রবিবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২৫

ধর্মসংকটের বলি মানবতা ---পর্ব ২



ধর্মসংকটের বলি মানবতা --পর্ব ২ 


ইহুদী ধর্ম প্রাচীনতর। খ্রীষ্টধর্ম (Second Temple Judaism, বা দ্বিতীয় মন্দির পর্বের) ইহুদী ধর্মের মধ্যকার আন্দোলন হিসাবেই শুরু হয়েছিল। এখানে বলে রাখা ভালো যে এই Temple বা মন্দির হোল জেরুজালেমের হারাম আল শরিফে অবস্থিত ইহুদীদের কেন্দ্রীয় পবিত্র মন্দির, আনুমানিক ৫১৬ খ্রীষ্টাব্দ পূর্ব থেকে আনুমানিক ৭০ খৃষ্টাব্দ যার অস্তিত্ব ছিল। ইহুদী রোমান যুদ্ধে ৭০ খ্রীষ্টাব্দ সময়কালে মন্দিরটি ধংস হয়ে যায়। ইহুদী জাতির পবিত্র এই মন্দিরের ইতিহাস সুদীর্ঘ এবং জটীল। (যুগ যুগান্তর কাল ধরে এই মন্দির ইহুদী, খ্রীষ্টান ও ইসলাম ধর্মের বিশ্বাসীদের তীর্থভূমি হিসাবে পরিগণিত)  শুধুমাত্র ইহুদী ধর্ম অনুসরণকারীদের অস্তিত্ব রক্ষার যে হাজার হাজার বছরের সংগ্রাম তার সূচনা লগ্নটি জানানোর জন্য এই দ্বিতীয় মন্দিরের উল্লেখ।

এবার আমরা আসি খ্রীষ্টিয় প্রথম শতাব্দী কালের পরবর্তী অধ্যায়ে। যীশুর জীবনকালে যীশুর ধর্ম ছিল সরল সুন্দর এবং সহজভাবেই মানবীয় ও সামাজিক। তখন খৃষ্টান গোষ্ঠী সৃষ্টি হয়নি। ধর্মগ্রন্থ ছিল না। আলাদা সম্প্রদায় ছিল না। ইহুদীরা যীশু প্রচারিত বিধি-বিধানগুলিকে তাদের ধর্মীয় শাখার বাণী বলেই মনে করত। মনে করত (আগেই বলা হয়েছে) যীশু দ্বিতীয় মন্দিরের ধংসাবশেষ থেকে উঠে-আসা ইহুদী ধর্মেরই ধারাবাহিকতা। 

সে যাই হোক্, যীশুর বিচার ও ক্রুশবিদ্ধ হবার পর খৃষ্টান ধর্মের ঐতিহাসিক বিবর্তন সম্ভাবিত হতে আরম্ভ করল। এই বিবর্তন এবং পরিবর্তনের সূত্রপাত হোল সেন্ট পলের কঠিন আত্মত্যাগী প্রচেষ্টায়। খ্রীষ্ট বিশ্বাসীদের প্রতিষ্ঠান, দল বা সম্প্রদায় সৃষ্টি হোল। যীশুর বিধানগুলির লিখিত রূপ দেবার কাজ আরম্ভ হোল। কিন্তু প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তাদের উপর নেমে এল রোমান শাসকদের বিরুদ্ধতা ও সন্ত্রাস। প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার শতাব্দী ধরে এই অত্যাচার চলেছিল। এরূপ অত্যাচার ও নিপীড়নের ফলে   খ্রীষ্টানদের সংহতি জমাটবদ্ধ হোল। তার ফলে, অসংখ্য ধার্মিক-শহীদের আত্মোৎসর্গের বিনিময়ে খৃষ্টধর্ম ও খ্রীষ্টিয় প্রতিষ্ঠানের প্রভাব রোম সাম্রাজ্যের বিস্তৃততর অঞ্চলে সংক্রামিত হয়েছিল। সে-ধর্ম আর অকিঞ্চনের ধর্ম হয়ে রইল না। ৩৮০ খ্রীষ্টাব্দ নাগাদ খ্রীষ্টধর্মের মাথায় কন্টক মুকুটের পরিবর্তে উঠল রাজার মুকুট। রোম সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রধর্ম হয়ে উঠল খ্রীষ্টধর্ম। এর পর থেকেই খ্রীষ্টান ধর্মের সর্বগ্রাসী রূপ ও বিচ্যূতির কাল। খ্রীঃ অষ্টম থেকে পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত ইউরোপের যে অন্ধকারময় যুগ এবং একাদশ শতক থেকে ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত ধর্মযুদ্ধের (Crushed War) যে বীভৎসা তার জন্যে দায়ী খ্রীষ্টানধর্মীদের ঐ উপরিউক্ত দুইটি অন্যতম প্রধান প্রবনতা। 


একাদশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকেই রোম-কেন্দ্রিক ‌খ্রীষ্টধর্ম আর পূর্ব দেশের (যে অঞ্চলে যীশুর জন্ম ও কর্ম) আলাদা হয়ে গেল। এই দ্বিতীয় অংশটির নাম হোল পূর্বী- অর্থডক্স (Eastern Orthodox Church). এই ধর্মমত একেশ্বরবাদী হয়েও ত্রিত্ববাদে (Trinitarianism) বিশ্বাস করে। 


এখানেও, কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক হলেও উল্লেখ করা যেতে পারে যে ইহুদী ধর্মের সঙ্গে খ্রীষ্টানদের ধর্মের মৌলিক ভিন্নতা বিদ্যমান। ভিন্নতাটি এই রকম :
"Christian Theology views the history of mankind as a progressive Covenant between God and Man. The covenant begins with Adam and manifests itself in different stages : Form Noah to Abraham, from Abraham to Moses, from Moses to Devid, from Devid to Son of Devid -- who is The Christ. In the ultimate sacrifice of Jesus of Nazareth who is The Christ, the Covenant is made final. The last step in the Covenant between God and Man, according to Christian theology is incarnation of God in the Son of God."
খ্রীষ্টান ধর্মে বিশ্বাসীরা ইহুদী ধর্মের পুরাতন বিধান (Old Testament) নিজেদের ধর্মগ্রন্থ বলেই মানেন। কিন্তু ইহুদীরা খ্রীষ্টানদের নব বিধান (New Testament) স্বীকার করেন না। এখানে ইহুদীদের ধর্ম (Jewish principles or Testament) এবং খ্রীষ্টানদের ধর্মের চিরকালের দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্ব বিদ্বেষের ক্রমঘটমান রক্তক্ষয়ী পরিণামের কাহিনী পরবর্তী সময়ে আবার আলোচনা করা হবে ; আপাতত খ্রীষ্টান ধর্মের ভয়ঙ্কর শক্তিসঞ্চার ও শাখা প্রশাখার সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্তান্ত বর্ণনা করা যাক্।
যাই হোক্ আমরা আবার 'ভাঙার' অধ্যায়ে ফিরে যাই। খ্রীষ্টান ধর্ম যখন রোমের রাজধর্মের স্বীকৃতি ও পৃষ্টপোষকতা লাভ করল তখন থেকেই (Religion added to monarchism) ধর্মের সঙ্গে শক্তির প্রভাব বিস্তার লাভ করতে আরম্ভ করল। (ঠিক এমনটি আমরা দেখব ইসলাম ধর্মের ক্ষেত্রেও। কিন্তু সে কথা কিছু পরে)।
এবার রাজা নিয়ন্ত্রিত ধর্মের সঙ্গে মহাপুরোহিত বা পোপের দ্বন্দ্ব। কয়েক শতাব্দীব্যাপী সেই দ্বন্দ্বের ইতিহাস অনুল্লেখ্য রেখে বলি, মধ্যযুগ বা অন্ধকারময় যুগের শেষভাগে ষোড়শ শতকে রোমান ক্যাথলিক চার্চ থেকে আলাদা হয়ে গেল মার্টিন লুথারের প্রোটেস্টান্ট চার্চ। তিনটি সমান্তরাল ধারায় বইতে লাগল খ্রীষ্টানদের প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মবিশ্বাস। রোমান ক্যাথলিক চার্চ, পূর্বী অর্থডক্স চার্চ এবং প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চ।
মূল বা উৎস এক হোলেও এই বিচ্ছেদ মাঝে মাঝেই চরম শত্রুতায় পর্যবশিত হয়েছে। কিন্তু সেই অন্তর্কলহের (বিশেষ করে ক্যাথলিক প্রোটেস্ট্যান্ট বিবাদ), ইতিবৃত্ত বাদ দিয়ে সামগ্রিক খ্রীষ্টধর্মের মারণ রূপ ধর্মের ইতিহাসে কলঙ্কিত অধ্যায়। ক্রুশেড, ইনকুইজিশন, ইহুদী-দমন। 


এই সময়কালের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে আরবের মরুময় ধরিত্রীর বুকে জন্ম নিয়েছেন আরও এক ঈশ্বরের দূত, (Prophet) হজরত মহম্মদ। তিনিও একেশ্বরবাদী এবং ধর্মবিশ্বাসীদের ধারনায় তিনি আদম, নোহা, আব্রাহাম,  মুশা ও যীশুর পরবর্তী ঈশ্বরের বাণী বহনকারী মুক্তিদাতা। অবিশ্বাসী ও পৌত্তলিক বিভিন্ন আরবীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সরাসরি সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে তার ধর্মযাত্রা আরম্ভ হয়েছিল এবং ৬২২ খ্রীষ্টাব্দে তাঁর‌ মৃত্যুর অত্যল্প কালের মধ্যেই শুধুমাত্র আরবীয় উপদ্বীপ নয়, এশিয়ার, ইউরোপ ও আফ্রিকার বিস্তৃত অঞ্চলে, এমনকি মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি সুদূর দক্ষিণপূর্ব এশিয়াতেও 'ইসলাম' ছড়িয়ে পড়েছিল। এবং অবশ্যই ইউরোপের খ্রীষ্টানধর্মের মত ইসলাম ধর্মেও সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র এসে পড়ে। আর স্বাভাবিকভাবেই অন্যবিধ ধর্মধারণা, বিশেষ করে ইউরোপখণ্ডের সম্প্রসারণবাদী খ্রীষ্টানধর্মীদের সঙ্গে প্রলম্বিত যুদ্ধের পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে যায়। এই যুদ্ধেরই সূচনাপর্ব ক্রুশেড, যা কিনা আরম্ভ হয়েছিল খ্রীষ্টান ধর্মগুরু পোপ, আরবান ২-এর ধর্মযুদ্ধের আহ্বানে, খৃষ্টানদের পবিত্র তীর্থভূমি জেরুজালেমকে  মুসলমানদের দখল থেকে উদ্ধারকল্পে। অন্য অঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপ ভূখন্ডে ইসলাম ধর্মের আগ্রাসী সম্প্রসারণকে বাধা দেওয়া।

"The slaughter of the pagans continues,
The City has been liberated. ..."
(Gerusalemme Liberata --Torquato Tasso.)

এই ক্রুশেড বা খ্রীষ্টানদের ধর্মযুদ্ধ দিয়ে আরম্ভ করা যাক্। সূচনা ১০৯৫ খ্রীষ্টাব্দে। মাঝে মাঝে সামান্য বিরতির পর ধাপে ধাপে এই রক্তঝরা সংগ্রাম চলেছে সাত, মতান্তরে আট বা নয় দফায়। প্রায় দু'শ বছরের অধিক কাল ধরে চলা এই যুদ্ধে যে অপরিমেয় ক্ষয় ক্ষতি, যে সংখ্যাতীত প্রাণহানী ঘটেছিল তার হিসাব দিয়ে শেষ করতে পারেনি মহাকালের হিসাবরক্ষক ইতিহাস।
ইউরোপের খ্রীষ্টান ও প্রাচ্যের ইসলামের ‌মধ্যে পবিত্রভূমি জেরুজালেমের উপর (সাথে কনস্টান্টিনোপলও) প্রভুত্ব কায়েম করবার প্রয়াসে দু'শ বছরের যে বীভৎস সংগ্রাম চলেছিল, সেই ধর্মযুদ্ধের নিষ্ঠুরতম অমানবিকতার দৃষ্টান্ত দেখাবার একটি মাত্র উদাহরণই যথেষ্ট --- যা শিশুদের ক্রুশেড (Children's Crushed) নামে বিশ্ব ইতিহাসের পাতায় একটি রুদ্ধবাক অধ্যায়রূপে বিরাজিত। প্রথম রণাঙ্গণ যাত্রায় (1st. Movement) আনুমানিক ১২১২ খ্রীষ্টাব্দে জার্মান মেষপালক এক কিশোরের নেতৃত্বে ৩০,০০০ শিশুকিশোরদের একটি দল, এবং পরে ফরাসী মেষপালক বার বছরের কিশোর নিকোলাসের নেতৃত্বে  প্রায় সমসংখ্যক আরো একটি  শিশুকিশোরদের দল পবিত্র তীর্থভূমি জেরুজালেমের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিল বা করানো হয়েছিল। পরিণতি কি হয়েছিল তা অনুমেয়,  প্রকাশিতব্য নয়। ঐতিহাসিকেরা পূর্ণ চিত্র প্রকাশ করেননি, বা বলা ভালো করতে পারেন নি। শিশু ক্রুশেড বিষয়ে বহুবিধ ও বিচিত্র রকমের কাহিনী প্রচারিত ও প্রকাশিত হয়েছে যা এক কথায় মর্মান্তিক !

                                 ক্রমশঃ
ধর্মসংকটের বলি মানবতা --পর্ব ৩
Inquisition বা রোমান ক্যাথলিক চার্চের বিচার।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...