বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ, ২০২৬

শান্তি-১

                         শান্তি ১

'শান্তি' শব্দের প্রকৃত অর্থ কি, কেও কি বলতে পারবে ? পারবে একজনই যে বলতে পারে না, এমনকি, ইঙ্গিতে-ভঙ্গিতে, প্রকাশে-অভিব্যক্তিতেও জানান দিতে পারে না। সে কে ? সে হোল এক, একা, একটি প্রাণহীন শবদেহ, যাকে, দাহ করবার জন্যই হোক্ বা মাটি দেওয়ার জন্যই হোক্ শ্মশানে কিংবা গোরস্থানে আনা হয়েছে। জীবন থাকা কালে 'শান্তি'র কোন অস্তিত্ব নেই। এইখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, এই আগের বাক্যে 'এক একা একটি' বিশেষণগুচ্ছ প্রয়োগ করা হোল কেন ওই শবদেহটির ক্ষেত্রে ? আরো তো সহযাত্রীরা ছিল তার সঙ্গে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায়। হ্যাঁ, ছিল ; কিন্তু যারা ছিল তাদের সাথে আর কি যোগ আছে ঐ মড়াটির ? তবে সে তো নিঃসঙ্গই, এমনকি তার আজীবনের সঙ্গী -- দেহ-কাঠামো, কর্মেন্দ্রিয়-জ্ঞানেন্দ্রিয়গুলি আর তার সঙ্গে নেই। চিন্তা-ভাবনা, স্মরণ-মননশূণ্য, নিশ্চেষ্ট, নির্বিকার, অন্তরের এবং বাইরের আঘাত-অভিঘাত- নিরপেক্ষ এই 'অবস্থাটিই' শান্তির শান্ত বিমূর্ত মূর্তি। সমস্ত জীবজগতের কথা বাদই দিলাম, পূর্ণচৈতন্যের মানব নামক জীবটির কাছে 'শান্তি' শব্দটি যে এক নির্মম বিদ্রুপের মত ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতে থাকে -- মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়ার জন্মক্ষণ থেকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার আগে শেষ নিঃশ্বাসটি ফেলে যাওয়া পর্যন্ত -- এই তো নিয়তি।
তাই হলে জীবন কি এক সত্যিই ট্রাজেডি ? হ্যাঁ এবং না। ('না' এর কথা পরে।) গভীরভাবে বিচার করলে দেখা যাবে, মানবসমাজের, মানবসংসারের অশান্তির যত কারণ আছে তার মধ্যে বেশিরভাগই মানুষের স্বকৃত ও স্ব-আরোপিত। সমস্ত রকমের প্রাকৃতিক বিপর্যয় সহ্য করে, প্রতিরোধ করে, জয় করে, নব নব সৃজনের দুর্মর প্রচেষ্টায় বেঁচে থাকার যে জীবনসংগ্রাম তার পরিণাম পরাভবের নয় ; কিন্তু দেশে দেশে, কালে কালে যে সকল যুদ্ধ, জাতিদাঙ্গা, আক্রমণ, আগ্রাসন, লুণ্ঠন সংঘটিত হয়েছে তার জন্য যে নরকের অশান্তি, সে সবই ভোগ করতে হয়েছে, হয়ে আসছে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে যাঁরা অশান্তি চায় নি, চায় না। মানব সমাজে মানুষে মানুষে বিভেদ, ঘৃণা ও নৃশংসতা -- তার অনেকখানিই দায় বর্তায় ধর্মধারণার উপর, ধর্মমতগুলির পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের উপর, ঈশ্বর নামক একটি বিধান-স্রষ্টা ও তাঁর নির্মিত স্বর্গ ও নরক সৃষ্টির কাল্পনিক বিশ্বাসের উপর। রাজ্য- সাম্রাজ্যলোভী রাজা, সম্রাটদের আক্রমণ, আগ্রাসন, লুণ্ঠন, শিশুনারী নির্বিশেষে হত্যা ও ধর্ষণ হয়, হয়েছে ও হবে। ইউরোপের মধ্যযুগে ভ্যাণ্ডাল, হুন, ফ্রাঙ্ক, অষ্ট্রোগোথ, ভিসিগোথ, ল্যাম্বার্ডদের অমানবিক ধ্বংসলীলায় (অ্যাটিলা দ্য হুনকে বলা হোত 'ঈশ্বরের কশাঘাৎ', Scourge of God) যত রক্তবন্যা বয়েছিল ইউরোপের মাটিতে, তার চাইতে কম শোণিতাক্ত হয় নি বিশ্বের মানবসমাজ ধর্ম নামক খড়্গের আঘাতে। অ্যাংলো আমেরিকান লেখক Christopher Hitchens, (1949-2011) তাঁর একটি বিতর্কিত বইতে (God is not Great, How Religion poisons Everything) লিখছেন যে যে-কোন "Organized Religion is violent, irrational, intolerant, allied to racism, tribalism, and bigotry, invested in ignorance and hostile to free inquiry, contemptuous of women and coercive towards children".

বইটির নামের মধ্যে একটি বিষম বিতর্কের অবতারণা করা হয়েছে। আব্রাহামিক ধর্মগুলির মধ্যে ইসলাম ধর্মের একটি মহান উচ্চারণ 'ঈশ্বর মহান' বা 'God is Great'. এখানেই দ্বন্দ্ব। হিচেন তাঁর গ্রন্থের নাম রেখেছেন 'God is not Great.' তাই যাঁরা আব্রাহামীয় একেশ্বরবাদী যেমন ইহুদি, খ্রিস্টান এবং ইসলাম ধর্মের মধ্যে পড়েন না, তাঁদের পক্ষে এই দ্বান্দ্বিক আলোচনায় লিপ্ত হওয়ার পরিসর অত্যন্ত সংকীর্ণ। কিন্তু তিনি শুধু ইসলাম নয় বাকি অন্যান্য বহু ধর্মধারণা নিয়েই তাঁর এই গবেষণামূলক গ্রন্থটি প্রণয়ন করেছেন। তিনি  (বিশেষ করে ঐ প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মগুলির বিষয়ে) ধর্মীয় মতবাদ সৃজন, সে মতবাদের প্রচার ও অন্য ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে তার দ্বন্দ্বের যে ঐতিহাসিক পরম্পরা সে-সবের বিশদে আলোচনা ও ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন কত অসংখ্য রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ সংঘটিত হয়েছে ধর্মবিশ্বাসকে কেন্দ্র করে। মধ্যযুগের ক্রুসেড, ইনকুইজিশন ছাড়াও উনবিংশ শতাব্দীতে বেলফাস্ট (আয়ারল্যান্ড) দ্বন্দ্ব, বেইরুট বা লেবাননের গৃহযুদ্ধ, ভারতের সাম্প্রদায়িক জাতিদাঙ্গার উদাহরণ দিয়ে লেখক প্রশ্ন করেছেন এ সকল হিংস্রতা, হত্যা, বাস্তুচ্যুত হওয়া কি মঙ্গলময় ঈশ্বর অনুমোদিত ? এমনকি যে ধর্মমত 'অহিংসার' মন্ত্রে দীক্ষিত, সেই বৌদ্ধধর্মে বিশ্বাসী মায়ানমার নিষ্ঠুর রাষ্ট্রবাদের ত্রাসনে ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী রোহিঙ্গাদের উপর নামিয়ে এনেছে এমন নারকীয় নিষ্পেষণ যার জন্য তারা দেশহারা, আশ্রয়হারা হয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে, অমানবোচিত জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়েছে। লাঞ্ছনা, ঘৃণা ও নির্বাসনের শিকার হয়েছে।
ধর্মে ধর্মে এমন সব সংঘাত ও সংঘর্ষের কথা, ঈশ্বরের অস্তিত্ব, সর্বশক্তিমানের (God the Great) সর্বময় ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের ধারণাকে প্রশ্ন করেছেন, সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, এমনকি অস্বীকারও করেছেন আমার বর্তমান আলোচিত একমাত্র লেখক খ্রিষ্টোফার হিচেনস্ -- তা কিন্তু নয়। আরও বহু বিদ্বান ও চিন্তাবিদ আছেন যাঁরা ধর্মীয় ধারণা ও ঈশ্বরবাদী বিশ্বাসকে বাস্তববাদী (materialistic) বিতর্কের দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করেছেন। তাঁদের মধ্যে আছেন Richard Dawkins, Danial Dennett, Marlin Amis, George Orwell, Noam Chomsky প্রভৃতি। এনারা প্রায় সকলেই মানবিক চেতনার উন্মেষ ও ক্রমোন্নয়নের পক্ষেই মত প্রকাশ করেছেন, যার দ্বারা মানবতার, মানবজাতির প্রকৃত মঙ্গল সম্ভাবিত হতে পারে এবং এই পৃথিবী নামক আশ্রয়টি ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সকলের জন্য একটি শান্তিপূর্ণ আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে।

যে ধর্মধারণাগুলি এক এবং অদ্বিতীয় কোন ঈশ্বরকে অবলম্বন করেছে, বিশ্বাস করেছে, যাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে জাগতিক ও পরাজাগতিক শান্তিলাভের কামনায়, তাহলে সেই ঈশ্বরের বিশ্বজনীন কল্যাণ ও মঙ্গল বিধানের ক্ষমতা কি তবে প্রশ্নাতীত নয় ? আবার প্রশ্নটির অন্য দিক থেকেও ওঠা বিতর্কও স্বাভাবিক যে যখন আমরা বলছি 'ঈশ্বর মহান' বা 'ঈশ্বর মহান নয়' তখন তো আমরা স্বীকার করেই নিচ্ছি যে 'ঈশ্বর' নামধারী কোনো এক অদৃশ্য সর্বশক্তিমান নিয়ন্ত্রকের অস্তিত্ব আছে। এবং যাঁরা ধর্মপ্রবক্তা বা ঈশ্বরের অবতার বা জীবনপথের প্রদর্শক বা জীবনদ্বন্দ্বের মুক্তিদাতা (Supreme Leaders or Liberators) তাঁরা সেই অদৃশ্য 'সর্বশক্তিমান নিয়ন্ত্রকের' বাণী বহন করে এনেছেন দুঃখময় জগতের যন্ত্রনাক্ষুব্ধ মানুষের ঐহিক ও পারত্রিক জীবনকে শান্তিময় ও মঙ্গলময় করে তোলার জন্যই। "তবে কেন পঙ্গু সৃষ্টি, খণ্ডিত এ অস্তিত্বের ব্যথা !"
'অস্তিত্বের ব্যথা' বিশেষতঃ ধর্মকে কেন্দ্র করেই হয়ে আসছে -- এ কথা তো সত্য। ঈশ্বর আছেন, তিনি স্বর্গ নামক এক কল্পিত সুখ-শান্তিময় স্থানে বাস করেন, তিনি ধর্ম সৃষ্টি করেছেন ; ধর্মের রীতি নীতি, বিধি বিধান, সাধন-আরাধনা, সংস্কার পালনের মধ্য দিয়ে তাঁর কাছে যাওয়া যায়। এই ধরাধামে তাঁর প্রতিনিধি বা ধর্মগুরুরা আছেন যাঁদের সাহায্য ব্যতিরেকে, আশীর্বাদ ছাড়া, করুণা ব্যতিত ঈশ্বরের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায় না, স্বর্গলাভেরও সম্ভাবনা থাকে না। পাপ নিয়েই মানুষ জন্মগ্রহন করে এবং নরকে তার স্থান নির্ধারিত , সেখানে purgatory বা শুদ্ধিলোক যদিও আছে কিন্তু সেই শুদ্ধিলোকের দীর্ঘ দহনযন্ত্রনা ভোগ করতেই হবে। তার পরেও অনন্ত নরকবাসের বিভীষিকাময় ভীতি এই বিশ্বাসের শিকড় একদিকে যেমন সুদূর অতীতের অধোলোকে নিমজ্জিত তেমনি তার শাখা প্রশাখা বিস্তার করে আছে সমগ্র পৃথিবীর সমস্ত জনপদে -- রাজার প্রাসাদ হতে ভিখারীর ভগ্ন কুটীরের জীর্ণ চালাঘরে। মধ্যযুগের পাপমুক্তির জন্য গীর্জা কর্তৃক নির্ধারিত, ধর্মযাজকদের কাছ থেকে মুক্তিপত্র (Letter of Indulgence) কেনার প্রচলন ছিল, যা ধর্মভীরু, নিরীহ, সন্ত্রস্ত মানুষেরা কপর্দকশূন্য অবস্থায় থাকলেও, সামন্তপ্রভুদের কাছে শ্রমদানের প্রতিজ্ঞার মাধ্যমে, কিনতে বাধ্য হোত যাতে মৃত্যুর পর তাদের শুদ্ধিকরণের ভয়াবহ অন্ধলোকে যেতে না হয়। আবার শুদ্ধিলোকে বা purgatory-র অগ্নিকুণ্ডের জ্বালা সহ্য করে' (purifying suffering or satispassion) উত্তীর্ণ হতে না পারলে শেষবিচারের দিন (সৃষ্টির অন্তিমকাল) পর্যন্ত মহানরকে অবস্থান। এই শেষ বিচারেরধারণা সমস্ত মানবীয় চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করে। 'শেষবিচার' হোল In Abrahamic religions (Judaism, Christianity, Islam, and Zoroastrianism) Judgement Day or The Last Judgement is a core theological concept which is a future event where God or Jesus Christ returns to judge all humanity ---- both living and resurrected dead ---- based on their faith, words, and actions leading to eternal reward or punishment.

কিন্তু তবুও বিচারের ভার তুলে নিয়েছিলেন ধর্মযাজক ও ধর্মগুরুরা। অবিশ্বাসী ও অখ্রিষ্টানদের উপর, বিশেষ করে ক্যাথলিকদের নির্মমতা কী বীভৎস ছিল তার অসংখ্য উদাহরণ আছে। মধ্যযুগে ১০৬৪ সাল থেকে ১৫২৬ সাল পর্যন্ত ক্যাথলিক ধর্মযাজকেরা অখ্রিষ্টানদের নির্মূল করার জন্য নির্বাসন, জোরপূর্বক ধর্মান্তরিতকরণ এবং গনহত্যার মত এমন সব নির্বিবেক, নির্বিচার, নিষ্ঠুর পন্থা অবলম্বন করেছিল যে সমগ্র পশ্চিম ইউরোপ একজাতি, এক ধর্মের ভূখণ্ডে রূপান্তরির হয়ে গিয়েছিল। এবং সেই সময়েই অখ্রিষ্টানদের কয়েকটি বিশাল বিশাল গোষ্ঠী ভবঘুরে বা Gipsy-তে পরিনত হয়ে যায়, যাঁরা মূলত উত্তর ভারত থেকে স্থানান্তরিত হয়ে, বলকান অঞ্চল দিয়ে ইউরোপে প্রবেশ করেছিল। এই অভিবাসিত যাযাবর জাতি ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের ভিন্ন ভিন্ন ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় প্রান্তিকভাবে বসতি স্থাপন করেছিল। মধ্যযুগের ইউরোপ তাদের মিশরীয় মনে করত বলেই তাদের Gypsy বলা হোত। আব্রাহামিক কোন ধর্ম, কোন ভগবান তাদের রক্ষা করতে পারে নি। (ইতিহাসের ঘোর কলঙ্কের বিষয় এই যে সেই সব ভবঘুরে জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন, বিচিত্র সংস্কার, সংস্কৃতি, নৃত্য-সঙ্গীতের মত শৈল্পিক সৌন্দর্য, দৈহিক এবং মানসিক ঐশ্বর্য থাকা সত্ত্বেও এই বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়কালে এসেও কিছু উন্মাদ, নৃশংস একনায়কতন্ত্রী রাষ্ট্রতন্ত্রের হাতে চিরবিনাশের অন্ধকারে হারিয়ে গেল তারা ! (অতি সামান্যই অবশিষ্ট রয়েছে এখনো, এখানে ওখানে)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়েরও আগে থেকে (১৯৩৩-১৯৪৫) ৬০/৭০ লক্ষ ইহুদিদের সঙ্গে নাৎসি বাহিনী প্রায় ৫০০,০০০ রোমানি ভবঘুরেদের হত্যা করেছিল -- "The cruelest Holocaust along with the Nazi Genocide of the Jews in the history of Europe!"
তাহলে তখন 'ঈশ্বর' নামের ব্রহ্মাণ্ডের 'সর্বশক্তিমান মুক্তিদাতা' কেউ ছিলেন না বা থাকলেও তিনি অসহায় মানববিশ্বের কল্যাণময় প্রাণশক্তি হতেই পারেন না। এমন ই চিন্তার ঝলক আমরা পাই Friedrich Nietzsche-য়ের লেখা থেকেঃ
"God is Dead. God remains Dead. And we killed him." ----'The grey science'. (প্রবন্ধের অন্যত্র এ বিষয়ে আলোচনা করা হবে।)

এতক্ষণ ইউরোপীয় ভূখণ্ডের ইতিহাসের কতিপয় ধর্মীয় দ্বন্দ্ব সংঘাতের কথা বলেছি, অন্ধ ধর্মবিশ্বাসের নরমেধ যজ্ঞকুণ্ডে মানবপ্রাণের আহুতিদানের কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরেছি। এবার তাই যদি ভিন্ন ভিন্ন দেশের প্রসঙ্গে আলোচনায় যাই তবে দেখব খ্রিস্টান ও ইসলাম‌ সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের সঙ্গে সমান্তরালভাবে সশস্ত্র ধর্ম-বিজয়াভিযানের শোণিত-তরঙ্গ, ঢেউয়ের পর ঢেউ, আছড়ে পড়েছিল এশিয়া, আফ্রিকা, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার সর্বত্র। এ সমস্ত স্থানে প্রথমদিকে এসেছিল ক্যাথলিক ধর্মযাজক ও ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ। পরবর্তী সময়ে ইসলাম ধর্মের ধর্মগুরু ও নবাব-সুলতানেরা। বিশ্বের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে এসেছিল শান্তির শ্বেতপতাকাবাহী অহিংস ধর্মপ্রচারকদের দ্বারা নয়, এসেছিল রক্তমাখা অস্ত্রহাতে, রক্তক্ষয়ী হনন, লুণ্ঠন, ধর্ষণ ও নিপীড়নের মধ্যে দিয়ে। ইতিহাসের এই হাজার হাজার বছরের যুদ্ধ, বিপ্লব, উপপ্লবের আলোচনা এখানে অপ্রাসঙ্গিক কিন্তু প্রাসঙ্গিক যা তা হোল 'ধর্ম' ও 'ধার্মিক' সম্প্রদায়ই যদি 'শান্তির' পথ অবলম্বন না করে তবে ধর্ম ও ধার্মিকতার বিমূর্ত মূর্তি 'ঈশ্বরের' অস্তিত্বে কি বিশ্বাস রাখা যায় ? এই অবিশ্বাস থেকেই নাস্তিক্যবাদের জন্ম। এই মতবাদটিই ইউরোপীয় নাস্তিক বা নিরীশ্বরবাদীদের চিন্তাকে ঋদ্ধ করেছে।
এবার আসি প্রতীচ্য ছেড়ে প্রাচীন প্রাচ্য ভূমিখণ্ডে --- প্রধানভাবে এবং প্রাসঙ্গিক কারণেই এই ভারতবর্ষে,  কেননা এখানে 'ঈশ্বর' বা 'ভগবান' বিষয়ে যত আলোচনা হয়েছে, মানবসভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে, ততখানি আর কোন দেশের কোন সভ্যতায় হয় নি। 'ঋক্শ্রুতি' বা ঋক্বেদ, বা 'ঋকবেদ সংহিতা' আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর, মতান্তরে দশ হাজার বছরও হতে পারে, আগে রচিত হতে আরম্ভ করে এবং গবেষকদের মতে দশ মণ্ডলের এই মহাগ্রন্থ সম্পূর্ণ রূপে প্রকটিত হয়েছে দুই হাজার বছর কাল ধরে। ঋক্ বেদ বিশ্বমানবসভ্যতার আদিমতম সাহিত্য, মানুষের মনন ও দর্শনের প্রথম অভিব্যক্তি। বাক্, বাক্যগঠন ও ভাষার ব্যাকরণগত ও ছন্দায়িত (ত্রিষ্টুপ, গায়ত্রী, জগতী প্রভৃতি ছন্দে ঋক্ মন্ত্রগুলির আবৃত্তকরণ হয়) চলনের প্রথম উচ্চারিত উদাহরণ। শুধু তাই নয় ঋগ্বেদ, যা পরবর্তী সামবেদ, যজুর্বেদ এবং আরো পরবর্তীতে, যুগ পর্বের ব্যবধানে সংকলিত অথর্ববেদের, ব্রাহ্মণগ্রন্থগুলির, আরণ্যক ও উপনিষদসমূহের উৎসস্বরূপ। (যোগবাশিষ্ঠ রামায়ণ, মদ্ভাগবৎগীতা, রামায়ণ, মহাভারতাদি পুরাণ গ্রন্থাবলীর আলোচনা প্রসঙ্গান্তরে করার অবকাশ থাকবে)।

আমাদের বা এই ভারতবর্ষের মত উপমহাদেশের ধর্মধারণা ও ঈশ্বরবিশ্বাস নিয়ে আলোচনা আরম্ভ করতে হলেই বেদসংহিতার প্রসঙ্গ অবধারিত। তাই বেদের সময়কাল থেকে আমাদের শান্তি ও সান্ত্বনার একমাত্র আশ্রয় 'ঈশ্বর'-য়ের মূর্ত এবং বিমূর্ত রূপের আলোচনা করতেই হবে --
                  (পরবর্তী পর্বে)।
                   --ক্রমশঃ--
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১৯/০২/২০২৬
কলকাতা।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...