দুঃখ-পর্ব ৩
আমাদের প্রাচীন সাহিত্যের মধ্যে চতুর্বেদ, ব্রাহ্মণ ও আরণ্যকগুলি, উপনিষদসমূহ, শ্রীমদ্ভগবদগীতা, দর্শনগ্রন্থ (ষড়দর্শন), এবং বৌদ্ধ, জৈন ধর্মদর্শনের অসংখ্য গ্রন্থরাজি ছাড়াও অষ্টাদশটি পুরাণ আছে। দুটি প্রধান মহাকাব্য আছে। রামায়ণ ও মহাভারত। রামায়ণ প্রকৃত অর্থেই একটি অপরূপ কাব্য যেখানে রাম-রাবণের যুদ্ধ প্রধান হলেও অপ্রধান আখ্যানভাগ- -যেমন রামচন্দ্রের জন্মকালের প্রাক-কাহিনী থেকে সীতাহরণ, সীতাদেবীর সন্ধান, সাগরবন্ধন। মাঝখানে মহারণ। যুদ্ধের পরবর্তীকালে রামের অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তন, রামরাজত্ব, সীতাদেবীর পুনরায় নির্বাসন এবং রামসন্নিধানে সীতার কুণ্ঠিত পুনরাগমন ও তাঁর পাতাল প্রবেশ -- এই আখ্যানগুলির রামায়ণ মহাকাব্যের কাব্যিক প্রকাশ তুলনারহিত। (যদিও অনেক পণ্ডিতদের মতে রামায়ণের 'উত্তরা খণ্ড' প্রক্ষিপ্ত ; আমারা সে দ্বন্দ্বে যেতে চাই না)। রামায়ণকে 'প্রকৃত অর্থেই' কাব্য বলতে চেয়েছি এই কারণেই যে সে কাহিনী মহাকবির মনোভূমির ফসল। ব্রহ্মার নির্দেশ পেয়ে নারদ ঋষি যখন বাল্মীকিকে রামচরিত রচনা করবার আদেশ করেন তখন আদিকবি সত্যাসত্যের দ্বন্দ্বে দ্বিধান্বিত ছিলেন। কিন্তু নারদ বলেছিলেন, "সেই সত্য যা রচিবে তুমি।" বাল্মীকি ও নারদের কথোপকথনের কিছু অংশ আরেক কবির বাণীতেই শুনি,
"ত্রিভূবন তোমাদের প্রত্যক্ষে বিরাজে --
কহ মোরে কার নাম অমর বাণীর ছন্দে বাজে।
কহ মোরে বীর্য কার ক্ষমারে করে না অতিক্রম,
কাহার চরিত্র ঘেরি সুকঠিন ধর্মের নিয়ম
ধরেছে সুন্দর কান্তি মানিক্যের অঙ্গদের মত,
মহৈশ্বৈর্যে আছে নম্র, মহাদৈন্যে কে হয়নি নত,
সম্পদে কে আছে ভয়ে, বিপদে কে একান্ত নির্ভীক,
কে পেয়েছে সব চেয়ে, কে দিয়েছে তাহার অধিক,
কে লয়েছে নিজ শিরে রাজভালে মুকুটের সম
সবিনয়ে সগৌরবে ধরামাঝে দুঃখ মহত্তম, --
কহ মোরে সর্বদর্শী, হে দেবর্ষি, তার পুন্য নাম।
নারদ কহিলা ধীরে -- অযোধ্যার রঘুপতি রাম।
জানি আমি জানি তাঁরে, শুনেছি তাঁহার কীর্তিকথা,
কহিলা বাল্মীকি, তবু নাহি জানি সমগ্র বারতা,
সকল ঘটনা তাঁর --- ইতিবৃত্ত রচিব কেমনে ?
পাছে পথভ্রষ্ট হই, এই ভয় জাগে মোর মনে।
নারদ কহিলা হাসি, সেই সত্য যা রচিবে তুমি,
ঘটে যা তা সব সত্য নহে। কবি, তব মনোভূমি
রামের জনমস্থান, অযোধ্যার চেয়ে সত্য জেনো। .."
অপরদিকে 'মহাভারত' আরেক মহাকবি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস কর্তৃক রচিত, এ কথা সর্বৈব সত্য, (যদিও একজন ব্যাসদেব, না বেদব্যাস গুরুকুল -- এ বিষয়ে নানা পণ্ডিতদের নানা মত আছে) মহাভারতের কাব্যসুষমাও 'অমৃতসমান'--এও সত্য, তা হলেও এই মহাগ্রন্থের ঘটনাগুলি, কিছু কিছু ব্যতিক্রম থাকলেও, ইতিহাসের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্লিষ্ট করে না। মহাভারতের আদিপর্বের একটি শ্লোকে বলা হয়েছে,
"আচখ্যুঃ কবয়ঃ কেচিৎ সম্প্রত্যাচক্ষতে পরে।
আখ্যাস্যন্তি তথৈবান্যে ইতিহাসমিমং ভূবি।।"
এই ইতিহাস পূর্বেই কিছু কিছু কবি বলে গিয়েছিলেন, এখন অপর কবিরা বলছেন, আবার অন্য অন্য কবিরাও ভবিষ্যতে বলবেন।
প্রথমে ভারতবর্ষের ধর্মগ্রন্থ, দর্শনগ্রন্থগুলির অতি সামান্য পরিচয় দিয়ে 'রামায়ণ ও মহাভারত'-এর কথা উল্লেখ করছি এই কারণেই যে আমাদের দেশের 'ধর্ম' ও 'দর্শনে' যে জ্ঞানালোকের সন্ধান করা হয়েছে, মানবধর্মের সত্যরূপ প্রতিষ্ঠা করবার চেষ্টা হয়েছে দুই মহাকাব্যের কাহিনীর বা কাহিনীগুলির মধ্যে সে সব জ্ঞান ও দর্শনের ফলিতরূপ দুর্লভ না হলেও খুবই স্বল্পভাবে পরিদৃশ্যমান। বেদ ও ব্রাহ্মণ সংহিতাগুলির জটিল যজ্ঞাদি কর্মকাণ্ড ধীরে ধীরে ক্ষীয়মান হয়েছে। প্রস্থানত্রয়ী অর্থাৎ উপনিষদ, গীতা ও ব্রহ্মসূত্র বা বেদান্ত দর্শন জ্ঞানমার্গের সাধনা করেছেন এবং সে সাধনা মানুষের আত্মোপলব্ধির এমন এক সীমাহারা অনন্তে উপনীত হয়েছে যেখানে মানুষ বলতে পারে 'অহম ব্রহ্মাস্মি'* (বৃহদারণ্যক উপনিষদ)। কিন্তু এতদসত্ত্বেও ভারতবর্ষের ব্যবহারিক এবং সামাজিক জীবনে সেই উচ্চমার্গীয় জ্ঞানালোকের প্রকাশ ঘটেনি ; যদিওবা ঘটেছে তবু তা পাশবিক প্রবৃত্তির অন্ধকার থেকে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে আলোকিত করতে পারেনি। এমনকি যে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় সমাজের অভ্যন্তর থেকে উচ্চারিত ও উদ্গীত হয়েছে পরম কল্যাণময়ী জ্ঞানের মন্ত্র সে সবের মর্মার্থ 'স্মৃতিশাস্ত্রের' ব্যাখ্যায় এসে সংস্কার যুগপৎ কুসংস্কারসর্বস্বতায় পর্যবসিত হয়েছে। 'বিশ্বাসের' বা কোনটি ধর্ম আর কোনটি অধর্ম তার বিচার মানুষই করেছে এবং যুগোপযোগী করে নিয়েছে। ন-আর্য জনগোষ্ঠীর সমাজ, যে সমাজ আর্যদের আগমনের (যদি তাঁরা বহিরাগত হন) বহুকাল পূর্ব থেকেই ভারতবর্ষ নামক পূর্ব গোলার্ধের এক বিশাল ভূখণ্ডের ভিন্ন ভিন্ন স্থানে, ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক বিধিবিধান পালন করে বসবাস করত। প্রাচীন ভারতীয় গবেষকগণ যেমন সায়নাচার্য, মাধবাচার্য প্রভৃতি, আধুনিক গবেষকগণ যেমন অধ্যাপক রাধাকৃষ্ণণ, অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ দাসগুপ্ত, মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এবং, অধ্যাপক তুচি, রিচ ডেভিডস্, বেলেভার, রানাডে, মূয়ার, কাওয়েল প্রভৃতি বিদেশী গবেষকগণ (যাঁরা বৌদ্ধ, জৈন, চার্বাক দর্শন সহ ভারতীয় 'লোকায়তিক' দর্শনের উপর নিবিড় গবেষণা করেছেন), সকলেই একটি বিষয়ে নিঃসংশয় হয়েছেন যে ন-আর্য এবং আর্য উভয় জনগোষ্ঠীই আদি অবস্থায় রক্ষণশীলতাহীন (liberal) ছিল ; আবার স্ত্রী বা নারীদের প্রতি পুরুষদের নিষ্ঠুরতাও ছিল। মহাভারতের আদিপর্বে (অধ্যায় ১২২) একটি আখ্যানে বলা হয়েছে,
পুরাকালে উদ্দালক নামে এক মহর্ষি ছিলেন। তাঁহার পুত্র শ্বেতকেতু। একদিন পিতামাতার সঙ্গে শ্বেতকেতু বসিয়া আছেন, এমন সময় এক ব্রাহ্মণ আসিয়া তাঁহার জননীর হস্ত ধারণ পূর্বক কহিলেন, আইস আমরা যাই। ঋষিপুত্র পিতার সমক্ষেই মাতাকে বলপূর্বক ল ইয়া যাইতে দেখিয়া সাতিশয় ক্রুদ্ধ হইলেন। মহর্ষি উদ্দালক পুত্রকে তদবস্ত দেখিয়া কহিলেন, "বৎস ক্রোধ করিও না। ইহা নিত্যধর্ম --এষঃ ধর্মঃ সনাতনঃ। -- গাভীগণের ন্যায় স্ত্রীগণ শত সহস্র পুরুষে আসক্ত হইলেও উহারা অধর্মলিপ্ত হয় না। ("এষঃ ধর্মঃ সনাতনঃ" -- মহাভারত, যোগবাশিষ্ঠ রামায়ণ, গীতা এবং আরো বহুতর পুরাণ কাহিনীতে বার বার বলা হয়েছে। উদ্ধৃত উদাহরণ সম্মন্ধে বর্তমান ব্রাহ্মণ্যবাদী সনাতনপন্থীদের মতামত জানতে ইচ্ছা করে)।
এই হোল কোন এক ঋষি পিতার 'ন্যায়শাস্ত্র'।
এবার দেখুন, ঋষিপুত্র পিতার বাক্য শ্রবণ করিয়া ক্ষান্ত হইলেন না, প্রত্যুত পূর্বাপেক্ষা অধিকতর ক্রুদ্ধ হইয়া মনুষ্যমধ্যে বলপূর্বক এই নিয়ম স্থাপন করিয়া দিলেন যে, অদ্যাবধি যে স্ত্রী পতিভিন্ন পুরুষান্তর সংসর্গ করিবে এবং যে পুরুষ কৌমারব্রতচারিণী বা পতিব্রতা স্ত্রীকে পরিত্যাগ করিয়া অন্য স্ত্রীতে আসক্ত হইবে, ইহাদের উভয়কেই ভ্রূণহত্যা সদৃশ ঘোরতর পাপপঙ্কে লিপ্ত হইতে হইবে। (কালীপ্রসন্ন সিংহের মহাভারত)।
আবার শুনুন, বৃহদারণ্যকের ঋষি বলছেন, স্ত্রী লোকের মধ্যে যখন 'শ্রী' উজ্জ্বল হয়, যখন সে 'মলোদ্বাসা' হয়, (স্ত্রীণাং যন্মলোদ্বাসাস্তস্মান্মলোদ্বাসসং.... ইত্যাদি, অর্থাৎ নারী যখন ঋতুমতী অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসেন, তখন সেই যশস্বিনী স্ত্রীলোকটির নিকট গমন করবে, তাকে কামনা করবে, সে কাম দিতে রাজী না হলে তাকে লাঠি দিয়ে বা হাত দিয়ে প্রহার করে অভিভূত করে বলবে, আমার ইন্দ্রিয়শক্তি দ্বারা, আমার মন দ্বারা তোমার যশকে কেড়ে নিচ্ছি। এইভাবে সে যশহীনা হয়।
তাকে 'যশহীনা' করে ভোগ করতেই হবে।
পাঠক, ভেবে দেখুন 'নারীধর্ষণের মত অমর্যাদাকর ও গ্লানিময় সংস্কারটি, যা কিনা বেদ-উপনিষদের বিধান, সেটি কত প্রাচীন ! আরও অসংখ্য এমন সুক্ত, শ্লোক ও মন্ত্রাদি আছে আমাদের বেদ, ব্রাহ্মণ, উপনিষদ ও কিছু কিছু পুরাণগ্রন্থে যেগুলি বর্তমান পরিমার্জিত সমাজমানসিকতার উপরিতলে 'বিকৃতরুচির' প্রকাশ মনে হতে পারে ; কিন্তু এ কথাও তো সত্য যে সমাজে স্ব-স্ব ভাবের নরপশুদেরও অস্তিত্ব রয়েছে, বিপুল পরিমাণেই রয়েছে যারা অবলা নারীদের অসহায়তার সুযোগ পেলেই পাশবিকভাবে যৌন নিপীড়ন করে, পুড়িয়ে মারে, নৃশংস হয়ে ওঠে। এবং এই ঘটনাগুলোর শেষ নেই, চরম কোন প্রতিবিধানও নেই।
আমাদের দেশের অতীতের সমাজজীবনের ইতিহাসে নারীত্বের, নারীর সম্মানের, নারী প্রাধান্যের গৌরবগাথারও অন্ত নেই। সে এক বিরাট বিপুল আলোচনার বিষয়। কিন্তু রামায়ণের সীতাদেবী এবং মহাভারতের দ্রৌপদীকে যদি আর্যসমাজের প্রতিনিধিস্থানীয় কল্পনা করা যায় তবে তাঁদের লাঞ্ছনার ও অবমাননার ট্রাজিক পরিণাম প্রমাণ করে নিষ্ঠুর ন্যায়শাস্ত্রীয় সংস্কারগুলির বেশিরভাগই পরিকল্পিত হয়েছিল রমনীদের অবদমিত করে রাখার নিমিত্তেই। সীতাদেবীর 'অগ্নিপরীক্ষা' কালে কালে এই ভারতীয় সমাজে (বিশেষ করে ভারতের পূর্বদেশে) 'সতীদাহ' নামক নারকীয় প্রথার জন্ম দিয়েছে এবং তা পৌরাণিক যুগ হতে আরম্ভ করে ঊনবিংশ/বিংশ শতক পর্যন্ত চলেছে অনির্বারিত ! এখনো কি 'নারীদাহ' বিচ্ছিন্ন হলেও সত্য নয় ? এবং যুদ্ধ ! (হায় রে যুদ্ধ)। যুদ্ধ -- গৃহযুদ্ধ বা বহিরাক্রমন-- বিশ্বের যে যে ভূখণ্ডে সংঘটিত হয়েছে, হয়ে চলেছে, যেমন ইউরোপে, মধ্য এশিয়ায়, উত্তর-পশ্চিম ভারতে, ভারত উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলীয় দেশে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সে সমস্ত দেশের নারীদের অবস্থার সঙ্গে আমাদের পাড়ার মৃতশাবক সারমেয় জননীর পার্থক্য কোথায় ?
আমরা আমাদের আলোচনার আরম্ভই করেছিলাম 'দুঃখ' দিয়ে। কিন্তু আমাদের উদ্দেশ্য 'দুঃখ' দেওয়া নয়, দুঃখের আঘাত কোন্ প্রাণে সবচেয়ে বেশী বাজে সেইটিই অনুসন্ধান করবার জন্য। এবার একটি রাষ্ট্রত্ত্বের বিষয় আলোচনা করা যাক্। মহান দার্শনিক নিৎসের মৃত্যুর পর তাঁর বোন Elisabeth Nietzsche তাঁর পাণ্ডুলিপির সংরক্ষণ ও এবং পরে সেই পাণ্ডুলিপিগুলি প্রকাশ করেন। সেখানে Fascism এবং Nazism -উপর আলোচনা আছে। Fascism রোমান 'ফ্যাসেসের' মতই একটি একমুখী আগ্রাসী রাষ্ট্রীয় শক্তি, যাকে ঐক্যের প্রতীকও বলা হয়েছে। সমস্ত পৃথিবীর, সমস্ত দেশের রাজতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র, ধর্মের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রতন্ত্র, অভিজাততন্ত্রের --- এমনকি সংখ্যাগরিষ্ঠের গণতন্ত্রের (brutal majority) মধ্যেও এই 'Fasces power' (যার থেকে এসেছে 'Fascism'), কখনো সংগুপ্তভাবে, কখনো উন্মুক্ত ও উলঙ্গরূপে পরিদৃশ্যমান। তখনই হয় 'সভ্যতার সংকট', মানবসমাজে নেমে আসে 'যুদ্ধ' নামক "নারীঘাতী, শিশুঘাতী" কুৎসিত বীভৎসার অন্ধকার। কারণ রাষ্ট্রের ক্রীড়নক সৈনিকেরাও তো মায়েদের জন্মদেওয়া শিশু)।
আর সেই Fasce power বলে, "পুরুষকে যুদ্ধের জন্য এবং নারীকে যোদ্ধা প্রজননের জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে -- অন্য সব কিছু বোকামি।"
_____________________________________
অসাধারন লেখা
উত্তরমুছুনখুব সুন্দর বিশ্লেষণ। ভালো লাগলো পড়ে।
উত্তরমুছুন