সোমবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২৫

শ্রীমদ্ভগবদগীতায় অর্জুন-১৬

      শ্রীমদ্ভগবদগীতায় অর্জুন- পর্ব১৬

 ষোড়শ অধ্যায় - 'দৈবাসুরসম্পদবিভাগযোগ'।


এই সংক্ষিপ্ত ও বিশেষ অধ্যায়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মানবের অন্তরসম্পদগুলিকে 'দৈবী ও আসুরী' এই দুই ভাগে ভাগ করে দিয়েছেন এবং মানব জীবনে সে সকল সম্পদের কি কি প্রভাব দেখা দেয় তার আলোচনা করেছেন। প্রথমতঃ দৈবী ভাগ ; যেগুলি 'অভয়াদি' নয়টি গুণ ; আর 'অহিংসাদি' এগারোটি গুণ।
অভয়ং সত্ত্বসংশুদ্ধিঃ জ্ঞানযোগব্যবস্থিতিঃ।
দানম্ দমঃ যজ্ঞশ্চ স্বাধ্যায়স্তপ অর্জবম্।।

ভয়হীনতা, অন্তঃকরণের পরিশুদ্ধি, জ্ঞানলাভের জন্য ধ্যান, ধীর স্থিতি, দান, যজ্ঞ, স্বাধ্যায় বা পঠন-পাঠন, তপস্যা এবং শরীর ও ইন্দ্রিয়ের সরল (ভগবৎপ্রাপ্তির জন্য) ব্যবহার-- 'অর্জবম্'। এগুলি জীবনাচরণের দৈহিক গুণাবলী। আবার এগারোটি অন্তরসম্পদ বা চিত্তবৃত্তি আছে, যেগুলি, 

"অহিংসা সত্যম্ অক্রোধঃ ত্যাগঃ শান্তিরপৈশুনম্।
দয়া ভূতেষু অলোলুপ্ত্বম্ মার্দবম্ হ্রীরচাপলম্।।"

অহিংসা, আক্রোধ, তিতিক্ষা, শান্তি (অচঞ্চলতা), কারো নিন্দা-না-করা (অপৈশুনতা), সর্বভূতে দয়া, 'বিষয়ের সঙ্গে ইন্দ্রিয়ের আসক্তি' দমন করা (অলোলুপ্ত্বম্), কোমলতা, ব্যর্থচেষ্টায় বিরত থাকা। এ ছাড়াও আরো কিছু দৈবী সম্পদ বা গুণাবলী, যেগুলি উত্তম পুরুষের অলঙ্কার। তাঁরও সংখ্যা ছয়টি। যেমন তেজ (যা নীচতাশ্রয়ী, অন্যায়কারী মানুষদেরকে উত্তম কর্মে প্রবৃত্ত করে), ক্ষমা, ধৈর্য, পরিশুদ্ধি, মিত্রভাব (অদ্রোহ) এবং অনভিমান। হে অর্জুন, উক্ত গুণসমূহ সমুন্নত, উত্তম পুরুষের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করে। 

অপরদিকে মানবের 'বাহ্য ও অন্তর' প্রকৃতিতে এমন কিছু গুণসম্পদ আছে যেগুলি আসুরী। হে পার্থ, সেগুলি সহজেই পরিলক্ষিত হয়। যেমন দম্ভ, দর্প, অভিমান, ক্রোধ, কার্কষ্য এবং অজ্ঞান। দৈবী সম্পদ মানবাত্মাকে কামনা, আসক্তি, ইন্দ্রিয়-প্রাবল্য দ্বারা আচ্ছন্ন সংসারবন্ধন থেকে মুক্ত করে। কিন্তু আসুরী সম্পদ বা আসুরী গুণ মানবাত্মাকে দুঃখ-শোক-দীর্ণ সংসারে আবদ্ধ করে রাখে। এর পরেও শ্রীকৃষ্ণ আসুরী প্রকৃতি বিশিষ্ট পুরুষদের বিশেষ লক্ষণগুলি অর্জুনকে শুনবার জন্য আদেশ করেছেন। হে পার্থ, এই লোকে (পৃথিবীতে) ভূতগণের স্বভাব দু'রকমের হয়ে থাকে -- দেব সদৃশ ও অসুর সদৃশ। দৈবী সম্পদ বিশিষ্ট পুরুষদের চারিত্রিক গুণাবলী (এখানে দুষ্টগুণ) বিস্তারিত ভাবে বলেছেন শ্রীকৃষ্ণ, 

"দম্ভো দর্পোহভিমানশ্চ ক্রোধঃ পারুষ্যমেব চ।
অজ্ঞানং চ অভিজাতস্য পার্থ সম্পদমাসুরীম্।।"

হে পার্থ, আত্মঅহংকার, অভিমান, ক্রোধ, নিষ্ঠুর বাক্য প্রয়োগ, অজ্ঞানতা -- এই সমস্ত অমানবিক দুষ্টগুণ আসুরী পুরুষের (জাতস্য) লক্ষণ।
দেখ সখা, দৈবী সম্পদগুলি মানুষকে মুক্তির পথে নিয়ে যায় ; আর আসুরী সম্পদগুলি মানুষকে আবদ্ধ করে। দৈবীগুণ বা দেবগণের স্বভাব সম্মন্ধে আগেই তোমাকে বলেছি। এবার অসুরদের স্বভাব বা আসুরী প্রকৃতির স্বভাব সম্মন্ধে আমি সবিস্তারে বলব। তুমি মন দিয়ে শোন। "আসুরম্ পার্থ মে শৃনু।" আসুরী প্রকৃতির মানব কর্তব্য ও অকর্তব্যের বিভাগ সম্মন্ধে জ্ঞানহীন, অন্তর বাহিরের শুদ্ধি বিষয়ে অসচেতন, সদাচরণ ও সত্যভাষণে অক্ষম, বিকৃতমনস্ক। তারা ভাবে জগৎ মিথ্যা এক আশ্রয়, ইশ্বরের অস্তিত্ব বিনাই স্ত্রী ও পুরুষের সংযোগে আপনা-আপনি সৃষ্টি হয়েছে এবং এই জগৎ কেবলমাত্র ভোগের জন্যই আছে --"কামহৈতুকম"। আসুরিক প্রকৃতির লোকেরা দুরাচারী, মিথ্যা ধারণার বশবর্তী, ক্ষুদ্রমতি এবং নির্দয় খলতার আশ্রয় নিয়ে জগতের বিনাশের জন্যই উৎপন্ন হয়।  "উগ্রকর্মাণঃ জগতঃ ক্ষয়ায় প্রভবন্তি।" তারা দম্ভী, মানগর্বী, কামাশ্রয়ী। মোহগ্রস্ত হয়ে, ভ্রষ্টাচারী হয়ে অসত্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, সংসার কর্মে প্রবৃত্ত হয়। তারা আমরণ ওই সকল অপরিণামদর্শী চিন্তাকে ধারণ করে, আহৃত বিষয়সমূহ ভোগ করে এবং তার থেকেই যতটুকু ক্ষণস্থায়ী আনন্দ পায় তাইই জীবনের চরিতার্থতা বলে স্থিরনিশ্চয় হয়।

এই সমস্ত আসুরী স্বভাবের মানুষ 'আশা নামক শত শত পাশ'  দ্বারা আবদ্ধ, কাম ও ক্রোধ পরায়ণ। তীব্র কামনা বাসনার পূর্তির জন্য প্রভূত ধনাদি সঞ্চয় করে, নিত্য নিত্য লাভের হিসাব করে ; এক প্রকার ধন, একক পরিমাণ ধন সঞ্চয় করবার পর আবারো ধনাহরণে উন্মত্ত হয়ে ধাবিত হয়। তারা এক শত্রু নিধনের পর অপর শত্রুর সন্ধান করে, উত্তরোত্তর জিঘাংসার দ্বারা তাড়িত হয়। এমনকি নিজেকে 'ঈশ্বর' বলেও মনে করে। মনে করে 'আমি সুখী, আমি সিদ্ধ, আমি সমস্ত ক্ষমতার অধিকারী।
"ঈশ্বরোহহমং ভোগী সিদ্ধোহহং বলবান সুখী।"
এবং মনে করে 'আমার আহৃত, সঞ্চিত ধন-সম্পদ, আমার প্রিয় ও পরিচিত আত্মীয়-স্বজন ---এ-সবই  যেহেতু আমার অধিগত ; অতএব আমি দানী হতে পারি, হোম-যজ্ঞাদির সঙ্কল্প করতে পারি, আনন্দ-বিলাস করতে পারি।' কিন্তু হে অর্জুন, এ-সকল অহংকার অজ্ঞানতাপ্রসূত ; কেননা ধন জন বিত্ত বৈভব -- সব কিছুই ক্ষণস্থায়ী। এই অচিরস্থায়ী বিষয়ের উপর মোহাসক্তি যথার্থ জ্ঞানের পরিপন্থী, দিকভ্রান্তকারী। নরকের পথে মানুষকে নিয়ে যায়। জ্ঞানের, ধন-মানের অহংকারমদে মত্ত পুরুষ শাস্ত্রবিধি-বর্জিত হয়ে যদি যজনক্রিয়াও করে তবু সে পুন্য লাভ করতে পারে না। অহংকার, বীরদর্প, কামনা ও ক্রোধের বশীভূত, অপরের নিন্দাকারী পুরুষ নিজের দেহস্থিত এবং অপরের দেহস্থিত অন্তর্যামী পরমাত্মাকে (আমাকেও) দ্বেষ করে। এই সমস্ত নিন্দুক, দ্বেষকারী নরাধম আসুরী যোনি প্রাপ্ত হয়ে চেতনাহীন নিকৃষ্ট জীবরূপে বার বার জন্মগ্রহণ করে। 

"আসুরীং যোনিমাপন্না মূঢ়া জন্মনি জন্মনি।
মামপ্রাপ্যৈব এব কৌন্তেয় ততো যান্ত্যধমাং গতিম।।"

শোন সখা, নরকের তিনটি দ্বার 'কাম, ক্রোধ এবং লোভ।' যদি আত্মার অধোগতি প্রাপ্তির গতিরোধ করতে হয়, মানবরূপ মহাজীবনের অচরিতার্থ বিনাশ রুদ্ধ করতে হয় তবে এই ত্রিবিধ পাপ ত্যাগ করতে হবে। আত্মকল্যাণ সাধনের পথ অবলম্বন করেন যে পুরুষ, শাস্ত্রবিধি অনুসারে নির্লোভ, নিষ্কাম ও অক্রোধী হয়ে মঙ্গলময় কর্মে প্রবৃত্ত থাকেন যে পুরুষ তিনিই আমাকে প্রাপ্ত হন। কেননা শাস্ত্রবিধিকে ত্যাগ করে স্বেচ্ছাচারী হয়ে কর্ম সম্পাদন করার ফল শূন্য। সে কর্মে পরিণামে সুখ, সিদ্ধি বা পরম গতি --- কিছুই থাকে না। তাই, হে অর্জুন, শাস্ত্র প্রমাণ সাপেক্ষ কর্ম করবার যোগ্যতা অর্জন কর। 

"তস্মাচ্ছাস্ত্রং প্রমাণং তে কার্যাকার্য ব্যবস্থিতৌ।
জ্ঞাত্মা শাস্ত্রবিধানোক্তম্ কর্ম কর্তুমিহার্হসি।।"
___________________________________________

                               ব্যাখ্যা
শ্রীমদ্ভগবদগীতার এই ষোড়শ অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ "দৈবাসু্রসম্পদবিভাগ" বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয় মানব, দানব (অসুর) ও দেবতাদের ভিন্ন ভিন্ন আকার প্রকার বা অস্তিত্বের রূপরেখা চিত্রায়িত করেন নি। স্বভাব, মনন, সাধন ও কর্ম-অনুসারে মানুষ দৈবী এবং আসুরী প্রকৃতি লাভ করে -- এমন কথাই তিনি বলতে চেয়েছেন। আর শেষে বলেছেন শাস্ত্র বিধি অনুযায়ী কর্ম করবার কথা। কিন্তু কিছু কিছু বৈদান্তিক ও পুরাণবিদ শ্রীগীতার নানা বিরুদ্ধ ব্যাখ্যাও করেছেন। ঐ যে ষোড়শ অধ্যায়ের ষষ্ঠ শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন,

"দৌ ভূতসর্গৌ লোকেহস্মিন্ দৈব আসুর এবং চ।
দৈবো বিস্তরশঃ প্রোক্ত আসুরং পার্থ মে শৃনু।।"

-- যার যথার্থ অর্থ হবে "এই লোকে (পৃথিবীতে) ভূতগণের স্বভাব দু'রকমের 'মতো' হয়ে থাকে -- দেব সদৃশ ও অসুর সদৃশ। তার মানে মানুষের মধ্যেই 'দৈবীপ্রকৃতি ও আসুরী প্রকৃতি' বর্তমান থাকে।
কিন্তু 'লোকায়ত দর্শনে' এই শ্লোকটির ব্যাখ্যা ভিন্ন প্রকার। "লোকায়ত-মত যে আসলে অসুরদেরই মত এ বিষয়ে আর একটি উল্লেখযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় শ্রীমদ্ভগবদগীতায়। শ্রীভগবান বলছেন, ইহলোকে দুই জাতি সৃষ্টি হইয়াছিল -- দৈবী ও আসুরী। হে পার্থ, 'দৈবী' বিস্তারপূর্বক বর্ণনা করেছি, এক্ষণে 'আসুরী' শোন। এই আসুরী বলতে একটি (নির্দিষ্ট) মত বোঝায় কি ? শ্রীধরস্বামী বলেছেন (এটিই) লোকায়ত মত। শ্রীমদ্ভগবদগীতাতেও এই আসুরী মতের বর্ণনায় চোদ্দ আনাই ঘৃণা ও বিদ্বেষ। কিন্তু তাছাড়াও অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক কথাও পাওয়া যায় (পরবর্তীতে, শ্লোক অষ্টম, ষোড়শ অধ্যায়)। আসুরী মত অনুসারে --- 

অসত্যমপ্রতিষ্ঠং তে জগদাহুরনীশ্বরম্।
অপরস্পরসম্ভূতম্ কিমন্যৎ কামহৈতুকম।।

প্রথম পংক্তির অর্থ নিয়ে কিছুটা অস্পষ্টতা থাকতে পারে। খুব সম্ভব এর অর্থ হলো ঈশ্বরের উপর প্রতিষ্ঠিত অর্থে জগৎ সত্য নয় ; কেননা ঈশ্বরই নেই। কিন্তু দ্বিতীয় পংক্তির অর্থ অত্যন্ত স্পষ্ট : জগৎ কামোদ্ভূত, স্ত্রী পুরুষের মিলনজাত।

(শ্রীকৃষ্ণ 'অসুর, আসুরিক' শব্দ ব্যবহার না করে বলেছেন 'আসুরী'।) আসুরী মতের এই কথাটি কিন্তু আমাদের কাছে নূতন নয়। তন্ত্রের সৃষ্টিতত্ত্ব আলোচনায় আমরা এই মতের পরিচয় পেয়েছি, পেয়েছি সাংখ্যের সৃষ্টিতত্ত্বে। ..... শ্রীধরস্বামীর মত যদি ঠিক হয়, অর্থাৎ আসুরী-মত বলতে গীতায় যদি লোকায়ত-মতই যদি বুঝিয়ে থাকে --- এবং এই সৃষ্টিতত্ত্বই যদি আসুরী-মতের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়, তার হলে এই সূত্র ধরে আমারা লোকায়ত, তন্ত্র এবং সাংখ্যের মধ্যে একটা সম্পর্ক খুঁজে পাই।" 

        'লোকায়ত দর্শন' -- দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়।

প্রাগার্য্য, প্রাক-বিভক্ত, প্রাক-বৈদিক এবং প্রাক-অধ্যাত্মবাদী প্রাচীন ভারতীয় সমাজে অসুর-ট্রাইবদের নিজস্ব দর্শন ছিল। সেই দর্শনের প্রণেতা ও প্রচারক ছিলেন কপিল, চার্বাক প্রভৃতি ঋষিগণ। বহিরাগত আর্যদের সঙ্গে অসুর জনগোষ্ঠীর সংঘাত অনিবার্য ছিল ; যার বর্ণনা আমরা পাই ঋগ্বেদে, যেখানে অসুরদের বিরুদ্ধে ইন্দ্রের যুদ্ধের বর্ণনা আছে। অসুর সম্প্রদায়ের দর্শন বৈদিক ও বৈদান্তিক দর্শনের বিরোধী ছিল বলেই আসুরী-প্রকৃতির বা, বলা ভালো, আসুরী-পন্থী মানুষের প্রতি পরমাত্মায়-বিশ্বাসী, ব্রহ্মবাদী, উপনিষদীয় চৈতন্য-সত্ত্বার প্রতিভূ শ্রীকৃষ্ণ এতখানি কঠোরভাবে বিতৃষ্ণ। লোকায়তিকদের ব্যাখ্যা তেমনই।
কিন্তু শ্রীগীতার ষোড়শ অধ্যায়ের একবিংশতম মহাবাণীর শাশ্বত সত্যকে কোন বস্তুবাদী, নিরীশ্বরবাদী, শূন্যবাদী বা ভোগবাদী (চার্বাক) যুক্তি দ্বারা নস্যাৎ করা কি সম্ভব ? 

ত্রিবিধং নরকস্যেদং দ্বারং নাশনমাত্মনঃ।
কামঃ ক্রোধস্তথা লোভস্তস্মাদেতৎ ত্রয়ং ত্যজেৎ।।

ওঁ শান্তি শান্তি শান্তি হি।
পরবর্তীতে সপ্তদশ পর্ব (সপ্তদশ অধ্যায়)।
____________________________________________


















কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...