( এই লেখাটি গতকাল পরিমার্জণ ও সংশোধন করার সময় হঠাৎই মুছে যায়। আজ লেখাটি নূতন রূপে প্রকাশিত হোল। )
ঝাড়খন্ড, সেখানের জনজাতির বিভিন্নতা, ভাষার বৈচিত্র, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও প্রকৃতিদত্ত অফুরাণ
ঐশ্বর্য , সুদীর্ঘ লালিত সংস্কৃতি -- উন্নাসিক , ভদ্র , ধূর্ত
ও তথাকথিত শিক্ষিত, বহিরাবরণে পরিশীলিত কিছু শহুরে মানুষের লুন্ঠনের সম্পদ বিনোদনের সামগ্রী । দক্ষিণ বাংলার পশ্চিম অঞ্চল হতে ওই চাকায় পর্বতমালা, মানভূম থেকে সিংভূম, পাহাড়, টিলা, নদ নদী ঝোরা , ঝোপ জঙ্গল আকীর্ণ, উদ্গীরিত লাভা- স্রোতে সৃষ্ট এই আদিম ভূমিখন্ডটির সমস্তটুকুই , অন্ধকার খনিগহ্বরে সুগুপ্ত, হীরক খন্ডের মতোই ছিল. বহুকাল । হীরকখন্ডই --- সে একটি দুটি নয়,
অসংখ্য, অনন্ত --- ভূতলে ,ভূ -অভ্যন্তরে। অফুরন্ত খনিজ সম্পদ গর্ভে ধারণ করে, একান্তে ছিল এই অনাদ্যন্ত কালের ধরিত্রী ।
ছোটনাগপুরের মালভুমি, শুধুমাত্র খনিজ সম্পদ, বনজসম্পদ নয়, জলসম্পদেরও বিপুল উৎস । খরস্রোতা, ভয়ঙ্করী সব নদ নদী – অজয়, দামোদর, ময়ূরাক্ষী, কংসাবতী, দ্বারকেশ্বর, শীলাবতী, সুবর্ণরেখা, কালিন্দী আরো কত। সে সকল নদ, নদীর পাড়ে, পাড়ে, পাহাড়, টিলার কোলে কোলে শত সহস্ৰ গ্রামে, বস্তিতে সহস্রযুগের, নানা জাতি গোষ্টির, ভিন্ন ভিন্ন জীবন ছন্দের বৈচিত্রময় সহাবস্থান। ভাষা ও. সংস্কৃতির বর্ণময় বিভিন্নতা তো অতুলনীয় ।
ভাদু, টুসু, কর্মা, আখান, ঘেঘান, ছেঁচরী বা ছেঁচান, বাঁদনা, শিকার –- এমন কতো সব উৎসব। আছে ঝুমুর, কীর্ত্তন, কবিগান, তরজা, চটকা, ছৌ নাচ...।
এদেশেই পুরুলিয়া। অভিশপ্ত দেশভাগ। কাটা পড়ল বাংলা ,পাঞ্জাব। বাঙলাকে তো বার বার ছেঁড়াছেঁড়ি। মানভূম কেটে কিছুটা তৎকালীন উত্তর বিহারের ধানবাদে, আর কিছুটা পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া। ছায়াঢাকা, মায়াময়ী পুরুলিয়ার উপর দৃষ্টি পড়ল "সভ্য" জগতের।
"গর্বে যারা অন্ধ তোমার সূর্যহারা অরণ্যের চেয়ে ।
সভ্যের বর্বর লোভ
নগ্ন করল আপন নির্লজ্জ অমানুষতা।"
–রবীন্দ্রনাথ।
পুরুলিয়ার সঙ্গে আমার নাড়ীর সম্পর্ক। আমার পূজনীয় পিতৃদেব এখানে চাকুরীরত ছিলেন। আমার মামাবাড়ি পুরুলিয়ায়। আমার এক ভাইয়েরও সেখানে চাকরি ছিল, এখন বাস ও সপরিবারে বসবাস ওখানেই। আজ থেকে বছর তিনেক আগে ওখানেই, ভামোরিয়ায়, একটি সংস্কৃতি মেলায় পুরুলিয়ার কয়েকজন স্বভাবকবির সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তাঁদের কাব্যাবেগের অনুপ্রেরণায় প্রাণিত হয়ে আমিও একটি কবিতা রচনা করে' পাঠ করেছিলাম ।
আজ আপনাদেরও তা শুনাতে মন চাইছে ।
লুণ্ঠিত অবগুণ্ঠন
-–------------------------
এক
ভালই হয়েছে বন্ধু এসেছে
চৈত্রের বেলাশেষে,
ভালই লাগছে বন্ধু এসেছে
প্রণয়ের হাসি হেসে।
সাজায়ে রেখেছি প্রেমের অর্ঘ্য
শিমুল পলাশ রাঙা,
মহুয়ার বনে বাসর শয়ান –
বিয়া ছেড়ে আজ সাঙা।
নিলাজ মনের মাধুরী ছড়াব
ভাদু আর তুসু গানে,
ঝুমুর বোলের তুলে ঝংকার
ঘুঙুরের মিঠা তানে ।
হলুদ পাখীর নরম গলায়
পিরীতি সুরভি বিলাব,
চাঁদের আলাতে, মাদলের তালে
অঙ্গে অঙ্গ মিলাব।
শাল পিয়ালের ছায়ায় মায়ায়,
লুকায়ে লুকায়ে খেলা,
তুমি আর আমি কাটাব জীবন
বসাব প্রাণের মেলা।
দুই
ভাঙল হঠাৎ স্বপনের ঘোর
ভেঙে গেল খেলাঘর,
প্রণয়ী আমার ঘাতকের বেশে,
এ কোন মায়াবী বর !
বিক্ষত করে অক্ষত বুক,
নিঠুর নখর আঘাতে,
সঞ্চিত চিত-সম্পদ সবই
লুন্ঠন করে দু'হাতে।
ঘনবন-কেশ লালসা আগুনে
জ্বলে জ্বলে পুড়া চিতা –
পঞ্চকোটের পঞ্চবটীতে
আমি ধর্ষিতা সীতা।
ঝুড়ি ঝুড়ি ভরা সহমর্মিতা,
সমব্যথী কত আসে,
মায়া কান্নার অভিনয় শেষে
পিশাচের হাসি হাসে।
বন্য প্রেমের মত্ত আবেগে
কারে যে ডেকেছি অবেলায়,
রূপের লালচে আসে নাই সে যে,
এসেছে রক্ত পিপাসায়।
ঘরের মরদ যত কালো হোক
সে আমার মরমিয়া,
তারই হাতে থাক্ মরণ বাঁচন –
আমি সতী পুরুলিয়া ।।
দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়,
০৫/০২/২০২২
ব্যাঙ্গালোর ।
–--------------------–-------------------------------------------------
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন