শুক্রবার, ২৮ মার্চ, ২০২৫

স্বামী রঙ্গনাথানন্দ ও বর্তমান ভারতবর্ষে তাঁর ধর্মাদর্শের অপরিহার্যতা-- ৩

তিন 

ভারতবর্ষের অধ্যাত্ম চিন্তা, বেদ-বেদান্ত-উপনিষদ ও গীতার বাণী বহুকাল ‌পূর্বেই পাশ্চাত্য মণীষীদের কাছে পোঁছেছিল এবং পশ্চিম দুনিয়ায় প্রাচীন ভারতের সে বাণী সাগরপারের মনন জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ইসলাম আসার প্রায় পাঁচ'শ বছর আগে খ্রীষ্টান (Christianity) ধর্মধারণার সঙ্গে  ভারতবর্ষের পরিচয় ঘটে। সেন্ট থমাস দ্য এপোষ্টেল (St. Thomas the Apostle), যীশু খ্রীষ্টের সাক্ষাৎ শিষ্য, 52খ্রীষ্টাব্দে অর্থাৎ খ্রীষ্টীয় প্রথম শতাব্দীতেই ভারতের দক্ষিণ-পশ্চিমের কেরল রাজ্যে এসেছিলেন। তখন থেকেই খ্রীষ্টান ধর্মের সঙ্গে আমাদের পরিচয় এবং প্রায় সমসাময়িককালেই ইহুদী | অষ্টম শতাব্দীতে পারসিক জরথুষ্ট্রীয় সম্প্রদায়ও ভারতে পদার্পণ করেন। স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর চিকাগো ভাষণে সে কথাই  জগতবাসীর কাছে উদাত্ত-গম্ভীর কণ্ঠে ঘোষণা করেনঃ 

"I am proud to belong to a religion which has taught the world both tolerance and Universal acceptance. we believe not only in universal toleration, but we accept all religions as true. I am proud to belong to a nation which has sheltered the persecuted and the refugees of all religions and nations of the earth."

'আমি এমন এক ধর্মীয় ঘরানা থেকে এসেছি যে ধর্ম জগতকে শিখিয়েছে সুমহান সহনশীলতা ও বিশ্বকে বরণ করবার, ঠাইঁ দেবার উদার মানসিকতা।' 

ভারতের সনাতন ধর্মবোধ-সঞ্জাত এই বাণীর উৎস আমাদের উপনিষদ। মহাউপনিষদের শ্লোকটি এই রকমঃ 

অয়ং নিজ পরোবেতি গণনা লঘুচেতসাম্।
উদার চরিতানাম্ তু বসুধৈব কুটুম্বকম্।।

সেই কোন বিস্মৃত অতীতকাল থেকেই ভারতবর্ষে বিশ্বের প্রধান ধর্মধারণার দূতেরা (Apostle) এসেছেন, তাঁদের ধর্মমত প্রচার করেছেন। সে সকল ধর্মমতগুলির মধ্যে ইহুদী, খ্রীষ্টান ও জরাথুষ্ট্রিয়ান প্রাচীনতর। তাদের সঙ্গে ভারতীয় ধর্মধারণার প্রবলতর দ্বন্দ্ব বা সংঘাত সংঘটিত হয়েছিল এমন উদাহরণ এ দেশের ইতিহাসে পাওয়া যায় না। 

কিন্তু যে ধর্মধারণা সপ্তম শতাব্দীর পর থেকে প্রায় অর্ধেক পৃথিবীতে আপন প্রতিষ্ঠা সুনিশ্চিত করেছে তা হোল ইসলাম। ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হজরত মহম্মদ ৫৭০ খ্রীষ্টাব্দে মক্কায় জন্মগ্রহন করেন। মহম্মদের প্রবর্তিত ও প্রচারিত ইসলাম ধর্ম অল্পকালের মধ্যেই সুবিস্তীর্ণ ভূখন্ডে ছড়িয়ে পড়েছিল। 

স্বামী রঙ্গনাথানন্দ তাঁর 'উপনিষদের সন্দেশ' গ্রন্থে  সবিস্তারে আলোচনা করেছেন। ভারতীয় সভ্যতার আর্য তথা হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে বেদ-ব্রাহ্মণ-বেদান্ত-উপনিষদ যেমন শ্রুতি এবং বেদানুবর্তী অনুশাসন সম্মন্ধীয় সংস্কার ও ক্রিয়াকর্ম‌ সম্মন্ধীয় গ্রন্থ যেমন স্মৃতি, ঠিক তেমনি ইসলাম ধর্মেও 'শ্রুতি ও স্মৃতি'-র বিষয়টি আছে। স্বামী রঙ্গনাথানন্দজী ইসলাম ধর্মের শ্রুতি কোরানের কিছু রুকু (সুক্ত বা বাণী) উদ্ধার করেছেন, এবং সিদ্ধান্ত করেছেন যে সে সকল কোরানের আয়াতগুলি বিরল আধ্যাত্মিক ঐশ্বর্যও মাধুর্যমণ্ডিত।
'কোরান বা কোরআন' -এর ৬২ নং রুকু উদ্ধার করে দেখিয়েছেন যে মহানবী হজরত মহম্মদ অপরাপর ধর্মধারণার উপরও শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। 

"যারা (কোরআনে) বিশ্বাস করে,
যারা ইহুদী,
এবং যারা খ্রীষ্টান
এবং পাবেয়ী -----
এদের যে কেহ
আল্লাহ্ এবং শেষ দিবসে বিশ্বাস করে
ও সৎকাজ করে,
তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের কাছে পুরস্কার আছে,
এবং তাদের কোন ভয় নেই,
তারা দুঃখিত হবে না।" 

এইভাবে গ্রন্থকার কোরআনের অনেকানেক স্তবক বা বাক্যসমষ্ঠি উদ্ধৃত করে দেখিয়েছেন যে ইসলামের 'শ্রুতি' বা ধর্মগ্রন্থের বাণীর মধ্যে যে গভীর আধ্যাত্মিক তত্ব আছে তা উপনিষদীয় ভাব ও দর্শনেরও অনুবর্তী বা পৃথিবীর অন্যান্য ধর্মীয় দর্শনের সঙ্গে মূলগতভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। "কোরআনের এই সমস্ত আধ্যাত্মিক বাণী, তার শিক্ষা, যা মানুষকে আধ্যাত্মিক অনুভূতির পথ দেখিয়ে দেয় তা সর্বকালীন ও সর্বজনীন।" 

কিন্তু ধর্ম যখনি শাসকের বা শাসকদের ধর্ম হয়ে উঠেছে, যখনি ধর্মের সঙ্গে রাজার ক্ষমতা, রাষ্ট্রশক্তি, ও নিষ্ঠুর পুরহিততান্ত্রিক বিধিবিধান যুক্ত হয়েছে তখনই ধর্ম তার কল্যাণকামী, বিশ্বমানবতার রূপ পরিহার করে আগ্রাসী ও রক্তক্ষয়ী পরিণামের দিকে অগ্রসর হয়েছে। মহান ইসলামের ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি।
"প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে অতিমাত্রায় জড়িত থাকার জন্য ইসলাম ব্যহত হয়েছে, যেমন হয়েছিল খ্রীষ্টধর্ম কষ্ট্যানটাইনের পরে।" 

খ্রীষ্টান ধর্মের মতই ইসলামের প্রায় জন্মলগ্ন থেকেই ভারতবর্ষে ইসলাম ধর্মের প্রচারকগণের আগমন ঘটে। প্রথম পর্যায়ে, প্রায় চার'শ বছর ধরে যে সমস্ত ঐস্লামিক  দূতগণ দেশে দেশে ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে গিয়েছিলেন তাতে মধ্যপ্রাচ্যের ভূখন্ডটিকে কেন্দ্রভূমিতে রেখে প্রাচ্যদেশের ভাব, চিন্তা, সংস্কৃতিসহ ব্যবসায়িক বিষয়েরও আদান প্রদান ও আমদানি রপ্তানির পথ খুলে দিয়েছিলেন।
আরব থেকে ভারতে এসেছিলন সুলেমান (৮৫১খ্রীঃ), আল মাসুদি (৯৫৭ খ্রীঃ), পারস্য  থেকে এসেছিলেন আল বিরুনি (১০২৪ খ্রীঃ)। এইরূপে বিভিন্ন দেশের, বিভিন্ন জাতির, ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের সঙ্গে ভাব বিনিময় ও আদান প্রদানের ফলে ইসলাম ধর্মবোধও বরণীয় ও গ্রহনীয় হয়ে ওঠে। "এই সময়েই আবার আরব জাতীয় মানস নূতন নূতন ভাব আহরণের ও তাদের প্রতি সাদর আতিথেয়তা দেখাতে উৎসুক হয়ে গ্রীকো-রোমান, ইরাণী ও ভারতীয় সংস্কৃতির ভাবধারা থেকে ইচ্ছামত গ্রহন করায় ইসলাম তার তেজ ও গৌরবের শিখরে উঠেছিল।" 

কিন্তু ত্রয়োদশ শতক থেকে ইসলামের শাসন-সাম্রাজ্য (যা পশ্চিমের স্পেন থেকে পূর্বে চীন পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল) এবং ভাব-সাম্রাজ্যে ঐতিহাসিক পরিবর্তন দেখা দিল। 'ক্রুশেড' (সে এক ভয়ঙ্কর ও বিপুল ইতিবৃত্তান্ত, (মৎপ্রণীত 'বিন্দুতে সিন্ধু দর্শন' গ্রন্থের, প্রথম‌ খণ্ডে প্রাপ্তব্য) শেষ হতে না হতে মোঙ্গল আক্রমণ আরবীয় ইসলামের আধিপত্য প্রায় বিধ্বস্ত করে দিয়েছিল। এই সময় কয়েক শতাব্দী ধরে ইসলামের পবিত্র 'শ্রুতি' অনেকটাই বিস্মরণে চলে যায়। বিজিতরা স্মৃতি অংশ (জীবনাচরণের সংস্কারগুলি) অনুসরণ করতে থাকেন। অপরদিকে বিজয়ী মোঙ্গলরাও ইসলাম গ্রহন করেন ঠিকই কিন্তু ইসলাম ধর্মের সুউচ্চ দার্শনিক ভাব গ্রহনে তাদের তেমন ধৈর্য না থাকার কারণে ধর্মের সঙ্গে শাসকদের আগ্রাসী শক্তির মিলন সংঘটিত হয়েছিল। 

ভারতে ইসলাম বিস্তার লাভ করতে আরম্ভ হোল মুসলমান শাসনের মধ্য দিয়ে। এই শাসনতন্ত্রের সঙ্গে ইসলামের ক্রমবিকাশের ফলে ভারতের এক বিপুল জনগোষ্ঠী ইসলাম ধর্মের অন্তর্ভুক্ত হয়ে। ভারতীয়দের ইসলাম গ্রহন করবার মূল কারণ তিনটি। এক -- 'হিন্দু' ধর্মের অবিভাবকত্ব যাদের হাতে ছিল সেইসব উচ্চবর্ণের ---- ব্রাহ্মণ, বৈদ্য, ক্ষত্রিয় সম্প্রদায়গুলির 'নীচু' সম্প্রদায়ের প্রতি অবিচার, অত্যাচার, ঘৃণা।
দুই --- ইসলাম রাজার ধর্ম, ইসলাম বর্ণবিদ্বেষহীন ভ্রাতৃত্ববোধের পৃষ্টপোষক।
তিন----- ইসলাম তার জন্মমুহূর্ত থেকেই ধর্মান্তরিতকরণের উপর শাসন ত্রাশন এবং উপঢৌকনের ব্যবস্থা কায়েম রেখেছে যার পূর্ণ প্রয়োগ হয়েছে অধিকৃত রাজ্যগুলিতে, এমনকি দেশগুলিতেও।
কিন্তু এই যে ধর্মান্তরিত মুসলমান সম্প্রদায় সৃষ্টি হোল তাদের কাছে ইসলামধর্মের আদি ও অকৃত্রিম শ্রুতির দার্শনিক মতবাদ সম্পূর্ণ পোঁছায়নি, আর পোঁছালেও ভাষার (আরবি) প্রতিবন্ধকতা ছিল দুস্তর।
তাই একদিকে উচ্চবর্ণীয় ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুদের উদারতাহীন আচারসর্বস্ব ছুুঁৎমার্গ, আর অপরদিকে ধর্মান্তরিত মুসলমানদের প্রতিহিংসা--- দুইয়ের মাঝখানে জাতিবিদ্বেষজনিত  ফাটল‌ --- ক্রমশ প্রশস্ত হতে হতে দুর্লঙ্ঘ্য বিভাজনের গিরিসঙ্কটে পর্যবশিত হয়ে গেল, হয়ে চলেছে আজও। 

তবুও ভূয়োদর্শী স্বামী রঙ্গনাথানন্দজী বলছেন, 

"প্রগতিশীল ইসলামের মন ও‌ বুদ্ধি এখন সংগ্রাম চালাচ্ছে, ভারতীয় চিন্তায় যাকে যুগের ধর্ম নাম দেওয়া হয় সেরূপ, নূতন ঐস্লামিক যুগধর্ম প্রবর্তনের জন্য এই নূতন ইসলাম এখনই কয়েকটি আরবদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের মনে ও প্রাণে সাড়া জাগিয়েছে। দু-রকম ইসলামের দ্বন্দ্ব এখন নিছক প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি আর প্রগতিশীল শক্তির, অনমনীয় অতীত-দর্শী আর নমনীয় ভবিষ্যৎ-দর্শীর দ্বন্দ্বরূপে প্রকাশ পাচ্ছে। প্রথমটি, ইসলামকে সুচারুরূপে বিন্যস্ত একটি পরিপূর্ণ 'স্মৃতি'  মনে করে,----যা স্বতন্ত্র থাকতে চায়, আর অপরটি ইসলামকে 'শ্রুতি'র অনুসরণের মধ্য‌ দিয়ে নবযুগের বৈজ্ঞানিক ও মানসিক চিন্তার আলোকে দেখছে ও চেষ্টা করছে নূতন ঐশ্লামিক স্মৃতি রচনা করতে --- যা ইসলামের চিরন্তন তত্ত্ব ও বর্তমান প্রগতিশীল ভাব, উভয়ের সঙ্গে একতাবদ্ধ হবে।" 

আমরা খ্রীষ্টানধর্ম ও ইসলামধর্মের কঠোর ও কঠিন বিধি বিধানবদ্ধ রূপ দেখেছি এবং তাইই 'পেগান'দের লিখিত ইতিহাসের প্রতিপাদ্য বিষয় ; কিন্তু এই দুই ধর্মেরই আরো একটি শাখা মূল শাখার সমান্তরাল ভাবে বেড়ে চলেছে। সেটি মরমীয়া সাধনা। মরমীয়া সাধনায় সাধকের কল্পনায় ঈশ্বরকে প্রত্যক্ষত অনুভবের মধ্যে মূল ধর্মাদর্শের 'শ্রুতি' ও 'স্মৃতি' - র জটীলতা থাকেনা। তাই খ্রীষ্টীয় মরমীয়া সাধনার (Mysticism) শাখাটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ঠিক যেমন গুরুত্বপূর্ণ "ইসলাম-পূর্ব  ইরানের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের সংস্পর্শজাত ইসলামের সুফি আন্দোলন"  (এ-প্রসঙ্গে সবিস্তারে আলোচনার অবকাশ আছে, যা পর্বান্তরে লেখা হবে।)

পূজ্যপাদ স্বামী রঙ্গনাথানন্দ এই ভাবে বিশ্বের প্রধান ও কিছু অপ্রধান ধর্মের মূল ধারণা বিতরণ করার পর উপনিষদের অতলান্ত প্রজ্ঞার আলোকবলয়ে প্রবেশ করেছেন। পরবর্তী পর্ব থেকে আমরা সেই জ্ঞানালোকের জ্যোতির্ময় শিখা থেকে আমাদের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র হৃদয়প্রদীপের সলতে জ্বালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করব।

(পেগান ধর্ম, Paganism-- বলতে বোঝায় খ্রীষ্টীয় দৃষ্টিভঙ্গীতে ইব্রাহিমীয় ধর্মমত বহির্ভূত কিছু আত্মিক ও সামাজিক বিশ্বাস যা পৌত্তলিকতার সঙ্গে যুক্ত)
                            


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...