সাধারণ মানুষরূপী রামচন্দ্র
পাঠ -- দুই
অরণ্যকান্ড ও কিষ্কিন্ধ্যাকান্ড
অরণ্যকান্ডের শেষে আমরা দেখলাম সীতার সন্ধানে গভীর বন থেকে গভীরতর বনান্তরে যেতে যেতে রাম লক্ষ্মণের সঙ্গে সাক্ষাৎ হোল মুমুর্ষ জটায়ুর।
"যেতে যেতে একস্থানে রাম দেখলেন, গিরিশৃঙ্গের ন্যায় জটায়ু রক্তাক্ত দেহে পড়ে আছেন। ধনুতে ক্ষুরধার শর সন্ধান করে রাম বললেন, এই পক্ষিরূপধারী রাক্ষসই সীতাকে খেয়েছে তাতে সন্দেহ নাই, একে আমি বধ করছি। জটায়ু সফেন রুধির বমন করতে করতে অতি দীন বাক্যে বললেন, আয়ুষ্মান, তুমি যাকে খুঁজছ সেই দেবীকে রাবণ হরণ করেছে, আমার প্রাণও হরণ করেছে। অসহায়া সীতাকে রাবণ নিয়ে যাচ্ছে দেখে আমি তার সঙ্গে যুদ্ধ করে তাকে ভূপাতিত করেছি, তার ধনু শর রথ ও ছত্র চূর্ণ করেছি, সারথিকেও বধ করেছি। অবশেষে আমাকে পরিশ্রান্ত দেখে রাবণ খড়্গাঘাতে আমার পক্ষ ছেদন করে সীতাকে আকাশমার্গে নিয়ে গেছে। রাক্ষস আমাকে মেরে রেখেছে, তুমি আবার মেরো না।
ধনু ফেলে দিয়ে রাম সরোদনে জটায়ুকে আলিঙ্গন করে লক্ষ্মণকে বললেন, রাজ্যনাশ বনবাস, সীতাবিয়োগ, জটায়ুর মরণ সবই আমার ভাগ্যে হোল, আমার অলক্ষ্মী আগ্নিকেও দগ্ধ করতে, সাগরকেও শুষ্ক করতে পারে। এই মহাবল গৃধ্ররাজ পিতৃবয়স্য জঠায়ুও মরণাপন্ন হয়েছেন।
( রাম সাশ্রুনেত্রে আসন্নমৃত্যু জটায়ুর কাছে জানতে চাইলেন রাবণের বীর্য, রূপ কি প্রকার, জানতে চাইলেন সীতার অবস্থা তখন কেমন ছিল। জটায়ু বললেন মায়াবী রাবণ মেঘ ও ঝটিকা সৃষ্টি করে সীতাকে আকাশ পথে নিয়ে গেছে।) জটায়ুর মুখ থেকে সমাংস রুধির নির্গত হতে লাগল 'বিশ্রবার পুত্র, কুবেরের ভ্রাতা' --এই কথা বলেই তিনি প্রাণত্যাগ করলেন। রাম কৃতাঞ্জলি হয়ে বললেন, 'বল বল', কিন্তু জটায়ুর মস্তক তখন ভূলুণ্ঠিত হল, তিনি চরণ প্রসারিত করে শয়ন করলেন।মৃত জটায়ুর জন্য রাম বহু বিলাপ করলেন। তাঁর আদেশে লক্ষ্মণ কাঠ নিয়ে এলে রাম চিতা রচনা করে গৃধ্ররাজকে দাহ করলেন। তারপর মৃগমাংসের পিন্ড দিয়ে হরিদ্বর্ণ তৃণময় ক্ষেত্রে পক্ষীদের ভোজন করালেন এবং দুই ভ্রাতা গোদাবরীতে গিয়ে তর্পণ করলেন।
(এরপর ভ্রাতৃদ্বয়ের দক্ষিণ দিকে ক্রৌঞ্চারণ্যে যাত্রা, আবার পূর্বদিকে --- মাতঙ্গ মুনির আশ্রমে, আরো গহনারণ্যে, পাতালতুল্য গভীর অন্ধকারময় গিরিকন্দর, সেখানে তীক্ষ্ণদশনা, লম্বোদরী, ভীমাকৃতি রাক্ষসী অয়োমুখী গোটা হরিণ খেতে খেতে লক্ষ্মণের কাছে এসে তাকে কামনা করে। লক্ষণ কুপিত হয়ে খড়্গাঘাতে তার কর্ণ নাসিকা ও স্তন কর্তণ করে।
আবার তাঁরা অগ্রসর হন। আবার কবন্ধ রাক্ষস। সে ছিল শাপগ্রস্ত, শ্রী নামক দানবের পুত্র দনু। রাম লক্ষ্মণের দ্বারা নিহত ও সৎকৃত হয়ে সে মুক্তি লাভ করলে বানররাজ ভ্রাতা বালীর দ্বারা বিতাড়িত সুগ্রীবের সন্ধান দিলেন। সুগ্রীব কামরূপী, কৃতজ্ঞ এবং নিজেও সাহায্য প্রার্থী। তোমার ভার্যার অনুসন্ধানের জন্য তিনি মহাকায় বানরদের চতুর্দিকে পাঠাবেন এবং মেরুশৃঙ্গ বা পাতালে গিয়েও রাক্ষস বধ করে সীতাকে তোমার হস্তে দেবেন।
এবার সুগ্রীবের বাস সম্মন্ধে বললেন,
পশ্চিম দিকে যেখানে বহু পুষ্পিত বৃক্ষ দেখা যাচ্ছে সেখান দিয়েই তোমার মাত্রার উত্তম পথ। যেতে যেতে তোমরা ফলভারে অবনত অনেক মহাবৃক্ষ দেখবে, শাখা নমিত করে তাদের অমৃততুল্য ফল ভক্ষণ ক'রো। পর্বত থেকে পর্বতে, বন থেকে বনে গিয়ে পম্পার তীরে উপস্থিত হবে। এই পুষ্করিণীতে কঙ্কর ও শৈবাল নেই, কমল ও উৎপলে শোভিত, তলদেশ বালুকাময় অপিচ্ছিল। তার তীরে বহুপ্রকার পক্ষী কূজন করে, তারা মানুষকে ভয় করে না। তোমরা সেই সকল ঘৃতপিন্ডতুল্য স্থল পক্ষী ভক্ষণ ক'রো। পম্পার জলে এক-কন্টক উৎকৃষ্ট রোহিত, চক্রতুন্ড ও নলমীন মৎস্য আছে, লক্ষ্মণ শরাঘাতে তাদের মেরে ত্বক ও শল্ক ছাড়িয়ে শূলপক্ক করে দেবেন। তোমার ভোজন হলে লক্ষ্মণ তোমাকে পদ্মপত্রে পম্পার নির্মল জল এনে দেবেন।
ওখানকার বনে মতঙ্গ মুনির শিষ্যগণ বাস করতেন। ফল মূল আহরণের শ্রমে তাঁদের যে স্বেদবিন্দু পড়ত তার থেকে বিবিধ পুষ্প উৎপন্ন হয়েছে, এই সকল পুষ্প কখনও শীর্ণ বা ম্লান হয় না। তাঁরা এখন গত হয়েছেন, কেবল তাদের পরিচারিণী শবরী নামে এক শ্রমণী ওখানে আছেন। এই ধর্মশীলা সন্ন্যাসিনী তোমাকে দর্শন করে স্বর্গলোকে যাবেন। রাম, তুমি পম্পার পশ্চিম তীর দিয়ে গেলে মতঙ্গ ঋষির আশ্রম দেখতে পাবে। সেই রমণীয় স্থানের নাম মতঙ্গ বন। হস্তীরা সেখানে যেতে পারে না। তার অদূরেই ব্রহ্মার রচিত ঋষ্যমূক পর্বত। লোকে তার শিখরে শুয়ে নিদ্রাবস্থায় যত ধনের স্বপ্ন দেখে, জাগ্রত হলে ততই পায়। এই পর্বতে এক দুষ্প্রবেশ্য গুহা আছে, সুগ্রীব তার সহচর বানরদের সঙ্গে তার মধ্যে বাস করেন, সময়ে সময়ে পর্বতের উপরেও থাকেন।
(রাম ক্ষত্রীয় রাজ কুমার। তাঁর খাদ্যাভ্যাস রাজকীয় হবে --তাই স্বাভাবিক। পাঠান্তরে মানুষরূপী রামচন্দ্রের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলি ধারাবাহিক আলোচনা করা হবে। )
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন