সোমবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২১

ধাত্রী ধরিত্রী

কালহারা সে সুদূর অতীত হবে–
বসুধার মুখে আলো পড়েছিল যবে,
প্রাণের প্রদীপ জ্বালালো বসুন্ধরা--
বিশ্বভূবনে বন্ধ্যা পাষাণে ঝরঝর জলধারা,
প্রাণের অমৃত-ভরা।

কত যুগ, কত যুগান্তর অবসান।
স্ফটিক পাথরে মৃত্যু গরল নিত্য করিয়া পান,
শাশ্বত প্রাণের মহিমা উঠেছে জ্বলে
আকাশে বাতাসে মরুময় দেশে ভূধরে জলে স্থলে।
যুগসন্ধির রহস্যময় সাঁঝে
অপাপবিদ্ধ নরনারী এলো বিধাতার দেওয়া কাজে ;
দেহমন্দিরে তার
আনন্দময় প্রাণের মূর্তি বিমূর্ত চেতনার।

তারপর?  ইতিহাস কথা কয়।
যুগে যুগে এলো শত সভ্যতা, কত সভ্যতা লয়--
লয় শুধু নয়, প্রকৃতির শাপে সঞ্চিত 'অবলুণ্ঠন',
দম্ভের গড়া কীর্তিস্তম্ভে লজ্জার অমাগুণ্ঠন।
পাশবিক-ভাব পশুরাও ছিল, এখনও কিছুবা আছে,
পাখীরাও আছে, গান গেয়ে বাঁচে, প্রকৃতির তালে নাচে।
তারা পৃথিবীর ভালোবাসা বোঝে, জ্ঞানের গরিমা-হারা--
শুধু মানুষের লালসা-আগুনে🔥দগ্ধ বসুন্ধরা।
যুগে যুগে যারা আগুন জ্বেলেছে নিজেও জ্বলেছে চিতায়
দ্যুলোকের বাণী ধ্বনিত নিয়ত -  শোনেনি অহমিকায়।

    " শৃণ্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রাঃ
     আ যে দিব্যানি ধামানি তস্তু
     পরাহমেকম্ পুরুষম্ মহান্তং
      আদিত্যবর্ণং তমসোপরস্তাৎ।।"

ওই তমসার পরপারে দেখ-- স্রষ্টা জ্যোতির্ময় ,
আত্মা তোমার তাঁহার সৃষ্টি, অক্ষয়, অব্যয়।
ধর্ম-বর্ণ-জাতি বিভাজনে কেন এ আত্মনাশ?
মনুষ্যত্বের মহাপরাভবে পিশাচের উল্লাস !

মহাকবি বলে, "হে অতীত তুমি কথা কও,কথা কও।"
আমি বলি, "ওগো গতকাল, তুমি বিস্মৃত হয়ে রও।"
ভালো যত আছে,তার চেয়ে কালো দেখি সহস্রগুণে,
ধরণীর কোল শোণিত-সিক্ত হিংসা মারণ-বাণে ।
বিদ্যুৎ ঝলে ঝঞ্ঝার মেঘে, তারেও অভয় মানি,
ধরিত্রীর বুকে হাহাকার আনে অস্ত্রের ঝলকানি।
সাগরের কূলে, মরুপ্রান্তরে শ্যামল সজল ধরায়
মৃত নরনারী, শিশুদের দেহ শোণিত-পঙ্কে লুটায়।

মনে করে দেখ কুরুক্ষেত্র,  যুদ্ধের অবসানে--
অস্তসূর্য স্থির অপলক মৃত্যুর প্রাঙ্গনে।
কুরু-পাণ্ডব আরো যত শব আঠারো অক্ষোহিনী,
রথ-মহারথী,কুশলী সারথী,অশ্ব-হস্তী-বাহিনী -
সব যবে শেষ, শুধু অবশেষ মূর্ত শোকের হাহাকার,
ছোটে সুভদ্রা পাগলিনী মাতা,হাতড়ায় মৃতদেহ কার !
হঠাৎ যেখানে দাঁড়ালেন এসে--বাহ্য চেতনা-হারা
অভিমন্যুর মৃতদেহ কোলে বসে আছে উত্তরা !
শূণ্যদৃষ্টি, শূণ্যে নিথর  গর্ভে রয়েছে প্রাণ ,
মরণের পায়ে জীবনকে সঁপে' নারীত্ব বলিদান ।
________________________________________
সুভদ্রা বিলাপঃ
"মুখ়ং তে দৃশ্যতে বৎস গুন্ঠিতং রণরেণুনা ।"

  রণাঙ্গনের ধূলায় মলিন কী মূর্তি যন্ত্রণার !
(হে কৃষ্ণ), কার পাপে এই নরকের গতি আমার প্রাণের কণার?)
_____________________________________________
এমনই নিযুত পুত্রহনন, ভ্রাতৃহনন শেষে
আজিও মানুষ মরণোন্মাদ  আত্মসর্বনাশে।
ঝটিকা, প্লাবন, দাবানল যত প্রকৃতির তাণ্ডবে
ভেঙেছে আলয়, আবার গড়েছি নব নব অনুভবে।
যে বিশ্বমারি মড়কের বলি শতেক লক্ষ প্রাণ–
মানুষের জ্ঞানে, জীবন-সাধনে তারও হবে অবসান।

কিন্তু যে পাখী, বুকে বিঁধে তীর আফগানী গুলবাগে,
থামালো গজল,পড়ল মাটিতে, সোমেতে ফেরার আগে।
যে‌ অবোধ শিশু–প্রাণহীন যীশু মধ্যসাগর তীরে,
কোথা তার গৃহ,পিতামাতা স্নেহ দেখা হয় নাই ফিরে।
কার পাপে ,কোন্ অভিশাপেএই নির্মম পরিণাম !
ফরিস্তা চুকাবে জীবন-মূল্যে অমানবিকতার দাম !

আঁধি, ব্যাধি,–দুর্দৈবের ভীতি সমস্ত জয় করে'
স্বকৃত পাপের তরবারী নিয়ে মানুষ মরে ও মারে।
ধর্মের নামে অধর্ম সৃজন–তার নির্মম অজুহাতে
দেশে দেশে যত ঘাতকের দল রক্ত-সিনানে মাতে।
মুনাফার ঘোরে উল্লাসে নাচে অস্ত্রের কারবারি,
পৃথিবীতে সুখস্বপ্নের ইতি, ভিনগ্রহে দিবে পাড়ি।
নেশাখোর আশা,হয়েছে দুরাশা,অন্তিম আসে ঘনায়ে,
অবলুন্ঠিতা কুন্ঠিতা ধরা দিয়েছে সেকথা জানায়ে।

সভ্যতা, তুমি আত্মঘাতী ! এখন এবার থামো !
প্রাণ প্রসবিনী, ধরিত্রী জননী, বল তারে নমঃ নমঃ,
ক্ষমা করো মা গো সর্বংসহা, এ বিশ্ব‌ সংসারে,
তুমিই রয়েছো প্রাণদীপ জ্বেলে লোকে ও লোকান্তরে।
জীবশ্রেষ্ঠ এ মানবকুল, তার জন্মদাত্রী তুমি,
তোমার বিপুল স্নেহভরা কোল সবার জন্মভূমি।
যুগে যুগে এলো শান্তির দূত অমৃত মন্ত্র নিয়ে, 
বরণ করেছে অকাল মরণ আমাদের পাপ ধুয়ে।
রক্তপিপাসু যে অসুর জাগে মানুষের অন্তরে–
মানবতা-হীন ধর্মপালন কপালিক উপচারে ।

নরবলি-দান হবে না বন্ধ ? হবে না কি প্রেমদান?–
নবপ্রভাতের নূতন আলোক, নবরাগ, নবতান –
একটি পৃথিবী, এক মহানীড়, একসুরে গান গাই –
"সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপর নাই ।"

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়
৩১/১০/২০২১
ব্যাঙ্গালোর।

জ্ঞাতব্যঃ
কিছু কিছু ভাব, ভাবনা, শব্দ, শ্লোক ও বাক্য–
বিশ্বসাহিত্যের মহান স্রষ্টাদের শাশ্বত সৃষ্টি থেকে নেওয়া হয়েছে। শেষ বাক্যটি মানবপ্রেমের মূর্ত বিগ্রহ দ্বিজ চণ্ডীদাসের একটি অমৃতক্ষরা পদের শেষ উচ্চারণ।
-----------------------------------------------------------------------









                    


                     



                  
        

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...