বুধবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৫

স্বামী রঙ্গনাথানন্দ ও বর্তমান ভারতবর্ষে তাঁর মতাদর্শের অপরিহার্যতা- ৫

পাঁচ 

কামনা ও ভোগস্পৃহা মানুষের সমস্ত দুঃখের মূল। একথা আমাদের ধর্মশাস্ত্রগুলিতে কতবার কত ভাবে যে লেখা হয়েছে তার ইয়ত্তা নাই। কিন্তু কামনা ও ভোগাসক্তি ত্যাগ করা কি যায় ? আর তা যদি সামাজিক এবং পরিবারভুক্ত মানুষ -- বাস্তবে ত্যাগ করে তবে মানুষের সমাজ বা পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানগুলিই অচল, অনুৎপাদক হয়ে যাবে। যাবেই। আর এই যে গীতায় (১৩/৯) শ্রীকৃষ্ণ বলে দিলেন,--- 

"অসক্তিরনভিষ্বঙ্গঃ পুত্রদার গৃহাদিষু।
নিত্যঞ্চ সমচিত্তম্ ইষ্টানিষ্টোপপত্তিষু।।" 

পুত্র, স্ত্রী, গৃহ, ধন সম্পদ ইত্যাদিতে কোন আসক্তি থাকবেনা, 'অনভিষ্বঙ্গ' হবে, অর্থাৎ কোন মায়া মমতা থাকবে না, আর প্রিয় বা অপ্রিয় যাহা-ই আসুক সর্বদাই সমভাবে গ্রহণ করতে হবে। এরকম কামনাবিবর্জিত হয়ে কি আর সংসার করা যায় ? কাম ও কামনা প্রজনের চালিকাশক্তি। আর প্রজনন বা উৎপাদনের প্রতি আসক্তির তীব্রতা থেকেই মানব সভ্যতার ক্রমোন্নয়ন। শরীর থাকলে ইন্দ্রিয়গুলির ক্রিয়াও থাকবে। ইন্দ্রিয়ানুভূতিও থাকবে। না যদি থাকে তবে শবদেহবৎ একটি অহল্যা-মূর্তি থাকাও যা, না-থাকাও তা। আর মনুষ্যসুলভ  ইন্দ্রিয়ানুভূতির, বরং বলা যায়, সংরক্ত ইন্দ্রিয়ালুতার মহাকবি আমাদের কালিদাস তো 'রঘুবংশ'-এ বলেইছেন, "শরীরম্ আদ্যং খলু ধর্মসাধনম্।" শরীর না থাকলে  এবং শরীরের মধ্যে ভোগবাসনার অদম্য ইচ্ছার আন্তর-প্রেরণায় অনুপ্রাণিত না হলে জীবনের রথ সচল থাকবে কেমন করে ? 


'শরীরই হোল উচ্চতর, উচ্চতম জীবনবোধ লাভ করার সাধনমন্দির।'
"দেহের ভাঁড়ে ছলকে পড়ে খে-জুর গাছের রস।" -- -- --বাউল। ('খ' এখানে আকাশ।) 

এইটিই সারকথা।
আমাদের জীবন্ত দেব-দেবী জনক-জননীর মনোবাসনায় প্রাপ্ত, তাদের সেবায় স্নেহে বর্ধিত এই পার্থিব দেহ, এই অনন্ত আবেগানুভূতি-ঋদ্ধ জীবনে জৈবিক প্রবনতাগুলির অপরিহার্যতা স্বীকার করেও যা থাকে তা হোল ইন্দ্রিয়াতীত চৈতন্যের অনুসন্ধান। জৈবিক জীবনের চাহিদাগুলো পূরণ করেও 'শাশ্বত-নিত্য-সত্য' জীবনের জন্য সাধনা আমাদের ধর্মশাস্ত্রগুলিও স্বীকার করে।
অতিন্দ্রীয় এবং ইন্দ্রিয়াতীত জ্ঞানের মূর্ত মূর্তি পরম নিরঞ্জন গৌতম বুদ্ধ বুদ্ধত্ব লাভের পর বারাণসীর কাছে সারনাথে তাঁর‌ শিষ্যদের প্রথম উপদেশ দিয়েছিলেন, মানবজীবনে দ্বৈতসত্তা ও মধ্যপন্থার কথা উল্লেখ করে।
"একটি হোল যা ইন্দ্রিয়সুখের মাধ্যমে কাম-লালসার সঙ্গে যুক্ত ও সম্পর্কিত এবং নীচ, অজ্ঞ, অমার্জিত, ইতর এবং মূল্যহীন ; অপরটি আত্মপীড়নের সঙ্গে সম্পর্কিত -- কষ্টদায়ক, নিকৃষ্ট ও মূল্যহীন।"
এই দুই চরম মূল্যহীন পথ অনুসরণ না করে তিনি একটি মধ্যপথের দিশা দেখিয়েছেন। যে পথের অনুসরণের মধ্য‌ দিয়ে আসে ইন্দ্রিয়াতীত অনুভূতি এবং প্রজ্ঞা, যা এগিয়ে দেয় শান্ত পরিবেশ, বিবেকপূর্ণ-বোধি ও শান্তির অভিমুখে। 

এমন মধ্যপন্থার কথা আছে গীতাতেও। 

নাত্যশ্নতস্তু যোগহস্তি ন চৈকান্তম্ অনশ্নতঃ।
ন চাতিস্বপ্নশীলস্য জাগ্রত ও নৈবচার্জুন।।

যুক্তাহারবিহারস্য যুক্তচেষ্টস্য কর্মসু।
যুক্তস্বপ্নাববোধস্য যোগো ভবতি দুঃখহা ।। 
                                                 (ষষ্ঠ অধ্যায়)। 


অতিভোজী, অনাহারী, অতি নিদ্রালু এবং অনিদ্রা অভ্যাসকারীরদের যোগ হয় না। বরং পরিমিত আহার-বিহারশীল, পরিমিত কায়কর্মশীল এবং নিদ্রা-জাগরণে যাঁদের পরিমিতি বোধ আছে তাদের সাধনা (যোগ) সংসার-দুঃখ নাশক হয়।

এখানেই ঋষিকল্প স্বামী রঙ্গনাথানন্দ মহারাজের উপনিষদ ব্যাখ্যার বিশেষত্ব। তিনি বেদান্ত শ্রুতির এমন এক সুন্দর, সহজতর ভাষ্য রচনা করেছেন যা সাধারণ মানুষেরও বোধগম্যতার মধ্যে ধরা পড়ে। সাধারণ মানুষেরও অধিকার আছে আপন স্বাধীন চিন্তার মাধ্যমে স্রষ্টাকে জানা, সৃষ্টিকে জানা। উপনিষদ আমাদের সেই শিক্ষাই দিয়েছেন। কঠোর তপশ্চর্যা, কৃচ্ছসাধনা বা যোগসাধনায় যাঁরা সত্যকে উপলব্ধি করেছেন, আর যাঁরা সুশৃঙ্খল জীবনাচরণের মধ্যে দিয়ে সত্যের অনুসরণ করেছেন -- দুই দলই একই তীর্থের যাত্রী। স্বামী রঙ্গনাথানন্দ মহারাজ এ-প্রসঙ্গে যা বলেছেন তার অন্তর্নিহিত ভাব এই রকমঃ --- 

শরীর, ইন্দ্রিয়াতীত ও মনস্ বা মন সঠিক নিয়ম শৃঙ্খলায় চালিত হলে বুদ্ধি শুদ্ধ ও মুক্ত হয়।‌ তখন সে উপলব্ধি করতে সমর্থ হয় আত্মার সৎরূপের (সত্যরূপ) বিরাটত্বকে ----- যে আত্মা নিজেকে অনুভূতিতে মানবাত্মারূপে‌ ধরা দেন।  মানুষ নিজেই এই মানবাত্মার সাধনায় ব্রতী হতে পারেন। ধর্মগ্রন্থ বা ধর্মগুরুদের দ্বারা আরোপিত বিধিনিষেধ পালনের দ্বারা নিজের আপন অন্তরাত্মার সঙ্গে যোগ সাধিত হয় না। 


স্বামী বিবেকানন্দ (মানবতাবাদের পরাকাষ্ঠা) বলছেন, "কোন বিধিনিষেধের দ্বারা মুক্তিলাভ হয় না। তুমি সদা মুক্ত আছো। যদি তুমি পূর্ব হতেই মুক্ত না হতে তবে কিছুই তোমায় মুক্তি দিতে পারে না। আত্মা স্বপ্রকাশ। কার্য-কারণ আত্মাকে স্পর্শ করতে পারে না --- এই দেহশূন্য ভাব বা বিদেহ অবস্থার নামই মুক্তি।" 

এই প্রসঙ্গে তাঁর কালজয়ী বক্তব্যের কিছুটা অংশ উদ্ধার করি, ----
এখানে সেখানে, মন্দিরে গীর্জায় ,স্বর্গে মর্ত্যে, নানাস্থানে এবং নানা উপায়ে অন্বেষণ করবার পর অবশেষে আমরা যেখান থেকে আলোচনা আরম্ভ করেছিলাম (আত্মা স্বপ্রকাশ), সেই আত্মাতেই যদি বৃত্তপথে ঘুরে‌ আসি, তবে দেখতে পাই  যার জন্যে আমরা সমগ্র জগতে অন্বেষণ করেছিলাম, যার জন্য আমরা মন্দিরে গীর্জায় --- সকল ধর্মস্থানগুলিতে  কাতর হয়ে প্রার্থনা ও অশ্রু বিসর্জন করেছিলাম, যাকে আমরা সুদূর আকাশে মেঘরাশির দ্বারা আবৃত ---- অব্যক্ত রহস্যময় বলে মনে করেছিলাম, তিনি আমাদের নিকট হতেও নিকটতর, প্রাণের প্রাণ ; তিনিই আমার দেহ, তিনিই আমার আত্মা। 'তুমিই  আমি, আমিই তুমি।' 


"আমার মধ্যে তোমার প্রকাশ তাই এত মধুর।‌"
                                                  --- রবীন্দ্রনাথ 


এই ধর্মদর্শন একান্তভাবেই বৈদান্তিক ; অর্থাৎ ঋকবেদ, সাম, যজুঃ -র পরবর্তী কালের (অথর্ব বেদ প্রথমে মূল শ্রুতিসংহিতার অন্তর্গত ছিল না)  যখন ঋষিগণ বুঝতে পেরেছিলেন কলস কলস ঘৃত অগ্নিতে আহুতি দেওয়ার  নিরর্থকতা। যাই হোক্, আর্য জাতির ধর্মাচরণের এই ক্রমবিবর্তনের ইতিহাস সুদীর্ঘ। শতাব্দী নয়, সহস্রাব্দের ব্যবধান ছিল ঋকবেদ থেকে উপনিষদ, শ্রীমৎ ভাগবত এবং রামায়ণ-মহাভারতাদি পুরাণ রচনার সময়কালে পোঁছাতে। 

এই হাজার হাজার বছর পরে (ঋক্ পরবর্তী) আর্য জাতির ধর্মাচরণের রীতি বহুধাবিভক্ত হয়েছে। বৌদ্ধ ও বৌদ্ধধর্মাবলম্বীগণ, মহাবীর জৈন ও জৈনধর্মাবলম্বীগণ বিভিন্ন শাখায় ভাগ হয়ে গিয়েছেন। বেদবাদীগণের মধ্যে ব্রাহ্মণ্যবাদী স্মার্ত এবং বেদান্তবাদী মীমাংসক সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হয়েছে। এই উভয় সাম্রদায়ের মাঝখানের মতবাদীরা ছিলেন আবার সাংখ্যিক। আর্যধর্মের এত বিভাজন ছাড়িয়েও এক বিপুল জনগোষ্ঠী ছিল যারা (তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ) লোকায়তিক। ('লোকায়ত দর্শন' একটি স্বতন্ত্র বিষয়)। 

এই সব জ্ঞাতব্য বিষয়গুলির ইঙ্গিত দিয়ে আমরা আবার ফিরে আসি 'উপনিষদের সন্দেশ' আলোচনায়। ঈশ্বর- সাধনা, উপনিষদ যাকে 'ব্রহ্ম' সাধনারূপেই বর্ণনা করেছেন, তা কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম নয়। সে ধর্ম গুরুমুখ বিতরিত এবং গুরুকুল নিয়ন্ত্রিত। অবশ্য এই সমস্ত গুরুগৃহগুলি যেমন বশিষ্ঠ, গৌতম, যাজ্ঞবল্ক্য, অত্রি প্রভৃতি--- বংশানুক্রমে বা শিষ্যাণুক্রমেই চলমান ছিল। কিন্তুু আর্য ধর্মধারণা বহির্দেশীয় ইহুদী, খ্রীষ্টান, ইসলাম এবং ভারতবর্ষীয় জৈন, বৌদ্ধ ধর্মের মত একক, প্রশ্নাতীত বা ঈশ্বরকল্প কোন প্রবর্তকের দ্বারা প্রচারিত নয় ; নিয়ন্ত্রিতও নয় সেই সমস্ত ধর্মধারণার প্রাতিষ্ঠানিক 'স্মার্তগণের' মত। 

বৈদান্তিক বা উপনিষদীয় ধর্ম একাধারে ব্যক্তিক ও সর্বজনীন। যার ফলে আর্য ছাড়া ন-আর্য জনগোষ্ঠীর আচরিত সংস্কার ও রীতি নীতির মধ্যেও বৈদান্তিক ধর্মবোধের, ধর্মাচরণের প্রভাব ক্রিয়াশীল।
আমাদের বৈদিক সভ্যতার প্রথম আধ্যাত্মিকতার ইতিহাস যদি ঋকবেদ হয়, তবে ঋকবেদের সুক্ত গুলির দ্বারা প্রার্থিত বিষয়গুলি ছিল প্রাণরক্ষার প্রয়োজনে। একটি সুক্তে বলা হচ্ছে,

ব্রহ্মণস্পতে সুষমস্য বিশ্বহা রায়ঃ শ্যাম রথ্যো বয়স্বতঃ।
বীরেষু বীরাঁ উপ পৃঙধি নস্তং যদিশানো ব্রহ্ম তা বেষি মে হবম্।। 

হে ব্রহ্মণস্পতি, বিশ্বব্যাপি সুনিশ্চিত (ভিন্নার্থে সুনিয়ন্ত্রিত) ধনের আমরা যেন অধিপতি হই  ; আমাদের বীরদেরকে তুমি  বীর পুত্র উৎপাদন করতে সাহায্য কর। তুমি সকলের শ্রেষ্ঠ এবং আমাদের অন্নযুক্ত ('নৈবেদ্য) স্তুতির অভিলাষী। 
অথবা
অম্বে রায়ো দিবে দিবে সং চরন্তু পুরস্পৃহঃ।
অম্বে বারাস ঈরতাম্।।

ওহো অগ্নি, আমাদের অতি কাম্য ধনসমুহ আমাদের নিকট আনয়ন করুক। অন্নসমুহ (খাদ্যদ্রব্য ) আমাদিগকে কর্মের প্রেরণা দিক।

মন্ত্রগুলি (সাম) অতি অনুশীলীত কণ্ঠে প্রার্থণা- সঙ্গীতরূপে গীত হোত। এই সকল গান ছিল কামনার গান। অন্নের কামনা, ধনের কামনা, পশুর কামনা, সন্তানের কামনা, নিরাপত্তার কামনা। মোক্ষলাভের কামনা নয়, আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের কথা নয়। সরলভাবে নেহাতই পার্থিব কামনা প্রকাশ করা হয়েছে।
ধন, জন, জীবন লাভের এই প্রার্থনা তো বিশ্বের সমস্ত আদিম সভ্যতার প্রাথমিক চাহিদা। হাজার হাজার বছর অতিবাহিত হবার পর, এই প্রাথমিক চাহিদাগুলিই রূপান্তরিত হয়ে যে আধ্যাত্মিক কামনা জীবন ও জগৎ সৃষ্টির কারণ অনুসন্ধানে ব্যাপৃত হোল উপনিষদসমুহ তারই বাঙ্ময় অভিব্যক্তি। এবং সেই 'অভিব্যক্তি' যা মানব সভ্যতার সমগ্র শাখার জ্ঞান বিজ্ঞানের ক্রমবিকাশের আদিতম উচ্চারণ। তাইই উদ্ভাসিত হয়েছে, উদ্ঘোষিত হয়েছে, হয়ে আছে আমাদের উপনিষদগুলিতে। 

"অসতো মা সৎগময়
তমসো মা জ্যোতির্গময়
মৃত্যোর্মা অমৃতংগময়ো।।" 

 এমন আর্ত উচ্চারণ বহুযুগের জীবনসাধনার অন্তিম প্রার্থণা |

এরপর চারটি মহাবাক্য নিয়ে আলোচনা I 
                                     


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...