খুন ২
এই প্রার্থনায় কি সভ্যতার ক্রুরতম, ঘৃণ্যতম নরহত্যা নামক 'অনুষ্ঠানটি'র সমাপ্তি ঘটবে ? না, সেটি হবে না, হবার নয়। কেন না, যুদ্ধকে, মানব সভ্যতার আদিকাল থেকেই মহিমান্বিত (glorified) করে দেখানোর একটি ভয়ঙ্কর প্রবনতা আছে। তাই যুদ্ধ--
সমর, মহাসমর, সংগ্রাম, আহব, রণ, মহারণ শব্দগুলির অভ্যন্তরে মাদকতা-জারিত যে উত্তেজনা
নিহিত আছে সেটি শুধু সৈনিকদেরই উন্মাদ করে তোলে তাই নয় সাধারণ মানুষের মধ্যেও সেই উন্মত্ততা সঞ্চারিত হয়ে যায়। হাতের কাছেই আছে তার উদাহরণ। যখন প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে আমাদের দেশের যুদ্ধ বাধে তখন দুই দেশের প্রায় সমস্ত মানুষই সৈনিক হয়ে ওঠে। যুদ্ধক্ষেত্রের উত্তেজনায় মনে প্রাণে তারাও প্রতিপক্ষ দেশের পরাজয় এবং স্বদেশের বিজয় কামনা করে। কিন্তু আসল সৈনিকদের অবস্থা কি হয় ?
Henri Barbusse-র কথায়,
"Two armies that fiqht each other is like one large army that Commit Suicide."
সৈনিকদের এই 'আত্মঘাতী হওয়া'কে martyrdom আখ্যা দিয়ে সমর প্রাঙ্গনের বীভৎসতাকে আড়াল করে রাখার চেষ্টা।
আমি এই প্রতিবেদনের প্রথম পর্বে যুদ্ধকে 'বিষয়' করে যে কাব্য, মহাকাব্যেগুলির উল্লেখ করেছি সেখানে বা সেসব কালে যুদ্ধ যাঁরা করাতেন, রাজা ও রাজপুত্র, তাঁরা স্বয়ং যুদ্ধে সামিল হতেন, যুদ্ধ পরিচালনা করতেন এবং রণাঙ্গনে মৃত্যু বরণও
করতেন। এখন যুদ্ধের চরিত্র পাল্টেছে, ধরণ পাল্টেছে, কারণও পাল্টে গিয়েছে। রাজা ও তাঁর আমাত্যরা এখন নিজেরা থাকেন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে শত শত মাইল দূরে। সৈনিকগণ জৈবিক জীবনে বেতনভুক কর্মচারী, আত্মিক জীবনে বা অন্তরে দেশপ্রেমিক। তাঁদের আর একটি পরিচয় তাঁরা দেশের বা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষাকারী। যতদিন থেকে শাসক অর্থে 'রাজা' শব্দের চল আর নেই, ততদিন হোল দেশ বা রাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
স্বাভাবিক ভাবেই 'রাষ্টশক্তি' একটি রাষ্ট্রের বা দেশের
সর্বশক্তিমান নিয়ন্ত্রক এবং রাষ্ট্রের যাঁরা প্রতিভূ, (রাষ্ট্রের চরিত্র যাই হোক-- একনায়কতন্ত্র, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র) তাঁরাই সেই বিমূর্ত রাষ্ট্র শক্তির মূর্ত বিগ্রহ। তাঁদের ইচ্ছাই রাষ্ট্রের ইচ্ছা। তাঁরা যুদ্ধ চাইলে যুদ্ধ, তাঁরা শান্তি চাইলে শান্তি। এখানে ঐ রণাঙ্গনে 'মার অথবা মর' প্রাণকনিকারা নিরুপায় এবং অসহায়।
যুদ্ধের আরম্ভটা তাঁরা জানেন কিন্তু পরিণাম জানতে পারেন না ; কেননা ঃ
"Only the dead have seen the end of war"
কথাটির তাৎপর্য গভীর। মৃতরা ছাড়া, যারা জীবিত আছেন বা থাকবেন তারা কেউ কখনো, কোনদিনও যুদ্ধ নামের গণচিতার পরিনির্বাণ দেখে যেতে পারেন না।
কারণ, এ চিতা চির বহ্নিমান।
আমি এই গণহত্যা, গণ আত্মহননের চিতাগ্নিশিখা নির্বাপনের আশায় এহেন অকথা কুকথা লিখতে চাইছি না। চাইছি না এজন্যই যে রাষ্ট্র এবং উগ্র রাষ্ট্রবাদের অস্তিত্বের সঙ্গে, ব্যবসায়িক আগ্রাসনের সঙ্গে, ভৌগলিক (অখণ্ডতা ?) সীমাবদ্ধতার সঙ্গে স্বাজাত্যবোধ, সরলার্থে জাতি ও মৌলবাদের সঙ্গে এই গণহত্যা (holocaust), যুগপৎ নরকাগ্নি প্রজ্বলনের ঐতিহাসিক সম্পর্ক অস্বীকার করবার উপায় নেই।
আমি পারমাণবিক আকারের (micro level) খুন, ব্যক্তির দ্বারা ব্যক্তিহত্যা নিয়েই আলোচনাটি ফেঁদেছি। এগুলিও নাটকে, নভেলে, কাব্য কাহিনীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সেখানেও হত্যাকারীর যে পরিণাম সেখানে বিষাদ ও সন্তাপ-সঞ্জাত বোধের (catharsis) উদয় হয়েই থাকে। কিন্তু...
ক্রমশঃ
(আলোচনাটি বিশদভাবে করবার চেষ্টা করবো)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন