"....লুব্ধ যারা , ক্ষুব্ধ যারা ,
মাংস গন্ধে মুগ্ধ যারা , একান্ত আত্মার দৃষ্টিহারা
শ্মশানের প্রান্তচর , আবর্জনা কুন্ড ঘেরি
বীভৎস চিৎকারে তারা রাত্রি দিন করে ফেরাফেরি --
নির্লজ্জ হিংসায় করে হানাহানি ।
শুনি তাই আজি
মানুষ -জন্তুর-হুহুঙ্কার দিকে দিকে উঠে বাজি ।''
উদয়-ঊষার প্রথম শুভক্ষণ থেকে সুদীর্ঘ জীবনকালব্যাপি' আলোর দিশারী যিনি , অস্তাচলের চূড়ায় , বার্ধক্যভারে ঈষৎ ন্যুব্জ (কবি তখন কালিম্পঙে) ," বহু মানবের প্রেম দিয়ে ঢাকা'' তাঁর সুন্দরী বসুন্ধরার দিকে , অস্তায়মান দৃষ্টি ফেলে কী দেখে গেলেন মহাপ্রেমের আলোয় চিরজ্যোতিষ্মান রবীন্দ্রনাথ ?
এ দেখাই শেষ ছিল । ভালোয় হয়েছিল ; নইলে উনিশ'শ একচল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ , এই বিশ্বধংসী মারণ কালের বীভৎসা দেখলে , সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মহামানবের অন্তরাত্মার সে ক্রন্দন আমাদের কাছে চির- অসহনীয় রয়ে যেতো । অবশ্য নিকট ভবিষ্যতে , মানবতার আসন্ন চিতাগ্নিশিখার বহ্নিজ্বালা অনুভব করেছিলেন বলেই সভ্যতার সঙ্কট -য়ে ইঙ্গিত দিয়ে গিয়ে ছিলেন ওই স্তূপীকৃত ভস্মরাশির , যা স্তব্ধবাক পৃথিবী প্রত্যক্ষ করেছিল, আযুৎবিৎসে , হিরোশিমায় , নাগাসাকিতে ।
আয়ুৎবিৎসে Auschwitz , তেই ছিল সেই প্রায় চল্লিশটি Concentration camp এর ভয়ঙ্কর বিশাল এক বন্দিশালা ,যেটি তৈরি করেছিল এডলফ হিটলারের নাৎসী (Nazi) বাহিনী পোল্যান্ড বিধ্বস্ত করার পর ।
হিটলারে সৃষ্ট এই নরক (Hell on earth)- বিশ্ববাসীর নজরে আসে ১৯৪৫ সালের ২৬শে জানুয়ারী , যখন রাশিয়ার ফৌজ সেখানে প্রবেশ করতে সক্ষম হোল । প্রথমে তারা পেয়েছিল সাড়ে সাতশ মৃতদেহ , সাত হাজার অভুক্ত , তখনো-সপ্রাণ সাত হাজার কঙ্কালের মত নারী পুরুষ , আর কয়েকটি গোদামে ও দেওয়ালের পাশে পাশে, কোণায় কোণায় স্তূপাকার জুতা, জামা- কাপড় ,থলি -- এইসব । এটুকু তো আমাদের কালিপূজায় পাঁঠাবলির মুন্ড মাত্র । এবার ধড়গুলির খবর ? রাশিয়ার লালফৌজ ঢুকবার
আগে ষাট হাজার , (৬০০০০) বন্দিকে হাঁটানো হয়েছিল ওডিজিলস শহরের দিকে । রাস্তায় পড়ে পড়ে
মরেছিল , যারা হাঁটতে পারেনি তাদের গুলি করে মারা হয়েছিল পনের থেকে বিশ হাজার (১৫০০০/২০০০০) । ১৯৪০ থেকে ১৯৪৫সাল পর্যন্ত তের লক্ষ (১৩০০০০০) ইহুদীকে বন্দি করা হয় , তাদের মধ্যে এগারো লক্ষ (১১০০০০০)-কেই হত্যা করা হয়েছিল । মোট নিহতের সংখ্যা আশি লক্ষ থেকে এক কোটি বিশ লক্ষ । (এ সবই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উপর লেখা বিভিন্ন গ্রন্থের আনুমানিক পরিসংখ্যান । বাস্তবে, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কারণে মৃতের সংখ্যা গণনার অতীত এবং আহত ও পঙ্গুর হিসাব আজও , সত্তর বছর ধরে, করা যায় নি।
তাহলে ,আমি কেন হঠাৎ ,এতো দিন পর , দান্তে সাহেবের " ডিভাইন কমেডি" নিয়ে বসেছি ? বসেছি এই কারণেই যে , ঐতিহাসিকেরা তো হাজার হাজার কারণ দর্শিয়েছেন , কিন্তু আমরা, আমাদের সাধারণ দীর্ঘ জীবনের দর্শনে ও অভিজ্ঞতায়, কি দেখেছি , কি দেখছি ? ইউরোপ ছেড়ে এবার আসি আমাদের ঘরেই। ১৯৪৬ - ৪৭ , বাংলা আর পাঞ্জাবের দেহ ছিঁড়ে যখন স্বাধীনতা এল , সেই সময়কার নরকের, (ভারতীয় সংস্করণ ) ছবি আঁকা আছে যে বইগুলিতে তার কয়েকটি হলো :
Midnight 's Furies , by Nisid Hajari, Train to Pakistan , Memories of madness, by Khushwant Sing,
Train to India, by Moloy krishna Dhar, The Story of India's Partition by Raghubendra Tanwar, The Untold Stories, by Narendra
Singh Sarila. এগুলি যথেষ্টই । আরো রয়েছে , এই কয়েকটি চোখের জল আর বুকের রক্ত নিঃশেষ করার পক্ষে অনেক ।
না , আমি রক্তনদীর ঢেওগুলি আর গুণতে চাই না , বরং ঘটি-বাটি ,ভিটে-মাটি , স্বামী-সন্তান , আত্মীয় -স্বজন হারানো লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তুদের অনেকগুলি ক্যাম্প ( যেমন ধুবুলিয়া , কাশিপুর , মুঙ্গের, কালাহান্ডি ইত্যাদি )-য়ের মধ্যে নদিয়ার রানাঘাটের কুপার্স ক্যাম্পের কথা বলি ,
" এক সময় সেখানে বাসিন্দার সংখ্যা ছিল সত্তর হাজারের উপরে । এই সত্তর হাজার মানুষের জন্য খাটা পায়খানা ছিল আশিটির মতো, গড়ে পায়খানা পিছু ন'শ লোক , (কুমারী,যুবতী , বধূদের অবস্থা ভাবুন। এই সমস্ত ক্যাম্পে জলের ব্যবস্থা ছিল না) । এখানে ভেসে বেড়াত সন্তানহারা নারীর আর্তনাদ ! রাস্তার দু'পাশে সার বেঁধে , মৃত শিশু কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত , জল -শুকানো চোখ আর মাথায় এক হাত তুলে ,চুল ছিঁড়তে ছিঁড়তে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করত কখন ট্রাক এসে নিয়ে যাবে শিশুর মড়া । "
"প্রান্তিক মানব , পশ্চিমবঙ্গের উদ্বাস্তু জীবনের কথা" ,--প্রফুল্য কুমার চক্রাবর্তী ।
উপরন্তু কিছু সহ্য করার মত শক্তি বা ধৈর্য কোনোটাই নেই । এইটুকু তাও জানালাম এই কারণেই যে দ্বিতীয় মহাসমরের অন্তিম সৎকারের শবদাহের দূরাগত গন্ধ আমাদের নাসারন্ধ্রে সহজেই প্রবেশ করে এখনো ; কিন্তু ভুলে গেছি সেই চল্লিশ -পঞ্চাশের দশকের আমাদের আত্মহনন ,ভ্রাতৃহননের ভয়ঙ্কর পরিণতি ,- গঙ্গা আর পদ্মাপাড়ের সুদীর্ঘ বহ্নিমান চিতাগুলি । এখানেই সমবেত একটি ক্ষীণ স্বর , সত্তর-আশি বছর বয়সের একটি ছোট 'গণ সংগঠনের' সম্মিলীত কণ্ঠ হতে বেরিয়ে আসতেও পারে, "ভুলি নাই।"
কিন্তু তার সাধ্য কতটুকু ? নবপ্রজন্মের সচেতন হওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই । কিসের সচেতনতা ?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বহুমুখী কারণ, সমুহভাবে শেষে এসে একমুখীন হয়ে "বিশুদ্ধ আর্য রক্তের (?)" উন্মত্ততার রূপ নিয়ে ছিল । উন্মাদ কাপালিক শব সাধকেরা মেতে উঠল ইহুদী , পোলিশ , সাম্যবাদী , উদার মানবতাবাদী নিধনে । জাত্যাভিমান , তার সঙ্গে মিশে গেল উগ্র রাষ্ট্রবাদ । তার দোসর ,আত্মরক্ষার নামে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন । যুক্ত হোল ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক বিষের অনর্গল উদ্গীরণ । ছড়িয়ে পড়ল দেশে দেশে ।
এবারে আসি এই বাংলার ,তথা ভারতের মাটিতে । অবিভক্ত ভারতে , বিশেষ করে পাঞ্জাব ও বাংলায় তখন হনন ,অগ্নিদহন , উৎসাদন , বিতাড়ন , "নারীঘাতী ,শিশুঘাতী কুৎসিত বীভৎসা "-র যে মানবতাহীন তাণ্ডব চলেছিল , "মহামানবের সাগরতীরে" প্রত্যাশিত ছিল তা কী ?
২৯/০১/২০২২
ইতিহাসের দিনক্ষণ , ব্যক্তি বা ঘটনার বিবরণ দিতে গেলে ইতিবৃত্ত লেখা হয়ে যাবে । সে পথে আমি যাবো
না । তবে বিশ শতকের তিরিশের দশক থেকে বাংলায় সাম্প্রদায়িকতার বিষ ভয়ঙ্করভাবে ছড়াতে থাকে । তার বহু আগে সাপ নিয়ে খেলা শুরু করে দিয়েছিল ইংরেজ শাসক এবং বীণ বাজাতে আরম্ভ করে দেশের কিছু নেতা । সাহিত্য ,শিল্প , সংস্কৃতি জগতের ব্যক্তিত্বগণ প্রমাদ গুণেছিলেন আগেই । নজরুল , শরৎচন্দ্র , ওপারের জসীমউদ্দীন , আব্দুল ওদুদ (সবাকার নাম লিখলে দশ পাতার প্রবন্ধ হয়ে যাবে ) তাঁদের লেখায়, রেখায় , সঙ্গীতে ,নাটকে ,যাত্রাপালায় প্রাণপণ চেষ্টা তাঁরা করেছিলেন সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্বের বিষাক্ত ছোবল থেকে বাংলাকে, বাঙালীকে মুক্ত রাখার । মহাপ্রাণ রবীন্দ্রনাথের কথা কত আর বলি ? আমাদের মানুষ করার জন্য কী না তিনি করেছেন ? বড় বেদনায় তিনি বুঝেছিলেন , "জয়হীন চেষ্টার সঙ্গীত , আশাহীন কর্মের উদ্যম "। তাই ১৯৩৫সালের ১১ই জানুয়ারী কাজী আব্দুল আজিজকে লেখা একটি চিঠিতে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তিনি লিখছেন ,
"আমরা দুই পক্ষ কী বিনাশের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পরস্পর পরস্পরকে আঘাত ও অপমান করে চলব ?"
বাংলা ও বাঙ্গালীত্ব নিয়ে আমরা যারা এখনও আত্মপ্রসাদ লাভ করি , তাদের প্রত্যেকের ভেবে দেখা উচিত , যে মহামানবের উদয় ও অস্ত জুড়ে আমাদের সুখ- দুঃখ, আনন্দ- বেদনার নিত্য চলমানতা, যাঁর
ভাষা, যাঁর ভাব , যাঁর নামে আমাদের পরিচয় ,সেই ভবিষ্যৎদ্রষ্টা ঋষি , অখণ্ড বাংলার আসন্ন সর্বনাশের ইঙ্গিত দিয়ে গিয়েছিলেন ঘটনার দশ বছর আগেই । ঘটনাও ঘটে গেল , দুঃসহ মরণ বরণ করল তিন কোটি এই বাংলারই মানুষ , তার পরও এলো ষাটের দশকের , সত্তরের দশকের মহাবিপর্যয় ; তবু আজিও আমাদের চেতনা হয়েছে কী ? এখনও ধর্ম ,বর্ণ , জাতি, সম্প্রদায়গত সঙ্কীর্ণতা বাংলাকে , বাঙালীকে নিয়ন্ত্ৰণ করে চলেছে । আব্দুল ওদুদকে লেখা কবিগুরুর সেই শঙ্কার বাণী আজও সমান প্রাসঙ্গিক । সাধু সাবধান !
আরো একটি কথা , বাঙালীর উত্তরাধীকার , বিশেষতঃ মানবতাবাদী সাহিত্যসৃজনে এবং ঐক্যবোধের দর্শনে । ভেদ ও বিভেদ এই ধারণাগুলি বঙ্গমানসিকতায় থাকারই কথা নয় । তিনটি সমুদ্রগভীর সাহিত্য ও দর্শন আমাদের সম্মুখে : ঋষি অরবিন্দ ,স্বামী বিবেকানন্দ এবং রবীন্দ্রনাথ । প্রথম দুজনের বিপুল রচনাসম্ভার প্রায় সবটাই ইংরেজিতে । আর রবীন্দ্রনাথের ইংরেজি চিঠিপত্র , ভাষণ , মৌলিক রচনা ও অনুবাদ অকল্পনীয় ভাবে কায়ায় বিশাল , গভীরতায় অতলস্পর্শ । (কৌতূহলী পাঠকবন্ধুগণ, যাঁরা এখনো হাতে নিতে সময় পাননি , তাঁরা পরখ করে দেখতে পারেন ) । 'অমৃতস্য পুত্রা: বিশ্বমানবের উদ্দেশে তিনি বলছেন --
"Theirs is the cry of a past that is already exhausted, a past that has thrived upon the exclusive spirit of national individualism witch will no longer be able to keep the balance in its perpetual disharmony with its surroundings. Only those races will prosper who , for the sake of their own perfection and permanent safety, are ready to cultivate the spiritual magnanimity of mind that enables the soul of man to be realised in the heart of races.
For men to come near to one another and yet to continue to ignore the claims of humanity is a sure process of suicided. We are waiting for the time when the spirit of the age will be incarnated in a complete human truth and meeting of men will be translated into the Unity of Man."
আর বলবার আছে কি কিছু ?
এই রচনার সমস্ত দায় আমার ।
দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়
২৮-০১-২০২২/ ২৯-০১-২০২২
ব্যাঙ্গালোর ।
______________________________________________________________________________________________________________________________________________________________________
Speechless...shobdo hariye gelo je...
উত্তরমুছুন