শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬

সুখ ২

   সুখ-২

অধুনা ঝাড়খণ্ডের অজয় নদের পাড়েই আমাদের গ্রাম ভাগ্যপুর। এই অঞ্চলটি বৃহত্তর বাঙলারই একটি অংশ। বাঙলা ভাষা, বাঙলা সংস্কার-সংস্কৃতি, অশন-বসন, উৎসব-অনুষ্ঠান সবই  বর্তমানের পশ্চিম বর্ধমানের মত ; কিন্তু যেহেতু 'অজয় নদ অন্তরায়' তাই বছরের চার পাঁচ মাস -- পারাপার শুধু ডিঙিনৌকা। আমাদের গ্রামে স্কুল পাঠশালা যা ছিল তা ওই ঈশ্বর চন্দ্রের 'বর্ণপরিচয় প্রথম ভাগ', 'দ্বিতীয় ভাগ' আর সংখ্যা গণনার 'ধারাপাত'। তাই ছোটনাগপুরের এই নির্জলা প্রান্তরে, পাহাড় টিলার ঢালে, সীমিত জমিতে অত্যল্প ধান চাষের মতই পড়াশোনার চাষও ছিল এইটুকু। তবে বামুন পাড়ার কিছু কিছু বাবা-মা চাইতেন তাঁদের ছেলে সন্তানেরা লেখাপড়াটা এমন শিখুক যাতে চাকরি-বাকরি করতে পারে এবং আখেরে তাঁদের দুঃখ ঘোচাতে পারে। দুঃখ বামুনদেরই বেশি কেননা, জমি-জিরেত তাঁদের যথেষ্ট থাকলেও তাঁরা, তাঁদের ছেলেরা তো আর হাল-কোদাল ধরত না। এমনই এক বামুন ঘর, অঘোর চক্রবর্ত্তী তাঁর ছয় ছেলে আর তিন মেয়ে নিয়ে সংসার চালাতে গিয়ে নাজেহাল। পৌরহিত্য, ঝাড়ফুঁক, হস্তরেখা বিচার এমনকি ভিক্ষা পর্যন্ত করেও বড় ছেলে নিরঞ্জনকে বীরভূমের দুবরাজপুরের এক ছাত্রাবাসে রেখে পড়িয়েছিলেন। নিরু মেধাবী ছিল এবং হেতমপুর রাজকলেজ থেকে বি-এ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম-এ পাশ করে কৃষ্ণনগর কলেজে অধ্যাপকের চাকরি পেয়ে গেল। প্রথম প্রথম দু' তিন বছর দেশের বাড়িতে যাওয়া-আসা, টাকা-পয়সা দেওয়া নিয়মিত ছিল। অঘোর ঠাকুর আর তাঁর স্ত্রী কাত্যায়নী দেবীর বুকে সন্তান-গর্বের জোয়ার। নিরুর জন্য পাত্রীর পিতাদের নিত্য আগমন কিন্তু অঘোর ঠাকুরের 'বরপণ' চাহিদার ঘায়ে আহত ও আশাহত হয়ে তাঁরা আর দ্বিতীয়বার সৌভাগ্যপুরমুখো হতেন না।

 
বিশ্বের বড় বড় ট্রাজেডিগুলোর অবিবেকী, অদূরদর্শী কিছু কিছু কারণ থাকে, যেমন রামায়ণের সোনার হরিণ, মহাভারতের পাশাখেলা, ইলিয়াডে গ্রীকরাণী হেলেন অপহরণ, 'ওথেলো'-তে রুমাল --- এই রকম  আর-কি, --- সংসারের অকস্মাৎ বিপর্যয়ের বেলাতেও তেমনি কিছু কিছু হেতু থাকেই থাকে যেগুলি আমাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়। অঘোর বাবুর সংসারে, তাঁর ওই পণাপণির একগুঁয়েমি তেমনই এক হেতু হয়ে উঠেছিল কি ? কেননা হঠাৎই কিছুদিন নিরু নিরুত্তর থাকার পর, তার লেখা একটি চিঠি এসে হাজির। চিঠি দীর্ঘ ; কিন্তু মূল বক্তব্যটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত, শ্মশানে শবদাহের পর একঢেলা পিণ্ডির মতন। ছেলে তারই  সহকর্মী জনৈকা 'লেখা সরকার' নাম্নী এক 'বাঙাল' নমঃশূদ্র মেয়েকে বাধ্য হয়ে বিয়ে করেছে, বাবা যদি অনুমতি দেন তবে তাঁর বৌমাকে নিয়ে নিরঞ্জন ঘরে আসবে।
মধ্যাহ্নভোজনের থালা পড়ে রইল। অঘোর ঠাকুর বার কয়েক কপালে করাঘাত করে ঘন ঘন বিড়ি টানতে লাগলেন। কাত্যায়নী দেবী তো শয্যাশায়িনী হয়ে পড়লেন। অপরাপর ছেলে মেয়েরা ঘরের দাওয়ায় এ-কোনে, সে-কোনে বসে পড়ল। যাই হোক্, সে দিনটা সেই ভাবেই কেটে গেল। পরের দিনগুলি একটু একটু পিছোতে পিছোতে অঘোর ঠাকুরের সংসার আবার অভাব অনটন ও মানহীন অগৌরবের অবস্থায় ফিরে গেল। গ্রামময় কানাকানি, জানাজানি হওয়াতে অঘোর ঠাকুরের 'ইনকাম'ও বেশ কমে গেল। সঙ্গে এসে জুটল নিন্দা, ভর্ৎসনা, বিদ্রুপ আর উপেক্ষা। কাত্যায়নী দেবী মরমে মরে গিয়ে একদিন স্বামীর পায়ের কাছে বসে, অস্থিসার পায়ে তেল মালিশ করতে করতে বললেন,
" এখন তো কতই এমন হয়, তুমি নিরুকে ক্ষমা করে দাও। একটা চিঠি লিখে বৌমাকে নিয়ে আসতে বল। ছেলেকে না দেখার কষ্ট আমি সহ্য করতে পারছি না। সংসারেরও সাহায্য হবে ; ওরা দুজনেই তো রোজগার করে।"
অঘোর ঠাকুরের দুটো চোখ রাগে রক্তজবার মত লাল হয়ে গেল, অঘোর সন্নাসীর মতোই দুর্বোধ্য এক হুংকার ছেড়ে, লাল গামছা কাঁধে ফেলে বাইরে বেরিয়ে গেলেন।  মু'আঁধারি সন্ধ্যায় ঘরে ফিরলেন, হ্যারিকেনের আলোয় একটা চিঠিও লিখলেন। কিন্তু সেই চিঠিতে নিরুর উপর অনন্ত দোষারোপের পর, 'পুনশ্চ' বাক্যে লিখে দিলেন, "মৃত্যুর আগে আমি যেন তোমার মুখ না দেখি।"

চিঠি পোস্ট করবার পর ঘরে ফিরে স্ত্রীর ও সন্তানদের মূক, বিষাদবিপন্ন মুখগুলি দেখে অঘোর ঠাকুরের সংবিদ ফিরে এল। ভাবলেন, এতখানি নিষ্ঠুরতা ঠিক হোল না। কিন্তু তখন আর কিছুই করার ছিল না, অনুতপ্ত হওয়া ছাড়া। ধনুক থেকে ব্রহ্মবাণ বেরিয়ে গিয়েছে। ওদিকে নিরঞ্জন সেই চিঠি পেয়ে এমনই ভেঙে পড়েছিল যে তিনদিন আর কলেজেই গেল না। লেখা বার বার জানতে চাইছে, হয়েছেটা কি ? অবশেষে নিরঞ্জন বালিশের তলা থেকে চিঠি বার করে লেখার হাতে দিয়ে বলল, "আমি বাবার ত্যাজ্যপুত্র হয়ে গেলাম।" লেখা বার বার বোঝানোর চেষ্টা করে গেল, "বাবার এই অভিযান সঙ্গত, কিন্তু চল, আমরা যাই, তাঁদের পায়ে অপরাধ স্বীকার করি, তাঁরা অবশ্যই ক্ষমা করে দেবেন।" নিরঞ্জন কোন উত্তর দিল না। জ্যেষ্ঠপুত্রসুলভ অভিমানের সঙ্গে অবিমৃষ্যকারিতাজনিত সন্তাপে বিবশ হয়ে গেল নিরঞ্জন।

অঘোর ঠাকুরের সাংসারিক সমস্ত সুখ, সুখের আশা, সুখের আশ্রয় এবং নিরঞ্জনের নব বিবাহিত জীবনের আবেগ-সংরক্ত সুখের এখানেই সমাপ্তিরেখা টেনে দেওয়া যেত ; কিন্তু জীবনের গতি বিচিত্র, অনিশ্চয়তার বাঁক পদে পদে। নিরঞ্জনের মেজ ভাই, ভরাযৌবন বোধনের ছিল সংসারের প্রতি গভীর টান এবং গ্রামের চাষাভূষো, বাউরী বাগতি, ডোম চুয়াড়, সাঁওতাল শবরদের সঙ্গে ওঠাবসা এবং তাড়ি-মাড়ি মহুয়ার দিকেও অল্পবিস্তর ঝোঁক। কীর্তনীয়া, বাউলদের আখড়ায় আখড়ায় ঘুরে, দু'এক বার গাঁজার কলকেতে দম মেরে বুঝে গিয়েছিল ''সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই"। তাই দাদার বিয়েটাকে সে নিজের বিশ্বাসের জয় বলেই মনে করেছিল। বৌদিকে দেখার জন্যও মনটা ছোঁক্ ছোঁক্ করছিল। বয়সের ধর্ম আর কি ! 

এখন বেহাল সংসারের হাল ধরল সেই। বামুনের কাজকর্ম সম্পূর্ণ ছেড়ে লেগে পড়ল চাষের কাজে। আবার মনে মনে ভাবল, ফেরাতে হবে দাদাকে নইলে মা'টা মরে যাবে অকালে। পূজা পার্বণের কাজ না পেয়ে বাপটাও মুষড়ে পড়েছে। তাই ঘরের কাউকে কিছু না জানিয়েই একদিন তার বর্ণপরিচয় দ্বিতীয় ভাগের বিদ্যা সম্বল করে চিঠি লিখল দাদাকে। বিশেষ অর্থ-অনর্থ না বুঝেই লিখে দিল, "তোমাকে অদ্য না এলে মায়ের 'দুরাবস্থা' ঘটিয়াছে।"
একটি সপ্তাহ কেটেছে সবে, হঠাৎই এমনই এক চৈত্র মাসের বিকালবেলায় সৌভাগ্যপুরের পাড়ায় পাড়ায়, ঘরে ঘরে গুঞ্জন অঘোর ঠাকুরের বড় ছেলে তার 'বেজাত' বউ নিয়ে গাঁয়ে ফিরেছে। বামুন পাড়া ছাড়া বাকি সমস্ত পাড়ার বউ-বিটি থেকে বুড়া-বুড়ি দল বেঁধে এসে হাজির অঘোর ঠাকুরের উঠানে। বউ দেখে তো সবার চোখ চড়কগাছ। কী সুন্দর, কী সুন্দর ! আর ব্যবহারটি দেখলে ? মুখের কথাগুলি ? আহা, কী মিষ্টি, কী মিষ্টি ! 

ব্যাস্, খবর রটে গেল চৈত্রের দমকা হাওয়ার ঢেওয়ে ঢেওয়ে। পরদিন বামুন পাড়ার গিন্নিবান্নি, নবোঢ়া-অনুঢ়ারাও, বুড়োদের বাধার বাঁধ ভেঙে কাত্যায়নীর সংসারে। হ্যাঁ, নূতন বউ এখন কাত্যায়নী দেবীর কোলের কাছটিতেই এসে আশ্রয় নিয়েছে বা উল্টো করে বললে, বৌমাকে পাওয়ার পর থেকে শাশুড়িমা তাকে আর কাছ ছাড়া করেন নি। ফেরার পথে সকলেই একবাক্যে স্বীকার করে গেল, 'সত্যি বউটি রূপে লক্ষ্মী, গুণে সরস্বতী।' কেউ কেউ আবার কাত্যায়নী ঠাকরাণের কাছে আবদার করেও গেল, 'ভোজনটি ফাঁকি দিও না।' আর এইটিই চাইছিল বোধন। দাদাকে গিয়ে বলল, "দাদা, বৌভাতের ব্যবস্থা করতে হবে তো।''
সৌভাগ্যপুর গ্রামে এমন আবেগের মিষ্টান্ন-রসে সিক্ত, সার্বজনীন বৌভাতের ভোজ আগে কেও কখনো দেখেছিল কিনা তাই নিয়ে আলোচনা চলেছিল দিনের পর দিন মাঠের আলে, পুকুরঘাটে, কু্ঁয়োর পাড়ে। কিন্তু আসল আসরটি দেখা গেল তালবাগানের তাড়ির ঝুপড়িতে। গ্রামের বামুন-অবামুন, গোত্র-অপগোত্রের সব যুবকেরা গোল হয়ে বসা, মধ্যমণি বোধন, মধ্যিখানে তাড়ির ভাঁড় নয়, তাড়ির হাঁড়ি। আলোচনার বিষয় লেখা বৌদি। সেই শেষ চৈত্রের পলাশ- রাঙা পড়ন্ত বিকালের, তাড়িখেকো গ্রাম্যযুবকদের প্রগলভ শব্দগুলো নাই বা শোনালাম ; তবে সলজ্জ হাসির মধ্যে বোধনের যে বিজয়ীর গর্ব, তাড়ির ঢোকে ঢোকে ছলকে ছলকে উঠছিল -- তার সেই 'সুখানুভূতি'র প্রকাশ আমি আজও মনে রেখেছি। 

একজন প্রায়-অশিক্ষিত, অ-মার্জিত, মেঠো মানুষ তার অপার, নিষ্কলুষ সত্যের আলোকদীপ্ত ভালোবাসার স্পর্শ দিয়ে নিশ্চিত অনুতাপের দুঃখ থেকে তার পরিবারটিকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল, জাতি-বর্ণ-হীন মানবপ্রেমের আমন্ত্রণে স্ববর্ণ-অসবর্ণের বাঁধ ভেঙে দিয়েছিল, অন্তঃসারশূন্য, অসাড়, সংস্কারাচ্ছন্ন পল্লীসমাজে একটি অসবর্ণ বিবাহ অনুষ্ঠানকে উচ্চনীচের ভেদাভেদহীন মিলনোৎসবে পরিণত করে দিয়েছিল ; তাও আবার এই 'প্রগতিশীল' সময়কাল থেকে অর্ধশতাব্দী আগের এক বিদ্যা-বিদ্যালয়শূন্য পাণ্ডববর্জিত দেশে -- সে ঘটনা আজও আমার সুখের স্মৃতি হয়ে বেঁচে আছে।
জনান্তিকে বলে রাখি বোধনের তাড়ির আড্ডার বন্ধু ছিলাম 'আমিও'।
                 (ক্রমশঃ)

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
০৪/০৩/২০২৬
কলকাতা।
__________________________________









কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...