শ্রীমদ্ভগবদগীতায় অর্জুন-পর্ব ১৭
সপ্তদশ অধ্যায়
'শ্রদ্ধাত্রয়বিভাগযোগ'
আমরা বিগত ষোড়শ অধ্যায়ে মানবীয় সত্ত্বার দৈবীপ্রকৃতি ও আসুরী প্রকৃতির বিশদ আলোচনা শুনেছি স্বয়ং পরমপুরুষ শ্রীকৃষ্ণের শ্রীকণ্ঠের উচ্চারণ হতে। সমস্ত বক্তব্যের শেষে তিনি মানবের দেবতা, বা পরিপূর্ণরূপে উত্তম হয়ে ওঠার পথে বাধাগুলির কথা বলেছেন। যেগুলি হোল কাম, ক্রোধ এবং লোভ। আরও একটি বিষয়ের উপর তিনি বিধান দিয়েছেন, যেটি হোল শাস্ত্রানুমোদিত কর্ম করা। "জ্ঞাত্বা শাস্ত্রবিধানোক্তম্ কর্ম কর্তুমিহার্হসি।" এই যে শাস্ত্রের কথা শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন তা হোল বেদের 'ব্রাহ্মণখণ্ডের' বিধি অনুযায়ী যাগ-যজ্ঞ ও সামাজিক সংস্কার পালন।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই আচার্যসুলভ বক্তব্যটি পরিপূর্ণরূপে হৃদয়ঙ্গম করবার জন্য এবার, এতক্ষণ পর, এই সপ্তদশ অধ্যায়ের প্রথম শ্লোকে অর্জুন জানতে চাইছেন,
"যে শাস্ত্রবিধি উৎসৃজ্য যজন্তে শ্রদ্ধয়ান্বিতাঃ।
তেষাং নিষ্ঠা তু কা কৃষ্ণ সত্ত্বমাহো রজস্তমঃ।।১৭।১"
যে মানুষ শাস্ত্রবিধি অনুসরণ না করে শুধুমাত্র শ্রদ্ধাযুক্ত হয়ে দেবতার পূজা করে তাদের স্থিতি বা কি, গতিই বা কী ? তারা সাত্ত্বিকী না রাজসী, না কি তামসী ?
__________________________________________
ব্যাখ্যা
উপরিউক্ত প্রশ্নটি একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এতক্ষণ আমরা ঈশ্বরসাধনার ক্ষেত্রে ভক্তিযোগের প্রতি যে ঝোঁক অনুভব করেছি, এখন ভগবান যা বলবেন তা নিঃসংশয়রূপে ফলিত 'ভক্তিযোগ'। ওই যে অর্জুনের জিজ্ঞাসা --- শাস্ত্রানুসরণ না করে কি পরমেশ্বরের আরাধনা করা যায় না ? আর যদি যায় তবে তা 'সত্ত্ব রজঃ বা তম' কোন গুণের মধ্যে পড়বে? অর্থাৎ গীতায় বর্ণিত সাধনমার্গের জটীল বাঁকগুলি পার হয়ে এখন একটি ঋজু, আলোকিত, আনন্দময় ভক্তিপথের রেখা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। কেননা শ্রীকৃষ্ণ বললেন,
"ত্রিবিধা ভবতি শ্রদ্ধা দেহিনাং সা স্বভাবজা।
সাত্ত্বিকী রাজসী চৈব তামসী চেতি তাং শৃণু।"
শ্রদ্ধার পথেও সত্ত্ব রজঃ ও তমোগুণের প্রকাশ আছে। শ্রীমদ্ভগবদগীতায় বার বার এই তিনটি (সত্ত্বম্ রজঃ তমঃ) গুণের কথা বলা হয়েছে এবং বেদ-ব্রাহ্মণ-উপনিষদ-পুরাণাদিতেও বার বার সে সকল গুণের বিস্তারিত ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে।
____________________________________
দেহীদের স্ব-ভাব থেকে উৎপন্ন হয় শ্রদ্ধা, যা তার জন্ম জন্মান্তরের সঞ্চিত সংস্কার থেকেই আসে। এই শ্রদ্ধা বা ভক্তি তিন প্রকারেরই হয়। কারণ শ্রদ্ধা ব্যক্তিবিশেষের অন্তঃকরণের অনুরূপ। দেখ অর্জুন, সাত্ত্বিক গুণসম্পন্ন পুরুষ দেবতাদের আরাধনা করেন, রাজগুণবিশিষ্ঠ যাঁরা তাঁরা যক্ষ রক্ষদের আরাধনা করেন এবং তামসিক যাঁরা তাঁরা ভূতপ্রেতাদির পূজা করেন। একইসঙ্গে তিনি শাস্ত্রবিধি-রহিত তপশ্চারণাকেও অবিধেয় বলে আখ্যায়িত করেছেন। এবং বলেছেন শাস্ত্রের বিধান অনুসরণ না করে, যজ্ঞ, যাজন, যজন ক্রিয়া 'কামরাগবলান্বিতাঃ' --- সে ধর্মীয় ক্রিয়াকর্মে কামনা, আসক্তি, ক্ষমতা দম্ভের উচ্ছ্বাস ঘটে। এসব আসুরী অহংকার যা মানুষের শরীরের মধ্যেও যে পঞ্চভূত (জল স্থল অগ্নি বায়ু ও আকাশ) ক্রিয়াশীল -- সেই সমস্তকে এবং তাদের সঙ্গে অন্তর্যামীরূপ আমাকেও (অন্তরস্থিত পরমাত্মাকে) অস্বীকৃতির দ্বারা কৃশ করে।
অতএব হে সখা, এবার শোন শ্রদ্ধা যেমন তিন প্রকার, ঠিক তেমনি 'ভোজন' মানুষের নিজ নিজ প্রকৃতি অনুযায়ী তিন প্রকার। তপস্যা ও দানের বিষয়েও তাই। যে আহার আয়ু বুদ্ধি বল ও আরোগ্য প্রদান করে, রসযুক্ত হয়, প্রীতিকর, স্নিগ্ধ এবং শরীরে স্থায়ী হয় সেই সব আহার্য স্বাত্ত্বিক পুরুষ আস্বাদন করেন। আর তীব্র অম্ল-কটু-তিক্ত-কষায়, অত্যুষ্ণ দাহকারী, রোগোৎপাদক আহার রজোগুণসম্পন্ন লোকেদের প্রিয় এবং তামসিক যাঁরা তাঁরা নিকৃষ্ট, অর্ধপক্ক, নিরস, উচ্ছিষ্ট, বাসী ও অপবিত্র আহারে রুচিশীল। যাগযজ্ঞ অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেও এমনি তিনটি ধারা। শাস্ত্রবিধি নির্ধারিত, ফলপ্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষাশূন্য, একনিষ্ঠ চিত্তসংযোগে যে হোমসঙ্কল্প -- তাই সাত্ত্বিক। যে যজ্ঞ শুধু মনস্কামনা পূর্ণ করার নিমিত্তে, দম্ভ প্রদর্শন ও অভিসন্ধিমূলক -- সে যজ্ঞ রাজসীক। আর বিধিবিধানহীন, মন্ত্রহীন, দক্ষিণাশূন্য, অন্নদান- সঙ্কল্পশূন্য যজ্ঞ তামসিক যজ্ঞ বলে জেনো।
এবার তপস্যার ক্ষেত্রেও ওই তিন প্রকার সাধনা আছে। সেগুলি হোল শারীরিক তপস্যা, বাক্য সম্মন্ধীয় তপস্যা এবং মানসিক তপস্যা। দেব-দ্বিজে পূজা, সরলতা বিত্রতা, ব্রহ্মচর্য ও অহিংসা পালনের মধ্যে দিয়ে শারীরিক তপশ্চারণা সাধিত হয়। বাক্যসিদ্ধি লাভ করতে হলেও সংযত, অনুদ্বিগ্নকারী, প্রিয় ও হিতকারী বাক্য প্রয়োগ একান্ত প্রয়োজন এবং তার সঙ্গে বেদাধ্যয়ন, শাস্ত্রপাঠ, ইশ্বরের নামজপের অনুশীলনের দ্বারা বাক্ তপস্যার সাধনা সাধিত হয়। সর্বোপরি, হে অর্জুন, তোমার জ্ঞাতার্থে জানাই মানসিক তপস্যাই সর্বোত্তম ও সর্বোৎকৃষ্ট।
"মনঃপ্রসাদঃ সৌম্যত্বং মৌনমাত্মবিনিগ্রহঃ।
ভাবসংশুদ্ধিঃ ইতি এতৎ তপো মানসমুচ্যতে।।"
শান্ত, প্রসন্ন, ভগবৎ-অনুধ্যানরত মন যাঁর, যিনি কুচিন্তাকে শাসনে রাখেন (আত্মনিগ্রহ), অন্তঃকরণ যাঁর পবিত্র --তিনিই মননতাপস। হে অর্জুন, ফলাকাঙ্ক্ষা-বিরহিত নিষ্কাম যোগীর সাধনাই স্বাত্ত্বীক তপস্যা। আর আপন 'মানপূজার্থম' ও অধ্রুব, অশাশ্বত, ক্ষণিক ফলদায়ী আত্মম্ভরিতাপূর্ণ যে তপস্যা তা রজোগুণসম্পন্ন। আবার মূঢ়তাচ্ছন্ন আত্মপীড়াত্মক বা পরপীড়াপ্রয়াসী তপবাসনাও আছে যা তামসিক তপস্যা নামে অভিহিত হতে পারে।
হে পার্থ, 'দান' যে পুন্যকর্ম -- এ কথা সত্য ; কিন্তু দানও ঐ তিন প্রকারের হয়। স্থান কাল ও পাত্র বিচার করে, যে দেশে, যে কালে, যে অসহায় নরনারী আর্ত ও পীড়িত তাঁদের প্রতি উদার দানই সাত্ত্বিক দানরূপে গন্য। অন্যদিকে যে দান ক্লেশপূর্বক দেওয়া হয়, প্রত্যুপকার ও ফললাভের উদ্দেশ্য নিয়ে দেওয়া হয় -- সে দান অবশ্যই রাজসিক। "তদ্দানম রাজসম স্মৃতম।"
তামসিক দানের উল্লেখও শাস্ত্র স্বীকার করে। সৎক্রিয়া ব্যতিত, তিরস্কারপূর্বক, অপাত্রে এবং অযোগ্য দেশে- কালে যে দান প্রদত্ত হয় তাই তামসিক দান বলে কথিত।
_____________________________________
ব্যাখ্যা
এই সপ্তদশ অধ্যায়ে, এখনো পর্যন্ত শ্রীকৃষ্ণ ভগবান সখা অর্জুনকে যা যা উপদেশ দিলেন সেগুলির মধ্যে দার্শনিকতা কম ; স্মৃতিতত্ত্ব বেশি। বলেছেন আহার্য, যজ্ঞানুষ্ঠান, তপস্যা ও দান-কর্মের বিধান বিষয়ে। যে সমস্ত আদেশ ও উপদেশ মানুষের ব্যক্তিজীবনের ও সমাজজীবনের সঙ্গে ওতপ্রোত (inextricably involved)। আর বলেছেন সত্ত্ব রজঃ ও তমঃ গুণগুলির কথা। তমোগুণবিশিষ্ঠদের প্রতি শ্রীকৃষ্ণের বিরাগ মাঝে মাঝেই ঘৃণায় পর্যবসিত হয়েছে। যেমন, "প্রেতান ভূতগণাংশ্চান্যে যজন্তে তামসা জনাঃ", "শ্রদ্ধাবিরহিতং যজ্ঞং তামসং পরিচক্ষতে", "মূঢ়গ্রাহেণ আত্মেনঃ যৎ পীড়য়া ক্রিয়তে তপঃ" -- অর্থাৎ পূজা, যজ্ঞ, তপস্যায় যাঁরা 'বেদ ও ব্রাহ্মণের' নির্ধারিত বিধি-বিধান পালন করেন না তাঁরা তামসিক। পণ্ডিতগণ মনে করেন স্বঘোষিত আর্যসমাজের বাইরে থাকা, বেদবিধি-না- মানা শূদ্র জনজাতির প্রতি এইরূপ বিরাগ প্রদর্শন করা হয়েছে। (ব্রাহ্মণ ছাড়া অব্রাহ্মণদের তো বেদ ব্রাহ্মণ্যবাদ ও বেদান্তের সঙ্গে কোনো যোগ ছিল না। 'শুধু ব্রাহ্মণের আছে অধিকার ব্রহ্মবিদ্যালাভে'-- রবীন্দ্রনাথ, এই ছিল রীতি। যদিও ব্যতিক্রম ছিল)।
মহাভারতের সময়কালে 'চতুর্বর্ণ' বিভাজনের মধ্যে ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয়-দের বাইরে বৈশ্য ও শূদ্র জনজাতির বিপুল গণসমাজ গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে বা সঙ্ঘে সঙ্ঘে বিভক্ত হয়ে আর্যাবর্তের প্রান্ত অঞ্চলে এবং আর্যাবর্তের বহির্দেশে বাস করতেন। এক "বাহীক (পাণিনি যাঁদের 'আয়ুধজীবী' আখ্যা দিয়েছেন) দেশস্থিত সংঘের বর্ণনা মহাভারতে বিস্তারিতভাবেই পাওয়া যায়। মহাভারতের বর্ণনায় এই মানুষগুলি সম্মন্ধে যে তীব্র ঘৃণার মনোভাব ফুটে উঠেছে তার কারণ নিয়ে আলোচনা অবশ্যই স্বতন্ত্র। আপাতত আমাদের প্রশ্ন হোল, এই বর্ণনার মধ্যে না সাধারণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ছবি পাওয়া যায়, না আদিম সমাজের কোন এক পর্যায়ের ছবি পাওয়া যায় ? কালিপ্রসন্ন সিংহের তর্জমা থেকে উদ্ধৃত করা যাক। কর্ণ বলছেন,
"হে মদ্ররাজ ! আমি ধৃতরাষ্ট্র সমীপে ব্রাহ্মণ মুখে যাহা শ্রবণ করিয়াছি, তুমি অবহিত হইয়া তাহা শ্রবণ কর। ব্রাহ্মণগণ ধৃতরাষ্ট্রমন্দিরে বিচিত্র দেশ ও পূর্বতন ভূপাতিগণের বৃত্তান্ত কহিতেন। তথায় একদা এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ বাহীক ও মদ্রদেশোদ্ভব (সমকালের ক্ষত্রিয় রাজত্বের প্রান্তেই যে তাঁরা থাকতেন, এ কাহিনী তার প্রমাণ) ব্যক্তিদিগকে নিন্দা করত কহিতে লাগিলেন, হে রাজন ! যাহারা হিমালয়, গঙ্গা, সরস্বতী, যমুনা ও কুরুক্ষেত্রের বহির্ভাগে এবং যাহারা সিন্ধুনদী ও তাহার পাঁচ শাখা হইতে দূর প্রদেশে অবস্থিত, সেই সমস্ত ধর্মবর্জিত অশুচি বাহীকগণকে পরিত্যাগ করা কর্তব্য।" .......... হে মদ্ররাজ,আর এক ব্রাহ্মণ কুরুসভায় যাহা কহিয়াছিলেন, তাহাও শ্রবণ কর। হিমাচলের বহির্ভাগে, যে স্থানে পীলুবন বিদ্যমান আছে এবং সিন্ধু ও তাহার শাখা শতদ্রু, বিপাশা, ইরাবতী, চন্দ্রভাগা ও বিতস্তা নদী প্রবাহিত হইতেছে, সেই অরট্টদেশ নিতান্ত ধর্মহীন ; তথায় গমন অবিধেয়। ব্রাহ্মণ, দেবতা ও পিতৃলোক ধর্মভ্রষ্ট সংস্কারহীন অরট্টদেশীয় বাহীকদিগের পূজা গ্রহণ করেন না। ........পঞ্চনদী পর্বত হইতে নিঃসৃত হইয়া যে স্থলে প্রবাহিত হইতেছে, সেই স্থলের নাম অরট্ট ; সাধুলোক কদাচ দুইদিন অবস্থান করিবেন না। বিপাসা নদীতে বাহ ও বাহীক নামে দুইটি পিশাচ আছে। বাহকেরা তাহাদের অপত্য। উহারা প্রজাপতির সৃষ্ট নহে ; সুতরাং হীনযোনি হইয়া কিরূপে শাস্ত্রবিহিত ধর্ম পরিজ্ঞাত হইবে ? ধর্মবিবর্জিত কারস্কর, মাহিষক, কালিঙ্গ, কেরল, কর্কোটক ও বীরকগণকে পরিত্যাগ করা কর্তব্য।"
'লোকায়ত দর্শন'--- দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়।
এখানে উদ্ধৃতি যথাসম্ভব সংক্ষিপ্ত করা হোল। কিন্তু উদ্ধৃতাংশে এই সত্যটুকু প্রতিভাত হোল যে 'তামসিক' বা শূদ্র জনজাতির বিপুল এক গণসমাজের অস্তিত্ব পরোক্ষভাবে স্বীকার করা হয়েছে শ্রীগীতায় এবং যা বিস্তারিতভাবে বর্ণিত আছে মহাভারতে যে সমাজ বৈদান্তিক 'ব্রহ্মবাদে' বিশ্বাস করতেন না। এ বিষয়ে আলোচনা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে যেতে পারে বলেই আমরা আবারও 'সর্বোপনিষদের অমৃতরস দোহনকারী' শ্রীকৃষ্ণের বাণী, পরমাত্মা বা ব্রহ্মবাদে প্রত্যাবর্তন করি।
____________________________________
সত্ত্ব রজঃ তমঃ -- এই তিন প্রকারের গুণের অনুক্রমে 'ত্রিবিধা শ্রদ্ধা', ত্রিবিধ শ্রদ্ধানুসারে ত্রিবিধ পূজার্চনা, ত্রিবিধ আহার, যজ্ঞ তপ ও দানের লক্ষণ এবং তাদের ফল বিষয়ে বিশেষ ও বিশদ আলোচনার পর শ্রীকৃষ্ণ এলেন বেদ ও উপনিষদের তিনটি মহামন্ত্রের ব্যাখ্যা ও বর্ণনায় --- ওঁ তৎ সৎ,
ওঁ তৎসদিতি নির্দেশো ব্রহ্মণস্ত্রিবিধঃ স্মৃতঃ।
ব্রাহ্মণাস্তেন বেদাশ্চ যজ্ঞাশ্চ বিহিতা পুরা।। ১৭/২৩।।
হে অর্জুন, সৎ-চিৎ-আনন্দঘন যে ব্রহ্ম তাঁকে 'ওঁ তৎ সৎ' -- এই তিন নামে স্মরণ করা হয়। তাঁর দ্বারা সৃষ্টির আদিকালে ব্রাহ্মণ, বেদ ও যজ্ঞাদি রচিত হয়েছে।
('বেদ ব্রাহ্মণ ও যজ্ঞ'-- 'বেদ' হোল ভারতীয় প্রাচীন আর্য সভ্যতার ধর্ম দর্শন ও সাহিত্যের সংকলন, যেমন ঋগ্বেদ, সামবেদ ও যজুর্বেদ। অথর্ববেদ পরবর্তী কালে বেদসংহিতায় অন্তর্ভুক্ত হয়। 'ব্রাহ্মণ' শব্দের অর্থ বহু। তাঁর মধ্যে দুটি অর্থ পণ্ডিতজনবিদিত। একটি অর্থ ব্রাহ্মণ বর্ণ এবং অন্যটি বেদের কর্মকাণ্ড। 'বেদ' বিষয়টি সুগভীর ও অসীম)।
এবং হে পার্থ, 'বেদকথা' বা 'শ্রুতি' যাঁরা বলেন এবং শাস্ত্রবিধি পালন করে যজ্ঞ, দান ও তপস্যারূপ ক্রিয়াগুলি করেন, তাঁরা সর্বদা ওঁ এই নামে পরমাত্মা (ব্রহ্ম)কে আহ্বান করে যজ্ঞদি সংকল্প আরম্ভ করেন।
পরমাত্মা 'তৎ' শব্দ দ্বারাও অভিহিত হন। ফলাকাঙ্ক্ষা না করে জগতের কল্যাণ সাধনের লক্ষ্যে সাধক পুরুষগণ যজ্ঞ, তপস্যা ও দানরূপ ক্রিয়া করার প্রারম্ভে 'তৎ' অর্থাৎ পরমাত্মাকেই স্মরণ করেন। 'সৎ' শব্দও ওই একই অর্থে প্রযোজ্য হয়। সদ্ভাবের, সাধুভাবের শ্রেষ্ঠভাবেরও দ্যোতক এই 'সৎ' শব্দটি।
"সদ্ভাবে সাধুভাবে চ সদিতেতৎ প্রযুজ্যতে।"
যজ্ঞ সঙ্কল্পে, তপস্যায় আর দানে যে স্থিতি (শান্তিময় জীবন ও প্রসন্নতা) তাকেও 'সৎ' বলা হয়। উক্ত কর্মগুলি অর্ঘ্য স্বরূপ পরমাত্মার উদ্দেশে উৎসর্গকৃত ; তাই তেমন কর্মকেও 'সৎ' নামেই অভিহিত করা হয়।
এইরূপ 'ওঁ তৎ সৎ' -য়ের মহিমা কীর্তন করবার পর স্বভাবতঃই শ্রোতার মনে এ প্রশ্ন জাগ্রত হতে পারে যে তাহলে 'অসৎ' কি ? 'অসৎ-এর ফল বা পরিণাম কি ? যদিও মধুকণ্ঠ-নিঃসৃত শ্রীকৃষ্ণের বাণী-সুধায় মুগ্ধ ধনঞ্জয় এমন প্রশ্ন করেন নি, কিন্তু পাঠক বা ভক্তদের নীরবতায় তার অনুক্ত গুঞ্জরণ থাকা স্বাভাবিক বটে। তাইই বোধ হয় ভগবান এক অমৃতময়ী শ্লোকে বলছেন,
"অশ্রদ্ধয়া হুতং দত্তং তপস্তপ্তং কৃতঞ্চ যৎ।
অসদিত্যুচ্যতে পার্থ না চ তৎ প্রেত্য নো ইহ।।"
হে অর্জুন, অশ্রদ্ধাপূর্বক যে দান প্রদত্ত হয়, অশ্রদ্ধায় যে যজ্ঞানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়, শ্রদ্ধাহীন যে তপস্যা কৃত হয় --সে সমস্ত ক্রিয়াই 'অসৎ' ; তাতে না থাকে সত্য, না থাকে পুন্য -- তা ইহলোকে বা পরলোকে কোথাও ফলপ্রসূ এবং ফলপ্রদ হয় না।
_____________________________________
ব্যাখ্যা
'শ্রদ্ধা' শব্দ অনেকার্থব্যঞ্জক। তার মধ্যে সম্মান প্রদর্শনের ভাব, পূজার ভাব, ভক্তির ভাব যেমন অভিব্যক্ত হয়, তেমনি আস্থা ও বিশ্বাসের ভাবও প্রকাশ পায়। শ্রদ্ধার মূলে আছে বিশ্বাস। বেদান্ত বলেন 'তিনি আছেন', তিনি জ্ঞানে আছেন (জ্ঞানস্বরূপ হয়ে আছেন), তিনি আমাতে আছেন, তিনি তোমাতে আছেন, তিনি আমার মধ্যে আত্মারূপে (পরম চৈতন্য) আছেন।
"প্রজ্ঞানং ব্রহ্ম।"
"অহং ব্রহ্মাস্মি।"
"তত্ত্বমসি।"
"অয়মাত্মা ব্রহ্ম।।"
আমাদের সমস্ত উপনিষদ এই চারটি "মহাবাক্য" প্রমাণ করবার জন্য, আমাদের উপলব্ধিতে প্রত্যয়িত করবার জন্য, আমাদের বিশ্বাসে দৃঢ়বদ্ধ করবার জন্য অসংখ্য এবং অন্তহীন গভীর বাণী রেখে গিয়েছেন যা মানবসভ্যতার মহাসম্পদ, যা শাশ্বত, চিরসত্য ও অনির্বচনীয়। সপ্তদশ অধ্যায়ের শেষ শ্লোকে ভগবান বাসুদেব বলতে চাইলেন, 'হে অর্জুন, তুমি যাই কর, 'বিশ্বাস'-কে আশ্রয় কর। 'বিশ্বাস'ই শ্রদ্ধার উৎস। কাকে বিশ্বাস ? কোথায় বিশ্বাস ? কেন বিশ্বাস ? উত্তর হোল ব্রহ্ম বা পরমাত্মায় বিশ্বাস (যা তুমি), এখানেই (এই আমাতেই) বিশ্বাস ; কেন না 'তুমি' ও 'আমি' তো দুটি নয় "অহম্ ত্বাম্ সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি।" (এই শ্লোকটি এবং পরম অদ্বৈতবাদ আমরা 'অষ্টাদশ অধ্যায়ে' বিশদে আলোচনা করার চেষ্টা করব)।
ভক্তিবাদের সঙ্গে অদ্বৈতবাদের কোন দ্বন্দ্ব নাই।
ওঁ তৎ সৎ।।
পরবর্তীতে অষ্টাদশ পর্ব
(অষ্টাদশ অধ্যায়)
_____________________________________
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন