দুঃখ--পর্ব-১
জানি এবং মানি, সকলেই জানেন এবং মানেন যে 'দুঃখ' বা বলা ভালো, দুঃখের যে অনুভূতি তা বিশ্বজনীন এবং অনাদ্যন্ত। মানবেতর প্রাণে দুঃখের আঘাত কতখানি বাজে, কতক্ষণ থাকে সেটি তেমন করে জানা যায় না, যেমন অনুভূত হয় আমার নিজের বেলায় এবং কিছুটা হলেও আপনার মানুষদের বেলা। তবে ঐ মানবেতর প্রাণ যদি আমাদের ভালোবাসার কেউ হয় তবে তার দুঃখের দৃশ্যও আমাদের আপনজন-বিরহবেদনার মতই অসহনীয় হয়ে ওঠে।
গতকালের একটি ঘটনা বলিঃ
আমার পাড়ায় কুকুরদের ছোট-খাটো একটি দল আছে, যেমন এই কলকাতা মহানগরীর সমস্ত পাড়াতেই থাকে। রোজই তাদের দেখি ঘরের বাইরে যাওয়া-আসায়। কয়েকদিন আগে দেখেছিলাম তাদের মধ্যে এক মা-কুকুরের দুটি ছানা হয়েছে। প্রথম প্রথম দেখছিলাম ছানাদুটি বাদুড়ের মত উপরমুখো হয়ে তাদের মায়ের স্তন্যপান করছে বা বিশ্রামরত মায়ের পেটের সাথে মিশে ঘুমিয়ে রয়েছে। পরে, বেশ কয়েকদিন পরে দেখি তাদের ছোটাছুটি, ধূলাখেলা, পথে-পড়ে-থাকা আবর্জনার টুকরো নিয়ে দুই সারমেয়-শিশুর খুনসুটি। পথচারীদের দৃষ্টিও তাদের উপর পড়েছে। এ-বাড়ি, ও-বাড়ী থেকে বেরিয়ে এসে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা, মেয়রাই বেশি, খাবারও পরিবেশন করছে --- পাউরুটির টুকরো, আস্ত বিস্কুট ইত্যাদি। আরো দিন কাটল, দিনে দিনে চোখলাগুরকম ডাগর হোল -- বেশ নাদুস নুদুস। আমাদের পায়ে পায়ে কিছুটা লাফাতে লাফাতে আসে, আবার তাদের মায়ের কাছে ফিরে যায়। মাকে সর্বাঙ্গ দিয়ে মায়ের সর্বাঙ্গে আদর মাখায়। আধচোখ-বোজা মায়ের সে তৃপ্তি যেন মূর্তি লাভ করে তেমনি যেমনটি দেখি মানবী মায়ের বাৎসল্যের প্রকাশে।
হঠাৎ শীতটাও বাড়ল, ঘন কুয়াশাও নামল, শরীরটাও বিগড়াল। কিন্তু বুড়ো বুড়ির সংসার। তিনটি দিনের বেশী ঘরে বসে থাকলে উনোন বন্ধ, 'মাইকিং' শুরু। অগত্যা সামান্য কুয়াশা কাটতেই সকাল সকাল 'উলম্ব বস্তির' চারতলা থেকে নেমে গলিপথে দশ'পা যেতেই পাগুলো অসাড় হয়ে গেল ! মা কুকুর একটি ছানার আধটুকরো মুখে করে নিয়ে কোথায় যায় ! কাঁপা কাঁপা পায়ে কিছুটা এগিয়ে যেতেই দেখি ওই ছানাটির আরেকটি টুকরোর সাথে মুখের টুকরোটা সে রাখছে ! আমি দাঁড়িয়ে। সে একবার করে আমর দিকে চাইছে, আবার মুখ নামিয়ে রক্তে ভেজা, কাটা অংশ দুখানা এক সাথে রাখছে।
এর মধ্যে আরো দু'একজন এলেন, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলেন। কেউ কুয়াশার, কেউ অজ্ঞাত গাড়িচালকের, কেউবা পথ কুকুরদের বাড়বাড়ন্তের জন্য মিউনিসিপ্যালিট উপর দায় চাপিয়ে আপন আপন মন্তব্য দিয়ে গন্তব্যের দিকে চলে গেলেন। আমিই বা কি করতে পারি ! আমিও বাজারে গেলাম। ফেরার সময় ভেবেছিলাম, ও'পথে আর যাব না। একটু ঘুরপথেই যাব। কিন্তু পারলাম না। 'দৃশ্যটা' যেন আমাকে টেনে ওই পথেই নিয়ে এল। ওই গলিপথের বাঁকটাতে, ওই অকুস্থানের দিকে আর চোখ দেব না ভেবে ভেবে এসেও চোখ চলেই গেল। দেখি ছিন্ন ছানাটি নেই ; 'সেনেটারির' লোকেরা নিয়ে গিয়েছে নিশ্চয়ই। কিন্তু জায়গাটিতে, শুকিয়ে-যাওয়া-রক্তে ভিজা ভিজা কালচে পিচ রাস্তায় লোম চামড়ার সামান্য কিছু অবশিষ্টের উপর মুখটি গুঁজে, কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে রয়েছে মা'কুকুরটি, আর তার সামনে একটা ভাঙা টিনের বাটিতে রাখা আছে অনেকগুলি রুটির টুকরো। অন্য ছানাটি, (আগেরটির তুলনায় সুন্দরতর, অন্ততঃ সাদা রঙের জৌলুসে) রুটির একটি একটি খণ্ড মুখে তুলে নিয়ে মায়ের কাছে রেখে আসছে। মা'টি কিন্তু নিঃসাড়। কিছুক্ষণ চেয়ে রইলাম ; তারপর ঘরমুখো হতেই হোল।
এ সংবাদটি গৃহিণীকে দিলাম না। জানি, সেটি তিনি এমনভাবে নেবেন যে তাঁকে সামাল দিতে দিতেই সেদিনটা নয়, বেশ কয়েকটি দিন কেটে যাবে। তারপর আবার সন্ধ্যাবেলায় পাশের অ্যাপার্টমেন্টের এক ফ্ল্যাটে গৃহপ্রবেশের নেমন্তন্ন আছে। আজকের জন্য 'মনখারাপের' বিষয়টি না হয় আমার একলারই থাক্। শীতের দিন, দুপুরবেলাটা নেহাতই ছোট। সন্ধ্যা হোল। নেমন্তন্ন বাড়িতে গেলাম। 'সিনিয়র সিটিজেন' ; "আপনারা বসে পড়ুন", এবং ঠান্ডার দোহাই দিয়ে আগেভাগেই ফিরে এলাম। টিভি খুলে বসলাম, আগ্রহে নয়, চাপা কষ্টটা ভুলে থাকার তাগিদে। কিন্তু তাতেও মনের উপর আঘাতের পর আঘাত। প্রতিবেশী দেশ জ্বলছে, গুলি ছুটছে, অর্ধমৃত করে কাউকে সল্লোসে পোড়ানো হচ্ছে, প্রতিষ্ঠান-পরিকাঠামো পুনরায় মাটিতে মিশে যাচ্ছে। স্বদেশের ভিতরেও খুন-ধর্ষণ, নারীনিগ্রহ, অজানা যুবকের লাশ পড়ে আছে ধানক্ষেতে, মন্দির-মসজিদ এখন বিদ্বষের তীর্থস্থান এবং রাজনীতির বিষাক্ত রণহুংকার, ধর্ম নিয়ে ধুন্ধুমার ! করি কি ? না, থাক্। টিভি বন্ধ করেই শান্তি।
কিন্তু কোথায় শান্তি ! ওই পাশের অ্যাপার্টম্যান্ট থেকে এবার ভেসে আসছে উৎসবের আসল কোলাহল। তরুণদের পার্টি -- হাসি-গান-নাচ-হুল্লোড়। ওদিকে গেটের বাইরে, সেটাও আবার আমারই ঘরের দিকটায়, ডাষ্টবিনে মাংস-বিরিয়ানির গন্ধে এসে জুটেছে এপাড়া, ওপাড়া, সেপাড়া, বেপাড়ার অনাহুত শ্বাপদদের ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠী। তুমুল সংক্ষোভ, বিক্ষোভ, সংঘাত ! কুকুর কেলেঙ্কারি নয়, কুকুরদের কুরুক্ষেত্র !
ঘুমাতে পারিনি এমন নয়। ঘুমের ওষুধ খাই। ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। যথারীতি ঘুম থেকেও উঠেছি সকালে। সহধর্মিণী আগেই উঠেছিলেন। যথানিয়মে চা-য়ের টেবিলে মুখোমুখি বসেছিলাম। কিন্তু ওই, 'তাঁর মেয়ে, ছেলেবউদের ঠিক কি করা উচিত, নকুলদানা আনতে কেন রোজ ভুলে যাই', কাজের মেয়েটা দুনিয়ার সেরা ফাঁকিবাজ -- এসবের মধ্যেই তাঁর মানস-বিচরণ। বাইরের যা ঘটমান তাতে তাঁর কি করবার আছে ? খাঁটি কথা। ওই নকুলদানা আনার ভার নিয়ে আমি বের হলাম বটে, তবে ওই হতভাগিনীকে দেখবার একটি আকর্ষণও ছিল ; কেননা অন্যমনস্ক হয়েও কয়েকটি বিস্কুট নিলাম পকেটে। গলিটাতে দশ পা'ও যেতে হোল না। এবার যা ঘটনা তার ভাষা কোথায় ! চার-পাঁচজন লোক, তিনটি ছোট ছোট মেয়ে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে। আমিও গিয়ে দাঁড়ালাম। মাথা গলিয়ে দেখি ওই মা'কুকুরটাই ! তার দ্বিতীয় ছানাটিকে হাঁ-মুখে ধরে তুলবার চেষ্টা করছে। ছানাটির সারা শরীর রক্তে চবচবে। তার ঘাড়ে, পিঠে, গলায় দগদগে ক্ষত। মরে গিয়েছে অনেক আগেই। মা'টা জানে না ; তারও মরতে বোধ হয় আর বেশি বাকি নেই ! তার পিঠের সঙ্গে পেট এক হয়ে গিয়েছে, ঘাড়টা, কান দুটো ঝুলে পড়েছে। পাগুলো যেন চারখানা কাঠি।
পাড়ার দর্শকরা সহমত একটিই কারণে, যে গতরাতে ভিন পাড়া থেকে যে সকল বাঘা বাঘা 'লিডার ডগ'রা পাশের অ্যাপার্টমেন্টের ডাষ্টবিনের দখল নেবার জন্য এসেছিল তারাই এই শিশুটির উপরেই তাদের শ্বাদন্তের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করেছে। আমি মা' কুকুরটির মুখের কাছে বিস্কুটগুলো দিলাম ; কিন্তু সে শুঁকেও দেখল না। শুধু ঝোলা মুণ্ডুটা অল্প একটু উঠিয়ে, আকাশের দিকে ঘোলা ঘোলা চোখ তুলে কী যে একরকম আর্ত ডাক ডেকে উঠল ! আমি আর সহ্য করতে পারলাম না।
(গল্প নয়, সত্য ঘটনা। এটি একটি প্রবন্ধের ভূমিকাস্বরূপ। ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে)।
(ক্রমশঃ)
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২৪/১২/২০২৫
কলকাতা।
_________________________________________
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন