শুক্রবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৩

তুমি কোন ভাঙনের পথে এলে

 তুমি কোন ভাঙনের পথে এলে 

একটি মর্মান্তিক মৃত্যু ! জীবন-বাঁচানোর সেবা-মন্দিরে তরুণী জীবনধাত্রীকে পৈশাচিক ধর্ষণ ও‌ খুন। ভীতি, বিমূঢ়তা গ্রাস করল জাতিকে, সমাজকে, দেশকে, এমনকি বিশ্বকেও। কিন্তু এ তো শুরু বা শেষ নয়। এ-যে সারা দেশে, জনপদে জনপদে নিত্য নিয়ত সংঘঠিত বিকৃত-মনন, অর্থলিপ্সু, নির্বিবেক মানুষরূপী শ্বাপদদের পশ্বাচারের অসংখ্য উদাহরণের একটি এবং বিশেষ একটি। সাময়িক শোকচ্ছ্বাসের বিহ্বলতা কাটিয়ে মানুষ জেগেছে। কিন্তু সেই হঠাৎ জাগরণের দিশাহীনতাও এতটাই প্রকট যে সমাজচেতনা আজ উদভ্রান্ত, বিভ্রান্ত। বিশ্বাসহীনতার অন্ধকারে সবই যেন বিলুপ্ত। সরকার, বিচার ব্যবস্থা, নীতি আদর্শ গুলি -- যা সমাজবন্ধনের, মৈত্রী সম্মন্ধের বন্ধনডোর -- সেগুলি যেন বেহালার (বে-হাল) ছিন্ন তার। 

এদিকে শরৎ এসেছে আবার। সমাসন্ন দুর্গোৎসব। সচ্ছল যাঁরা তাঁদের আনন্দের প্রত্যাশা, অসচ্ছল যাঁরা তাঁদের রুজি রোজগারের আশা। বিপণি-পণ্য- বিপণন, শিল্প-শিল্পী সম্পর্কের সন্ধিকালও এই সময়। 

 কিন্তু তুমুল বর্ষা অকস্মাৎ। বাঙলার বুকে দর্গতির, দুর্ভাগ্যের, প্রতি বছরের মত এবারও, মারণ আঘাত। নদীর পাড়ের গ্রামের পর গ্রাম তলিয়ে যাচ্ছে নদীগর্ভে, বাঁধ ভাঙা প্লাবনে ডুবে গেছে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুরের শত শত জনবসতি। ধ্সে  পড়ছে গাঁয়ের, শহরতলীর কাঁচা ঘর। বাঁকুড়া বিষ্ণুপুরের ঘটনা তো সহ্য করা যায় না -- মর্মবিদার। মনে হয় আমি বা আমরাও কেন বেঁচে আছি এখনও। ঘরের দেওয়াল ধসে তিনটি ঘুমন্ত শিশুর জীবন্ত সমাধি। কোথাও বা বৃদ্ধ বৃদ্ধারাও ভেঙে-পড়া ঘরের ধংস স্তুপের ভিতরে শেষ নিঃশ্বাসটুকুও নিয়ে যেতে পারেনি। দক্ষিণ বঙ্গের আটখানা জেলার, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল ও শহরতলি কোথাও হাঁটু, কোথাও গলা পর্যন্ত বন্যার দূষিত, আবর্জনাক্লিন্ন জলে নিমজ্জিত। উত্তরবঙ্গে, সিকিমে কী ঘটছে বা ঘটবে তা জানেন শৃঙ্খল-ছিন্ন উন্মত্ত প্রকৃতি। 

প্রতিবিধান ?

বাঙলার এবং ভারতেরও ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে তারা শ্মশান শ্বাপদের লালাসিক্ত রসনায় আত্মকলহে উন্মাদ। ওই নিরপরাধ, অবোধ-নির্বোধদের হাহাকার-য়ের, অকাল মৃত্যুর হাতে-পাওয়া মূলধন কে কতখানি রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলে কাজে লাগাবে তারই জন্য ছোটাছুটি। কেও যদি এক টুকরো 'শোক', মৃত শবের শরীর থেকে ছিঁড়ে-নেওয়া মেদখণ্ডের মত ছিনিয়ে নিয়ে স্থলপথে পালিয়ে গেল, অমনি আরেকজন আরেক টুকরো আহরণ করে, রক্তনয়নে  হুঙ্কার ছেড়ে আকাশে লাফ দিয়ে পোঁছে গেল কাপালিক গুরুর গুহায়। মানুষের দারিদ্র্য, বিপর্যয়, দুর্গতি -- এগুলি রাজনীতির নির্মম ব্যবসায়ীদের কাছে Sustainable and substantial Capital. 

বছরের পর বছর পেরিয়ে জীবনের শেষ ধাপে আজ পৌঁছেছি, বহু রাজনৈতিক নেতাকে দেখেছি, যাদেরকে দেখিনি তাদের জীবনী পড়েছি --- মাত্র কয়েকজন ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব ছাড়া বেশীর ভাগই ওই (Julius Caesor.) মার্কাস ব্রুটাসের সেই বিখ্যাত উক্তির মূর্ত মূর্তি। 


"The abuse of greatness is young ambition's ladder ;
Whereto the climber upward turns his face,
But when he attains the upmost round,
He then unto the ladder turns his back
Looks in the clouds scoring the base degrees
By which he did ascend." 


স্বভাব-সরল সাধারণ মানুষকে সিঁড়ির মত ব্যবহার করে সদ্যজাত 'উচ্চাকাঙ্ক্ষা' (উচ্চাকাঙ্ক্ষী নেতা) যখন শাসন ক্ষমতার উচ্চতম মঞ্চে নিজেকে অধিষ্ঠিত করে তখন তার দৃষ্টি মেঘেদের উপর। সিঁড়ির দিক থেকে শুধু যে সে মুখ ফিরিয়ে নেয় তাই নয়, তার ওই ক্ষমতার উৎসের প্রতিও তার ঘৃণা, তার বিতৃষ্ণা প্রদর্শন করে।
জগৎ ও জীবনের মহা নাট্যকার, মহাকবির এই উচ্চারণ সত্যের আলোয় চির ভাস্বর। বিদেশ বিভূঁইয়ের কথা থাক্, আজ আমাদের দেশের রাষ্ট্র-  যন্ত্রের, রাষ্ট্র তন্ত্রের দিকে তাকিয়ে দেখলেই এই ছবি সুস্পষ্ট। 

ভূমিকম্প বিধ্বস্ত মরোক্কো, তুরস্কের ধ্বংসস্তূপে কিংবা মধ্যপ্রাচ্য, ইউক্রেনীয় যুদ্ধে বিধ্বস্ত নগর শহরে চাপাপড়া নর-নারী-শিশুদের শেষ আর্তনাদ দূরাগত বলে কানে আসে না ঠিকই, কিন্তু আমার দেশের শহরগুলি থেকে দু-পা দূরের গ্রাম, গঞ্জ, বস্তি --যেগুলি দেশনায়কদের ঈশ্বর্য, দম্ভ, অপ্রতিহত শক্তির উৎস সেইসব অকুস্থলে যখন জীর্ণ ঘরগুলো ধসে ধসে পড়ছে, জীবন্ত চাপা পড়েছে ঘুমন্ত শিশু, বৃদ্ধ বাবা মা ঠাকুমা দিদিমা তখনও দেখি তারা হয় অন্ধ, নয় বধির ; অথবা অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠার মত্ত বাসনায় সমগোত্রীয়দের সাথেই নির্লজ্জ বিতন্ডায় অবতীর্ণ। তখন তাদের নখ দন্তের উলঙ্গ আস্ফালন কলহে-লিপ্ত, শবভুক  শ্মশানচারী চতুস্পদেরও লজ্জা দেয়।
দুঃখে দারিদ্র্যে, রোগে শোকে, প্রকৃতির বিপর্যয়ে যে অসহায় প্রাণ অকালেই ঝরে যায়, ধ্সে চাপা পড়ে, প্লাবনে ভেসে যায় -- 

"জানে না সে কোথা যাবে,
কার দ্বারে দাঁড়াইবে বিচারের আশে,
দরিদ্রের ভগবানে বারেক ডাকিয়া দীর্ঘশ্বাসে
মরে সে নীরবে...." 

এই মানবসমাজ চিত্র দিনে দিনে আরো দুর্বিসহ হয়ে উঠেছে সকলের চোখের সামনেই। অপর দিকে ধরিত্রীর প্রাকৃতিক সম্পদের লুণ্ঠন চলছে অব্যাহত গতি। শুধু আমাদের দেশে নয়, পৃথিবী জুড়ে। ভারতসহ দক্ষিণপূর্ব এশিয়া, মধ্য এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকার ভূগর্ভ, পর্বত-অরণ্য, নদী-হ্রদ এমনকি মানুষের শরীরের, নারীদের গর্ভস্থ ভ্রূণেরও রেহাই নেই --- লুণ্ঠন লুণ্ঠন। বাধা পড়লেই সশস্ত্র তান্ডব। পরিণাম -- যুদ্ধ, মৃত্যু, মহামারী। তা হোক্। ভোগের সর্বগ্রাসী লালসার মুখে সভ্যতা যেন তান্ত্রিকের হাঁড়িকাঠে পোরা ছাগশিশু। আরো চাই, আরো আরো ! মিলিয়নিয়ার, বিলিয়নিয়ার, ট্রিলিয়নিয়ার, জিলিয়নিয়ার.... হওয়ার জন্য যা কিছু করবার করে চলেছে ভোগসর্বস্ব ধনবাদ। এ যেন ছিন্নমস্তার রক্তপিপাসা ! 

আজ থেকে প্রায় পঁচাশি বছর আগে, আসন্ন শেষ বিদায়ের আগে, মানবধর্মের দেবদূত রবীন্দ্রনাথ ভগ্ন-  বিশ্বাসে আর্তনাদ করে উঠেছিলেন,
                    " ...... শুনি তাই আজি
মানুষ জন্তুর হুহুঙ্কার দিকে দিকে উঠে বাজি।"
"লুব্ধ যারা, ক্ষুব্ধ যারা, মাংসগন্ধে মুগ্ধ যারা" --সেই "একান্ত আত্মার দৃষ্টি হারা" নরপশুদের যে ভাষায় তিনি ধিক্কার দিয়ে গিয়েছেন তা তাঁর আজন্ম লালিত জীবনধর্ম ও সাধিত সংস্কারের সম্পূর্ণ পরিপন্থী -- সন্দেহ নেই ; কিন্তু আমরা ভেবে শিহরিত হয়ে উঠি, ত্রিকালজ্ঞ ঋষিকবির এহেন উচ্চারণ উদ্ঘোষিত হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নরমেধ যজ্ঞারম্ভের প্রাক্  মুহূর্তে।

সেই পৈশাচিক নরমেধ যজ্ঞে আজও পূর্ণাহুতি  পড়েনি। খনিগহ্বরে-জ্বলা নরকাগ্নির মত ভোগবাদের অন্তরে লোভের সেই আগুন অনির্বাণ। কখনো অদৃশ্য, কখনো উপরিতলে ধূমায়িত, কখনো বা খনিমুখ থেকে বেরিয়ে আসে তার লেলিহান শিখা। ইউরোপখণ্ডের আভ্যন্তরিণ ফাটলে দাও দাও জ্বলে উঠেছে সেই শিখা --- সমাপ্তির পূর্ণাহুতি হয়তো বা হতে পারে পরমাণু ঘৃতপিণ্ডে।
ভাবনার পথে অনেক দূর চলে গিয়েছি ঠিকই কিন্তু তা অপ্রাসঙ্গিক নয়। একটি দেশের বা একটি রাজ্যের প্রত‌্যন্ত কোন গ্রামের কিছু জীর্ণ ঘরে দরিদ্র, সহায়-সম্বলহীন মানুষ মাথা গুঁজে থাকেন। সে গ্রামের যে মাথা, ওই হতদরিদ্র মানুষদের সমর্থনে যে শাসক --  গ্রামপ্রধান, তার নিজস্ব ভোগস্পৃহা, তার স্বার্থপরতা, তার প্রবঞ্চনায় যদি জীর্ণ ঘরের দেওয়াল চাপা পড়ে শিশুদের মরতে হয় তবে তার অপরাধ, আর যুদ্ধবাজ, নির্মম রাষ্ট্রপ্রধানদের অপরাধ একই। লালসার জিভ লম্বায় ছোট বড় হতে পারে কিন্তু শোষণে সমান পারদর্শী। অগ্নিশিখার দহনক্ষম আগ্রাসন ততখানি প্রসারিত যতখানি তার আয়ত্বাধীন, ভাগাড়ে গৃধ্রের চঞ্চু ততখানিই যায় মৃত পশুর যতখানি অংশ সে ছিঁড়তে পারে। যেমন ছেঁড়া চটের আস্তানা থেকেও চুরি হয়ে যায় ভিক্ষুক, হারিয়ে যায় বেমালুম (কেননা তার দেহেও রত্ন আছে --- দশ বিশ লক্ষ টাকা মূল্যের), ঠিক তেমনি রাজকোষ থেকে উধাও হয়ে যায় রাষ্ট্রের মূলধন যে 'মূলধন' কোষাগারে পৌঁছায় দেশের বৃহত্তম জনসম্পদ কৃষিজীবী, শ্রমজীবী মানুষের অশ্রু ঘাম রক্তের নিরন্তর চলমান স্রোতধারায়। এসব কথায় রাজনীতির রঙ লেগে আছে -- এমন একটি ধারণা গড়ে তোলা যেতে পারে কিন্তু তা সত্য নয়। মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা যদি রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি এবং সমাজবন্ধনের সমস্ত আদর্শের ভিত্তি না হয় তবে কোন সংবিধান, কোন 'মেনিফেস্টো', কোন 'ডিক্লেয়ারেশন' সর্বজনীন কল্যাণ প্রতিষ্ঠার 'বিশ্বাস' সৃষ্টি করতে সমর্থ হবে না --- অব্যর্থভাবে ব্যর্থ হবে। সভ্যতার ঘনঘোর সঙ্কটের মাঝখানে দাঁড়িয়েও যিনি মৃত্যুহীন আশায় বুক বেঁধে বলেছিলেন, "মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ'', তিনিও বিদায়বেলায় প্রশ্ন রেখে গিয়েছেন এই 'বিশ্বাস' য়ের উপর। আজ 'বিশ্বাস' শব্দটি তার অর্থ হারিয়েছে। সে প্রবঞ্চনার নামান্তর। তাই মানুষের সঙ্গে মানুষের প্রেমের সম্পর্ক যতক্ষণ না সাধিত হবে, যতক্ষণ না সহমর্মিতা বোধ জাগ্রত হবে, যতদিন হিংস্রতা, ক্রূরতা, স্বার্থপরতা  সমাজে বিরাজ করবে এবং সর্বোপরি ভোগসর্বস্ব জীবনের প্রতি লালসার প্রশমন যতদিন না হবে ততদিন বিপুল নৈরাশ্যের ভার বহন করে যেতেই হবে। 

ঈশ্বর, ভগবান বা কোন দৈব বিধান ( Providential Dispensation), কোন গনতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক, জনগণতান্ত্রিক, সশস্ত্র বা নিরস্ত্র আন্দোলন সর্বস্তরের মানুষের কল্যাণ সাধনে সফল হবে না যতদিন না মানুষের চেতনা, সমাজের বিবেক জাগ্রত হবে। 

(লেখাটি পরিমার্জিত ও পুনঃপ্রকাশিত।) 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 

২৬/০৯/২০২৪ 

কলকাতা।
 








1 টি মন্তব্য:

  1. বিশ্বাস শব্দটির অতীত বর্তমান আর ভবিষ্যত অবস্থান সম্পর্কে লেখকের আলোচনা নিঃসন্দেহে মনোগ্রাহী

    উত্তরমুছুন

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...