সোমবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৪

রামায়ণে অবিচার --- তিন

রামায়ণে অবিচার --- পর্ব তিন

রামায়ণে অবিচার প্রসঙ্গে পর্ব দুই'তে রাজা রামচন্দ্রের 

'শম্বুক বধ' বর্ণনা ও আলোচনা করেছি। আজ আলোচনা করব সেই ঘটনার পরবর্তী পর্যায়। 


সীতা বিসর্জনের পর বহু কাল রাজা রামচন্দ্রের রাজ্যশাসন অব্যাহত আছে। গো-ব্রাহ্মণ হিতায়, ধর্ম রক্ষার দায়িত্ব পালন করে রামচন্দ্র তখন দিগ্বিদিকে প্রসংসিত। বাল্মীকি রামায়ণ, ৬০ -- ৬৪ সর্গে আমরা পাই, একদিন, কোন এক অপগতশীত, কবোষ্ণ প্রভাতে রামচন্দ্র তাঁর রাজসভায় এসে সিংহাসনে সমাসীন হলে সুমন্ত্র নিবেদন করলেন, মহর্ষি চ্যবনের সঙ্গে কয়েকজন যমুনাতীরবাসী তপস্বী রাজার দর্শনপ্রার্থী হয়েছেন। 


ভূগুপুত্র মহর্ষি চ্যবনের কথায় রামচন্দ্র জানতে পারলেন যে যমুনাতীরের মধু নামের এক মহাসুরের প্রতিষ্ঠিত রাজ্যে, মধুবনে, অসুর মধুর পুত্র পাপাত্মা লবনাসুর দ্বারা ওই জনপদের সকল জীব, বিশেষত তাপসগণ উৎপীড়িত, নিহত এবং ভক্ষিত হয়ে চলেছে।
রামচন্দ্র কণিষ্ট ভ্রাতা শত্রুঘ্নের উপর লবণাসুর নিধনের ভার অর্পণ করলেন এবং বললেন, তুমি মধুর পুত্র পাপাত্মা লবনাসুরকে বধ করে ওই স্থানে, যমুনাতীরে, মধুর রাজ্যে নগর ও জনপদ স্থাপন কর, রাজ্য স্থাপনা কর। আমি সেই রাজ্যে তোমাকে অধিষ্ঠিত করব। 


এইবার শত্রুঘ্ন তাঁর সৈন্য বাহিনীকে অগ্রসর হতে আদেশ দিয়ে একমাস পরে মধুর রাজ্য অধিকার করবার জন্য যাত্রা করলেন। এই অভিযাত্রায় দুই রাত্রি পথে কাটিয়ে, তৃতীয় দিবসে মহর্ষি বাল্মীকির আশ্রমে উপস্থিত হলেন। মহর্ষি বাল্মীকি তাঁর আশ্রমে শত্রুঘ্নকে স্বাগত জানালেন। সেই আশ্রমের নাতিদূরে কিছু পূরাতন যজ্ঞোপকরণ দেখে শত্রুঘ্ন কৌতুহল প্রকাশ করেন।
মহর্ষি মহান রঘুবংশের পূর্বতন এক রাজা সৌদাসের কাহিনী সবিস্তারে বর্ণনা করলেন এবং পরিশেষে বললেন, শত্রুঘ্ন, এই আশ্রমের নিকটে যে যজ্ঞস্থান দেখছ তা রঘুবংশেরই রাজা সৌদাসের যজ্ঞস্থান ছিল। 


"শত্রুঘ্ন যে রাত্রিতে বাল্মীকির পর্ণশালায় ছিলেন, সেই রাত্রির মধ্যভাগে সীতা দুই পুত্র প্রসব করলেন। দেবতুল্য কান্তিমান বালকদ্বয়কে দেখে বাল্মীকি অতিশয় প্রীত হলেন, এবং কুশগুচ্ছ দিয়ে ভূতরক্ষোবিনাশিনী  রক্ষা (রাখি বা তাগা) রচনা করে বৃদ্ধাদের বললেন, যে অগ্রজ তার গাত্র এই মন্ত্র পূত কুশগুচ্ছের অগ্রভাগ দিয়ে মার্জনা কর, তার নাম 'কুশ' হবে। যে  পরে জাত তার গাত্র কুশগুচ্ছের অধোভাগ (লব) দিয়ে মার্জনা কর, তার নাম 'লব' হবে। এই দুই জমজ পুত্র আমার প্রদত্ত নামেই খ্যাতি লাভ করবে। (বাল্মীকির বর্ণনা অনুযায়ী 'কুশ' অগ্রজ এবং 'লব' অনুজ।) 


লক্ষণীয়, আধুনিক (উনবিংশ শতাব্দী থেকে বর্তমান কালের) বিশ্বসাহিত্যের বিশ্ববরেণ্য উপন্যাসিকগণও তাঁদের সুবৃহৎ সব উপন্যাসে এমন নিখুঁত পারম্পর্য, অজস্র ঘটনার এমত যৌক্তিক গ্রন্থন সম্ভব করতে পারেন নি।
যাই হোক্, এখানে সীতা দেবীর সঙ্গে শত্রুঘ্নের দেখা হওয়ার কোন উল্লেখ নেই। তীলক প্রভৃতি টীকাকারেরা মন্তব্য করেছেন রামচন্দ্রের অনুজ্ঞা না থাকায় শত্রুঘ্ন সীতা দেবীর সঙ্গে দেখা করতে চান নি। কিন্তু মহর্ষি সেই যমজ সন্তানের জন্ম হওয়ার কথা, তাদের নামকরণ, গোত্র নির্দিষ্টকরণ -- সমস্ত কথাই তাদের খুল্লতাত শত্রুঘ্নকে জানিয়ে দিলেন। এবং শত্রুঘ্নও সহর্ষে বললেন, "কী সৌভাগ্য!"
মধ্যরাত্রি। বাল্মীকি আশ্রমে অযোধ্যারাজ রামচন্দ্রের ঔরসজাত, সীতা দেবীর গর্ভজ যমজসন্তান ভূমিষ্ঠ হোল। এই পবিত্র ঘটনাটিকে সংশয়াতীতরূপে প্রমাণযোগ্য করার জন্য মহাকবি কী বিস্ময়কর ঘটনা- শত্রুঘ্নের উপস্থিতি -- সংস্থাপন করেছেন।
আজ যখন অযোধ্যারাজ্যের 'উত্তরাধিকার' জন্ম নিচ্ছেন তখন, সীতা নির্বাসনের এক বৎসর অতিক্রান্ত না হতেই কনিষ্ঠ রামানুজ শত্রুঘ্ন রাজাদেশে রাজকার্য সম্পাদন করার নিমিত্তে, যুদ্ধযাত্রার পথে সেই বাল্মীকি আশ্রমেই রাত্রিবাস করছেন যেখানে তাঁদের বংশধরদের অভ্যুদয় সংঘটিত হোল।
আমাদের স্মরণে আছে লক্ষ্মণ যেদিন সীতা দেবীকে নির্বাসনে দিয়ে গেলেন সেদিনও সীতা দেবী তাঁর নারীসুলভ সমস্ত ব্রীড়া বিসর্জন দিয়ে রামানুজ লক্ষ্মণকে তাঁর গর্ভস্ফীত নিম্নোদর দেখিয়ে বলেছিলেন, দেখ, দেখ লক্ষ্মণ, আমি সন্তানসম্ভবা। এই অবস্থায় তোমরা আমাকে কোথায় রেখে যাচ্ছ ? 


বিস্মিত, বিমূঢ় সীতা দেবী আরো কিছু মর্মবিদারী বাক্য অশ্রুবাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন,
পূর্বে বনবাসকালে আমি রামের সঙ্গে ছিলাম, এখন একাকিনী কি করে এই আশ্রমে থাকব ? মুনিরা যখন প্রশ্ন করবেন --- কোন্ অসৎ কর্মের জন্য রাঘব তোমাকে ত্যাগ করেছেন , তখন আমি কি উত্তর দেব ? আমার গর্ভে রাজবংশের সন্তান আছে, নতুবা আজই জাহ্নবীর জলে প্রাণ বিসর্জন দিয়ে এই আরোপিত কলঙ্কের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি লাভ করতাম।  
পরিশেষে, জীবনে এই প্রথম তাঁর শ্রীমুখ থেকে নিঃসৃত হয়েছিল তাঁর আরাধ্য জীবন স্বামীর উদ্দেশ্য ভর্ৎসনার বাণী,
লক্ষ্মণ, তুমি সেই ধর্মনিষ্ঠ নৃপতির চরণবন্দনা ক'রে আমার এই কথা জানিও, ---- "আমি শুদ্ধচরিত্রা, তোমার (রাজা রামচন্দ্রের) প্রতি একান্ত ভক্তিমতী ও হিতকারিণী তা তুমি জান। তুমি (রামচন্দ্র) অপবাদভীরু তাই আমাকে ত্যাগ করেছ। তুমি আমার পরম গতি, তোমার অপবাদ যেন না হয় তা আমার অবশ্য করণীয়।"

এখানে ধর্মনিষ্ঠ নৃপতি সম্বোধন করে সীতা দেবী বুঝিয়ে দিলেন রাম এতখানিই দুর্বল 'পুরুষোত্তম' রাজা যিনি আপন অসহায় অন্তঃসত্ত্বা সহধর্মিণীকে, শুধুমাত্র জনসমক্ষে, সন্দেহক্লিন্ন প্রজাবর্গের কাছে নিজেকে নিষ্কলঙ্ক, নিষ্কলুষ ও আত্মশ্লাঘী প্রমাণ করবার জন্য রাবণ বধের পর লঙ্কায় অগ্নিপরীক্ষায় পরিশুদ্ধা সীতা দেবীকে এমন গ্লানিময় অবস্থায় নিক্ষেপ করতে পারেন। তিনি তো সীতারও 'পতি', স্ত্রীকে রক্ষা করবার দায় আপন রাজস্কন্ধে বহন করে, রাজ্যশাসনের ভার অপর ভ্রাতাদের উপর ন্যস্ত করে, তাঁর আসন্ন সন্তানের রক্ষার পবিত্র প্রয়োজনে রাজ সিংহাসন পরিত্যাগ করতেই তো পারতেন।
তিনিই তো প্রথম জানতে পেরেছিলেন সীতা দেবী তাঁর সন্তান ধারণ করেছেন। 

তাঁকে বিসর্জনের আগে, অযোধ্যার অশোক কাননে তিনিই সীতা দেবীকে বলেছিলেন,
বৈদেহী, তোমার অপত্যলাভ হবে তার লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি, এখন তুমি কি ইচ্ছা কর, আমাকে বল।
তাহলে রাম সত্যটা জানতেন এবং সহধর্মিণীর সঙ্গে সহবাস স্বীকার করেই তাঁর (সীতা দেবীর)'সাধ 'পূর্ণ করতে চাইছেন।
এখানে আমরা মহাকবির কথা কিছু বলি -----
কী অতিমানবীয় প্রতিভা, কী অতুলনীয় সৃষ্টিচেতনা। সীতা দেবীর সন্তান সম্ভাবনা থেকে তাঁর যমজ সন্তানের শুভ প্রসবকাল --- প্রতিটি সুনির্দিষ্ট সময়ে মহাকবি অযোধ্যার রাজপরিবারের সদস্যদের, বিশেষ করে রামচন্দ্র, লক্ষ্মণ ও শত্রুঘ্নকে সাক্ষী রেখেছেন।
কিন্তু লক্ষ্মণ অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তন করে সীতার বিদায়কালের কথাগুলি রামকে বলেছিলেন কিনা তা মহাকবি উল্লেখ করেন নি।

এইভাবে ঘটনা পরম্পরা সংঘটিত হতে লাগল। শত্রুঘ্ন লবনাসুরকে বধ করেন, সেখানে শূরসেনারা উপনিবেশ গড়ে তুলল। ক্ষত্রবীর শত্রুঘ্নের যত্নে, পৃষ্টপোষকতায় দ্বাদশ বৎসরের মধ্যে যমুনাতীরে এক অর্ধচন্দ্রাকৃতি শোভমান ও সমৃদ্ধ বহুপ্রজাসমন্বিত নগর স্থাপিত হোল। (এই মধুপুরীই মথুরা এবং তার পরিধির মধ্যেই শূরসেন)। অনন্তর দ্বাদশ বৎসর অতিবাহিত হবার পর শত্রুঘ্ন একশত রথ ও তাঁর অনুচরদের নিয়ে রামচন্দ্রের সঙ্গে দেখা করার জন্য অযোধ্যা যাত্রা করলেন।  বিভিন্ন স্থানে বিশ্রাম করার পর তিনি আবারও মহর্ষি বাল্মীকির আশ্রমে উপস্থিত হলেন। 


পান ভোজনের পর বিশ্রাম কালে তাঁদের কানে ভেসে এল রামচরিত গান। দেবভাষায় ছন্দোবদ্ধ, উদারা-মুদারা- তারায় উচ্চারিত, বীণাধ্বনিসহযোগে, সমতালে, মধুর কণ্ঠে গীত সেই গান শুনতে শুনতে যেন সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লেন শত্রুঘ্ন। তাঁর দুই চোখ বেয়ে অশ্রুধারা নিঃসৃত হতে লাগল। তাঁর সঙ্গে যাঁরা ছিলেন তাঁরাও স্মৃতিমেদুর ও বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। তাঁরা জানতে চাইলেন এই স্বপ্নবৎ সঙ্গীত কার রচনা, কাদের কণ্ঠেই বা ধ্বনিত হচ্ছে। শত্রুঘ্ন উত্তর দিলেন, আশ্রমে বহু কিছু আশ্চর্য ব্যাপার ঘটে। কৌতুহল প্রদর্শন করা অনুচিত হবে।
শত্রুঘ্ন নিজে কিন্তু বিনিদ্র রজনী যাপন করে শুধু সেই গানের কথাই ভাবতে লাগলেন। পরদিন প্রত্যুষেই তিনি মহর্ষির নিকট বিদায় নিয়ে অযোধ্যার উদ্দেশ্য যাত্রা করলেন। সুদীর্ঘকাল পর তিনি অযোধ্যায় অগ্রজদের সঙ্গে মিলিত হলেন। 


আবারো এমন একটি ঘটনা , মহাকবি নাটকীয় ভাবে ঘটালেন যার মধ্য দিয়ে রামায়ণ কাহিনীর পারম্পর্য অক্ষুন্ন রয়ে গেল। 


এরপর উপাখ্যান চলমান। গতি তার মন্থর কিন্তু আকর্ষণ তীব্র থেকে তীব্রতর। 'শম্বুকের শিরশ্ছেদ' কিছু পূর্বেই আলোচনা করেছি।
তা হলে এই সত্যটি  প্রতিপন্ন হোল যে সীতা দেবীকে বিসর্জনের সংকল্পটি ছিল সম্পূর্ণ ত্যাগ এবং কতখানি নির্মম, নিষ্ঠুর ছিল এই সম্পর্ক ছিন্ন করার বিধান, (রাজার শাস্তি বিধান)তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ এই কঠোর নীরবতা। সুদীর্ঘ বারটা বছর সন্তান সম্ভবা স্ত্রীকে নির্বাসনে দিয়ে স্বয়ং রাজা বা অযোধ্যার রাজপরিবারের কোন সদস্য, রাজার শাসনেই হয়তোবা, বাল্মীকি আশ্রমে সীতা দেবীর অবস্থা, অবস্থিতি ও পরিণাম বিষয়ে 'অমানবিক'ভাবে উদাসীন। এই রাজকীয় উপেক্ষা  একটি অবলা নারীর প্রতি কী প্রাণঘাতী অবিচার ! 


                         ক্রমশঃ
      (চতুর্থ পর্বে সমাপ্য। বিশ্ব সাহিত্যের নির্মমতম বিয়োগান্তক মহাপরিণাম নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করব। সুধী পাঠকগণের জন্য শুভ নববর্ষ।)
______________________________________________




1 টি মন্তব্য:

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...