শনিবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

বেতো মাস্টার

বেতো মাস্টার

টাড়রা-মোহনপুর গ্রাম। পশ্চিম বর্ধমানের একেবারে প্রান্ত অঞ্চলে, যেখানে চিত্তরঞ্জন রেলইঞ্জিন কারখানা গড়ে উঠেছে, তারও পরে পূর্বমুখী অজয় নদের উত্তর পাড়ের এই জনবসতি। উপরোক্ত দুটি গ্রাম ভিন্ন ভিন্ন হলেও দুই গ্রামের রাস্তা, কুঁয়ো-পুকুর, মাঠঘাট, খেলার মাঠ, কালিমন্দির , চণ্ডীমণ্ডপ -- সকল কিছুই এমনভাবে সর্বজনীন যে লোকে একবাক্যে, একসঙ্গে দু-গ্রামের নাম উচ্চারণ করে। এই অঞ্চল বিহার প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত ছিল, এখন ঝাড়খণ্ডের।
আজ থেকে ষাট পঁয়ষট্টি বছর আগে এই গ্রামদেশ ছিল বনজঙ্গলে ঢাকা। যানবাহন বলতে পা দুটো আর গরু বা  মোষের গাড়ি। শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল আশেপাশের পাঁচ গাঁয়ের একটি পাঠশালায়। দূর কোন বর্ধিষ্ণু পল্লী থেকে বা শহর থেকে একটি 'মাষ্টার' আসতেন, পড়াতেন। মেয়েদের পড়াশোনা কল্পনাতেও আনতো না কেও। শিশু কিশোর ছেলেরাই যেতো সেই পাঠশালায়। বই পত্তর বলতে বর্ণ পরিচয় প্রথম ভাগ, দ্বিতীয় ভাগ, একটি ধারাপাত, কোণা ভাঙা, তেলচিটে শ্লেট, ছোট ছোট টুকরা টুকরো খড়ি পেনসিল --- এই সমস্ত একখণ্ড ছেঁড়া চটে মুড়িয়ে এ-গ্রাম, ও-গ্রামের গোটা বিশেক ছেলে আমরা, সকালের জলখাবার খেয়ে হাজির হোতাম ঐ ছাত-ফাটা কাছারি ঘরের উঠোনে। মাস্টার যেদিন আসতেন সেদিন দুপুর পর্যন্ত থাকা, নইলে আম জাম পেয়ারা, যখন যেটা ফলে সেই বাগানের দিকে দৌড়। মাঝে মাঝে
মাসাবধিকাল আসতেনই না মাস্টার।
আমার আজ বেশ মনে পড়ে, সেটা ছিল শীতের সময়। সন্ধ্যাবেলায় ঘরে ফিরে খবর পেলাম দেশের ঘর থেকে মাস্টার ফিরে এসেছেন। কাল থেকে আবার পাঠশালায় যেতে হবে। রবিবার বা ছুটির দিন এসব ব্যাপার ছিল না।
তা, পরের দিন যথাসময়ে পাঠশালায় আমরা হাজির। বেতো মাস্টার (বাত নয়, তাঁর হাতে থাকতো এক লিকলিকে বেতের ছড়ি) আমাদের বললেন,
--- শোন্ তোরা, আজ একটি বিশেষ দিন, প্রজাতন্ত্র দিবস। আমি যা বলছি, মন দিয়ে শুনবি।
এরপর তিনি যে সব কথা বলতে আরম্ভ করলেন সে কথাগুলি আমরা আগে কোন দিন শুনিনি। ভারতবর্ষ, বিদেশি শাসন, স্বাধীনতা যুদ্ধ, স্বাধীনতা লাভ --- এমনি কত কথা তিনি বলেই গেলেন বহুক্ষণ ধরে। আর শেষে বললেন,
---  এতসব জানতে হলে এখানকার এই গ্রামের পাঠশালায় হবে না। শহরে যেতে হবে। তোদের মধ্যে যারা বড়, প্রথম ভাগ, দ্বিতীয় ভাগ শেষ করেছিস, যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ জেনেছিস তাদেরকে আমি চিত্তরঞ্জনের
স্কুলে ভর্তি করব। ওখানকার শিক্ষকদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। যাতায়াত করতে হবে নদী পেরিয়ে।
পারবি তো ?
আমরা কোন উত্তর দিতে পারিনি।

সেদিন সন্ধ্যায় দেখি, তিনি গ্রামের ঘরে ঘরে ঢুকছেন আবার বেরিয়ে আসছেন।
একদিন পরেই খুব সকালবেলা  আমাদের আটজন ছেলেকে আর কারো বাবা, কারো কাকা--- তাদের সঙ্গে নিয়ে বেতো মাস্টার চলতে লাগলেন।
মাঠের আলের উপর দিয়ে নদীর পাড়। এতদূর রাস্তা আমাদের জানা, কিন্তু নদী পেরিয়ে এক অন্য জগৎ। পাকা, কালো কালো পরিস্কার রাস্তা। দুপাশে কেমন সুন্দর সুন্দর ঘর। মানুষগুলো অন্যরকম যেন। ভালো ভালো জামাকাপড় পরে আছে।
গিয়ে দাঁড়ালাম যেখানে সেখানে এক মস্ত বড় ঘর। আমাদের গ্রামের ঠাকুর দালানের চাইতেও বড়।
আমাদেরকে বাইরে রেখে মাষ্টার সেই ঘরে ঢুকে গেলেন।
হঠাৎ শুনি ঢং ঢং ঢং শব্দ। একদল আমাদের মতই ছেলে হৈ হৈ করে বেরিয়ে এল। অবাক কাণ্ড, মেয়েরাও আছে।
মাস্টার বেরিয়ে এলেন, আমাদেরকে নিয়ে চললেন। একটি ঘরের ভিতরে ঢুকলাম আমরা সবাই। কী সুন্দর সাজানো ঘর। চৌকির (পরে জেনেছি টেবিল) ওপারে চেয়ারে বসে একজন, সাদা ধুতি, সাদা জামা পরা লোক।
বিস্ময়ের ঘোর, বিমূঢ়তায় আচ্ছন্ন (এ শব্দগুলি আজকের, সেদিন জানতাম না) আমরা ফিরে এলাম এবং পরের সোমবার থেকে আমাদের যাত্রা হোল শুরু।

বেতো মাস্টার তার পরও তিন বছর কি চার বছর থেকেছেন আমাদের গ্রামে। বছরে বছরে নূতন নূতন ছেলের দল পাঠিয়েছেন শহরের স্কুলে। তখনো আমরা ছোট, হঠাৎই গ্রামে আলোচনা, মাস্টার চলে গিয়েছেন। আর ফিরে আসবেন না।
বড় হয়ে বাবা, কাকাকে, অন্য বয়স্ক মানুষদের জিজ্ঞাসা করেছি, কেন মাষ্টার চলে গিয়েছিলেন। কেউই উত্তর দেন নি। আমার এই ঔৎসুক্য লক্ষ্য করে মা আমাকে চুপি চুপি একদিন বললেন,
--- মাস্টার নিজে থেকে চলে যান নি। তাঁকে গাঁয়ের লোক একজোট হয়ে তাড়িয়ে দিয়েছিল।
---কেন মা, ওনার হাতে একটা বেতের ছড়ি থাকতো ঠিকই, কিন্তু উনি তো কোন দিন কাউকে মারতেন না, এমন কি বকতেনও না।
------ উনি গ্রামসভায় জানতে চেয়েছিলেন, মেয়েদের কেন পাঠশালায় পাঠানো হয় না। মোড়ল বিনোদ মিশ্রর সাথে নাকি তর্কাতর্কিও হয়েছিল।
আমি হতবাক। ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের কথা মনে পড়ল। মনে হোল, এদেশে শুধু একজন বিদ্যাসাগর জন্ম গ্রহণ করেন নি। গ্রামে গ্রামে, জনপদে জনপদে কত শত সহস্র বিদ্যাসাগর জন্ম নিয়েছেন, হারিয়েও গিয়েছেন ব্যর্থ প্রয়াসের গ্লানি বহন করে। তাঁদের মঙ্গলময় কর্মের ফল তাঁরা ভোগ করে যেতে পারেন নি, কিন্তু আজ সমগ্র সমাজ সে ফলের অমৃতরস আস্বাদন করে চলেছে।

সেদিনের সেই স্বল্পজ্ঞাত বেতো মাস্টারের মূর্তি আমার অন্তরজুড়ে ভাস্বর হয়ে উঠল। শিক্ষা-দীক্ষাহীন এই
পাণ্ডববর্জিত গ্রাম দেশে, অর্ধ শতাব্দী আগে, শিক্ষার আলোক বর্তিকা হাতে, অবোধ নির্বোধ কিশোর শিষ্যদের সঙ্গে নিয়ে, এক মাস্টার মশাই, উপনিষদের ঋষির মত এগিয়ে চলেছেন সেই সময়ের সুদুর্গম শিক্ষা তীর্থের পথে। 
আনত মস্তকে, ভক্তিবিহ্বল চিত্তে মনে মনে বললাম,
--- ওই বর্ণপরিচয়, ওই যোগ-বিয়োগ, গুণ-ভাগের যে  পাথেয় আপনি দিয়ে গিয়ে গিয়েছিলেন তাই আজও আমার বেঁচে থাকার সঞ্জীবনী। প্রতিদানে কিছুই দেওয়া হয়নি। মাস্টার মশাই, আপনি যেখানেই থাকুন,‌ দ্যুলোকে-ভূলোকে, আমার প্রণাম যেন পৌঁছাতে পারে আপনার চরণপ্রান্তে।

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২৬-০৮- ২০২৩
ব্যাঙ্গালোর।






৩টি মন্তব্য:

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...