শনিবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

রাখাল


রাখাল

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

"হায় রে হৃদয়
তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়
নাই নাই নাই যে সময়।"

চেয়েছি, মনে প্রাণে চেয়েছি। সেই স্মৃতির সঞ্চয় জীবন পথে ফেলে দিতে চেয়েছি, ভুলে যেতে চেয়েছি। পারি নি।

রবি ঠাকুরের কবিতা দিয়ে শুরু করলাম এই কারণেই যে সেদিনও ছিল ২৫শে বৈশাখ। চল্লিশ বছর আগের বিশ্বকবির আরেক জন্মদিন।
পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম প্রান্তে, অজয় নদের ওপারে, ঝাড়খণ্ড সীমানায় একটি বর্ধিষ্ণু গ্রামের মাঝামাঝি,  কালী পুকুরের পশ্চিম পাড়ে, এক মাটির  দোতলা কোঠাবাড়ির উপর তলায়, ট্রাণজিস্টারে রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনতে শুনতে রুদ্র গ্রীষ্মের উত্তপ্ত দিনান্তবেলার সান্ধ্য তন্দ্রাচ্ছন্নতার মৌতাত উপভোগ করছি। শুয়ে আছি তালপাতার চাটাইয়ে। হঠাৎই আমার বাহাত্তুরে মা-জননীর ডাক (আহা! মধুরতম সে ডাক হারিয়ে গিয়েছে জীবন  থেকে),
-- বাবু, দেখ তো কিসের কোলাহল। সনকা ছুটতে ছুটতে  ওপাড়ার দিকে দৌড়াল! কাউকে কিচ্ছুটি বলবি না। শুধু দেখবি সনকা মাসির কি হোল।

বাউরী পাড়ার সনকা। ফসল ক্ষেতে কাকতাড়ুয়ার গায়ে  সাদা শাড়ি লেপ্টে দিলে যেমন দেখাবে সনকা মাসিকে  দেখতে অবিকল তেমনি। শুধু মুখের হাসিটি তার দেহের সৌন্দর্য, তার অনাবিল মনের প্রকাশ। আমাদের ঘরের  সমস্ত রকম দায় তার উপর। মা'য়ের, শুধু রাতটুকু বাদ  দিয়ে, সর্বক্ষণের সঙ্গী। তার একমাত্র পিতৃহারা সন্তান খোঁড়া গাঁয়ের বাগাল। খোড়াঁ-ই তার নাম ; কেননা জন্ম হতেই তার একটি পা ছোট। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়েই তার জীবন শুরু এবং এখনও চলমান --গরু, মোষ, ছাগল, ভেড়াদের সাথে, সমান তালে।
কোলাহলটি এ পাড়ারই, এই বামুন পাড়ার উপর মুড়ার দিক থেকেই আসছে। সঠিক অনুমান করেই এগিয়ে চললাম। কেষ্ট রায় (কৃষ্ণ চন্দ্র রায়)-দের বাড়ির কাছাকাছি এসে দেখি সিংহ দরজার বাইরে বাউরী বাগদি, ডোমপাড়ার সমস্ত ছেলে-বুড়া-মিয়া-মরদ। ভিড় ঠেলে ভিতরে ঢুকে যা দেখলুম তাতে ভয়ে কাঁপন ধরে গেল। হাত-পা বাঁধা খোঁড়া পড়ে আছে। হাত দুটো বাবুই দড়ি দিয়ে এমন ভাবে বাঁধা যে দড়ির দুদিকের ডগা লম্বা টেনে ওই দড়ি দিয়েই দুই পা মুড়ে বেঁধে দেওয়া। পায়ের ছোট বড় হাঁটু দুটো জোড়া হয়ে উঠে আছে খুঁটার মতন।কশাইখানায় গরু মোষ কাটার আগে যেভাবে পা বেঁধে ফেলে রাখা হয়, তেমন। মোষের সঙ্গে তুলনাই ঠিক, খোঁড়া মোষের মতই কালো। চিত করে রাখা হয়েছে দুপাশে দুটো ইঁট রেখে। হাঁ মুখ, শুকনো লালার সুতা ঠোঁটের দুই কোণায়।
কেষ্ট রায়ের ব্যাটা অকা (ঠিক নাম অক্রূর), বছর তিরিশের জোয়ান, পাতলুন-পরা, খালি গা, লোমশ বুকে ছাগল বাঁধা রশির মতন মোটা সোনার চেন। বাবরি কাটা চুল ঝাপুড় হয়ে নেমেছে চোখ মুখ ঢেকে। তারই ফাঁক দিয়ে বড় বড় চোখ, লাল যেন কাঠ-কয়লার আঙার, পুড়িয়ে দিতে চাইছে খোঁড়াকে। পাগলা কাড়ার মতন হুঁকরে উঠছে থেকে থেকে,
--- বল্ শালা, কোন্ ব্যাপারিকে বিকেছিস্ , বল্। 

সনকা লম্বালম্বি উবুড় পড়ে আছে তার পায়ের কাছে। ঠিক যেমন স্কুল মাস্টার রামধন তেওয়ারীর গিন্নি ছট্ পূজার সময় হত্যা দিয়ে পড়ে থাকে। সারা গাঁয়ের লোক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে, কিন্তু কিচ্ছুটি বলার সাহস কারোর নাই। অকার বাবা মুখিয়া, আবার বড় নেতাও। জজ সাহেব থেকে থানার দারোগা, সকলেই তাদের বৈঠকখানায় আসেন, বসেন, গল্প করেন।
হঠাৎই সনকা উঠে বসল, সর্বাঙ্গে ধূলা, শাড়ি খুলে গিয়েছে, কান্নাভাঙা গলা, হাত জোড় করে বলছে,
---হেই বাবা, জল, একটুকুও জল খেতে দাও খোঁড়াকে। অকা নির্বিকার। সনকা শাড়ি বুকের উপর চেপে ছুটতে লাগল। ঘরে ঘরে ঢুকছে, কেউ জল দেয়নি হয়তো। এবার নিজের ঘরের দিকে। কিছুক্ষণ পর আবার ফিরে এলো -- হাতে পিতলের ঘটি, ঘটিভর্তি জল। খোঁড়ার হাঁ মুখে ঢালতে গেল, অমনি অকার লাথি। ঘটি উড়ে গিয়ে একজনের বুকে... তারপর মাটিতে...কাত হয়ে গলগল জল গড়াতে থাকল মাটিতে। স্থির চেয়ে রইল সনকা, চেয়ে রইল, কম হলেও, দুকুড়ি চোখ।
দৃশ্যটি আমার কাছে অসহ্য হয়ে উঠেছে। এতো বড় অন্যায়, একজন পঙ্গু রাখাল, তার উপর এমন নিষ্ঠুর অত্যাচার ! আর আমি কাপুরুষের মতো দাঁড়িয়ে আছি, দেখছি। ওদিকে মায়ের কঠোর আদেশ, 'কোন ঝামেলায় জড়াতে যাবি না।' তা যুক্তিযুক্তও বটে। আমার আদর্শবান, স্কুলশিক্ষক, প্রতিবাদী বাবা অন্যায়, অবিচারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে করতে, মামলা মোকদ্দমায় জড়িয়ে, সর্বস্বান্ত, হতাশায় বিধ্বস্ত হয়ে অকালেই চলে গিয়েছেন বছর তিনেক আগে। মা বেঁচে আছেন শুধু আমার মুখ চেয়ে। আমি বাঁকুড়া খৃষ্টান কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। ঘরে এসেছি গরমের ছুটি পড়েছে তাই। মায়ের ধারণা, গ্রামের জটীল, কুটীল সমাজের রীতি নীতি আমি বুঝি না। মায়ের এই ধারণা, যত বয়স বাড়ছে ততই দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠছে আমার কাছে।
সব কিছু জেনেও থাকতে পারলাম না। এগিয়ে গেলাম অকাদার কাছে। আমার উদ্দেশ্য আন্দাজ করে, আমার দিকে এমন ভাবে চেয়ে রইল যে, আমার মুখ থেকে কথা বার হওয়া তো দূরের কথা, গলা শুকিয়ে কাঠ। মনে হলো ও যেন , তার গরিলার মতো লোমশ হাত দুটো দিয়ে আমার টুঁটি চেপে ধরেছে। 


হঠাৎই ভিড়ের মধ্যে ছটফটানি, সবার কান খাড়া। দূর থেকে গুম গুম শব্দ। দৌড়, যে যেদিকে পারে । মুহূর্তে ফাঁকা হয়ে গেল সেই অকুস্থান ; অকা আর আমি মুখোমুখি, মাঝখানে দড়িবাঁধা, মরা মোষছা-য়ের মতো পড়ে আছে খোঁড়া। অকার চোখ মুখ সাংঘাতিক ভাবে পাল্টে গেল। চ-কার উপসর্গ দিয়ে 'মারাণি' বলে' উৎকট চিৎকার করে উঠল। বুঝতে পারিনি সম্বোধনটি আমাকে করা। পরের কথাটিতে বুঝলাম,
-- এর দড়িটা খোল শালা,....বলে নিজেও হাত লাগালো। দড়ি খোলা হতেই খোঁড়ার মাথার চুল ধরে তুলে, আমাকে ইঙ্গিতে দেখালো পা ধরে তুলতে। চ্যাংদোলা করে 'সিংহ দুয়ারের' ভিতরে, বাঁদিকের একটি ঘুপচি ঘরে ঢুকিয়ে মেঝেতে ফেলেই দেওয়া হোল প্রায়।
-- পাহারা দে শালা...।
অস্থির হয়ে উঠেছে, ভয় পেয়ে যেমন হয়, তেমনি। বেরিয়ে গেল।
আমি হতভম্ব, স্তব্ধবাক। পেছনে ফিরে দেখি কোণায় মাটির কলসি, ঢাকনার উপর একটি টিনের গেলাসও রাখা। 'যা হবে দেখা যাবে' -- গেলাসে জল নিয়ে ঢেলে দিতে থাকলাম খোঁড়ার মুখে। মনে হোল যেন তপ্ত বালিতে জল পড়ছে। দু-গেলাস জল শুষে নিল খোঁড়া।  জামা খুলে ঝটিতি মুখটা দিলাম মুছে। ভাবছি, পালিয়ে যাব ! না, না, দেখি, খোঁড়াকে কি করে। ভাবতে ভাবতে অকা ঘরে ঢুকল, সঙ্গে চারজন মুনিষ, একটি খাটিয়া। তারা ধানের আঁটির মতো খোঁড়াকে তুলে দিল খাটে।
-- পেছন দরজা দিয়ে নিয়ে যা। ওদের উঠানে ফেলে, খাট নিয়ে তুরন্ত ফিরে আসবি। কাল হারামিকে কবুল করাবই। শালা দারোগা আবার এসেছে বাপের কাছে।
খোঁড়াকে তুলে নিয়ে যেতেই অকা এসে দাঁড়ালো ঠিক আমার মুখের সামনে।
-- এই যে বাপের সুপুত্তুর, এই ঘটনা নিয়ে কোথাও যদি মুখ খুলেছিস তবে তুইও তোর বাপের মতন উপরে  ...বুঝলি? বেরিয়ে যা ।
ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বড় দরজার বাইরে বার করে দিল আমাকে।
                           দুই

মনে প্রাণে বিধ্বস্ত , বাড়ির দিকে ফিরছি পুকুরের পাড় ধরে। সূর্য ডুবেছে বেশ কিছুক্ষণ। মু-আঁধারি সন্ধ্যা। তবুও পশ্চিম আকাশে দিগন্ত রেখা বরাবর একটি জমাট মেঘের স্তর । অস্তগত সূর্যের লাল আলো পড়েছে তার উপর। মহিষাসুরের দ্বিখন্ডিত দেহের রক্তস্রোত, গলগল গলে গলে পড়ছে এসে এই পুকুরের জলে। যেন দান্তে সাহেবের ইনফারনো !
একী ? এসব কী ভাবছি ! পুকুর পাড়ের ঢাল বেয়ে নীচে নামতেই দেখি বট গাছটার তলায়, অন্ধকারে অনেক মানুষের জটলা। আমাকে দেখেই সেখান থেকে ছুটে এলো সনকা মাসি। উন্মাদ হয়ে গিয়েছে।
-- ও বাবু, বাবুরে, ওরা কি খোঁড়াকে দারোগার হাতে  দিয়ে দিয়েছে ? মেরে দিয়েছে? বল্ বাবা, বল্।
না, মুখ বুজে সহ্য করা ঘোরতর অন্যায় হবে। মাসিকে খুলে বলে দিলাম সমস্ত কিছু। শুনে মাসি ছুটতে লাগল ঘরের দিকে। মাসির পেছনেই এসে দাঁড়িয়েছিল বলাই, মাসির ভাইপো। সব শুনে বলল সে ,
--- কাল আবার অশান্তি হবে গাঁয়ে।
আমি তার কাছে জানতে চাইলাম, কারণটা কি? সে যা জানালো তা তো আমার কাছে অভূতপূর্ব। এমত বিষয় এতখানি জীবনে এই প্রথম শুনছি।

কেষ্ট রায়ের ব্যাটা অকা বছর চারেক আগে একটি সদ্য বিয়োনো ভাগলপুরী গাই কিনেছিল। বাছুরটি ছিল বকনা। একমাস না যেতেই গাইটি গেল মরে। বাছুরটিকে দেখভাল করার দায়িত্ব পড়েছিল খোঁড়ার উপরেই। খোঁড়ার মায়া পড়ে গেছিল বাছুরটির উপর, বাছুরটিও খোঁড়ার গায়ে গায়ে সেঁটে থাকতো। গোয়াল ঘর থেকে ছাড়া পেয়েই সে দৌড়ে চলে যেতো খোঁড়াদের উঠানে। এখন বড় বকনা। শম্ভু লেগেছে উয়ার পিছনে। বাস্, ছটফটানি শুরু। এদিক ওদিক ছুটে বেড়ায়। ভিতর বনে, নদীর ধারে, দূরে দূরে। এমনিই তো হয়, গাবিন না হওয়া তক্। কিন্তু কেউ বলে দিয়েছে অকাকে যে খোঁড়া বকনটি বেচে দিয়েছে ব্যাপারীদের কাছে। এমনও হয়, যারা গরু কাড়ার কারবার করে, তারা বাগালদের হাতে কিছু পয়সা দিয়ে গরু কাড়া নিয়ে পালায়। কিন্তু খোঁড়াদাদা সেটি করে নাই, সে সকল গরু, কাড়া, ছাগল ভেড়াদের ভালবাসে, বকনটিকে তো নিজের বিটি মনে করে। তার নামও রেখেছে---  'বকুল'। আমার বাবা তাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল নদীপারের ইটভাটাতে। খোঁড়াদাদা যায় নাই। বলেছিল,
'বকুলকে কে যতন করবে ? আহা, মা-মরা ছা।'
--- আচ্ছা, শম্ভুটা কে ?
-- তুমি জান না ? শম্ভু আমাদের গাঁয়ের ষাঁড়। এক এক পালে একটি একটি করেই ষাঁড় থাকে। দুটা হলেই তো লড়াই -- রক্তারক্তি ! আমাদের শম্ভু এমনিতে শান্ত কিন্তু সে যদি কোন বকন ধরে, তবে তার খোরাক কেউ ছিনতে পারে না। দেখেছ তার সিং --- বাপ্ রে !  সেইটি তো খোঁড়া কাল থেকে বলে আসছিল। তা ছাড়াও, জংলা, খোঁড়ার কুকুর, খোঁড়ার পাল পাহারা দেয়। তার চোখকে ফাঁকি দিয়ে কেউ ভটকাতে পারবে একটি গরু-মোষ ? সে ওই মিশকালো গতর নিয়ে যখন ভুখে, তখন ভয়ে বাঘ পালায়। অকা কিছুতেই মানতে চায় না। কেবলই বলছে, 'খোঁড়া বেচে দিয়েছে, শালাকে মেরেই ফেলবো।' 

আমি বললাম, 'তোমরা গাঁয়ের লোক সকলে মিলে একথা তাদের বলছো না কেন?' বলাইয়ের কথা, 'কেউ বলতে পারবে না দাদা। যে বলতে যাবে হয় তার ঘর পুড়বে, নয় তাকে ঘর ছাড়তে হবে।'
বলাই এদিকে ওদিকে নজর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চলে গেল। বটগাছের তলাটাও ততক্ষণে ফাঁকা হয়ে গিয়েছে। আমিও ঘরের দিকে। ঘরে ঢুকতে গিয়ে দেখি মা হ্যারিকেন নিয়ে বেরোবার জন্য তৈরি।
-- কি বাবা, এতো দেরি ? চিন্তায় আকুল হয়ে পড়েছি। শুনলাম খোঁড়াকে রায়েরা ধরে রেখেছে। কেন, কি করেছে সে ?
--- মা, ঘরের ভিতরে এসো, বলছি সব।
বললাম ; শুনতে শুনতে মায়ের চোখদুটো রক্তাভ হয়ে উঠল। মা অক্রোধী, সুখে দুঃখে অবিচল ; কিন্তু আজ মনে হোল সংযমের বাঁধ ভেঙে গিয়েছে তাঁর। নির্বাক, কি যেন ভাবলেন স্বল্পক্ষণ। ঘরের ভিতরে গেলেন, বেরিয়ে এলেন থলিভর্তি কি যেন নিয়ে। আমার হাতে দিয়ে বললেন,
--- চল।
থলি হাতে নিয়ে বুঝতে পারি টিফিন ক্যারিয়ার। বেশ ভারি। এ সেই টিফিন ক্যারিয়ার যাতে বাবা খাবার নিয়ে যেতেন। মা হ্যারিকেন নিয়ে আগে আগে। দৃপ্ত সাহসী ভঙ্গিমা। সোজা সনকার ঘর। ঘর নয় -- উন্মুক্ত উঠানের পর খড়ের ছাউনি দেওয়া, দেওয়ালভাঙা কুটীর। দুয়ারে কপাট নাই, ভাঙা টিনের পাত দিয়ে আড়াল করার চেষ্টা ছিল হয়তোবা, সেটিও পড়ে আছে কাত হয়ে।
--- সনকা .... সনকা....!
কোন সাড়া নাই ! মা হ্যারিকেনটি সামান্য উস্কে ভিতরে ঢুকলেন। পিছনে আমিও।
---'আবার কেনে!'--- মারণ ভয়ে আর্ত চিৎকার!
--- আমি, আমি বাবুর মা...
মা আলো নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতেই যে দৃশ্যটি আলো  -অন্ধকারের অদ্ভুত অস্পষ্টতায় প্রত্যক্ষ করেছিলাম , মনে হয়েছিল যেন সেই অমর ভাস্কর্য-- মাইকেল এঞ্জেলোর পিয়েটা। ক্রুশে বিদ্ধ ক্ষতবিক্ষত যীশুর মৃতদেহ-কোলে মা মেরী ---  পাথরের পাটাতনে বসে আছেন। সোমত্ত সন্তানের দীর্ঘ, অর্ধনগ্ন নিষ্প্রাণ শরীর কোলের ওপর, অবিন্যস্ত কেশরাশী সম্বলিত মাথা, আর উলঙ্গ পা দুটি দুই প্রান্তে ঝোলা, নিথর। মা মেরীর মুখ অবনত। কান্নার নৈঃশব্দ্য নাকি নৈঃশব্দ্যের কান্না-- মহাশিল্পী তা দেখাতে চান নি।
এখানেও সেই চিরন্তন প্রাণের প্রস্তরিভূত ভাস্কর্য। খোঁড়া , ওই মরা যীশুর মতোই দীর্ঘ, নির্মেদ অস্থির কাঠামো, শুধু একটি পা খাটো এইযা, চিৎ মেরে আছে পড়ে, মায়ের কোলে নয়, ছেঁড়া তালপাতার চাটাইয়ে। আর মরে নাই হয়তো, ঘুমিয়ে আছে নিঃসাড়।  সনকা একবার শুধু চোখ তুলে আর্ত স্বরে জানতে চেয়েছিল কে ঢুকেছে ঘরে ; তারপর স্থির দৃষ্টি আবার ছেলের উপরে, ঠিক যেমন মা মেরী। (ধুৎ, কী যে ভাবছি ! এই আমার সমস্যা। ঘটনা, দুর্ঘটনা -- যাই দেখি মন চলে যায় উপমা খুঁজতে।)
আমার মা থলিটি নিলেন, খুললেন, তুললেন টিফিন ক্যারিয়ার, রাখলেন সনকার সামনে। সনকা নির্বিকার। উঠে গিয়ে খোঁড়ার মাথার কাছটিতে গিয়ে বসলেন, মাথায় হাত রেখে বিড়বিড় করে কি যেন বলছেন-- শোনা যায় না। তবে উঠে দাঁড়িয়ে যা বললেন শুনতে পেলাম,
--- খোঁড়া উঠলে মা-ব্যাটায় খেয়ে নিবি। বাতিটাও রইলো। ভয় পাবি না।

আমরা যখন ঘরে ফিরে এলাম তখন রাত গাঢ় হয়েছে। গ্রামের বামুন পাড়ায় 'রাখালরাজ বংশীবদনের' মন্দিরে সন্ধ্যারতির কাঁসর ঘন্টা সবে স্তব্ধ হয়েছে। পেছনের বাঁশ বাগানে শিয়ালদের প্রথম প্রহরের ঘোষণা শেষ।
মা বললেন, 


--- আজ আর কিছু রান্না করবো না বাবু। আয়, গুড় মুড়ি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়। কাল সকালবেলা আমরা দুজনেই যাব। খোঁড়াকে বাঁচাতেই হবে। আজ তোর বাবা বেঁচে থাকলে কি ঘরে বসে থাকতেন ?
শরীরের মনের ক্লান্তি ছিল। শুয়ে পড়লাম। ঘুম আসছে না। আচ্ছন্নতায় বার বার খোঁড়ার ওই দড়িবাঁধা, ঘামে ভেজা, ধূলি-কাদায়-লেপা আধনাঙা শরীর ; ওই তৃষ্ণাকাতর হাঁ-মুখ, ওই অসহায় চাহনি চোখের সামনে ভেসে ভেসে উঠছিল। ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম অঘোরে। চমকে জেগে উঠলাম মায়ের ডাকে। মায়ের সমস্ত কাজ সারা, যাবার জন্য প্রস্তুত। আমিও ঝটিতি তৈরি হয়ে নিলাম।
কিন্তু যেতে হোল না আমাদের। বাড়ির দরজা খুলতেই দেখি দাঁড়িয়ে আছে বলাই। এক হাতে হ্যারিক্যানটি আর অন্য হাতে টিফিন ক্যারিয়ারসহ থলিটি।
মা--- কি রে বলা, তুই ? তুর জেঠিমা, খোঁড়া ?
বলাই---তখন অনেক রাত, জেঠিমা আমদের ঘরে এই জিনিসগুলা দিয়ে বলে গেল তোমাকে দিতে। তারা চলে গেল। অন্য লোক যেন না জানতে পারে --- তাই কিচ্ছুটি বলে নাই।
আর কি হয়েছে জানো কাকিমা ? বকুল ফিরে এসেছে, সঙ্গে শম্ভুও। জেঠিমার উঠানে শম্ভু বসে বসে জাবর কাটছে আর বকুল দুয়ারে দাঁড়ায়ে। মাঝে মাঝে হাম্বা, হাম্বা --  খোঁড়া দাদাকে ডাকছে। গাঁ ভেঙে লোক--- দেখে তো অবাক। 
বলাই চলে গেল। মা নিশ্চুপ। একটি দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বসলেন। আমি, একমাত্র আমিই জানি এই নীরবতা, এই দীর্ঘশ্বাস কতখানি গভীর অন্তর্বেদনার অভিব্যক্তি। সনকা মাসি, তার ছেলে -- তারা কাজের লোক ও বাগাল ছিল না, তারাই একমাত্র আপনাজন ছিল মায়ের কাছে, বহুদিনের সুখ-দুখের সাথী।
গাঢ় বিষাদঘন নৈঃশব্দ্যের নিশ্চলতা। কী করি ? রেডিওটাই খুলি। 

'আপনারা শুনছেন রবীন্দ্রসঙ্গীত ;  শিল্পী সন্তোষ সেনগুপ্তঃ
"দূরদেশী সেই রাখাল ছেলে।
আমার বাটের বটের ছায়ায় সারাবেলা গেল খেলে ...।'' 

অকস্মাৎ 'হো হো, হায় হায়' বুক কাঁপানো বহুকণ্ঠের আওয়াজ ! সনকা আসবে না। মা উঠোন ঝাঁট দিতে চাইছিলেন, আমিও চাইছি --এই নিয়ে মা-ব্যাটায় দ্বন্দ্ব চলছিল। থেমে গেল। দুজনেই ভয়-চকিত। অনড় দাঁড়িয়ে উঠানে। বেরোতে চাইছিলাম, মা ধরে রইলেন। আবারও উন্মত্ত চিৎকার, 'সব্বনাশ, সব্বনাশ', 'মরে গেল রে, মেরে দিয়েছে রে' -- বিকট, উৎকট সব মারণ রব ভেসে আসছে !  আমি বাইরে যাবার জন্য যতই ছটফট করছি মা ততই আমাকে দুই হাত দিয়ে টেনে নিয়ে আসতে চাইছে ঘরে।
একি ! দুটো ছোট ছোট, বছর সাত আট হবে, উলঙ্গ শিশুকে নিয়ে বলাইয়ের মা উন্মাদিনীর মতো ঢুকে পড়ল।
-- ও দিদি, দিদি গো, ঘরের ভিতরে চল গো। ও বাবু, বাবুরে, বাইরে যেয়ো না, দরজা বন্ধ করে দাও। আজ যে কি হবে, আরো মানুষ মরবে, গাঁ জ্বলবে !
-- হয়েছে কি, সেকথা তো বলবে !
মায়ের ধমক খেয়ে মাটিতেই বসে গেল বিমলা মাসি, বলাইয়ের মা। হাতের ইঙ্গিতে দেখালো 'জল দাও' ।  ঘটিভর্তি জল গলায় ঢেলে মাসি যা বলে গেল তা বিশ্বাস অবিশ্বাসের সীমাছাড়া, 

 
-- বলো না দিদি কাওকে। মাঝ রাতে তো চলে গেল সনকা আর খোঁড়া। সেটিও ভয়ের, চিন্তার। এবারে যা হোল, শুন,
তখনো ভুরকা তারা (ভোরের তারা) ডুবে নাই। 'হাম্বা হাম্বা' ডাক। আমরা উঠে দেখি, ওই বেপাত্তা বকুল সনকার উঠানে দাঁড়ানো, হামালছে একনাগাড়ে, আর তার পেছনেই শম্ভু। সে পা দিয়ে মাটি খুঁড়ছে -- পাগলা ষাঁড় যেমন করে। পাড়ার বেবাক লোক এসে হাজির। এসে দেখে ঘর খাঁ খাঁ। ঘরের দুয়ারে আগুড় ঠেসানো। সনকা, খোঁড়া নাই।
চৌকিদার এলো। রায়দের খবর দিতে গেল। অকা তার দলবল নিয়ে, হাতে লম্বা ছড়ি ঘুরাতে ঘুরাতে এসে দাঁড়াল। খুব জোরে জোরে বকতে থাকল। 'শালা ঠিক বেচেছিল, ভয়ে ফিরিয়ে এনেছে। কোথা পালাবে শালা। হয় মরাব, নয় জেলের ভাত খাওয়াব। আসছে আজ  দারোগা।'
এই সব বলতে বলতে ছড়িতে সাঁই সাঁই শব্দ করে বকনটিকে মারতে যায়। সবাই একসাথে চেঁচাতে লাগলো, 'যাবে নাই, যাবে নাই। ষাঁড় ক্ষেপে আছে। বকনা এখানেই থাক্, এখন ঘরে তাকে নিয়ে যেয়ো না। খোড়াকে নিয়ে আসো, ও ঠিক সামলাবে।'

শুনল না অকা। যেই বকনাটাকে এক ছড়ি মেরেছে অমনি শম্ভু খরিষ সাপের মতন ফুঁসতে ফুঁসতে তেড়ে  গেল ! ....ও মা গো, চোখে দেখা যায় না গো ! ওই শাবলের মতন সিং.. ফুঁড়ে দিল গো, ফেড়ে দিয়েছে গো ! বুক পেট ফাঁক করে দিল যে গো ! রক্তে রক্তে উঠান ভিজে গেল গো ! ওই দেখ, লোকেরা সবাই ছুটছে। কে কোথা যাবে জানে না। ছোট ছোট ছেলে পুলে ভয়ে কাঁপছে, হাঁও মাঁও কাঁদছে ! যদি খোঁড়া থাকত এমন বিপদ হোত নাই গো !
কি হবে দিদি? আমাদের ঘর পুড়বে, আমাদের মানুষ মরবে, আমাদেরকেও গাঁ ছাড়া হতে হবে গো দিদি !
আমার মাও মাথায় দুই হাত রেখে বসে পড়লেন বিমলা মাসির সামনে, বার বার শুধু একই কথা বলে গেলেন,
--- অক্রূর, একি করলে তুমি বাবা ! কেন খোঁড়াকে শাস্তি দিলে ? সে যে দেবতার চাইতেও ভালো মানুষ ! সে থাকলে শম্ভুকে ঠিক বশে রাখতো। 

আমি এই ঘটনার একটি উপমা খুঁজতে চেষ্টা করলাম ; কিন্তু বৃথাই !

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
০৬-০৬-২০২২
শিলিগুড়ি।     
_____________________________________________















































কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...