রবিবার, ২০ মার্চ, ২০২২

চণ্ডীদাসের আধুনিক কবিতা

 দ্বিজ চন্ডীদাসের আধুনিক কবিতা 

না, "আধুনিক কবিতা" এই শিরোনাম দিয়ে আমি আজ সাহিত্য সমালোচনা করতে যাবো না। 'আধুনিক'  শব্দটির বয়স 'বর্তমান' নয়। আদি কবি বাল্মীকিও যেমন তাঁর সময়কালে আধুনিক ছিলেন, তেমনই আজ  যাঁরা ‌পত্র পত্রিকায় লিখছেন তাঁরাও তাঁদের কালে আধুনিক। 
রামায়ণ, মহাভারত, কাদম্বরী, ঋতুসংহার, কুমারসম্ভব, গীতগোবিন্দম্, গাথাসপ্তশতীর কবিদের কথা তো বাদই  দিলাম, বৈষ্ণব কবিরগণও আধুনিকতার (নিরাবরণ দৈহিকতা ও 'নিলাজ' কামনা যদি মানদ্ণ্ড হয়) যে  উদাহরণ রেখে গিয়েছেন তেমন কিছু লিখতে গেলে আজকের অত্যাধুনিক কবিরও হাত কেঁপে উঠবে। 

আজ থেকে পাঁচ শতাধিক বছর আগে অনাবিল বাংলাভাষার আদি কবি চণ্ডীদাসের পদাবলী পাঠ  করুন। 

'মাথুর' পদে রাই বিরহিণী বলছেন , 
 
"কালি বলি কালা গেল মধুপুরে 
     সে কালের কত বাকি। 
যৌবন সায়রে সরিতেছে ভাঁটা 
     তাহারে কেমনে রাখি।। 
জোয়ারের পানী নারীর যৌবন 
     গেলে না ফিরিবে আর। 
জীবন থাকিলে বঁধুরে পাইব 
      যৌবন মিলন ভার।।" 

পাঁচ শতাধিক বছর আগে এমন সংরক্ত আবেগের রক্তমাংসের কামনা এবং পার্থিব (জোয়ার ভাটার) উপমা সমকালের সামাজিক পরিবেশে কতখানি অনুকূল বা প্রতিকূল ছিল সেটির সম্পূৰ্ণ ছবি ইতিহাসের ধূসর পাতা থেকে উদ্ধার করা না গেলেও কবির অন্তর প্রকৃতির অনাবিল, জৈবিক ক্ষুৎপিপাসা সমন্বিত মানবিকতাকে অস্বীকার করার কোন উপায় থাকে না।  

      সই  কেবা শুনাইল শ্যাম নাম। 
কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল গো 
           আকুল করিল মন প্রাণ।। 
**********************************
নাম পরতাপে যার ঐছন করিল গো 
           অঙ্গের পরশে কিবা হয়।। 

                                   দুই
                               ________
মানবাত্মার জাগতিক যে রূপ – তার যে পার্থিব আশা-‌ আকাঙ্ক্ষা, দেহজ কামনা-বাসনা, প্রিয় বিরহে   মনোবেদনা, মিলনে পরমানন্দ – এসকল হৃদয়াবেগের মধ্যেই জীবনের ইহজাগতিক ও পারমার্থিক চরিতার্থতা। রূপমুগ্ধতার সঙ্গে সংরক্ত স-অঙ্গ সম্মিলন-য়ের এই যে  সুতীব্র কামজ কামনা, এমনতর উদাহরণ সংস্কৃত  সাহিত্য, কোমলকান্ত, তরলিত সংস্কৃত, শৃঙ্গরসাত্মক পদাবলীর আকরগ্রন্থ গীতগোবিন্দম্ ব্যতিরেকে এই প্রথম 'আধুনিক বাঙলা সাহিত্যে' পরিদৃশ্যমান। 

রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর। 
প্রতি অঙ্গ তরে কাঁদে প্রতি অঙ্গ মোর।। 

"চণ্ডীদাসের পদাবলী পড়িতে পড়িতে বিস্মিত হইয়া  
জিজ্ঞাসা করিতে হয়, এই ভাষা পাঁচশো বৎসর পূর্বেকার লেখা না এখনকার লেখা ? এভাষা যদি  প্রাচীন  হয়, তাহা হইলে নবীন ভাষা কোথায়? রচনার  সর্বশ্রেষ্ঠ গুণ প্রসাদ গুণ, চণ্ডীদাসের রচনায় এই গুণ  সর্বত্র বিরাজমান। এমন সহজ সরল সুন্দর সরস ভাষা  দেখিতে পাওয়া যায় না। চণ্ডীদাসের কথা যেন প্রাণ  হইতে নিঃসারিত হইয়া প্রাণ স্পর্শ করে।" 

পদকর্তা চণ্ডীদাস পূর্বরাগ, অনুরাগ, রূপানুরাগ, মান, মাথুর, অভিসার, মিলন–য়ের অসংখ্য (বহু পদই বিভিন্ন পদকর্তার নামে প্রচারিত হয়েছে) পদে নরনারীর হৃদয়াবেগের যে বাস্তবানুগ ভাষা-প্রতিমা নির্মাণ  করেছেন তা তাঁর পূর্বতন শিল্পী কবি জয়দেব, কবি  বিদ্যাপতির মতো অলঙ্কার সর্বস্বতার ঔজ্জ্বল্যে  রাজসভার রাজকীয় রুচিবোধকে তৃপ্ত করার জন্য নয়, সে যেন আবহমানকালের বাঙলাদেশের পল্লীপ্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পল্লীবালার বহিরঙ্গ ও অন্তরঙ্গ  সংরাগ দিয়ে গড়া।  

তোমরা আমারে ডাকিয়া সুধাও না (প্রাচীন বানানরীতি) 
         প্রাণ আনচান বাসি। 
কেবা নাহি         করে প্রেম 
       আমি হইলাম দাসী। 
গোকুল নগরে     কেবা কিনা করে 
          তাহে কি নিষেধ বাধা। 
সতী কুলবতী       সে সব যুবতী 
           কানু কলঙ্কিনী রাধা। 

আহাঃ, যেন আমার ঝাড়খণ্ডের প্রত্যন্ত এক গ্রামের 
মনসাতলায় গ্রাম্য কুলবধূদের দ্বিপ্রাহরিক জটলা বসেছে। 

আরো শুনুন 'মাটির কাছাকাছি' কবির কথা , 

পাপ পরাণে কত সহিবেক জ্বালা। 
শিশুকালে মরি গেলে হইত যে ভালা।। 
এ জ্বালা জঞ্জাল সই‌ তবে সে পরিহরি। 
ছেদন করিয়া দেও পিরীতের ডরি।। 
তেমতি নহিলে যার এমতি ব্যাভার। 
কলঙ্ক কলসী লইয়া ভাসিব পাথার।। 

সমাজের সমস্ত নিয়মের নিগড়, বাধা-বন্ধন, বর্ণাভিমান,  
ধর্মাভিমান, কুল-শীল-জাতি-মান – সবার উর্দ্ধে কবি  চণ্ডীদাস স্থান দিয়েছিলেন 
প্রেম ও মানবিকতাকে। 

পিরীতি নগরে বসতি করিব 
            পিরীতে বাঁধিব ঘর। 
পিরীতি দেখিয়া পড়শী করিব 
             তা বিনু সকলি পর।। 
.............................................
পিরীতি সরসে       সিনান করিব 
          পিরীতি অঞ্জন লব। 
পিরীতি ধরম.        পিরীতি করম 
             পিরীতে পরাণ দিব। 

আর যা চিরদিনের, ধ্রুবতারার মতো জ্যোতির্ময়, 
শাশ্বত মানবপ্রেমের বাণী তা তো এই মহাপ্রেমিকেরই 
স্বর্ণলেখনীনিঃসৃত ,

"শুনহ মানুষ ভাই। 
সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপর নাই।।" 
 
এখনকার আধুনিক সময়কালের এমন একজন আধুনিক কবির জন্মদিন পালন করা যাবে কি যিনি  সংকীর্ণ গণ্ডীবদ্ধ রাজনীতি, সমাজপরিবেশ, স্বার্থসর্বস্বতা, উচ্চমন্যতা এবং অবচেতনিক মর্ষকামিতা-  নিরপেক্ষ উদার মনুষত্ববোধের একটি কবিতা লিখছেন? তেমন যদি একটি কবিতা পেয়ে থাকেন, 
আমাকে উপহারস্বরূপ পাঠিয়ে দিবেন। আমি ওই  কবিতাটিকে আধুনিক কবিতার সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ  হিসাবে উদ্ধার করে রাখব।  

ঋণ স্বীকার, 
বৈষ্ণব পদাবলী, 
'বাঙলার গীতিকাব্য' -- নগেন্দ্রনাথ বসু । 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 
২০/০৩/২০২২
কলকাতা।













কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...