষ-শয্যায়-শায়িত চরিত্রগুলির সঙ্গে তাঁর একাত্মতা এমন মরমী ভাষায় প্রকাশ পেয়েছে যার তুলনা বিপুল বাঙলা সাহিত্যের ভাণ্ডারে দুর্লভ। এমনকি ভিন দেশের সাহিত্যে সহজলভ্য নয় এবং তা এই কারণেই যে সেখানে মৃত্যুর বিভীষিকাময় রূপের প্রাধান্যই বেশি। জীবনের এই যে ট্রাজিক পরিণতি-- মৃত্যু, তার ভয়ানক সব চিত্রকল্প আমরা পেয়েছি গ্রীস দেশের প্রাচীন নাট্যকারত্রয়ী এসকাইলাস (Aeschylus, আনু. ৫২৫-৪৫৬ খ্রিঃ পূঃ), ইউরিপিদিস (Europides, আনু. ৪৮৫- ৪০৬ খ্রিঃ পূঃ) ও সোফোক্লিসের (Sophocles, আনু. ৪৯৭-৪০৬) রচনায়। এই সকল নাটকগুলির বিষয়বস্তুই ছিল মানুষের ইচ্ছা ও ভাগ্যের দ্বন্দ্ব, অনুপেক্ষণীয় নিষ্ঠুর দৈব প্রভাব (দেবতাদের দ্বারা মানুষের জীবন ও ভাগ্যের নিয়ন্ত্রণ), আত্মদর্পের নির্মম পরিণাম, পারিবারিক এবং রাজনৈতিক বিদ্রোহ, বিপজ্জনক অহংকার ও ঔদ্ধত্য (arrogance). এবং এই নাটকের শেষ অঙ্কে দর্শকদের অন্তর জুড়ে জেগে ওঠে এক অদ্ভুত অনুভূতি যাকে সমালোচকেরা বলেছেন catharsis -- আবেগের মুক্তি ও হতভাগ্যের প্রতি করুণা।
কিন্তু এই 'catharsis' এমন এক করুণা যার সঙ্গে যুক্ত থাকে নিজেকে শান্ত করার অদম্য আগ্রহ। অপরদিকে মৃত্যুর ট্রাজিক যন্ত্রনা-ভোগকারীর প্রতি সহমর্মিতা বোধে একাত্ম-হয়ে-যাওয়া ভারতীয় সমাজের অতি কোমল, দরদী আকুলতা মূর্ত হয়ে ওঠে তারাশঙ্কর, শরৎচন্দ্রের সৃষ্টিতে। আলোচনা সামান্য দীর্ঘায়িত করে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুচেতনা, যা অন্তিমে উপনিষদীয় পূর্ণতার আলোকাশ্রয়ী--(তাঁর অন্তর্বেদনার গভীরের এবং ব্যপ্তির কথা, নানা সুরের কথা, ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তিত, বিবর্তিত হওয়ার কথা এই স্বল্প পরিসরে অসম্ভব তো বটেই, এমনকি সে কথা আলোচনা করবার ধৃষ্টতাও আমার নেই)-- তেমনই যেন তারাশঙ্করের সৃষ্টিতে কোথাও কোথাও লক্ষ্য করা যায়।
"তাই 'আরোগ্য নিকেতন' উপন্যাসে মৃত্যুর রূপ-কল্পনা উপনিষদের প্রভাবপ্রসূত বললে ভুল বলা হয় না। মৃত্যুর জন্য শান্ত সমাহিত প্রতীক্ষার ধ্যান অসম্ভব কিছু নয়। মৃত্যু চুড়ান্ত কোনও অবসান নয়, এই প্রত্যয়ে যদি কেউ স্থিত হতে পারেন, মৃত্যু জীবনেরই সহায়ক এবং সূর্য যেমন জগতের ও জীবনের পরিপোষক, তেমনই যম তথা মৃত্যু ও জগতের ও জীবনের নিয়ামক, মৃত্যুর ধারাই প্রাণধারার অপরিহার্য পরিপূরকমাত্র, এই যদি 'সত্য' হয়, যা হলে সত্যনিষ্ঠ মুমূর্ষুর শান্ত-সমাহিত প্রার্থনা বা উপাসনার ভাষায় সূর্য ও যম তথা জীবন ও মৃত্যু একাকার হয়ে উঠতে, পরস্পরের পরিপূরক হয়ে উঠতে বাধা কোথায় ?...."
এই উপন্যাসের অষ্টাদশ পরিচ্ছদে আমরা দেখি, বিগত রাত্রির দীর্ঘ, চিন্তান্বিত জাগরণের ফলে সকালবেলা দেরিতে ঘুম ভেঙেছে জীবনমশাইয়ের। জেগে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর মনে পড়ে গেল গণেশ ভটচাজের সেই অসুস্থ মেয়েটির কথা। উৎকণ্ঠিত বোধ করলেন -- কেমন আছে সে ! কিন্তু শান্তচিত্তে উৎকণ্ঠা প্রশমিত করে, "হাত জোড় করে জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন, -- নমঃ বিবস্বতে ব্রাহ্মণভাস্বতে বিষ্ণুর্তেজসে জগৎসবিত্রে সূচয়ে সবিত্রে কর্মদায়িনে -- নমঃ।
মৃত্যুধ্রুব এই পৃথিবীতে এত চঞ্চল হলে চলবে কেন ?"
বস্তুত 'আরোগ্য নিকেতন' উপন্যাসে "ভারতীয় দৃষ্টিতে মৃত্যুকে তিনি যে ভাবে বিশ্লেষণ করেছেন, তাতে তাঁর নিষ্ঠা ও পাণ্ডিত্যের গভীর পরিচয় থাকলেও সেই বিশ্লেষণ প্রাণের প্রাচুর্যে উদ্দীপ্ত নয়, জীবনরসরসিকতায় অভিসিঞ্চিত নয়। ভারতীয় ঐতিহ্যেকে, এক্ষেত্রে উপনিষদিক মৃত্যুভাবনাকে (সঙ্গে তো কবিরাজি ও পাশ্চাত্য চিকিৎসাবিধির তথা পূরাতন ও নূতন দৃষ্টিভঙ্গির দ্বন্দ্বের চিত্র আছেই) প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য কৃতসঙ্কল্প লেখকের উদ্যোগ আয়োজন বেশ প্রকটরূপেই অনুভূত হতে থাকে।"৩
অবশ্য তাঁর ও পূর্ব পূর্ববর্তী, বাঙলার উপন্যাসের আলোকবর্তিকা প্রদর্শক ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও 'মৃত্যু' প্রতি তাঁর রচনায় ওই 'স্বর্গলোকের' প্রলোভনই দেখিয়েছেন। তাঁর 'চন্দ্রশেখর' উপন্যাসে 'মহাভারতের' শব-আকীর্ণ কুরুক্ষেত্রের মতো এক মৃত্যু- প্রান্তরের দৃশ্য উৎকীর্ণ করেছেন।
" চন্দ্রশেখর বলিলেন, "আমি প্রতাপের জন্য অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হইতেছি।
রামানন্দ স্বামী বলিলেন, "আমি তাহার তত্ত্ব লইয়া আসিতেছে।
এই বলিয়া রামানন্দ স্বামী চন্দ্রশেখর ও শৈবলিনীকে বিদায় করিয়া দিয়া যুদ্ধক্ষেত্রাভিমুখে যাত্রা চলিলেন।সেই ধূমময় আহতের আর্তচিৎকারে ভীষণ যুদ্ধক্ষেত্রে অগ্নিবৃষ্টির মধ্যে, প্রতাপকে ইতস্ততঃ অন্বেষণ করিতে লাগিলেন। দেখিলেন, কোথাও শবের উপর শব স্তূপাকৃত হইয়াছে --- কেহ মৃত, কেহ অর্ধমৃত, কাহারও অঙ্গ ছিন্ন, কাহারও বক্ষ বিদ্ধ, কেহ 'জল ! জল !' করিয়া আর্তনাদ করিতেছে --- কেহ মাতা, ভ্রাতা, পিতা, বন্ধু প্রভৃতির নাম করিয়া ডাকিতেছে। রামানন্দ স্বামী সেই সকল শবের মধ্যে প্রতাপের অনুসন্ধান করিলেন, পাইলেন না। ........ পরে একজন পলায়নপর সিপাহীর কাছে 'কেবল একজন বীর হিন্দু যোদ্ধার' কথা শুনে, যখন 'আহত, মৃতপ্রায়, তখনো জীবিত' প্রতাপের সন্ধান পেয়েছিলেন তখন প্রতাপের শেষের কথাগুলি বাংলা সাহিত্যে এই প্রথম একটি বিশেষ দিক নির্দেশ করে, যার উপলক্ষ্য 'ভালোবাসার জন্য মৃত্যুবরণ'।
"কি বুঝিবে, তুমি সন্নাসী ! এ জগতে মনুষ্য কে আছে যে আমার এ ভালোবাসা বুঝিবে ? কে বুঝিবে, আজি এই ষোড়শ বৎসর, আমি শৈবলিনীকে কত ভালোবাসিয়াছি। পাপচিত্তে আমি তাহার অনুরক্ত নহি --- আমার ভালোবাসার নাম --- জীবন বিসর্জনের আকাঙ্ক্ষা।..... এ জন্মে এ অনুরাগে মঙ্গল নাই বলিয়া, এ দেহ পরিত্যাগ করিলাম।"
কিন্তু এই 'মানবিক ভালবাসার' মধ্যে পাপ-পুন্য বিচারের অবতারণা করা হয়েছে যা ভারতের বৈদিক ও বৈদান্তিক ধ্যানধারণার প্রকাশ পেয়েছে যা কিছুটা ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রের আর্য মূল্যবোধের প্রতি ঝোঁক (তাঁর গীতার ব্যাখ্যায়, 'কৃষ্ণচচিত্রে' লক্ষ্যণীয়) এবং তাইই যেন উদ্ঘোষিত হয়েছে রামানন্দ স্বামীর প্রতাপের প্রতি বিদায়বাণীতে,
"...... ইন্দ্রিয়জয়ে যদি পুণ্য থাকে, তবে অনন্ত স্বর্গ তোমারই। যদি চিত্তসংযমে পুণ্য থাকে, তবে দেবতারাও তোমার তুল্য পুণ্যবান্ নহেন। যদি পরোপকারে স্বর্গ থাকে, তবে দধীচির অপেক্ষাও তুমি স্বর্গের অধিকারী। প্রার্থনা করি, জন্মান্তরে যেন তোমার মত ইন্দ্রিয়জয়ী হই।
রামানন্দ স্বামী নীরব হইলেন। ধীরে ধীরে প্রতাপের প্রাণ বিমুক্ত হইল। তৃণ-শয্যায় অনিন্দ্যজ্যোতিঃ স্বর্ণতরু পড়িয়া রহিল।"
এবার ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্রের মন্তব্য,
"তবে যাও, প্রতাপ, অনন্তধামে। যাও, যেখানে ইন্দ্রিয়জয়ে কষ্ট নাই, রূপে মোহ নাই, প্রণয়ে পাপ নাই, সেইখানে যাও ! যেখানে সুখ অনন্ত, প্রণয় অনন্ত, সুখে অনন্ত পুণ্য, সেইখানে যাও। যেখানে পরের দুঃখ পরে জানে, পরের ধর্ম পরে রাখে, পরের জয় পরে গায়, পরের জন্য পরকে মরিতে হয় না, সেই মহৈশ্বৈর্যময় লোকে যাও ! লক্ষ শৈবলিনী পথপ্রান্তে পাইলেও, ভালোবাসিতে চাহিবে না।"
আমরা দেখলাম মুমুর্ষু, অর্ধমৃত, শোণিতলাঞ্ছিত শবদেহের স্তুপ পেরিয়ে গেলেন রামানন্দ স্বামী --- কেমন যেন নির্বিকার, পৌঁছে গেলেন আসন্নমরণ প্রতাপের কাছে, 'প্রতাপের শৈবলিনীর প্রতি ভালোবাসার' কথাও যা হোল এবং অন্তিম সময়ে প্রাণহীন প্রতাপের জন্য যে আশীর্বাদ বাণী তিনি ব্যক্ত করলেন -- সমস্তটির মধ্যে মর্ত্যলোকের জীবনের প্রতি মোহ, জীবনের যন্ত্রণার প্রতি মর্মান্তিক ব্যাকুলতা, মৃত্যুজনিত শোকোচ্ছ্বাস যেন শীতলতায় নির্জীব, ঔদাসীন্যে পাষাণ!
কিন্তু তারাশঙ্করের 'কবি' এমন এক লোকায়ত জীবনের উপন্যাস যেখানে মৃত্যুর ভাবনা, মৃত্যুর অকাল সংঘটন অনেক বেশি উষ্ণ, বিয়োগান্তক ও মানবিক। ঠিক যেমন শরৎচন্দ্রের 'দেবদাস' উপন্যাসটিতে আমরা পাই। লোকায়ত ভাবনায় মৃত্যুর রূপ কী নিদারুণ, বিয়োগান্তক ও দুঃসহ বেদনাবোধের জন্ম দেয় ----
(রচনার পরবর্তী ৩য় পর্বে তা আলোচিত)
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১২/০২/২০২৬
কলকাতা।
Recently published
অমূল্য
He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed. ...
-
বৈশাখী পূর্ণিমা (পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত) বিষণ্ণ সায়াহ্ন বেলা, ক্ষীণ জলধারা অজয়ের। পাড়ে আছি বসে। রৌদ্র-দহন-দগ্ধ পাথরের টিলা, আধ-ডোবা পানস...
-
শ্রীমদ্ভগবত গীতায় অর্জুন-১৩ শ্রীগীতার এই ত্রয়োদশ অধ্যায়টি " ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞবিভাগযোগ"। অধ্যায়টি জটীল ও এই যোগ জানায় পরমাত্ম...
-
শ্রীমদ্ভগবত, অর্জুন --পর্ব ১২ ভক্তিযোগ একাদশ অধ্যায় আমাদের সেখানেই শেষ হোল যেখানে শ্রীকৃষ্ণ ভগবান প্রাপ্তির সর্বশে...